দুর্গা পুজোয় ফ্যাশন গাইড -

দুর্গা পুজোয় ফ্যাশন গাইড

অনামিকা খান্না, মনীশ মালহোত্রার টিপস।

ঢাকের কাঠি, শিউলির গন্ধ আর শরতের নীল আকাশ জানান দিচ্ছে পুজো এসে গেছে। বছরের এই ক’টা দিন মানেই বাঙালির কাছে নিখাদ আনন্দ, আর সেই আনন্দের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো সাজগোজ। অষ্টমীর অঞ্জলি থেকে নবমীর আড্ডা—প্রতিটা দিন কীভাবে ফ্যাশনেবল অথচ আরামদায়ক লুকে ফুটিয়ে তুলবেন নিজেকে? এই বিষয়ে আমাদের সঙ্গে এক্সক্লুসিভ মতামত ও পরামর্শ শেয়ার করেছেন ইন্ডাস্ট্রির খ্যাতনামা ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ ও ডিজাইনাররা।

 ঐতিহ্যের নবরূপ: শাড়ি এবং হ্যান্ডলুমের ম্যাজিকপুজো মানেই শাড়ির জয়জয়কার। তবে এবার ট্র্যাডিশনাল লুকের সঙ্গে মডার্ন টাচের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।”পুজোয় শাড়ির বিকল্প কিছু হতে পারে না। তবে এবার ভারী কাজের চেয়ে কটন হ্যান্ডলুম, চান্দেরি, জামদানি এবং সফট অর্গ্যাঞ্জা খুব জনপ্রিয়। সসেপশন বা অষ্টমীর সাজে ক্যাজুয়াল ড্রেপিং না করে একপ্যাঁচ বা ঐতিহ্যবাহী ভাজ ধরে পরুন, আর ব্লাউজে নিয়ে আসুন স্টেটমেন্ট কাট।

ফিউশন ও ওয়েস্টার্ন: ষষ্ঠী ও সপ্তমীর ট্রেন্ডি লুক-ষষ্ঠীর আড্ডা বা সপ্তমীর মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর ফিউশন পোশাক। ক্যাজুয়াল কিন্তু এলিগ্যান্ট লুকের জন্য এখন তরুণীদের প্রধান পছন্দ ফিউশন ওয়্যার।ষষ্ঠী বা সপ্তমীতে দিনের বেলা অতিরিক্ত ভারী পোশাক না পরাই ভালো। ইন্দো-ওয়েস্টার্ন কো-অর্ড সেট, লং কেপ ড্রেস বা আনারকলি কুর্তির সঙ্গে স্ট্রেট প্যান্টস এখন দারুণ ট্রেন্ডিং। পোশাকটি যেন শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে সাহায্য করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।

অষ্টমীর অঞ্জলি: খাঁটি সাদার ওপর লাল পাড় জামদানি বা কাঞ্জিভরম শাড়ি সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল খোঁপা ও আলতা।

নবমী নিশি : ভাইব্র্যান্ট অর্গ্যাঞ্জা বা টিস্যু শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট সিক্যুইন ব্লাউজ।

এভাবেও স্টাইল প্ল্যান করা যায় –

 ষষ্ঠী ও সপ্তমী: হালকা ও আরামদায়ক সাজপোশাক: দিনে ঘোরার জন্য বেছে নিন হালকা প্রিন্টেড সুতির কুর্তি, হ্যান্ডলুম কটন বা লিনেন শাড়ি। পুরুষরা পরতে পারেন হালকা রঙের সুতির পাঞ্জাবি।টিপস: গরম ও ভিড়ের কথা মাথায় রেখে সুতির বা আরামদায়ক কাপড়ের পোশাকই শ্রেয়।

মহাষ্টমী: সাবেকিয়ানার জমকালো রূপপোশাক: অঞ্জলি এবং সন্ধ্যার প্রধান আকর্ষণের জন্য লাল-সাদা তাঁত, গরদ, তুষার বা ট্র্যাডিশনাল সিল্ক শাড়ি। পুরুষদের জন্য মানানসই তসর বা সিল্কের পাঞ্জাবি।টিপস: শাড়ির সঙ্গে ছোট টিপ, খোঁপায় তাজা ফুল এবং মানানসই সনাতনী গয়না পুরো লুকে আভিজাত্য এনে দেবে।মহানবমী ও বিজয়া দশমী: ফিউশন ও বিদায়ী আমেজপোশাক:

নবমীর রাতে শারারা সেট, আনকলি বা জর্জেট-অরগাঞ্জা ফিউশন পোশাক। দশমীর সিঁদুর খেলার দিনে ক্লাসিক লাল-সাদা শাড়ি বা হালকা ব্রোকেড কুর্তি।টিপস: হালকা মেকআপ ও স্টেটমেন্ট ইয়াররিংস বা ঝুমকো দিয়ে রাতের পার্টি লুক কমপ্লিট করুন।

মেকআপ ও স্টাইল টিপস : দিনের বেলায় ন্যুড বা হালকা লিপস্টিক এবং রাতে একটু গাঢ় লাল বা বেরি শেডের লিপস্টিক বেছে নিন।জুতো: প্যান্ডেল হপিংয়ে হাঁটার সুবিধার জন্য হিল বা স্নিকার্সের বদলে এথনিক কোলপুরী বা ফ্ল্যাট জোতি জুতোগুলো বেশি আরামদায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞ টিপস:

অনামিকা খন্না – পুজোর ফ্যাশন নিয়ে  একটি প্রতিবেদনে অনামিকা খন্না বলেছেন :’পশ্চিমবঙ্গে পুজো মূলত একটি ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের জন্য আমি সবসময় ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরার পক্ষেই কথা বলেছি।’

তিনি পোশাকের সঙ্গে অ্যাকসেসরিজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন । তাঁর মতে, সেই মরসুমে কোরাল, কমলা ও ফুশিয়া রং বিশেষ আকর্ষণীয়, আর আইভরি চিরকালীন। রয়্যাল ব্লু-কেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন , ঐতিহ্যবাহী তাঁত বা কাঁথার পোশাকের সঙ্গে বেল্ট ও ট্রাউজার্স মিলিয়ে নেওয়া যায়। আবার ভারতীয় কুর্তার সঙ্গে ওয়েস্টকোটও পরা যেতে পারে।উৎসবের দিনে শাড়িই আমার ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।

শাড়িকে নতুনভাবে পরা, এম্বেলিশমেন্ট  বা অলঙ্করণের মাধ্যমে সাজে নতুনত্ব আনা এবং প্রচলিত ব্লাউজের বদলে অন্য ধরনের ব্লাউজ নিয়ে পরীক্ষা করার পক্ষেও তিনি মত দিয়েছেন । অনামিকা খন্নার পরামর্শের মূল কথা: ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক থাকুক, কিন্তু তার ড্রেপিং অ্যাকসেসরিজ ও স্টাইলিংয়ে  আসুক আধুনিকতা।

মণীশ মালহোত্রার পরামর্শ  ‘সরল, নির্মল ও ঐতিহ্যবাহী’।তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল-“পুজোর সময় ফ্যাশন নিয়ে আপনার পরামর্শ কী?”

মণীশ মালহোত্রার পরামর্শ :’আমার মনে হয় পুজোর সময় সবকিছুই এতটা নির্মল ও ঐতিহ্যবাহী থাকে যে সেটি বদলানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। সাজপোশাককে সহজ, নির্মল ও ঐতিহ্যবাহী রাখাই ভালো। উৎসবের সময় এভাবেই সাজাই সবচেয়ে সুন্দর।’তিনি কলকাতায় দুর্গাপুজোর অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন এবং পুজোর পরিবেশের সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্রতার প্রশংসা করেছেন।

জ্যামিতিক প্রিণ্ট বা ব্লক প্রিন্টের কেপ সেট ব্যবহার করুন।জিন্সের সাথে এথনিক ব্লেজার বা শর্ট কুর্তি পরলে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন টাচ বজায় থাকে।

 অলঙ্কার ও  অ্যাক্সেসরিজ: সঠিক গয়না ছাড়া পুজোর সাজ অসম্পূর্ণ। কিন্তু সব পোশাকে সব গহনা মানায় না।

অল্পতেই মাত করা—এই কনসেপ্টেই এখন ভরসা রাখছেন তরুণ প্রজন্ম। শাড়ির সাথে অক্সিডাইজড সিলভার, টেরা কোটা বা মেটাল গহনা দারুণ মানায়। অন্যদিকে ফিউশন পোশাকের সঙ্গে পরতে পারেন চাঙ্কি স্টেটমেন্ট ইয়াররিংস বা মিনিমালিস্টিক গোল্ডেন চেইন।

জুতো বাছাই: ঠাকুর দেখার জন্য ফ্ল্যাট জুতো, কোলাপুরি বা মোজড়িস সেরা পছন্দ। পেন হিল এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মেকআপ ও হেয়ারস্টাইল: প্রাকৃতিক ও সতেজ শরতের আবহাওয়া আর্দ্র থাকায় মেকআপ দীর্ঘস্থায়ী করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

ন্যাচারাল গ্লো ও নো-মেকআপ লুকই এবার পুজোর মূল আকর্ষণ। ওয়াটারপ্রুফ বেস মেকআপ ব্যবহার করুন। চোখের সাজে আনুন বোল্ড ভাব—উইংড আইলাইনার বা স্মোকি আইজ। ঠোঁটে নিউড বা গাঢ় মেরুন/রেড শেইড পুজো লুকে মাত্রা যোগ করবে।

পুজোর ফ্যাশনে সবচেয়ে বড় কথা হলো আপনার আত্মবিশ্বাস। ট্রেন্ড যাই চলুক না কেন, যে পোশাকে আপনি নিজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন, সেটেই আপনাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখাবে। তাই বিশেষজ্ঞদের এই টিপসগুলি মাথায় রেখে নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তুলুন আপনার পুজোর প্রতিটি দিন!

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *