ভ্যালেন্টাইনে চিলেকোঠার প্রেম,ঘুড়িতে প্রেমপত্র

দুই বাড়ির চিলেকোঠার ঘর থেকে দু’জনেই…….প্রেমপত্রটি ঘুড়ির লেজে সেঁটে……

কমলেন্দু সরকার

‘ইতিহাস বলে রোমান্টিক প্রেমের উন্মেষ ইংল্যান্ডে নয়, ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে– ফ্রান্সে। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে। এবং একালে নয়, সেই মধ্যযুগে, হাজার শতক থেকে তেরো চৌদ্দ শতকের মধ্যে। অঙ্কুর, গাছ, ফুল– সব ওই কয়শ’ বছরে। ফ্রান্স থেকে স্পেন, ইটালি, ইংল্যান্ড, জার্মানী। গোটা পশ্চিম ইউরোপ। মধ্যযুগের শেষে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চল যেন এক বিশাল প্রেমের বাগিচা।’ এসব আমার কথা নয়, বলেছেন শ্রীপান্থ তাঁর ‘ভালবাসার জন্ম’ লেখাটিতে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাঙালির ভালবাসার জন্ম, ভালবাসার দৃঢ় বন্ধন হল পুরনো বাড়ির ছাদ, চিলে কোঠা। এখন তো ফ্ল্যাটবাড়ির সৌজন্যে উধাও কোমরসমান আলসেঘেরা ছাদ আর চিলেকোঠা। চিলেকোঠায় ভূত থাকে, ভয় দেখিয়ে ছোটদের দূরে রেখে বড়দের অবসর নেওয়ার ফাঁকে চলত দুরন্ত প্রেম। অনেকের  আবার চিলেকোঠা-ঘরে না-বসলে পড়ায় মুখস্থ হত না। আলাভোলা ছেলে নিকুঞ্জর জন্য পাড়ার কত ছেলে বাবা-মায়ের কাছে মার খেয়েছিল ইয়ত্তা ছিল না। বাড়ির বড়রা বলতেন, “দ্যাখ, নিকুঞ্জকে দেখে শেখ, সারাদিন কেমন বইমুখে বসে আছে। আর তুই খেলে বেড়াচ্ছিস।” নিকুঞ্জদের পাশের বাড়ির উমারও ছিল একই অভ্যাস। চিলেকোঠায় না-পড়লে পড়ার মেজাজই পেত না। সারাদিন বই নিয়ে। আবার সেই বাড়ির বড়দের ধমক, “উমাকে দ্যাখ, সারাদিন বই ছাড়া কিছু বোঝে না। আর তুই ধিঙ্গি নেচে বেড়াচ্ছিস। আর ভারতীটাও হয়েছে তেমন। দিনরাত দু’জনের কী যে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর কে জানে! ভারতীরা ভাড়া থাকত উমাদের বাড়ি। উমা আর নিকুঞ্জদের ছিল তিনতলা বাড়ি। দুই বাড়িরই চিলেকোঠা থেকে ঘরের ভিতর সব দেখা যেত। একদিন মাল কট। সন্ধেবেলা ছাদে উঠে দেখি দুই বাড়ির চিলেকোঠার ঘর থেকে দু’জনেই টর্চের আলো জ্বালাচ্ছে আর নেভাচ্ছে! ওই বাংলা কথাটা সামান্য অদলবদল করলাম– যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো প্রেমের সন্ধান। ঠিক তাই। এটা ছিল বাইরে বেরিয়ে দেখা করার ছল। আমিও পিছু নিলাম নিকুঞ্জের। যাকে বলে গোয়েন্দাগিরি। বলতে ভুলে গেছি, আমরা ছিলাম ওদের বাড়ির ভাড়াটে। দেখি, দু’জনে দু’জনের মতো হাঁটতে লাগল। দেখে মনে হল গন্তব্য ভূতের মাঠ। ভূতের ভয়ে সন্ধের পর ওদিক আর কেউ মাড়াত না। প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া। মিলে গেল দুইয়ে দুইয়ে চার। বোঝা গেল, পড়া নয় ছল, এ-হল চিলেকোঠার প্রেম।

ছবি:দেবব্রত

চিলেকোঠা ছাড়াও আর এক ধরনের প্রেমের খুব চল ছিল ষাটের দশকে। তা হল ঘুড়ি-প্রেম। আরে না, ঘুড়িপ্রেমী নয়। দু’জনের মধ্যে প্রেমের মিডিয়াম ছিল ঘুড়ি। সেকালে বাড়ির কিশোরী, যুবতীরাও বেশ দড় ছিল ঘুড়ি ওড়ানোয়। ওই দাদা-কাকাদের লাটাই ধরতে ধরতে শিখে নিত ঘুড়ি ওড়ানো।

ওই সময় পেটকাটা চাঁদিয়াল, ময়ূরপঙ্খি, হাড়িকাট, বামুনটেক্কা ইত্যাদি ঘুড়ির সঙ্গে চাহিদা ছিল খুব উত্তম-সুচিত্রা ঘুড়ির। উত্তম-সুচিত্রার মুখ দেওয়া দেড়তে, দোতে ঘুড়ি। ষাটের দশকে উত্তম-সুচিত্রার দুরন্ত প্রেমের ছবি দেখে বহু বাঙালি যুবক-যুবতী নিজেদের বসিয়ে ফেলেছিলেন ওঁদের জায়গায়। সিনেমার মতো প্রেম এসেছিল নীরবে। কখনও কখনও সরবে। বিশ্বকর্মা, পৌষপার্বণ আর সরস্বতী পুজোয় ঘুড়ি উড়ত আকাশ ছেয়ে। এখনও ওড়ে। বাবা, কাকা, দাদাদের অফিস যাওয়ার ফাঁকে ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে ছাদে যেত বাড়ির কিশোরী-যুবতী। যাওয়ার আগে দেখে নিত পানের ডাবর নিয়ে মায়েদের তাসখেলা জমেছে কিনা। কোনও বাড়িতে আবার মা-দিদিরা উল্টোরথ, সিনেমা জগৎ, জলসা সিনেমা ম্যাগাজিন বুকের ওপর নিয়ে পড়তেন। আর তর সইতো না বুড়ি, বুঁচিদের। পাশের বা ও বাড়ির ঘোতনদা, চাঁদুদারা অলরেডি ছাদে উঠে ফিল্ডিং দিচ্ছে। ওদের একটা সময় নির্ধারিত থাকত ছাদে লাটাই-ঘুড়ি নিয়ে ওঠার। যে যাঁর কাজে বেরিয়ে গেছেন, মা-দিদিরা খেয়েদেয়ে রান্নাঘর পরিষ্কার করে ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন বা সিনেমা ম্যাগাজিন পড়ছেন। কেউবা মুখে পান ঠেসে টুয়েন্টি-নাইন খেলছেন। সাধারণত ওইসময়ে বাড়ির লোকেরা  ছাদে ওঠার কোনও সিন ছিল না। তাই কেস খাওয়ারও ব্যাপার থাকত না। তখন ঘুড়ি হাতে উত্তম আর সুচিত্রাদের দখলে থাকত ছাদগুলো।  সেই যুবক সযত্নে প্রেমপত্রটি ঘুড়ির লেজে সেঁটে আকাশে উড়িয়ে ঠিক ওই যুবতীর বাড়ির ছাদে গোঁত্তা মারতেন। যুবতীটিও সেই প্রেমপত্রটি নিয়ে তার প্রেমপত্রটি সেঁটে উড়িয়ে দিতেন। তারপর সেই প্রেমপত্র হাতে পড়ত প্রেমিকের। এভাবেই প্রেমপত্রের উত্তর-প্রত্যুত্তর চলত ঘুড়ির ওড়াউড়িতে। কখনও কোনও পার্বণ ছাড়াও শীতের দুপুরে মিঠেকড়া নির্জন দুপুরেও চলত ঘুড়ি-প্রেম। তাই বাড়ির ছাদগুলোই হয়ে উঠেছিল এক একটা প্রেমের বাগিচা। আমাদের দু’চারটে বাড়ির পরেই ভবেশদার বাড়ি। ওরা ছিল বিশাল ধনী। শুনেছিলাম ভবেশদার বাড়িতে নাকি সোনার মোহরও ছিল। না, দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনও। ভবেশদা আর ললিতাদির বাড়ির মাঝে ছিল বিশাল পুকুর। পুকুর নয়, দিঘি বলা চলে। প্রায়ই দেখতাম ভবেশদার ওড়ানো ঘুড়ি গোত্তা খেয়ে ললিতাদির ছাদে আর ললিতাদির ঘুড়ি ভবেশদার ছাদে। দু’জনের ঘুড়িতে লম্বা লেজ ঝুলত। তারপর একদিন ভবেশদা-ললিতাদি দু’জনেই উধাও। পলায়িত-পলায়িতা দ’জনেরই কোনও খোঁজ নেই। না, ওদের খোঁজ পাইওনি কেউ, কোনওদিন।

আবার উল্টোটাও যে ঘটেনি এমন নয়, গবার ঘুড়ি গোত্তা খেয়ে পড়ল গুটির মাথায়। কাকে ঠোকারানোর মতো জ্বালা। মাথায় হাত গুটির। দ্যাখে, ও বাড়ির ছাদ থেকে গবা দাঁত বার করে হাসছে। ঘুড়িতে ল্যাজে লাগানো চিঠি খুলেই গুটির মাথা গেল ঘুরে-গুটি তোমাকে আমি খুব ভালবাসি। একদিন চলো না শ্রীকৃষ্ণ সিনেমা হলে উত্তম-সুচিত্রার ‘সপ্তপদী’ দেখে আসি। বাড়ির কাউকে বোলো না। ইতি- তোমার গবু।

গুটি চিঠি সটান গেল মায়ের কাছে। গুটির সরলাকাকিমা গুটিকে নিয়ে গেল গবাদের বাড়ি। কাকিমার চিল চিৎকারে গবার বাড়ির সকলের ঘুম গেল চটকে। তারপর যা ঘটল তা চোখে দেখা যায় না। গুটর মা, গবার মা সঙ্গে বাবার মিলিত প্যাঁদানি। পুলিশের হাতে চোরের প্যাঁদানি। গবার হাপুস নয়নে কান্না, সে চোখে দেখা যায় না। শুনেছিলাম, গবাকে নাকি একশিশি আর্নিকা খেতে হয়েছিল ব্যথা কমানোর। এক সপ্তাহ পর গবা স্কুলে যেতে শুরু করে। এরপর থেকে গবাকে কোনওদিন ওপর দিকে তাকাতে দেখিনি। ঘুড়ি ওড়ানো দূরে থাক, আকাশের দিকে তাকিয়েই দেখিনি কোনওদিন। একদিন গবাদের পরিবার পাড়া ছেড়েই চলে গেছিল। বহু বছর পর গবা আর গুটিকে নিউমার্কেটে পুজোর বাজার করতে দেখে অবাক হয়েছিলাম! না, ওদের সামনে গিয়ে লজ্জায় ফেলিনি।

গ্রিসের বিজ্ঞানী-দার্শনিক  আর্চিটাস যখন ঘুড়ির উদ্ভাবন করেন তখন তিনি কী ভেবেছিলেন তাঁর ঘুড়িই হবে বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেমের মাধ্যম! শোনা যায়, খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে তিনি ঘুড়ির পূর্বপুরুষকে  বানিয়েছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন পায়রা। আবার অনেকেরই মত, ২৮০০ বছর আগে চিনেই প্রথম ঘুড়ির প্রচলন। পরবর্তী সময়ে ঘুড়ি ছড়িয়ে পড়ল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। ইউরোপে ঘুড়ি প্রচলন হয় ১৬০০ বছর আগে। ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যাপারে দক্ষ চিন, জাপান, কোরিয়া,  মালয়েশিয়া। এইসব দেশে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন আছে।

সেকালে চিনে ঘুড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হত বিস্ফোরক। উদ্দেশ্য শত্রু-জাহাজকে ঘায়েল করা। পুরনোকালে ঘুড়ি ব্যবহৃত হত সামরিক কাজে। নৌবাহিনীর গোলন্দাজেরা অনুশীলন করতেন ঘুড়ি উড়িয়ে তাঁদের নিশানা-লক্ষ্যের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঘুড়ির সঙ্গে এরিয়াল জুড়ে রেডিয়ো-সংকেত পাঠানো হত। অনেকসময় জাহাজের খোঁজ না-মিললে ঘুড়ি উড়িয়ে নিখোঁজ জাহাজের খবরাখবর নেওয়া হত। ঘুড়ির মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তিও হত। প্লেন আবিষ্কারের বহু আগে ঘুড়ির সঙ্গে মানুষকে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হত। ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে-যাওয়া মানুষটির কাজই  ছিল শত্রুপক্ষের সমস্ত খবরাখবর নেওয়া।

ঘুড়ি উড়িয়ে শুধুমাত্র এসবই হত, তা নয়। গবেষণার কাজেও ঘুড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি উড়িয়ে দেখেছেন বজ্রপাতের পিছনে বিদ্যুতের ভূমিকা আছে। স্কটল্যান্ডের দুই বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার উইলসন এবং টমাস মেলভিন  ঘুড়ির সঙ্গে থার্মোমিটার জুড়ে সেটি আকাশে উড়িয়ে পরীক্ষা করেছিলেন পৃথিবীর ওপরের স্তরের তাপমাত্রা।

ভারতে ঘুড়ি এসেছে অনেক পরে। মুঘল আমলে। মুঘলেরা মূলত ঘুড়ি ওড়াতেন বিনোদনের জন্য। তারপর দিল্লি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য রাজ্যে। কলকাতা শহরে ঘুড়ি আসে অনেক পরে। মেটিয়াবুরুজে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ আসবার পর ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন খুব বেশি বাড়ে। ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি প্রচলন হয়েছিল বুলবুলির লড়াইয়েরও। এই দু’টিই কলকাতার বাবু কালচারের সঙ্গে মিশে যায়। কলকাতার বাবুরা ঘুড়ির লেজে টাকা সেঁটে আকাশে ওড়াতেন। সেই কাটা ঘুড়ি যিনি ধরতেন টাকাটাও তিনিই পকেটস্থ করতেন। আবার শোনা যায়, পড়তি বাবুরা নাকি নকল টাকা ঘুড়িতে সাঁটিয়ে ওড়াতেন।

একটা সময় বাঙালির ঘুড়ি ওড়ানো কালচারটিই শেষ হতে বসেছিল। এবারে করোনার কারণে আকাশ-ছেয়ে ঘুড়ি দেখা যাচ্ছিল লকডাউনের সময় থেকে। মানুষের ঘরে বসে থাকতে থাকতে এসেছিল একঘেয়েমি। তাই দুপুরের রোদের তেজ কাটিয়ে গৃহবন্দি মানুষ ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে ছাদে উঠতেন বিকেলবেলা। ঘণ্টা দুই-আড়াই সময় কাটাতেন সেই পুরনো অভ্যাসে। অনেকেই ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আনন্দ কিংবা মুক্তির স্বাদ। খুঁজে পেয়েছিলেন সেই কৈশোরের নস্ট্যালজিয়া। তবে প্রেমপত্র সেঁটে ঘুড়ি ওড়ানোর খবর আর পায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *