সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ডাক্তারবাবু। নামের পাশে লাইন তিনেক তাঁর ডিগ্রির ফিরিস্তি। ইংরিজি বর্ণমালার সবকটাই সেই মালায় বোধ হয় মালায়িত। গোটা বিশ্ব হতে আহরিত বিচিত্র সব উপাধি । মানব শরীরের অলিতে গলিতে গুপ্তঘাতকদের সমস্ত ষড়যন্ত্রের প্রয়াস তিনি এক লহমায় ধরে ফেলেন। অনেক সময় রুগীকে স্পর্শ করারও প্রয়োজন বোধ করেন না। অনেকটা এই রকম আড়চোখে এক পলক তাকালেই সুন্দরীর মোহনী মূর্তিতে মোহিত, সিস্সিরে ধোঁয়াই গরম জলের পরিচয়, ছানাবড়ার মতো গোল গোল দুটি চোখ গৃহিনীর মেজাজের প্রকাশক। পেরেকের মতো বিদ্ধকারী দৃষ্টিতে বড় কর্তা বুঝিয়ে দেন ছাঁটাই আসন্ন । সপরিবারে পথে নামার দিন আগত। যেন মা মনসার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, নকশাদার একটি সর্প, রেডি ফর এ ছোবল। খুব স্বপ্ন দেখেছিলে, দেখিয়েছিলে ফানুস বাতাসে দুলতে, দুলতে ক্রমশ ওপর দিকে উঠছে। অহঙ্কারী মানুষেরই উপমা। পেটে ভরা আগুন, যেন জঠরাগ্নি! তারপর ? ফানুসের নিয়তি মানুষের মতোই। জীবনের আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাক্। মরে গেলে খাটে তুলে খই আর কর্ণ কটূ নানা শব্দ ছড়াতে ছড়াতে শ্মশানের ‘এগজিট পয়েন্টে’ নিয়ে যেতে যেতে সবাই ভাবে – ব্যাটা, আর কিছু বলবে না, শুনবে না, দেখবে না, দেখাবে না —ভাবনাটা মন্দ নয়, তবে ঠিক কি-না কে বলতে পারে! দেখা যাক, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স আর একটু ইনটেলিজেন্ট হলে, কি দিশা দেখায় !
সেকেলে অফিসে বড়বাবু ‘রিটায়ার’ করলে টেবিল-চেয়ার সরিয়ে ‘ফেয়ার ওয়েলের’ ব্যবস্থা হত, নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে । একালে তো রিটায়ার হয় না, হয় ছাটাই’। এই গানটি জাতীয় সঙ্গীতের পর্যায়ে চলে যেতে পারে, ‘মার ঝাড়ু, মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর।’ সেই ‘ফেয়ার ওয়েলে’ এই জাতীয় করুণ দৃশ্য দেখা যেত, করুণ তো হবেই। এ তো মা দুর্গার বিদায় উৎসব নয়, ‘আসছে বছর আবার হবে’। মানুষটিকে এই প্রতিষ্ঠানের ত্রিসীমানায় আর দেখা যাবে না । কোথাও যেন এক বাসস্থান ছিল- স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, প্রবীণা মা। ছাতে তুলসী গাছে। বাড়ির পেছনে ডোবা । শরতের শালুক, ঝরা শিউলি। পৃথিবীর অনেক সম্পদের মধ্যে এই সামান্যই তাঁর অধিকার, এবং সন্তুষ্ট । বাকিটা স্বপ্ন দিয়ে পূরণ করতেন। এই পথ সকলের জন্য খোলা । দূর দূর বহুদূরে চলে যাওয়া যায়। সেকালের আটপৌরে প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের একটি পরিবার গড়ে উঠত। গোবরডাঙার গোস্বামী, ঘুঘুডাঙ্গার ঘোষদা, নিমতার নিত্য । একদল মধ্যবিত্ত । কারোরই আকাশ ছোঁয়া আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকত না । নিতান্তই পারিবারিক । স্ত্রী-নির্ভর । পুত্র, কন্যা, পিতা মাতা, আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত, কর্তব্য নিষ্ট, সেন্ট পারসেন্ট বাঙালি । মোটা লোমশ তোয়ালে নয়, গামছাই স্নানের সঙ্গী । তোয়ালে শুকোতে মাস খানেক সময় লাগে, তারপর ভাগাড়ের গন্ধ ছাড়ে। ফুর ফুরে গামছা রোদ আর বাতাস পেলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে শুকিয়ে যায়। কোমরে জড়ানো যায় ৷ সিকিউরিটির সমস্যা নেই। এমার্জেনসির সময় গায়ে একটি গামছা চাপিয়ে পাড়ার মুদিখানা থেকে পাচফোড়ন কিনে এনে রান্নাঘরের শান্তি বজায় রাখা যায় । গামছা মধ্যবিত্ত বাঙালির দীর্ঘকালের বিশ্বস্ত বন্ধু। অতীতে বাঙালি পরিবার বাড়িতে বাস করত। প্রবীণ জানালা দরজা বৃদ্ধ, বৃদ্ধার কুঞ্চিত ত্বকের মতো কাঠের চেহারা । অবশ্যই ঘাত সহ সেগুন কাঠে তৈরি পিতা, পিতামহের কালে । তিন পুরুষের জীবন যুদ্ধের সাক্ষী, । তারে ঝুলছে বির্বণ কয়েকটি বাদি পোতার গামছা । বাঙালির ট্রেডমার্ক । সেকালের পাওনাদাররা গলায় গামছা দিয়ে পাওনা আদায়ের কথা বলতেন । সাহিত্যে এ মত আছে, ‘মুকুজ্যে মশাই লজ্জায় গামছায় মুখ ঢাকলেন।’ বর্ষার গঙ্গায় কাকাবাবু স্নান করতে গিয়েছিলেন। গামছা দিয়ে তিনটে ট্যাংরা মাছ ধরে এনেছেন। পারিবারিক ঝগড়ায় গামছার ভীতিপ্রদ ভূমিকা ছিল । অভিমানী বলছে,‘ যেদিন গলায় গামছা দিয়ে ঝুলে পড়ব সেদিন বুঝবে মজা।’ হংস শুভ্র ‘টার্কিশ টাওয়েলের’ পাঁচতারা মর্যাদা। তেল মেখে, গামছা দিয়ে গা রগড়ে স্নান ছিল বাঙালির অন্যতম কালচার। যেমন অন্য আর এক জাতির কালচার, পান খেয়ে প্যাচাত করে দেয়ালে পিক ফেলা। প্রহরা না থাকলে মাসখানেকের মধ্যে তাজমহলটাকেও লালে লাল করে দেওয়া যেত। কোন প্রখ্যাত সাহিত্যিক লিখেছিলেন, ‘যৌবন জল তরঙ্গ রোধিবে কে?’ ফোলা ফোলা গাল দুটো আরো ফুলে আছে, কারন মুখ গহ্বরে দুখিলি পান, যেন ‘অরুন, বরুণ, তারই কিরণ মালা ‘’প্যাচাত’’, লালে লাল। বহুতলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল, খিচুড়ি কালচার। ঘোড়েল, কোয়েল, দফাদার, রফাদার, পাঁচ ইঞ্চি, দশ ইঞ্চি দেয়ালের ব্যবধানে কাল যাপন। কে, কি করেন বলা কঠিন। লিফ্টে ওঠা নামা। নির্জন সিঁড়ি বিরহিনীর মতো একপাশে, পাকে পাকে উর্ধগামী। কদাচিৎ পায়ের স্পর্শ পায়। খাঁজে, খন্দে একা বৃদ্ধ, একা বৃদ্ধা, হঠাৎ কেউ আবিষ্কার করে চমকে উঠতে পারেন। পুরনো ক্যালেণ্ডার এখনো দেয়ালে ঝুলছে! আকাশের গায়ে একটি খাচায় নিঃসঙ্গ চন্দনা। কবে কেউ ভিজে ছোলা দিয়েছিল, কল বেরিয়েছে, জলের পাত্রে জল নেই, সাদা একটি দাগ । ওদিকে কত জল, মেঘ ভাঙা বৃষ্টি । জল শয্যায় ভাঙা সেতু পাশ বালিশের মতো পড়ে আছে।
কোথায় সেই মাটির উঠান, চওড়া দাওয়া, তুলসী মঞ্চ, সন্ধ্যার দীপ, শাঁক কেন বাজে না ! প্রবীণার কন্ঠস্বর কেন আসে না কানে। ‘ বউমা কোথায় গেলে ? এলোচুলে সন্ধে বেলায় বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ঝাঁকড়া বেল গাছে কাকের বাসা।।গভীর রাতে রহস্যময় কে যেন আসে। গম্ভীর এক পুরুষ। ‘দিদা ! কে গো সে ?’
ডাক্তারবাবুর কন্ঠস্বর কানে এল, ‘কি হল কি? তখন থেকে মিশরের মমির মতো শুয়ে আছেন, একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছেন না !’
‘ আমাকে উঠে বসতে দিন, তার পর বলছি।’
‘হ্যাঁ এইবার বলুন।’
‘তলপেট ফুলে আছে কেন ?’
‘অনেক কথা ওখানে জমে আছে ডক্টর সাব। কোষ্টকঠিন্যের মতো কথা কঠিন্যে অতীত আটকে আছে।’
‘মরণ দশা !’
‘অ্যায় ! ডাক্তার সাহাব আপনার মধ্যে আমার দিদিমা আটকে আছেন। এই কথাটি দিনে রাতে বার দশেক বলতেন।’
‘আপনি একজন নিউরোর কাছে যান।’
‘না, আমি যাবো সেই ডেন্টুর কাছে । যিনি আমার আক্কেল দাঁতটি উৎপাটিত করে ছিলেন- গিভ মি ব্যাক মাই উইজডাম টুথ’।
শেয়ার করুন :





