ভাইফোঁটার নেপথ্যকথা -

ভাইফোঁটার নেপথ্যকথা

পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার এবং সামাজিক ঐতিহ্য।

বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজোর পর যে পার্বণটি পারিবারিক আনন্দ ও আবেগের এক বিশেষ আবহ তৈরি করে, তা হল ভাইফোঁটা। ভাই-বোনের চিরন্তন স্নেহ, ভালোবাসা ও মঙ্গলকামনার এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্য। বাংলায় যা ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া নামে পরিচিত, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তা ভাইদুজ, ভাইদূজ, ভাইবিজ কিংবা যমদ্বিতীয়া নামে পালিত হয়। নেপালে উৎসবটির নাম ভাইটিকা।

পৌরাণিক উৎস ও যম-যমুনার কাহিনি

ভাইফোঁটার উৎস সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনিটি যমরাজ ও তাঁর বোন যমুনাকে ঘিরে। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, সূর্যদেব ও সংজ্ঞার সন্তান যম এবং যমুনা। তাঁরা ছিলেন ভাই-বোন। কথিত আছে, দীর্ঘদিন পর একবার যমরাজ তাঁর বোন যমুনার বাড়িতে আসেন। ভাইকে কাছে পেয়ে যমুনা অত্যন্ত আনন্দিত হন। সাদরে তাঁকে আপ্যায়ন করেন, নানা সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করেন এবং তাঁর কপালে তিলক বা ফোঁটা দিয়ে দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন।

বোনের আতিথেয়তা ও ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে যমরাজ তাঁকে বর দিতে চান। যমুনা প্রার্থনা করেন, প্রতিবছর এই বিশেষ দিনে যে বোন তার ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ফোঁটা দেবে, তার ভাই যেন দীর্ঘায়ু লাভ করে। যমরাজ সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। এই পৌরাণিক বিশ্বাস থেকেই কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথি যমদ্বিতীয়া নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীকালে এই তিথিই ভাইফোঁটার উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে লোকবিশ্বাস।

আর একটি প্রচলিত কাহিনিতে রয়েছে, নরকাসুরকে বধ করে শ্রীকৃষ্ণ যখন দ্বারকায় ফিরে আসেন, তখন তাঁর বোন সুভদ্রা তাঁকে ফোঁটা দিয়ে স্বাগত জানান এবং মিষ্টিমুখ করান। এই ঘটনাকেও ভাইফোঁটার উৎসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের যোগ

ভাইফোঁটার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সূচনাকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাই এর প্রচলন ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে যম ও যমীর উল্লেখ ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম সূক্তে পাওয়া যায়। সেখানে তাঁদের কথোপকথন রয়েছে। যদিও এই বৈদিক সূক্তে ভাইফোঁটার অনুষ্ঠানের উল্লেখ নেই, তবু যম-যমুনা সম্পর্কিত পরবর্তী পৌরাণিক আখ্যানের প্রাচীন সাংস্কৃতিক পটভূমি বুঝতে এই উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ভবিষ্যপুরাণের উত্তরপর্বে যমদ্বিতীয়া ব্রতের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে যমুনার গৃহে যমের ভোজন এবং বোনের আতিথেয়তার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত আচার ও বিশ্বাসের শাস্ত্রীয় ভিত্তিও রয়েছে।

বাংলার নিজস্ব লোকাচার

বাংলায় ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান সাধারণত কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে পালিত হয়। কোথাও কোথাও প্রথমা তিথিতেও ফোঁটা দেওয়ার রীতি রয়েছে। বোন স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে ভাইকে আসনে বসান। চন্দন, দই, কাজল প্রভৃতি দিয়ে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেন। ধান-দূর্বা, প্রদীপ, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় অনুষ্ঠান। প্রচলিত ছড়াটি হল, ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।’ এই ছড়ার মধ্যেই রয়েছে ভাইয়ের অমঙ্গল ও মৃত্যুকে দূরে রাখার এক আন্তরিক কামনা।

ফোঁটা দেওয়ার পর ভাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। বাড়িতে আয়োজন করা হয় বিশেষ ভোজের। ভাইও বোনকে উপহার দিয়ে তার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বের প্রকাশ ঘটান।

দেশজ সংস্কৃতিতে উৎসবের বিস্তার

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসবের রীতিতে বৈচিত্র্য রয়েছে। উত্তর ভারতে ভাইদুজে বোনেরা ভাইয়ের কপালে তিলক দিয়ে আরতি করেন। মহারাষ্ট্র ও গোয়ায় এটি ভাইবিজ বা ভাইবীজ নামে পরিচিত। নেপালে পাঁচ দিনব্যাপী তিহার উৎসবের শেষ পর্বে পালিত হয় ভাইটিকা। কোথাও ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা, কোথাও বোনের মঙ্গল ও পারস্পরিক আশীর্বাদ—উৎসবের মূল সুর কিন্তু একই।

সময়ের সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গড়ে উঠেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা। তবু ভাইফোঁটার আবেদন কমেনি। বরং দূরত্ব পেরিয়ে ভাই-বোনের মিলন, উপহার বিনিময়, স্মৃতিচারণ এবং পারিবারিক আনন্দের মধ্য দিয়ে উৎসবটি আজও বাঙালির জীবনে বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে। আসলে ভাইফোঁটা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক মঙ্গলকামনার এক আন্তরিক সামাজিক উদ্‌যাপন।

তথ্যসূত্র :

ঋগ্বেদ, দশম মণ্ডল, দশম সূক্ত — যম ও যমীর কথোপকথন।

ভবিষ্যপুরাণ, উত্তরপর্ব, যমদ্বিতীয়া ব্রত — যম ও যমুনার কাহিনি।

 ভারতীয় জনগণনা দপ্তরের ১৯৬১ সালের ভিলেজ সার্ভে মনোগ্রাফস – ভাইদুজের আঞ্চলিক প্রথা ও লোকবিশ্বাস।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *