স্মৃতিকুমার -

ছবি- নির্মলেন্দু মন্ডল

স্মৃতিকুমার

আমি পুত্র স্মৃতিকুমারকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। প্রহরীগণ, যাও, ইহাকে এখনই বধ্যভূমিতে লইয়া যাও!’ 

সন্মাত্রানন্দ

ধুলার পথ, মাটির ঘর-পাতায় ছাওয়া। পথের দু-পাশে মানুষের বসতি; নাম-না-জানা ছোটো একটি গ্রাম। এ অঞ্চলে সম্পন্ন বনবীথি কোথাও নেই, ইতস্তত কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে মধ্যে মধ্যে মূক সাক্ষীর মতন। এখন চৈত্রান্ত; তাই সেসব গাছে পুরোনো পাতা ঝরে যাচ্ছে, নতুন কিশলয়ের আবির্ভাব ঘটছে।          

ভিক্ষাটনাদি সেরে গ্রামের বাইরে একটা ছায়াঘন নিমগাছের তলে তথাগত এসে বসেছেন। এর পরেই দিকহারানো বিস্তীর্ণ চাষের খেত। যদিও কৃষিবহুল নয় এতদঞ্চল, তবু কিছু গ্রামীণ মানুষ দ্বিপ্রহরবেলায় কৃষিক্ষেত্রে কর্মনিরত। কোথাও কোথাও শস্যপুঞ্জের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ে মাটির রঙ ঈষৎ কালচে বা পিঙ্গল। সে-মাটি অবশ্য এখনকার নয়। আড়াই হাজার বছর আগেকার সেই মৃত্তিকা।         

কিছুক্ষণ পরে তীব্র দাবদাহের কারণে কৃষকদের পক্ষেও মাঠে কাজ করা সম্ভব হল না আর। মাঠ থেকে উঠে এসে তারা ওই নিমগাছের নীচে জড়ো হল। কাপড়ের গ্রন্থি খুলে তারা বের করল আহার্য। মনে হল, এরা তথাগতর পরিচিত। তথাগত এই কৃষকদের সঙ্গে আহার্য বিনিময় করে খেতে লাগলেন। খেতে খেতে কথাবার্তাও কিছু কিছু হচ্ছে; কিন্তু কী সেই কথা, এত দূর থেকে, এত যুগের দূরত্ব থেকে তা আর স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না।           

এখন এমনই ধারা। অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে। উরুবেলায় তপস্যাকালে তপস্বী সিদ্ধার্থ যেমন জনসঙ্গ বর্জন করে চলতেন, অধিকাংশ সময় অন্তর্মুখ থাকতেন, বোধিলাভের পরে সেই দশা আর নেই। কী তিনি লাভ করেছেন, সে-কথা কেই বা বোঝে, কেই বা জানে, আর কেই-বা জানতে চায়? কিন্তু বাইরে থেকে তাঁকে সদাই প্রফুল্ল দেখায়, যেন ভেতরে ভেতরে কোনও গভীর আনন্দে নিমগ্ন হয়ে আছেন। তাঁর মুখে চোখে অণুমাত্র উদ্বেগের চিহ্নও আর নেই। এখন তিনি সকলের সঙ্গে সহজেই মিশে যান। তাদেরই ভাষায় কথা বলেন। যা তারা ভিক্ষা দেয়, তা-ই সানন্দ চিত্তে আহার করেন। এমনকি বস্ত্রও সর্বদা গৈরিক কাষায় নয়, কখনও শ্বেত, কখনও লোহিত, যখন যেমন যা পাওয়া যায়, তখন তেমনই।       

এই গ্রাম জেতবন থেকে মাত্র ক্রোশখানেক দূরত্বে অবস্থিত। কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তী, সেই শ্রাবস্তী নগরীর বহির্বর্তী জেতবন উদ্যান তথাগতর উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক। তাঁর ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছেন মূলগন্ধকুটি। চন্দনকাঠের তৈরি সেই কুটিরে তথাগত কিন্তু অল্প সময়ই অবস্থান করেন। জেতবনের মধ্যে উন্নতশীর্ষ ছায়ানিবিড় অনেকগুলি গাছ আছে। তথাগত দিনমানে এসব গাছেদের ছায়ায় থাকেন। কখনও কখনও ভিক্ষার্থে নিকটবর্তী গ্রামগুলিতে যান।

জীবনজিজ্ঞাসায় অস্থির হয়ে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গৃহপরিত্যাগী তপস্বী। প্রশ্ন করলেই যে তথাগত উত্তর দেন, কিংবা খুব দীর্ঘ কিছু উপদেশ দেন, তা নয়। তিনি আগন্তুকদের বলেন জেতবনে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে। নীরবতা ও সংযম পালন করতে। নিজে নিজে জীবনপ্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। আর কিছুই না।       

তাঁর কাছে সকলেরই অবারিত দ্বার। তিনি কাউকে জাতিপরিচয়, কুলপরিচয় জিজ্ঞাসা করেন না। যে কেউ আসুক, সে সন্ন্যাসীই হোক আর গৃহস্থই হোক, আগত ব্যক্তির জীবনসমস্যার কথা তথাগত সমনস্ক চিত্তে শ্রবণ করেন। সম্ভব হলে, সমাধান বলেন।

তবু ব্যতিক্রম আছে এক ক্ষেত্রে। সকলের জন্য অবারিত দ্বার হলেও সদ্য-আগত শাক্যপুত্রীয়দের জন্য নয়। বড়ই বিচিত্র অবস্থা!   

অনুরুদ্ধ, ভদ্দিক, ভৃগু, কিম্বিল, দেবদত্ত আর আনন্দ। রাজগেহ যাওয়ার পথের পাশে অনুপিয় আম্রকাননে যখন তথাগত ছিলেন, তখনই এই শাক্যপুত্রীয়রা কপিলাবস্তু ছেড়ে এসে তথাগত-র আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের সঙ্গে এসেছিলেন ক্ষৌরকার উপালিও। পরে সেই একই প্রব্রজ্যার আদর্শে প্রাণিত হয়ে শাক্যবংশীয় অপরাপর রাজপুত্ররাও এসেছেন। আপাতত তাঁরা জেতবনেও উপস্থিত হয়েছেন। তথাগত তাঁদের এখানে থাকতে নিষেধ করেননি। কিন্তু একমাত্র উপালি ছাড়া আর কাউকেই তিনি এখনও পর্যন্ত কাছে ঘেঁষতে দেননি। বলে দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে বহু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

শাক্যপুত্রীয়দের জন্যে এমন কঠোর ব্যতিক্রম কম উষ্মার জন্ম দেয়নি। সত্যিই তো! তাঁরা হলেন তথাগত-র পূর্বাশ্রমীয় আত্মীয়। যে-শাক্যবংশে কুমার সিদ্ধার্থ জন্মেছিলেন, সেই বংশেই তাঁদেরও জন্ম। অথচ তাঁদের জন্যেই এ কীপ্রকার বে-নিয়ম?    

একদিন মধ্যাহ্নভোজনের পরে এ নিয়ে শাক্যপুত্রীয়দের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বর্তুলাকার চোখ দুটি আরও বিস্ফারিত করে দু-পাশে ঘাড় দুলিয়ে কিম্বিল বলে উঠলেন, ‘অব্‌ভুতম্‌ বাতা ভো! আচ্চরিয়ম্‌ বাতা ভো! আমরা হইলাম তাঁহার সমবংশজ। অথচ আমাদিগের নিমিত্তই এই উদ্ভট নিয়ম। অন্য যে কেহ আসিতেছে, তথাগত-র দর্শন পাইতেছে, কথা কহিবার সুযোগ পাইতেছে। আর আমরা তাঁহার সহিত কথা কহিব কি? বসিয়াই আছি মাসের পর মাস কাকবৎ প্রতীক্ষায়!’    

ভৃগু বললেন, ‘শুনিয়াছিলাম নাকি বুদ্ধত্ব সাম্যাবস্থা! এক্ষণে ইহা কীদৃশ সাম্য হইল?’

দেবদত্ত ফুট কাটলেন, ‘দ্যাখো বন্ধু, প্রবাদ আছে, আকরে টানে। পূর্বজীবনে ছিলেন রাজা। রাজদর্শনে উপস্থিত হইলে দর্শনার্থীকে অপেক্ষা করিতে হয়। সেই অভ্যাস কি সিদ্ধার্থের একেবারে গিয়াছে বলিয়া মনে করো? বুদ্ধ হইলেই কি আর এতকালের রাজকীয় অভ্যাস পরিত্যাগ করা যায়?’     

এসব কথা আনন্দের ভালো লাগছিল না। তিনি বললেন, ‘এই রূপে চিন্তা করা নিতান্তই অনুচিত। আর যিনি বুদ্ধ হইয়াছেন, তাঁহাকে পূর্বাশ্রমের নামে, সিদ্ধার্থ নামে উল্লেখ করাও গর্হিত কর্ম। আমাদিগের জন্য তথাগত নিষেধনিয়ম করিয়াছেন যখন, তখন নিশ্চয়ই তাহার কোনো সংগত কারণ আছে। উহাই অন্বেষণ করিতে হইবে।’

দেবদত্ত উত্তর দিলেন, ‘করো তুমি অন্বেষণ। আমি যাহা বুঝিবার, বুঝিয়া গিয়াছি। সিদ্ধার্থ বাল্যাবধি এইরূপই ছিল। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যপ্রিয়, উদ্ধত। এক্ষণেও সে তাহাই আছে। সবাকার সম্মুখে আমাদিগকে হীনপ্রভ করিবার জন্যই সে আমাদিগের সহিত এমন করিতেছে। আমরা কি তাহার নিকট অস্পৃশ্য? কেন সে আমাদের এইরূপে বসাইয়া রাখিয়াছে, আমি কি বুঝি না?’      

ভদ্দিক খানিক চিন্তা করে ধীরে ধীরে নীপপুষ্পনিভ সদ্যোমুণ্ডিত মস্তকটি চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘কারণ যাহাই হউক… কথা হইল, তথাগত আমাদের এইরূপে উপেক্ষা করিলে সাধুসমাজে আমরা মানসম্মান কিছুই পাইব না। শ্রমণ বা তপস্বীদের ভিতর আমাদের চিরকাল ব্রাত্য হইয়াই থাকিতে হইবে।… আর এই উপালিটাও হইয়াছে তেমনই, রাজপুরীতে ও ছিল মহাধূর্ত নহাপিত, এখানে আসিয়া হইয়াছে যমসদৃশ দ্বারপাল… তথাগত অনুমতি দেন নাই বলিয়া ও কেমন আমাদের দিকে ক্রমাগত রুষ্ট ভঙ্গিতে তাকাইতেছে… পারিলে বুঝি জেতবন হইতে লগুড়াঘাতে আমাদিগকে এখনই তাড়াইয়া দেয়…’       

‘সবই তো বুঝিলাম, কিন্তু এ সমস্যার নিষ্পত্তি কী হইবে?’ অনুরুদ্ধ স্বগতস্বরে যেন প্রশ্ন করলেন।

নিষ্পত্তি কিছুই হল না। আলোচনায়, চর্চায় সেদিন বৃথাই বেলা গড়ালো শুধু।   

বরং নিষ্পত্তি এল কয়েকদিন পরে। একেবারে অভাবিত পন্থায়।     

দিনের আলো সেদিন ক্রমশ তেজ হারিয়ে নীল হয়ে আসছে, তখন বিকেলবেলা, কোথা থেকে এক অরণ্যচারী তপস্বী জেতবনে উপস্থিত হলেন। শোনা গেল, তাঁর নাম উপসেন। গা-হাত-পা রুক্ষ, মাথায় জটাভার, পরনে কটিমাত্র একটি বস্ত্র; অর্ধনগ্নই বলা যায়। এখানে এসেই তিনি অস্থির ব্যাকুলতায় তথাগত-র অন্বেষণ করতে লাগলেন। যাকেই সামনে দেখেন, তাকেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেন, ‘সুগত এখানে কোথায় আছেন? আমি যে তাঁহার দর্শন-অভিলাষী! কী উপায়ে তাঁহার দেখা পাইতে পারি? হে ভদ্র! আপনিই কি সেই মহাশ্রমণ সুগত?’ যেন তথাগত-র সঙ্গে দেখা না হলে এখনই তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যাবে।   

এই ব্যাকুল তপস্বী আগন্তুকের কথা উপালি তাড়াতাড়ি তথাগত-র কর্ণগোচর করলেন। অণুমাত্র বিলম্ব হল না, তপস্বী উপসেনের কাছে এসে উপালি তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আপনাকে ভগবান বুদ্ধ এখনই তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইতে বলিয়াছেন। আসুন, ভিক্ষু উপসেন, আমার সহিত আসুন। তিনি জেতবনের অপর প্রান্তে রহিয়াছেন!’

সমস্ত ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে দেবদত্ত তাঁর পার্শ্ববর্তী শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষুদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, “দেখিলে? দেখিলে কাণ্ডটা? মাসের পর মাস আমরা অপেক্ষা করিতেছি, অথচ আমাদিগের সহিত দেখা করিবার নাম নাই। আর কোথা হইতে আসিল জটাজটিল অপরিষ্কৃত একটা ভণ্ড, অমনি ‘ভগবান বুদ্ধ তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইতে বলিয়াছেন!’ ” শেষ কথাটা উপালির কণ্ঠস্বর নকল করে মুখভঙ্গিসহকারে বললেন দেবদত্ত।     

প্রায় এক প্রহর ধরে তথাগত-র সঙ্গে সেই ভিক্ষু উপসেনের কী যেন বার্তালাপ হল। অবশেষে প্রথম রাত্রির অন্ধকার গায়ে মেখে উপসেন ফিরে আসছিলেন। এখন আর তাঁর মুখে আর কোনো অস্থিরতার ভাব নেই। বেশ হৃষ্ট, আনন্দময় মুখভাব। জেতবনের সীমানা উপসেন পার হয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় শাক্যপুত্রীয়রা এসে তাঁকে ধরলেন। দেবদত্ত কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তপস্বী উপসেন! কী উপায়ে আপনি তথাগত-র দর্শন পাইলেন? আমরা তো এত মাস এ স্থলে বসিয়া আছি, তথাপি তথাগত আমাদিগকে দেখা করিবার অনুমতি দেন নাই!’   

সেই জায়গাটায় অল্প অল্প জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল। আবছা আলোয় ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষুদের মুখ শিশুর কৌতূহলে অবলোকন করে কী যেন চিন্তা করে নিয়ে উপসেন প্রতিপ্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা কি রাজপুত্র?’

ভদ্দিক উত্তর দিলেন, ‘তা ছিলাম বটে! কিন্তু এখন আমরা আর রাজপুত্র নই। ইদানীং প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়াছি।’

উপসেন বললেন, ‘তাহলে আমি ঠিকই ধরিয়াছি!’

দেবদত্ত ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ধরিয়াছেন?’

উপসেন উত্তর দিলেন, ‘আপনাদিগের মধ্যে আমি এখনও অবধি কোনো তপস্যার চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি না। এখনও আপনারা কাষায়-আবৃত রাজপুরুষ মাত্র। রাজবংশের গরিমা আপনাদিগের দূর হয় নাই। পরন্তু আপনাদিগের চীবরগুলি যথেষ্ট সুন্দর, মনোরম, আরামদায়ক। ইহা কি ভিক্ষুজনোচিত চীবর? নাকি রাজবস্ত্রে নির্মিত কাষায়? আপনারা ভিক্ষু হইয়াছেন?  নাকি ভিক্ষু সাজিয়াছেন? এতাদৃশ ব্যক্তিদের সহিত তথাগত সাক্ষাৎ করিবেন না, ইহাই তো স্বাভাবিক। হা হা হা!’      

লোকটার কি শরীরে এতটুকু ভয়ডর নেই গা? ছ-ছটা রাজপুত্তুর, নেহাত প্রব্রজ্যা নিয়েছে বলেই কোমরে তলোয়ার নেই, তা না হলে এতক্ষণে ওর কাটামুণ্ডু মাটিতে গড়াগড়ি খেতো! এখনও এদের যেমন বলিষ্ঠ বপু, রাগের চোটে অহিংসা-টহিংসা ভুলে গিয়ে যদি গলা টিপে ধরে, রুগ্ন উপসেনের প্রাণ বেরোতে অধিক বিলম্ব হবে না। সেসব কিছুই না ভেবে ‘হা-হা’ শব্দে রাজপুরুষদের পরিহাস করতে করতে উপসেন জেতবনসীমা পার হয়ে যেতে লাগলেন।

পরদিন প্রাতঃকালে ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তাঁদের উত্তম চীবরসমূহ পরিত্যাগ করলেন। স্নানান্তে অপেক্ষাকৃত জীর্ণ চীবর ধারণ করে নিতান্ত বিনয়ীভাবে মূলগন্ধকুটি-র দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁরা ভাবছিলেন, উপালিকে দেখতে পেলে পুনরায় তথাগত-দর্শনের আবেদন জানাবেন।   

কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। মূলগন্ধকুটি-র কাছাকাছি আসামাত্রই উপালি তাড়াতাড়ি ওঁদের কাছে এসে বললেন, ‘ভিক্ষুবৃন্দ! আপনারা এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? আজ প্রভাতবেলা হইতেই ভগবান আপনাদিগের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছেন। এমনকি ভিক্ষার্থেও বহির্গত হন নাই। আপনারা এখনই সত্বর তাঁহার নিকটে গমন করুন। তিনি জম্বুবৃক্ষতলে অবস্থান করিতেছেন।’     

দেবদত্ত মনে মনে ভাবছিলেন, বাব্বা! আজ যে এত খাতির! ব্যাপার কী? জেতবন থেকে চিরতরে চলে যেতে বলবে নাকি সিদ্ধার্থ?  

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তথাগত-সমীপে উপস্থিত হলেন। পাদবন্দনাদি শেষে তাঁরা বুদ্ধের সামনে মাটিতেই সুখাসনে বসলেন। তাঁদের উদ্দেশে মৃদু হেসে তথাগত বললেন, ‘স্বস্তি!’

প্রথমেই কথারম্ভ করলেন অনুরুদ্ধ। একটু অভিমানভরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদিগের সহিত এতকাল সাক্ষাৎ না-করিবার কারণ কী, ভগবন? আমরা কৃচ্ছ্রসাধনাদি করি নাই, রাজবংশের অহংকার পরিত্যাগ করি নাই, ইহাই কি আমাদিগের সহিত অসাক্ষাতের কারণ?’   

প্রশ্ন শুনে বুদ্ধ একটু হাসলেন। তারপর কমনীয় স্বরে  বললেন, ‘না, ইহা অসাক্ষাতের সম্যক কারণ নহে।’

আনন্দ অধীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তবে আর কী কারণ, ভগবন?’   

যেন কোন সুদূর বেদনায় মথিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তথাগত। বললেন, ‘পূর্ব-পূর্বজন্মের স্মৃতি জাগরিত হইলে ভিক্ষুজীবন সুদৃঢ় হয়, আনন্দ। যাহাতে তোমাদের চিত্তে পূর্বজন্মের স্মৃতি উদ্বুদ্ধ হয়, সেই জন্যেই ইচ্ছা করিয়াই তোমাদিগকে এতদিন দূরে রাখিয়াছিলাম। যাহাতে বিগতজন্মের কথা তোমাদের মনে পড়ে। কিন্তু আমার সে-প্রয়াস সফল হয় নাই। তোমাদের স্মৃতিমঞ্জূষা অতি দৃঢ়ভাবে অর্গলবদ্ধ রহিয়াছে!’

দেবদত্ত বলে উঠলেন, ‘পূর্বজন্মের স্মৃতি? সে আবার কী? পূর্বজন্ম ইত্যাদি আবার আছে নাকি?’

সে-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বহুদূরের দিকে, যেন বিগত বহুজন্মের দিকে উদাসীন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সুগত। তারপর আবার যেন নিজের কাছে ফিরে এসে শান্ত ভঙ্গিমায় বললেন, ‘তোমাদিগকে একটি গল্প বলিব। শুনিবে?’    

গল্প কে না শুনতে চায়? শ্রদ্ধাবান আনন্দ-অনিরুদ্ধই হোক কিংবা শ্রদ্ধাহীন ক্রূরচিন্তক দেবদত্তই হোক, গল্প শুনতে চায় না, ত্রিভুবনে এমন কেউ এখনও জন্মায়নি। সকলেই সাগ্রহে তথাগত-র দিকে এবার কিছুটা এগিয়ে এসে বসলেন।  

মহাশ্রমণ বুদ্ধ অতঃপর বলতে লাগলেন:      

“উদাসীন ধরিত্রীর উপর দিয়া দীর্ঘ দীর্ঘ কল্পকাল তাহার যাবতীয় ঐশ্বর্য লইয়া চলিয়া গিয়াছে। সে-সকল কথা কেহ মনে রাখে নাই। মন্দির শ্মশান হইল, শ্মশান মন্দির হইল। রাজ্য-সাম্রাজ্য ধুলা হইয়া গেল, তাহাদের ভস্মাবশেষরাশি নদী লইয়া গেল সমুদ্রে। একজনও কেহ রহিল না। সকলের অস্থিকরোটি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া মাটিতে মিশিল, সেই মাটি হইতে রস টানিয়া লইয়া মাথা তুলিল উন্মুখ উদ্ভিদ। ভাষা পরিবর্তিত হইয়া গেল। কত সাধভরে রচিত কাব্যসম্ভার পুথির পৃষ্ঠায় অপঠিত অনুদ্ধারণীয় হইয়া ধুলা খাইতে লাগিল। সেকালের গান আর কেহ একালে গাহে না; ভাষা ভুলিয়া গিয়াছে।

এমনই বহুকল্প পূর্বে বারাণসী নগরীতে এক স্বধর্মনিষ্ঠ রাজা ছিলেন। নাম— ব্রহ্মদত্ত। তাঁহার অতি সরলা, শান্তা, গম্ভীরা রাজ্ঞীর নাম ছিল ব্রহ্মাবতী। কৈশোরকালেই উভয়ের বিবাহ হইয়াছিল। ধীরে ধীরে তাঁহারা যুবক-যুবতী হইলেন।  

উভয়ে উভয়ের প্রতি সুগভীর স্নেহমায়ার আকর্ষণ অনুভব করিতে লাগিলেন। স্নেহ হইতে প্রীতি হইল, প্রীতি হইতে রতি। রতির ফলস্বরূপ যথাকালে ব্রহ্মাবতী অন্তর্বত্নী হইলেন। অন্তঃসত্ত্বা ব্রহ্মাবতীর সাধ হইল, কিছুকাল নদীবক্ষে নৌবিহার করিবেন।   

রাজ্ঞীর এমত ইচ্ছাপূরণের জন্য রাজা যথোপযুক্ত ব্যবস্থা লইলেন। পরিচারক-পরিচারিকা সমেত একটি সুচিত্রিত জলযান রাণী ব্রহ্মাবতীকে লইয়া গঙ্গাবক্ষে ভাসিল। ধীরে ধীরে গঙ্গানদীর প্রবাহ বাহিয়া এমন এক নির্জন স্থানে নৌকা উপস্থিত হইল, যেখানে নদীর দুইপারে কেবল শান্ত তরুশ্রেণী, ঘন অরণ্য, অনাবিল আকাশ ও মৃদুমন্দ মলয়ানিলের প্রাচুর্য আছে। আর কিছুই নাই।       

এই জনকোলাহলহীন নীরব আকাশ, শান্ত ধ্যানমগ্ন তরুবীথিকা, নিম্নে গঙ্গার মৃদু কলতানগুঞ্জরিত জলস্রোতের মধ্যে রাণী ব্রহ্মাবতীর মন একান্ত শান্ত, গম্ভীর, নিরতিশয় নিজনিবিড় হইয়া গেল। তাঁহার জন্মজন্মের স্মৃতি যেন চিত্তপথে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। শেষে সেই স্মৃতিস্রোতও স্তিমিত হইয়া আসিল, নিরুদ্বিগ্ন আনন্দের আভাস চিত্তনদীতে ধীরে ধীরে স্ফুটতররূপে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। কিছুদিন পরে রাণী ব্রহ্মাবতী এক সুদর্শন পুত্রের জন্ম দিলেন। পুত্রমুখ দর্শনে উৎফুল্ল রাণী নবজাত সন্তানের নাম রাখিলেন-স্মৃতিকুমার।

প্রসূত ও প্রসূতিকে লইয়া নাও বারাণসীতে ফিরিয়া আসিল। রাজপুত্রের জন্মসংবাদ পাইয়া রাজা ও প্রজা সকলেই হৃষ্টচিত্তে নদীতীরে রাজ্ঞীকে স্বাগত জানাইতে আগমন করিলেন। রাণী ব্রহ্মাবতী ও তাঁহার সদ্যোজাত পুত্র স্মৃতিকুমারকে লইয়া রাজা আনন্দে ভাসিতে ভাসিতে রাজপুরীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

দিন গেল। রাজপুত্র স্মৃতিকুমার ধীরে ধীরে শশিকলার ন্যায় প্রবর্ধিত হইতে লাগিল। কিন্তু ইতোমধ্যে শিশুদেহে কিঞ্চিৎ বৈলক্ষণ্য দেখা দিল। অপরাপর শিশুদের ন্যায় স্মৃতিকুমার সহজে রোদন করে না। তীব্র রৌদ্র কিংবা দারুণ শৈত্যে ফেলিয়া রাখিলেও তাহাকে কাঁদিয়া উঠিতে দেখা যায় না। ক্ষুধা পাইলেও সে ক্ষোভ প্রকাশ করে না, রাণী তাহাকে বুকে করিয়া বসিলেও সে নিজ হইতে মাতৃস্তনে মুখ দেয় না।  

যে-বয়সে শিশুরা হাঁটিতে শেখে, সেই বয়স আসিল, অথচ স্মৃতিকুমারকে বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও হাঁটানো শেখানো গেল না। সে এক স্থানে স্থির হইয়া বসিয়া থাকে। তাহাকে ধরিয়া জননী নিয়মিত হাঁটানোর প্রয়াস করাইলেও, যতক্ষণ মা ধরিয়া আছেন, ততক্ষণই সে চলিতে পারে, ছাড়িয়া দিলে তৎক্ষণাৎ ভূমির উপর পড়িয়া যায়।   

যে-বয়সে সচরাচর শিশুর মুখে বোল ফুটে, আধো-আধো দুই একটা শব্দ উচ্চারণ করিয়া শিশু পিতামাতাকে তাক লাগাইয়া দেয়, সেই বয়সও আসিল, তথাপি স্মৃতিকুমারের মুখে বোল ফুটিল না। একটি শব্দও সে উচ্চারণ করিল না। রাজা-রাণী উভয়েই ধৈর্য ধরিয়া আরও কিছুকাল অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু সে-প্রতীক্ষা বিফল হইল, স্মৃতিকুমারের জিহ্বায় বাণীর প্রসাদ ফুটিল না।

তখন রাজবৈদ্য আসিলেন। একজন নহে, অনেক বৈদ্য। পরীক্ষা সকলেই করিলেন। কিন্তু শিশুটির শরীরে বা জিহ্বায় অণুমাত্র অসুস্থতা খুঁজিয়া পাইলেন না। স্মৃতিকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ। তাহা হইলে তাহার মূকত্ব ও পঙ্গুত্বের কারণ কী? কেহই বলিতে পারিলেন না।

পুত্র মূক, পুত্র পঙ্গু—ইহা চিন্তা করিয়া রাজা নিতান্ত শোকগ্রস্ত হইলেন। রাজপুত্রই রাজ্যের ভবিষ্যৎ; সে যদি বাকশক্তিহীন ও চলচ্ছক্তিহীন হয়, তাহা হইলে এই বিপুল সাম্রাজ্যের দায়ভার রাজা কাহার উপর ন্যস্ত করিয়া যাইবেন?

রাণী ব্রহ্মাবতী কিন্তু পুত্রের এতাদৃশ অবস্থা দর্শনে দুঃখিত হইলেন না। স্মৃতিকুমার অসুস্থ – এই কথাটাই ব্রহ্মাবতীর বিশ্বাস হইল না। সন্তান যখন গর্ভে ছিল, তখন রাণী সেই শান্ত নিসর্গদৃশ্যের ভিতর আপন স্মৃতিভারে নিমজ্জিতা ছিলেন, এক্ষণে শিশুটির নির্বাক দৃষ্টির ভিতর রাণী সেই নির্জন প্রকৃতির নীরব ভাষা, তাহার অসাড় পদদ্বয়ে বৃক্ষসমূহের স্থিরতা, ধ্যাননিশ্চলতা দেখিয়া নিরুদ্বিগ্না রহিলেন।   

রাণীর এই নিরুদ্বেগ ভাব রাজার ক্ষোভের কারণ হইল। কিন্তু সেই ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হইবার সুযোগ পাইল না। ইহার পর রাণী ব্রহ্মাবতী আর বেশিদিন বাঁচিলেন না। আকস্মিকভাবে অসুস্থ হইয়া একদিন মৃত্যুপথগামিনী হইলেন।

রাণীর অদর্শনে রাজার শোকবেগ দ্বিগুণিত হইল। স্ত্রী পরলোকগতা, পুত্র মূকপঙ্গু, কী লইয়া আর বাঁচিবেন? রাজারা একাধিক বিবাহ করেন, কিন্তু রাণী ব্রহ্মাবতীকে রাজা প্রাণাধিক ভালোবাসিতেন। অপর বিবাহের কথা তাঁহার মনেও উঠিল না। ফলতঃ, রাজা ব্রহ্মদত্তের অন্য পুত্রসম্ভাবনাও আর রহিল না।

এমতাবস্থায় একজন ভুবনবিদিত ভিষগ্‌ রাজপুরীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি স্মৃতিকুমারকে পরীক্ষা করিয়া যাহা বলিলেন, তাহা বিস্ময়কর। তিনি বলিলেন, স্মৃতিকুমার মূকও নহে, পঙ্গুও নহে। সে অন্যের ভাষা সমস্তই অনুধাবন করিতে পারে। তাহার বাকশক্তিও অটুট। তা সত্ত্বেও সে কোনো কারণে কথা কহে না। কথা কহিবার ইচ্ছা নাই, তাই সে নির্বাক। তাহার চলিবার সামর্থ্যও রহিয়াছে। তা সত্ত্বেও সে কোনো কারণে চলে না। চলিবার ইচ্ছা নাই, তাই সে নিশ্চল। ইচ্ছাশক্তিই মনুষ্যের সকল ক্রিয়ার মূল কারণ। কিন্তু ইচ্ছা না হইলে কোনো কার্য হইবে না। এক্ষেত্রে স্মৃতিকুমার চলনে ও বলনে অপারগ নহে, অনিচ্ছুক। কেন অনিচ্ছুক, তাহা ভিষগ্‌বর বলিতে পারিলেন না। রাজকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ, সজীব; তথাপি সে এইরূপ জড় অবস্থায় স্ব-ইচ্ছায় রহিয়াছে – এই মাত্র বলিয়া বৈদ্য বিদায় লইলেন।

এদিকে রাজার অন্যান্য অমাত্যবর্গও পুত্রসন্তান লাভ করিয়াছেন। ছয় জন অমাত্যের ছয় পুত্র। তাহারা সকলেই স্বাভাবিক। অমাত্যপুত্ররা রাজপুরীতে রাজপুত্র স্মৃতিকুমারের সহিত খেলা করিতে আসিত। কিন্তু তাহাদের নানা বালকসুলভ চেষ্টাতেও স্মৃতিকুমার সাড়া দেয় না, খেলায় অংশ লয় না, নিশ্চুপ হইয়া বসিয়া থাকে। এমন অনিচ্ছুক বালকের সহিত খেলা করিয়া সুখ নাই। অমাত্যপুত্রগণ নিরাশ হইয়া ফিরিয়া যায়।   

সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া রাজা ব্রহ্মদত্ত একদিন পুত্রকে কাছে লইয়া বসিলেন। তাহাকে বিবিধ খেলানা ও মিষ্টান্ন লইয়া অনেক সাধিলেন। তাহার পর মিষ্ট কথায় পুত্রকে বুঝাইতে লাগিলেন, ‘হে সৌম্য! তুমি আমার একমাত্র তনয়। এই বিশাল সাম্রাজ্যের তুমিই ভাবী উত্তরাধিকারী। তুমি কথা বলিতেছ না কেন? গমনাগমন করিতেছ না কেন? তুমি উঠো, কথা কও, রাজ্যের দায়িত্ব বুঝিয়া লও। আমি জানি, তুমি কথাও কহিতে পারো, চলিতেও পারো। তথাপি তুমি এই জড়বৎ হইয়া আছ। আমার কথা শুনো। একবার উঠিয়া দাঁড়াও। একবার অন্ততঃ শব্দ উচ্চারণ করো।’

এইরূপে দিনের পর দিন রাজা পুত্রকে বুঝাইতে লাগিলেন। কিন্তু কোনো ফল হইল না। রাজপুত্র স্মৃতিকুমার তদবস্থই রহিল।

তখন রাজা চিন্তা করিলেন, প্রিয়বাক্যে যখন কার্যোদ্ধার হয় নাই, তখন রূঢ়তাই অবলম্বন করিতে হইবে। একই কথা রাজা স্মৃতিকুমারের প্রতি তর্জনগর্জন করিয়া বলিতে লাগিলেন। তাহাতেও ফল হইল শূন্য। স্মৃতিকুমার নির্ভয়, নির্লিপ্ত, নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া রহিল।

অতঃপর রাজা এক বিষম পরিকল্পনা আঁটিলেন। স্থির করিলেন, তিনি স্মৃতিকুমারকে শাস্তিদানের অভিনয় করিবেন। সভা আহূত হইল, পাত্র-মিত্র-অমাত্য সকলেই উপস্থিত। স্মৃতিকুমারও এক পার্শ্বে স্থানুবৎ বসিয়া আছে।

সেই ভরাসভায় সকলের সম্মুখে রাজা ঘোরশব্দে ঘোষণা করিলেন, ‘আমার পুত্র স্মৃতিকুমার মূক ও পঙ্গু। রাজ্যের উত্তরদায়িত্ব লইবার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এমন পুত্র থাকাও কী, আর না থাকাও কী? আমি পুত্র স্মৃতিকুমারকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। প্রহরীগণ, যাও, ইহাকে এখনই বধ্যভূমিতে লইয়া যাও!’ 

তখন সান্ত্রী, প্রহরী, হন্তারক সকলেই নিতান্ত খিন্ন মনে চতুর্দোলায় করিয়া স্মৃতিকুমারকে বধ্যভূমির দিকে লইয়া যাইতে লাগিল। রাজা উহাদের গোপনে বলিয়া দিয়াছিলেন, যদি স্মৃতিকুমার মধ্যপথে শব্দ উচ্চারণ করে, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ যেন তাহাকে রাজসভায় ফিরাইয়া আনা হয়। অন্যথায়ও একই ব্যবস্থা। তবে সেক্ষেত্রে পরে আনিলেই হইবে।

রাজ্যের অন্যান্য প্রজারাও রোদন করিতে করিতে উহাদেরই সঙ্গে বধ্যভূমি-অভিমুখে যাত্রা করিল। শ্মশানে তুষাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইল। এখনই যেন প্রহরীগণ স্মৃতিকুমারকে সেই অনলকুণ্ডে ফেলিয়া দিবে।

অন্তিম মুহূর্তে সেই সমুজ্জ্বল অগ্নিশিখা দেখিয়া স্মৃতিকুমার সহসা বলিয়া উঠিল, ‘এই বারাণসীতে কি কোনো লোক বাস করে? অথবা এই রাজ্য মনুষ্যশূন্য?’  

অমনি কাড়া-নাকাড়া-বাদ্য-ঢাক-ঢোল তুমুল শব্দে বাজিয়া উঠিল। রাজপুত্র জীবনে এই প্রথম কথা কহিয়াছে। আনন্দিত জনতা স্মৃতিকুমারকে লইয়া রাজসভায় ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে সেই সুসংবাদ দিল।

কিন্তু ফিরিবার পর আবার যেই-কে-সেই অবস্থা। স্মৃতিকুমার এখন আর কথাও কহিতেছে না। গমনাগমনও করিতেছে না। সেই একই তুষ্ণীম্ভাব ধরিয়া বসিয়া আছে। বধ্যভূমিতে যাহা বলিয়াছিল, সেই একবারই একটি মাত্রই কথা, তাহার পর আর নাই। 

রাজা পুনরায় আদেশ দিলেন, উহাকে বধ্যভূমিতে লইয়া গিয়া বধ করিয়া ফেলিতে। পুনর্বার রাজপুত্র স্মৃতিকুমারকে লইয়া বিপুল জনতা বধ্যভূমির দিকে যাত্রা করিল।

শ্মশানে প্রবেশ করিবার মুখে একটি শবদেহ পড়িয়াছিল। মৃত সেই ব্যক্তির মুখপানে চাহিয়া স্মৃতিকুমার আধোমনস্ক স্বরে বলিয়া ফেলিল, ‘এই ব্যক্তি কি মরিবার পরে মরিয়াছে? নাকি মরিবার পরে বাঁচিয়া রহিয়াছে?’

কথার অর্থ কী, কে জানে! তবুও তো কথা! রাজপুত্র মুখ খুলিয়াছে। পুনরায় সকলে ঢাকঢোল বাজাইয়া আনন্দ করিতে করিতে রাজসভায় ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে সুসংবাদ দিল, ‘আবার রাজপুত্র কথা কহিয়াছেন!’   

কিন্তু এইবারও সেই একই ঘটনার পুনরাভিনয় হইল। শ্মশানে স্মৃতিকুমার মুখ খুলিয়াছিল বটে, কিন্তু পিতার সমীপে আসিয়া বহু অনুরোধ সত্ত্বেও আর মুখ খুলিল না। রাজা ভাবিলেন, কেন এইরূপ করিতেছে? ভাবিয়া ভাবিয়া কোনো উত্তর পাইলেন না। শেষে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। এবার আর নকল মৃত্যুদণ্ড নহে। ক্রুদ্ধ রাজা ব্রহ্মদত্ত পুত্র স্মৃতিকুমারকে সত্য সত্যই এইবার মৃত্যুদণ্ড দিয়া উঠিয়া গেলেন। সকলে স্মৃতিকুমারকে লইয়া শ্মশানাভিমুখে বাহির হইয়া গেল। নির্বিন্ন রাজাও রাজসভা হইতে উঠিয়া গিয়া আত্মহননের পরিকল্পনা করিলেন। জীবন বিস্বাদ, সংসার বিস্বাদ, নিজেই নিজের পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়া মহাপাপ করিয়াছেন। আর বাঁচিয়া কী হইবে?  

এদিকে স্মৃতিকুমারকে লইয়া জনসারণী শ্মশানের পথ ধরিয়া চলিতেছে। পথিপার্শ্বে দিগন্তস্পর্শী শস্যক্ষেত্র। ধান ফলিয়াছে খুব। জীবধাত্রী ধরিত্রীর গর্ভকুহর হইতে স্বর্ণাভ ধান্যশিশুগুলি সমুদ্‌গত হইয়া নিখিল জীবনিবহের জঠরকুহর পরিপূর্ণ করিবার জন্য যেন উৎসুক হইয়া রহিয়াছে। সেই দিকে তাকাইয়া আপনমনে স্মৃতিকুমার বলিয়া উঠিলেন, ‘ইহারা একবার ভুক্ত হইয়া পুনরায় ভুক্ত হয়!’

অসংলগ্ন কয়েকটি শব্দ। হউক অসংলগ্ন, তবুও তাহারা উচ্চারিত হইয়াছে। আনন্দিত জনতা কুমারকে লইয়া রাজপুরীতে ফিরিল। রাজা ব্রহ্মদত্ত বিষপাত্র ওষ্ঠে স্পর্শ করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় কুমারকে লইয়া উল্লসিত প্রজাদের ফিরিয়া আসিতে দেখিলেন।

তিনি বলিলেন, ‘উল্লাসে কী লাভ? কুমার তো তোমাদের সম্মুখে কথা কহিতেছে, অথচ আমার নিকটে আসিলেই নিশ্চুপ। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ভালো লাগে না। আমার সহিত রাজপুত্র কথা কহিবে না!’

তখন সকলকে অবাক করিয়া দিয়া স্মৃতিকুমার পিতার উদ্দেশে বলিয়া উঠিল, ‘পিতঃ! আপনারও সহিত বাগ্‌বিনিময় করিব। আপনারও সম্মুখে গমনাগমন করিব। যদি কথা দেন…’

বিষপাত্র এক পার্শ্বে নিক্ষেপ করিয়া রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কী কথা?’

‘যদি কথা দেন, আমি যাহা চাহিব, আপনি তাহাই আমাকে দিবেন।’

রাজা অশ্রুপরিপ্লুত স্বরে বলিলেন, ‘পুত্র! পুত্র! তোমাকে অদেয় আমার কী আছে? তুমি যাহা চাহিবে, তাহাই দিব। আগে বলো, কেন এতদিন কথা কহ নাই? কেন এতদিন চলাচল করো নাই?’ 

অতি শান্ত স্বরে স্মৃতিকুমার উত্তর দিল, ‘পিতঃ! আমি আমার পূর্ব পূর্ব সকল জন্মের সুস্পষ্ট স্মৃতি লইয়াই এইবার জন্মিয়াছিলাম। আমি জাতিস্মর। পূর্বজন্মে আমি রাজা ছিলাম। ষাট বৎসর রাজ্যভোগ করিয়াছিলাম। তাহার ফলে মৃত্যুর পরে ষাট সহস্র বৎসর আমাকে নরকবাস করিতে হয়। রাজকীয় উপভোগ এমনই ভয়ানক। এই কথা মনে পড়াতে আমি জন্মমুহূর্তেই স্থির করিয়াছিলাম, আমি মূকবৎ, পঙ্গুবৎ আচরণ করিব। তাহা হইলে আপনি আর আমাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিতে পারিবেন না।’

রাজা বলিলেন, ‘হা পুত্র! এ কী শুনাইলে? তাহা হইলে আমাদের ন্যায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কী পরিণতি হইবে? আচ্ছা, সে সকল কথা পরে ভাবিব। কিন্তু তাহার আগে বলো দেখি, শ্মশান-অভিমুখে গতবান তুমি ওইরূপ অসংলগ্ন তিনটি কথা বলিয়াছিলে কেন? উহাদের অর্থ কী?’     

রাজপুত্র হাসিমুখে বলিল, ‘ও সকল কথা অসংলগ্ন নহে। উহাদের অর্থ আছে। বধ্যভূমিতে নীত আমার জন্য যখন তুষাগ্নি জ্বলিল, তখন বলিয়াছিলাম, বারাণসীতে কি কোনো লোক বাস করে, অথবা এই রাজ্য মনুষ্যশূন্য? যে-রাজ্যে মূক বা পঙ্গু হওয়ার অপরাধে নির্দোষ এক কিশোরকে রাজা মৃত্যুদণ্ড দেন, আর তাহা শ্রবণ করিয়াও প্রজারা বিদ্রোহ না-করিয়া রাজার এবম্বিধ অন্যায়-আদেশ পালন করিতেই উদ্যত হয়, সেই রাজ্যে বসবাসকারীরা কি মনুষ্য পরিচয়ের যোগ্য? উহারা তো পশ্বাধম! দ্বিতীয়বার একটি মৃতদেহ দেখিয়া বলিয়াছিলাম, এই ব্যক্তি কি মরিবার পরে মরিয়াছে, নাকি মরিবার পরে বাঁচিয়া রহিয়াছে? মানুষ দুইপ্রকার। এক ধরনের মানুষ মরিবার পূর্বেই মরিয়া যায়। উহারা অবিবেকী, অনাচারী ব্যক্তি। আরেক ধরনের মানুষ জীবৎকালেই এমন কীর্তি রাখিয়া যায়, যাহার ফলে মৃত্যুর পরেই তাহাদের প্রকৃত জীবন আরম্ভ হয়; কীর্তির ভিতর দিয়া, কল্যাণকামনার ভিতর দিয়া সকল নরনারীর হৃদয়ে তাঁহারা চিরজীবিত থাকেন। তৃতীয়বার অবারিত ধান্যসম্পদ দেখিয়া বলিয়াছিলাম, ইহারা একবার ভুক্ত হইয়া পুনরায় ভুক্ত হয়। ধান্য উৎপন্ন হইলে বহুলাংশে তাহা খাদ্যদ্রব্যরূপে জীবকুলের দ্বারা ভুক্ত হয়। অবশিষ্টাংশ ভালো জাতের ধান হইতে বীজ প্রস্তুত করা হয়, যাহা পরবর্তীকালে কৃষিক্ষেত্রে রোপণ করা হয়। অনুরূপভাবে প্রতিটি মানুষ ইহজন্মে পূর্ব পূর্ব জন্মার্জিত কর্মের ফল ভোগ করে, একই সঙ্গে বর্তমান জন্মে যেসব কর্ম করে তাহাই সঞ্চিত থাকিয়া তাহাদের ভাবী জন্মে ফলপ্রসূ হয়। জীব জন্মে জন্মে কর্মভোগ করিয়া চলে। ইহারই সহিত আমি ধান্যসম্পদের তুলনা করিয়াছি।’   

সভাস্থ সকলে ‘সাধু সাধু’ করিয়া উঠিল। রাজা বলিলেন, ‘অসীম সৌভাগ্যে তোমার ন্যায় পুত্র পাইয়াছি। বলো পুত্র, কী তোমার অভীষ্ট? পূর্বশর্তানুসারে যাহা চাহিবে, তাহাই দিব।’

স্মৃতিকুমার উত্তর দিল, ‘তাত! আপনি আমাকে প্রব্রজ্যা গ্রহণের অনুমতি দিন!’ 

এই কথায় নিতান্ত শোকাহত হইয়া রাজা কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘কী বলিতেছ, পুত্র? তুমি যে আমার রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী! তোমার ন্যায় প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিই রাজ্যশাসনে সর্বপ্রকারে উপযুক্ত নয় কি?’

স্মৃতিকুমার বলিলেন, ‘আমি প্রজ্ঞাবান কিনা, জানি না। তবে এ জগতে যাঁহারা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান, সন্ন্যাস তাঁহাদেরই জন্যে। তাঁহারা সকলই পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া স্থির করিয়াছেন, সমস্তই নশ্বর ও দুঃখপ্রদ। তাঁহারাই সব পরিত্যাগ করিয়া নির্বাণের অনুসন্ধান করিয়া থাকেন। আর যাঁহারা অনেক ভুগিয়াও এ জগতের আশা পরিত্যাগ করিতে পারেন না, তাঁহাদের জন্যই জাগতিক উপভোগ। তাঁহারা পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মের ফল ভোগ করিয়া পরবর্তী জন্মের কর্মভোগের বীজ বুনিয়া যান। মধ্যে মধ্যে স্বর্গ বা নরক ভোগ হয়, তাহাতেও তাঁহাদের চেতনা হয় না। আবার আসিয়া এই ভবচক্রে ঘুরিতে থাকেন। পিতঃ! আমার ইতোমধ্যেই বিলম্ব হইয়া গিয়াছে। আমি চলিলাম।’

এই বলিয়া স্মৃতিকুমার রাজা, রাজ্য, প্রজা সমস্ত ফেলিয়া প্রব্রজ্যার পথে বাহির হইয়া গেল। অতি নির্জন স্থানে এক বনভূমিতে সুকঠিন তপ আরম্ভ করিল।     

তাঁহার দেখাদেখি ছয় অমাত্যপুত্রও সেই বনে আসিয়া উপস্থিত হইল। স্মৃতিকুমার তাহাদের ফিরিয়া যাইতে বলিল। কিন্তু তাহারা শুনিল না। তখন তাহাদিগকে স্মৃতিকুমার দূরে রাখিতে লাগিল। তাহাদের সংশ্রব স্মৃতিকুমার পরিত্যাগ করিবার চেষ্টা করিল। তথাপি সেই অমাত্যপুত্ররা স্মৃতিকুমারকে ছাড়িল না। একত্রে তপস্যা করিতে আরম্ভ করিল।”

এই পর্যন্ত বলে তথাগত কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে শাক্যপুত্রীয়দের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বহু কল্পপূর্বের এই সর্ববৈনাশিক গল্পটি কেমন শুনিলে? ভালো লাগিল? কিছু কি মনে পড়িল তোমাদের?’

এরই মধ্যে তথাগত-প্রচারিত ত্যাগবৈরাগ্যের ভাবটিকে সংসারী লোকেরা বিদ্রূপভরে ‘সর্ববৈনাশিক’ বলে ডাকতে আরম্ভ করেছে। এ ত্যাগবৈরাগ্য কিনা সর্বনাশা, সংসারে আগুন লাগিয়ে দেয়। সে-কথা তথাগত-র কানেও উঠেছে। তাই স্বকথিত আখ্যানটিকে ‘সর্ববৈনাশিক’ বলে খানিক মজা করলেন তিনি।      

অনুরুদ্ধ ছাড়া অন্য পাঁচজন শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তাঁদের মনের ভিতরে অনেক তোলাপাড়া করেও এ আখ্যানের কণামাত্রও মনে করতে পারলেন না। কিন্তু অনুরুদ্ধ ব্যতিক্রমী; গল্প শুনতে শুনতে তাঁর মনের মধ্যে কী যেন ছায়া ছায়া আকার, অস্পষ্ট সব ঘটনাপুঞ্জ চোখের পাতার উপর রেণু রেণু অক্ষিরোমের মতো ভেসে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতন খেয়াল হল তাঁর, আরে, এ ঘটনা যে তাঁর বহুপরিচিত! এতদিন কীভাবে যে ভুলে গেছিলেন!     

তথাগত হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অনুরুদ্ধ! তুমি কি কিছু বলিতে ইচ্ছা করো?’  

অনুরুদ্ধ উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, ভগবন! এখন আমার সম্যক মনে পড়িয়াছে। বহু কল্পপূর্বে আপনিই ছিলেন সেই স্মৃতিকুমার। আর আমরা ছয়জন ছিলাম আপনারই অনুসারী সেই ছয় অমাত্য পুত্র…’             

অনুরুদ্ধর কথা শেষ হল না, তার আগেই জম্বুবৃক্ষ থেকে ঝরঝর করে কতগুলো শুকনো পাতা চৈত্রপবনে স্খলিত হয়ে মাটির উপর খসে পড়ল। হয়তো এ জন্মের মতো প্রাণোর্মি শেষ হল তাদের, এর পর সৃষ্টির কোনো পুনঃপ্রবাহের বীজের ভিতরে মিশে গিয়ে সম্মুখে আরও সম্মুখে ভাবী কোনো জন্মে বুদ্ধত্বের দিকেই শুষ্ক পত্ররাশির অনিবার্য অভিযাত্রা।     

(সূত্র: বোধিসত্ত্বাবদান-কল্পলতা, সপ্তত্রিংশ পল্লব)                   

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *