বুড়ো আশুতোষ আর নিঃসঙ্গ চৈত্র -

ছবি- শুভেন্দু সরকার

বুড়ো আশুতোষ আর নিঃসঙ্গ চৈত্র

পায়ের নীচে ঘেঁটু ফুলের জোসনা, প্রফুল্ল আকন্দ ফুটে থাকে রুখা দুপুরের গর্ভে, অদূরে দিগন্তবিথারি….

সায়ন্তন ঠাকুর

আশুতোষের বয়সের গাছ-পাথর নাই, মাথার জটা ধুলামলিন পিঙ্গল, পরনের বাঘছালও জৌলুসহীন তবে কণ্ঠে সেই কবেকার নীল রঙ কিন্তু এখনও লেগে রয়েছে! মোটাসোটা দেবতাটি ফাল্গুন-চৈতের হাহাকারাচ্ছন্ন দ্বিপ্রহরে একা একা চড়কতলার মাঠে প্রাচীন ছায়াময় অশ্বত্থ তলায় বসে থাকেন, লাল শালু মোড়ানো হাতের কল্কেয় মাঝে মাঝে দু-একটি টান দেন আর ভুরুক ভুরুক গাঁজার ধোঁয়া মিশে যায় বৈরিগি বাতাসে।  পায়ের নীচে ঘেঁটু ফুলের জোসনা, প্রফুল্ল আকন্দ ফুটে থাকে রুখা দুপুরের গর্ভে, অদূরে দিগন্তবিথারি ভুলোর বালুচর থেকে যখন ভেসে আসে হট্টিটি পাখির ডাক ঠিক তখনই দু-একটি বেখেয়ালি শুকনো অশ্বথ পাতা খসে পড়ে আশুতোষের মাথায়, জটার বামদিকে একফালি চাঁদের কোণে আটকে থাকে সেই জীর্ণ বসনসম পাতা, যেন কোনও সেকেলে অলঙ্কার।  তবে কে কার অলঙ্কার তা আর স্পষ্ট বোঝা যায় না, আশুতোষের অলঙ্কার এই উদাসী চৈত্র, বিগতযৌবনা হলদে পাতা নাকি উল্টোটিই সত্য? কে জানে!

সত্য অত সহজে বোঝা না গেলেও বুড়ো দেবতার সঙ্গে অনেকদিন আগে ছেলেবেলায় একবার আমার দেখা হয়েছিল, সে এক আশ্চর্য ঘটনা! আসুন, আজ আপনাদের সেই গপ্পো শোনাই, ঠিক গল্প নয় আবার আঁকাড়া বাস্তবও তো বলা চলে না।  ওই ধরুন কল্পনা আর বাস্তবের মাঝামাঝি এক অপরূপ দোদুল্যমান ভূখণ্ডে আমাদের দেখা হয়েছিল—ঈষৎ অস্পষ্ট, সামান্য কাঁপুনে, যেন স্পর্শ করলেই ওই ঘটনার রেণু আকাশে বাতাসে গোটা ফাটা শিমুল তুলোর মতন ভেসে যাবে।

যাকগে, ওসব ভাবের কথা থাক, তার চেয়ে বরং গল্পটা বলি!

রাঢ়দেশে চৈত্র মাসের একটা আলগা চটক আছে, ভালো করে ঠাহর না করলে অবশ্য বোঝা যায় না।  পালামৌর বনপাহাড়ের সঙ্গে কিছু মিল আছে আবার অনেকটা ফারাকও স্পষ্ট।  বেলা দ্বিতীয় প্রহর গড়াতে না গড়াতেই রোদ্দুর রক্তচক্ষু হয়ে ওঠে, বাউলানি ধুলাপথ, দূরে আকাশ-মাটির সীমানার কাছে জ্বরো রুগীর মতন কাঁপতে থাকা দিকচক্রবাল রেখা, ঝুঁটি বাঁধা বোষ্টুমী তালগাছ, আগুনে পলাশ, অনাদরের ঘেঁটু ফুলের ঝোপ, ধুলামলিন আকন্দ আর ফল-পাতা শূন্য শিমুল আকাশে হাড় জিরজিরে স্মৃতি-ডালপালা মেলে বসে থাকে।  ইশারাবাহী এক ক্ষ্যাপা বাতাস মাঝে মাঝে ছুটে আসে কোন্‌ জাদুভুবন থেকে, তখন পাক ওঠে লাল ধুলা, খসে পড়ে পলাশ, শুকনো পাতা ভেসে যায় কারোর অলঙ্ঘনীয় নির্দেশে, কে এক বিচিত্র জাদুকরী তার সাপি খুলে ভুবনডাঙায় ছড়িয়ে দেন দু-মুঠি অকারণ মনখারাপ, সংসার-আলগা মানুষের মনে সেই মুহূর্তে ডাক দিয়ে যায় এক চিরকালীন আগল-ভাঙা কিশোর, কানে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘অনেক বেলা হল হে মনপবন, এবার গুবগুবিখান হাতে তুলে নাও, পলাতকা ছায়া আঁধারে হারিয়ে যাওয়ার আগেই চলো আমরা দুজনে পালাই!’

আর তখনই দুপাশে আদিগন্ত মাঠে খরার পান্না সবুজ লকলকে ধান এই রুখা রূপভুবনে কী এক অপূর্ব বৈপরীত্য যে সৃষ্টি করে, ঠিক যেন আমাদের জীবন—বেহিসাবী রাগ, অল্প অভিমান, ঝগড়া, বাদ-বিসম্বাদ আবার চকিত চুম্বন, আলগোছে তুলে নেওয়া প্রেম ও অপ্রেম সব নিয়েই যেমন সে চিরকালের চালচিত্র রচনা করে, এও কতকটা তাই!

তো এইরকম বেলা-বয়ে-যাওয়া দিনে আমি প্রায় ভুলোর চরের দিকে একা একা চলে যেতাম।  কেন যেতাম এখন সে-কথা আর মনে পড়ে না কিন্তু যাওয়ার ঘটনাটি এখনও দিব্যি ঠাহর হয়।  ভুলোর চরের একটা ছোট্ট আখ্যান আছে, এইবেলা সেটিও বলে নিই, নাহলে পরে আবার ভুলে যাব।  আপনি হয়তো বলবেন, ‘আরে, এ যে গল্পের ভেতর আবার গল্প, ও ঠাকুরমশাই, এরকম করে চললে যে আর কোথাও পৌঁছানো হবে না আমাদের! যাহোক বেভুলো উড়নচণ্ডে লোক বটে আপনি!’

আমি সেক্ষেত্রে মুচকি হেসে বলব, ‘এই তো ভালো! কিছুটা আমি বলব, তারপর পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বাকি গল্পের ফুঁপি ধরে আপনি এগিয়ে যাবেন, কিছুক্ষণ পর অন্য কেউ, এভাবেই তো আখ্যান বয়ে যায় কাল থেকে কালান্তরে!’

একসময় ময়ূরাক্ষী এই অঞ্চলে বেশ গতিশীলা ছিল, তারপর কীসের খেয়ালে যেন সে পথ ভুলে চলে গেল আরও পশ্চিমে, পড়ে রইল স্মৃতির মতন শূন্যগর্ভ নদীখাত।  রইল একটি ক্ষীনতনু ধারা, তিরিতিরি জল, বর্ষায় যৌবনবতী হয় বটে কিন্তু তার বারোমাস্যা বড়োই করুণ, শুষ্ক।  নদী মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ায়, ঠিক প্রথম প্রেমিকা ফিরে যাওয়ার পর যেমন হৃদয়ে তৈরি হয় এক অনুনমেয় ক্ষত, অবিকল সেরকম ওইখানে তৈরি হল গত শতাব্দীর বিধবার থানের মতন এক ধু ধু বালুচর, এপার ওপার দেখা যায় না তার, দুপুরে রোদ্দুর গাঢ় হলে তেতে আগুন হয়ে ওঠে চর আবার দিন ফুরোলে চৈতি রাতে অলীক কুয়াশায় ভরে ওঠে চারপাশ।  নিঝুম জনহীন চরে মাঝে মাঝে ভেসে আসে শিবাদলের ডাক, রাতচরা পাখির কান্না ভেঙে দেয় নৈঃশব্দের মগ্না আঁচল, বয়ে যায় শিমশিম বাতাস, কান পাতলে শোনা যায় কে যেন বলছে, ‘আরও এগিও না বাপু, ফিরে যাও, নাহলে তোমার ঘর-সংসার-হাল-বলদ-ছেলেপুলে-পরিবার-জমিজিরেত-ভদ্রাসন সব রসাতলে যাবে!’

তবে চৈতি জোসনায় ভুলোর চর অন্যরকম, এই রূপ-জগতের সঙ্গে তখন তার আর জলচল নাই।  মূর্ছিত কৌমুদী হাওয়া-বাতাসে মিশিয়ে দেয় অলীক ভুবনের রুহ্‌ আতর, তখন কেঁদে কেঁদে একাকী ঘুরে মরে ওই নিঃসঙ্গ বাতাস।  তার বিস্রস্ত আঁচল লুটোয় বন্ধনহীন জ্যোৎস্নায়, দুচোখে লেগে যায় মায়া জগতের রেণু, কাউকে যেন খুঁজে বেড়ায় সে, অনেক জন্ম আগে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিন্তু মিলন হয় নাই বলে বিরহী বাতাস আজও মুক্তি পায়নি।  এই দিগরের লোকজন ওই হাওয়া-বাতাসকে যমের মতন ডরায়, তারা বলে, দিনের বেলা যেমন তেমন ভুলোর চর কিন্তু জোসনা রাতে ওইপানে চোখ তুলে একপলক তাকালেও নাকি অন্ধ হয়ে যায় মানুষ, ডাইনি চাঁদ তার রক্তে অবিরাম বাজিয়ে চলে সন্ন্যাসের ঝুমঝুমি।  চন্দ্রাহত সেইসব মানুষই নাকি চড়কের সন্নিসি হয় একমাসের জন্য, আর যাদের অসুখ আরও তীব্র তারা ঘর ছেড়ে চিরকালের জন্য পালায়, কেউ কখনও তাদের কোথাও খুঁজে পায় না।  গাঁয়ের বুড়ো মানুষরা, যাদের তিন মাথা এক হয়েছে, তারা আরও বলে, বহুকাল আগে এক সোমত্থ মেয়ে নাকি ওই ভুলোর চরে গায়ে আগুন দিয়ে মরেছিল, সেদিন ছিল চৈত্র পূর্ণিমা, ভরা চাঁদের রাতে হব্যবাহর বূহ্য বলয়ের মতন ঘিরে ধরেছিল তাকে, যুবতি পাক খেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল বালুচরে, প্রচণ্ড আর্তচিৎকারে জেগে উঠে বাতাসে মিশে যাচ্ছিল কেশবতী কন্যার চুল-মাংস পোড়ার কটু গন্ধ, মন পোড়ার সুবাসও হয়তো মিশে ছিল! কে জানে! জগত-চোখ দিয়ে মন তো আর দেখা যায় না!

কেন মরেছিল তা নিয়ে কেচ্ছা কম রটেনি কিছু, ওই যা হয়, কাঁচা বয়সে বিয়ের আগে পোয়াতি, আমাদের গাঁ-দেশে বলে সর্বনাশিনীর মন মজেছিল আনজনে! হাঃ, তারা সব অন্ধ লোক, পিরিত দেখতে পায় না, জানে না, সর্বনাশী পিরিত ওইভাবেই দেশ-লোকাচার-কুলাচার-মান-অপমান-নিন্দা-স্তুতি সব ভাসিয়ে জোয়ারের টানে ভাসিয়ে নিয়ে যায় চিরকালের নারী ও পুরুষকে, বারংবার, ওই প্রবল টানের কোনও দেশ-কাল-জাতি নাই, সে এমনই, নিষ্ঠুর ও সোহাগী যুগপৎ, তাই বোধহয় অপ্রতিম!

তবে ওই ঘটনার পর থেকেই নাকি প্রতি শুক্লপক্ষের রাতে বালুচরে ঊর্দ্ধলোক থেকে নেমে আসেন জ্যোৎস্নার দেবী, ফিনফিনে নরম ত্বক, বসনহীন নিরাভরন দেহে দীঘল চোখের মতন দুটি শ্বেতস্তন, মোম গোলানো এলোচুল চরাচরে বিছিয়ে দিয়ে মানুষের নাম ধরে ডেকে বেড়ান, যাদের নাম ধরে ডাকেন তারা যদি ভুলেও ওদিকপানে যায় তাহলে আর ঘরে ফেরে না।  ডেকে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলেই বোধহয় বিস্তীর্ণ চরের নাম হয়েছে ভুলোর চর।

আরও শোনা যায়, ওই মেয়ের নাগর তারপর নাকি মরেছিল গলায় দড়ি দিয়ে, ভুলোর চরের পুবে যে অতিকায় অশ্বত্থ গাছ আছে তার একটি পুরাতন ডালে…হ্যাঁ, আপনার অনুমান যথার্থ, এই হল সেই অশ্বত্থ যার তলায় নিঝুম চৈতি দ্বিপ্রহরে বসে থাকেন আমাদের দেবতা আশুতোষ, যাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বিস্মৃত কৈশোরে!

সেদিনও বেলা একটু গড়াতেই ওইরকম বেপথু বাতাস বইতে শুরু করল আর আমিও গামছায় ফুলো ফুলো আউশ চালের মুড়ি, দুটি শশা আর একখানি পাকা বেল বেঁধে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম।  ফেরার ঠিকানা নাই, সাঁঝ ঘনিয়ে আসার আগে ফিরলেই হবে! বড়ো দিঘির পাশ দিয়ে রাস্তা, তারপর রেললাইন পার হয়ে কলুদের মাঠ, একাকিনী পথ, বামহাতে বিশ্বাসদের বাঁশবাগান, পথের দুপাশে ঘেঁটু ফুলের ঝোপ, চোরকাঁটা, নয়নতারা ফুল, লজ্জাবতী লতা…আরও কয়েক পা হাঁটলে চড়কতলার মাঠ, ভুলোর চর চোখে ভেসে উঠবে।

এই পথে সন্ধ্যায় থোকা থোকা জোনাক জ্বলে, ভুলি নাই, কিছুই ভুলি নাই, এখনও সব স্পষ্ট মনে আছে। 

ইচ্ছা ছিল অশ্বত্থ তলার ছায়ায় বসে মুড়ি-শশা খাব আর অলস চেয়ে থাকব সেই কুহকিনী চরার দিকে, কেন কে জানে ওইরকম কাঁচা বয়সে ভুলোর চর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত! সেই ডাক অবশ্য আজও মুছে যায়নি। 

তা মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক, চিরদিনের নিয়ম!

চড়কতলায় পৌঁছে দেখি বুড়ো অশ্বত্থের ছায়ায় আশুতোষ বসে রয়েছেন, মাথায় ভাঙা চাঁদ, পরনে মলিন বাঘছাল, সারা দেহে ছাই, গলায় আবার নীল রঙ! ডম্বরুটি পাশে রাখা, ত্রিশূল কিন্তু নাই।  আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে গাঁজা খাওয়া ভাঙা গলায় বললেন, ‘বিড়ি দ্যা না একখান, বাপজান!’

আমি তো কথা শুনে একগাল মাছি! বললাম, ‘বিড়ি খাইনা আমি!’

‘সে কী অলুক্কুনে কতা রে বাপ, বিড়ি খাসনে তো চলে কী করে তোর!’

শুধোলাম, ‘তুমি কে বলো দেখি? এত খতেন কীসের তোমার?’

তারপর কত কথা, কত কথা! ছায়া দীর্ঘ হল, অপরাহ্নের রেণু আর বাতাস জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার হয়ে গেল কখন যেন, আমাদের কথাগুলিও ডানা মেলে উড়ে গেল ভুলোর চরের পানে, সে-সব কথা জমিয়ে রাখলে আজ আপনাদের শোনাতে পারতাম।  কিন্তু আমার দ্বারা যে সঞ্চয় হয় না, যত্র আয়, তত্র ব্যয়, কী করব বলুন, কথায় বলে, অভ্যেস যায় না ম’লে!

তবে এটুকু মনে আছে, পাকা বেলটি আশুতোষের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, ভারি তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল খুবই খিদে পেয়েছিল!

খেতে খেতে গলায় আলগোছে হাত বুলিয়ে কেমন যেন করুণ গলায় বললেন, ‘দ্যাক, এই অং মাকলি গা কুটকুট করে!’

ছেলেমানুষি সুরে শুধোলাম, ‘তা গলায় মাখো কেন রঙ?’

প্রসন্ন মুখে বুড়ো দেবতা বললেন, ‘না মাকলি চলবে! কত বচ্চরের অব্যাস! সেই কবে বিষ খাইচেলাম তার ট্যালা সামলাও একন!’, কথা শেষ করেই গুনগুন করে গান ধরলেন, ‘চিড়নে চুড়িয়া চুল, খোঁপায় দিয়া, হা রে, চম্পা ফুল, ফুলের গন্ধে কেড়ে লেয় প্রাণের যুবতির কুল! সুন্দরী তুই তো বড় রূপসী,আমি একটু হইছি বুড়া, তাতে তোর ক্ষেতি কি?’

ওই একবারই মাত্র দেখা হয়েছিল, তারপর আর কখনও সাক্ষাত হয়নিকো!

গতকাল বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম বড়ো রাস্তার ধারে দুজন লোক শালু পেতে পয়সা ভিক্ষা করছে।  পরনে লাল কাপড়, খালি গা, কপালে খড়িমাটির তিলক, সুর টেনে টেনে বলছে, ‘দুদিন এলি এই ভবে, দুদিন পরে যেতে হবে,খামারবাড়ি খামারজমি, সময় হলে যাবে ছাড়ি!’

বুঝলাম চড়কের সন্নিসি, অবাকও হলাম একটু, এই ইলিকঝিলিক শহরে এরা এখনও বেঁচে আছে! চোখের পলকে মধুমাসের বাতাসে ভর করে ছুটে এল রাম বাগদি!

সখী সাজবে এবার রাম বাগদি।  সস্তার জরিপাড় শাড়ি, পরচুলো, কানে ঝুটো সোনার মাকড়ি,পায়ে মল,নীল রঙ সারা মুখে। আরেকজন কেউ পরবে মিথ্যে বাঘছাল, প্লাস্টিকের চাঁদ লাগাবে পরচুলো জটায়, হাতে টিন কাটা ত্রিশূল, গলায় বৈঁচি ফুলের মালিকা।  নীল পুজোর রাতে বিয়ে হবে ওদের—শিব আর লীলাবতী, বাসর জাগবে সন্নিসির দল,কচি বেতের নলা দিয়ে শোল মাছ রাঁধা হবে, যতেক ভূত পেত্নীর সেদিন নেমতন্ন।

পোড়া অশ্বত্থ তলার মাঠে পরদিন চড়কের মেলা, নাগরদোলা আসবে, হরেক মাল—যা নেবে সব দশ টাকা, দশ টাকা! গণপতি জাদুকর খেলা দেখাবে খালি হাতে, দড়ির খেলা, শূন্য কলস থেকে জল ঢালার খেলা, তারপর চড়ক গাছে চড়ে পিঠে বর্শা গেঁথে বোঁ বোঁ করে পাক খাবে জোয়ান সন্নিসিরা।  

আরও রাতে সন্নিসির দল কাঁচা আতুড়ে ছেলের লাশ তুলে এনে শুরু করবে মরা খেলা।  বাঁশের ডগায় দেহ পুঁতে ডম্বরুর তালে তালে নাচাবে রাতভর, বৈরিগি বাতাসে ধুনির আগুন লকলক করে জেগে উঠবে তখন—রাঢ়দেশকে সাক্ষী রেখে শুরু হবে মড়াখেলার প্রাচীন গুহ্য উৎসব।

এমনই তো ছিল আমাদের বঙ্গদেশ, কোথা থেকে কী যেন সব হয়ে গেল! ভিনদেশির ইশারায় নির্বাপিত হল তুলসীতলার শ্রীদীপ, লোকাচার-দেশাচার মুছে আমার শ্যামলী বাংলায় কারা যেন বাতাসে মহাভুজঙ্গের তীব্র শিস তুলে ছুটে এল, তাদের মুখে ‘হর হর মহাদেও’ ধ্বনি।  আমাদের সদাপ্রসন্ন, ঈষৎ পৃথুল, আলাভোলা, গৌরীকে অভাবে রাখা, গাঁজা খেয়ে শ্মশান-মশানে পড়ে থাকা আশুতোষ তো এমন ছিলেন না!

রাস্তার কোলাহলে সহসা ভেঙে গেল চটকা!

চারপাশে গাঢ় বিকেল, দু এক টুকরো মেঘ সূর্যকে আড়াল করে ছিন্ন মায়াতন্তু রচনা করেছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম অনেকক্ষণ।  কেমন যেন অবাস্তব ওই দুজন সন্নিসি—আকন্দের ঝোপ নাই, ঘেঁটু ফুল নাই, বৈঁচি বেলগাছ রায়চৌধুরীদের শ্যামদিঘি কিছুই নাই।  ধুলোমাখা অতিকায় শহরের রাজপথে গাজনের গান গাইছে তারা, কে চেনে এখানে ওদের ? কেই বা দেবে দুটো পয়সা ?

চোখ বন্ধ করে পুনরায় ফিরে গেলাম আমার চেনা বাংলায়…শ্যামদিঘির ঘাট পার হয়ে সেই অকালমৃতা যুবতির মন-পাল্কি ভুলোর চরে আহত অভিমানের মতো পাখা মেলে ছুটে চলেছে, দুপাশে অপরাহ্নের বসতবাটি, সাদা আঁশের মতো শেষ বেলার আলো গড়িয়ে পড়ছে যেন কোথা থেকে, চৈত্রপবন গৃহদাহের সুবাসে আমোদিত…ওই আখ্যান ডাকছে এবার আমাদের, বেলা পড়ে এল হে বাজনদার, চলো রওনা দিই!

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *