কালীবাড়ি কথা

কালীঘাট,দক্ষিনেশ্বর,ঠনঠনিয়া,ফিরিঙ্গি,লেক কালীবাড়ির ইতিহাস ফিরে দেখা।

কলকাতা শহরের কালীবাড়ির ইতিহাস।

কালীঘাট মন্দির

কবিকিঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্যে কালীঘাটের উল্লেখ আছে-”বালুঘাটা এড়াইল বেনের নন্দন/ কালীঘাটে গিয়া ডিঙ্গা দিল দরশন।” ক্ষেমানন্দের “মনসার ভাসানে” লেখা হয়েছে-” কালীঘাটে কালীবন্ধ বড়াতে বেতাই।”আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে কালীঘাটের উল্লেখ করা হয়েছে “কালীকোটা” নামে।

একান্ন পিঠের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র।পুরাণমতে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর ডান পায়ের আঙ্গুল এখানে পড়েছিল।জনশ্রুতি সন্ন্যাসী ব্রহ্মানন্দ গিরি ও আত্মারাম ব্রহ্মচারী কষ্টিপাথরে শিলাখন্ডে দেবীর রূপদান করেন।

১৮০৯ সালে বরিশার সাবর্ণ জমিদার শিবদাস চৌধুরী ও তার পুত্র ও ভ্রাতুস্পুত্রের উদ্যোগে আদিগঙ্গার তীরে বর্তমান মন্দির নির্মিত হয়। বঙ্গীয় আটচালা স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরের আয়তন ৮ কাঠা।

মা কালির মূর্তির জিভ,দাঁত,মুকুট,হাত,মুণ্ডমালা সোনার। মন্দিরের ভেতরে একটি সিন্দুকে সতীর পাথরের অঙ্গ রক্ষিত আছে।

কালীঘাটের বর্তমান মন্দির তৈরি প্রসঙ্গে বহু ইতিহাস ও জনশ্রুতি রয়েছে।কিছু পন্ডিত ও বিশেষজ্ঞের মতে  জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পুন্য তিথিতে  কলকাতার কালীঘাট কালীমন্দিরে সতীঅংশের প্রতিষ্ঠা হয় একটি পট্টবস্ত্রের ওপর।

মন্ত্রী,ক্রিকেটার,ফিল্মস্টার সেলেবরা তো বটেই ,ভিনরাজ্যে থেকে আশা ভ্রমণার্থীরা ভিড় জমান এই তীর্থস্থানে।কলকাতায় প্রচুর কালীমন্দির থাকার কারণে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ‘কালী কলকাত্তাওয়ালী’ উপাধি।

কালীপুজোর দিন শাস্ত্রমতে কালীপুজো হয় না, ধনলক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। মা দক্ষিণেশ্বরী এই বিশেষ দিনে পূজিতা হন লক্ষ্মীরূপে।শুধু পূজার আয়োজন নয়, ভোগের আয়োজনও করা হয় লক্ষীপূজোর মতো।পীঠমালা তন্ত্রের শ্লোকটি হল:

যুগাদ্যায়ং মহাদেব দক্ষাঙ্গুষ্ঠং পদোমম/নকুলীশঃ কালীপীঠে দক্ষপদাঙ্গুলি সু চ মে/সর্বসিদ্ধিকারী দেবী কালিকা তত্র দেবতা।।

বঙ্গানুবাদ: “কালীঘাট মহাশক্তিপীঠ। সকল পীঠস্থানের শ্রেষ্ঠ। কালীপীঠের দেবী মহাশক্তিস্বরূপিণী কালী। আর পীঠরক্ষক হলেন ভৈরব নকুলেশ্বর। এখানে পুজো দিলে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। কালীঘাটের দেবী কালিকা সর্বসিদ্ধিকারী।”

দক্ষিনেশ্বর মন্দির

শ্রীরামকৃষ্ণ আর দক্ষিনেশ্বর মন্দির একে অপরকে জড়িয়ে আছে।১৮৫৫ সালে ৩১ মে প্রভু জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার দিনে এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।মা কালীকে এখানে ‘ভবতারিণী’ রূপে পুজো করা হয়।

১৮৪৭ সালে ৪৪ বছরে রানী রাসমণি বিধবা হলে কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজনকালে মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান।দেবী তাকে বলেন, “কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি নয়নাভিরাম মন্দিরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা কর। সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই আমি পূজা গ্রহণ করব।”আটবছর ধরে সেই সময়ে ন লক্ষ টাকায় তৈরী হয় এই মন্দির।

রামকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রধান পুরোহিত হিসেবে ব্রত হন আর তার সঙ্গে আসেন কিশোর শ্রী রামকৃষ্ণ। ১৮৫৭-৫৮ সালে কিশোর রামকৃষ্ণ পরমহংস মন্দিরের পুজোর ভার গ্রহণ করেন। বাকিটা ইতিহাস।শ্রীরামকৃষ্ণ উনিশ শতকের মানুষকে শেখালেন ঈশ্বরকে মানুষের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।

মন্দির নবরত্ন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।এখানে কালীমন্দির ছাড়াও দ্বাদশ শিব মন্দির আর রাধাকৃষ্ণ মন্দির অবস্থিত।মা ভবতারিণীর কষ্টিপাথরের বিগ্রহ তৈরী করেছিলেন কাটোয়ার দাঁইহাটের নবীন ভাস্কর। ১০০০ রৌপ্য পদ্মের ওপ র শায়িত মহাদেবের ওপর দণ্ডায়মান মা ভবতারিণী। শতাব্দীপ্রাচীন এই নবরত্ন মন্দিরের আকর্ষণ আজও একই রকম রয়ে গিয়েছে।

ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি

এই অঞ্চলের এমন আশ্চর্য ঠনঠনিয়া নামের পেছনে জনশ্রুতি হল প্রাচীন কালে এই অঞ্চল ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছিল আর এখানে ভীষণ ডাকাতি হত বলে এই অঞ্চলে একটি ঘন্টা লাগানো হয়েছিল এবং ডাকাতি হলেই সেটা ঠং ঠং আওয়াজ করে বেজে উঠত সেই থেকে এই অঞ্চলের নাম ঠনঠনিয়া।

বিধান সরণিতে কলেজ স্ট্রিটের কাছে ঠনঠনিয়া কালী মন্দির জনশ্রুতি অনুসারে ১৭০৩ সালে উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী নাম এক তান্ত্রিক মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি নির্মাণ করেন।১৮০৬ সালে শ্রী ধনী শঙ্কর ঘোষ এখনকার কালীমন্দির আর পুষ্পেস্বর শিবের আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন আর পূজার ভার নেন। এখানে প্রতি বছর মায়ের মূর্তির সংস্কার করা হয়।সিদ্ধেশ্বরী মূর্তিটি মাটির আর প্রতিবছর লাল আর কালো রঙে সাজানো হয়।মা কালীর একটা ছোট মূর্তি আছে যা প্রতিবছর পুনঃনির্মাণ করা হয়।বিগ্রহের পাশে শ্রী রামকৃষ্ণের দন্ডায়মান ছবি আছে।  

শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে এই মন্দিরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যখন ঠাকুর ঝামাপুকুরে থাকতেন তখন এই মন্দিরে এসে মা কে গান শোনাতেন।পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বরে থাকাকালীন ও এই মন্দিরে আসতেন আর পুজো দিতেন।    

ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি    

এখানে দেবী “শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা ঠাকুরানি” নামে পূজিত হন। দীনেশ চন্দ্র সেন লিখিত “হিষ্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচার” থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সে সময় এই মন্দিরের দেখাশোনা করতেন এক অল্প বয়স্ক বিধবা প্রমীলাদেবী। পর্তুগিজ ‘ফিরিঙ্গি’ অ্যান্টনি কবিয়াল এই মন্দিরে আশা যাওয়ার কালে ওনার প্রেমে পড়ে প্রণয়াবদ্ধ হন আর তারপর লোকমুখে এই মন্দির ‘ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি’ নামে পরিচিত হয়। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে এই তথ্য সঠিক নয় কারণ এই কালীবাড়ির সঙ্গে  অ্যান্টনি কবিয়ালের যোগসূত্রের অকাট্য প্রমান নেই।ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভিন্নমত আছে।মন্দিরের সামনের দেওয়াল ফলকে লেখা আছে, “ওঁ শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা ঠাকুরাণী।স্থাপিত ৯০৫ সাল, ফিরিঙ্গী কালী মন্দির”। এর থেকে অনুমান করা হয়, মন্দিরটি ৯০৫ বঙ্গাব্দে স্থাপিত হয়েছিল।প্রথমে এটি শিব মন্দির ছিল।১৮২০-১৮৮০ পর্যন্ত শ্ৰীমন্ত পন্ডিত এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ছিলেন।ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি চাঁদনী স্থাপত্যে গড়া মন্দির।

মন্দিরের কালীমূর্তিটি মাটির তৈরি। এটি প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা সবসনা ত্রিনয়না মূর্তি। কালীমূর্তি ছাড়াও মন্দিরে আছে শীতলা,মনসা,দুর্গা,শিব ও নারায়ণের মূর্তি।মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায় কালীপূজা ও প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ পূজা হয়। 

লেক কালীবাড়ি

আগের নাম ছিল ‘শ্রী করুণাময়ী কালীমাতা মন্দির’। সাদার্ন অ্যাভিনিউতে লেকের পাশে বলে  লোকমুখে লেক কালীবাড়ি নাম হয়েছে। ১৯৪৯ সালে তন্ত্রসাধক শ্রী হরিপদ চক্রবর্তী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত মূর্তির নাম ‘করুণাময়ী কালী’ যিনি দক্ষিণা কালী রূপে পূজিত।সম্প্রতি এখানে দেবী ধূমাবতীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।     

মন্দিরের বয়েস বেশিদিন না হলেও এই কালীবাড়ির বিপুল জনপ্রিয়তা ও কিছু মাহাত্ম্য নিয়ে কিছু জনশ্রুতি আছে তন্ত্রসাধক হরিপদ চক্রবর্তী অধিকাংশ সময়ে সাধন ভজনের মধ্যে থাকতেন ,আশে পাশের লোকজন তাকে গুরুদেব বলত।তার সাধনায় খুশি হয়ে মা কালী তাকে দর্শন দিয়েছিলেন আর উনি মানবজাতির শান্তিকামনার জন্য তন্ত্রসাধনা করে একটি পঞ্চমুন্ডীর আসন তৈরী করেন যা পাঁচটি নরমুণ্ড দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল।কালীমূর্তির পাশে এখনও এই আসন রাখা আছে।

এখানে উল্লেখ্য এই মন্দির কোনও ধনীর আনুকূল্যে নয় ভক্তরাই এই মন্দির চালান।প্রতি শনিবার ১৫ মিনিট অন্তর অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।পুজোর সময় এখানে সাজ বদল হয় দেবীর। কখনও সোনার,কখনও ফুলের সাজে সেজে ওঠে মায়ের মূর্তি।

তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র- দীপ্তিময় রায়, এসেন্সিয়াল হিন্দুইজম অ্যান্ড জার্নাল অফ বৈষ্ণব স্টাডিস -স্টিভেন.জে. রোসেন। হিষ্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচার- দীনেশ চন্দ্র সেন।                

  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *