কমলেন্দু সরকার
চৈত্রের শুরু বাংলা পঞ্জিকায় উৎসবের শেষ। শুরু পাড়ায় হেঁকে চলা ‘জয়বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে মহাদেব।’ চটে যাওয়া গেরুয়া খেটে ধুতি আর হাতাওয়ালা দাদু গেঞ্জি পরিহিত একদল চৈত্রের সন্ন্যাসী পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে অন্ন-ভিক্ষা করতেন। এখনও হয়তো করেন। বাড়ির গিন্নিমায়েরা খিড়কির দরজা খুলে একবাটি চাল, কিছুটা ডাল, দুটি আলু, একটি কাঁচকলা সন্ন্যাসীদের ঝুলিতে দিতেন। বাল্যকালে দেখতাম ওই সন্ন্যাসীরা টাকা-পয়সা নিতেন না। কারণটা বুঝতাম না! পরে জেনেছিলাম চৈত্রের শুরু থেকে শেষ, এই একমাস ওঁরা কৃচ্ছ্রসাধন করতেন। টাকাপয়সা ছুঁতেন না। দিনশেষে ভিক্ষার চাল, ডাল, আলু, কাঁচকলা- সব একসঙ্গে মাটির মালসায় রান্না করার পর খেতেন। এমনকী রান্নার নুনও ব্যবহার করতেন না, করতেন সৈন্ধব লবণ। তারপর মাটিতে গায়ের উড়নি বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। এই সময় এঁদের কোনও যৌন উত্তেজনা বা শারীরিক মিলনও ছিল নিষিদ্ধ। এই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করার কারণ অনেক স্বামী-স্ত্রীকেও একসঙ্গে সন্ন্যাস নিতেও দেখা যেত, এখনও হয়তো দেখা যেতে পারে! স্বামীর সঙ্গে স্ত্রী ছাড়াও বহু মহিলাও থাকতেন। সন্ন্যাসীদের মধ্যে প্রান্তিক মানুষের আধিক্য থাকলেও একাধিক ধনী বা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষও থাকতেন, থাকেনও। আসলে চৈত্র-সন্ন্যাস নেওয়ার পিছনে একটা কারণ থাকে৷ সেই কারণ হতে পারে মানসসিদ্ধি অর্থাৎ দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে কিছু চাওয়া বা আশাপূরণ হয়ে যাওয়ার পর মহাদেবের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা সন্ন্যাস নিয়ে। এই চৈত্র-সন্ন্যাসীরা হলেন সবাই শিবের চেলা। লোকবিশ্বাস, গাজনের দিন শিবের বিয়ে হয় দেবী হরকালীর সঙ্গে। এই বিয়েতে সন্ন্যাসীরাই হলেন বরযাত্রী। হয়তো যার জন্য তাঁদের মুখে একটিই মন্ত্র— ‘জয়বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে মহাদেব।’ এই মন্ত্রের অদ্ভুত একটা সুর। যে-সুরে মিশে থাকে লোকাচার। এই সুর অন্যকোথাও শুনবেন না।
কলকাতার সেকাল থেকেই চলে আসছে চৈত্রসংক্রান্তির গাজন ও চড়ক উৎসব। এই গাজন আর চড়ক উৎসব জড়িয়ে আছে নীলপুজোর অর্থাৎ শিবের সঙ্গে। চড়কপুজোর মাধ্যমে উৎসবের শেষ। উত্তর কলকাতার ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাজার এবং দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাটে কলকাতার গাজন উৎসব দেখার মতো! এদিন বেরোয় জেলেপাড়ার সঙ। পুরনো কলকাতায় এর কদর ছিল। বহুদিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়। পুরনো উত্তর কলকাতায় বাবু সংস্কৃতিতে গাজন নিয়ে প্রভূত উত্তেজনা উন্মাদনা ছিল। চৈত্র সংক্রান্তির বিকেলে সন্ন্যাসীরা চড়ক গাছে উঠে পিঠে বাণ ফুঁড়ে ঘোরেন! আবার একাধিক সন্ন্যাসী আবার জ্বলন্ত আগুনের ওপর দিয়ে
শহুরে ব্যস্ততার মাঝেও কলকাতার কিছু এলাকায় এই লোকঐতিহ্য আজও সগৌরবে পালিত হয়।
চড়ক বা গাজন উৎসব নিয়ে সবিস্তারে আলোচনায় আসা যাক। ভয়ংকর কষ্টকর জীবন কাটাতে হয় চৈত্রের চড়ক-সন্ন্যাসীদের। আরও ভয়ংকর হয় চৈত্র সংক্রান্তির বিকালে বা সন্ধ্যায়। সারাদিনের পর চড়কের ঝাঁপ হয় মহাদেবের সামনে। দু’তিনতলা বাড়ি সমান বাঁশের ভারার ওপর থেকে ঝাঁপ দেন সন্ন্যাসীরা। তাঁদের ঝাঁপ দিতে হয় বটি, কাটারি ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র কিংবা আগুনের ওপর। আবার অনেকে জ্বলন্ত কোনও কিছুর ওপর দিয়ে হাঁটেন। কোথাও তৈরি হয় দশতলা সমান চড়ক গাছ তার ওপর চড়ক-সন্ন্যাসীরা পিঠে বাণ বিঁধিয়ে বনবন করে ঘোরেন। চড়ক পুজোর আগের দিন চড়ক গাছটিকে পরিষ্কার করা হয়। জলভরা একটি পাত্রে শিবলিঙ্গ রাখা হয়। এই শিবলিঙ্গটির পরিচয় বুড়ো শিব। আজও এই দৃশ্য কলকাতা শহরে দৃশ্যমান ছাতুবাবুর বাজারের চড়কপুজোয়। কলেজ স্কোয়ারের মেলা এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে।
চড়কপুজোর প্রচলন নিয়ে নানারকম কথা শোনা যায়। তবে চড়ক হল মূলত বাংলার এক অন্যতম সেরা লোকউৎসব। চৈত্রসংক্রান্তির দিন দুই বাংলাতেই হয়ে থাকে চড়কপুজো। চৈত্র মাসে শিবভক্তেরা মহাদেবের উপাসনা করে থাকেন। গ্রামগঞ্জে চালু আছে এক লোককথা, বাণরাজা ছিলেন প্রচণ্ড শিবভক্ত। তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ হয় দ্বারকা অধিপতি কৃষ্ণের। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাণরাজা অমরত্ব লাভের আশায় চৈত্রসংক্রান্তির দিন অনেক লোকজন নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন। উৎসবে আত্মহারা বাণরাজা নিজের শরীরের রক্তপাত করেন শিবের উদ্দেশে। এইদিনটির স্মরণে প্রতি বছরই চড়ক উৎসব পালন করা শুরু হয়।
অনেকেই মনে করেন, পাশুপত সম্প্রদায় এই উৎসব পালন করত প্রাচীনকালে। পাশুপত শৈবধর্ম হল প্রাচীনতম প্রধান শৈব হিন্দু বিদ্যালয়গুলির মধ্যে একটি। মনে করা হয়, খ্রিস্টীয় প্রথমশতক থেকেই বিদ্যমান ছিল। আবার অন্য মতে, পনেরো শতকের প্রায় শেষলগ্নে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা চড়কপুজোর প্রচলন করেন। তবে, চড়কপুজো কোনওমতেইই রাজা, জমিদার, ধনীব্যক্তিদের উৎসব নয়। মনে করা হয়, হিন্দু সমাজের প্রান্তিক মানুষেরাই এটি পালন করেন। সেইকারণে চড়কপুজোয় পুরোহিত বা ব্রাহ্মণদের কোনও ভূমিকা থাকে না।
চড়ক পুজোর কিছু প্রচলিত লোকসংস্কৃতির রীতি আছে, যা পূর্বে একটা ধারণা দিয়েছি। ভয়ংকর সে রীতি। যা রীতিমতো শিহরন জাগায়। কুমিরের পুজো, জ্বলন্ত আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা, কাঁটা, বর্শার ফলা বা ধারালো কোনও অস্ত্রের ওপর লাফানো, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য বা শবদেহ নিয়ে নৃত্য ইত্যাদি চড়কপুজোর বিশেষ অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। তবে, বর্তমানে এইসব রীতির অনেকটাই এখন নেই। ইংরেজ আমল থেকেই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
গ্রামবাংলায় চড়কপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে থাকে ভূতপ্রেত বা পুনর্জন্ম। চড়কপুজোর সন্ন্যাসীরা মনে করেন, নানাবিধ শারীরিক যন্ত্রণা হল ধর্মের অঙ্গবিশেষ। সবচেয়ে ভয়ংকর হল চড়ক-সন্ন্যাসীরা যখন পিঠে লোহার শলাকা বা বাণ বিঁধিয়ে চড়কগাছের সঙ্গে ঘোরেন! অনেকে আবার পিঠে, হাতে, পায়ে, কানে, জিভে এফোঁড়-ওফোঁড় করে শরীরের লোহার শলাকা গেঁথে ঝাঁপ দেন কিংবা নৃত্য করেন!
চড়কপুজোর বীভৎসতা ১৮৬৫-তে ব্রিটিশ সরকার আইন করে বন্ধ করে দেয়। তবে আজও গ্রামবাংলার বহু জায়গায় এইভাবে চড়ক পুজো পালিত হয়ে থাকে। চড়কপুজো মূলত দেখা যায় বা পালিত হয় কৃষিপ্রধান অঞ্চলে। কলকাতা শহরেও দেখা গেছে এমন চড়কপুজো।
সারা বাংলা জুড়েই পালিত হয় চড়কপুজো। হাওড়া জেলার বালিগ্রামের কল্যাণেশ্বরতলায় বহুকাল ধরে পালিত হয়ে আসছে চড়কপুজো বা চড়কের ঝাঁপ। কল্যাণেশ্বর শিবমন্দির বহু পুরনো। শোনা যায়, এই মন্দিরে নাকি পুজো করতে আসতেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব। এছাড়া কাছেই পঞ্চাননতলায় বাবা পঞ্চাননমন্দিরের সামনে চড়কের ঝাঁপ আজও সাড়ম্বরে পালিত হয়। নদীয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিবের গাজন উপলক্ষে মেলা বসে। সেই মেলা শতাধিক বছরের পুরনো। তারকেশ্বর ধামেও গাজনের মেলা বসে। বাঁকুড়ার খামারবেড়ে অঞ্চলে শিবের গাজন এবং মেলা হয়। হুগলির চণ্ডীপুর গ্রাম ছাড়াও আরও বেশকিছু জায়গায় শিবের গাজন উপলক্ষে চড়কপুজোর মেলা বসে। প্রচুর লোক সমাগমও হয়।

চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন বাড়ির মহিলারা সংসার এবং সন্তানের মঙ্গলকামনায় পালন করেন নীলষষ্ঠী। এটি বাঙালি গৃহিণীদের ব্রত। নীল বা নীলকণ্ঠ হল শিবের আর এক নাম। কোথাও কোথাও নীলসন্ন্যাসী এবং শিব-দুর্গার সঙ সেজে নীলের মূর্তি নিয়ে গান গাইতে গাইতে তাঁরা গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘোরেন। গ্রামের মানুষেরা তাঁদের ভিক্ষা দান করেন।
কিছু কিছু জায়গায় চৈত্রসংক্রান্তির দিন চড়কপুজো বা উৎসব হলেও তা চলে বৈশাখ মাসের প্রথম কয়েক দিনও। প্রকাণ্ড একটি গাছের কাণ্ডকে ‘চড়ক গাছ’ বলে অভিহিত করা হয়। চড়ক গাছটি সারাবছর জলে ডোবানো থাকে। চৈত্রসংক্রান্তির দিন গান গেয়ে বাজনা বাজিয়ে শিবের নাম জয়ধ্বনি দিয়ে জল থেকে তোলা হয় গাছটি।। কিছু জায়গায় তোলা হয় আগের দিন। চড়ক গাছ পুজো করে মাটিতে সোজা করে পুঁতে দেওয়া হয়। আগায় বাঁধা হয় কাঠ। গাছটি হল শিবের লিঙ্গের প্রতীক, আর পার্বতীর প্রতীক জমি। অর্থাৎ গাছটি হল শিবের লিঙ্গ, আর জমি হল পার্বতীর যোনি। চড়ক হল শিব-পার্বতীর মিলনের উৎসব। জমির উর্বরতা বৃদ্ধির কামনা নিয়ে কৃষকেরা মাতেন চড়ক উৎসবে। বোঝাই যাচ্ছে, চড়কপুজো হল কৃষিকাজের উন্নয়নের উৎসব।
এ-প্রসঙ্গে লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ, লেখক, গ্রন্থকার স্বপন ঠাকুর বললেন, “সারাদেশের থেকে বাংলায় দেব-দেবীদের নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন, দেবাদিদেব মহাদেবকে কৃষিকাজের দেবতা হিসেবে মানা হয়। এ আমরা দেখেছি ‘শিবায়ণ কাব্য’-এ। গৌরীকে বিয়ে করে শিব গৃহস্থ হয়েছেন। সন্তানও হয়েছে। তখন গৌরী বললেন, ‘তুমি এবার কৃষিকাজ শুরু করো মর্তে।’ তখন শিব বলেন, ‘চাষবাস করতে গেলে তো বীজ দরকার। বীজ কোথায় পাওয়া যাবে।’ তখন শিব এবং গৌরীর মধ্যে কামোত্তেজনা দেখা গেল। শিবের বীর্যপাত থেকে ধানের বীজ সৃষ্টি হল। মর্তে শুরু হল ধান চাষ। এই ধানের নাম কামোদ। কাম থেকে সৃষ্টি তাই কামোদ। এই নামের ধান আমরা পেয়েছি।
স্বপন ঠাকুর আরও জানান, “চড়কপুজো কিন্তু বহু প্রাচীন। সেই তুলনায় গাজন কিন্তু নবীন। ধর্মরাজের উৎসব থেকে গাজনের শুরু।”
মানুষ তো প্রথম থেকেই চাষবাসের কাজে লাঙল ধরা বা ব্যবহার করতে শেখেনি। সেই প্রাচীনকালে মানুষ যখন থেকে লাঙলের ব্যবহার শিখল তখন চাষের উপযোগী জায়গা বাছাই করে স্থায়ীভাবে বাস করতে শেখে এবং শুরু করে। এবং শিখেছিল বিনিময়প্রথা। চালের বদলে ডাল, ডালের বদলে আনাজপাতি ইত্যাদি ইত্যাদি পেতে লাগে।
দেখা গেল, সবাই মিলে যে যার মতো বিনিময়প্রথা চালাতে গেলে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। তাই কোনও একজনকে দায়িত্ব হল। তার কাছে সবাই এসে তাদের চাষের বাড়তি সব দিয়ে যেত বদলে যা প্রয়োজন নিয়ে যেত। এই প্রথা বা system চলতে চলতে দোকান তৈরির ভাবনা মাথায় আসে সেকালের মানুষদের। এর হিসাবপত্র রাখার জন্য খাতা তৈরি হল। হালজাত উৎপাদিত জিনিসপত্রের হিসাব রাখা হত বলে খাতাটিও নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হালখাতা’। পুরনো হিসাবপত্রের খাতা বন্ধ করে খোলা হত নতুন খাতা। তাই দিনটি পরিচিত হল হালখাতা নামেই।
পুরনোকালের হালখাতা মাথায় রেখে মুঘল সম্রাট আকবর জমিদারদের বাকি খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠান ‘পুণ্যাহ’ চালু করেছিলেন পয়লা বৈশাখ। তাই অনেকেই বলেন, পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ চালু করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। আদৌ তা নয়। জমিদারদের ওপর নবাবি কর্তৃত্ব কায়েম রাখতে পয়লা বৈশাখ ‘পুণ্যাহ’ প্রথা চালু করেছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খান। সেসব ছিল এলাহি ব্যাপার!
তবে বলে রাখা প্রয়োজন হালখাতার সঙ্গে বাংলা নতুন বছর উদযাপনের কোনও সম্পর্ক নেই।
একসময় ছিল শারদোৎসব নতুন বছর শুরুর উৎসব। দুর্গাপুজোর অষ্টমী- নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপুজোর সময় ছিল বাংলা নতুন বছরের শুরু। এইসময় ১০৮ প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়েই দেবীর কাছে প্রার্থনা জানানো হত নতুন বছর যেন আলোকোজ্জ্বল হয়।

এসব আদ্যিকালের কথা। আগেই বলেছি হালখাতা আর বাংলা নববর্ষ পালন এক নয়। বাংলা নতুন বছরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সকলের বাড়িতে যেতেন। মিষ্টিমুখ করতেন। আর একটি চমৎকার ব্যাপার ছিল সেইসময়। শহরে চাকরি করতে যাওয়া বাঙালিবাবুরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন অফিসের কাজকর্ম সেরে বাড়ি ফিরতেন। গ্রামের বাড়ির সবাই অপেক্ষায় থাকতেন নতুন কিছু পাওয়ার আশায়। মিষ্টি, নতুন বছরের জামাকাপড় তো থাকতই। আর একটি জিনিস থাকত, সেটি হল নতুন পঞ্জিকা। বাড়ির বিধবারা একাদশী, পূর্ণিমা, অমাবস্যা দেখে নিতেন। এছাড়াও কেউ কোনও শুভকাজে যাওয়ার আগে বাড়ি থেকে বেরোবার শুভসময়টি দেখে নিতেন। বিশেষ করে যাঁরা মামলামকদ্দমার জন্য আদালতে যেতেন তাঁরা। এই নতুন পঞ্জিকা পড়া চলত কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সবাইয়ের বাড়িতেই। পঞ্জিকা পড়া শেষে মিষ্টিমুখ হত। বহু বাড়িতেই বাড়ির গিন্নিরা মিষ্টি বানাতেন। বহুরকম মিষ্টি বানানো হত সারারাত। সেসব দিন অস্তাচলে।
এখন তো বাংলা নববর্ষের কয়েক দিন আগে থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখা যায় ঢাউস ঢাউস বিজ্ঞাপন। কোন হোটেল-রেস্তরাঁয় কী কী বাঙালি খাবার মিলবে। কোনও কোনও হোটেল-রেস্তরাঁ আবার খাওয়ার তালিকার সঙ্গে খাবার পরিবেশনকারী পুরুষদের ধুতি-পাঞ্জাবি আর বাংলার শাড়ি পরা মহিলাদের ছবি দেন। এখন তো আবার অর্ডার দিলেই বাড়ি বসেই খাবার পাওয়া যায় পছন্দমাফিক।
বাল্যকালে মজা ছিল বাংলা নববর্ষের দিন সন্ধেবেলা। চৈত্র মাসের শেষের দিকে পাতলা কাগজের একটি গোলাপি খাম আসত বাড়িতে। সোনার দোকানের হালখাতার আমন্ত্রণ। লালকালিতে লেখা, তার ওপর অভ্র বা সোনালি গুঁড়ো ছড়ানো আমন্ত্রণপত্র। একাধিক আমন্ত্রণপত্র। পয়লা বৈশাখের সকালেই ঠিক হয়ে যেত কে কোনটাই যাবে। সবাই চাইত বড় দোকানে যেতে।
হালখাতার পুজো হত সাতসকালে। অনেকেই দোকানপাটে পুজোর ঝামেলা না-করে কালী মন্দিরে সেরে নিতেন। পুজো বলতে লাল খেরোর খাতা আর লক্ষ্মী-গণেশ পুজো। পুজোর শেষে দোকানে ফিরে পুরনো মূর্তি বিসর্জন দিয়ে নতুন অধিষ্ঠিত করা। আর সন্ধ্যা হলেই মালিক ছোট্ট একটি ডেস্কের ওপর লাল হালখাতাটি খুলে আগাম দেওয়া অর্থের পরিমাণ লিপিবদ্ধ করে, পুরনো খাতার বাকি অর্থ নিয়ে অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিতেন।
আর অন্যদিকে সন্ধে হলেই সেজেগুজে বাড়ির বড়রা রওনা হতেন হালখাতা সারতে। বাড়ির কর্তার পরনে চওড়া পাড়ের ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। ধুতির কোঁচা থাকত পাঞ্জাবির পকেটে। আর বুক পকেটে কড়কড়ে একটা বড় নোট। বাইরে থেকে দেখা যেত। আর সঙ্গে গিন্নির পরনে ঢাকাই শাড়ি। সঙ্গে বাড়ির ছোট বাচ্চাটি। দোকানে ঢুকলেই কর্মচারীটি গোলাপজল ছিটিয়ে দিতেন। তারপর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত শরবত। টাকা পাওয়ার পর ধরিয়ে দেওয়া হত একবাক্স মিষ্টি আর ক্যালেন্ডার। বাচ্চাটির কাজই ছিল মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করা। বাড়ি ফিরে হিসেব হত কতগুলো পাওয়া গেছে! কেননা হালখাতার আমন্ত্রণ থাকত সোনার দোকান থেকে মুদির দোকান। পয়লা বৈশাখের হালখাতার দিনগুলো ছিল একেবারে ভিন্নরকম। এখনও আছে তবে প্রযুক্তির ব্যবহার চলে এসেছে। আমন্ত্রণপত্রও আর আসে না। চলে আসে হোয়াটসঅ্যাপে। টাকার আদানপ্রদানও হয় অনলাইনে।
বাঙালির পয়লা বৈশাখের হাওয়া লেগেছিল টালিগঞ্জে বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে। সে যে কবে লেগেছিল কেউই বলতে পারে না। তবে সে হালখাতা নয়, ছিল বাংলা সিনেমার মহরত। পয়লা বৈশাখে মহরতের দিন টালিগঞ্জের প্রতিটি স্টুডিয়ো সেজে উঠত ফুলে ফুলে! সবাই নতুন পোশাক পরে স্টুডিয়োয় আসতেন। প্রযোজক পরিচালকেরা কালীমন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসতেন। সেই প্রসাদী-ফুল ক্যামেরায় ঠেকিয়ে নতুন ছবির মহরত শট নেওয়া হত। এমনকী উত্তমকুমারকেও দেখা গেছে মহরত শটের সূচনায় ক্লাপস্টিক দিতে। সেসব দিন ছিল ষোলোআনা বাঙালির।
কোনও কোনও স্টুডিয়োতে দেখা যেত প্যান্ডেল বেঁধে খাওয়াতে। সেই অনুষ্ঠানে সকলের অংশগ্রহণ ছিল দেখার মতো। একবার পয়লা বৈশাখ মহরতের দিন খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি দুই কিংবদন্তি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস আর পাহাড়ি সান্যাল। টেবিল চেয়ার ছিল সেকালের বিয়েবাড়ির মতো। লম্বা লম্বা টেবিল আর ফোল্ডিং কাঠের চেয়ার। ছবি বিশ্বাস আর পাহাড়ি সান্যাল, দুজনের মধ্যে ছিল ঠাট্টা মজার সম্পর্ক। ঘটনাটি কী ঘটেছিল সেদিন: ছবি বিশ্বাস আর পাহাড়ি সান্যালের একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল একবার পয়লা বৈশাখের মহরতে। সেদিন ছিল ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবির প্রযোজকের নতুন ছবির মহরত। চল্লিশের দশকে কোনও একটা ছবির মহরত অনুষ্ঠানে কালী ফিল্মস স্টুডিয়োতে ভূরিভোজ হচ্ছে। কালী ফিল্মসের স্টুডিয়ো বলতে এখন যেটি টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো বলে পরিচিত। যাইহোক, ওই মহরত অনুষ্ঠানে বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি শিল্পীরা সবাই হাজির। ছবি বিশ্বাস আম খেতে ভালবাসতেন খুব। কানাঘুষো শোনা গেল প্রযোজক ল্যাংড়া আমের ব্যবস্থা করেছেন। অন্যদিকে পাহাড়ি সান্যালের পছন্দের খাবার ছিল ছানার ডালনা। তিনিও খবর নিয়ে জেনেছেন তাঁর প্রিয় পদটি আছে দুপুরের মেনুতে। কিন্তু খেতে বসে দেখা গেল দুটোর কোনও পদটিই নেই। ছবি বিশ্বাসকে লক্ষ করে পাহাড়ি সান্যাল বললেন, ‘টাকায় টাকা বাড়ে, গরমে বাড়ে ঘাম, প্রোডিউসার এত কিপটে, পাতে দেয়নি আম!’ ছবি বিশ্বাসও সঙ্গেসঙ্গে বললেন, ‘হায়রে ছানার পাই না দেখা, কোথায় গেলি তুই?, তোর অভাবে ভরলো না পেট, হাত-পা তুলে শুই!’ এইরকম মজার সম্পর্ক ছিল ওঁদের দু’জনের ভিতর। আর কত কত মজা হত সেকালের পয়লা বৈশাখের মহরতে। এক পরিচালক খুব হতাশ হয়ে বললেন, টালিগঞ্জ স্টুডিয়োপাড়ার পয়লা বৈশাখে বাঙালির বনেদিয়ানাটাই হারিয়ে গেল!
শুধু স্টুডিয়োপাড়ায় নয়, পয়লা বৈশাখের সেই মজা, আনন্দ, বাঙালিয়ানার গন্ধ কোথাও আর তেমনভাবে পাওয়া যায় না!
শেয়ার করুন :




