যাদের ফেরা হয়নি কোথাও -

ছবি- শুভেন্দু সরকার

যাদের ফেরা হয়নি কোথাও

কথা মাঝপথে থামিয়ে উপরের পাটির দাঁত দিয়ে অধর সামান্য চেপে ধরে বলেছিল, ‘কেন, তোমাদের স্কুলের পত্রিকা আমি পড়তে পারি না?’…

সায়ন্তন ঠাকুর

আর রোদ্দুরে রোদ্দুরে উথলে উঠত আকাশ। ওই যে গান আছে না—‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’, পরমুহূর্তে ঠিক এক কি দুই সেকেন্ডের ক্ষণিক বিরতির পর আবার, ‘দেখি নাই কভু, দেখি নাই, এমন তরণী বাওয়া’; তখন এই দুই পঙক্তির মাঝখানে যে রৌদ্র ও অমলিন মেঘছায়ার কাহিনি গড়ে ওঠে, অবিকল তেমন আলো প্রেমে, আরও প্রেমে হারিয়ে যেত নীলিমায়! ওই বিরতি সবার গলায় কিন্তু রৌদ্র হয় না, তাঁর কণ্ঠ বরষা শেষের আকাশকে ধুয়ে মুছে তকতকে করে তুলত, বাতাসে মিশিয়ে দিত মিহিন আতর আর পুরাতন ভাঙা বাড়ির জংলা বাগানে একপাশে সবার অলক্ষ্যে হেলে-পড়া পাঁচিলে ভর দিয়ে বেঁচে থাকা অপরাজিতা লতা থেকে ঝরে পড়ত গাঢ় বেগনে-রঙা ফুল, অবিরল। লোকটির নাম অমিয় মুকুজ্জে, লোকে বলে ওমিয়বাবু। শরিকি বাড়ির পেছনের অংশে একদিকে দেড়খানি হতদরিদ্র ঘর, চলকা-ওঠা লাল বারান্দা, উঠোন, একফালি কলঘর নিয়েই ছিল ওমিয়বাবুর সংসার, সংসার মানে পরিবার-পুত্র নয়, একা মানুষের নিরালম্ব গেরস্থালি।

আজ থেকে আঠাশ ত্রিশ বছর আগে উত্তর বাংলার মিজমিজে সেই মফফ্‌সলে তিনি ছিলেন গানের মাস্টারমশাই, ছাত্র-ছাত্রী যে খুব আসত তেমনটা নয়, ওই দু’চারজন, শনি রবিবার সকালের দিকেই আসত তারা। তেমনই এক শনিবার আমি ওই বাড়ির সামনে পড়ে থাকা নিঝুম গলিপথে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় শুনলাম ভেসে আসছে বিরতিসহ ‘এমনও তরণী বাওয়া’।

গলির পাশেই ওমিয়বাবুদের শরিকি বাড়ির পেছন-পাঁচিল, সেইখানে হেলান দিয়ে অপরাজিতা লতা থেকে তখন খসে পড়ছে আহ্লাদি সব বেগনে ফুল। খুব বেশি হলে সকাল সাতটা কি সাড়ে সাতটা, উত্তর বাংলার প্রবাদপ্রতিম বর্ষা আসি আসি বলেও দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও তার পিরিত স্তিমিত হওয়ায় আকাশ ঝলমলে, কিশোরীর দুই-বিনুনির মতন উচ্ছ্বল খণ্ড মেঘেদের গায়ে সাদা নতুন জামা, পুবদিক থেকে আসা শারদীয়া আলোয় জগত যেন রূপনগরের হাট থেকে সদ্য কিনে আনা মনমুকুর।

সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, অপেক্ষা করছি কখন তরণীর পিছু পিছু আসে ‘কোন্‌ সুদূরের ধন’, এক মিনিট দুই মিনিট কিন্তু সে আর আসে না, ওমিয়বাবুর নৌকো ঘাটেই আটকে পড়েছে কারণ গলা মিলিয়েছে একটি কিশোরী! যথারীতি সুর ভুল করায় গান থামিয়ে ওমিয়বাবু বলছেন, ‘এমুনডা হইলে তুমার গান হইব না, বারবার বলতাসি এমনো-ও-ও, এমনো-ও-ও, কোমল কোমল, কোমল নি এইখানডায়, বুঝতাসো না ক্যান? তোমার তো শুনি অঙ্কে খুব মাতা, তা এইডাও তো অঙ্ক, নাও, ধরো দেহি আমার সাথে’।

কিশোরীর নাম আমি জানি, শবনম্‌, ভুটুর দিদি, আমাদের ক্লাসেই পড়ে, সামনের বছর আমাদের উচ্চমাধ্যমিক কিনা, তাই বায়োলজি মাস্টারমশাই সঞ্জয় চক্রবর্তী স্যারের সন্ধের ব্যাচে সদ্য ভর্তি হয়েছে। বায়োলজিতে খুব একটা ভালো নয়, সেই কারণেই আমাদের ইস্কুলের সঞ্জয় স্যারের কাছে আসা, ওঁর কাছে পড়ে এই মফফ্‌সলে প্রায় সবাই উচ্চমাধ্যমিকে লেটার না পেলেও একশো কুড়ি-তিরিশ নম্বর পায়, একেবারে ধরাবাঁধা, এমনই ভালো পড়ান। শবনম্‌দের ইস্কুলও বেশ নামকরা—বার্লো গার্লস হাই ইস্কুল, মহানন্দা যেতে ডান হাতে পড়ে, ওই দিকে ইস্কুল ছুটির পর আমাদের সাইকেলগুলি কী জানি এক অজানা কারণে প্রায়শই পথ ভুল করে চলে যায়!

এখানে অবশ্য তেমন কিছু হয়নি, আমি প্রতিদিনই যাতায়াতের পথে এই বাড়ির সামনে একটু থামি, শনি-রবিবার বাদে গানের ইস্কুল না থাকলেও ওমিয়বাবু একা একাই সকাল কি নিভু সন্ধ্যায় হারমোনিয়াম নিয়ে বসেন, গানের কথা ও সুর তখন মধুমাসে শালফুলের রেণুর মতন বাতাসে আপনমনে ভেসে বেড়ায়। আজ জরাজীর্ণ পাঁচিলের ফাটলের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে লকলকে আগাছা, কচু আর বনতুলসী গাছে ভরে আছে মুকুজ্জেদের কবেকার বাগান, দিনের প্রথম রাঙা আলোয় থলকমল গাছের মাথায় একলা বসে আছে বসন্তবৌরী পাখি, কয়েকটা ঘুঘু পুরাতন ভিটা থেকে এই সকালেও একটানা মন্দ্র ও করুণ স্বরে ডেকে চলেছে। শবনমের ছুটি হবে কিছুক্ষণ পর, গাঢ় নীল সাইকেল চালিয়ে তারপর সে চলে যাবে এই শহরের আরও উত্তরে, তখন তাকে দেখাবে একটি উজ্জ্বল স্মৃতির মতন—কালো লং স্কার্ট সাদা ব্লাউজ, ফিনফিনে নাক, ঘাড় অবধি কাটা বুনো ঘোড়ার কেশরের মতন ঘন রেশমী বাদামী চুলে সে নিজেই যেন এই শান্ত মফফ্‌সলের একটি তীব্র পলাশ ফুল।

দু’একবার মাত্র কথা হয়েছে, দিন কয়েক আগে সন্ধেয় বায়োলজি টিউশন পড়ে বেরিয়ে আসার সময় স্যারের বাড়ির গলির মুখে সাইকেল থামিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল, ‘লেখাটা খুব ভালো হয়েছে কিন্তু!’

সবার সামনে থতমত খেয়ে অবাক গলায় শুধিয়েছিলাম, ‘কোন্‌ লেখা?’

‘ইস্কুল ম্যাগাজিনের লেখাটা! পিয়ের দ্য ফার্মাকে নিয়ে, ভালো হয়েছে!’

‘আমাদের ইস্কুলের ম্যাগাজিন? সেটা তোমার মানে তোর কাছে’

কথা মাঝপথে থামিয়ে উপরের পাটির দাঁত দিয়ে অধর সামান্য চেপে ধরে বলেছিল, ‘কেন, তোমাদের স্কুলের পত্রিকা আমি পড়তে পারি না?’

হলদে ল্যাম্পপোষ্টের ঝুঁঝকি আলোয় চেনা গলি তখন ছায়ার আপন সহোদরা, রহস্যময়ী যৌবনবতী; মাথার উপর শরতের নির্মেঘ আকাশে ভেসে চলেছে খণ্ডমেঘ, যেন বা দূর কোনও দেশের যাত্রী, ঝিমিঝিম বাতাসে রাত-মাধবীর সুবাস; উত্তর না দিতে পেরে ফ্যাকাশে হাসায় ঈষৎ কৌতুকের স্বরে বলল, ‘অনিন্দ্যদা তোমাকে একটা বই দিতে বলেছে!’

অনিন্দ্যদা মানে, অনিন্দ্য পুরকায়স্থ, আমাদের ইস্কুলে সদ্য জয়েন করেছেন। ইংরাজির মাস্টারমশাই, একেবারেই অল্পবয়সী বলে আমরা সবাই স্যর বলি না, তিনিই অবশ্য এমন বলেছেন। কিন্তু অনিন্দ্যদা বই দিতে বলেছে শবনমকে…মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমাকে? অনিন্দ্যদা?’

‘হ্যাঁ! বলল তো, আমার পড়া হয়ে গেলে তোমাকে দিতে, তুমি নাকি পড়তে চেয়েছিলে!’

মনে পড়ল ক’দিন আগে একটা কবিতার বই অনিন্দ্য’দার কাছে চেয়েছিলাম বটে, কিন্তু সেটা ওকে দিতে বলবে কেন? আশ্চর্য!

আমাকে চুপ থাকতে দেখে ফের বলল, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি! পড়তে চেয়েছিলে তুমি। পরেরদিন নিয়ে আসব, আর একটু পড়া বাকি আছে, নিয়ে যেও।’, বলেই আর না দাঁড়িয়ে সাইকেলে উঠে প্যাডেলে চাপ দিল, এক পা এগিয়ে কী মনে হওয়ায় মুখ ফিরিয়ে একবার হাসল শুধু! হতবাক আমি ম্লান বিস্রস্ত আলোয় খেয়াল করলাম শবনমের একটি গজ-দাঁত আছে আর হাসলে সেটি কোনও মুদ্রাদোষের মতনই তাকে কিশোরী থেকে আকস্মিক যুবতি করে তোলে।

সেই বই পেলাম আরও কিছুদিন পর, তখন আমাদের ছোট্ট শহরে ঝমঝম শব্দে পুজো বেজে উঠেছে। সেবার মনে আছে, এই বছরের মতনই শেষ আশ্বিনে পুজো; বাংলার উত্তরদিকের চৌকাঠে তখন হেমন্ত অপেক্ষারতা, পুজো শেষ হলেই সে অস্তমিত দরিদ্র অপরাহ্ণ, পীতবর্ণা স্বল্পায়ু আলোর দিন আর অকারণ মনখারাপের আঁচল রুক্ষ ধুলাবাতাসে উড়িয়ে মাত্র কয়েকদিনের জন্য আমাদের কাছে বেড়াতে আসবে!

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে বলেই ওইবছর পুজোয় আমাদের দেশের বাড়ি যাওয়া হয়নি, পুজোতেও ছিল কড়া বিধিনিষেধ কিন্তু সেসব নিয়মের ফাঁক কেটে সপ্তমীর সকালে দেখা হয়ে গেল। তখন তো ‘আমাদের-তোমাদের, সনাতনী পুজো, লাভ জিহাদ’ এসব ছিল না, ফলে পুজোমণ্ডপে শবনম্‌রা আসত, তাদের কেউ সন্দেহের চোখেও দেখত না আর পুষ্পাঞ্জলির সময়েও দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের ঘরের মেয়ে দুগ্‌গা বচ্ছরকার দিনে কিচ্ছু মনে না করে বরাভয়ের হাসি মুখে নিয়ে কেমন ভালোবেসে তাকিয়ে থাকতেন; আজও নিশ্চয় থাকেন শুধু আমাদের চোখেই এক বিজাতীয় গেরুয়া রঙের দ্বেষ-চশমা ইদানীং উঠে এসেছে।

মণ্ডপ থেকে বেরোনোর মুখেই দেখা, একটা আসমানি শাড়িতে ভারি মানিয়েছে, সঙ্গে লিলি ফুলের মতন এ-ওর গায়ে হাসিতে ঢলে পড়া মেয়েরাও ছিল। আমাকে দেখে তীব্র উচ্ছ্বল আকাশ-আলোকে ম্লান করে সেই গজদাঁতে সাজানো হাসি বলে উঠল, ‘এই তো! তোমার দেখাই যে পাওয়া যায় না! বইটা নেবে না?’

‘বই?’

‘হ্যাঁ! নেবে না?’, একমুহূর্ত কী যেন ভেবে ফের বলল, ‘কাল আসবে?’

আমার সঙ্গে প্রীতম ছিল, তার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে শুধোলাম, ‘এখানে?’

‘এখানে? হ্যাঁ, এখানেও আসতে পারো, নাহলে তোমাদের পাড়ায়, ওমিয়বাবুর বাড়ির সামনে বাঘাযতীন ক্লাবের পুজোর মাঠে, কাল ও-পাড়ায় যাব তো আমি!’

‘সকালে?’

‘না না, সন্ধেয়, কাল তো অষ্টমী, সন্ধেয় আসব।’

প্রীতম পাশ থেকে বলার চেষ্টা করল, ‘কাল সন্ধেয় তো আমরা’, আমি তাড়াতাড়ি কথা দিয়ে ওকে থামিয়ে বললাম, ‘বেশ তো, কাল সন্ধে, এমনিও ওখানেই থাকতাম!’

কিছু বুঝল কিনা কে জানে, অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল সামলে ফের ঝিলমিলিয়ে উঠল হাসি, গাঢ় চুল কপালের উপর থেকে আলগোছে একবার হাত দিয়ে সরিয়ে শরতের সকল আয়ুধ নিমেষে নিষ্ক্রিয় করে বলল, ‘ভুলে যেও না আবার!’

স্পষ্ট মনে আছে অষ্টমী ছিল পয়লা কার্তিক, সেই পতনোন্মুখ শিশির-সন্ধ্যায় আলোফুল আর সন্ধিপুজোর সমারোহের মাঝেই কালো শাড়ির মায়াচ্ছন্ন আঁধারে নিজেকে সাজানো অষ্টাদশী দীর্ঘাঙ্গী আমার হাতে তুলে দিয়েছিল ওই বিষাদদ্রষ্ট কৃশকায় বইখানি, চিরকালের হেমন্তিকা যার পাতায় পাতায় অলীক এক অক্ষর কলোনি গড়ে তুলেছিল অনেক আগেই। বই হাতে নিয়ে পাতা উলটে দেখলাম উৎসর্গপত্রে ‘বুদ্ধদেব বসু’র নামের নীচে ছোট ছোট বাদামী অক্ষরে লেখা আছে—‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–পঁচিশ বছর পরে!’

আর কিচ্ছু নাই, নিজের নাম-আমার নাম কিচ্ছুটি নয়; হঠাৎ সেই মানুষের ভিড়ে এলোমেলো সন্ধ্যায় মনে পড়ল, এই বই তো অনিন্দ্য’দার, তাহলে এইটা লিখল…মুখ তুলে চাইলাম, আমার মন পড়তে পেরেই বোধহয় শবনম্‌ আলতো সুরে আমার কানের কাছে মুখ এনে সরগরম মাঠের শব্দ-ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সন্তর্পণে বলল, ‘এইটা অনিন্দ্য’দার বই নয়!’, একমুহূর্তের বিরতি মাত্র, ‘আমি নতুন কিনেছি, তোমার জন্য!’

বাতাস বইছিল তখন মিহিন, উত্তরপথগামী সেই বাতাসে চোরা শীতটান, ফিস্‌ফিসিয়ে বলছিল আমাদের দুজনকে, আর তোমাদের কখনও এখানে ফেরা হবে না!

এমনই কি ছিল সেই সন্ধ্যা? শেষবার মাঠের উপর ওই যুগন্ধর কবির ধূসর পাণ্ডুলিপির আয়োজন মেনেই কি সত্যি আমাদের দেখা হয়েছিল? স্পষ্ট কথায় এর উত্তর দেওয়া যায় না। শবনমের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার অনেক অনেকবার; মহানন্দার জলে সন্ধ্যা যখন গাঢ় হয়, অস্তমিত হেমন্তে আকাশে চল্‌কে পড়ে স্মৃতি-রঙের কৌটো, চৈত্রে আকুল বিবাগী ধুলাচ্ছন্ন মেঘ-বাতাসে অথবা পৌষের ম্লান ঝাপসা আলো-কুয়াশাচ্ছন্ন দ্বিপ্রহরে আমাদের দেখা হত। একটি নীল ও কালো সাইকেল পরস্পরের যাত্রাপথ কাটাকুটি করে পৌঁছে যেতে চাইত দূর দিকচক্রবালরেখা পার হয়ে অন্য কোনও ভুবনে, যেখানে সময়-গাড়ির গতি মন্থর, দিগন্তবিথারি অলৌকিক মাঠে যখন হারিয়ে গেছে অতীত-ভবিষ্যত-বর্তমানের চলন নিয়ন্ত্রণকারী কালরেখা দণ্ড।

তাই পাঠক ও পাঠিকা, আপনার কৌতুহলের উত্তর এক-কথায় দেওয়া অসম্ভব। আপনার মনে হতে পারে, তারপর? তারপর কী হল? যেমন সব কাহিনির একটা ‘তারপর’ থাকে, সেই নিয়ম মেনেই আপনার ওমনধারা কৌতুহল হতেই পারে। সেটিই স্বাভাবিক।

কিন্তু এই আখ্যানে তারপর আর কিছুই নাই!

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবার চাকরিস্থল বদলে যায়, ওই শহর ছেড়ে আমরাও চলে আসি, চলে আসি চিরতরে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন আমার সঙ্গে শবনমের শেষবার দেখা হয়, ওই নদীর ধারে, তখন নির্জন ঘাটের কিনারে মুখ নীচু করে বহমান জলমুকুরে নিজের ছায়াছবি দেখার জন্য উৎসুক প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের শরীর থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ছিল দুটি একটি জীর্ণ পাতা। ক’দিন আগে ওমিয়বাবুর কাছে শেখা একটি গান আনমনে ফুটে উঠছিল শবনমের গলায়–তারায় করিব কর্ণের দুল, জড়াব গায়েতে অন্ধকার!

‘সন্ধ্যার মেঘে ভরিব দুকূল’ গাওয়ার সময় তার মুখে এসে পড়েছিল পশ্চিমের আলো, সেই আলোয় মিশে ছিল হত্যা দৃশ্যের রঙ। ঘাটে বাঁধা একখানি তরণী দুলছিল মন্দ মন্দ, ছায়া ভাসছিল আপন সহোদরার মতন। কে সত্যি, ছায়া নাকি তরণীর কায়া, সেদিন আমি স্থির করে উঠতে পারিনি। সেই তরণী, যা বাওয়ার আগে ওমিয় মাস্টারের গলায় ফুটে উঠত পুজোর ছুটির নিমন্ত্রণ-রোদ্দুর।

 ওই দিনের পরেও তো বয়ে গেছে ছাব্বিশ-সাতাশ বছর, আর কখনও সেই মফ্‌ফসলে ফিরে যাওয়া হয়নি। পুজো আসে আবার নিজের নিয়মে চলেও যায়। ইদানীং কলকাতার উত্তর শহরতলীর যে পাড়ায় থাকি সেখানে অত জাঁকজমক নাই, থিমপুজো নাই, ওই সাবেক চালের দু’একটি পুজো হয়। আমি একদিন সকালে স্নান করে দেবীমুখ দর্শন করে আসি, তারপর বাড়িতেই কেটে যায় চারটে দিন। পুত্রের ক্যাপ-বন্দুক ফাটানোর উৎসাহও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তে, ফলে সেসব কিনে আনার বায়নাও আর নাই। এখন তো বাঙালি বোধহয় পুজোয় নতুন জামাকাপড়ও খুব একটা কেনে না, সারাবছর ধরেই চলতে থাকে তাদের কেনাকাটা, বাজারহাট। তবে অস্বচ্ছল পরিবার এখনও বোধহয় চেয়ে থাকে পুজোর জামার দিকে, তাদের হাতেই বা পয়সা কই!

মাঝে মাঝে পুজোর আগে কাছেই স্টেশন বাজারে যাই, ছোট ছোট সব জামাকাপড়ের দোকান, ঝুটো গয়না-সাজগোজের দোকান, ভিড় অবশ্য খুব একটা হয় না। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি সেসবের দিকে; মুখে মেচেতার দাগ নিয়ে বাড়ি ফেরে যে মেয়েটি সারাদিন কলকাতায় কোনও দোকানে কাজ সেরে, দিনভর হকারি করে ট্রেনে থেকে ঘরে ফেরে যে ক্লান্ত যুবক, মাছ-সবজি-ফল বিক্রি করে দিনান্তে বসিরহাট-বনগাঁ-গোপালপুর-ঠাকুরনগরে ফিরে যায় যে সব মানুষ-মানুষী তাদের দিকে চেয়ে থাকি। ওদের পুজো কোন্‌ রঙের কৌটো উপুড় করে আলো ও বাতাস নিয়ে আসে? নতুন জামা হয়? দু-একটা ভালো-মন্দ রান্না পুজোর দিনে? এখন তো শুনছি পুজোর পর ইস্টিশানে হকারি, ট্রেনে হকারি সব বন্ধ হয়ে যাবে। ওসবে বাবু-বিবিদের নাকি খুব অসুবিধা হয়! ডিজিট্যাল ইন্ডিয়ার বিশাল গ্লো-সাইন বোর্ডের নীচে মোল্লাহাটি-রুদ-সিমলিপাল-অকসি গ্রামের চিরকালের জংলা ভারতবর্ষ একেবারেই বেমানান।

তবুও পুজো আসে, প্রকৃতিদেবী আমাদের সুখ-দুঃখে চির-উদাসীনা। তিনি নিজের নিয়মেই বর্ষণক্ষান্ত দ্বিপ্রহরে আকাশের সুনীল বসতবাটিতে ছড়িয়ে দেন একমুঠি রৌদ্র ও পলাতক বালকের মতন মেঘ, অলীক রুহ্‌ আতরদানির জলে জাগিয়ে তোলেন অমলিন কমলা-সাদা ফুলের সাজি, ঝরঝর বাতাসের দোলায় খসে পড়তে থাকে তারা ভুঁইয়ের উপর।

মধ্য-চল্লিশের আমিও চোখ বন্ধ করি তখন; স্পষ্ট দেখতে পাই ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগের সেই উদ্বাস্তু কলোনি পাড়ায় বিশ্বনাথের দোকানে পঞ্চাশ পয়সার ঝাল-লজেন্স, একটাকার চানাচুর কিনতে ভিড় জমিয়েছে ছেলেমেয়ের দল। পুজোর দিনে দশ টাকার সরষের তেল কিনে কাচের শিশিতে নিয়ে যাচ্ছে লাজুক বউ, বাড়িতে আজ মাংস হবে কিনা !

ওমিয় মাস্টারের জীর্ণ ভদ্রাসন জেগে উঠছে অতিকায় ফ্ল্যাট বাড়ির গহিন অন্তঃপুর থেকে, জংলা বাগানে অপরাজিতা লতার তলায় রেখে যাওয়া শবনমের নীল সাইকেল মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে অবিতথ কুসুম রঙে, আদ্যিকালের হারমোনিয়ামের বেলো টিপে মাস্টারমশাই নম্র বেহাগকে পাশে বসিয়ে গাইছেন—ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন, ভেবে মরে মোর মন…কালসায়রের ওপার থেকে আমার দিকে অনিমিখ তাকিয়ে আছে অষ্টাদশী শবনম্‌ আর রোদ্দুরে রোদ্দুরে উথলে উঠছে আকাশ।

.

এই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব এবং এই সম্পর্কিত কোনো দায় কতৃপক্ষের নয় ।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *