বাংলার কালীবাড়ি ইতিকথা -

বাংলার কালীবাড়ি ইতিকথা

ঐতিহ্যমণ্ডিত ও জাগ্রত সাধনপীঠ।

বাংলার এমন ৫টি মহিমান্বিত ও স্নিগ্ধ কালীপীঠের গল্প, যা নীরবে শতকের পর শতক   ধারণ করে চলেছে অগনিত ভক্তের চিরন্তন বিশ্বাস, অপার শ্রদ্ধা এবং পরম আকুতি। যেকোনো বাহ্যিক আড়ম্বর বা কোলাহলের বাইরে দাঁড়িয়ে এই পবিত্র সাধনপীঠগুলি যুগের পর যুগ ধরে নিভৃতে বিলিয়ে চলেছে মায়ের অমৃত আশিস। এই মন্দিরগুলির প্রতিটি ইঁট- বাতাসে জড়িয়ে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ, যা আজও প্রতি কালীপুজোর অমাবস্যায় শত শত আকুল প্রাণকে টেনে আনে মায়ের অভয় চরণে। আসুন, এক নজরে চিনে নেওয়া যাক বাংলার তেমনই ঐতিহ্যমণ্ডিত ও জাগ্রত ৫টি কালীবাড়ি: 

বড়িশা সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির (বেহালা)-কলকাতা শহরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কালীপীঠ হলো বড়িশার সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির। মধ্যযুগে এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘বড়শে বহুলা’, যা কালক্রমে লোকমুখে ‘বড়িশা’ নাম ধারণ করে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: মন্দিরের গায়ে খোদাই করা তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলা ১১৭০ বঙ্গাব্দে (অষ্টাদশ শতক) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে মূল মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে তা নবকলেবরে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ঐতিহ্য ও মধ্যযুগের তান্ত্রিক সাধনার সঙ্গে এই মন্দিরের গভীর ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে।

বিগ্রহ ও বিশেষত্ব: মন্দিরের গর্ভগৃহে মা সিদ্ধেশ্বরীর শ্যামলা বর্ণ রূপ পূজিত হন। এছাড়া একই গর্ভগৃহে ষষ্ঠীদেবী, শীতলাদেবী, চণ্ডীদেবী ও মনসাদেবী—এই চার দেবীর বিগ্রহও একসঙ্গে বিরাজমান, যা সচরাচর অন্য কোনো কালী মন্দিরে দেখা যায় না।

পূজা ও উৎসব: প্রতি বছর এই মন্দিরে মূলত তিনটি প্রধান উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালিত হয়-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজা, কার্তিক মাসে দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা। প্রতিদিন ঐতিহ্যবাহী নিয়ম মেনে মায়ের নিত্যপূজা ও ভোগ নিবেদন করা হয়।

কঙ্কালীতলা শক্তিপীঠ (শান্তিনিকেতন)- বীরভূমের কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত কঙ্কালীতলা ৫২ সতীপীঠের অন্যতম এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। জনশ্রুতি  ১৭০৩সালে তান্ত্রিক উদয় নারায়ণ ব্রহ্মচারী দ্বারা স্থাপিত।

পৌরাণিক ইতিহাস ও নামকরণ-সতীর দেহাংশ পতন: দক্ষযজ্ঞে পতির অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতি দেহত্যাগ করেন। শোকাতুর মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে যখন প্রলয় নৃত্য শুরু করেন, তখন মহাবিশ্বকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে দেন। এই স্থানে সতীর কোমরের অংশ বা কঙ্কাল পড়েছিল।

চৈতন্যপীঠ: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কঙ্কালীতলাতেই সতীর দেহের সর্বশেষ অংশটি পতিত হয়েছিল এবং এর পরেই মহাদেবের মোহভঙ্গ বা চৈতন্য ফিরে আসে। এই কারণে এই পবিত্র স্থানকে ‘চৈতন্যপীঠ’-ও বলা হয়।

 দেবী ও ভৈরব: তন্ত্রচূড়ামণি ও পীঠনির্ণয় তন্ত্র অনুসারে, এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ‘দেবগর্ভা’ (মতান্তরে বেদগর্ভা) এবং তাঁর রক্ষক বা ভৈরব হলেন মহাদেব ‘রুরু’। কবি ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে লিখেছেন— “কাঞ্চীদেশে পড়িল কাঁকলি অভিরাম / বেদগর্ভা দেবতা ভৈরব রুরু নাম।”

অলৌকিক সতীকুণ্ডের রহস্য-কঙ্কালীতলা মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর পাশে থাকা পবিত্র জলাশয় বা সতীকুণ্ড।প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই কুণ্ডের জলভাগের ঈশান কোণেই দেবীর দেহাংশ নিমজ্জিত রয়েছে।কুণ্ডের জল তীব্র খরার সময়েও কখনো শুকিয়ে যায় না।প্রতি ১২ বা ২০ বছর অন্তর তান্ত্রিক ও সাধকদের দ্বারা অত্যন্ত গোপনে এই পাথরগুলি জল থেকে তুলে পুজো করা হয় এবং পুনরায় তা কুণ্ডে নিমজ্জিত করে দেওয়া হয়।

সর্বমঙ্গলা মন্দির (বর্ধমান)- পূর্ব বর্ধমান জেলার ঐতিহাসিক শহর বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের আমল থেকে এই মন্দিরের খ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে। এখানকার দেবী ‘সর্বমঙ্গলা’ মূলত উগ্রচণ্ডা বা কালী রূপেই ভক্তদের কাছে পূজিতা হন। বহু পুরনো এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবারের নানা ইতিহাস ও অলৌকিক কাহিনী। প্রচলিত আছে যে, দেবী স্বয়ং স্বপ্নাদেশ দিয়ে এই মূর্তি প্রকাশ করেছিলেন। মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রাচীন কষ্টিপাথরের মূর্তিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রতিদিন শত শত ভক্তের সমাগম ঘটে এখানে, আর তান্ত্রিক মতে পুজো দেওয়ার জন্য এই মন্দিরের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।

কৃপাময়ী কালীবাড়ি (বরানগর জয় মিত্র কালীবাড়ি)-উত্তর কলকাতার বরানগরে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত কৃপাময়ী কালীবাড়ি (যা স্থানীয়ভাবে জয় মিত্র কালীবাড়ি নামে খ্যাত) বাংলার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক সাধনাপীঠ। ১৮৪৮ সালে বিশিষ্ট জমিদার জয়রাম মিত্র এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর নাম রাখা হয় ‘কৃপাময়ী’, যিনি মূল গর্ভগৃহে শ্রী শ্রী আনন্দময়ী দক্ষিণাকালী রূপে বিরাজমান।এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হলো এর সুদৃশ্য ১২টি শিব মন্দির সমন্বিত ঐতিহ্যবাহী বাংলা স্থাপত্যকলা এবং শান্ত নদী তীরের পরিবেশ। কথিত আছে, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এখানে একাধিকবার এসেছিলেন এবং সাধনা করেছেন। কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি বা ট্রাস্টের ক্ষমতার চেয়েও সাধারণ ভক্তদের অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই বহু দশক ধরে এই মন্দিরের পুজো ও উৎসব পরিচালিত হয়ে আসছে। কার্তিক মাসের শ্যামাপূজা ও নিত্য ভোগে প্রতি অমাবস্যায় এখানে বহু ভক্তের সমাগম ঘটে।

রামেশ্বরপুর কালীবাড়ি –  দক্ষিণ চাট্টা কালকাপুকুর, চট্টা রামেশ্বরপুর, কলকাতা – ৭০০১৪১।: এটি মহেশতলা বা বজবজ অঞ্চলের কাছাকাছি এবং চাট্টা রামেশ্বরপুর পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্গত। গ্রামীণ বাংলার এক অন্যতম বিখ্যাত ও জাগ্রত কালীপীঠ হলো এই রামেশ্বরপুর কালীবাড়ি। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এই মন্দিরের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ মনকে শান্তি দেয়। বহু বছর আগে কয়েকজন সাধক এখানে গোপনে তন্ত্রসাধনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এই স্থানটি একটি পূর্ণাঙ্গ মন্দিরে রূপ নেয়। এখানকার মা কালী অত্যন্ত জাগ্রত বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। দীপাবলি ও কালীপূজার দিন এখানে মেলা বসে এবং হাজার হাজার মানুষ মায়ের কৃপা লাভের আশায় ভিড় জমান।

তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র- দীপ্তিময় রায়, এসেন্সিয়াল হিন্দুইজম অ্যান্ড জার্নাল অফ বৈষ্ণব স্টাডিস -স্টিভেন.জে. রোসেন। হিষ্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচার- দীনেশ চন্দ্র সেন।      

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *