আসন্ন বর্ষায় শরীর সুরক্ষা -

ছবি- চ্যাটজিপিটি

আসন্ন বর্ষায় শরীর সুরক্ষা

অ্যাপোলো ও মণিপাল হসপিটালসের বিশিষ্ট ডাক্তারি পরামর্শ।

গরমের দাবদাহের পর বর্ষার আগমন যেন স্বস্তির পরশ। মেঘলা আকাশ, টুপটাপ বৃষ্টি আর সবুজে মোড়া প্রকৃতি মনকে যেমন ভালো করে দেয়, তেমনই এই সময়েই বাড়তে শুরু করে নানা সংক্রমণ ও মৌসুমি রোগের প্রকোপ। চিকিৎসকদের মতে, বর্ষাকালে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, জল জমে থাকা, দূষিত পানীয় জল এবং খাদ্যদ্রব্যে জীবাণুর বিস্তার দ্রুত ঘটে। ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া থেকে শুরু করে টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া কিংবা বিভিন্ন ছত্রাকঘটিত ত্বকের সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তবে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললে বর্ষা উপভোগের পাশাপাশি শরীরকেও রাখা যায় সুরক্ষিত।

বিশুদ্ধ পানীয় জলই প্রথম সুরক্ষা

বর্ষাকালে জলবাহিত রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দূষিত জল থেকে ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ-এর মতো রোগ ছড়াতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সম্ভব হলে ফুটিয়ে বা পরিশোধিত জল পান করুন। বাইরে বেরোলে নিজের পানির বোতল সঙ্গে রাখুন এবং রাস্তার অজানা উৎসের জল এড়িয়ে চলুন।

মশা প্রতিরোধে কোনও আপস নয়

বর্ষার জমে থাকা জল মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ ক্ষেত্র। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের সংক্রমণ এই সময়েই সবচেয়ে বেশি হয়। সপ্তাহে অন্তত একদিন ফুলদানি, এসির ট্রে, টব, পুরনো টায়ার বা ছাদে জমে থাকা জল পরিষ্কার করুন। সন্ধ্যার পর পুরো হাত-পা ঢাকা পোশাক পরুন এবং প্রয়োজন হলে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।

রাস্তার খাবারের লোভ সামলান

বৃষ্টির দিনে ফুচকা, চপ বা ভাজাভুজির আকর্ষণ অনেকের পক্ষেই সামলানো কঠিন। কিন্তু বর্ষাকালে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, যতটা সম্ভব টাটকা ও গরম খাবার খান। দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখা খাবার, কাটা ফল বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাদ্য এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী খাবেন?

ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে খাদ্যতালিকায় এমন খাবার রাখা উচিত যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

মৌসুমি ফল

পাতিলেবু ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার

আদা, রসুন ও হলুদ

দই বা প্রোবায়োটিক জাতীয় খাদ্য

পর্যাপ্ত জল ও হালকা স্যুপ

অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত ও ভারী খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই সহজপাচ্য খাবারের উপর জোর দেওয়াই ভালো।

ত্বক ও পায়ের বিশেষ যত্ন

বর্ষার আর্দ্র পরিবেশে ফাঙ্গাল ইনফেকশন, র‍্যাশ, চুলকানি ও অ্যাথলিটস ফুটের মতো সমস্যা বাড়তে দেখা যায়।

ভিজে জামাকাপড় দ্রুত বদলে ফেলুন

পা শুকনো রাখুন

দীর্ঘক্ষণ ভেজা জুতো ব্যবহার করবেন না

প্রয়োজন হলে অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার ব্যবহার করুন

বৃষ্টির জল বা নোংরা জমা জলে খালি পায়ে হাঁটবেন না

বিশেষত ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পায়ের যত্নে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

সর্দি-কাশি মানেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়

বর্ষাকালে ভাইরাল সংক্রমণের কারণে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা ও জ্বর সাধারণ ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অযথা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়। তিন দিনের বেশি জ্বর থাকলে বা শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

শিশু ও প্রবীণদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা

শিশু, গর্ভবতী নারী এবং প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাদের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ জল, পুষ্টিকর খাদ্য এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকের কাছে কখন যাবেন?

নিম্নলিখিত উপসর্গগুলির কোনওটি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন –

টানা জ্বর

বমি বা ডায়রিয়া

তীব্র শরীর ব্যথা

শ্বাসকষ্ট

ত্বকে অস্বাভাবিক র‍্যাশ

অতিরিক্ত দুর্বলতা

প্রস্রাব কমে যাওয়া

ডেঙ্গু, টাইফয়েড বা লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখবেন: বৃষ্টি উপভোগ করুন, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে কোনও আপস নয়।

বর্ষার ১০টি স্বাস্থ্য-মন্ত্র

☑ শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বা ফুটানো জল পান করুন

☑ বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন

☑ রাস্তার কাটা ফল ও খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন

☑ সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির আশপাশে জমে থাকা জল পরিষ্কার করুন

☑ মশারি বা মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন

☑ ভিজে জামাকাপড় দীর্ঘক্ষণ পরে থাকবেন না

☑ প্রতিদিন অন্তত একটি ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল খান

☑ শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকুন

☑ জ্বর হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

☑ পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন

অ্যাপোলো হসপিটালসের ডঃ সন্দীপ কুমার চন্দ্র (এমডি, এমআরসিপি ),মণিপাল হসপিটালসের ডঃ শম্ভূ ভিশাল (এফসিপিএস, ডিএনবি ) র পরামর্শ-

“বর্ষাকালে অসুস্থতা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ জল এবং মশা নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়ে কোনও আপস না করা।”

ডেঙ্গু নাকি সাধারণ ভাইরাল জ্বর?

লক্ষণ দেখে প্রাথমিক পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?

লক্ষণডেঙ্গুসাধারণ ভাইরাল জ্বর
জ্বরহঠাৎ খুব বেশি (১০২-১০৪°F)মাঝারি থেকে বেশি
মাথাব্যথাখুব তীব্রসাধারণত মাঝারি
চোখের পিছনে ব্যথাপ্রায়শই থাকেসচরাচর থাকে না
শরীর ও গিঁটে ব্যথাঅত্যন্ত তীব্রহালকা থেকে মাঝারি
ত্বকে লালচে র‍্যাশদেখা যেতে পারেকম দেখা যায়
প্লেটলেট কমে যাওয়াহতে পারেসাধারণত হয় না
সর্দি-কাশিকম দেখা যায়প্রায়শই থাকে
দুর্বলতাঅনেক বেশিতুলনামূলক কম

সতর্কবার্তা

• জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

• ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না।

• প্রচুর জল, ওআরএস এবং তরল খাবার গ্রহণ করুন।

• প্লেটলেট নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন।

গুরুত্বপূর্ণ: শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে নিশ্চিত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নিতে হবে।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *