এই প্রতিবেদনের জন্য আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক দশক।সময়টা ৭০এর দশক ।তখন বলিউডে রাজত্ব করছিলেন রোম্যান্টিক নায়করা। রাজেশ খান্নার হাসি, প্রেম, গান আর আবেগে মুগ্ধ ছিল গোটা দেশ। কিন্তু ভারতের সমাজ তখন অন্য এক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে—বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান হতাশা। সেই সময়ে দর্শক আর স্বপ্নের প্রেমিককে নয়, নিজের ক্ষোভের প্রতিনিধিকে খুঁজছিলেন।ঠিক তখনই ১৯৭৩ সালে জঞ্জির ছবির মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটে অমিতাভ বচ্চনের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান-এর। ইন্সপেক্টর বিজয় খান্না ছিলেন এমন এক নায়ক, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপস করেন না, নিয়মের সঙ্গে সংঘাতে যেতে ভয় পান না এবং নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়। এই চরিত্রই অমিতাভকে রাতারাতি সুপারস্টারে পরিণত করে।

এরপর দিওয়ার, শোলে, ত্রিশুল,কালা পাত্থর, ডন ,মুকাদ্দার কা সিকান্দার,অগ্নিপথ -একের পর এক ছবিতে অমিতাভ এমন এক নায়কের প্রতীক হয়ে ওঠেন, যিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাই লড়াই করছেন। তাঁর চরিত্রগুলি প্রায়শই আইনের বাইরে গিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত, আর দর্শক তাতেই নিজেদের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন খুঁজে পেতেন।সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, অমিতাভের জনপ্রিয়তা কেবল অভিনয় দক্ষতার জন্য ছিল না। তিনি আসলে সত্তরের দশকের ভারতীয় যুবসমাজের হতাশা, বঞ্চনা এবং বিদ্রোহী মানসিকতার মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ইমেজ একটি পুরো প্রজন্মের সামাজিক মনস্তত্ত্বকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

২০২৩ সালে ‘অ্যানিমাল’ মুক্তির পর ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এক অদ্ভুত বিতর্ক শুরু হয়েছিল। একদল দর্শক ছবিটিকে “মাস্টারপিস” বলেছিলেন, অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশ অভিযোগ করেছিলেন এটি অতিরিক্ত হিংসা, বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র এবং নারীর প্রতি অসম্মানকে গ্ল্যামারাইজ করেছে।
বিতর্ক থামার আগেই ২০২৫-২৬ সালে ধুরন্ধর, এবং ধুরন্ধর; দ্য রিভেঞ্জ অভূতপূর্ব বক্স অফিস সাফল্য অর্জন করে। দুটি ছবিই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত, তীব্র হিংসাত্মক এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন অপ্রতিরোধ্য শক্তিমান পুরুষ। তবুও দর্শক সেগুলিকে বিপুলভাবে গ্রহণ করেছেন। ধুরন্ধার এবং তার সিক্যুয়েল মিলিয়ে হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা করেছে এবং ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল অ্যাকশন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—ভারতীয় দর্শক কি আবার ‘মাচো ম্যান’-এর প্রেমে পড়েছেন?
রাগী যুবক থেকে অ্যানিম্যাল- ভারতীয় সিনেমায় মাচো নায়কের ইতিহাস নতুন নয়।কিন্তু অ্যানিম্যাল এই ধারাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এখানে নায়ক শুধু শক্তিশালী নন, তিনি মানসিকভাবে অস্থির, আবেগপ্রবণ, হিংস্র এবং নিয়মভাঙা। তাঁর নৈতিকতা প্রশ্নাতীত নয়, তবুও দর্শকের একটি বড় অংশ তাঁকে উদযাপন করে।এই পরিবর্তনটাই গুরুত্বপূর্ণ।আগের মাচো নায়ক সমাজকে রক্ষা করতেন। নতুন মাচো নায়ক সমাজের নিয়ম ভেঙেও নিজের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করেন।

ধুরন্ধর সিরিজের সাফল্য দেখিয়েছে যে ভারতীয় দর্শক এখনও বৃহৎ আকারের অ্যাকশন কাহিনি দেখতে আগ্রহী। ছবিগুলি ব্যাপক বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে এবং ভারতীয় বক্স অফিসের বহু রেকর্ড ভেঙেছে।তবে অ্যানিম্যাল l এবং ধুরন্ধর এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।অ্যানিম্যাল ব্যক্তিগত ক্রোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের গল্প।ধুরন্ধর জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিশোধ, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক শক্তিকে যুক্ত করে।দর্শকের কাছে এই নায়ক কেবল একজন মানুষ নন; তিনি একাই একটি বাহিনী।
কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে অতিরিক্ত হিংসা?
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ শক্তির প্রতীক খোঁজে।চাকরির অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক উদ্বেগ—এসবের মধ্যে অনেক দর্শক এমন চরিত্র দেখতে চান, যিনি দ্বিধাহীনভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং মুহূর্তের মধ্যে সমস্যার সমাধান করেন।বাস্তব জীবনে যেখানে মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করেন, সিনেমার পর্দায় সেই ক্ষমতার কল্পনাই তাঁদের আকর্ষণ করে।এই কারণেই ২০০ কিলো ওজন তোলা, একা শতাধিক শত্রুকে হারানো বা অসম্ভব প্রতিশোধ নেওয়ার দৃশ্য দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হলেও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।এটি বাস্তবতার নয়, ক্ষমতার ফ্যান্টাসি।
মাচো ম্যান সিনড্রোম ‘কী?
সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় একটি ধারণা প্রায়ই উঠে আসে হাইপারম্যাসকূনালিটি বা অতিরঞ্জিত পুরুষত্ব।এর বৈশিষ্ট্য:আবেগ প্রকাশ না করা,শারীরিক শক্তিকে সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে দেখা,আগ্রাসনকে স্বাভাবিক ভাবা,আধিপত্যকে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করা,দর্বলতাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা।অ্যানিম্যাল–এর নায়ক এই বৈশিষ্ট্যগুলির প্রায় সবকটিই বহন করেন।কিন্তু এখানেই বিতর্ক।এই ধরনের চরিত্র কি সমাজের বাস্তব সমস্যাকে প্রতিফলিত করছে, নাকি সমস্যাটিকেই জনপ্রিয় করে তুলছে?নারী দর্শকরাও কেন দেখছেন?মজার বিষয় হলো, এই ধরনের ছবির দর্শক শুধুই পুরুষ নন।অনেক নারী দর্শকও অ্যানিম্যাল বা ধুরন্ধর দেখেছেন।এর কারণ কেবল অ্যাকশন নয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা এবং লক্ষ্যপূরণের ক্ষমতা মানুষের কাছে আকর্ষণীয় বৈশিষ্টি। সমস্যা হয় যখন সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা বা সহিংসতায় পরিণত হয়।অর্থাৎ দর্শক শক্তিকে পছন্দ করেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই একই আচরণ গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পৌরুষের সংকট
আজকের ভারতে পুরুষত্বের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে।একদিকে নারী ক্রমশ বেশি শিক্ষিত, স্বনির্ভর এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।অন্যদিকে অনেক পুরুষ মনে করছেন তাঁদের প্রচলিত সামাজিক ভূমিকা বদলে যাচ্ছে।এই পরিবর্তনের সময়ে শক্তিশালী, নিয়ন্ত্রণকারী, ভয়হীন নায়ক অনেকের কাছে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় হয়ে ওঠেন।তাই অ্যানিম্যাল বা ধুরন্ধর শুধু সিনেমা নয়, তারা এক সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলনও।
সাফল্য কি সবসময় গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ?এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কোনও ছবি হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করলেই কি তার সামাজিক বার্তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়?ইতিহাস বলছে, না।
অনেক সময় বিতর্কই একটি ছবির জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। অ্যানিম্যাল এর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছিল। সমালোচনা এবং প্রশংসা—দুইই ছবিটিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।অর্থাৎ দর্শক ছবির প্রতিটি আচরণকে সমর্থন করছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ভুল।অনেকেই ছবিকে উপভোগ করেন, কিন্তু চরিত্রকে অনুসরণ করেন না।
ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ কোথায়?
আজকের ভারতীয় দর্শক এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছেন।একদিকে টুয়েল্ভথ ফেল, লাপাতা লেডিস , ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা -এর মতো মানবিক গল্প সাফল্য পাচ্ছে।অন্যদিকে অ্যানিম্যাল বা ধুরন্ধর এর মতো হিংসাত্মক মাচো-নায়ককেন্দ্রিক ছবিও বিপুল ব্যবসা করছে।এর অর্থ দর্শক একমুখী নন।তাঁরা একই সঙ্গে সংবেদনশীল গল্পও চান, আবার ক্ষমতার ফ্যান্টাসিও উপভোগ করেন।
শেষ কথা
‘মাচো ম্যান’-এর প্রত্যাবর্তন আসলে কেবল সিনেমার ট্রেন্ড নয়। এটি আধুনিক ভারতের মানসিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।
অ্যানিম্যাল বা ধুরন্ধর আমাদের দেখিয়েছে, শক্তিমান পুরুষ চরিত্রের প্রতি আকর্ষণ এখনও প্রবল। কিন্তু একই সঙ্গে এই ছবিগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছে—আমরা কি নায়ককে উদযাপন করছি, নাকি তাঁর শক্তির কল্পনাকে?
সম্ভবত উত্তরটি মাঝামাঝি কোথাও।কারণ পর্দার মাচো ম্যান যতই শক্তিশালী হোক, বাস্তব সমাজ আজ ক্রমশ এমন এক পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শক্তির চেয়ে সহমর্মিতা, আধিপত্যের চেয়ে সহযোগিতা এবং হিংসার চেয়ে মানবিকতাই বেশি মূল্যবান।
শেয়ার করুন :





