শাকের শক্তি -

শাকের শক্তি

আপনাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিই দেবে না, বিভিন্ন রোগ থেকে দূরে রাখবে।

সারাবছর খেতে পারবেন এমন কিছু শাক যেগুলো আপনাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিই দেবে না, বিভিন্ন রোগ থেকে দূরে রাখবে।আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অন্যতম পরিচিত ও জনপ্রিয় কয়েকটি শাক এবং সেগুলির পুষ্টিগুণ নিচে আলোচনা করা হলো :

১. কলমি শাক : জলাশয়, খাল-বিল বা আর্দ্র জমিতে অনায়াসে বেড়ে ওঠা কলমি শাক পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই শাকে রয়েছে ক্যালসিয়াম খনিজ লোহা, ম্যাগনেশিয়াম পটাশিয়াম ভিটামিন-এ, ভিটামিন বি-৬ ভিটামিন সি ,ভরপুর জিঙ্ক। কলমি শাক শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে, যা রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। এতে থাকা প্রচুর আঁশ বা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজমশক্তি বাড়ায়। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য কলমি শাক অত্যন্ত উপকারী। এ ছাড়া এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

২. পুঁই শাক : ‘শাকের রাজা’ হিসেবে পরিচিত পুঁই শাক তার সুস্বাদু স্বাদ ও ঘন পাতার জন্য জনপ্রিয়। পুঁই শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ, ‘সি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন এবং ফোলেট। ভিটামিন ‘এ-র প্রাচুর্যের কারণে পুঁই শাক চোখের জ্যোতি বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক। এতে বিদ্যমান উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড় ও দাঁত শক্ত করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট পথ্য, কারণ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পুঁই শাকের থকথকে পিচ্ছিল আঁশ পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।

৩. লাল শাক:লাল শাক তার আকর্ষণীয় রঙের মতোই পুষ্টির দিক থেকেও অত্যন্ত চমৎকার। লাল শাকে রয়েছে প্রভূত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ এবং ফলিক অ্যাসিড। রক্তস্বল্পতা সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য লাল শাক ওষুধের মতো কাজ করে। এটি শরীরে লোহিত রক্তকণিকা গঠনে বিশেষ ভূমিকা নেয়। নিয়মিত লাল শাক খেলে রক্ত পরিষ্কার থাকে এবং হৃদযন্ত্র ভালো থাকে। এতে থাকা আঁশ পরিপাক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।

৪. সজনে শাক:বর্তমান বিশ্বে সজনে পাতা বা সজনে শাককে একটি ‘সুপারফুড’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সজনে শাকে দুধের চেয়েও বেশি ক্যালসিয়াম, কলার চেয়ে বেশি পটাশিয়াম এবং কমলার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ থাকে। এতে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি-কমপ্লেক্স’, ‘ই’, প্রোটিন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড। সজনে শাক উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে চমৎকার কাজ করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং বার্ধক্যের ছাপ প্রতিরোধ করে।

৫. ডাঁটা শাক:সবজি ও শাক—উভয় হিসেবেই ডাঁটা শাক বাঙালির অত্যন্ত প্রিয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ, ‘সি, ‘কে, ক্যালসিয়াম, কপার এবং পটাশিয়াম পাওয়া যায়। ডাঁটা শাক শরীরের হাড় মজবুত করতে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং পেটের নানাবিধ সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।

ভিটামিন মিনারেলের প্রাকৃতিক শক্তির উৎস:

শাকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি অতি অল্প খরচে প্রচুর পরিমাণে অণু-পুষ্টি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস   সরবরাহ করে। আমাদের দেহের স্নায়ুতন্ত্র, পেশী, হাড় ও রক্তের সুস্থতার জন্য যে সমস্ত ভিটামিন (যেমন এ,সি,কে,বি-কমপ্লেক্স এবং মিনারেল বা খনিজ (যেমন আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক) প্রয়োজন, তার বড় একটি অংশ আমরা শাক থেকেই পেতে পারি। কৃত্রিম ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ও নানা রঙের শাক খাওয়া অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ।

পরিশেষে:

বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে আমরা প্রায়শই প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। প্রকৃতির এই অমূল্য উপহার অর্থাৎ সবুজ শাকসবজি আমাদের নিরোগ ও দীর্ঘায়ু রাখতে প্রধান সহায় হতে পারে। কলমি, পুঁই, লাল, সজনে ও ডাঁটা শাকের মতো সহজলভ্য শাকগুলি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে তা আমাদের শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখবে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে আমাদের স্বীকার করতেই হবে—প্রকৃত অর্থেই ‘শাকেই শক্তি।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *