ঠাকুমার হেঁসেল -

ঠাকুমার হেঁসেল

পুরোনো রান্নার ডায়েরি থেকে সেই সাবেকি স্বাদ।

ঠাকুমার হেঁশেল মানেই হারিয়ে যাওয়া সেই সাবেকি স্বাদ আর মশলার এক মায়াবী সুবাস, যার ছোঁয়ায় সাধারণ রান্নাও হয়ে ওঠে এক রাজকীয় ভোজ। আধুনিক ব্যস্ততার ভিড়ে ধুলোবালি জমা পুরোনো রান্নার ডায়েরি থেকে আজ আমরা নিয়ে এসেছি এমন কিছু খাঁটি বাঙালি পদ, যা আপনাকে নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে শৈশবের সেই নস্টালজিক মেজাজে। চলুন, ঠাকুমার হাতের ছোঁয়া আর ঐতিহ্যকে সঙ্গী করে আজ আবার নতুন করে মেতে উঠি বাঙালির সেরা স্বাদের আমেজ নিয়ে !

রাঁধুনি-বাটা কাঁচকলার সঙ্গে কাতলা

সাধারণ মাছের ঝোল নয়, পুরনো বাঙালি  বাড়ির দুপুরের পদ।কাতলা মানেই পাতলা ঝোল কিংবা কালিয়া-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার মতো একটি পুরনো ঘরানার রান্না হল রাঁধুনি-বাটা দিয়ে কাঁচকলা কাতলা। রাঁধুনি, শুকনো লঙ্কা, জিরে আর কাঁচকলার মেলবন্ধন এই পদটিকে একেবারেই অন্য স্বাদ দেয়। পুরনো বাঙালি রান্নায় রাঁধুনির ব্যবহার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এই পদটি তার সুন্দর উদাহরণ। এই ধরনের রেসিপিকে সাম্প্রতিক সময়েও ‘পুরনো বাঙালি’ রান্না হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপকরণ-কাতলা মাছ — ৪-৫ পিস,কাঁচকলা- ২টি, রাঁধুনি  – আধ  চা-চামচ, জিরে – আধ চা-চামচ ,শুকনো লঙ্কা – ২টি , হলুদ- আধ  চা-চামচ, সামান্য লঙ্কাগুঁড়ো,  বড়ি-৫-৬টি, কাঁচালঙ্কা – ২-৩টি, নুন ,সর্ষের তেল।

প্রণালী– কাতলার টুকরোগুলিতে নুন ও হলুদ মাখিয়ে সর্ষের তেলে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন।কাঁচকলার খোসা ছাড়িয়ে লম্বা করে কেটে নিন। অল্প হলুদ মেশানো জলে কিছুক্ষণ রেখে দিলে কালো হবে না। এবার একই তেলে কাঁচকলাগুলি হালকা ভেজে তুলে রাখুন। বড়িগুলিও ভেজে রাখুন।এবার তেলে রাঁধুনি, জিরে ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। গন্ধ বেরোলেই সামান্য হলুদ ও লঙ্কাগুঁড়ো জলে গুলে দিয়ে দিন। মশলা কষে এলে কাঁচকলা ও পরিমাণমতো জল দিয়ে ঢেকে দিন।কাঁচকলা নরম হয়ে এলে ভাজা কাতলা ও বড়ি দিয়ে দিন। খুব বেশি নাড়াচাড়া করবেন না ,তাতে মাছ ভেঙে যাবে। শেষে চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে দু-তিন মিনিট ঢেকে রেখে নামিয়ে নিন।

ঠাকুমার টিপস : এই রান্নায় মশলা বেশি দেওয়া চলবে না। রাঁধুনির গন্ধটাই আসল। গরম ভাতের সঙ্গে পাতলা ঝোল আর নরম কাঁচকলা -এই পদটির সৌন্দর্য সেখানেই।

ভেটকির মৌলি-পাতুরি নয় -চার মশলার পুরনো ভেটকি

উপকরণ-ভেটকি – ৩০০ গ্রাম, পেঁয়াজ বাটা – ১টি মাঝারি পেঁয়াজের, আদা বাটা – ১ চা-চামচ, রসুন  বাটা – ১ চা-চামচ, টম্যাটো বাটা – ১ চা-চামচ, পোস্ত বাটা – ১ চা-চামচ,কাসুন্দি – ১ চা-চামচ, পেঁয়াজ  কুচি — ১টি মাঝারি, গোটা জিরে -আধ  চা-চামচ, শুকনো  লঙ্কা – ২টি , কাঁচালঙ্কা- ৩টি, ধনেপাতা কুচি, নুন ও সামান্য চিনি,সর্ষের তেল।

প্রণালী – ভেটকি টুকরো করে ভালো করে ধুয়ে নিন। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টম্যাটো, পোস্ত ও কাসুন্দি একসঙ্গে মিশিয়ে একটি মশলা তৈরি করুন।এই মশলা মাছের গায়ে ভালো করে মাখিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট রেখে দিন। এই সময়টুকু খুব জরুরি-মশলার স্বাদ মাছের মধ্যে ঢোকে।কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলি সাবধানে ভেজে তুলে রাখুন।এবার সেই তেলেই শুকনো লঙ্কা ও গোটা জিরে ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ধীরে ধীরে সোনালি করে ভাজুন। এবার ভাজা মাছগুলি ফিরিয়ে দিয়ে খুব অল্প আঁচে রান্না করুন।চেরা কাঁচালঙ্কা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে শেষে এক ফোঁটা কাঁচা সর্ষের তেল দিলে গন্ধটি আরও সুন্দর হবে।কেন আলাদা?এখানে সর্ষে প্রধান নায়ক নয়। পোস্ত, কাসুন্দি, টম্যাটো এবং পেঁয়াজ-আদার মিশ্রণে যে ঘন, তীব্র অথচ ঘরোয়া স্বাদ তৈরি হয়, সেটিই মৌলির বৈশিষ্ট্য।

চিংড়ি কোফতা পোলাও

একেবারে অন্যরকম-চিংড়ি দিয়ে কোফতা, তারপর সুগন্ধি গোবিন্দভোগের পোলাও।

উপকরণ-   চিংড়ির কোফতার জন্য-পরিষ্কার করা চিংড়ি – ১ কাপ, বাটা, সেদ্ধ আলু – ২ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো – ১ টেবিল চামচ,আদা-রসুন বাটা – আধ  চা-চামচ,কাঁচা আমের বাটা – আধ  চা-চামচ,গরম মশলা – আধ  চা-চামচ,সামান্য হলুদ, স্বাদমতো নুন ও অল্প চিনি।

পোলাওয়ের জন্য- গোবিন্দভোগ চাল- ৪ কাপ, দই – আধ  কাপ, আদা বাটা – আধ  চা-চামচ , গরম মশলা -আধ  চা-চামচ ,দুধের গুঁড়ো – ১ টেবিল চামচ, কাঁচা আমের বাটা- আধ চা-চামচ,চিনাবাদাম – ১ চা-চামচ, জাফরান – আধ  কাপ দুধে ভেজানো, এলাচ, লবঙ্গ, শুকনো লঙ্কা, ঘি , স্বাদমতো নুন ও চিনি।

প্রণালী -চিংড়ি বাটা, সেদ্ধ আলু, গোলমরিচ, আদা-রসুন, কাঁচা আমের বাটা, গরম মশলা, নুন ও সামান্য চিনি একসঙ্গে মেখে নিন।হাতে অল্প তেল মেখে ছোট ছোট গোল কোফতা তৈরি করুন। তেলে ধীরে ধীরে ভেজে তুলে রাখুন।এবার গোবিন্দভোগ চাল ধুয়ে ২-৩ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ভালো করে জল ঝরিয়ে নিন। চালের সঙ্গে দই, আদা বাটা, গরম মশলা, দুধের গুঁড়ো, কাঁচা আমের বাটা, নুন ও চিনি মিশিয়ে রাখুন। এই অদ্ভুত বলে মনে হওয়া কাঁচা আমের ব্যবহারটাই পদটিকে অন্য মাত্রা দেয়।কড়াইয়ে ঘি দিয়ে তেজপাতা, এলাচ, লবঙ্গ ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। চাল দিয়ে অল্প নেড়ে পরিমাণমতো জল দিন। চাল যখন প্রায় সিদ্ধ, তখন চিংড়ির কোফতাগুলি আলতো করে বসিয়ে দিন।সবশেষে জাফরান-ভেজানো দুধ ও সামান্য ঘি ছড়িয়ে দমে রাখুন।ঢাকনা খোলার সময় যে গন্ধ বেরোবে-চিংড়ি, গোবিন্দভোগ, ঘি, গরম মশলা আর জাফরানের তাতেই জিহ্বায় লালাক্ষরণ ।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *