হর্ষ দত্ত
সরকারি হাসপাতালগুলোকে বাতিল করে মোহন ওর গুরুতর অসুস্থ স্ত্রী বর্ণাকে অ্যামবুলেন্সে চাপিয়ে , বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সল্ট লেক ও বাইপাসের ধরে গড়ে ওঠা এইসব সুদৃশ্য হাসপাতাল রোগী লুফে নেওয়ার জন্য নিরন্তর প্রস্তুত। কিন্তু আশ্চর্য কোথাও বেড নেই ।’ বেড খালি নেই’ ‘সরি বেড নট অ্যাভেলেবল ‘ শুনতে শুনতে মোহন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রাইভেট হাসপাতাল বেড নেই বলছে কেন ?জেনারেল বেড যদি ভর্তি হয়ে থাকে তাহলে কেবিন আছে ওয়ান পেশেন্ট, টু পেশেন্ট কেবিন ছাড়া বড় হাসপাতালে ডিলাক্স হিসেবে দাগানো কেবিনও থাকে। সেগুলো রুগি থাকার ঘর তো নয় যেন দু কামরার ফার্নিশড ফ্ল্যাট । বর্ণাকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়ার পরেই জুনিয়র ডাক্তার কেউ দৌড়ে আসছেন। তিনি সব দেখেশুনে পাঁচ- দশ মিনিটের পরই হয়তো রিপোর্ট দিচ্ছেন । পরক্ষণেই অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্ট জানাচ্ছে- বেড নেই। অন্যত্র চেষ্টা করুন।
অ্যাম্বুলেন্সে শায়িত বর্ণা স্বাসকষ্টের পরিমাণ যেন আর সহ্য করতে পারছে না। ওর মাথার কাছে বসে ক্রমাগত মায়ের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেয়ে বিনম্রা। বৌদির পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিনা দেখছে মোহনের ভাই শোভন। ড্রাইভার বাচ্চুর কাছেও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। পাড়ার ক্লাবের এই অ্যাম্বুলেন্স ওর জিম্মায় থাকে । রোগ ও রুগির অভাব নেই ।ফলে সপ্তাহের প্রায় প্রত্যেকদিন ওকে ছোটাছুটি করতে হয়। বাচ্চুর পাশে বসে মোহন অজানা ভীতিতে কেঁপে উঠছে। তাহলে কি আচমকা বর্ণা নিরাময়ের বাইরে চলে গেছে ! সেই জন্যেই কি হাসপাতালগুলো মোহনের মুখের সামনে ঝুলিয়ে দিচ্ছে ‘বেড খালি নেই ‘ প্ল্যাকার্ড ব্যানার । অন্তিম স্তর থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নেওয়াই তো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ । অথচ তার বদলে এরা যেন দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।
হুটারের শব্দ একটু কমিয়ে অভিজ্ঞ বাচ্চু চরম কোনও মুহূর্তের প্রতীক্ষায় ঘামতে থাকা মোহনকে বলল, ‘দাদা আমি এখান থেকে উত্তর কলকাতায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি ।ওখানে একটা ছোট প্রাইভেট হাসপাতাল আছে। ওরা রুগী ভর্তি করে নেয় , বাতিল করে দেয় না ।… আপনি বললে যাব।
-তাই চলো বাচ্চু । পেছন থেকে উদ্বিগ্ন শোভন বলল আপাতত এছাড়া কোনও উপায় নেই। দাদা তুমি কি সরকারি হাসপাতালগুলোর কথা ভাবছ?
কান্না ভেজানো গলায় মোহন উত্তর দিল কিছুই ভাবতে পারছি না ।আমি আর বর্ণার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না রে, হঠাৎ কী যে হল ।ওহো …..
শোভন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। খবর পেয়েই কলকাতা চলে এসেছে । ডেলি প্যাসেঞ্জারির হাত থেকে বাঁচার জন্য কল্যাণীতে বাড়ি করে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকে। বাচ্চুকে নির্দেশ দেওয়ার মতো শোভন বলল তুমি যে হসপিটালের কথা বলছ সেখানেই চলো ।
ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের সমসাময়িক ডাক্তার এ, রায়চৌধুরীর নামে পরিচিত এই হাসপাতালের আগে নাম ছিল জেনারেল সার্ভিস হসপিটাল। প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার রায়চৌধুরীর প্রয়াণের পর তাঁর নামে হাসপাতালটি পরিচিতি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বড় রাস্তার ওপরেই মেন গেট। ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স … থেকে রুগি নামানোর বড় পরিসর। ব্যাক পজিশনে গাড়ি ঢুকিয়ে দৌড়ে এসে বাচ্চু দরজা খুলে স্ট্রেচারের পায়ের দিকটা খানিকটা টেনে দিল।
মিনিট দুয়েক পরেই একই ধরণের শাড়ি ব্লাউজ পরা দু’জন অল্পবয়সী মহিলা হসপিটালের ওয়েটিং এরিয়ার পাশ থেকে বেরিয়ে এলেন। শায়িত রুগির একেবারে কাছাকাছি গিয়ে ছিপছিপে তরুণীটি আপনজনের মতো জিজ্ঞেস করলেন ওঁর কী হয়েছে ?
-প্রবল শ্বাসকষ্ট হচ্ছে , সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর ঘামছেন …। শোভন উত্তর দিল। শ্যামলা রঙের ওপর যুবতীটি সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে কাউকে রুগির পরিস্থিতি জানিয়ে বললেন, অ্যাটেন্ডিং ডাক্তার দেখতে আসছেন। একটু অপেক্ষা করুন। তিনিই ডিসিশন জানাবেন।
প্রতিটি মুহূর্তকে মনে হচ্ছে অনন্তকাল। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে ছটফট করছে বিনম্রা। বর্ণা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে -ত্রাসে সংকুচিত মোহন অ্যাম্বুলেন্সের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে আছে।
লোকালয়ের মধ্যে গড়ে তোলা এই হাসপাতাল সম্পর্কে শোভনের কোনও ধারণা নেই । আরও স্পষ্ট করে বললে হসপিটালের নামের সঙ্গে আজ ওর প্রথম পরিচয় ঘটল। শোভন চার পাশ দেখে হাসপাতালের অভ্যন্তরের দিকে সামান্য এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে , গাড়ির কাছে যিনি এসে দাঁড়ালেন তিনিই ডাক্তারবাবু। বয়স্ক নন তরুণ। সকলের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন স্ট্রেচারটা যতটা সম্ভব বের করে আনুন।
মলিন মোহন এগিয়ে এসেছে। বাচ্চু স্ট্রেচারের একটা হ্যান্ডেল আর অপর হ্যান্ডেলটা ধরল শোভন ।সারা শরীরের সঙ্গে বর্ণার মুখ দেখা যাচ্ছে । যন্ত্রণার দুরন্ত অভিঘাতে বদলে দ্রুত স্তব্ধ হয়ে আসছে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রুগির দেহ । ডাক্তারবাবু শায়িত বর্ণার কাছাকাছি গিয়ে হসপিটাল স্টাফ তরুণীদের নির্দেশ দিলেন পেশেন্টকে এখুনি আইসিইউতে ভর্তি করে নিতে বলুন।
হাসপাতালের কর্মিরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে এসে বর্ণাকে খুব সাবধানে নামিয়ে নিল। ওয়েটিং এরিয়ার বাঁ পাশে সিঁড়ি । সিঁড়ির পাশেই লিফ্ট । বর্ণ চলে যাওয়ার পরে মোহন ভাই ও মেয়েকে নিয়ে লিফটে উঠতেই ছিপছিপে তরুণীটি খানিকটা নির্দেশ দেওয়ার মতো বলল, আইসিইউতে সবাই ঢুকবেন না । যে কোনও একজন গিয়ে কাগজপত্রে সই করে আসবেন। ওই যে রিসেপশন কাউন্টার দেখছেন ওখান থেকে ভিজিটিং কার্ড পাবেন । নিয়মাবলী ওঁরাই বলে দেবেন ।
দীপেশকে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ , ওর বন্ধুগ্রূপের সুব্রত ফোন করে জানিয়েছিল মোহনের স্ত্রী প্রচন্ড অসুস্থ। কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । কখন ভর্তি হয়েছে কোন হাসপাতালে অসুস্থতা কতটা গভীর ও উদ্বেগজনক – এসব জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর সুব্রত দিতে পারেনি । মোহন নিশ্চয়ই কাউকে জানায়নি। জানানোর প্রয়োজন নেই মনে করলে, এমনই ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয় । ওর বন্ধুদের মধ্যে কমবেশি এমন স্বভাব কয়েকজনের আছে । তারা হয়তো ভাবে অন্যের সহায়তা নিলে নিচু হয়ে যেতে হয় । অথচ এক মুহূর্তে বন্ধুবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এমন স্বভাব।
পরদিন সকালেই মোহনকে ফোন করেছিল দীপেশ কি রে তোর মিসেসকে গতকাল হসপিটালাইজড করতে হয়েছে ? সুব্রত আমাকে জানাল ।
মোহনের সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ । কাল রাতে ।
– একবার তো জানাবি ! হাসপাতালে ভর্তি মানে বাড়িতে রেখে ট্রিটমেন্ট করার অবস্থা নয় । বর্ণার কী হয়েছে ? কোন হসপিটালে আছে ? দীপেশের গলায় গভীর উদ্বেগ ।
নির্লিপ্ত গলায় মোহন বলল , আজ বেলার দিকে কিছু রিপোর্ট আসবে । অসম্ভব শ্বাসকষ্ট নিয়ে উত্তর কলকাতার একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি ।
– প্রাইভেট মানে ? নার্সিং হোম ? দীপেশ বুঝতে পারছে না ।
এবার মোহনের গলা যেন স্বাভাবিক হয়ে এল । একটু চুপ থেকে মোহন উত্তর দিল , বড় কোনও প্রাইভেট হসপিটাল বর্ণাকে ভর্তি নিল না। সবার একই ধরণের কজ – বেড খালি নেই । শেষ কালে মানিকতলার ডক্টর এ আর মেমোরিয়াল হসপিটালে বর্ণার জায়গা হল। নার্সিং হোম বলা যাবে না । ছোট হাসপাতাল । পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । সরকারি হাসপাতালের মতো মেছো হাটা নয় ।
– এ আর সি হসপিটালে বর্ণা ভর্তি হয়েছে ! বাঃ ! দীপেশ যেন লাফিয়ে উঠল , ওখানকার বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সদের একজন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আমার দাদাভাইয়ের মতো সম্পর্ক । আমি এখুনি ওঁর সঙ্গে কথা বলছি । বর্ণার ট্রিটমেন্ট যেন পারফেক্টলি হয় । কোনও চিন্তা করিস না । যে – কোনও জায়গাতে চেনা পরিচিত কেউ থাকলে খুব সুবিধে হয় । শ্ৰীমতীকে যখন আইসিইউ-তে দিয়েছে তবে ডিজিজের ডেনসিটি তো অনেকটা । তবে মিনিমাম খরচে ম্যাক্সিমাম চিকিৎসা দেওয়াই এ আর সি মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রধান উদ্দেশ্য ।
– হুঁ, হ্যাঁ । মোহন ভারী গলায় বলল , বর্ণা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এলে আমার এই ভয়ানক উদ্বেগ শেষ হবে । মনে এতটুকু জোর পাচ্ছিনা । উপরন্তু ভীষণ ভয় করছে ।
– দূর , এইভাবে ভেঙে পড়িসনা । আমরা সবাই পাশে আছি ।
মোহনলাল কোনও উত্তর দিল না । দীপেশ কেবল একটা হতাশ্বাসের শব্দ শুনল ।
চেম্বারে বসার আগে ডাক্তার কৃষ্ণদেব মৈত্র এক বৌল ভেজিটেবল স্যুপ খেয়ে নেন।
কেননা রুগির ভিড় সামলাতে বেলায় দুপুর একটা।আর রাতে এগারোটা বেজে যায়।
বাড়ির একতলাতেই ওর চেম্বার। ক্রমশ বিরল হয়ে আসা, সহৃদয় , উদার, গরিব মানুষের অসহায়তা বুঝতে পাড়ার অন্তর যাঁদের আছে ডাক্তার মৈত্র তাঁদের মধ্যে একজন। ওঁকে দেখে অনুমান করা যায়না ডাক্তারবাবুর বয়স চুয়াত্তর। মেদহীন ঋজু, লম্বা মানুষটিকে দীপেশ অশেষ শ্রদ্ধা করে।
স্যুপ খেয়ে ডাক্তার মৈত্র নিজেকে একটু গুছিয়ে নেন। চেম্বারের কেয়ারটেকার গোপালবাবুর কাছে জেনে নেন , কতজন রুগি নাম লিখিয়ে অপেক্ষা করছেন। এই রকম একটা সন্ধিক্ষণে দীপেশ ওঁকে দরকারে – অদরকারে ফোন করে। আজ অবশ্য মোহনের স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে কথা বলবে।
ওপ্রান্ত থেকে দীপেশের গলা শুনে ডাক্তার মৈত্র মৃদু উচ্ছাসে বললেন, হ্যাঁ। দীপেশ বলো। ভালো আছো তো !
– নিশ্চয়ই ভাল আছি । আপনিই তো আমাদের সুস্থ রেখেছেন। ডাক্তার মৈত্র সজোরে হাসলেন ‘পথ ভাবে আমি দেব /রথ ভাবে আমি /মূর্তি ভাবি আমি দেব /হাসেন অন্তর্যামী ‘। তোমার খবর বলো …
দীপেশ আর সময় নষ্ট না করে মোহনের স্ত্রী সম্পর্কে যতটা জানে বলল। সেই সঙ্গে অনুরোধ জানালো দাদা আপনি এআরসি মেমোরিয়াল হাসপাতালের একজন পরিচালক শুধু নন , বলতে গেলে অভিভাবক ।… আপনি বলে দিলে হাসপাতাল স্পেশাল কেয়ার নিতে বাধ্য। আমি আপনার ওপর নির্ভর করছি। বন্ধু ভেঙে পড়েছে । টেস্ট টু ট্রিটমেন্ট এখনও শুরুই হল না, কেবল অক্সিজেন ও অন্যান্য লাইফ সাপোর্ট দিয়ে আইসিইউতে রাখা হয়েছে ।
-সে কী। এই অবস্থায় তোমার বন্ধু ভেঙে পড়ছে কেন ? হসপিটাল আর ডাক্তারদের একটু সময় দাও।
– আপনি কাল একবার রুগিকে দেখে এলে আমিও মনে জোর পাব। দীপেশ অনুনয়ের সুরে বলল, আপনাকে বিরক্ত করছি । দাদা , বুঝতেই পারছেন বন্ধুর কেস ।
জোর গলায় ডাক্তার কে ডি মৈত্র বললেন, শুধু আগামীকাল কেন , দরকার হলে আমি প্রতিদিন পেশেন্টকে দেখে আসব।… তোমার সঙ্গে কবে দেখা হবে ? এসো একদিন । বাই বাই ….
ডাক্তার মৈত্র ফোন কেটে দিলেন। দীপেশ নিশ্চিত আজ যদি রুগির সংখ্যা কম থাকে, তাহলে বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার শুরু হবার আগেই ডাক্তার মৈত্র মোহনের স্ত্রীকে দেখে আসবেন। যে- ডাক্তারের আন্ডারে বর্ণা ভর্তি আছে , তাঁর সঙ্গে ফোনে মত বিনিময় করবেন। নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ দিয়ে আসবেন অ্যাটেন্ডিং ডাক্তারকে। দীপেশ জানতে চাওয়ার আগে নিজেই হয়তো কল করবেন।
কোনও বন্ধুর সাহায্য কিংবা সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিতে দীপেশের ভারী ভালো লাগে , আনন্দ হয়। এখন কোনও অসুখ- বিসুখ মানেই একটা ভয়ার্ত টানেলের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা। মোহন যে মরমে মরে আছে , তা খুব স্বাভাবিক। বর্ণা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মোহনের পরিবার শূন্যে ভাসতে থাকবে।
গলির মুখটায় অভিরূপের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। দীপেশদা অফিস থেকে ফিরছে। ওর থেকে যারা বয়সে বড় অভিরূপ তাদের দাদা সম্বোধন করে। অভিরূপ ব্যবসা করে। বড় রাস্তায় ওদের প্লাইউডের দোকান। অফিসে সময়মতো আসা – যাওয়ার কষ্ট ব্যবসায়ীরা কিছুটা অন্তত উপলব্ধি করে , তবে পুরোটা নয়। অভিরূপ তার ব্যতিক্রম। দীপেশদের বন্ধু হিসেবে ও ভালভাবে জানে চাকরির চরিত্র যাই হোক, ছুটির দিন বাদ দিয়ে প্রত্যহ বাড়ি থেকে বেরনো ও ফিরে আসা যেন জীবন – উপন্যাসের এক একটি পাতা। প্রতিটা মুহূর্তের বিবরণ। অভিরূপ বি.কম পাশ করার পর সরকারি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলে হিসেবে বাবার চলতি ব্যবসার হাল ধরতে হল। দীপেশের মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কোনও বিরক্তি নেই ।
– তুমি তো সবই জান।… অভিরূপ ফিকে হেসে বলল , আমি গ্রূপ মিডিয়া থেকে জেনে মোহনদার সঙ্গে যোগাযোগ চেষ্টা করেও , ওকে পাইনি। তাই আজ বিকেলে সোজা হসপিটালে চলে গেলাম। গিয়ে শুনি মোহনদা বৌদিকে অন্য হসপিটালে ভর্তি করেছে ।
– তার মানে ! দীপেশ যেন এক অপ্রত্যাশিত আঘাতে মাটিতে আছড়ে পড়ল , আজ সকালেও তো মোহনের সঙ্গে কথা হল । জানাল বর্ণা ইজ রিকভারিং । যদিও খুব ধীরে । কিন্তু অন্য হাসপাতালে শিফ্ট করার কথা তো কিছু বললই না। বর্ণা যে ক’দিন আই সি ইউ-তে থাকবে সেসময় আমি যাব না , ভিড় বাড়াবো না – এত বললাম । আশ্চর্য ।
অভিরূপ একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল , বৌদি যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল , সেখানে কি তোমার কোনও ভূমিকা …. আই মিন হেল্প …..
– না, না , মোহন নিজেই সব করেছে । আমি শুধু আমার একজন শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবুকে রুগির বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তিনি ওই হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত । তুমি কি জানতে পেরেছ , মোহন ওর স্ত্রীকে কোথায় ভর্তি করেছে ? … আমার এত খারাপ লাগছে ! পেশেন্ট উইথড্র করার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে , কিন্তু সেটা একবার জানাবে না । ব্যক্তিগতভাবে আমাকে জানানোর অসুবিধে থাকলে ফ্রেন্ড সার্কেলে জানাতে পারত। এগুলো মাত্রা ছাড়া অসভ্যতা ।
– দীপেশদা , তুমি শান্ত হয়ে বাড়ি যাও। সবার আচরণ সুন্দর হওয়াটাই অস্বাভাবিক । অভিরূপ ম্লান হাসল । যেন আচমকা আগুনে দগ্ধ ও তিক্ত মুখে বাড়ি ঢুকবে দীপেশদা , পরিবারের কারও সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে পারবে না । মোহনদার মনের অবস্থা যেমনই থাক, দীপেশদাকে একটা ছোট টেক্সট মেসেজ দিতে পারত। বিপদে কেউ পাশে এসে দাঁড়ালে , তার অস্তিত্ব উপেক্ষা করা অন্যায় । অস্বীকার করা পাপ ।
স্বল্প হাত নেড়ে দীপেশ পাড়ার ক্লাবের সামনে দিয়ে বাড়ি ঢুকে এল। অতিরিক্ত সাবধানতা , প্রত্যাশা , সিদ্ধান্ত গ্রহণ যে অন্যের অবমাননার কারণ হতে পারে , মোহনের মতো মানুষরা এটা ভাবতেই পারে না। ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে । অন্যত্র ভর্তি করার কারণটা জানা কর্তব্য । পরোপকার করা , না করার জন্য জরুরি ।
না , মোহনকে ফোন করল না দীপেশ । ওর ভেতরের আবেগগ্রস্ত মানুষটা ওকে রুখে দিল। আরোগ্য নিকেতন বদলের ঘটনাটা মোহনেরই জানানো উচিত। চুল চেরা বিচারে দীপেশ কিছুই করেনি। কেবল একটা চেনা সূত্রকে কাজে লাগানোর চেষ্টাটুকু করেছে। ডাক্তার মৈত্র নিশ্চয়ই বিষয়টা জেনে গেছেন। ব্যাপারটা ভালোভাবে নিশ্চয়ই নেননি ।
গুড মর্নিং জানিয়ে দীপেশ অপরাধীর মতো সমস্ত ঘটনাটা ডাক্তার মৈত্রকে বলল। সবটা শুনেই ডাক্তারবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন , আরে এ তো হামেশাই হচ্ছে । বাড়ির লোক যদি মনে করে , এই হসপিটাল বা নার্সিং হোমে ট্রিটমেন্ট ঠিকঠাক হচ্ছে না , তাহলে তাঁরা চিকিৎসাকেন্দ্র বদলাতেই পারেন। এটা তাদের রাইট। শোন দীপেশ , রুগির প্রাণ নিয়ে তো আর ছিনিমিনি খেলা যায় না। অতএব মানুষ সাধারণ থেকে অসাধারণের পথে যাবেই । তখন মানি ফ্যাক্টরের কথাও লোকজন মনে রাখে না। ড্রপ ইট । এসব নিয়ে আমি আদৌ ভাবিনা। তুমি তোমার কাজ করেছ , আমি আমার কাজ করেছি । ব্যস । হিয়ার দ্য ম্যাটার ইজ ফিনিশড ।
তিনদিন পরে, রবিবার সকাল এগারোটা নাগাদ মোহনের কল ঢুকল দীপেশের মোবাইলে। যেন অজানা নম্বর থেকে কেউ ফোন করছে এমন বিরক্তি ঝরিয়ে দীপেশ হ্যালো বলল ।
– আমি মোহন বলছি ।… তুই নিশ্চয়ই এতদিনে জেনে গেছিস বর্ণাকে বাধ্য হয়ে আলিপুরের এক প্রাইভেট হসপিটালে ভর্তি করতে হল ।
একটু চুপ করে থেকে দীপেশ নিস্পৃহ স্বরে বলল , শুনেছি । সুব্রত জানিয়েছে ।
– বর্ণাকে শিফ্ট করতে বাধ্য হয়েছিলাম রে । তুই হয়তো ক্ষুব্ধ । কিন্তু অন্য কোনও উপায় ছিল না। অ্যাডমিশনের আড়াই দিনের শুরুতে হাসপাতাল থেকে ফোন এল আপনি বেলা দশটার মধ্যে চলে আসুন । পেশেন্ট আমাদের সঙ্গে কোঅপারেশন করছেন না । সব ফোনে বলা যাবে না । আই সি ইউ-তে থাকা অন্য রুগিদের অসুবিধে হচ্ছে ।
… মেয়েকে নিয়ে আমি দৌড়লাম । নিজের চেম্বারে বসিয়ে চিফ মেট্রন বেশ কিছু অভিযোগ করলেন। এও জানালেন , বর্ণার লাংসে স্প্যাজম ছাড়া অন্যান্য রিপোর্ট নর্মাল। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার , নার্সদের বা স্টাফদের যখনই কিছু জিজ্ঞেস করেছি , স্পষ্ট কিছু উত্তর পাইনি। আমি বর্ণার কাছে যাওয়ার পারমিশন পেয়েই ওপরে গেলাম । অক্সিজেন মাস্ক পরানো বর্ণা আমাকে স্থির চোখে দেখছিল। ওর দু’ চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তেই আমি চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলাম , কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার ? বর্ণা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলেছে , তুমি এখান থেকে আমাকে নিয়ে চল । আর একদিন থাকলেই আমি মরে যাব। এখানকার নার্সরা অক্সিজেন মাস্ক ঠিক করে পরাতে পারে না । লাগছে বললে স্বান্ত্বনা দেয় না , উল্টে মুখ করে। না, না আমি এখানে থাকতে পারছিনা । নিয়ে চলো …
হসপিটালের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে বর্ণাকে আলিপুরের মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছি। উত্তর কলকাতার হাসপাতালের কথা আমি ভুলে যেতে চাই ।
– ঠিকই তো , ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা বাজে জেনে মিসেসকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী বা করার ছিল ! সস্তার চিকিৎসা এর চেয়ে ভাল হবে কী করে ? তবে বর্ণাকে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টায় এ আর সি মেমোরিয়াল বাঁচিয়ে রেখেছিল। ফলে বর্ণা আরও উঁচু দরের ব্যবস্থায় যেতে পেরেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরবে। …. এই অবদান টুকু ভুলিস না ।
শেয়ার করুন :





