স্বাধীনতার বিস্মৃত ৩ বীরাঙ্গনা -

স্বাধীনতার বিস্মৃত ৩ বীরাঙ্গনা

যাঁরা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েছেন
কারাবরণ করেছেন, কিন্তু আজ তাঁদের অবদান আমরা মনে রাখিনি।

স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও ইতিহাসের বহু পাতা যেন অপূর্ণ। সেখানে এখনও রয়ে গিয়েছে কিছু নাম,যাঁরা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, হাসিমুখে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন দেশের মুক্তির জন্য, অথচ সময়ের স্রোতে তাঁদের অবদান আজ অনেকটাই বিস্মৃত। বাংলার সেই অগ্নিকন্যারা প্রমাণ করেছিলেন, স্বাধীনতার লড়াই শুধু পুরুষদের নয়, সমানভাবে নারীদেরও সংগ্রাম। স্বাধীনতা দিবসের এই বিশেষ আয়োজনে আমরা ফিরে দেখব এমন ৩ বীরাঙ্গনাকে, যাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অদম্য দেশপ্রেম আজও আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে নতুন প্রেরণা।

ইলা সেন

১৯০৭ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ইলা  সেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফেডারেটেড, মালয় স্টেটস-এ। পৈতৃক দেশ তীর ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের মধ্যে সোনারং গ্রামে। তার পিতা ডাক্তার ব্রজেন্দ্রনাথ  দেন ও মাতা সুরবালা সেন। পিতা ফেডারেটেড মালয় স্টেটসের  ডাক্তার ছিলেন এবং সেখানেই  বসবাস করতেন। পিতামাতা ছিলেন উদার মতাবলম্বী  ও শিক্ষান্তরাগী ।১৯৩৭ সালে গৌহাটির  নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সঙ্গে ইলা সেনের বিবাহ  হয়।১৯২৫ সালে কলিকাতায়  এসে ডায়োসেসান কলেজ থেকে তিনি আই.এ, পাশ   করেন এবং ১৯২৭ সালে বেথুন কলেজে বি.এ. ক্লাসে ভতি হন। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বয়কট  আন্দোলনের শোভাযাত্রায় তিনি যোগদান করেন। ১৯৩১ ও ১৯৩৩ সালে তিনি ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে এম এ এবং বি টি পাশ করেন।

 ১৯২৯ সালে তিনি কল্যাণী দাসেব ছাত্রীসংঘের সভ্য হন এবং তখন থেকেই তিনি স্বাধীনতা-আন্দোলনে যুক্ত হন। স্বাধীনতা দিবস পালন, জাতীয় পতাকা  উত্তোলন, রাজনৈতিক সভা ও শোভাযাত্রা প্রভৃতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়  অংশগ্রহণ করেন।১৯৩০ সালে তিনি “নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’র  পক্ষ থেকে বড়বাজারে বিলিতী

কাপড়ের  দোকানে  পিকেটিং করতে যেতেন এবং অর্ডিন্যান্সের বিরোধিতা ক’রে সভা ও শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতেন ।

এইসময়কার  একটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য । সত্যাগ্রহ-আন্দোলনের ‘ সময় সভা ও শোভাযাত্রা বে-আইনী ঘোষণা করা হয়েছিল । ১৯৩০ সালের ২২শে জুন দেশবন্ধুর শ্রাদ্ধতিথি বার্ষিকীতে সত্যাগ্রহীরা  এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য ক’রে শোভাযাত্রা পরিচালনা করেন। কলেজ স্কোয়ার  থেকে মেয়েদের শোভাযাত্রা দেশবন্ধু পার্কের দিকে অগ্রসর হয । পুরুষ সত্যাগ্রহীরা দু’চারজন ক’রে বিচ্ছিন্নভাবে আগেই গিয়ে কলেজ স্ত্রীট মার্কেটের নিকট অবস্থান করেন। নারী সত্যাগ্রহীদের পিছনে অশ্বারোহী পুলিশ  ও পদাতিক পুলিশ  অগ্রসর হ’তে থাকে । ইলা সেন অশ্বারোহী পুলিশের  সামনে দাড়িয়ে সত্যাগ্রহীদের উপর আক্রমণ যথাসাধ্য রোধ করবার ইচ্ছা নিয়ে সতর্কভাবে চলতে থাকেন । শোভাযাত্রা হ্যারিসন রোড ( মহাত্মা গান্ধী রোড) অতিক্রম করবার পর পুরুষ সত্যাগ্রহীরা মহিলাদের সম্মুখভাগে শোভাযাত্রা গঠন করেন। পুলিস-অফিসার পুরুষ-সত্যাগ্রহীদের উপর লাঠি চার্জ করতে পাঠান-অশ্বারোহী-পুলিসকে হুকুম দেয়। পাঠান-অশ্বারোহী-পুলিস নারী সত্যাগ্রহীদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই, ইলা সেন সেই

ঘোড়ার  লাগাম  ধরে প্রতিরোধ করলেন এবং অগ্রসর হ’তে বাধা দিলেন। এইভাবে দেশবন্ধু পার্ক পর্যন্ত সমস্ত রাস্তাটায় যখনই কোনো অশ্বারোহী পুলিস তাব সামনে দিষে অগ্রসর হবার চেষ্টা করেছিল তখনই তিনি বাধা দিয়ে প্রতিরোধ করতে থাকেন । অন্যান্য  অনেক মহিলাও অনুরূপভাবে বাধা দিতে থাকেন । শোভাযাত্রা দেশবন্ধু  পার্কে পৌছাবার পর সভার অনুষ্ঠান আরম্ভ হয় । পুলিস লাঠিচার্জ করবার জন্য  প্রস্তত হয়ে  এক এক স্থানে দাড়িযে যায় | যে ইওরোপিয়ান  অশ্বারোহী  অফিসারটি লাঠিচার্জের হুকুম দেওয়ার  জন্য অগ্রসর  হতে থাকলে  ইলা সেন তাকে বাধা দেবার জন্য দৃঢমুষ্টিতে তার ঘোড়ার  লাগাম ধ’রে ফেলেন । ঘোড়াটা  লাফিয়ে  ওঠে, কিন্তু তবুও ইলা সেনের দৃঢ়মুষ্টি শিখিল হয়নি । ঘোড়া  লাফিয়ে  ওঠার সঙ্গে সঙ্গে  তিনিও ঘোডার লাগাম  ধরা অবস্থায়  শূন্যে ঝুলতে থাকেন। এখং ঘোড়া  নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও নেমে আসেন । এইভাবে কিছুক্ষণ ঘোড়ার  সঙ্গে ইলা সেনের দুঃসাহসিক ওঠানামা  চলতে থাকে | তীব্র  এই দুঃসাহসিক  কাণ্ড দেখে পুলিস ও সত্যাগ্রহী উভয়পক্ষই  বিস্ময়ে  হতবাক হযে যান। একটি ক্ষীণাঙ্গী নারীর  অভূতপূর্ব সাহস  ও অনমনীয় দৃঢ়তা  সেদিন অনেক সত্যাগ্রহীর মাথা বাঁচিয়েছিল।

 ভারতের স্বাধীনত।-সংগ্রামে সৈন্যদের  যোগদান ধবতে আবেদন জানিয়ে  ইন্দুমতী গোয়েঙ্কা  ইস্তাহার প্রচার করছিলেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে  আদালতে মামলা রুজু  হলে সেই সময়  ইলা সেন আদালতে উপস্থিত থাকায়  মামলায় সাক্ষ্য দেবাব জন্য কোর্ট  ইলা সেনকে আহ্বান করে। কিন্তু তিনি স্বাক্ষ্য দিতে ও  শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে  বলেন যে, ইংরেজের আইন আদালত তিনি মানেন না। এই আদালত অবমাননার দায়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের হয। এই পরোয়ানা জারী করার পূর্বেই তাকে  পিকেটিং-এর দোষে গ্রেপ্তার ক’রে চারমাসের সাজা দেওয়া হয়|

১৯৩০ সালে জেলে সতীন সেন প্রভৃতি রাজনৈতিক বন্দীদের উপর পুলিস কমিশনার টেগার্টের প্রহারের প্রতিবাদে তিনি জেলে অনশন অবলম্বন করেন।

অল ইন্ডিয়া উওমেন্স  কনফারেন্সে যোগদান ক’রে ১৯৪৫ সালে তিনি দক্ষিণ কলিকাতা শাখার ভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৪৮ সালে দিল্লী যাওয়া পর্যস্ত এ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ইতিমধ্যে ১৯৪৬ সালে কলিকাতা দাঙ্গার সময় দাঙ্গাপীডিতদের উদ্ধার ও সাহায্য কার্যে  তিনি বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ইহলোক ত্যাগ করেন। 

কমলা দাশগুপ্ত

‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’  এই অমূল্য  বইটির লেখিকা যার দৌলতে আমরা এত হারিয়ে যাওয়া অখ্যাত অজ্ঞাত অনামী  বাংলার মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চিরস্মরণীয় সংগ্রামের প্রণম্য ইতিহাস জানতে পারছি।

১৯০৭সালের ১১ই মার্চ কমলা দাশগুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন ঢাকা শহরে। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত স্বামী বিবেকানন্দের সান্নিধ্যে এসে স্বামীজীর ত্যাগ ও সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মা চারুলতা ছিলেন শান্ত বুদ্ধিমতী ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ। ১৯২৮ সালে  কমলা দাশগুপ্ত বি.এ. পাশ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. পড়তে থাকেন। বেথুন কলেজে পড়বার সময়েই তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ হয়। ছাত্রীসংঘের কর্মী হিসেবে কমলা দাশগুপ্তরা ১৯২৮ সালে লাঠিখেলা শিখতেন দীনেশ মজুমদারের কাছে। দীনেশ ছিলেন বিপ্লবী যুগান্তর দলের সভ্য। একদিন কমলা শিক্ষক দীনেশ মজুমদারকে বললেন দেশের কাজ করতে তিনি ইচ্ছুক সেজন্য আলোচনা করতে চান। দীনেশ নিয়ে গেলেন তাঁকে শ্রদ্ধেয় রসিকলাল দাসের কাছে। তিনি বিপ্লবী যুগান্তর দলে যোগদান করলেন ১৯২৯ সালে।১৯৩০ সালে বিপ্লবী কাজের প্রয়োজনে কমলা দাশগুপ্তকে একটা মেয়েদের হোস্টেলে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয়। তিনি হলেন হোস্টেলের ম্যানেজার। একদিন নেতা রসিকলাল তাঁকে  বললেন – একটা বিপ্লবী প্রচেষ্টা চলছে। সেজন্য কতগুলি বোমা তৈরি হয়েছে। বোমাগুলি যেখানে আছে সেখানে রাখা আর নিরাপদ নয়। সেগুলি কমলা তাঁদের হোস্টেলে রাখার দায়িত্ব নিতে পারেন কিনা ।কমলা তো বিপ্লবের কাজে লাগতে পারবেন বলে বিপদের ঝুঁকি জেনেই সাগ্রহে রাজি।সেদিন রাত্রে এক বিরাট ধামায় ভর্তি বোমা এল তাঁদের হোস্টেলে। ধামার ওপরটা ছিল ফল দিয়ে ঢাকা। কমলা দাশগুপ্ত সেগুলি তাঁর ট্রাঙ্কে বোঝাই করে রেখে দিলেন। কতকগুলি রাখলেন ছোটো ছোটো সুটকেসে। সুটকেসগুলি রাখলেন ভাঁড়ার ঘরে। ম্যানেজার হিসেবে ভাঁড়ার ঘরের  চাবি থাকত তাঁরই কাছে ।একটু অসতর্ক হলেই সর্বনাশ। বিপ্লবী রসিকলাল এক -একদিন এক-একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে সাংকেতিক পরিচয় দিয়ে পাঠিয়ে দেন। কমলা কয়েকটা করে বোমা ছোট এক-একটা সুটকেসে ভোরে তাকে দিয়ে দেন নিঃশব্দে। কখনও বা নিজে নানা বেশে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে আসেন।

১৯৩০ সালের ২৫শে অগাস্ট দীনেশ মজুমদার, অনুজাচরণ সেন অতুল সেন ও শৈলেন নিয়োগী ডালহৌসি স্কোয়ারে গিয়েছিলেন কলকাতার কুখ্যাত অত্যাচারী পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে ইহলোক থেকে সরিয়ে দেবার জন্য। টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমার আক্রমণ ও বিস্ফোরণ হল। কিন্তু টেগার্ট কোনোরকমে বেঁচে যায়। কমলা দাশগুপ্তকে ডালহৌসি স্কোয়ার বোমা ষড়যন্ত্র মামলা সমরকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৩০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর।কিন্তু ২০/২১দিন হাজতে রেখে ঐ বোমা -ষড়যন্ত্র মামলায় জড়াতে না পেরে মুক্তি দেয়।

মুক্তির পর কমলা একটা স্কুলে শিক্ষকতার কাজ নেন। ১৯৩২সালের জানুয়ারি মাসে একদিন তিনি তাঁর বন্ধু কল্যাণী দাসের বাড়িতে গেছেন ।কল্যাণী তখন আইন অমান্য আন্দোলন করে জেলে গেছেন। তাঁর ছোটো বোন বীণা দাস কমলা দাশগুপ্তকে আস্তে করে বললেন,’ আমার ইচ্ছা গভর্নরকে গুলি করি। তুমি আমাকে রিভলবার দেবে ?’ সেই বছরে বীণার কনভোকেশন হল থেকে বি.এ ডিগ্রি আনবার কথা। কনভোকেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য গভর্নর আসেন ডিগ্রী দিতে। কমলা এই কাজের বিপদের দিকটা বীণাকে দিনের পর দিন বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বীণা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এদিকে কমলা দাশগুপ্ত আলোচনা করতে থাকেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সুধীর ঘোষের সঙ্গে । আলোচনার ধারাটা ছিল এই যে বিদেশী শাসনের এক প্রধান প্রতিভূ গভর্নরকে আঘাত করতে পারলে বিপ্লবের যে আলোড়নকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেটা উঠবে একটা উচ্চ শিখরে।তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন গভর্নরকে গুলি করা হবে এবং গুলি করার দায়িত্ব গ্রহণ করা হবে। একদিন সুধীর ঘোষ রিভলবার সংগ্রহ করে আনলেন ।কমলা বীণাকে নিয়ে বসলেন রামমোহন লাইব্রেরিতে একটা নিরিবিলি ঘরে।কমলা দাশগুপ্ত রিভলবারের প্রতিটি অংশ ঝুলে বুঝিয়ে দিয়ে বীণা দাসের হাতে তুলে দিলেন সেই অগ্নিনালিকা। ১৯৩২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি সেনেট হলে কনভোকেশনের সময় অভিভাষণ পাঠকালে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে বীণা দাস গুলি করেন কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় । এর ফলে কলকাতা ও সারা ভারতবর্ষে জেগেছিল প্রচন্ড উত্তেজনা। গভর্নরের মৃত্যুটাই বড়ো কথা নয় – বড়ো কথা হচ্ছে ইংরেজ শাসনের ভিত্তিতে কতখানি আঘাত লেগেছে এবং দেশের লোকের মনে কতখানি সারা জেগেছে। এটাই ছিল সফলতার মাপকাঠি।

বহু  চেষ্টা করেও পুলিশ জানতে পারে নাই বীণার কাজের পশ্চাতে করা জড়িত ছিলেন। কিন্তু সন্দেহক্রমে আরো অনেকের সঙ্গে কমলা ও সুধীরকে মধ্যেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ।কমলা দাশগুপ্তকে ১৯৩২ সালের ১লা মার্চ গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে ও পরে হিজলী জেলে রাজবন্দী করে রেখে দেয়।মুক্তি পান তিনি ১৯৩৮সালে ।

এই সময় মহাত্মা গান্ধী একটার পর একটা গণ আন্দোলন করে কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে সমস্ত জাতিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন। কমলাও কংগ্রেসে যোগ দিলেন ।এই সময়ে কমলা দাশগুপ্তর উপর ভার পড়ে ‘মন্দিরা’ নাম একটি রাজনৈতিক মাসিক পত্রিকার সম্পাদিকা হওয়ার। ‘সন্ধ্যা’, ‘যুগান্তর’ ‘বন্দেমাতরম’ ‘স্বাধীনতা’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলির মতো ‘মন্দিরা’রও উদ্দেশ্য ছিল দেশাত্মবোধের উদ্দীপনা ও প্রেরণা জাগাবার, বিশেষত মেয়েদের মধ্যে ।       

এরপর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন। ১৯৪২ সালের ৮ই অগাস্ট কংগ্রেস গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব গ্রহণ করার পর ৯ই অগাস্ট যখন সব নেতাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তখন গান্ধীজির ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ মন্ত্রে সারা ভারত উত্তাল হয়ে উঠল।কমলা দাশগুপ্ত আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে বন্দি রইলেন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। ফিরে এসে আবার সেই কর্মস্রোত।ইংরেজ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বল করে দেবার জন্য বাধিয়ে দিল হিন্দু – মুসলমান দাঙ্গা।১৯৪৬সালের ১০ই অক্টোবর ঘটেছিল নোয়াখালির একতরফা দাঙ্গা।গান্ধীজি ছুটে গেছেন সেখানে। সেই সময়ে কাগজে একটা বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে ৮৬টা চিঠি এসে পড়ে কমলার হাতে। চিঠির লেখকরা নোয়াখালির দাঙ্গার সময় ধর্ষিতা মেয়েদের বিবাহ করতে ইচ্ছুক। কংগ্রেসের মহিলা বিভাগের সম্পাদিকা রূপে কমলা দাশগুপ্তকে পাঠানো হলো গান্ধীজির কাছে ঐ চিঠিগুলি নিয়ে ১৯৪৬সালের ১৫ই ডিসেম্বর ।

 স্বাধীনতা আসার কয়েক বছর পরে কমলা দাশগুপ্ত লিখেছিলেন নিজের জীবনকথা ‘রক্তের অক্ষরে ‘ নামক পুস্তকে ।পরে লিখেছিলেন তিনি ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী ‘ গ্রন্থ ।১৯শে জুলাই ২০০০ সালে চলে গেলেন ।

চারুশীলা দেবী

১৮৮৩ সালে মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন চারুশীলা দেবী। পিতা রাখালচন্দ্র অধিকারী মা কুমুদিনী দেবী।শৈশবে পিতৃমাতৃহীন ক্ষুদিরাম থাকতেন মেদিনীপুরের উপকণ্ঠে হবিবপুরে তাঁর দিদির কাছে। তিনি প্রায়ই চারুশীলা দেবীর বাড়িতে আসতেন। ১৯০৫সালে ক্ষুদিরাম বিপ্লবীদলে যোগদান করেন। চারুশীলা দেবীকেও একদিন ক্ষুদিরাম রক্ততিলক পরিয়ে স্বদেশীর প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন। ১৯০৮ সালে মজঃফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যাওয়ার আগে ক্ষুদিরাম চারুশীলা দেবীর বাড়িতে কিছুদিন বাস করেছিলেন। ক্ষুদিরামের মামলার সময় পুলিশ চারুশীলা দেবীর খোঁজ করতে থাকে। তিনি তখন আত্মগোপন করেছিলেন।

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী দেশবন্ধু প্রভৃতি মেদিনীপুরে যান। ঐ সময় তাঁদের প্রেরণায় মেদিনীপুরে নারী-জাগরণ দেখা দেয়।চারুশীলা দেবী একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন।জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলি ও চারুশীলা দেবীরা কাঁথি , কালিনগর গিয়ে জনসভার আয়োজন করেন এবং জনসাধারণকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করতে আহ্ববান করেন। চন্দ্রাকরে গিয়ে চারুশীলা দেবী একটি সভায় বক্তৃতা করার সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে।নরঘাটের মতোই এবারেও মেদিনীপুরের দুঃসাহসী নারীরা লাঠিচার্জ অগ্রাহ্য করে সভা অনুষ্ঠিত করেন।চারুশীলা দেবীর নাম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের হয়। তিনি পলাতক অবস্থায় খড়গপুরে এসে শ্রমিক ইউনিয়নের এক সভা আহ্ববান করেন সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে ।সেখানে হাজার হাজার লোকের জনতাকে উত্তেজিত দেখে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সাহস পায়নি। ৭ই অগাস্ট একটা বে-আইনি শোভাযাত্রা পরিচালনা করার সময় মেদিনীপুর শহরে তাঁকে  গ্রেপ্তার করা হয় ।তাঁর প্রতি ৬মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়। মেদিনীপুর জেলের ভেতরে গিয়ে বিধবাদের নিজ হাতে রান্নার অধিকারের জন্য তিনি অনশন করেন। কতৃপক্ষ অবশেষে তাঁর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন ।১৯৩১ সালের শেষে তাঁকে একমাসের জন্য জেলে রাজবন্দী হিসাবে আটক রাখা হয় ।মুক্তি পেয়ে তিনি ১৯৩২সালের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করেন এবং দেড়বছর কারাদণ্ড হয় ।এবারে বাইরে আসার পর তিনি পাবনা যান।সেখানে এক সভায় রাজদ্রোহমূলক বক্তৃতা দেওয়াতে ১৯৩৩সালে পুনরায় একমাসের কারাদণ্ড হয়। কারাভোগের পর  ফিরে আসেন মেদিনীপুরে।১৯৩৩

সালেই মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট বার্গকে বিপ্লবীরা হত্যা করেন। তখন চারুশীলা দেবীকে আট বছরের জন্য মেদিনীপুর জেলা থেকে বহিস্কৃত করা হয়।ব্রিটিশ গভর্মেন্টের পিউনিটিভ পুলিশের ট্যাক্স আদায় করবার জন্য তার বাড়ি ও জমি নিলাম হয়ে যায়। পরে গভর্মেন্টের পক্ষ থেকে ঐ ৮ বছরের বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করা হলে ১৯৩৮সালে কলিকাতায় চলে আসেন। গৃহহারা, বাস্তুহারা ও কপর্দকশূন্য অবস্থায় কলকাতায় তিনি ৭দিন ঘুরে বেড়ান। তখন কলিকাতা কর্পোরেশনের এডুকেশন অফিসার শৈলেন ঘোষ তাঁকে কর্পোরেশনের শিক্ষয়িত্রীর কাজ গ্রহণ করার অনুরোধ করেন।বৃদ্ধবয়সে অবধি তিনি এই শিক্ষয়িত্রীর কাজে নিযুক্ত ছিলেন।তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তা কোথাও তাঁকে মাথা নত করতে শেখায়নি।      

নির্বাচিত অংশ – স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী -কমলা দাশগুপ্ত , অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা-৯ , র‍্যাডিকাল ইম্প্রেশন্স।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *