বিশ্বের ৪টি রুদ্ধশ্বাস রহস্য -

বিশ্বের ৪টি রুদ্ধশ্বাস রহস্য

যা আজও আধুনিক বিজ্ঞান ও মানব মস্তিষ্কের ব্যাখ্যার অতীত…

রহস্যে ঘেরা এই পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেছে, যা আজও আধুনিক বিজ্ঞান ও মানব মস্তিষ্কের ব্যাখ্যার অতীত। অনুসন্ধানী মনকে বাধ্য করে অজানার গভীরে ডুব দিতে। মানব ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ৪টি রুদ্ধশ্বাস রহস্য নিয়ে সাজানো আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

ছবি – লিউক জনসন নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ড -বুট ম্যাগাজিন

. ফ্ল্যানান আইলস –  ৩  লাইট হাউস  রক্ষীর অন্তর্ধান

স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের আটলান্টিকের মধ্যে ছোট্ট ফ্ল্যানান আইলস।

জনমানবহীন, উত্তাল সমুদ্রঘেরা এই দ্বীপপুঞ্জে ১৮৯৯ সালে একটি লাইট হাউস চালু হয়। বাতিঘরের দায়িত্বে থাকতেন তিনজন করে রক্ষী।

১৯০০ সালের ডিসেম্বরের এক সকালে সেখানে গিয়ে যা দেখা গেল, তা আজও অন্যতম বিখ্যাত সামুদ্রিক রহস্য।১৫ ডিসেম্বর রাতে দূর থেকে স্কটিশ নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ড টেন্ডার

 জাহাজ লক্ষ্য করেছিল লাইটহাউসে আলো জ্বলছে না। কিন্তু খবরটি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছতে সময় লাগে। অবশেষে ২৬ ডিসেম্বর লাইটহাউস বোর্ড টেন্ডার শিপ হেস্প্যারাস দ্বীপে পৌঁছয়।কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় বাতিঘরে গিয়ে দেখা গেল—তিনজন রক্ষীই উধাও।

তাঁরা হলেন জেমস ড্যুকেট, থমাস মার্শাল এবং ডোনাল্ড ম্যাকআর্থার।দরজা-জানালা বন্ধ, রান্নাঘর গোছানো, বাতিঘরের লাইটহাউসের কাজকর্মও প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। কিন্তু মানুষ তিনজন কোথায়?

সরকারি তদন্তে আরও অদ্ভুত কিছু তথ্য সামনে আসে। পশ্চিম দিকের ল্যান্ডিং এরিয়াতে

 লোহার রেলিং ভেঙে গিয়েছিল, কিছু দড়ি ও সরঞ্জাম ছিটকে পড়েছিল। দুজনের বাইরে পরার পোশাকও নিখোঁজ ছিল। অর্থাৎ, তাঁরা সম্ভবত বাইরে গিয়েছিলেন।

 নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ডের সরকারি ব্যাখ্যা ছিল—উত্তাল সমুদ্রে কোনও বিশাল ঢেউ তাঁদের সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তিনজন একসঙ্গে কীভাবে এমন বিপদের মধ্যে পড়লেন, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। তাঁদের দেহও উদ্ধার হয়নি।

ওখানকার কিংবদন্তি ও সমুদ্রযাত্রার লোককথায় পরে নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ে- কেউ বলেছে, তাঁরা কোনও অস্বাভাবিক সমুদ্র-ঘটনার শিকার হয়েছিলেন; কেউ বলেছে, তাঁদের মধ্যে কোনও সংঘর্ষ হয়েছিল। আরও অতিরঞ্জিত গল্পে অতিপ্রাকৃত ঘটনার কথাও এসেছে।কিন্তু ইতিহাসের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি অনেক বেশি সরল এবং একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর—তিনজন মানুষ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাতিঘর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন, এবং তাঁদের শেষ মুহূর্তের সত্য আর কখনও জানা গেল না।

আজও নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ডের নিজস্ব নথিতে ঘটনাটি “ মিস্ট্রি ” হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। মনে রাখবেন রহস্যের জায়গা: স্কটল্যান্ড এইলিন মোর ফ্ল্যানন আইল্যান্ড।সময়কাল: ১৯০০ সাল।রহস্য:   ৩ লাইটহাউস রক্ষীর  নিখোঁজ হওয়া যে রহস্যের আজও সমাধান হয়নি।

ছবি- হেডকাউন্টকফি ডট কম 

বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল — পাঁচজন মানুষ কোথায় হারিয়ে গেলেন?

বহুবছর ধরে চলে আসা  সামুদ্রিক রহস্য  বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের নাম প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু আমেরিকার ভারমন্টে  রয়েছে তার ছোট, অনেক কম পরিচিত এক রহস্যময় আত্মীয়- বেনিংটন ট্রায়াঙ্গেল রহস্য।১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে ভারমন্টের গ্লাস্টেনবেরি পাহাড়  ও আশপাশের এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে ৫ জন মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান।

প্রথম ঘটনা ১৯৪৫ সালে। ৭৪ বছরের অভিজ্ঞ প্রকৃতিপ্রেমী অভিযাত্রী মিডি রিভার্স    শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হন। বিশাল সার্চ অপারেশন  চালিয়েও তাঁর কোনও দেহ পাওয়া যায়নি; পরে একটি রুমাল পাওয়া যায়, কিন্তু সেটি তাঁরই ছিল কি না, তা নিশ্চিত হয়নি ।পরের বছর নিখোঁজ হন ১৮ বছরের বেনিংটন কলেজ ছাত্রী  পলা ওয়েলডেন। তিনি হাইকিং করতে  বেরিয়েছিলেন এবং আর ফেরেননি। তাঁর অন্তর্ধান  এতটাই আলোড়ন তৈরি করে যে পরের বছর ভারমন্ট স্টেট পুলিশ  প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এই ঘটনার তদন্তের দুর্বলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে ওঠে।

এরপর আরও তিনজন- জেমস টেডফোর্ড একজন ৬৮ বছরের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিক , ৮ বছরের শিশু পল ‘বাডি ‘ জেপসনএবং ৫৩ বছরের মহিলা   ফ্রেইডা ল্যাঙ্গার  একই  অঞ্চলে নিখোঁজ হন। ল্যাঙ্গারের মৃতদেহ পরের বসন্তে পাওয়া গেলেও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।

এখানেই জন্ম নেয় ‘ ট্রায়াঙ্গেল ’এর গল্প।সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হল ‘বেনিংটন ট্রায়াঙ্গেল’ নামটি তখনকার কোনও সরকারি তদন্তকারী সংস্থা দেয়নি।

১৯৯২ সালে ভারমন্টের এক  লেখক জোসেফ এ সিট্রো  একটি রেডিও কমেন্ট্রিতে  এই নামটি ব্যবহার করেন। তিনি আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখেই নামটি তৈরি করেছিলেন। পরে বই, রেডিও   এবং ইন্টারনেটের  মাধ্যমে গল্পটি আরও বড় হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে জুড়ে যায় এলিয়েন অ্যাবডাকশন স্যাসকোয়াচ উত্তর আমেরিকার কাল্পনিক  বিশাল দৈত্যাকার লোমশ  বা অজানা প্রাণী এবং আরও নানা অতিপ্রাকৃত তত্ব।

কিন্তু বাস্তব ঘটনা এবং পরবর্তী লোককাহিনীকে  আলাদা করলে ছবিটা অন্যরকম। পাঁচজন সত্যিই নিখোঁজ হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের অন্তর্ধানের পিছনে কোনও  অতিপ্রাকৃত  শক্তি কাজ করেছিল, তার কোনও প্রমাণ নেই। ভারমন্ট পাবলিক সংবাদপত্রের  সাম্প্রতিক অনুসন্ধানও দেখিয়েছে, ‘বেনিংটন ট্রায়াঙ্গেল’  আসলে পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া একটি কল্পকাহিনী , যার মধ্যে কয়েকটি পৃথক অন্তৰ্ধানকে  একসঙ্গে দেখা হয়েছে।তবু একটা রহস্য থেকেই  যায়।

ছবি- নর্থউইন্ড পিকচার আর্কাইভস/ অ্যালামি

রোয়ানোক কলোনি – আমেরিকার ‘লস্ট কলোনি ’ রহস্য

উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত অমীমাংসিত রহস্যগুলির একটি লুকিয়ে আছে  রোয়ানোক দ্বীপে । বর্তমান নর্থ ক্যারোলিনার  উপকূলের কাছে এই দ্বীপে ১৫৮৭ সালে ইংরেজ কলোনিস্টদের  একটি দল বসতি স্থাপন করেছিল। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন জন হোয়াইট।

কিন্তু কয়েক বছর পর জন হোয়াইট  যখন ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এলেন, তখন তিনি এমন একটি দৃশ্য দেখলেন, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।

তার ছেড়ে যাওয়া একটা পুরো বসতি উধাও।

শুধু মানুষ নয়, কোনও যুদ্ধের স্পষ্ট চিহ্ন নেই, কোনও গণহত্যার প্রমাণ নেই, এমনকি বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্নও পাওয়া যায়নি।সবচেয়ে রহস্যময় ছিল একটি শব্দ।

একটি গাছের গায়ে খোদাই করা ছিল “CROATOAN”। আর অন্য একটি জায়গায় পাওয়া গিয়েছিল “CRO” অক্ষর।

ক্রোয়াটয়ান  ছিল কাছাকাছি একটি দ্বীপ এবং স্থানীয় আদিবাসী   জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গেও যুক্ত একটি শব্দ। জন হোয়াইট  আগে ওখানকার  অধিবাসী মানুষদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তাঁরা যদি কোনও বিপদের কারণে জায়গা ছাড়তে বাধ্য হন, তাহলে কোথায় গিয়েছেন তার ইঙ্গিত রেখে যেতে।

কিন্তু জন হোয়াইটের  ফিরে আসতে দেরি হয়েছিল। আবহাওয়া ও সমুদ্রযাত্রার সমস্যায় তিনি তৎক্ষণাৎ ক্রোয়াটনে  গিয়ে অনুসন্ধান করতে পারেননি। পরে যখন আবার সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়, তখনও কোনও নিশ্চিত সন্ধান মেলেনি।

তারপর থেকে শুরু হয় শত শত বছরের জল্পনা ।কেউ মনে করেন ঐ অধিবাসীরা  স্থানীয় অন্য আদিবাসী  জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। কেউ মনে করেন তাঁরা অন্যত্র চলে গিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন সংঘর্ষ, দুর্ভিক্ষ বা রোগের কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল।

আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদ  জগতে এসেছে আরও নানা ব্যাখ্যা- স্প্যানিশ আক্রমণ থেকে শুরু করে অতিপ্রাকৃত অন্তর্ধান পর্যন্ত।

কিন্তু ইতিহাস কী বলে?

এখানেই রহস্যটি আরও আকর্ষণীয়। রোয়ানক কলোনির অধিবাসীদের নিশ্চিত পরিণতি এখনও জানা যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অবশ্য সম্ভাব্য অন্যত্র বসতি স্থাপন এবং অন্য আদিবাসী সমাজের সঙ্গে এই অধিবাসীদের দের সংযুক্তকরণের পক্ষে কিছু সূত্র দিয়েছে। কিন্তু  এই মানুষগুলির ঠিক কী হয়েছিল তার নিশ্চিত ও প্রামাণ্য কোনও সমাধান পাওয়া যায়নি ।তাই রোয়ানক রহস্যকে ভূতের গল্প হিসেবে দেখার চেয়ে বরং বলা যায় এটি ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়, যার শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা হারিয়ে গেছে।

মনে রাখবেন রহস্যের জায়গা: রোয়ানক আইল্যান্ড নর্থ ক্যারোলিনা যুক্তরাষ্ট্র ।সময়কাল ১৫৮৭- ১৫৯০।রহস্য: একটি সম্পূর্ণ ইংলিশ কলোনির অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।সবচেয়ে রহস্যময় সূত্র: “CROATOAN”।

ছবি- পিক্সবে -মিস্ট্রিগাইড ডট কো. ইউকে

মেরি সিলেস্ট: যে জাহাজে মানুষ ছিল, কিন্তু মানুষ ছিল না

আটলান্টিকের বুকে ভেসে চলেছিল একটি জাহাজ। খাবার ছিল, পণ্য ছিল, পাল ছিল-শুধু ছিল না একজন মানুষও।

১৮৭২ সালের ডিসেম্বর।আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অ্যাজোয়াস দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দূরে একটি জাহাজকে দেখতে পেল ব্রিটিশ ব্রিগেন্টিন দেল গ্রেসিয়ার নাবিকেরা।দূর থেকে জাহাজটিকে অস্বাভাবিক লাগছিল।সেটি যেন নিজের মতো করে ভেসে চলেছে।কেউ তার হাল ধরছে না।কেউ ডেকে নেই।কেউ সাহায্যের জন্য সংকেতও দিচ্ছে না।ক্যাপ্টেন ডেভিড মোরহাউস  জাহাজটির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।তারপর তাঁর লোকেরা যখন জাহাজটিতে উঠল, তখন সামনে যে দৃশ্যটি এল, সেটিই তৈরি করল সমুদ্রের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর রহস্য।

জাহাজটির নাম মেরি সিলেস্ট।জাহাজটি মোটামুটি সমুদ্রযাত্রার উপযোগী অবস্থাতেই ছিল। তার পণ্য প্রায় অক্ষত। জাহাজে ছিল খাদ্য ও পানীয়ের পর্যাপ্ত মজুত। কিন্তু পুরো জাহাজে  একজন মানুষও নেই।ক্যাপ্টেন নেই।তাঁর স্ত্রী নেই।তাঁদের দু’বছরের শিশুকন্যা নেই।সাতজন নাবিকও নেই।মোট দশজন মানুষ যেন সমুদ্রের বুক থেকে মুছে গিয়েছেন।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার?জাহাজটি ডুবে যায়নি।জাহাজটি পুড়েও যায়নি।

কোনও জলদস্যুর আক্রমণের স্পষ্ট চিহ্নও ছিল না।বরং মেরি সিলেস্ট তখনও ভেসে চলছিল।

শেষ নথি-মেরি সিলেস্ট  নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ১৮৭২ সালের ৭ নভেম্বর। গন্তব্য ছিল ইতালির জেনোয়া।

জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন বেঞ্জামিন স্পুনার ব্রিগস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সারা  এবং তাঁদের দুই বছরের মেয়ে সোফিয়া। বাকি সাতজন ছিলেন নাবিক দল ।

যাত্রার প্রথম কয়েক সপ্তাহ ছিল যথেষ্ট কঠিন। আটলান্টিকে খারাপ আবহাওয়া এবং উত্তাল সমুদ্রের মুখোমুখি হয়েছিল জাহাজটি।২৫ নভেম্বর সকালে জাহাজের লগে  l শেষ এন্ট্রি লেখা হয়।তারপর- নীরবতা।দশ দিন পরে অন্য একটি জাহাজ মেরি সিলেস্টকে  দেখতে পায়।আর তখন তার ভিতরে একজন মানুষও নেই।এই দশ দিনের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল,সেখানেই শুরু রহস্য।যেন সবাই হঠাৎ জাহাজ ছেড়ে  পালিয়ে গেছে। দেল গ্রেসিয়ার  নাবিকেরা জাহাজে উঠে দেখলেন, কিছু জিনিস এলোমেলো। দুটি হ্যাচ খোলা ছিল, ডেকে  কিছু জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিল এবং জাহাজের একটি পাম্প  খুলে রাখা হয়েছিল।কিন্তু কোনও ভয়াবহ সংঘর্ষের দৃশ্য বা চিহ্ন  ছিল না।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেরি সিলেস্টের লাইফবোটটি  ছিল না।

অর্থাৎ, কোনও এক মুহূর্তে জাহাজে থাকা মানুষরা জাহাজটি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।কিন্তু কেন?একটি সম্পূর্ণ  সমুদ্র যাত্রার  উপযোগী  জাহাজ ছেড়ে একজন অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন তাঁর স্ত্রী ও শিশুকে এবং সঙ্গে ৭জন নাবিককে  নিয়ে কোথায় যাবেন? আর যদি তাঁরা যদি জাহাজ ছেড়ে  লাইফবোটে  বেরিয়েই থাকেন, তবে সেই নৌকার কী হল?দশজন মানুষেরও কোনও সন্ধান কেন পাওয়া গেল না?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

জাহাজের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যাত্রী মেরি সিলেস্টের কার্গো ছিল ১,৭০১টি ব্যারেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালকোহল। পরে তদন্তে দেখা যায়, নয়টি ব্যারেল খালি ছিল। এগুলি রেড ওকের  তৈরি ছিল এবং অন্যান্য ব্যারেলের তুলনায় লিক করার সম্ভাবনা বেশি ছিল।  প্রশ্ন উঠেছিল তাহলে কি অ্যালকোহল ভেপার নিয়ে কোনও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? সম্ভবত। কারণ আধুনিক গবেষণার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল জাহাজের পাম্প  ঠিকমতো কাজ না করায় ক্যাপ্টেন হাল -এর ভিতরে কতটা জল ঢুকছে তা বুঝতে পারছিলেন না। আগের ভয়েজের  কয়লার গুঁড়ো এবং পরে হওয়া রিফিটিংয়ের আবর্জনা পাম্পকে  প্রভাবিত করে থাকতে পারে।তার উপর ছিল ভয়ঙ্কর আবহাওয়া।

একটি আধুনিক রিকন্সট্রাকশনে   এমন সম্ভাবনাও দেখা হয়েছে যে ক্যাপ্টেন হয়তো মনে করেছিলেন জাহাজটি ডুবে যেতে পারে এবং কাছাকাছি জমির  আশায় সবাইকে  লাইফবোটে  ওঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু এখানে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি যেমন যদি এই তত্ত্ব সত্যি হয়, তবে সেই  লাইফবোট আর কখনও জাহাজটির কাছে ফিরল না কেন?আর দশজন মানুষের দেহও পাওয়া গেল না কেন?এই জায়গাতেই যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও আবার রহস্যে পরিণত হয়।তারপর শুরু হল ভুতুড়ে গল্প  কারণ বাস্তব ঘটনার চেয়ে মানুষের কল্পনা অনেক দ্রুত দৌড়য়।কেউ বলল জলদস্যু।

কেউ বলল মিউটিনি অর্থাৎ বিদ্রোহ।কেউ বলল অ্যালকোহলের নেশায় নাবিকেরা উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।কেউ আবার বলল সমুদ্রের অজানা কোনও প্রাণী জাহাজের মানুষদের গ্রাস করেছে।আর রহস্যকে আরও জনপ্রিয় করে তুললেন একজন বিখ্যাত লেখক।১৮৮৪  সালে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল মেরি সিলেস্ট  ঘটনাকে ভিত্তি করে লিখলেন তাঁর বিখ্যাত  কল্পকাহিনী জে, হাবাকুক জেপসন’স স্টেটমেন্ট ।

কিন্তু সত্যিই কি কোনও অশুভ শক্তি ছিল?সম্ভবত নয়।

আর এখানেই মেরি সিলেস্টের আশ্চর্য কান্ড হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।কেননা অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা এখানে নিষ্প্রয়োজন।একজন অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন হয়তো ভেবেছিলেন জাহাজটি ডুবে যাচ্ছে।একটি ত্রুটিপূর্ণ পাম্প তাঁকে ভুল ধারণা দিতে পারে।খারাপ আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর করে তুলতে পারে।জাহাজের কাছাকাছি ভূখণ্ড থাকায় তিনি হয়তো মনে করেছিলেন লাইফবোটে  নিরাপদে সরে যাওয়া সম্ভব।কিন্তু সমুদ্রের হিসাব ভুল হলে?একটি দড়ি  ছিঁড়ে গেলে?ঝড় লাইফবোটকে মূল জাহাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিলে?একমাত্র তাহলেই মেরি সিলেস্ট একা ভেসে যেতে পারে ,আর তার যাত্রীরা হারিয়ে যেতে পারেন চিরতরে।আধুনিক গবেষণায় এই বিষয়টিকে  সম্ভাব্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে, কিন্তু কোনওটিকেই চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না।

আর এখানেই রহস্যের শেষ প্রশ্ন।ভেবে  দেখুন ,আপনি সমুদ্রের মধ্যে একটি জাহাজ দেখতে পেলেন।আপনি কাছে গেলেন।জাহাজটি ভাসছে।তার ভিতরে খাবার আছে,পর্যাপ্ত জল  আছে,পণ্য আছে,পাল আছে।ক্যাপ্টেনের জিনিসপত্র আছে।নাবিকদের জিনিসপত্রও আছে।কিন্তু মানুষ নেই।একজনও নেই।কেউ জানে না তাঁরা কখন জাহাজ ছেড়েছিলেন।কেউ জানে না তাঁরা কেন ছেড়েছিলেন।কেউ জানে না লাইফবোটে করে তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন।এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য-যাঁরা শেষবার সেই জাহাজে জীবিত ছিলেন, তাঁদের কেউই আর কখনও ফিরে এসে গল্পটি বলতে পারেননি।১৫০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।

মেরি সিলেস্টের রহস্যের অনেক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এসেছে। কিন্তু নিশ্চিত উত্তর আসেনি।সমুদ্র তার রহস্য নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।

তথ্যসূত্র ও সত্যতা- মেরি সিলেস্টের  ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ। ১৮৭২ সালের ব্রিটিশ এনকোয়ারিতে ঘটনাটি তদন্ত করা হয়েছিল এবং অসাধুতা বা প্রতারণার  নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী গবেষণায় জাহাজের পাম্প , আবহাওয়া, অ্যালকোহল কার্গো, এবং নেভিগেশনের মতো বাস্তব বিষয় থেকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খোঁজা হয়েছে। কিন্তু দশজনের চূড়ান্ত পরিণতি এবং কেন তাঁরা জাহাজ ছেড়েছিলেনতা এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *