শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য পাঠ করলে মনে হয়, তিনি মানুষের জীবনের খুব কাছ থেকে কথা বলছেন—এমন এক নৈকট্য, যেখানে চরিত্র আর পাঠকের মধ্যে কল্পনার দূরত্বটুকুও যেন থাকে না। তাঁর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা কোনো অলৌকিক মহিমায় উজ্জ্বল নন; তাঁরা আমাদেরই সমাজের মানুষ, আমাদের ঘরের, আমাদের চারপাশের। তাঁদের প্রেমে যেমন আকুলতা, তেমনই আছে সামাজিক নিষেধের দহন; তাঁদের প্রতিবাদে যেমন সাহস, তেমনই আছে একাকিত্বের অনিবার্য মূল্য। বিশেষত নারীর জীবন, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি আজও আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। তিনি নারীর দুঃখকে কেবল করুণার বিষয় করেননি, তাঁর নীরবতার মধ্যেও শুনেছেন আত্মসম্মানের উচ্চারণ।
সার্ধশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাই তাঁকে স্মরণ করা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এ এক সাহিত্যিকের কাছে ফিরে যাওয়া, যিনি সহজ ভাষায় কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর রচনার জনপ্রিয়তার আড়ালে যে তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টি, মানবিক বোধ এবং যুগের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস লুকিয়ে আছে, এই বিশেষ বর্ষে সেই শরৎচন্দ্রকেই নতুন করে আবিষ্কার করা জরুরি। কারণ সময় বদলালেও মানুষের হৃদয়ের কিছু ক্ষত, কিছু আকাঙ্ক্ষা, কিছু অপমান এবং কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন থেকে যায়—আর সেইখানেই শরৎচন্দ্র আজও আমাদের সমকালীন।
বহু ভারতীয় ভাষায় তার গল্প উপন্যাসের অনুবাদ এই বিপুল জনপ্রয়িতার সাক্ষ্য। কিংবদন্তি গায়িকা শ্রীমতি আশা ভোঁসলে আর এক কিংবদন্তি শ্রী সলিল চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘শরৎবাবু আমাদের বাড়িতে বিশেষত আমার আর দিদির নিয়মিত পাঠ্য।’ সমাজের লাঞ্ছিত ও নিপীড়িতরা বিশেষত মেয়েরা শরৎচন্দ্রের গভীরতম সহানুভূতি পেয়েছেন।বলা যায় সহানুভূতি উদ্রেককারী কিন্তু তৎকালীন সামাজিক বিধিনিষেধ অমান্যকারী নারী ও পুরুষদের চরিত্রচিত্রন এক ভিন্ন স্বকীয়তা দাবি করে ।
বিদগ্ধ সমালোচকদের মতে তাঁর প্রতিভার শ্রেষ্ঠ সময় তাঁর মধ্যবর্তী রচনাগুলিতে।তৎকালীন সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে বিশেষত নারীদের ওপর অন্যায় তাঁকে বিচলিত করেছিল।যেমন চরিত্রহীন (১৯১৭) শ্রীকান্ত (১ম, ২য় ৩য় খন্ড) দেনাপাওনা ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন লেখক খুব বেশি নেই, যাঁর কলমে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া মানুষ এত গভীর মমতা এবং এত তীক্ষ্ণ সামাজিক বোধ নিয়ে উঠে এসেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। অথচ আজ, তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দিন বা কোনও জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের পুনঃপ্রদর্শন ছাড়া, আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক আলোচনায় শরৎচন্দ্র ক্রমশ যেন দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে তাঁর নাম পরিচিত, তাঁর কয়েকটি উপন্যাসের নামও পরিচিত—কিন্তু তাঁর লেখার সামাজিক অভিঘাতটি কি সত্যিই আমরা আর অনুভব করি? তিনি ছিলেন এমন এক কথাসাহিত্যিক, যিনি উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলার নারীর সামাজিক বন্দিদশাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
‘বাংলা সাহিত্যের সময় ইতিহাস লেখক ‘ বইতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ -১৯৩৮ )কে বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঐ বইটি থেকে কিছু অংশ – পূর্ববর্তী শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের দ্বারা তিনি যেমন প্রভাবিত হয়েছিলেন তেমনি নিজের মানসপ্রবণতা অনুযায়ী স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টিও করেছিলেন। জীবনের নৈমিত্তিক ঘটনার স্বল্পচ্ছ্বাসিত তরঙ্গগুলির সঙ্গে জড়িয়ে মানব -চরিত্রাঙ্কন। তিনি নীতিবোধের দিক থেকে সামাজিক রক্ষনশীলতাকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন।এ আঘাত কোথাও -ই বিদ্রোহের রূপ নেয়নি, কিন্তু সংস্কারাচ্ছন্নতা এবং রক্ষণশীলতার দ্বারা নিষ্পিষ্ট মানুষের প্রতি লেখকের সহানুভূতি শতধারায় উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে।
শরৎচন্দ্রের ঔপন্যাসিক প্রবণতা –
১ ) শরৎচন্দ্র অত্যন্ত আবেগপ্রবণ শিল্পী। আবেগকে সংহত ও সংযত করলে তা শিল্পকর্ম হয়ে দাঁড়ায়। সর্বদা তিনি সে- সিদ্ধিতে পৌঁছতে চাননি।তিনি জীবনকে ভাবাবেগের আতিশয্যের মধ্য দিয়ে দেখেছেন।তাঁর ভাষারীতি এবং বাচনভঙ্গিতেও উচ্ছাসের প্রবণতা লক্ষণীয়।
২)তিনি আসলে পারিবারিক জীবনের রূপকার। তাঁর বড়গল্পগুলিতে (‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’,’নিষ্কৃতি ‘, ‘মেজদিদি ‘ ) পরিবার জীবনের কাহিনী ও সমস্যা প্রাধান্য পাওয়ায় এখানে এক অভিনব পরিবার -রসের আবেদন সৃষ্টিতে তিনি সমর্থ হয়েছেন।সমকালের সংসারী বাঙালি নর-নারী শিশু-কিশোরের জীবন ও বাংলার পল্লীসমাজ এই গল্পগুলির মধ্যে সার্থকভাবে ধরা পড়েছে।
৩) সামাজিক সংস্কার ও নীতিবোধ – এই বিশিষ্ট প্রশ্ন শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সমস্যা। সেই সময়ের বাংলাদেশের গ্রাম-সমাজের নানা কদাচার সমাজ প্রধানদের অন্যায় স্বার্থপরতা জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণ এবং মানুষের হীনমন্যতাকে শরৎচন্দ্র দ্বিধাহীন চিত্তে ধিক্কার দিয়েছেন। বিবাহে যদি ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার চরিতার্থতা নাও মেলে তবুও মনের মধ্যে তাকে গুরুতর মূল্য দিতে তিনি সংকুচিত হন নি। রাজলক্ষীর মতো নারীর জীবনে বাইজিবৃত্তির মধ্যে বঙ্কুর মাতৃত্বের সংস্কার কাজ করেছে। মৃণালের বিবাহে তার বাসনা-কামনার সম্পত্তি ঘটেছে ; অথচ এই অসম মিলনকেও শরৎচন্দ্র এতবড়ো সত্যরূপে গ্রহণ করেছেন যাতে জীবনসংগ্রামে ভগ্নতরী যাত্রীরা ঐ পোতেই আশ্রয় খুঁজেছে। অন্নদাদিদি যে দুঃখের ও লাঞ্ছনার মধ্যেও আগুনের শিক্ষার মতো জ্বলেছে তার কারণ ঐ ছন্নছাড়া সাপুড়ের সঙ্গে তার প্রকৃত সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর। বৈধ্যবের সংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি রমা কিংবা সাবিত্রী মুক্তির কথা ভাবতে পারেনি বড়দিদি।
৪) শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র দেশে তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। নারীচরিত্র সৃষ্টিতে তিনি একটি বিশেষ প্যাটার্নের অনুসরণ করেছেন। তাঁর নারীচরিত্রগুলির মধ্যে যেসব পার্থক্য দেখা যায় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্বের ভিত্তি পর্যন্ত প্রসারিত নয়। সে পার্থক্য প্রায়ই ঘটনা ও পরিবেশগত। বাঙালি নারীর যে মূর্তি পরিবার জীবনের কেন্দ্রে অবস্থিত সেই রাজেন্দ্রাণী রূপেরই পূজা করেছেন শরৎচন্দ্র।নারী এ-সমাজে অবহেলিতা, লাঞ্ছিতা নিস্করুণ আচারে শুষ্কপ্রাণ -এইসব সমালোচনা তাঁর উপন্যাসে তীব্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলেও বাঙালি সংসারের নিয়ন্ত্রণী শক্তি নারীকে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়েছেন। শরৎচন্দ্রে নারীর যে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ দেখি তার সূত্রও এই জীবনকেন্দ্র থেকেই সঙ্কলিত। সুতীব্র অভিমান ও সর্বব্যাপী কতৃত্বের মধ্যে এই নারী আপন ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছে। এর জন্য তার কোনো বাইরের শিক্ষার প্রয়োজন হয়নি।এ শিক্ষা যেন যুগ যুগ ধরে বাঙালি পরিবার -জীবনের মর্মস্থলে অঙ্কিত হয়ে আছে।
৫)বাংলার পল্লীগ্রামের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ট পরিচয় ছিল ।পল্লীগ্রামের পটভূমিকা তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাসেই ব্যাপ্ত । পল্লীর মানুষ তাঁর উপন্যাসে প্রধানত দুটি স্বতন্ত্র টাইপ রূপে দেখা দিয়েছে । তাদের একদল পরশ্রীকাতর কূটবুদ্ধি, সংকীর্ণমনা এবং স্বার্থসর্বস্ব । অপর দল সরলহৃদয় উদারচরিত্র সুক্ষ নাগরবৈদগ্ধ -বর্জিত প্রসন্ন হাস্যে উজ্জ্বল ।
‘চরিত্রহীন নারীর চরিত্র কে ঠিক করবে?-‘চরিত্রহীন-এর কিরণময়ীকে আজকের চোখে পড়লে বিস্মিত হতে হয়। সমাজ যে নারীকে ‘চরিত্রহীন’বলে দাগিয়ে দেয়, শরৎচন্দ্র তাঁর ভিতরের আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধি, ক্ষত, অসন্তোষ এবং অস্তিত্বের সংকটকে দেখার চেষ্টা করেছেন।সমাজের বিচারে নারীর যৌনতা ছিল অপরাধ; পুরুষের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল ক্ষমতার প্রকাশ। এই দ্বিচারিতাকে শরৎচন্দ্র সরাসরি সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় ব্যাখ্যা করেননি। তিনি তার চেয়েও শক্তিশালী কাজটি করেছেন—একজন ‘অগ্রহণযোগ্য’ নারীর ভিতরে মানুষটিকে দেখিয়েছেন।আজকের ভাষায় আমরা যে প্রশ্নগুলি করি—একজন নারীর নিজের জীবনের উপর অধিকার কতটা? সমাজের তৈরি ‘চরিত্র’-এর সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? নারী কি নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে পারে?—এই প্রশ্নগুলির বীজ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বহু আগেই উপস্থিত।
‘শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মী ও অভয়া’-শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মীকে শুধু শ্রীকান্তের প্রেমিকা হিসেবে পড়া তাঁর প্রতি অবিচার। রাজলক্ষ্মী এমন এক নারী, যিনি সমাজের নির্ধারিত পথ থেকে বহু দূরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব তৈরি করেন। তাঁর জীবনে প্রেম আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, আত্মসম্মান আছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আছে—এবং আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে অবিরাম সংঘাত।আর অভয়া?
স্বামীর অত্যাচার, সামাজিক বিধি এবং তথাকথিত ‘স্ত্রীধর্ম’-এর সামনে অভয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভয়াবহ সাহসী। সে প্রশ্ন তোলে—শুধু বিবাহিত বলেই কি একজন নারীকে অত্যাচার সহ্য করে যেতে হবে?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অভয়ার সেই প্রশ্নকে আমাদের খুব আধুনিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শরৎচন্দ্র যখন লিখছেন, তখন এই প্রশ্ন ছিল সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রায় বিস্ফোরণ।
গৃহদাহ’র অচলা -অচলাকে বোঝার জন্য শুধু ত্রিভুজ প্রেমের গল্প হিসেবে ‘গৃহদাহ’ পড়লে চলবে না। অচলা এমন এক সমাজের প্রতিনিধি, যেখানে নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে সংঘাত প্রায় অনিবার্য।শরৎচন্দ্র নারীর সিদ্ধান্তকে সবসময় মহিমান্বিত করেননি। তিনি তাঁদের দুর্বলতাও দেখিয়েছেন, দ্বিধাও দেখিয়েছেন, ভুলও দেখিয়েছেন। এখানেই তাঁর নারীচরিত্রগুলি রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠে।
দেনাপাওনা’র নিরুপমা: পণ শুধু টাকা নয়।দেনাপাওনা’-র নিরুপমার ট্র্যাজেডি কোনও এক পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়। এর ভিতরে আছে পণপ্রথা, বিবাহের বাজার, নারীর উপর পারিবারিক মালিকানা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার নির্মম বাস্তবতা।বিয়ের সময় মেয়ের পরিবারকে যে অর্থনৈতিক বোঝা বইতে হয়, তার সঙ্গে মেয়েটির নিজের ইচ্ছার সম্পর্ক প্রায় নেই। মেয়ের জীবন যেন একটি সামাজিক চুক্তির অংশ।শরৎচন্দ্র এই নিষ্ঠুরতাকে বক্তৃতা দিয়ে বোঝাননি। তিনি পাঠককে নিরুপমার যন্ত্রণার মধ্যে দাঁড় করিয়েছেন।আজও যখন পণ, গার্হস্থ্য হিংসা, বৈবাহিক নির্যাতন কিংবা মেয়ের বিয়েকে পরিবারের আর্থিক দায় হিসেবে দেখার প্রবণতা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়নি, তখন ‘দেনাপাওনা’ পুরনো বই বলে মনে হয় না।
‘দেবদাস’-এর পার্বতীকে আমরা কীভাবে পড়ি?’দেবদাস’কে আমরা সাধারণত এক ব্যর্থ প্রেমিকের ট্র্যাজেডি হিসেবে মনে রাখি। কিন্তু পার্বতীর দিকে তাকালে গল্পটির আর একটি মুখ দেখা যায়।পার্বতী অপেক্ষা করে, কিন্তু চিরকাল অপেক্ষা করে না। দেবদাসের দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সামাজিক সংকোচ যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করে, পার্বতী নিজের জীবনের বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায়।আর চন্দ্রমুখী?সমাজ যাকে ‘পতিতা’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, শরৎচন্দ্র তাঁর মধ্যেও ভালোবাসার ক্ষমতা, আত্মত্যাগ এবং মানবিক মর্যাদা খুঁজে পান।
অর্থাৎ একই উপন্যাসে তিনি একদিকে উচ্চবর্ণের ঘরের মেয়েকে, অন্যদিকে সমাজের তথাকথিত ‘পতিতা’ নারীকে পাশাপাশি দাঁড় করান। দুজনের সামাজিক অবস্থান আলাদা, কিন্তু দুজনেরই অনুভূতি, ভালোবাসা এবং যন্ত্রণা সত্য।এখানেই শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রোম্যান্টিক গল্পের ভিতর থেকেও বেরিয়ে আসে।
অনিলা দেবী ছদ্মনামে ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে তাঁর কথায়- ‘ নারীত্বের মূল্য কি? অর্থাৎ, কি পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণা, স্নেহশীলা, সতী এবং দুঃখে কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ, তাঁহাকে লইয়া কি পরিমাণে মানুষের সুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং কি পরিমাণে তিনি রূপসী! অর্থাৎ পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে কতটা পরিমাণে তিনি নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পারিবেন।… প্রায় কোন দেশেই পুরুষ নারীর যথার্থ মূল্য দেয় নাই; এবং তাহাকে নির্যাতন করিয়াই আসিতেছে।’..আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের কষ্টকে তিনি ‘মেয়েদের ব্যাপার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাননি।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
কুন্তলীন পুরস্কার (১৯০৪): ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘মন্দির’ ছোটগল্পের জন্য তিনি কুন্তলীন পুরস্কার লাভ করেন। এটিই তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম প্রাপ্ত কোনো স্বীকৃতি বা পুরস্কার। জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯২৩): বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রদান করে। ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৩৬): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করে সম্মানিত করে।
বি.এ. পরীক্ষার পেপারসেটার: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বি.এ. পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের প্রশ্নকর্তা বা পেপারসেটার হিসেবে নিয়োগ করেছিল।
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (১৯৭৮, মরণোত্তর): তাঁর ‘স্বামী’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৭ সালের সেরা কাহিনীর পুরস্কার হিসেবে তিনি ১৯৭৮ সালে মরণোত্তর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ ডাকটিকিট প্রকাশ (১৯৭৯): ভারত সরকার শরৎচন্দ্রের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭৯ সালে একটি ২৫ পয়সার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

শরৎ সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ
তার সাহিত্য-কর্মকে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়েছে।[তার মধ্যে ‘দেবদাস’ উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলুগু ভাষায় আটবার তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে ‘দেবদাস’ বাংলা ও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সুমিত্রা মুখার্জি, শাহরুখ খান, ঐশ্বর্য রাই বচ্চন, মাধুরী দীক্ষিত প্রমুখ। এছাড়া সন্ধ্যারানি ও উত্তমকুমার অভিনীত বিখ্যাত বাংলা ছবি ‘বড়দিদি’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘পরিণীতা’ ছবি নির্মিত হয়। ‘পরিণীতা’ উপন্যাস দু-বার চলচ্চিত্রায়িত হয়, বাংলা ছবির মধ্যে ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘বালক শরৎচন্দ্র’, উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘চন্দ্রনাথ’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘কমললতা’, বসন্ত চৌধুরী ও মালা সিনহা অভিনীত ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’ ; ‘বালক শরৎচন্দ্র’, ‘ইতি শ্রীকান্ত’, ‘রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত’, উত্তম কুমার মাধবী মুখার্জি অভিনীত ‘বিরাজ বউ’ অন্যতম । হিন্দী ছবির মধ্যে ঋষিকেশ মুখার্জির হিন্দি ছবি ‘মাঝলি দিদি’ অন্যতম। হিন্দী ‘স্বামী’ (১৯৭৭) চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা লেখকের পুরস্কার পান । ‘বিন্দুর ছেলে’ অবলম্বনে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ‘ছোটি বহু’ (১৯৭১) নামে বিখ্যাত হিন্দী চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘দত্তা’ চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেন এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন । ১৯৭৭ সালে ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে উত্তমকুমার অভিনীত ‘সব্যসাচী’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় । তাঁর ‘দর্পচূর্ণ’ গল্প অবলম্বনে ১৯৮০ সালে দর্পচূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় । এছাড়া ‘নববিধান’ উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘তুমহারি পাখি’ নামে একটি ভারতীয় টিভি ধারাবাহিক নির্মিত হয়|
কেন আজকের দিনে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ শরৎচন্দ্রের মতো এক মহীরুহ বিস্মৃতির আড়ালে ?
আজকের দ্রুতগামী এবং ডিজিটাল-নির্ভর বিশ্বে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো বর্তমান প্রজন্মের পড়ার অভ্যাসের এক বিশাল পরিবর্তন; আজকের পাঠকেরা শরৎচন্দ্রের গভীর, আবেগঘন এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের সংক্ষিপ্ত ও তাৎক্ষণিক কনটেন্ট বেশি পছন্দ করেন। তদুপরি, তাঁর উপন্যাসে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের যে গ্রামীণ ও নগর জীবনের প্রেক্ষাপট ছিল—যা কঠোর জাতিভেদ প্রথা, যৌথ পরিবারের রাজনীতি এবং ঔপনিবেশিক সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ—তা আজকের বিশ্বায়নের যুগে বেড়ে ওঠা পাঠকদের কাছে বেশ দূরের এবং অচেনা মনে হয় কারণ সেই সামাজিক প্রেক্ষাপট আজকের বাঙালি জীবনে সম্পূর্ণ বদলে গেছে ।একান্নবর্তী পরিবারের দ্বন্দ্ব রাজনীতি পল্লী সমাজের বিধিনিষেধের এবং বিশেষত সমাজে নারীর অবস্থানের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি।
তাঁর গল্পে যে তীব্র মানবিক অনুভূতি, সমাজ সংস্কারের ডাক এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের কথা ছিল, তা আজ আধুনিক বিনোদন ও কৃত্রিম চাকচিক্যের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। শরৎচন্দ্রের দেখানো গভীর সামাজিক সহানুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধকে অবহেলা করে আজ আমরা কেবল এক যান্ত্রিক সমাজ তৈরি করছি, যা আমাদের এই মহান সাহিত্যিক থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু এ স্বত্তেও যুগ বদলালেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। সমাজ ও মানুষের মনের গহীনের যে রূপ তিনি তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও অনন্য। আজ তাঁর সার্ধশতবর্ষের পুণ্য লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা অনুভব করি যে, আধুনিকতার চাকচিক্য সাময়িকভাবে আমাদের তাঁর থেকে দূরে সরালেও, আমাদের আবেগ, ভালোবাসা এবং মানবিক অনুভূতির প্রতিটি পরতে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত অগ্রদূত হিসেবে তাঁর স্থান আজও অপরাজিত। যান্ত্রিক এই সমাজে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা একাকীত্বের গভীরে আলো ফেলতে আজও আমাদের শরৎচন্দ্রের কাছেই ফিরে যেতে হয়। তিনি কেবল অতীতের কোনো চরিত্র নন; বরং বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির এক চিরন্তন আশ্রয়, যিনি আজও আমাদের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অত্যন্ত ভালোবাসার সাথে সগৌরবে বিরাজ করছেন।
তথ্য ঋণ – হর্ষ দত্ত
শেয়ার করুন :





