ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি -

ছবি- বলিউডডাইরেক্ট.মিডিয়াম ডট কম

ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি

অভিনয় দক্ষতায়, ব্যক্তিত্বে, চেহারায় ও বাচনভঙ্গিতে ছবি বিশ্বাসের জুড়ি আর নেই-সত্যজিৎ রায়

কমলেন্দু সরকার

ছবিবাবুর মতো অভিনেতা না থাকলে ‘জলসাঘর’-এর মতো কাহিনির চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কি না জানি না। বোধয় না। একদিকে বিশ্বম্ভর রায়ের দম্ভ ও বিমৃশ্যকারিতা, অন্যদিকে তার পুত্রবাৎসল্য ও সংগীতপ্রিয়তা এবং সবশেষে তার পতনের ট্র‍্যাজেডি— একাধারে সবগুলির অভিব্যক্তি একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল’। সত্যজিৎ রায় লিখছেন তাঁর ‘ছবি বিশ্বাস’ প্রবন্ধে।

‘একথা সেকথা’ প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় লিখছেন, ‘বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে ছবি বিশ্বাস ছাড়া আর কোনও অভিনেতার কথা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না’।

তিরিশের দশকের এক বিকালে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও কি ভেবেছিলেন, তাঁর প্রযোজিত নতুন ছবি ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ বিশুর ভূমিকায় এই যুবকটিই সঠিক নির্বাচন। এই প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় কে? এঁকে জানলে বোঝা যাবে ছবি বিশ্বাসকে কেন সিনেমায় অভিনয়ের জন্য বলেছিলেন। বিশ শতকের গোড়ায় তিনি চাকরি নেন ম্যাডনের অফিসে। চাকরিটা ছিল টাইপিস্টের। পরবর্তী সময়ে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় যোগ দেন ম্যাডানের চলচ্চিত্র ব্যবসায়। বছর কুড়ি তাঁর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল বেশকিছু তথ্যচিত্র এবং নিউজ রিল অর্থাৎ সংবাদচিত্র। ম্যাডানের নির্বাক ছবি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৯২৭) ছবিতে প্রিয়নাথকে প্রথম দেখা যায় পরিচালক হিসেবে। এরপর আগামী চারবছর, ১৯৩১ পর্যন্ত প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখা যায় ম্যাডানের ব্যানারে সাতটি নির্বাক এবং একটি সবাক ছবির পরিচালক। ১৯৩২-এ ম্যাডান ছেড়ে এলেন ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ-এ। এদের ব্যানারে  পরিচালনা করলেন ‘যমুনা পুলিনে’ (১৯৩৩)। এরপর শুরু নতুন অধ্যায় প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনে। নিজেই তৈরি করলেন প্রযোজনা সংস্থা ‘কালী ফিল্মস’,  যদিও পূর্ব নাম ভিন্ন ছিল।

প্রিয়নাথের ‘কালি ফিল্মস’-এর ব্যানারে তৈরি হবে নিরুপমা দেবীর তৎকালীন জনপ্রিয় উপন্যাস নিয়ে  ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’। পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী। প্রযোজক প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় একদিন বিকেলে বসে আছেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ক্রাউন প্রেক্ষাগৃহের বুকিং কাউন্টারে। হঠাৎ তাঁর নজরে এলো অত্যন্ত সুপুরুষ চে্‌হারার বছর তিরিশ-বত্রিশের এক যুবক হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে। যুবকের রাজকীয় চেহারা দেখে তাঁকে ডাকেন। যুবকটি কাছে এলে তিনি প্রস্তাব দেন সিনেমা করার। যুবকটির অবস্থা মেঘ না চাইতেই জল। ভিতরের উচ্ছ্বাস মুখে প্রকাশ করলেন না। যুবকটি জানালেন, ‘রাজি।’ ছবি বিশ্বাস তখন নাটকে নাম করেছেন।

প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে নিলেন। ছবি বিশ্বাস কথামতো কালী ফিল্মসের স্টুডিয়োতে চলে গেলেন একদিন। বর্তমানের টেকনিশিয়ানই ছিল কালী ফিল্মসের স্টুডিয়ো। সিনেমা জগতে ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবি এই ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ (১৯৩৬)। এরপর প্রতি বছরই তিন-চারটি ছবি করতে লাগলেন ছবি বিশ্বাস।

দু’চারটি প্রথাগত কথা বলে নেওয়া ভাল। তাঁর নাম ছিল শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। দেখতে সুন্দর হওয়ার কারণে মা কাত্যায়নী বিশ্বাস ডাকতেন ছবি। মায়ের নামেই পরবর্তীকালে ছবি নামেই পরিচিত হলেন সিনেমা এবং মঞ্চে। অল্প বয়সে মাতৃহারা হলে পিতা ভূপতিনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পিতার ছিল পাটের ব্যবসা। সেই ব্যবসাও দেখতে বাঙালি কিংবদন্তি অভিনেতা ছবি বিশ্বাসকে। যাঁর অন্তরে অভিনয় তিনি কি করে ব্যবসা সামলাবেন! তার ওপর পাটের ব্যবসা। সবকিছু ছেড়েছুড়ে মন দিলেন অভিনয়ে। যেটি তাঁর প্রথম পছন্দের।

ছবি বিশ্বাসের অভিনয়-স্পৃ্‌হা আসে তাঁর বৃহৎ পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে। বাড়ির সদস্য ভাই-বোন  সংখ্যায় বেশি থাকার জন্য নিত্য লেগে থাকত নানাবিধ অনুষ্ঠান। কলেজজীবন থেকেই ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের শুরু। একসময় তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের। এখানে আসতেন তৎকালীন বিখ্যাত গুণীজনেরা। সংস্পর্শে আসেন শিশির ভাদুড়ির। যেহেতু শিশির ভাদুড়ির ছোটভাই হৃষীকেশ ভাদুড়ি ছিলেন বিদ্যাসাগর কলেজে ছবি বিশ্বাসের সহপাঠী তাই তিনি তাঁকে বড়দা বলেই ডাকতেন।

যাইহোক, ছবি বিশ্বাস একসময় যোগ দিলেন অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘আর্ট থিয়েটার’-এ। একাধিক যাত্রাদল থেকে অভিনয়ের জন্য ডাক আসতে লাগে। এইসময় তিনি অভিনয়কে পেশা করতে চাননি। তাই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় এক বিমা কোম্পানিতে। পরে বিমা কোম্পানি ছেড়ে আসেন ‘বেঙ্গল টেলিফোন কোম্পানি’-তে। কিছুদিন পর থেকে ছবি বিশ্বাসের মন বসে না সেখানে। চাকরি নয়, ব্যবসা করবেন ঠিক করলেন। পারিবারিক ব্যবসা পাটেই মন দিলেন। কিছুদিন পর পাটের ব্যবসা লাটে ওঠে।

বাল্যকালে সঙ্গীতশিল্পী উস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁ-এর কাছে ধ্রুপদীগানের চর্চা করেছিলেন। ছোট জাগুলিয়ায় যেখানে তাঁদের বাড়ি ছিল সেখানে মঞ্চ বেঁধে করছিলেন ‘বিল্বমঙ্গল’ নাটকে চিন্তামণির পার্ট।

মদন মিত্র লেনের দীনবন্ধু মিত্রের বৈঠকখানার ঘরে ছিল ‘বারবেলা’ বৈঠক ক্লাব। এখানে হত শখের নাটক, শখের অভিনয়। এখানেই ছিল ছবি বিশ্বাসের অভিনয়জীবনের হাতেখড়ি। তবে, বলাই মত্রের ক্লাবে করেন নাটক ‘ভীষ্ম’। একসময় জড়িয়ে পড়লেন কাঁকুড়গাছি নাট্যসমাজ এবং সিকদার বাগান বান্ধব সমাজের সঙ্গে। বান্ধব সমাজ তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘নদীয়া বিনোদ’ মঞ্চস্থ করবে। ‘নদীয়া বিনোদ’-এ নিমাইকে খুঁজে বার করেছিলেন ললিত বসু যিনি পরিচিত ছিলেন বাঁকাবাবু নামে। ১৯৩৩, ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন এক তরুণ অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। নিমাইয়ের ভূমিকায় তাঁকে দেখে আবালবৃদ্ধবনিতা মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৩৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যান রামকৃষ্ণ আশ্রমে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব-এর মূর্তির সামনে অভিনীত হয়েছিল ‘নদীয়া বিনোদ’। এখানেই শেষ নয়, এই নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে ধারাবাহিকভাবে চলে। ১৯৩৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে শততম রজনী হয় ‘নদীয়া বিনোদ’-এর। যতদূর জানা যায়, ১৭৫-টি রজনী অভিনীত হয়েছিল নাটকটির।

১৯৩৮-এ নাট্যনিকেতন মঞ্চে ‘সমাজ’ নাটক দিয়ে পেশাদারি ছবি বিশ্বাসের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপরই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে, যে-কথা পূর্বেই বলা আছে।

ছবি- ‘ পথে হল দেরি’

অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের ওপর অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের, স্টুডিয়োপাড়ায় পরিচিত ছিলেন ঢুলুদা নামে। তিনি মনে করতেন, সিনেমার অভিনয় এবং নাটকের অভিনয়, এই দুইয়ের মধ্যে যে ফারাক সেটা ছবি বিশ্বাসই দেখিয়ে গেছেন। খুব মজার মানুষ ছিলেন ছবি বিশ্বাস। তখন এম পি-র ‘পথে হল দেরি’র শুটিং চলছিল। তা একদিন প্রচুর দেরি করে এলেন ছবি বিশ্বাস। বললাম, এত দেরি হল ছবিদা? উত্তর যেন তাঁর ঠোঁটে লেগেই ছিল। বললেন, “তোদের ছবির নামই তো ‘পথে হল দেরি’। তা দেরি হবে না!” আসল কারণটা পরে জানা গেছিল, ছবি বিশ্বাস চলে গেছিলেন আড়িয়াদহে ইস্টার্ন টকিজে। ছবি বিশ্বাস সে-কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, “আরে ওরা তো আমাকে দিয়ে দুটো ছবির শুটিং করিয়েও নিল। ব্যাপারটা হয়েছিল আমি ডায়রিটা নিতে ভুলে গিয়ে যত বিপত্তি। যাক, অত ভাবিস না। আমি তোদের কাজ তুলে দিয়ে যাব।” উনি কথা রেখেছিলেন।

১৯৩৬, ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবি ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ সময় একটু ফিরতে হবে। এই বছরেই মুক্তি পেয়েছিল নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘দ্বীপান্তর’। ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ করার পর সুপুরুষ সুদর্শন ছবি বিশ্বাস স্টুডিয়োপাড়ায় হইচই ফেলেছিলেন তেমনটা ঘটেনি। কাজের আশায় ঘোরাঘুরি করেন এই স্টুডিয়ো, ওই স্টুডিয়ো। তারই মাঝে শুনলেন কে একজন অভিনেতা নৃপতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছেন চারদিকে! একদিন পাকড়াও করলেন নৃপতিকে। ছবি বিশ্বাস বল্রন, “শুনুন মশাই, আপনি নাকি আমার নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছেন?” নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ও তো কম যান না। গম্ভীর হয়ে বলেন, “বদনাম করার কাজ করেছেন, তাই করেছি।” ছবি বিশ্বাস তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কারণটা। নৃপতি চট্টোপাধ্যায় বললেন, “আগামী কাল স্টুডিয়োতে আসুন বলব।”

পরদিন ছবি বিশ্বাস যেতে নৃপতি মেক-আপ রুমের দরজা বন্ধ করে বোঝাতে লাগলেন তাঁর অভিনয়ের ভুলভ্রান্তি, খামতি ইত্যাদি। সবকিছু হাঁটা থেকে শুরু তাকানো, সংলাপ কীভাবে বলতে হবে, সংলাপের মাঝে পজ নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। নৃপতি চট্টোপাধ্যায়কে ‘প্রভু’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন সেই মুহূর্ত থেকে। দুজনের মধ্যে ভালবাসা, বন্ধুত্ব ছিল অটুট আমৃত্যু। মঞ্চে নাটকের বাইরে বহু মজার ঘটনাও ঘটেছিল।

সম্ভবত সেটি ছিল কম্বিনেশন নাইট। তৎকালে কোনও উৎসবে বা বিশেষদিনে কম্বিনেশন নাইট হত। নাটকে দৃশ্যটি ছিল কম্বল গায়ে মঞ্চের একপাশে শুয়ে থাকবেন ছবি বিশ্বাস আর নৃপতি চট্টোপাধ্যায় এসে কম্বলটা খুলবেন। সেদিন কলকাতা শহরে প্রচণ্ড গরম। নাটক করার নৃপতি দশটা টাকা চেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাসের কাছে। উনি মাঝেমধ্যেই টাকা চাইতেন। তা ছবি বিশ্বাস দেননি নৃপতিকে। উনিও বললেন, টাকা দিবি না তো, মজা টের পাওয়াব। নাটক শুরু হয়েছে কম্বলে মোড়া ছবি

বিশ্বাসের কাছাকাছি ঘুরছেন আর বলছেম, কি রে দশ টাকা দিবি কিনা বল। ছবি বিশ্বাস কম্বলের মধ্যে থেকে বলছেন, না দেবো না। নৃপতি মঞ্চে ঘোরাঘুরি করছেন আর ছবি বিশ্বাসের কাছে গিয়ে বলছেন, কি রে দিবি? ঘামে গরমে নাজেহাল ছবি বিশ্বাস আর পারলেন না। নৃপতির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। বললেন, দেব দশ টাকা। আগে কম্বলটা খোল। সারা প্রেক্ষাগৃহে হাসির তুফান। মিনিট পাঁচ পর আবার নাটক শুরু হয়।

আরও অনেক ঘটনা আছে। আর একটি মজার ঘটনা বলি, সেকালে নাটকের মেক-আপ রুম ছিল খুব মজার জায়গা। আড্ডা হত, হাসি হই-হল্লাও হত। বিশেষ করে নৃপতি আর ছবি বিশ্বাস একই নাটকে অংশ নিলে মেক-আপ রুমে উঠত হাসির ফোয়ারা। একবার কোন  এক নাটকে নৃপতিকে লক্ষ্য করে ছবি বিশ্বাস বলেন, তোর আবার অত মেক-আপের কী আছে! দর্শক তো নাটকে ছবি বিশ্বাসকে দেখতে আসে।

নৃপতি চট্টোপাধ্যায় বলেন, তোকে দেখিয়ে দেব নাটকে কোনও চরিত্রই ছোট নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ। ওই  নাটকে ছবি বিশ্বাস অভিনয় করছিলেন এক অভাবগ্রস্ত সৎ মানুষের। যিনি পাওনাদারের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়ান। আর পাওনাদারটির ভূমিকায় ছিলেন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়। নৃপতিকে দেখে ছবি বিশ্বাস লুকিয়ে পড়েন। পাওনাদার নৃপতি তাঁর স্বভাবসুলভ ঢঙে ছবি বিশ্বাসকে ইতিউতি খুঁজতে শুরু করেন কুলুঙ্গিতে, কখনও বিছানার নীচে কখনও গোটানো মাদুর খুলে, এমনকী জুতোর মধ্যেও! নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে সারা হল হাসিতে ফেটে পড়ে! দৃশ্যটির সময়সীমা ছিল মিনিট কয়েক নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের কাণ্ডকারখানায় গিয়ে দাঁড়ায় মিনিট পনেরো-কুড়ি। পরিচালক পর্দাও ফেলতে পারছেন না,   দর্শক উপভোগ করছেন। প্রেক্ষাগৃহে হাসির তুফান! ছবি বিশ্বাস মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালে তাঁর প্রতি সমবেদনা জানাবে কি, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছেন! পরিচালক পরের শো বাতিল করে টিকিটের দাম ফেরত দেন। সেদিন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হার মেনে ছবি বিশ্বাস স্বীকার করেছিলেন, নাটকে  কোনও চরিত্রই ছোট নয়, সকল চরিত্রেরই আছে সমগুরুত্ব।

শিশির ভাদুড়ি-অহীন্দ্র চৌধুরী পর বাংলা নাট্যমঞ্চে শুরু হয় ছবি বিশ্বাস যুগ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’, মনোজ বসুর কাহিনি নিয়ে ‘ডাকবাংলো’, দেবনারায়ণ গুপ্ত-র ‘শ্রেয়সী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, কত ঐতিহাসিক নাটক! পূর্বেই বলেছি, শিশির ভাদুড়ির ভাই ছিলেন ছবি বিশ্বাসের সহপাঠী, তাই শিশিরবাবুকে ‘বড়দা’ বলতেন। সেইজন্য তিনি কাছ থেকে শিশির ভাদুড়িকে দেখেছেন, অভিনয় দেখেছেন, শিখেছেন, তার পর বদলাচ্ছেন তাঁর  অভিনয়। ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের মধ্যে ছিল চরিত্রের আভিজাত্য, দাপট, কারুণ্য, ভাঙচুর। ছিল না ম্যানারিজম। ফিল্ম-কেরিয়ারের তুঙ্গ পর্যায়ে ন’বছর বাদ পড়েছিল মঞ্চাভিনয়, তবে সুযোগসুবিধা মতো মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন। শিশির ভাদুড়ির আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকাকালীন সময়ে বিনা অর্থে নাটক করেছেন। শরীর ঠিক না-থাকার কারণে ডাক্তারের অনুমতি মেলেনি। যেদিন অনুমতি পেয়েছেন সেদিনই স্টার থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন। বুকিং অফিস খুলতেই বিশাল লাইন। মুহূর্তে সব টিকিট শেষ। প্রতিটি শো ছিল হাউসফুল। সেইসময় একটি কথা খুব চালু ছিল, বক্স-অফিস টানতেন নায়ক-নায়িকা আর ছবি বিশ্বাস।

তিরিশের দশকের মধ্যভাগ থেকে পঞ্চাশের দশকের শুরু, নিয়মিত অভিনয় করেছিলেন পেশাদারি মঞ্চে। তাঁর অভিনয়ের দাপটে মঞ্চের প্রধান শিল্পীরাও ম্লান হয়ে যেতেন কখনওসখনও। এমনটা ঘটত সিনেমাতেও। বাংলা সিনেমা ছবি বিশ্বাসকে এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তার ভিতর ছিল, তপন সিংহের ‘কাবুলিওয়ালা’ (১৯৫৭), এই ছবির জন্য তিনি যোগ দিয়েছিলেন বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ (১৯৫৮), ‘,দেবী’ (১৯৬০), ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (১৯৬২) ইত্যাদি সিনেমা তাঁকে দেশেবিদেশে এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, পরিচিতি ইত্যাদি ইত্যাদি।

পঞ্চাশের প্রায় শুরু থেকেই বাংলা সিনেমায় ছবি বিশ্বাসের কাজ বাড়ল। ফল, তাঁকে পাওয়া গেল কম। ১৯৩৬-এ প্রথম ছবি ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ থেকে তিরিশের কয়েকটি বছর সঙ্গে চল্লিশের দশকে তিনি মোট ৬০টি ছবি করেছেন। সেখানে শুধুমাত্র পঞ্চাশের দশকে ছবি করলেন ১৪৭টি। গড়ে বছরে প্রায় ১৫টি ছবি। শুধু তাই নয়। এই দশকেই ছবি বিশ্বাস পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তপন সিংহের ‘কাবুলিওয়ালা’ (১৯৫৭), সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’ (১৯৫৮) এবং ‘জলসাঘর’ (১৯৫৮) করেছেন।

ছবি – ‘ কাবুলিওয়ালা’

‘কাবুলিওয়ালা’ প্রভূত জনপ্রিয়তা এনে দেয় ছবি বিশ্বাসকে। তবে উত্তম-সুচিত্রার ‘সবার উপরে’র  (১৯৫৫) একটি সংলাপ বাঙালির মুখে মুখে ফিরেছিল, ‘খালাস, খালাস আমি চাই না।… ফিরিয়ে দাও আমার বারোটা বছর।’ ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের মধ্যে যে মেলোড্রামা ছিল তা পছন্দ করেছিলেন দর্শকেরা। এছাড়াও ছবি বিশ্বাস অভিনীত চরিত্রটি দর্শক-মনে আবেগ-সহানুভূতির সঞ্চার করতে পারে  তাঁর অভিনয়-গুণে।

ছবি- ‘জলসাঘর’

ছবি বিশ্বাস যখন সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’ করছেন তখন তাঁর ১৭৩টি ছবি হয়ে গেছে আর ‘জলসাঘর’ করছেন ১৮৩টি ছবি। সেইসময় তিনি বাংলা সিনেমার অপরিহার্য অভিনেতা। ছবি বিশ্বাসের যে আভিজাত্যময় চেহারা তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়। ‘জলসাঘর’-এর অসাধারণ একটি মুহূর্ত—‘পারেনি, পারেনি, সুদখোরের ব্যাটা বামন হয়ে পাহাড়ের চুড়ো ভাঙতে গেছিল, পারেনি’— ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের তাচ্ছিল্যপূর্ণ সংলাপ বলার যে ভঙ্গিমা ছবি বিশ্বাস ছাড়া আর কে পারতেন! জমিদারি শেষ তবুও তাঁর অহংকার বিন্দুমাত্র কমেনি। ঐতিহ্যের সঙ্গে  আধুনিকতার দ্বন্দ্ব। অসাধারণ এই দৃশ্যটি যেভাবে পরিস্ফুটিত করেছেন ছবি বিশ্বাস তা বাংলা সিনেমা তো বটেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ! এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এবার ‘কাবুলিওয়ালা’র প্রসঙ্গে বলি। পরিচালক তপন সিংহ যখন ছবি বিশ্বাসকে ‘কাবুলিওয়ালা’র কথা বলেন তখন তিনি পরিচালককে কি বলেছিলেন। দেখে নেওয়া যাক। ‘কাবলেদের সম্বন্ধে আমাকে একজন অথরিটি ভেবে নিতে পার।’ বললেন ছবি বিশ্বাস, ‘ওদের সঙ্গে অনেক মেলামেশা করেছি।’ সাগ্রহে বললাম, ‘তাহলে তো ওদের পুশতু ভাষাও একটু আধটু নিশ্চয়ই জানেন। কারণ কিছু সংলাপ পুশতুতে দিতে চাইছি কিনা।’ এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘সংলাপে আবার শুধু শুধু পুশতু মুশতু আনতে গেলে কেন? বুঝবে কে? বললাম, ‘না বুঝলেও চলবে, এতে অভিনয়ের একটা ডাইমেনশন আনতে পারে— আনবেই যে এ কথা বলছি না।’ একটু ভেবে বললেন, তা ঠিক, একটা কাবলেকে ধরে শিখে নিলেই চলবে। বাদবাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দাও— কেমন পোশাকপরিচ্ছদ, মেক-আপ, চলা বলা— অনেকদিন পর একটা রোল পেয়েছি এক হাত লড়তে চাইছি।’ (চলচ্চিত্র আজীবন, বায়োস্কোপের বাঁকে বাঁকে, তপন সিংহ)।

পুরনো দিনের মাঝেমধ্যেই শুনতাম  তপন সিংহের কাছে। একদিন তিনি ‘কাবুলিওয়ালা’র শুটিংয়ের ঘটনা বলছিলেন, “সেট ফেলা হয়েছিল স্টুডিওতেই। সেটটা ছিল মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের একটি মুসলমান হোটেলের। শুটিং শুরু হবে। লাইট সাউন্ড ক্যামেরা সব রেডি। এবার সেটে ঢুকবেন কাবুলিওয়ালা বেশি ছবি বিশ্বাস। মনে হল ঠিক দেখছি তো! কাবুলিওয়ালা কোথায়! ছবি বিশ্বাসের মেক-আপ দেখে মনে হয়েছিল ইনি বোধহয় কোনও মুঘল সম্রাট। গরিব কাবুলিওয়ালাকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। অসিত চৌধুরী তো মেক-আপ দেখে রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর আলোচনা করে আমরা দু’জনেই ব্যাপারটা বলি ছবি বিশ্বাসকে। প্রথম দিকে গাঁইগুঁই করলেও পরে নিমরাজি ছবি বিশ্বাসকে গরিব কাবুলিওয়ালার মেক-আপ দেওয়া হয়। এছাড়াও আরও অনেক ঘটনা আছে।” সেদিন আর কথা হয়নি তপন সিংহের সঙ্গে। অভিনেতা ছবি বিশ্বাস সম্পর্কে ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আবার অন্যরকম ঘটনা ঘটেছিল শুটিংয়ে। এটি শোনা অভিনেত্রী গীতা দের কাছে, “ঋত্বিকদা তখন শংকরের ‘কত অজানারে’ নিয়ে সিনেমা করছেন। একদিন শুটিং চলছে। হঠাৎ ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে ঋত্বিকদা বললেন, ‘ছবিদা কিচ্ছু হচ্ছে না।’ আমরা তো ভয়ে সব কাঁটা। এই বুঝি তীব্র হুংকার শোনা যাবে ছবিদার। আজকের শুটিংয়ের ইতি ঘটবে! একেবারে চুপচাপ সবাই। হঠাৎ ছবি বিশ্বাসের গলা, ‘তাহলে দেখিয়ে দিন, কেমন করে করতে হবে।’ তারপর ঋত্বিকদা অভিনয় করে দেখালেন। সেটে উপস্থিত সকলেই অবাক! অপূর্ব তাঁর অভিনয়! ছবি বিশ্বাস চুপচাপ ঋত্বিকদার দেখানো অভিনয়টি করলেন। সেদিন বুঝেছিলাম, ঋত্বিক ঘটক কত বড় অভিনেতা ছিলেন!”

ছবি বিশ্বাস অভিনয়ের একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। থিয়েটার এবং সিনেমার মিশ্রণে অদ্ভুত একটা ধারা এনেছিলেন। দু’একটা ক্ষেত্র ব্যতীত তাঁর অভিনয়ে থিয়েটারের কোনও ছাপই থাকত না। বিশেষ করে তাঁর কথা বলার ঢং ছিল একেবারে নিজস্ব। তার উদাহরণ হিসেবে উত্তমকুমারের একটি লেখার উল্লেখ করা যেতে পারে। উত্তমকুমার তাঁর ‘অভিনয়ের কথা’য় লিখছেন, ‘আমি যখন ‘নায়ক’ করতে যাই তখন সত্যজিৎবাবু বলেছিলেন— ওহে উত্তমকুমার? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলুন স্যার। — না প্রথম সিনটা একটু ছবিবিক ঢঙে অভিনয় করতে হবে।ছবিবিক ঢঙে আমি কি অভিনয় করব? ছবিদা ছবিদার মতো অভিনয় করতেন, আমি আমার মতো করব।না, ওই যে টাইম অ্যান্ড পজ-এর ব্যাপারটা আছে না, ওইটে করতে হবে’। উত্তমকুমার নিজে মনে করতেন, ‘একটু স্টাইলাইজড অভিনয় করতে গেলেই ছবি বিশ্বাস…। ‘স্ত্রী’ ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয়ের প্রশংসা করতে উনি বলেছিলেন, “আমি আর অভিনয় করলাম কোথায়! সারাক্ষণই তো ছবি বিশ্বাসকে অনুসরণ করে গেলাম।”

ছবি – ‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা ‘

ছবি বিশ্বাস ছিলেন বাংলা সিনেমার এক কিংবদন্তি অভিনেতা। তাঁকে নিয়ে লেখা খুব অনায়াসসাধ্য নয়। তপন সিংহ বলেছিলেন, “গ্রেট অ্যাক্টর।” সত্যজিৎ রায়  তাঁর ‘ছবি বিশ্বাস’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার সাড়ে তিনবার। ‘সাড়ে’ এই কারণে যে, ‘পরশ পাথর’ ছবিটিতে তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন একটি মাত্র দৃশ্যে এবং তাও ‘অতিথি অভিনেতা’ হিসেবে— বেনামে এবং বিনা পারিশ্রমিকে। বাকি তিনখানা ছবি হল, ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’ ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। তাঁর উপযুক্ত আরও অনেক চরিত্র, অনেক কাহিনি আমার পরিকল্পনায় ছিল। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি কমেডি ছবির মোটামুটি কাঠামোও আমার তৈরি ছিল। এসবই তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার মন থেকে মুছে ফেলে দিতে হয়েছে। হয়তো এসব কাহিনি, এসব চরিত্র আর কোনওদিনই চলচ্চিত্রে রূপ পাবে না; কারণ অভিনয় দক্ষতায়, ব্যক্তিত্বে, চেহারায় ও বাচনভঙ্গিতে ছবি বিশ্বাসের জুড়ি আর নেই, এবং অচিরে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনাও নেই’। (প্রবন্ধ সংগ্রহ, সত্যজিৎ রায়, আনন্দ)।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *