সোফা -

ছবি - মৃণাল শীল

সোফা

বাইরের ঘরটা কেন যে সোফা দিয়ে সাজিয়ে রাখা …

অন্তরা চট্টোপাধ্যায়

“মজা আ গয়া বে…”
“কসম সে…”
“শরাব,আওরত,খানা…সব কুছ সহী হোনি চাহিয়ে,তভি না আতা হ্যায় মজা.…”
“যা বলেছিস মাইরি..”

মোদো মাতালদের অপসৃয়মান কোলাহলটা ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে।আর একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কিছুক্ষণ গুমরে গুমরে মরে কানা গলিটার দেওয়ালে দেওয়ালে।সে কান্না এমনি শোনা যায় না,কারণ কানে পৌঁছনোর আগেই গলির দাঁত বের করা দেয়ালগুলো গিলে নেয় সে অস্ফুট ক্রন্দনধ্বনিকে।

সোফার উপর উপুড় হয়ে কাঁদছিলো কনক।ফুলকাটা,বাহারী লেস লাগানো চাদরটা ভিজে যাচ্ছিলো তার চোখের বাঁধ না মানা জলে।সামনের ছোট কাঁচের টেবিলে এঁটো প্লেট,মদের গ্লাস আর পোড়া সিগারেটের টুকরোর স্তূপ।একটু আগেই চলে গেছে মতিনের “বন্ধু” রা।মতিনও।
চোখ মুছে শাড়ি সামলে উঠে বসে কনক।উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে জানলা ঘেঁষা পাঁচিলের ওপর দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যায়,তার দিকে।সেখানে আদেখলার মতো ঝুলে আছে ফ্যাকাশে শাদা হাড়ের মতো একফালি চাঁদ।কনকের মনে পড়ছিলো তার গ্রামের খড়ে ছাওয়া মাটির বাড়ির উঠোন থেকে দেখা মস্ত আকাশটার কথা।তারায় তারায় ভরা সে আকাশের চাঁদ ছিলো আলাদা,তার আলো ছিল ননীর মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল আর নরম। সে দুধেল আলো আকাশ থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে আসতো উঠোনের আমগাছের পাতায় পাতায়,চন্দনজবার ফুলে ফুলে।বাড়ির পেছনে ছোট্ট পুকুরটার জলেও মুখ দেখতো সেই সুখী,আহ্লাদী চাঁদ।আর দাওয়ার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতো বাবা,হাতপাখাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খেতো আর এটা সেটা কতরকম গল্প করতো কনকের সঙ্গে।বাপবেটির সেইসব গল্পের নীরব শ্রোতা ছিলো সেই আকাশের চাঁদও।কোথায় হারিয়ে গেলো সেই আলোভরা রাত,ছায়ানিবিড় শান্তিভরা সেসব দিন?

মুর্শিদাবাদ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম বদরপুরের মেয়ে কনক।বাবা নিকুঞ্জ কয়াল ভাগচাষী।মা মরা মেয়ে কনককে ভালো রোজগেরে পাত্র জেনে মতিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলো কনকের বাবা।মতিন কলকাতায় রাজমিস্ত্রির কাজ করে।অতি সাধারণ চেহারা মতিনের,বয়সের তুলনায় একটু বেশিই বয়স্ক যেন।বাড়িজমিও সেরকম বলার মতো কিছু নেই।অপর দিকে কনকের গায়ের রঙ পরিষ্কার,সুন্দরী না হলেও মুখে একটা কোমল শ্রী রয়েছে,ঘরের কাজ,রান্নাবান্নায় বেশ পটু,ক্লাস সেভেন অবধি পড়াশুনা করেছে।মোট কথা,সে সুপাত্রী।তবুও রোজগার ভালোই জেনে,মেয়ে কলকাতা শহরে থাকবে জেনে কনককে মতিনের হাতে তুলে দিতে রাজী হয়েছিলো নিকুঞ্জ।
বিয়ের পর কনককে নিয়ে এসে মতিন তুললো কলকাতার এক বন্ধ গলির মধ্যে ছোট্ট ঘরে।প্রথম যেদিন নতুন বউ কনক পা রাখলো এই ঘরে,সেদিন এই সামনের বসার ঘরটা খুব পছন্দ হয়েছিল তার।একটাই জানলা সেই ঘরে,সামনে উঁচু পাঁচিল।কিন্তু ঘরটা খুব সাজানো।ঘরের মাঝখানে একটা দারুণ সুন্দর সোফা।সামনে কাঁচের ছোট টেবিল।ঘরের কোণে কোণে টেবিল ল্যাম্প,নকল ফুলে সাজানো রঙিন ফুলদানি।দেওয়ালগুলো রঙ করা।

“ওমা,কি সুন্দর ঘরটা!”
এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মুগ্ধ কন্ঠে বলে উঠেছিল কনক।
আলতো করে ওর চিবুক নাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল মতিন,”তোর জন্যই তো ঘর সাজিয়েছি।”
“ধ্যাৎ!”
লাজুক হাসি হেসে বরের বুকে মুখ লুকিয়েছিলো কনক।

বাইরের সাজানো গোজানো ঘরটা পছন্দ হলেও ভেতরে গিয়ে বেশ দমে গিয়েছিলো কনক। ভেতরে একটা জানলাবিহীন বদ্ধ,ছোট্ট শোয়ার ঘর,আর তারও পেছনে একচিলতে রান্নার জায়গা আর শ্যাওলাধরা একফালি কলতলা।গ্রামের খোলামেলা,মুক্ত,উদার পরিবেশ থেকে এই দমবন্ধ করা ভাড়াবাড়ি একফোঁটাও ভালো লাগলো না কনকের।শুধু এই সামনের ঘরের এই সোফাটাই খুব পছন্দ হয়েছিলো ওর।সোফাটার নরম গদিতে বসে,হাতলটায় ভর দিয়ে পাঁচিলের ওপরের দৃশ্যমান আকাশটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকাই তার একমাত্র বিলাসিতা।মাঝে মাঝে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে অকারণে শুয়ে থাকতে আর চোখ বুজে ভবিষ্যত সংসারের স্বপ্ন দেখেও বেশ কিছুটা সময় কাটে কনকের।ও ভাবে,নিশ্চয় কিছুমাস বা দু এক বছর পর মতিন ওকে আরেকটু বড়,আরেকটু হাওয়াবাতাস খেলে এমন কোন বাড়িতে নিয়ে যাবে।সেখানে আরো গুছিয়ে কনক সংসার পাতবে, আসবে নতুন ছোট্ট অতিথি,সে খেলবে সে বাড়ির মেঝেতে, কনক মতিনের কোলে।তবে যেখানেই যাক না কেন,এ বাড়ি থেকে সোফাটা কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়ে পাতবে, এটা মনে মনে ঠিক করেই রেখেছে কনক।
ঘরে টিভি নেই,তবে মতিন বলেছে কিনে আনবে একটা ছোট টিভি কনকের জন্য।রেডিও অবশ্য আছে একটা।রেডিওতে বাজতে থাকা গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মাঝে মাঝে গুনগুন করে কনক,আর চেষ্টা করে নিজেকে সুখী ভাবতে,ভালো না লাগলেও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে।

কিন্তু কনক জানতো না যে কি দুঃস্বপ্নের জীবন তার জন্য অপেক্ষা করে আছে।মতিন আসলে মেয়েমানুষের দালাল।কলকাতায় তার আরো একটা সংসার আছে।সে প্রায়ই তার বন্ধুদের, অর্থাৎ খদ্দেরদের এখানে নিয়ে আসে।মদের ফোয়ারা চলে,সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর ভরে ওঠে।সঙ্গে চলে দেদার খাওয়া দাওয়া।তারপর কনককে যেতে হয় এক বা একাধিক অচেনা পুরুষের সঙ্গে পাশের ঘুপচি শোয়ার ঘরের খাটে।শুধু তাদেরই নয়,মতিনেরও শরীরের খিদে মেটাতে হয় তাকে মাঝে মাঝেই।প্রতিবাদ করলে কনকের কপালে জোটে বেধড়ক মারধর।

বন্ধু বলে বাড়ি নিয়ে এসে প্রথম যেদিন ঘরে লোক ঢোকালো মতিন,প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি কনক।ভেতরের শোয়ার ঘরে কনককে খদ্দের সমেত ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো মতিন।বন্ধ দরজার পিছনে কনকের আর্ত চিৎকার আর কান্না শুনেও এতটুকু বিচলিত হয়নি সে।সেই লোক চলে যাওয়ার পর ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে মুখ খুলতে যেতেই ঠাস করে সজোরে এক চড় মেরেছিলো মতিন কনকের গালে।
“চোপ শালী!একটা কথা বললে জিভ ছিঁড়ে নেবো তোর।খেতে পাচ্ছিস,ভালো শাড়ি ব্লাউজ,গয়না পরতে পারছিস,শুধু আমার বন্ধুদের সঙ্গে এক আধদিনএকটু শুবি,ব্যস।এতে এত কষ্ট কিসের রে তোর!একদম ফালতু নখরা করবি না।বেশি সতীপনা দেখানো হচ্ছে না?”গর্জে উঠে বলেছিলো মতিন।
প্রথমে বিস্ময়ে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে গিয়েছিলো কনক।তারপর ঘোর কাটিয়ে কনকও চিৎকার করে উঠেছিলো,”কেন,কেন বাবাকে মিথ্যে বলে নিয়ে এলে এখানে?গ্রামে চলে যাবো আমি,কিছুতেই থাকবো না এখানে।”
“যা না!কোথায় যাবি যা!দেখি কেমন ক্ষমতা!গ্রামে চলে যাবে!গ্রাম যেন পাশের গলিতে!” তীব্র শ্লেষের সুরে বলেছিলো মতিন।তারপর আরো কিছু অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে বেরিয়ে গিয়েছিলো সেরাতের মতো।আর বাইরের ঘরটা কেন যে সোফা দিয়ে সাজিয়ে রাখা সেটা সেদিনই প্রথম বুঝতে পেরেছিলো কনক।আর এ ও হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলো যে পালানোর কোনও পথ নেই এখান থেকে।অতএব পালানোর কথা ভাবা বৃথা।হাতে কোন পয়সাকড়ি নেই,এই অচেনা শহরে সে কোথায় যাবে?কার কাছে যাবে?সেখানেও যে শেয়াল কুকুরে তাকে ছিঁড়ে খাবে না,এমন কোন আশ্বাস আছে? এক ফাঁদ থেকে অন্য ফাঁদে গিয়ে পড়বে না তো সে?
এইসব ভাবতে ভাবতে যেন মাথাটা খারাপ হয়ে যায় কনকের।শুধু চোখের জল ফেলা আর এই কারাগার থেকে আদৌ কোনদিন মুক্তি পাবে কি না, সেই কথা চিন্তা করা ছাড়া আর যেন জীবনে কিছু করার নেই তার।

আচমকা দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে সম্বিৎ ফেরে কনকের।কে এলো এই সময়ে? মতিনরা তো ঘন্টা খানেক আগে বেরিয়ে গেছে।এ সপ্তাহে আর এমুখো হবে বলে মনে হয় না।কনকের ওপর কড়া নিষেধ রয়েছে যাকে তাকে দরজা খুলে দেওয়ার বা কারো সঙ্গে কথা বলার।আর কনক এও বুঝে গেছে যে এই পাড়ায় ভদ্রলোকের বাসা নেই,অসামাজিক লোকজনদের গোপন আখড়া এ জায়গা।
আবার কড়া নাড়ার শব্দ।জোরে জোরে।তাহলে কি মতিন ফিরে এলো?দ্বিধাগ্রস্ত মনে দরজার পাল্লা খুলে অবাক হয়ে যায় কনক।দরজায় দু হাতে দুটো জলের জগ হাতে দাঁড়িয়ে এক যুবক।লম্বা,রুক্ষ চেহারা, মাথায় অবিন্যস্ত চুল,মুখে হালকা দাড়ি আর দুটি গভীর কালো চোখ।পরনের নীল কালো গেঞ্জির মধ্যে সুস্পষ্ট তার টানটান ছিপছিপে শারীরিক সৌষ্ঠব।যুবকটি বললো,”একটু খাবার জল হবে?আমি আজই এই ওপরের ঘরে ভাড়া এসেছি।কল থেকে নোংরা জল বেরোচ্ছে।এতদিন বন্ধ ছিল তো,সেইজন্য হয়তো।এই দুটো জগ ভরে দিলেই হবে।”

বহুদিন পর যেন কোন মানুষের গলায় স্বাভাবিক কথা শুনলো কনক।কয়েক সেকেন্ড বিহ্বল হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর জলের জগ দুটো নিয়ে জল ভরে নিয়ে এলো সে।

“এই নিন”,বললো কনক।সে দেখলো তরুণটি কৌতূহলী চোখে তার সোফা ও ফুলদানি দিয়ে সাজানো বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে।ইস!সামনের টেবিলে এঁটো প্লেট আর মদের গ্লাসগুলো দেখে কি ভাবলো ও? বুঝতে পেরে গেছে বোধহয় আসল ব্যাপারটা।লজ্জায় কোনমতে জলের জগ দুটো ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো কনক।বেশ কিছুক্ষণ এক অজানা রোমাঞ্চে বুকটা তিরতির করে কাঁপতে থাকলো তার,কেন,কে জানে!

এরপর কনকের এক অদ্ভূত দ্বৈত জীবন শুরু হলো।স্বর্গ আর নরকের মাঝে এক অদৃশ্য সীমারেখায় বাঁচে সে।মতিন যথারীতি খদ্দের নিয়ে আসে।তবে আগের মতো অত ঘন ঘন নয়,ইদানীং একটু কমই আসে।কারণ মতিন প্রায়ই বিহারে চলে যায়, মনে হয় ওখানেও নতুন ধান্দা খুলেছে সে।
আর এদিকে উপরের ভাড়াটে যুবকটি আসতে যেতে কনকের জানলায় একটু দাঁড়ায়,হাসে।প্রত্যুত্তরে কনকও হাসে।কখনো জিজ্ঞাসা করে,
“বেরোনো হচ্ছে?”
তরুণটি মাথা নেড়ে সায় দেয়।
“হ্যাঁ, এই একটু….”

আর একদিন আবার দরজায় শব্দ হয় কড়া নাড়ার।

“চা এর জন্য চিনি নিতে এসেছি।একদম ফুরিয়ে গেছে।হবে?একটু চিনি?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, এক্ষুণি আনছি।”

কনক কাগজে মুড়ে কিছুটা চিনি দেয় তাকে।দিতে গিয়ে আলতো করে আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যায় দুজনের।দুজনেই ঝটিতি তাকায় একে অন্যের চোখে,তারপর দুজনেই লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়।
ব্যস,এইটুকুই।কেউ কারো নামও জানে না,কিন্তু এক অদম্য আকর্ষণ গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে।একদিন সে যদি কনকের জানলায় না আসে,কনকের মন ছটফট করতে থাকে,অকারণে চোখে জল আসে।কিসের যেন এক ঘোরে থাকে সে।পচাগলা জীবনটাকে হঠাৎ করে ভালোলাগতে থাকে তার।এরই মাঝে মতিন খেয়াল করে,ওপরের বন্ধ ঘরে ভাড়াটে এসেছে,কড়া গলায় শাসিয়ে যায় সে কনককে,”শোন মাগী,কেউ ডাকলেও খবরদার দরজা না খুলবি না,ওপরের কারো সঙ্গে কথা বলবি না।যদি টের পাই না,জীনা হারাম করে দেবো তোর হারামজাদী।”
লোক আসে ওপরের ছেলেটির ঘরেও,ষন্ডামার্কা চেহারা তাদের,কখনো কখনো রাতে এসে পরদিন যায় তারা।কনক লক্ষ্য করে তখন সেই যুবকটি এড়িয়ে চলে কনককে,বুঝতে পারে তারই মত অন্ধকারের জীবন ওই যুবকেরও।

একদিন দুপুরে সোফায় বসে জানলায় চোখ রেখে অপেক্ষা করছিল কনক, কারণ ঠিক এই সময়টাতেই বেরোয় তার নাম না জানা প্রেমিক।ঠিক সময়ে জানলায় দেখা গেল তাকে।এগিয়ে এলো সে কনকের তারে ঘেরা জানলার গরাদের কাছে।নিজের বুকের ধুকপুক আওয়াজ নিজের কানে শুনতে পেলো কনক।স্পষ্ট বুঝতে পারছিলো কনক আজ একটা অন্য কিছু ঘটতে চলেছে।কারণ তারে ঘেরা জানলার গরাদের ওপারে যে চোখ দুটি অপেক্ষা করছে অধীর অপেক্ষায় তাতে আজ অন্যরকম চাউনি,ওই চোখের সীমানা ছাড়িয়ে আজ এতদিনকার সব না বলা জমে ওঠা বন্দী কথাগুলো যেন আজ মুক্তির পথ খুঁজছে।

“শুনুন একটু..”
“কি?”
“ছাদে যাবেন?”
“ছাদে?এখন?”
“হ্যাঁ, কথা আছে।”

কনকের বুকের বাঁ দিকে একটা অবাধ্য কাঁপুনি ধীরে ধীরে সারা শরীর বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে ওকে আস্তে আস্তে বিবশ করে দিচ্ছিলো।কোনমতে নিজেকে ধাতস্থ করলো সে।

“আসছি।দরজার সামনের সিঁড়িটা দিয়ে তো?”
“হ্যাঁ, আপনি আসুন।আমি আছি।”

বুকের মধ্যে যেন একশটা রেল ইঞ্জিন একসাথে চলতে শুরু করলো কনকের।সন্তর্পণে দরজা খুলে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো।এই প্রথম ঘরের চৌকাঠের বাইরে পা রাখলো কনক।ভয়ে,রোমাঞ্চে,উত্তেজনায় ওর মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে হাঁটু দুমড়ে সিঁড়িতে পড়ে যাবে সে যেন।
তিনতলায় পৌঁছে বিবর্ণ কাঠের দরজাতে আলতো ঠেলা দিতেই কনক দেখতে পেলো তাকে।চুন সুড়কি ক্ষয়ে ইঁট বের করা ছাদের পাঁচিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।দুই পা থরথর করে কাঁপছে কনকের, আর দাঁড়াতে পারলো না সে,দরজায় পিঠ দিয়ে বসে পড়লো,দু হাতে মুখ ঢেকে।তার আঙ্গুলগুলো ভিজে উঠলো চোখের বাঁধ না মানা জলে।একবুক উথালপাথাল করা সাগরের জলে নুনের পুতুলের মতো গলে যেতে যেতে আর ডুবে যেতে যেতে কনক নিজেকে আবার খুঁজে পেলো এক পুরুষালি বাহুডোরে।

“কেঁদো না,কেঁদো না এভাবে,একটু শান্ত হও”
“আমি খারাপ…একটা নষ্ট মেয়ে…”
“আমিও খারাপ।”
“কেন?কি করো তুমি?তোমার ঘরে কারা আসে সব?”
“বোমা,গ্রেনেড এসব বানাই।ওরা সব পার্টির গুন্ডা।পার্টির ক্যান্টিনে কাজ দেবে বলে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল।তারপর এই বোমা বাঁধার কাজে লাগিয়েছে। অ্যাকশনেও যেতে হয় মাঝে মাঝে।”
“গ্রাম কোথায় তোমার?”
“নসীপুর,জৌগ্রাম।করিমপুরের কাছে।”
“আর নাম?”
“মুস্তাক,মুস্তাক আলী।”
“তুমি মুসলমান?”
“হ্যাঁ।কি হয়েছে?”
“কিছু হয়নি তো…”

“হ্যাঁ হয়েছে,কনকের একটা মুস্তাক হয়েছে।”
মনে মনে বললো কনক।মুখে বললো,”আমার নাম কনক।চলো ছাদের পাঁচিলে দাঁড়াই।”

ছাদের পাঁচিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা।মুস্তাক আর কনক।ছাদের উপর আকাশ অনেক বড়,সীমানাহীন।বিস্তীর্ণ জঙ্গলের মত গিজিগিজি বাড়ি চতুর্দিকে।সব ছাড়িয়ে দেখা যাচ্ছে হাওড়া ব্রিজ।দূরে নয়,কাছেই।দু চোখ বুঁজে বুক ভরে খোলা হাওয়ায় লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলো কনক।তারপর হাত রাখলো মুস্তাকের হাতে,বললো,
“কিছু বলবে?কথা আছে বলছিলে?”
“এখান থেকে হয়তো চলে যেতে হবে আমাকে।মুর্গাসোলে।একশন আছে।ফিরে আসবো আবার,কিন্তু কবে জানি না।তবে খুব বেশিদিন দেরি হবে না ফিরতে,দিন পনেরো কুড়ি হতে পারে।ভাবলাম যাওয়ার আগে একবার জানিয়ে দিয়ে যাই।”
“না,না,না,তুমি যাবে না।আমি কি করবো তাহলে?আমি কি করে বাঁচবো?”হাহাকার করে উঠলো কনক।
কিছুক্ষণ দূরে তাকিয়ে রইলো মুস্তাক।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস গলায় বললো,”জানি না।”
কনক শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মুস্তাকের কাঁধ।স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মুস্তাকের দিকে।তারপর মরিয়া গলায় বলে,
“চলো,পালাই।পালাবে?”
“কোথায় পালাবে?পালিয়ে কোথায় যাবে?”
“যেখানে হোক।ওই তো হাওড়া ব্রিজ দেখা যাচ্ছে।হাওড়া স্টেশনে গিয়ে যে ট্রেনে পারি উঠে পড়বো।চলো বেরিয়ে পড়ি,এক্ষুনি।”
“অত সোজা নয়,গলির মুখে যে পানবিড়ির দোকানটা আছে,ওই পানওয়ালাটা ওদের লোক।এই গলির ওপর নজর রাখে।তোমার বরেরও জানবে লোক ফিট করা আছে কাছেই কোথাও,তুমি পালিয়ে যাও কি না দেখতে।মরবে নাকি পালাতে গিয়ে?”
“মরেই তো আছি,নতুন করে আর কি মরবো?এখানে এই কালকুঠুরির মধ্যে কয়েদীর মতো বন্দী হয়ে এইভাবে পচেগলে মরার থেকে বাইরে গিয়ে মরা ভালো।আর তুমিও একদিন মরবে বোমা বাঁধতে গিয়ে,নয়তো একশনে।তার থেকে একসাথে বাঁচার একটা শেষ চেষ্টা করি চলো!”
“সেটার জন্য আগে থেকে ভালো করে প্ল্যান করতে হবে,এভাবে হবেনা।কোনও লাভ হবে না,মাঝখান থেকে বিপদ বাড়বে।একটু সবুর করো।আমি একটু দেখি কিভাবে সুযোগ করা যায়।আমার ওপর ভরসা আছে তো তোমার?”
“তুমি ছাড়া আমার আর কে আর আছে বলো ভরসা করার মতো?ঠিক আছে,আমি অপেক্ষা করে থাকবো।চলো, এখন নিচে যাই।কে যে কখন এসে হাজির হয়!ঘরের দরজা খোলা রেখে এসেছি।”

সিঁড়ি বেয়ে আবার নেমে আসে দুজনে।নিচের ঘরে দরজার সামনে এসে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে যায় কনক।দরজায় হাত রেখে নেশালাগা চোখে তাকিয়ে থাকে মুস্তাকের চোখে।একই আবেশ মুস্তাকের চোখেও।দুজনেরই শরীর মন প্রাণের প্রতিটি কণা তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে একে অন্যের দিকে,যে গতিবেগের ওপর কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।সমাজ,সংসার সব আজ মিথ্যে হয়ে মুছে গেছে,মিথ্যে হয়ে গেছে জীবনের সমস্ত কলরব,অজানা অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে বাইরের পৃথিবী।দৃঢ়,অটল সত্য হয়ে,স্পষ্ট হয়ে,ঘরের চৌকাঠের বাইরে আর ভিতরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধু দুটি আবেগমথিত নারী ও পুরুষহৃদয়।সৃষ্টির আদিকাল থেকে যেন এভাবেই তারা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে,নীরব ও পবিত্র অপেক্ষায়।
মুস্তাককে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে আসে কনক,সোফায় বসায়,তারপর নিজেকে সঁপে দেয় তার ভালবাসার মানুষটির কাছে,যে মানুষটি ছিলো তার সলজ্জ কল্পনায়,বিয়ের আগে,যেমন সব সাধারণ মেয়েদের থাকে।কনক যেন হঠাৎ করেই বুঝতে পারে এই পুরুষটির প্রতি তার ভালোবাসা হঠাৎ করে জন্মায়নি,এই ভালোবাসায় কোন স্বার্থ নেই তার,আমৃত্যু এই নরকে থাকলেও আগামী হাজার বছর সে মুস্তাককেই ভালোবাসবে।

কেটে যায় আরো কয়েকটা মাস।মুস্তাক মাঝে মাঝে কলকাতার বাইরে যায়।যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা চিরকুটে ফেরার দিন ও তারিখ লিখে রেখে পাকিয়ে কনকের জানলার এককোণে তারের জালের ফাঁকে গুঁজে রেখে যায় মুস্তাক।এভাবেই বার্তা বিনিময় করে তারা।এছাড়া যোগাযোগের আর কোনও উপায় নেই ওদের।মতিন কনককে ফোন রাখতে দেয় না।মুস্তাক অবশ্য একটা সাধারণ মুঠোফোন একবার কিনে দিয়েছিল কনককে।রান্নাঘরে চালের ডিবের মধ্যে সেই ফোন আর তার চার্জার লুকিয়ে রাখতো কনক।একদিন অফ করে রাখতে ভুলে যাওয়ায় বেটাইমে বেজে উঠেছিলো সেটা।কনকের বাইরের ঘরে তখন মতিন সহ দুজন লোক বসে মদ গিলছে,আর ওদের জন্য রান্নাঘরে মাংস রাঁধছিলো কনক।ফোন বেজে উঠতেই এক লহমায় হৃদপিন্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে এসে আটকে গিয়েছিলো কনকের।ঝটিতি চালের ডিবের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কোনমতে ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়েছিলো কনক।ইতিমধ্যে ওর কানে এসেছে চেয়ার ঠেলে বসার ঘর থেকে মতিনের রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসার পায়ের শব্দ।আর এক মুহূর্তও না ভেবে ফোনটা ফুটন্ত মাংসের ঝোলের কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো কনক।টলোমলো পায়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলো মতিন,নেশায় রক্তজবার মতো লাল চোখ দুটোকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো,”ফোন বাজলো কোত্থেকে রে?নাগর জুটিয়ে ফেলেছিস নাকি এখানে?”
“ফোন?ফোন কোত্থেকে বাজবে?”পাল্টা প্রশ্ন করলো কনক।
মতিন এতটুকুও বিশ্বাস করে নি কনকের কথা।রান্নাঘরে ঢুকে এ তাক সে তাক হাতড়ে হাতড়ে,কৌটো,ডিবে,শিশি সব সরিয়ে সরিয়ে দেখেছিলো কোনো ফাঁকে কোনও ফোন লুকানো আছে কিনা।তারপর কোথাও কিছু না পেয়ে ক্যাৎ করে কনকের কোমরে একটা লাথি কষিয়ে বলেছিলো,”কোন ধরনের কোনও চালাকি করবি না,মাগী।একবার ধরা পড়লে কিন্তু মারতে মারতে শেষ করে ফেলবো তোকে,মনে রাখিস।”এই বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো মতিন।বসে রান্না করার টুলটা থেকে মেঝেয় ছিটকে পড়ে গিয়েছিলো কনক।তারপর গলায় আটকে থাকা শ্বাসটাকে কোনমতে গিলে,মেঝে থেকে উঠে কোমরটাকে একহাতে ডলতে ডলতে অন্যহাতে হাতা ডুবিয়ে মাংসের ঝোল থেকে উদ্ধার করেছিলো ফোনটাকে।সেটা অবশ্য দেহ রেখেছে ততক্ষণে।ব্যস,আর কোনও ঝুঁকি নেয়নি কনক।সেই ঘটনার পর থেকে যোগাযোগের এই ব্যবস্থা।

মুস্তাক আর কনকের গোপন সাক্ষাৎ ও প্রেমের মিলনের সাক্ষী থাকে কনকের ঘরের সোফাটি।ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কনক তার ভিতরের শোয়ার ঘরের কলুষিত শয্যায় কখনও নিয়ে যায় না মুস্তাককে।কনকের জীবনের রুক্ষ,শুষ্ক,তপ্ত,দুঃসহ মরুভূমির বুকে এক চিলতে মরূদ্যান যেন তার এই সোফাওয়ালা ঘরটি।নীরবে,নিভৃতে বৃষ্টি নামে এখানে,ভিজে তৃপ্ত,স্নিগ্ধ হয় দুটি শরীর ও মন।তৃতীয় কোন ব্যক্তি জানতে পারে না সেই বৃষ্টির খবর।
একদিন মুস্তাক তাকে বলে,
“আগামী সপ্তাহে একশনে বেরিয়ে যাবো।ফিরে এসে নিয়ে যাবো তোমাকে।একটা ঘর দেখে এসেছি মাইথনের কাছে কুমারডুবিতে।শোনো মন দিয়ে,খোঁজ নিয়েছি গলির মোড়ে ওই পানওয়ালা হোলির সময় দু সপ্তাহের জন্য দেশে যাবে দোকান বন্ধ রেখে।ওই সুযোগে পালাতে হবে।তুমি কিন্তু এ’কদিন খুব সাবধানে থেকো।তোমার বর যেন কোনরকম সন্দেহ না করে বসে।”
“কবে আসবে?আমার যে খুব ভয় করছে।”
“ধূর পাগলী,ক’টা দিনের তো ব্যাপার।একটু কষ্ট করে থাকো, কেমন?”

হোলি আসছে।কানা গলির মধ্যে যেটুকু রোদহাওয়া যাওয়া আসা করে, তাতে লেগেছে ফাগুনের মৌতাত।কোথা থেকে যে নেশাগ্রস্তের মতো একটা কোকিল ডেকে চলে দিনরাত কে জানে!দূর থেকে রাতের বেলায় ভোজপুরী ভাষায় ঢোল সহযোগে হোলির গান ভেসে আসে কনকের কানে।

“ফাগুন মে উড়ে গুলাল,কহিও নন্দরানীসে/হমারী রাধা ভোলিভালি,নটখট নন্দ কে লাল,কহিও নন্দরানিসে/
রাধা কে হাথ মে চুড়িয়া সোহে/চুড়িয়া সোহে রাধা কঙ্গন সোহে/বংশি বাজাওয়ে নন্দলাল কহিও নন্দরানীসে”…

গান তো নয়,যেন উচ্চকন্ঠে রাধার বিরহবিলাপের ক্রন্দনধ্বনি ভেসে আসে দূর থেকে।মুস্তাকের সঙ্গে প্রায় ষোল সতেরো দিন হলো কোন যোগাযোগ নেই কনকের।মুস্তাক যে এই বাড়িটায় নেই সেটা ভাবলে কান্নার একটা দলা এসে আটকে যায় কনকের গলায়।দেখা হোক না হোক,মুস্তাক যে ঠিক ওপরের তলাটায় রয়েছে,চলা ফেরা করছে,এটাই অনেক,অনেকটা ওর কাছে।বিষাদঘন আবছা আঁধারে একা চুপচাপ বসে কান্না গিলতে থাকে কনক।দুঃখে,আশঙ্কায়,উৎকণ্ঠায়,উত্তেজনায় সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে সোফার চাদরটা,যেটায় মুস্তাকের স্পর্শ লেগে আছে এখনো যেন,মনে হয় তার।দুশ্চিন্তার ধোঁয়ার কুন্ডলী ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে কনককে।
কি হবে? পারবে তো পালাতে?মতিন এখন কলকাতায় নেই।কি ধান্দায় না জানি শিলিগুড়ি গেছে।ইস!এই সময়টায় বেরিয়ে যেতে পারলে…..

এইসব সাতপাঁচই কনক ভাবছিলো সেই রাতে নিজের ঘরে বসে বসে।হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ে উঠলো।চমকে উঠলো কনক।কে এলো?মুস্তাক তো কড়া নাড়ে না,প্রথমে একবার,তারপর পরপর তিনবার মৃদু টোকা দেয়।ওটাই সংকেত।ধন্দে পড়ে গেলো কনক,দরজা খুলবে কি খুলবে না ভেবে।এরপরই প্রচন্ড জোরে কড়া নাড়ার শব্দ উঠলো দরজায়,তারপর ধাক্কার পর ধাক্কা,দরজা যেন ভেঙ্গে পড়বে।
দরজা খুলতেই আতঁকে ওঠে কনক।

মুস্তাক।

রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে তার জামা।মেঝেতে আছড়ে পড়ে কোনমতে বুক ঘষটে সে লুকোয় সোফার পিছনে।কিছু বলার বা বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড়িয়ে পুলিশের দল ঢুকে পড়ে কনকের ঘরে।রক্তের দাগ লক্ষ্য করে গুলিবৃষ্টি চালাতে থাকে তারা,গুলিতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় সোফাটা। বিস্ময়ের প্রাথমিক আঘাতটা কাটিয়ে উঠে এক পা এগোতেই কনককে একজন পুলিশ এক ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয় পেছনে।টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো কনক। বোবা আতঙ্কে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এলো কনকের।তার সামনেই সোফার পিছন থেকে পুলিশ টেনে বের করলো মুস্তাকের গুলিবিদ্ধ, নিষ্প্রাণ দেহটা।একজন পুলিশ অফিসার কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলো কনককে,
“কি সম্পর্ক আপনার,এই গুন্ডাটার সাথে?”

পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে সহসা যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।মহাশূন্যের কোন এক কৃষ্ণগহ্বরে আছড়ে পড়ে নিশ্চল হয়ে গেছে সময়ঘড়ির কাঁটা।কনকের কানের কাছে অজস্র ঝিঁ ঝিঁ পোকার অসহ্য বিরামহীন ডাক।তারই মধ্যে পুলিশ অফিসারের কড়া গলায় প্রশ্ন ভেসে আসে আবার,”কি হলো?চুপ করে থাকলে হবে না, উত্তর দিন।গুন্ডাটাকে চেনেন আপনি?কি সম্পর্ক আপনার এর সাথে?”
“কোন সম্পর্ক নেই।ওপরের ঘরে ভাড়া থাকতো,মাঝে মাঝে চাবি রেখে যেতো।” কনক নয়,যেন অন্য কে একজন ওর ভেতর থেকে উত্তর দিলো।
পুলিশ অফিসার আপাদমস্তক একবার মেপে নিলেন কনককে।তারপর আবার প্রশ্ন করলেন,”আপনি তো বিবাহিত দেখছি।আপনার স্বামী কোথায়?”
“বাইরে গেছে, কাজে।”,যন্ত্রচালিতের মতো উত্তর দিলো কনক।
“ঠিক আছে,কাল সকালে পুলিশের স্পেশাল টিম আসবে তদন্ত করতে।আপনাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।কোথাও যাবেন না,বাড়িতেই থাকবেন যেন।”,আদেশের সুরে বললেন অফিসার।কোনমতে মাথা নেড়ে সায় দিলো কনক।
“পান্ডে,সান্যাল বাইরে থেকে স্পট সিল করে দাও।বডি ভ্যান আসছে?খবর দিয়েছো?”অন্য পুলিশদের দিকে তাকিয়ে বললেন অফিসার।
“হ্যাঁ,স্যার।এসে গেছে।গলির মুখটাতেই রয়েছে।”,উত্তর দিল আরেকজন।

মুস্তাকের দেহ পুলিশদের দল নিয়ে চলে গেল।আরো একটা দল এসে স্পট সীল করে দিলো।তাদের মধ্যে থেকে একজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে বললো,“দরজাটা ভেতর থেকে ভালো করে বন্ধ করে দিন।আর একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি,সেভ করে নিন।আর আপনার ফোন নম্বরটাও দিন।”
“ফোন তো নেই,খারাপ হয়ে গেছে।”একই রকম যান্ত্রিক সুরে উত্তর দিলো কনক।
কনককে দেখে বোধহয় মায়া হচ্ছিলো পুলিশ কনস্টেবলটির।“ও আচ্ছা,যাই হোক।চিন্তা করবেন না।গলির মোড়ে চারজন সিভিল ড্রেসের পুলিশ পোস্টেড আছে।ওরা নজর রাখবে।”আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো সে।
“আচ্ছা।”,নিষ্প্রাণ কন্ঠে সায় দিলো কনক।

পুলিশ কনস্টেবলটি বেরিয়ে গেলে ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে পাথরের মূর্তির মতো ঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে রইলো কনক।প্রহরের পর নিকষ কালো প্রহর কেটে যেতে লাগলো।একসময় দূর থেকে ভেসে এলো দিনের প্রথম কাকের ভীতু,দ্বিধাগ্রস্ত ডাক।সম্বিৎ ফিরলো কনকের।কাপড়ের খুঁট দিয়ে ঘষে ঘষে মাথার সিঁদুরটা তুললো সে।শুকনো,খরখরে চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বসে থেকে থেকে একসময় মেঝেতে শুয়ে পড়ল কনক।

পরদিন সকালে দরজা ভেঙ্গে কনকের লাশ উদ্ধার করলো পুলিশ।সোফার লেস লাগানো চাদরটা গলায় বেঁধে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে কনক।তার ঝুলন্ত দেহের নীচে উল্টে পড়ে আছে পুলিশের গুলিতে ফুঁড়ে যাওয়া তার প্রিয় সোফাটা।

এই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব এবং এই সম্পর্কিত কোনো দায় কতৃপক্ষের নয় ।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *