ছবি: অনির্বান নস্কর

কত অজানারে বাগবাজার

কলকাতার শেষ সতী,মদনমোহন রাস,ভোলা ময়রা,রসগোল্লা,গিরিশ ঘোষ,অমৃত বাজার পত্রিকা..

অনিরুদ্ধ সরকার

‘বাগবাজার’ নামটা সম্ভবত ‘বাঁকবাজার’ থেকে এসেছে বলেই অনেকে মনে করেন। গঙ্গার বাঁকে অতীতে একসময় বেশ বড় একটি বাজার বসত। আর সেই বাঁকের বাজার থেকেই  বাগবাজার নামটির আবির্ভাব বলে অনেকেরই ধারণা। তবে এই মত মানতে নারাজ অনেকেই। পুরনো কলকাতার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে,  কলকাতায় ইংরেজদের বসবাসের একেবারে প্রথম দিকে গঙ্গার তীরে  চার্লস পেরিন নামে এক সাহেব বড় একটি বাগানবাড়ির মালিক ছিলেন। এই পেরিন সাহেব ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। পেরিন সাহেবের একটি সুন্দর বাগান ছিল। ইংরেজরা সেযুগে প্রচুর ফারসি শব্দ ব্যবহার করতেন বাগানকে ফার্সিতে বলা হয় ‘বাগ’ বলা হয়। পেরিন সাহেব এখানে একটি বাজার বসিয়েছিলেন যা ‘পেরিন সাহেবের বাগিচা’ নামে বেশ জনপ্রিয় ছিল।  পেরিন সাহেবের সেই ‘বাগিচা’ বা ‘বাগ’ থেকেই বাগবাজার নামটির উৎপত্তি বলে বেশিরভাগ জন মনে করেন।

চার্লস পেরিনের বাগানবাড়িতে কোম্পানির বড় বড় সাহেবরা তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সন্ধ্যেবেলার দিকে  শহর কলকাতা থেকে মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসতেন। ইংরেজরা সুতানুটি ছেড়ে চৌরঙ্গী অঞ্চলে চলে গেলে  ১৭৪৬ সাল নাগাদ সাহেবদের আনাগোনা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৭৫২ সালে এই  বাগানটি নিলামে ওঠে এবং কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট জেফানিয়াহ হলওয়েল মাত্র আড়াই হাজার টাকায় এই বাগানটি কিনে নেন। পরে ১৭৫৫ সালে কর্নেল ফ্রেডরিক স্কটের কাছে বাগানটি তিনি বিক্রি করে দেন। এই কর্নেল ছিলেন পুরানো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সেনাধ্যক্ষ এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রথম স্ত্রী মেরির বাবা। মেরির স্বামী বুকানন অন্ধকূপ হত্যায় মারা গেলে মেরি হেস্টিংসকে বিয়ে করেন। সিরাজের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের পর ইংরেজরা পালিয়ে ফলতায়  আশ্রয় নিলে সেখানেই হেস্টিংয়ের সঙ্গে মেরির আলাপ হয়। মেরির পিতা কর্ণেল স্কট ফলতায় একটি বারুদ তৈরির কারখানা খুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে চলে যায়। বাগবাজার শুধু বাজারের জন্যই প্রসিদ্ধ এরকমটা নয়। বাগবাজার আরও অনেকগুলি কারণে ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

কলকাতার শেষ সতী  হয়েছিলেন যে হরসুন্দরী , তিনি ছিলেন বাগবাজারের সোম পরিবারের মেয়ে। বেন্টিঙ্কের আইন পাস হওয়ার আগের মুহূর্তে স্বামীর চিতায় তিনি নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি। বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট অত্যন্ত মনোরম। কলকাতায় যে কয়েকটি শ্মশান রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো বাগবাজারের কাশী মিত্তিরের শ্মশানঘাট। ঢাকার নায়েব রাজবল্লভ মিত্রর ভাইপো কাশিমপুরের নামেই এই শ্মশান ঘাট। এই ঘাটের কাছেই ছিল তাঁর বাড়ি। ১৭৬১ সাল নাগাদ তিনি এক দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন। সেকেলে কলকাতার বাগবাজারের দুটি জিনিস ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। একটি ছিল ষোলোচরকি এবং অন্যটি ছিল মদনমোহন তলার রাস। মদনমোহন তলার বাড়িতে রাস উপলক্ষে সঙ প্রদর্শিত হত। আর সেই ‘সঙ’ সারা কলকাতায় আর কোথাও দেখা যেত না।  এই ‘সঙ’ বাগবাজার ছাড়িয়ে নানান প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত।  সেযুগে এই বাগবাজার ঘিরে একটি প্রবাদ ছিল বেশ জনপ্রিয়-

   “ ময়রা মুদি কলাকার ,তিন নিয়ে বাগবাজার।”

 

সারা কলকাতা জুড়ে এই প্রবাদ লোকের মুখেমুখে ফিরত। প্রবাদে ব্যবহৃত  তিনজন ময়রা- মুদি-কলাকারের মধ্যে ভোলানাথ দে অর্থাৎ ভোলা ময়রার নাম আজ সারা বিশ্ব চেনে। তাঁর নিজের কথায়, “আমি ময়রা ভোলা বি আই খোলা নহি কবি কালিদাস বাগবাজারে করিবার পুজো হলে পুরি মিঠাই ভাজি।” অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সঙ্গে ভোলা ময়রার কবির লড়াই আজ ইতিহাস। এই ভোলা ময়রার নাতজামাই ছিলেন নবীন চন্দ্র দাস বাগবাজার রসগোল্লার জন্য চিরপ্রসিদ্ধ। নবীন চন্দ্র দাস রসগোল্লার জন্মদাতা।

বাগবাজারকে কেন্দ্র করে আরও একটি বিখ্যাত প্রবাদ গড়ে উঠেছিল যা ছড়াতে পরিণত হয়েছিল সেযুগে। প্রবাদটি হল, “বাগবাজারে গাঁজার আড্ডা গুলির কোন্নগরে বটতলায় মদের একটা সুন্দর বউ বাজারে”। জানা যায় দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায় যিনি হ্যারিসন সাহেবের দেওয়ান ছিলেন এবং যার নামে বাগবাজার অঞ্চলে একটি রাস্তা এবং গঙ্গার তীরের একটি ঘাট রয়েছে। তাঁর ছেলে শিবচন্দ্র ছিলেন বাবুগিরিতে ওস্তাদ। তাঁর পরিবারের সবাই ছিলেন দুই ‘ম-তে’ মাতোয়ারা ‘মদ আর মেয়ে’, আর সেকারণে যাতে পথে ঘাটে বসে তাঁরা নেশা না করে গাঞ্জা না টানে মেয়েদের সঙ্গে বেরাল্লাপনা না করে  এবং পরিবারের সম্মান বজায় থাকে তার জন্য একটি গাঁজার আড্ডা খুলেছিলেন। এখানে প্রত্যেকের নাম ছিল এক একটি পাখির নামে। আর সেই আড্ডায় তাঁদের সেই পাখির নামেই ডাকা হত।

এই বাগবাজার পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের পদধূলিতে ধন্য। শ্রীরামকৃষ্ণ দীর্ঘদিন এখানকার বলরাম বসুর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই থাকতেন। যে বাড়ি আজ বলরাম মন্দির নামে জনপ্রিয়। বলরাম মন্দির আর হলঘরেই ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন অ্যাসোসিয়েশন নামে যে সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন তাই পরে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সারদামণিও দীর্ঘদিন বাগবাজারে ছিলেন।

বাগবাজারে নারী শিক্ষার জন্য নিবেদিতা স্থাপন করেছিলেন রামকৃষ্ণ সারদা মিশন ভগিনী নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়, যা ‘নিবেদিতা স্কুল’ নামে জনপ্রিয়। বাগবাজারে থাকতেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, অমৃতলাল বসুর মত মানুষজন। এই বাগবাজার থেকে গড়ে উঠেছিল বাংলার প্রথম সাধারণ রঙ্গালয়। বাগবাজারে গিরিশচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে তৈরি হয় প্রথম অ্যামেচার নাটকের দল, বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার। প্রথম পেশাদারী নাট্যসংগঠন ন্যাশনাল থিয়েটারেরও জন্ম হয়েছিল বাগবাজারে। রয়েছে নন্দলাল বসুর বাড়ি। ১৯২৪ সালে স্বরাজ পার্টির কনফারেন্স বসে ছিল এই বাড়িতে। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ এই বাড়ির উঠোনে সভা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, প্রফুল্ল চন্দ্র, চিত্তরঞ্জন দাশ থেকে একাধিক দিকপাল ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন এই বাড়িতে। শ্রীরামকৃষ্ণ এই বাড়িতে এসেছিলেন নন্দলালের ভাই প্রতিবেশের আগ্রহে।

বাগবাজারের আরও একটি বিখ্যাত জায়গা এখানকার ‘বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরী’ যে লাইব্রেরীতে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে আরম্ভ করে অজস্র বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তাদের গ্রন্থ দান করেছিলেন।

শিশির কুমার ঘোষ এবং মতিলাল ঘোষ বাগবাজার থেকে শুরু করেছিলেন ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র প্রথম প্রকাশ।

আখড়াই গানের স্রষ্টা রামনিধি গুপ্ত টপ্পা গানের গানের যে দল করেছিলেন তা ‘বাগবাজার দল’ নামে জনপ্রিয় ছিল। তার শিষ্য মোহন চান  বাগবাজারের একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। যিনি আখড়াই গানকে হাল্কা করে হাফ আখড়াই রূপান্তরিত করেছিলেন। ।বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল অনাদি বসুও ছিলেন বাগবাজারের বাসিন্দা ।

বাগবাজারের মাটিতেই মোহনবাগান ক্লাবের বীজ রোপণ করা হয়েছিল আর সবশেষ ১৯১০ সালে শ্রী অরবিন্দ নৌকাযোগে চন্দননগর যাত্রা করেছিলেন এই বাগবাজার ঘাট থেকেই।

তথ্যসূত্র :

১| এক যে ছিল কলকাতা- পূর্ণেন্দু পত্রী

২| পুরনো কলকাতার কথা- জলধর মল্লিক

৩| কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা-        মহেন্দ্রনাথ দত্ত

৪| জোড়াসাঁকোর ধারে- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৫| আঠারো ও উনিশ শতকের কলকাতার বাজার – জ্যোর্তিময় সেন

৬| কলিকাতা কল্পলতা- রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 

ব্যক্তি ঋণ: মৌমিতা ভৌমিক।

ছবি সৌজন্যঃ গেটি ইমেজেস,শাটারস্টক,পিন্টারেস্ট ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *