বিনোদ ঘোষাল
সময়টা ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাস। তরুণ কবি নজরুল ইসলাম তখন কলকাতার তালতলা লেনের মেসবাড়িতে থাকেন মুজফফর আহমেদের সঙ্গে। নজরুল তখন পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার লড়াইতে পা মেলাতে শুরু করেছেন। একইদিকে যেমন দেশবন্ধুর আদর্শে উদবুদ্ধ হয়ে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাস্তায় নেমে মিছিল মিটিং-এ গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করছেন একইসঙ্গে মুজফফরের সঙ্গে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কাজে সচেষ্ট। মস্কো থেকে প্রেরিত মানবেন্দ্র নাথ রায়ের দূতের সঙ্গে মুজফফর আহমদ এবং নজরুলের মিটিং হয়েছে। কীভাবে পার্টি গঠন করা হবে তাই নিয়ে জল্পনা চলছে। একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অন্যদিকে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে নজরুল প্রবল ব্যস্ত। সঙ্গে কবিতা লেখালিখি তো চলছেই। কলকাতার সাহিত্যমহলে ইতোমধ্যেই নজর কেড়েছে এই যুধফেরত হাবিলদার কবির অন্যধারার লেখনী। বিশেষ করে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নজরুলের অবিশ্বাস্য কলমের শক্তি সম্পর্কে সাহিত্য তথা রাজনৈতিক মহলে আলোরণ তৈরি হয়েছে। এই কবি যে লেখনীর মাধ্যমে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তা শুধু দেশের মানুষ নয় ইংরেজ শাসকও টের পেয়েছে, তারা এবার নড়েচড়ে বসেছে। নজর রাখছে এই তরুণ জ্বালাময়ী লেখনীর প্রতি। গোয়েন্দাবিভাগে নিয়মিত জমা পড়ছে নজরুলের লিখিত প্রতিটি কবিতা, প্রবন্ধ। এরমধ্যেই গ্রাফতার হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর সম্পাদিত বাঙ্গালার কথা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন দেশবন্ধুর সহধর্মিনী বাসন্তিদেবী। তিনিও পড়েছেন কাজীর লেখা। বুঝেছেন এই ছেলেটির লেখায় আলাদা আগুন রয়েছে, স্থির করলেন পত্রিকায় নজরুলের লেখা ছাপাতে হবে। দেওর সুররঞ্জনকে পাঠালেন তালতলার ঠিকানায়। একদিন সকালে সুররঞ্জন দাশ এসে হাজির হলেন ৩,৪ সি তালতলালেনের মেসে। ঘরে তখন মুজফফর আহমদ এবং নজরুল দুজনেই উপস্থিত। সুররঞ্জন নিজের পরিচয় দিয়ে আগমনে উদ্দেশ্য জানানো মাত্রই নজরুল সোল্লাসে দে গরুর গা ধুইয়ে বলে তক্তপোষে বসে তখনই পত্রিকার জন্য লিখতে শুরু করে দিলেন। মুজফফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন, তিনি আর সুররঞ্জনবাবু নিচু গলায় কথা বলছিলেন আর নজরুল তক্তপোষে পিছন ফিরে বসে খাতায় পেনসিক দিয়ে খসখস করে লিখছিলেন। পুরো লেখাটি লিখতে সময় লেগেছিল আধঘন্টা মত। জন্ম হল এক অবিস্মরণীয় কবিতা।
কারার ঐ লৌহকপাট
ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট
রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
এই কবিতাও প্রকাশ হওয়া মাত্র বাঙলার মানুষের মুখে মুখে তা ছড়িয়ে গেল। তারপর নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকায় যখন প্রকাশিত হল আনন্দময়ীর আগমনে নামের কবিতা, ব্রিটিশ সরকার আর অপেক্ষা করল না, নজরুলকে গ্রেফতারের বন্দোবস্ত করল। কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হল নজরুলকে। বিচারের নামে খানিক প্রহসণ হয়ে একবছরের কারাদণ্ড হল কবির।
একবছরের কারাজীবনে নজরুল ইসলাম তিনটি জেলখানায় থেকেছেন। আলীপুর সেন্ট্রাল জেল, হুগলি জেল এবং শেষে বহরমপুর জেল।এই তিনটি জেলের মধ্যে সবচেয়ে দূর্বিসহ ছিল হুগলিজেল। কেমন ছিল সেই কারাবাসের অভিজ্ঞতা? কবির নিজের কিছু কথা এবং কবির দুই সহবন্দি নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী ও খান মৈনুদ্দীনের স্মৃতিচারণায় তা জীবন্তরূপে ফুটে উঠেছে।
হুগলি জেলের সুপার থার্সটোন সাহেব ছিলেন অসম্ভব অত্যাচারী একজন লোক। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাজবন্দিদের কতরকমভাবে অত্যাচার করা যায় তার ফিকির খোঁজা। নজরুল যেদিন হুগলি জেলে গেলেন তারপর দিন থেকেই তিনি থার্সটোনের কুনজরে পড়ে গেছিলেন। কী ঘটেছিল আসুন একটু জানা যাক।
সকাল সাতটা। হুগলি জেলে নজরুলের প্রথম দিন। জেলগেটে ঢং করে একটা ঘন্টা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সারা জেলখানা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সপারিষদ জেল সুপার মিস্টার থার্সটোন আসছেন বন্দীদের দর্শন দিতে। এবং তাদের কোনও অভাব অভিযোগ থাকলে তা শুনতে। শাহী কায়দায় বুটের খটখট শব্দ করে এগোতে থাকলেন থার্সটোন। কালো পাগড়িধারী একজন একজন কনভিকটেড ওয়ার্ডার চিৎকার করে উঠল, হুঁশিয়ার হো যাওওওওওও…সরকার সালাম আজবর। আজবর হল ইংরেজি ‘এ্যাজ ইউ ওয়্যার’ এর বিশেষ বঙ্গীকরণ।
এগারো নম্বর ঘরের সামনে এসেও কালো পাগড়ি ওই কথাগুলোই উচ্চারণ করল।কিন্তু জেলবন্দীদের মধ্যে কোনওপ্রকার চাঞ্চল্য দেখা গেল না। নজরুলকে আগে থেকেই বাকি বন্দীরা বলে রেখেছিল কী কী করতে হবে। নজরুল ঠিক তাইই করতে থাকল। থার্সটোন তার পারিষদসহ ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন বটে কিন্তু ঘরের বন্দীরা যেন তার অস্তিত্বকে স্বীকারই করল না। যেমন শুয়ে বসে –বসে ছিল তেমনই রইল। নজরুল নিজের বিছানায় শুয়ে পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে থাকল এবং গুণগুণ করে গান গাইতে থাকল।
হোয়াট ইজ দিজ! বিশ্রী কর্কশকন্ঠে গর্জে উঠলেন জেল সুপার।
বন্দীরা পুরো বোবা।
আই সে হোয়াট ইজ দিজ! আবারও চিৎকার করে উঠলেন।
এমন চিৎকারে ভয় পাওয়ার বদলে বন্দীদের মধ্যে চাপ হাসির রোল উঠল। কে যেন নিচুগলায় বলে উঠল নাথিং।
ডু ইউ নট ফলো ডিসিপ্লিন?
নো। আবার চাপা গলায় কারও উত্তর।
এবার থার্সটোনের নজর পড়ল নজরুলের দিকে। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে দিব্বি নাচাচ্ছে। দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল সুপারের।নজরুলের সামনে এসে রাগে গরগর করে বললেন, হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?
নজরুল ফিক করে হেসে উত্তর দিল নাথিং।
হোয়াট!
এ্যাবসলুটলি নাথিং।
ওহ হু ইজ দিস? জেলরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সুপার।
জেলর সাহেব থার্সটোনের কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। শুনে সুপার বললেন, ওহ দেন ইউ…ইউ দ্য রেবল পোয়েট?
ইয়েস স্যর। নট অনলি পোয়েট বাট দ্য সারথী অফ ধুমকেতু অলসো। ইউ নো হোয়াট ইজ ধুমকেতু?
নজরুলের এমন কথায় আবারও হা হা করে হেসে উঠল বন্দীরা।
এমন বিদ্রুপে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল সুপার। ইউ নিড পানিশমেন্ট। নজরুল সহ আরও কয়েকজনকে আগামী তিনদিনের জন্য পেনাল ডায়েটের শাস্তি দিয়ে গটমট করে চলে গেলেন।পেনাল ডায়েট হল ভাতের বদলে শুধু মাড় দেওয়া হবে এবং তাতে ডাল, তরকারি, নুন কিচ্ছু থাকবে না। দুইবেলা শুধু ওই মাড় খেয়ে থাকতে হবে।সেই শুরু। তারপর হুগলি জেলের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তই যেন অসহ্য। আলীপুর জেলে স্পেশাল কয়েদিদের যে স্বাধীনতা ছিল, যে সুযোগ-সুবিধা, সম্মান ছিল তার কিছুই এখানে নেই।থার্সটোন সহ জেলর, ডেপুটি সুপার, সিপাই সব এক একটি মূর্তিমান শয়তান।
কয়েকদিনের মধ্যেই এই জেলখানা অসহনীয় হয়ে উঠল নজরুলের।জেলে সাধারণ ও রাজনৈতিক কয়েদিদের দিয়ে একটা ফুলের এবং একটা সবজি বাগান করা হয়েছে। সেই বাগানে যেসব তরিতরকারি আনাজ হয় তা কয়েদিদের জন্যই ব্যবহার করার কথা। কিন্তু হুগলি জেল চলে তার নিজের নিয়মে। সপ্তাহে যে ক’দিন মাছ বা মাংস দেওয়ার কথা সেদিন কয়েদিদের কপালে জোটে মাছের কাঁটা এবং মাংসের হাড়োগোড়। আর তরকারির মধ্যে সবজির বদলে পাওয়া যায় তরকারির খোসা, কপির বুড়ো ডাঁটা,শুকনো পাতা, দরকচা পোকা ধরা বেগুন, ঝিঙে, আধপচা লাউ অথবা কুমড়ো। তারমধ্যেই খুদ ও ধানের কুন মিশিয়ে আধসিদ্ধ করে সেই চটচটে বস্তুটা সাতসকালে বন্দীদের সানকিতে ঢেলে দেয় ফালতুরা। একে বলে লপসি। তার স্বাদ তো দূরের কথা, কালো রঙ দেখলেই গা ঘুলিয়ে ওঠে। ওই কুৎসিত কালো অখাদ্য লপসিই হল এখানকার ব্রেকফাস্ট। দুপুর আর রাতের আহারও তথৈবচ। মুখে দেওয়া তো দূ রের কথা খাবারেরকথা ভাবলেই বমি আসে। এ ছাড়াও হার্সটোনের নিত্যনতুন অত্যাচার তো রয়েছেই।কিন্তু এত অত্যাচার করেও সে কিছুতেই এইসব দুরন্ত নির্ভীক বিপ্লবীদের শিরদাঁড়া ভাঙা যায় না। বরং প্রতিদিনই তারা নতুনভাবে জ্বলে ওঠে। জেলরের কড়া নির্দেশ একমাত্র সরকার মনোনীত কাগজ ছাড়া জেলের ভেতরে আর কোনও ভেতরে যেন না আসে। তারমধ্যেই নজরুল থার্স্টোনকে ব্যঙ্গ করে লিখে ফেললেন একটী প্যারোডি গান।রবি ঠাকুরের লেখা তোমারই গেহে পালিছ স্নেহের সুরে সেই গান সহবন্দিদের শিখিয়ে দিলেন নজরুল। কেমন? বলে নজরুল ওই সুরে গাইতে শুরু করল-
তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে
তুমি ধন্য ধন্য হে,
আমার এ গান তোমারি ধ্যান
তুমি ধন্য ধন্য হে।।
রেখেছ সান্ত্রী পাহারা দোরে।
আঁধার কক্ষে জামাই আদরে,
বেঁধেছ শিকল প্রণয়- ডোরে
তুমি ধন্য ধন্য হে।…
পরদিন রোজের মতো আজ সকালেও থার্সটোন সাহেব তার বুটের খট খট শব্দ তুলে সপারিষদ জেলের কয়েদি পরিদর্শনে বেরোলেন। সাধারণ কয়েদিদের দেখার পর চোয়াল শক্ত করে এসে এগারো নম্বর কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন থার্সটোন। কালো পাগড়িওলা সিপাই সরকার সালাম আজবর বলে হাঁক পাড়ামাত্রই এতক্ষণ চুপচাপ শুয়ে বসে থাকা লোকগুলো আচমকাই উঠে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করল-
তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে
তুমি ধন্য ধন্য হে…
সুপার প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেন। এসব কী!জেলর, ডেপুটি সুপার, জমাদার, ডাক্তার সকলেই হতভম্ব।
নজরুল সবার আগে। হার্সটোনের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে গাইতে থাকল-
আঁকাড়া চালের অন্ন লবন
করেছে আমার রসনা-লোভন
বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লপসী-শোভন
তুমি ধন্য ধন্য হে…
স্টপ অল দিজ ননসেন্স স্টপ। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো চিৎকার করে উঠলেন থার্সটোন। চোখ মুখ এমন লাল হয়ে উঠল যেন এখনই চামড়া ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসবে।ইউ ড্যাম ফুল সোয়াইন। নজরুলের দিকে আঙুল দিকে দাঁতে দাঁত ঘসে বললেন সাহেব।সকলকে আবারও চমকে দিয়ে নজরুলও পালটা বলে উঠল, ইউ ড্যাম ফুল সোয়াইন!সাহেব পুরো হতবাক! এ ছোঁড়া বলে কী! কালা আদমীর এত সাহস! হ্যাভ ইউ কলড মি নেমস!
ইউ হ্যাভ কলড ইট ফার্স্ট! চোখে চোখ রেখে আঙুল তুলে বলল নজরুল।
ইউ…ইউ…রাগে কথা আটকে গেল সাহেবের। জেলখানায় হাওয়া পর্যন্ত বইছে না এমন নৈঃশব্দ।
আই উইল টিচ ইউ আ লেসন…ইউ সোয়াইন! ঘর থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেলেন সাহেব, পিছনে তার অনুচরেরা। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘরের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল জেলর এবং সিপাইরা।জেলর বললেন, সুপারের নির্দেশে আপনাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনারা সহযোগিতা করুন। বলে তিনি যারা গান গেয়েছিল প্রত্যেকের হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানোর নির্দেশ দিলেন। জোর করে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাওয়া হল নজরুলকে। বন্দীরা সমবেতকন্ঠে ধ্বনি দিলেন
বন্দে মাতরম! ভারত মাতা কী জয়? গান্ধীজী কী জয়!
নজরুলও ওই অবস্থায় গলা মেলাল।জেলের পশ্চিমদিকে পূবমুখী সারসার সেল। প্রতিটির মাপ ছয়ফুট বাই চার ফুট। ওই লাইনেরই পাঁচ নম্বর সেলে নজরুলকে ভরে লোহার দরজা আটকে দেওয়া হল।একে হাতে পায়ে শিকল তার ওপর এইটুকু কুঠুরি। ভাল করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর্যন্ত উপায় নেই। খাট নেই। একটামাত্র কম্বল। ব্যাস।সুপার হার্সটোনের নির্দেশে রাজবন্দীদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল সমস্ত সুযোগসুবিধা।দুইবেলার খাদ্য বলতে শুধু পেনাল ডায়েট অর্থ্যাৎ নুন ছাড়া ভাতের ফ্যান, সকাল আর বিকেলে শুধুমাত্র এক ঘন্টার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় বাকি সময়টা হাতে পায়ে শিকলবাঁধা অবস্থায় নির্জন সেলে একা। সারা দিন, সারা রাত্রি। এ যে কী অসহনীয় শাস্তি তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। লেখার কাগজ কলম কিছু নেই অথচ মনের ভেতর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনকে কীভাবে ওগরাবে বুঝতে পারে না নজরুল। যা লেখা আসে গান গেয়ে অথবা আবৃত্তি করে মনে রাখার চেষ্টা করে। কখনও হুংকার দিয়ে উঠে বলে-
সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়
নাই কিরে কেউ সত্য-সাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়
শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়
বজ্র হাতে জিন্দানের ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়
দিন যায় রাত যায় এই অমানুষিক জীবন প্রতি মুহূর্তে অসহ্য লাগে। ইচ্ছে করে দুই হাতে এই গরাদটা ভেঙে ফেলে বাইরের বিশাল পৃথিবীতে আবার আগের মতো ছুটে বেড়াতে। কিন্তু মুক্তি কই? মুক্তি নেই…প্রতিটা মুহূর্তকে মনে হয় অনন্তকাল। যুগের পর যুগ ধরে এই কফিনের মতো খুপরির মধ্যে নিজের শরীরটাকে আটকে রাখা যে কী দুঃসহ যন্ত্রণার তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারও বোঝার সাধ্য নেই। দম বন্ধ হয়ে আসে। জীবনের প্রতি যে তীব্র আকাঙ্খা তা কখনও স্তিমিত হয়ে আসে হতাশায়। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। পরমুহূর্তেই নিজেকে জ্বালিয়ে তোলে নজরুল। গভীর রাতে পৃথিবী যখন নিশ্চুপ, ঘুমে মগ্ন তখন নিজের আগুনেই ধকধক করে জ্বলতে থাকা নজরুল শিকলে বাঁধা দুই হাত গারদে ঠুকে ঝনাত ঝনাত শব্দ তুলে গাইতে থাকে-
এই শিকল পরা ছল মোদের এ
শিকল পরা ছল,
এই শিকল পরেই শিকল তোদের
করব রে বিকল!
তোমার বন্দী কারায় আসা মোদের
বন্দী হতে নয়!
পাশের সেলগুলিতে যারা নজরুলের মতোই একাকী, চার বাই ছয় কুঠুরিতে অমানবিক দিন
যাপন করছেন তারাও নজরুলের লেখা গানটির সঙ্গে গলা মেলায়-
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের
সবার বাঁধন ভয়
এই বাঁধন দিয়েই বাঁধন ভয়কে
করবো মোরা জয়,
কন্ঠস্বর আরও দৃঢ় হয় নজরুলের। দ্বিগুণ উৎসাহে গরাদের শিকলের ঝনঝন শব্দ
তুলে গলা ছাড়ে-
এ শিকল বাঁধার পা নয় এ
শিকল ভাঙ্গা কল…
যত রকমের অত্যাচার করা সম্ভব সবরকম প্রয়োগ করেও থার্সটোন সাহেব বুঝতে পারছিলেন তিনি হেরে যাচ্ছেন। রাজবন্দীদের মরন কামড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন তিনি। মাত্র একবেলা দুর্গন্ধযুক্ত পচা ভাতের মাড় খাবার হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, সারাদিনে যে একঘন্টা সেলের বাইরে রাজবন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হত সেটাও বন্ধ করে দিলেন। ২৪ ঘন্টা দিনের পর দিন একবেলা ওই কুখাদ্য খেয়ে আর ওই কুঠুরির মধ্যে আটক থেকেনাভিঃশ্বাস উঠে গেল বন্দীদের। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ল, পাতলা দাস্ত, বমি। ফলে নজরুল এবং আরও কয়েকজন মিলে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শেষ অস্ত্র তুলে নিল। অনশন…আমরণ অনশন! আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হল-কাজী নজরুল ইসলাম, গোপালচন্দ্রসেন এবং মৌলবী সীরাজুদ্দীন আহমদ এই তিনজনেই আজ ৪০ দিন হইল অনশনব্রত অবলম্বন করিয়াছেন। কাজী নজরুলকে অনশনের পঞ্চমদিনে নাকের ভিতর দিয়া জোর করিয়া খাদ্য দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু তাহার ফলে তাঁহার নাকের ভিতর দিয়া রক্ত পড়িতে থাকে। তারপর হইতে কাজী নজরুল প্রায় অনশনেই আছেন; মাঝে সামান্য একটু দুধ তাহাকে জোর করিয়া খাওয়ানো হইতেছিল। তিনজন বন্দীরই অবস্থা অতি শোচনীয়। যে কোন মুহূর্তে চরম দুঃসংবাদ আমাদের কানে আসিয়া পৌঁছিতে পারে।হুগলি জেলের ব্যপারে স্পষ্ট বোঝা যাইতেছে যে, আমরা যে কেবল অসহায় তাহা নহে,অত্যাচার ও অপমানের আঘাতে আমাদের প্রাণে আর কোন চাঞ্চল্যই জাগাইয়া তুলিতে পারিতেছে না।ওই অনশন করতে গিয়ে তারপর যা অবস্থা হয়েছিল তা ভয়ংকর। বার বার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র জ্বর।
নজরুল ও অন্যান্য অনশনকারীদের প্রতি সুবিচারের দাবীতে দেশজোড়া প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল জেলের ভেতরে অত্যাচার। শরীরের ওজন তখন ২৫ পাউন্ড কমে গেছে। উঠে দাঁড়ানো তো দূরের কথা বসার, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই, তারমধ্যেই অন্ধকার সেলে জোর করে হাতে পায়ে বেড়ি বেঁধে রেখে দেওয়া। ওই অবস্থাতেই একবার নয়, দু-দু’বার সেই সেলের ভেতর থেকে ভয়ংকর সাপ বেরোলো। কবি এবং তার বন্ধুরা নিশ্চিত বুঝেছিলেন ওই সাপ এমনি আসেনি, ইচ্ছে করেই কবির সেলে ছাড়া হয়েছিল। তবে সেই সাপ দুটিও কবিকে দংশন করে পাপের ভাগী হতে চায়নি। বেরিয়ে গেছিল অসহায় হাত-পাবাঁধা অনশনক্লীষ্ট অসহায় কবিকে দেখে।
অবশেষে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠল নজরুল ও বাকি অনশনকারীদের প্রতি অন্যায়ের বিচার করতেই হবে। ইংরেজ সরকার শেষপর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হল। রাজবন্দিদের যাবতীও দাবী মেনে নিল জেল কর্তৃপক্ষ। বিরজাসুন্দরীদেবীর হাতে ফলের রস একটানা উনচল্লিশ দিনের অনশন ভাঙলে নজরুল ইসলাম। লৌহকপাট ভাঙার কবির মনে থেকে গেল লৌহকপাটের আড়ালে থাকা অভিশপ্ত দিনগুলির স্মৃতি।
শেয়ার করুন :





