ছবি:shutterstock

ভাইফোঁটায় বাংলার মিষ্টি গাইড

কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের আর বাংলাদেশের বিখ্যাত মিষ্টিকথা।

ভাইফোঁটা মানেই ভাইয়েদের প্লেটে নানারকম নানা স্বাদের মিষ্টির আয়োজন।এই সময়ে বাংলার মিষ্টির ঐতিহ্য ফিরে দেখা। কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের আর বাংলাদেশের বিখ্যাত মিষ্টিকথা:

কলকাতার ১০ টি ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’ বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সুপারহিট মিষ্টি গাইড

কে সি দাসঃ  রসগোল্লা,নলেন গুড়ের রোল, ল্যাংচা, রসমালাই,ক্ষীরকদম।

ভীম নাগ: আবার খাবো,লেডিকেনির স্রষ্টা,মনোহরা,রোজ ক্রীম,পেস্তা সন্দেশ,চমচম। 

জয়শ্রীঃ ‘ভাজা মিষ্টি’- জিভে গজা,সরভাজা ।   

সেন মহাশয় : মিহিদানা, দরবেশ,সীতাভোগ,মালাই চপ,জয়ন্তী,অপরূপা।

গিরিশ চন্দ্র দে নকুড় চন্দ্র নন্দী: নলেন গুড়ের সন্দেশ,কালাকাঁদ,রসমালাই,চকোলেট মালাই রোল,মিষ্টি দই।    

দ্বারিক ঘোষঃ পেঁড়া ও বরফি,সন্দেশ।

শ্রী হরি মিষ্টান্ন ভান্ডার :ল্যাংচা ,মিষ্টি দই।

নব কৃষ্ণ গুইঁ :রোজ ক্রিম সন্দেশ, রাতাবি সন্দেশ, চন্দন ক্ষীর।

চিত্তরঞ্জন: রসগোল্লা,চকোলেট সন্দেশ, মালাই চমচম, গুলাব জামুন, মিষ্টি দই।   

অমৃতঃ মিষ্টি দই। ক্ষীর চপ, ক্ষীর সিঙাড়া, সরভাজা।

পশ্চিমবঙ্গের সেরা ১০

বাগবাজারের রসগোল্লা : কোনও কথা হবে না।জি এই ট্যাগ পাওয়া গেছে। পৃথিবী বিখ্যাত নবীনচন্দ্র মানে কে সি দাসের রসগোল্লা। শীতকালে খেজুর গুড়ের ,গ্রীষ্মকালে আমের। ভিনদেশীরা বাঙালিকে রসগোল্লা বলে টিপ্পনি কাটলেও এর স্বাদে আহ্লাদে আকুল।

রানাঘাটের পান্তুয়া: রানাঘাটের জগু ময়রা (যজ্ঞেশ্বর প্রামানিক) কে পান্তুয়ার জনক বলা হয়। এই নাম এখনও ওখানে দোকান আছে তবে এই অঞ্চলের পান্তুয়াকে বিখ্যাত করে তোলার পেছনে প্রভাত প্রামানিক,হরিদাস পালের অবদান আছে। প্রামাণিকদের বড়দা,মেজদা,ছোটদা এই দোকানের পান্তুয়া বিখ্যাত।

বর্ধমানের মিহিদানা আর সীতাভোগঃ রাজার অতিথি হয়ে লর্ড কার্জন সাহেব সীতাভোগ আর মিহিদানার স্বাদ পেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বর্তমানে এই বিশেষ ধরনের মিষ্টি দুটির প্রধান যোগানদাতা দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দোকানের মালিক জয়দেব নাগ। তারই পূর্বপুরুষ ভৈরব নাগ বর্ধমানের রাজার হুকুমে মিহিদানার সঙ্গে সীতাভোগ তৈরি করে সাড়া ফেলে দেন। তারপরেই বি সি রোডের সীতাভোগ ও মিহিদানার জোগানদাতা হিসাবে এই দোকানটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

ল্যাংচা :শক্তিগড়,তারাপীঠ,বীরভূমঃ                 

মিষ্টির নাম ল্যাংচা হল কেন জানা আছে ? নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের কন্যার বিয়ে হয়েছিল বর্ধমান রাজ্ পরিবারে।সন্তানসম্ভবা হলে তার কি খেতে পছন্দ জিজ্ঞেস করায় সলজ্জে বলেছিল ‘ল্যাংচা’।এই মিষ্টির কথা কেউ শোনেনি বলে তাকে জিজ্ঞেস করায় সে বলেছিল তার বাপের বাড়িতে একটা মিষ্টি খেয়েছিল তার নাম জানেনা কিন্তু যে ময়রা বানিয়েছিল সে খোঁড়া ছিল এটা মনে আছে।রাজাদের ব্যাপার,সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে আনা হল সেই খঞ্জ ময়রাকে ,তাকে বর্ধমানে বড়সুল গ্রামে ভূসম্পত্তি দিলেন আর দোকান হল বাদশাহী সড়কের ধারে শক্তিগড়ে।তারাপীঠ মন্দিরে পুজো দিয়েছেন আর বিখ্যাত ল্যাংচা খাননি এমন মানুষ বিরল।

বহরমপুরের ছানাবড়া: কড়া পাকের মিষ্টি।একটি মতে মুর্শিদাবাদে নবাবরা অতিথিদের পেল্লাই সাইজের মিষ্টি দিয়ে অভ্যর্থনা করতেন।খাগড়া সোনাপাড়ার পটল ওস্তাদের জনপ্রিয়তায় এর নাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।অন্যমতে কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী ইংরেজদের খুশি করতে এই মিষ্টি তৈরী করিয়েছিলেন।বহরমপুরের খাগড়ার ছানাবড়া আজও সমান জনপ্রিয়। খাগড়া ছাড়াও শহরের বেশ কিছু এলাকায় ভাল মানের ছানাবড়া এখনও পাওয়া যায়।এর সাইজের জন্য বাংলায় ‘চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে’ কথার প্রচলন।

মালদার রসকদম্ব: হুসেইন শাহর রাজত্বকালে গৌড় মালদায় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য এসেছিলেন।বিশ্রাম নিয়েছিলেন একটি কদম গাছের তলায় আর রূপ সনাতনকে দীক্ষা দেন।এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে এই মিষ্টির উদ্ভব।রসকদম্বের ভেতরে থাকে কড়াপাকের রসগোল্লা যার বাইরে ক্ষীর আর পোস্তর প্রলেপ।

কৃষ্ণনগরের সরভাজা : এরও জি আই ট্যাগ এল বলে। এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।কৃষ্ণনগরে এসে কেউ সরভাজা চেখে দেখেন নি এমন মানুষ বিরল।

সরপুরিয়ায় ওপরে ও নিচে সরের পুর, মাঝখানে ছানা দিয়ে তৈরি সন্দেশ জাতীয় মিষ্টির পুর। অর্থাৎ সরের মাঝখানে পুর বলেই নাম হয়েছে সরপুরিয়া।সরভাজা অনেকটা একই রকমের, তবে সেখানে সরের পরিমাণ অনেক বেশি আর সেটা ভাজা হয়। তাই নাম সরভাজা।নেদিয়াপাড়ার অনন্তহরি মিত্র রোডের সুবিখ্যাত অধর চন্দ্র দাসের দোকানের আভিজাত্য ও জৌলুষ একইরকম। অজানা কথা হল আসল সরপুরিয়া আর সরভাজার রেসিপি সেখানকার মিষ্টির কারিগরদের পেট থেকে কিছুতেই বেরোয়না।       

নবদ্বীপের লাল দই: ১৯৩০ সালে নবদ্বীপের কালিপদ মোদক (মতান্তরে ঘোষ) এই দইয়ের সৃষ্টিকর্তা। প্রাচীন ‘লক্ষী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ এই লাল দইয়ের সেরা ঠিকানা।

লাল দইয়ের গল্প হল এই কালী ঘোষ আর হরি ঘোষ দুই ভাই ছিলেন। এনারা অল্প আঁচে মোষের দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে অল্প জল দিয়ে ঘোল বানাতেন,বেশি জ্বালের কারণে দুধের রং লালচে হয়ে যাওয়ায় এলাকায় ‘লাল ঘোল’ বলা হত। সেই দুধ ঘন ক্ষীরের মত হলে লাল দই তৈরী হয়। এর ঘনত্ব মাপার জন্য ছুরি ব্যবহার করা হত বলে এর আরেক নাম চাককু দই।রাধাবাজার আলোছায়া মোড়ের লক্ষীনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার আর তেঘাইপাড়ার বড়াল রোডের রামকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভবন লাল ক্ষীর দইয়ের অন্যতম জনপ্রিয় দোকান। 

                     

বাঁকুড়ার মেচা সন্দেশ: বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের বিখ্যাত মিষ্টি। মুগডাল ও চিনি দিয়ে তৈরী হয়।মুগডাল বাটার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে সঠিক পাক করে গোল্লা পাকানো হয়। পরে এর উপর একটি চিনির প্রলেপ দেওয়া হয়।     

ম্যাচা বা মেচা সন্দেশের স্রষ্টার নাম পাওয়া যায় না।লোকশ্রুতি ২০০ বছরের পুরোনো এই মিষ্টির সৃষ্টি নিয়ে দুটি মত আছে।একটি হলবিষ্ণুপুরের মল্লরাজের দেওয়ান বেলিয়াতোড় জমিদারি উপহার পেলে সেখানে তৈরী হয় মেচা সন্দেশ।অপর মতে এর স্রষ্টা গিরিশচন্দ্র মোদক।শক্তিগড়ের ল্যাংচার দোকানের নামকরণের মত এখানেও দোকানের নাম ‘মেচা মহল’,’হীরা মেচা সেন্টার’।       

    

জয়নগরের মোয়াঃ২০১৫ সালে ২৪ পরগনার জেলার এই অনন্য শীতকালীন বিশেষ মিষ্টি একটি জিআই ট্যাগ অর্জন করেছে। জয়নগরের মাত্র ১৫০ টি দোকানে এই মিষ্টি বিশেষ ট্যাগটি পেয়েছে। এই দোকানগুলিতেই একমাত্র কনকচূড় খই, ঘি, পোস্ত এবং নলেন গুড় দিয়ে এই মিষ্টি বানানো হয় ঐতিহ্যগতভাবে।

চন্দননগরের সূর্য কুমার মোদক ও রিষড়ার  ফেলু মোদকঃ  জলভরা বিখ্যাত সূর্য্য কুমার মোদক। আম কুলপি থেকে একদম লিচুর পায়েস।ফেলু মোদকের বিখ্যাত ছানার মুড়কি,শাঁখ সন্দেশ,রাবড়ি, নারকেল ফুল থেকে তৈরি মিষ্টি। শ্রী রামকৃষ্ণ এখানকার মিষ্টি খেয়েছিলেন।   

বাংলাদেশের মিষ্টি  

টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমালাই, গাইবান্ধার রস মঞ্জরী, বিক্রমপুর ও কলাপাড়ার রসগোল্লা, শেরপুর ও গৌরনদীর দই ,যশোরের দই, খেজুরগুড়ের সন্দেশ, শাহজাদপুরের রাঘবসাই, মুক্তাগাছার মণ্ডা, খুলনা ও মুক্তাগাছার অমৃতি,কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার গয়া নাথ ঘোষালের আবিষ্কৃত বালিশ মিষ্টি, নওগাঁর প্যাঁড়া সন্দেশ,রাজশাহীর তিলের খাজা, ব্রাহ্মণবেড়িয়ার ছানামুখি, রাজশাহীর রসকদম, মেহেরপুরের সাবিত্রীর নাম মিষ্টি কুটুমদের ইষ্ট নামের মত চিরকালের ভালাবাসার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *