নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী
বাংলার নতুন বৎসর আসলে একেবারেই মোগলাই ব্যাপার। এখনকার দিনের পয়লা বৈশাখে বাঙালির যে বর্ষারম্ভ হয় ,তা আমাদের আত্মীকৃত, সাধারণীকৃত সংস্করণ। অথচ বাঙালির ঘরে আমাদের হিন্দু ভাবনায় যা হতে পারত ,তাও আমাদের ঘটেনি।কেননা তা সম্ভবই ছিল না । আসলে জৈন – বৌদ্ধ কিংবা মুসলমান-খ্রিস্টানের আগে থেকেই সনাতন ব্রাহ্মণ্য সংস্কার যেটা বঙ্গদেশে চালু ছিল ,সেখানে তো পরিবর্তন হয়েছে বার বার। অর্থাৎ কিনা ,অতি- প্রাচীন ভারতবর্ষে তিথি- নক্ষত্রের যোগ নিয়ে অনেক ভাবনা থাকলেও বর্ষারম্ভ নিয়ে একটা শক্তপোক্ত মত গড়ে ওঠেনি কিছু । পন্ডিতেরা বৈদিকদের ঋতু –সনাথ ,আশা- আকাঙ্খা -আশীর্বাদ ব্যাপারটাকে একটা চিহ্ন হিসেবে ধরে বলেছেন যে ,আর্যরা অতিশীতল দেশ ছেড়ে ভারতবর্ষে ঢোকার পরও পুরোনো অভ্যেস বদলাতে পারেনি বলে ‘একশো শীত ‘ বেঁচে থাকার আশা করতেন ,অথবা একশো শীত বেঁচে থাকার আশীর্বাদও করতেন। ঋগ্বেদে রুদ্রদেবতার কাছে একটি মন্ত্রে ঋষি বলছেন – আমরা যেন তোমার দেওয়া ওষধি লাভ করে একশো হিম ( শীতকাল ) বেঁচে থাকি – শতং হিমা অশীয় ভেষজেভিঃ।বেদের পংক্তিতে শতং হিম মানে একশো বছর।পন্ডিতেরা বলেছিলেন সেকালে ভারী শীতের দেশ থেকে এসে আর্যদের এই শতবার্ষিকী জীবন পরিকল্পনার কারণ সম্ভবত আর্যরা বছর গণনা করতেন শীতকাল থেকে।
আবার যখন যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন কোন মাসের উপবাসে ফল হয় সবচেয়ে বেশি তখন ভীষ্ম পিতামহ উপবাসের তালিকা আরম্ভ করলেন অগ্রহায়ণ মাস থেকে ।কেননা সেকালে বর্ষারম্ভের মাস এটাই আর নামের মধ্যেই সেই মিল দেওয়া আছে,কারণ বৎসরের অগ্রে যে প্রথম মাস সেই অগ্রহায়ণ ।ভগবতগীতার আর এক টীকাকার বেঙ্কটনাথ বলেছেন বৎসরের এই প্রথম মাসের অধিষ্ঠাত দেবতা হলেন কেশব তাই ‘প্রথমস্য কেশবস্য মাসত্বাং… বর্ষ গৰ্ভধান ..কালত্বাৎ।
সন্দেহের আর দ্বিতীয় কারণ থাকে না যে, শুধু বঙ্গদেশ নয়,সমস্ত ভারতবর্ষেই এই অঘ্রাণ মাসটাই বর্ষারম্ভের প্রতীক ছিল।সেখান থেকে আমরা যে কেমন করে টি এস এলিয়টের ক্রুুয়েলেস্ট মান্থ এপ্রিলে বর্ষবরণ আরম্ভ করলাম তার সৌজন্য সহায়তায় আছেন মহামতি আকবর,মুঘল সম্রাট আকবর।এমনিতে হৃদয়বান মানুষ হলেও কী করবেন ,রাজকোষে অর্থ না থাকলে ,রাজকর জমা না হলে তিনি প্রশাসন চালাবেন কী করে ?রাজকোষে অর্থ জমা পড়ার সবচেয়ে অসুবিধে দাঁড়াল ক্যালেন্ডার।আকবরের অনেক আগে থেকেই বঙ্গদেশে প্রশাসন চলছিল হিজরি সন অনুযায়ী ।কিন্তু হিজরি সন
চান্দ্রমাস অনুযায়ী চলে বলে বাংলার মতো কৃষিপ্রধান দেশের ফসলি সন প্রতিবছর হিজরি সনের সঙ্গে শুধুমাত্র মেলে না বলেই মিলত না।ফলে কৃষকদের সমূহ অসুবিধে আরম্ভ হল ! কারণ ফসল বস্তুটাই যাদের রাজকর হিসেবে দিতে হয় ,তারা চান্দ্রমাসের গতিতে এক এক সময়ে রাজকর দেবে কী করে !ফসল ওঠার নির্দিষ্ট সময়েই যদি অবস্থা বুঝে রাজকর দেওয়া সম্ভব হয় ,তবেই কৃষকদের সুবিধে ।
মহামতি আকবর আমির ফতেউল্লা শিবাজি নামে এক বিদ্বান পন্ডিতকে ভার দিলেন হিজরি চাঁদ এবং ভারতীয় ফসলি সনের সূর্যকে একত্র মেলাতে।শিবাজির পরিশ্রম কম হয়নি -হিজরির চান্দ্রায়ণী গতি আর হিন্দুদের সূর্যসিদ্ধান্ত অনেক মিলিয়ে তিনি নিজের সমকাল বাদ দিয়ে বাদশাহ আকবরের সিংহাসন বসার অভিষেক -বর্ষ থেকে একটা শতাব্দী সূচনা করার চেষ্টা করলেন।কেননা যখন বঙ্গাব্দ প্রচলনের এই চেষ্টা চলছে তখন আকবরের রাজত্বকালের ২৮ বছর চলে গিয়েছে ,তাঁর সমসাময়িক হিজরি সন তখন ৯১৮।শিবাজি তখন আকবরের সিংহাসন লাভের বছর ধরে হিজরি সনের ৯৬৩ সনে বঙ্গাব্দ চালু করে দিলেন।বঙ্গাব্দ বৃদ্ধ হয়েই জন্মাল।
তাই এটা বরং মেনে নেওয়া ভাল যে বঙ্গাব্দের সূচনায় বাঙালির কোনও কারিগরি নেই কিংবা নেই পরম্পরা চালিত কোনও ভাগবত সন্দর্ভ।যা আছে ,তা হল চরম জাতীয় সংহতির প্রমাণ ।তবে বাংলার একটা পৃথক সত্তা অবশ্যই তৈরি হয়েছে – আমাদের নিজস্ব বর্ষ গণনার পদ্ধতি আছে ,যা সারা ভারতবর্ষ মেনে নিয়েছে ।জাতীয় সংহতির এই আব্দিক পূরণ বঙ্গাব্দের বৈশিষ্ট বলেই আমাদের দেবতা গণেশ।গণেশ তাঁর হস্তীমূখের মৃদু হাসিটি নিয়ে নেমে এসেছেন আমাদের হালখাতায় ; কালীঘাটে মহাকালী দন্তবিকশিত আশীর্বাদ করছেন আমাদের, বাঙালির পয়লা বৈশাখ উৎসবের গতিতে বসে পড়েছে শুধু কৃষকদের কল্যাণে ,তাদের ফসলি সনের পূর্ববাহিকতায়,এই নতুন বঙ্গাব্দে তাই কৃষকদের প্রতিই আমাদের কৃতজ্ঞতা থাকুক। এমন কোনও দেশ আছে এই পৃথিবীতে যেখানে একটা নতুন ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে শুধু কৃষকদের প্রয়োজনে।
রবীন্দ্রসংগীত, নলেন গুড় কিংবা বিয়ের ধুতির মধ্যে যদিও বাঙালির বাঙালিত্ব প্রমান করার দায় থাকে কিছু পয়লা বৈশাখের নববর্ষে সেই দায় আছে বলে মনে হয় না!আমাদের এই বঙ্গদেশে বঙ্গাব্দের ইতিহাস জানেন এমন মানুষের সংখ্যা পাঁচ শতাংশও নয়।যে অসংখ্য মানুষ এখন আছে, যাঁদের শিয়ালদহ স্টেশনে ট্রেনে ওঠার সময় বঙ্গাব্দের বর্তমান সংখ্যা জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারবেন না।এমনকী আমাকেও কারণান্তর বশত বঙ্গাব্দের সংখ্যা স্মরণ করতে হয় মাঝেমধ্যে, কিন্তু হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে আমি থতমত খাব।তার কারণ অনভ্যাস।এমনকী বর্ষশেষের আলোয় রাঙা এই চৈত্র মাসে কোনও আধুনিক আধুনিক প্রেমিক- প্রেমিকার চোখে ‘সর্বনাশ ‘ পর্যন্ত ধরা পড়ে না । আর যে ছেলেটা সদ্য -রাবীন্দ্রিক রোমাঞ্চে চোখ ঢুলু ঢুলু করে -‘বর্ষশেষের আলোয় রাঙা ‘ উচ্চারণ করেছিল এবং নিপুণভাবে লক্ষ্য করেছিল অভি- দন্ডায়মান তরুণীর চোখ দুটিতে প্রেমময়ী দীর্ঘছায়া ঘনিয়ে আসে কিনা -তরুণী উত্তর দিয়েছিল – কী সব চৈত্র – ফৈত্র বলছিস আর তোর সর্বনাশটাই বা কী করলাম আমি ?দ্যাখ এইসব কবিতা- ফবিতা নিয়ে একদম আমাকে ‘হেকল’ করার চেষ্টা করিস না ।এই মর্মান্তিক ‘সেমান্টিক ‘ বিপর্য্যাস শুনেই আমি বুঝেছিলাম – আর বাংলা ক্যালেন্ডার থাকার কোনও মানেই হয় না।
অথচ দেখুন প্রতি বছর বঙ্গাব্দ আসে আমরা বর্ষবরণ করি যথাসাধ্য যথামতি।এমনকী সকাল এবং সন্ধ্যায় মহোৎসাহ দেখা যায় এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে – যারা আমাদের অন্ন- ব্যঞ্জন বেশ- বাসের ব্যবস্থা করেন ।সকালে তাদের গুন্ঠিত ধুতিতে জাবদা খাতা আর সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি নিয়ে কালীমন্দিরে যেতে দেখি কেননা বঙ্গদেশে পুজোর প্রথমাংশ সিদ্ধিদাতা গণেশের জন্য বরাদ্দ থাকলেও এদেশ গণেশ চতুর্থীর দেশ নয়, আমরা মাথা বিকিয়ে আছি জগন্মাতার কাছে আর ভোলানাথ শঙ্করের কাছে – মাতা মে পার্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ।আমরা ধামায় করে সিদ্ধিদাতা গণেশকে নিয়ে জনক -জননীর আদর খাইয়ে আনি কালিমাতার থানে তারপর জাবদা খাতায় হিসাব আরম্ভ করি শুভলাভ লিখে।
তবে এটা মানতে হবে যে বাঙালি আর বাঙালিয়ানার মধ্যে একটা তফাৎ আছে বই কি!বাঙালি বলতে তার ভৌগোলিক সংস্থানটুকুর সঙ্গে তার নদ-নদী জল-হওয়া ধুতি-চাদর মৌরলা-ইলিশ শাক-শুক্তোর পাত আর নদী -জলের কাদামাখা মাখো মাখো আবেগ -এসব ঠিক আছে ।কিন্তু বাঙালিয়ানার মধ্যে একটা দেখনদারী আছে এগজিবিশনিজম আছে, বাঙালিত্বের একটা বাহ্য আরোপন আছে ।সময় বুঝে ধুতি পাঞ্জাবি পরা নির্দিষ্ট দিনে বড় রেস্তোরাঁয় শাক-শুক্তোর খালি গিলে আহা-উহু করা এবং সাময়িক রবীন্দ্রসংগীত -এসব আমার কাছে কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় এমনকী অশ্রদ্ধেয় কোথাও কিছু নয়। কী করবে বাঙালি ঠাকুমা-দিদিমারা নেই চলার মধ্যে সময় নেই, অকারণে আনন্দ নেই কী করবে বাঙালি? ফলত নতুন বছরটাও কিন্তু বাঙালিয়ানার একটা অন্যতম দিন হয়ে উঠেছে ।এটা ভেবে আনন্দ পাওয়ায় ভাল যে আজকে যে দিনটা পালিত হতে হতে ইতিহাস হয়ে উঠেছে সেখানে যদি উৎসমুখে বাঙালির কোনও আত্মচিহ্ন না-ও থাকে তাহলেও পালন-পোষণের মাহাত্ম্য এতটাই যে তা বাঙালির ইতিহাস তৈরি করে দেয়।
শেয়ার করুন :





