হর্ষ দত্ত
গৌড় এক্সপ্রেস শিয়ালদহ থেকে ঠিক রাত ১০টা ৫ মিনিটে ছেড়েছে। মালদা টাউন স্টেশনে পৌঁছবে সকাল ৬টা থেকে ৬-১৫মিনিটে। স্লিপার ক্লাসের যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ট্রেন ছাড়ার কিছু পরেই শুয়ে পড়েন। কেউ কেউ সঙ্গে করে নিয়ে আসা ডিনার সেরে নেন। মনুজেন্দ্র বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করেই বেরিয়েছে। এই নিয়ে ও মালদায় আসছে দ্বিতীয়বার। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাশ্বতী দেবীর ওপর দুদিন ব্যাপী সেমিনারে যোগ দিতে যাচ্ছে।
এসি টু-টিয়ারে লোয়ার বার্থ পেয়েছে মনুজেন্দ্র। ওর উলটো দিকে বসে আছেন কালচে ট্রাউজার ও আকাশি নীল রঙের ফুল শার্ট পরা এক নিপাট বয়স্ক ভদ্রলোক। মুখে কোনও বিরক্তি বা বিষাদ লেগে নেই। বরং প্রসন্ন। । ট্রেন চলতে শুরু করার পর একঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঠায় বসে না থেকে, শুয়ে পড়ার মতো পিঠটা একটু ঠেকিয়ে নিলে ভাল লাগত। মনুজেন্দ্র ভাবল।
— আপনি কি এখন বিছানা করবেন ? তা হলে আমি করিডোরে দাঁড়াই…। বিনয়ী স্বরে কথা বলতে বলতে মানুষটি উঠে পড়লেন।
সামান্য হলেও, ভেতরে ভেতরে চমকে গেল মনুজেন্দ্র। ভদ্রলোক ওর মনের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারলেন কী করে ! বিস্ময় সামলে নিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, না…না, আমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমোই না।…বাড়িতে শুতে শুতে বারোটা পেরিয়ে যায়।
—তা হলে তো আপনি আমারই মতো বিছানা-কাতর নন। অতএব দিব্যি গল্প করতে করতে যেতে পারি। ভদ্রলোক স্মিত হাসলেন, মালদায় যাচ্ছেন নিশ্চয়ই ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। মনুজেন্দ্র নড়েচড়ে বসল।
আলতো ভঙ্গিতে বার্থে বসে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, মালদায় কি এই প্রথমবার ?
—না, এটা সেকেন্ড টাইম। গৌড়বঙ্গ ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনারে যোগ দিতে এসেছি।
ভদ্রলোক হাসি ছড়িয়ে বললেন, ওরে বাবা, আপনি তাহলে নিশ্চয়ই অধ্যাপক ! ওইসব সেমিনার-লেকচার…বুঝেশুনে আপনার সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি মশাই রেলে কেরানির চাকরি করতাম। সাত-সতেরো জায়গা ঘুরে কয়লাঘাটা থেকে যথাসময়ে রিটায়ারমেন্ট। হাঃ, হাঃ, তারপর থেকে বয়স হু হু করে বাড়ছে। মালদা টাউনে বাড়ি করেছি। আমার নাম লোকেশ নিয়োগী।…তা, আপনার নামটা জানা হল না।
— মনুজেন্দ্র ভৌমিক। আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি মফস্বলের একটি কলেজে অধ্যাপনা করি।
—বাঃ, খুব ভাল।…টাউন থেকে গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি খানিক আউটস্কার্টে। জায়গাটার নাম মোকদুমপুর। ইউনিভারসিটির পাশ দিয়ে চলে গেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে থার্টি ফোর। আচ্ছা, প্রথমবার এসে মালদা জেলার আশপাশটা ঘুরে দেখেছিলেন ?
সেবার ওর হাতে তত সময় ছিল না। তবু তারই মধ্যে যেটুকু দেখেছে মনুজেন্দ্র তা বলল, হুসেন শাহী গৌড়, পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ আর মহেদিপুর বর্ডার দেখেছিলাম।
আনন্দের সঙ্গে নিয়োগীবাবু বললেন, বেশ, বেশ। আপনি তো ক্রিম জায়গাগুলোই দেখে নিয়েছেন। তবে আরও ঘুরে দেখার জায়গা আছে, অধ্যাপক ভৌমিক। এবার না হয় যাবেন।
একটু দ্বিধা ও মৃদু অস্বস্তি নিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, আসলে মালদার সঙ্গে আম অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে গেছে। বলতে লজ্জা করছে, তবু বলি, অনন্য স্বাদের এত বিচিত্র আমের ফলন যে-জমিতে হয়, সেই ভূমির মাটি একমুঠো নিয়ে যেতে চাই।
লোকেশ অবাক চোখে, মনুজেন্দ্রর দিকে সোজা তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বললেন, এই না হলে অধ্যাপক ! আমরা আমটি খেয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। আর আপনি আমের গাছ যে-মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটিকে সম্মান জানাতে এসেছেন। আমি ভাবতেই পারছি না। বিশ্বাস করুন, আমার জীবনে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।
দুই
অবিরাম চলছে এক্সপ্রেস ট্রেন। ওদের দুজনের তো বটেই, সম্ভবত কম্পার্টমেন্টের অন্য যাত্রীদেরও গন্তব্য মালদা টাউন। একলা ট্রেনভ্রমণে বা ফ্লাইটে মনুজেন্দ্র চুপচাপই থাকে। পাশের যাত্রীর সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলে না। কিন্তু এই লোকটির সঙ্গে কোনও এক অজানা সহজ পথে আলাপ হয়ে গেল ! ভালই লাগছে।
কুণ্ঠিত স্বরে নীরবতা ভাঙল মনুজেন্দ্র, লোকেশবাবু, আমি কয়েকটা বড়সড় আমবাগান দেখতে চাই।
ভাবনার অতল থেকে সহসা উঠে এসে, দুঃখী মানুষের মতো শব্দহীন মলিন হাসলেন নিয়োগীবাবু, মালদা শহরে তেমন বাগান আর নেই। কলকাতার মতো এখানেও ফ্ল্যাট কালচার সব গ্রাস করে নিয়েছে। আপনারা পুকুরহারা, আমরা বাগানহারা। তবে গ্রামীণ এলাকার আমবাগানগুলো উপার্জনের স্বার্থে, মালিক ও চাষিরা হাতে হাত বেঁধে বাঁচিয়ে রেখেছে। হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ প্রভৃতি আম এখানকার মানুষের কাছে শুধু ফল নয়, মাল্টিপারপাস ইন্ডাস্ট্রি। একজন রিটায়ার্ড পার্সন হিসেবে যেটুকু বুঝি। আমি কিছু ভুল বলছি না তো ?
— ভুল বলার কোনও প্রশ্নই নেই। মনুজেন্দ্র হাত তুলে লোকেশকে আশ্বস্ত করল।
—বাঙালি বহু ধরনের চেনা-অচেনা আম খায়। তবে নানা কিসিমের আমের মধ্যে হিমসাগর আর ল্যাংড়া বাঙালির অর্ধেক ভালবাসা ছিনিয়ে নিয়েছে। দুটো আমই চোঁচহীন। শাঁসে ভরপুর, আঁটি ছোট। আহা, দুটোরই কী স্বাদ ! আবার ইয়া বড় বড় গাছপাকা ফজলি একটা খেলেই পেট ভরে যায়। তাই না !
—ঠিকই বলেছেন। মনুজেন্দ্র বলল, এই জেলার একজন অধিবাসী হিসেবে এটা আপনার বাস্তব জ্ঞান, অনুভব, উপলব্ধি।…সেমিনার থেকে সময় বের করে নিয়ে গ্রামের দিকেই যাব। মনে রেখেছি, গতবার পান্ডুয়া যাওয়ার পথে, চলন্ত গাড়ি থেকে কয়েকটা পাঁচিল ঘেরা আমবাগান দেখেছিলাম।…কিন্তু এমনভাবে আর নয়, আমি এবার হেঁটে-ঘুরে আমসাম্রাজ্য দেখতে চাই।
দারুণ খুশি হলেন লোকেশ। স্যার সম্বোধন করে বললেন, আপনি গড্ডলিকা স্রোতের বাইরে থাকা তেমনই মানুষ, যাঁদের সান্নিধ্যে এলে জীবনের মানেটাই যেন বদলে যায়। স্যার, আমি আপনাকে কোনও উপদেশ দিচ্ছি না। কেবল একটা প্রস্তাব। বলব ?
মনুজেন্দ্র অবাক, কেন বলবেন না ! বলুন…
ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে একটু ভেবে, নিয়োগীবাবু খবর দেওয়ার মতো করে জানালেন, আমবাগান দেখতে যাওয়ার সময় আপনার সঙ্গে কোনও গাইড থাকবেন। আমার একটা অনুরোধ, যেই থাকুন, তাকে বলবেন, আমি অনসূয়াদির আমবাগানটা একবার দেখতে যাব। অপূর্ব বাগান। আড়ে-বহরে বিরাট। সত্যিই দেখবার মতো। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে লোকে বলত, হিমসাগরি বিশ বিঘে। তারপর নাম পালটে হল প্রসাদবাবুর ম্যাঙ্গো ফরেস্ট। এখন লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে তিন নম্বর পরিচয়—অনুসূয়াদির আমবাগান।
স্বল্প ভুরু কুঁচকে মনুজেন্দ্র বলল, অনুসূয়া শব্দটা ভুল। হবে অনসূয়া।
—কিন্তু ভুলটাই এখানে দিব্যি চলছে। হাত জোড় করে ফিকে হাসলেন লোকেশ।
—জায়গাটা মালদা টাউন থেকে কতদূর ?
যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন এমনভাবে ভদ্রলোক বললেন, খুব বেশিদূর নয়। মহানন্দা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে পান্ডুয়ার দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলে রামকেলি গ্রাম। নামটা আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন।
জোরে অথচ নীরবে মাথা নাড়ল মনুজেন্দ্র। তারপর যেন সুদূর অতীতে চলে গিয়ে মগ্ন স্বরে বলল, রামকেলি বৈষ্ণবদের কাছে অন্যতম মহান তীর্থ। ষোড়শ শতকের শুরুতে ধর্মভাবনার চিরপথিক মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব বৃন্দাবন যাওয়ার পথে, এই গ্রামে কিছু দিন ছিলেন। এখানেই তিনি পেয়েছিলেন আজীবনের সহচর রূপ ও সনাতনকে।
মনুজেন্দ্রর পায়ে হাত ছোঁয়ানর মতো আনত হয়ে নিয়োগীবাবু বললেন, এসব ইতিহাস আপনি সব জানেন। ভাগ্যিস আমি বলিনি !
মৃদু বিরক্ত হল মনুজেন্দ্র, শুনুন লোকেশবাবু, আমি সবজান্তা মাস্টার নই।…আপনি যখন এত গুরুত্ব দিয়ে বলছেন, তখন আমবাগানটা যেভাবে হোক দেখতে যাবই।
—আমার সৌভাগ্য স্যার। তবে এত বড় বাগান ঘুরে দেখতে সময় লাগবে। বাগানের মালকিন অনুসূয়া মালাকার ওখানেই থাকেন। আমি আর কিছু বলছি না। বাকিটা আপনি বুঝে নেবেন।
তিন
দ্বিতীয় দিন সকাল সাতটা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত, একাধিক আমবাগান ঘুরে দেখার জন্যে মাননীয় উপাচার্য ডক্টর ভট্টাচার্য, মনুজেন্দ্রকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ওর সঙ্গে আছে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (এগজামিনেশন) প্রদীপ্ত আচার্য। ভদ্রলোক আলাপচারি নয়। কম কথার মানুষ। মনুজেন্দ্রর চেয়ে বয়সে ছোট। তবে কথা কম বললেও সুভদ্র, অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সচেতন। শুরু থেকেই ড্রাইভারের পাশে বসছে। শহর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত বাগানগুলোর সামনে, গাড়ি থামিয়ে কেয়ারটেকার বা মালিদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। তিনটে বাগান ইতিমধ্যে মনুজেন্দ্রকে দেখানো হয়ে গেছে। এগুলো বড় আকারের নয়। শাখা-প্রশাখায় ঝুলন্ত আমের ঘনত্ব কম, বৈচিত্র মামুলি।
‘আম্রকানন’ নামে একটা মাঝারি বাগান দেখে, মনুজেন্দ্রর মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রদীপ্ত বলল, সাবার্ব থেকে বেরিয়ে এবার আপনাকে পুরোপুরি গ্রামের দিকে নিয়ে যাব।…বুঝতে পারছি, এইসব পড়তি বাগান দেখে আপনি খুশি হচ্ছেন না। ঠিক আছে, মহানন্দা পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার গেলেই গ্রামাঞ্চলের শুরু। হাইওয়ের দুপাশে গ্রাম, গ্রামের ভেতরে বাগানের পর বাগান। গাছে গাছে যেন আমের মেলা বসেছে ! খুব ভাল লাগবে।
মনুজেন্দ্র মিষ্টি হাসল, তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, গ্রামের দিকে গেলে বিস্ময় ও আনন্দ—দুটোতেই ভেসে যাব।
—তা বলতে পারেন। প্রদীপ্তর মুখে হাসির আভাস, গৌড়বঙ্গের ইতিহাসের চেয়ে, আমের অমর ঐতিহ্যে মালদাবাসী অনেক বেশি গর্বিত।
—ভাই, আমি শুনেছি রামকেলিতে নাকি একটা বিশ বিঘে জমি জুড়ে একটা আমবাগান আছে ? মনুজেন্দ্র ঔৎসুক্য চেপে রেখে সহজভাবে জানতে চাইল।
মুহূর্তে পাংশু বর্ণ হয়ে গেল প্রদীপ্তর মুখ, আপনি কি অনসূয়াদির আমবাগানের কথা বলছেন ?
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি এমন বিচলিত হচ্ছেন কেন ! মনুজেন্দ্র বেশ অবাক হয়ে গেল। ওর মনে পড়ল, লোকেশ নিয়োগী এই বিশাল বাগানের অস্তিত্ব ও অবস্থিতির কথা জানিয়েও মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি আর কিছু বলছি না। বাকিটা আপনি বুঝে নেবেন।‘ ভদ্রলোক কোনও কারণে বিষয়টার ইতি টেনে দিয়েছিলেন মাঝপথে। আমবাগানটি নিয়ে ডেপুটি রেজিস্ট্রারের আচরণও অস্বাভাবিক।
প্রদীপ্ত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না স্যার, আমি বিচলিত হইনি। আসলে ওই বাগানটার মহিলা মালিক লোকজনের সঙ্গে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করেন। বাগানের নিজস্ব চাষি ও মালিদের ছাড়া কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেন না।…আপনাকে একটা অনুরোধ করছি, বাগান দেখার পারমিশনটা যদি আপনি নিজে করে নেন…
চোখ সরু করে মনুজেন্দ্র জিজ্ঞেস করল, অনুমতি কে দেবেন ?
—যাঁর বাগান অর্থাৎ অনসূয়া ম্যাডামই দেবেন। এখানে চাকরিতে জয়েন করার পর, আমি বাগানটার কথা লোকের মুখে শুনে একবার দেখতে এসেছিলাম। আমার পরিচয় জানানো সত্ত্বেও মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। এমন দুর্ব্য়বহার উনি অনেকের সঙ্গে করেছেন। প্লিজ স্যার, আমি বাগানের ভেতরে যাব না।
চিন্তিত মুখে মনুজেন্দ্র জানতে চাইল, অনসূয়া দেবী কোথায় থাকেন ? ওঁর বাড়ি…
প্রদীপ্ত শুকনো মুখে উত্তর দিল, অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, বাগানের ডান দিকে একটা ইট দিয়ে তৈরি রাস্তা আছে। ওই পথ ধরে মিনিট পনেরো গেলেই দেখতে পাবেন, পুরনো ধাঁচের উঁচু একতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে গাছের ঘনত্ব অনেক বেশি। অনেকটা বনের মতো। উনি ওখানে একা থাকেন। বিয়ে-থা করেননি। ওঁর রিলেটিভ কেউ মালদায় আছেন কিনা, তা জানি না।
একটা আমবাগানকে ঘিরে এত রহস্য কেন ? মসৃণ, দুরন্ত হাইওয়ের দিকে অপলকে চোখ রেখে মনুজেন্দ্র ভাবতে চেষ্টা করল। স্পষ্ট উত্তর পেল না। গম্ভীর গলায় প্রদীপ্তকে নির্দেশ দিল, বিশ বিঘেতে চলুন।
চার
ভারি কাঠের তৈরি বিরাট দুটো দরজা। ওপর দিকে শেকল ও তালা দিয়ে বাঁধা। একটা পাল্লা সরাতেই দরজায় যে-লম্বা ফাঁক হল, তাতে একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে আড়াআড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। মনুজেন্দ্র ফোকর দিয়ে দেখল, কোনও দ্বাররক্ষী নেই। মালি, চাষি কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছে, বাগান জুড়ে রোদ্দুর আর ছায়ার কাটাকুটি। আমের সুগন্ধ। নিবিড় পল্লবের আড়াল থেকে একটু থেমে থেমে কোকিল ডাকছে। ভেসে আসছে অন্য পাখির শিস। একেবারেই জনমানব শূন্য। তবু ও গলা চড়িয়ে হেঁকে উঠল, কেউ আছেন ? কেউ কি আছেন ? আমি একটু ভেতরে যেতে চাই। হ্যালো…
কয়েক মিনিট কেটে গেল। তেমনই এক কঠিন শূন্যতা। মুখ ঘুরিয়ে মনুজেন্দ্র দেখল, নিঃস্পৃহ মুখে শুকনো কাঠের মতো বসে আছে প্রদীপ্ত। ওর দিকে হাত নেড়ে, দরজার ফাঁক দিয়ে মনুজেন্দ্র বাগানে প্রবেশ করল। কাউকে দেখতে না পেয়ে ঘুরতে শুরু করল এধার-ওধার। কী আর হবে ! ট্রেসপাসার্সের তকমা লাগিয়ে মালিক দুচার কথা শোনাবেন। আম-চোর অপবাদ দিয়ে অপমানও করতে পারেন অযথা। এর বেশি কিছু তো নয়।
আরও দূরে, বাগানের উত্তর দিক থেকে কয়েকজন পুরুষ ও মহিলার কথাবার্তার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। একবর্ণও বুঝতে পারল না মনুজেন্দ্র। বরং ভাবল অনসূয়ার সঙ্গে দেখা হওয়া বা দেখা করা জরুরি নয়। যখন কেউ বারণ করছে না, তখন ও যতটা পারে বাগানটা ঘুরে-ফিরে দেখুক। চলে যাওয়ার সময় অনসূয়ার সঙ্গে আলাপ হলে ভাল। না হলে ওর কিছু করার নেই। ইটরাস্তা থেকে মাটিতে পা রাখল মনুজেন্দ্র।
টইটম্বুর ফলের ভারে অবনত গাছগুলো যেন স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় মৃদু হাওয়ায় দুলছে। বাগানের মাটিতে কোথাও সবুজের আভাস, কোথাও রুক্ষ মাটি। ঝরা পাতা ঝাঁট দিয়ে তফাতে তফাতে স্তূপ করে রাখা আছে। গাছগুলোর গায়ে লেবেল সাঁটানো : ফজলি-62, হিমসাগর-184, ল্যাংড়া-37 ইত্যাদি। সম্ভবত কত সংখ্যক গাছ, এই নাম্বারিং তারই ইঙ্গিত। মনুজেন্দ্র হাঁটছে কখনও এদিকে, কখনও ওদিকে। ওর মন বলছে, গাছ মানুষকে নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে যতটা ভালবাসে, মানুষের প্রয়োজনে-উপার্জনে পাশে দাঁড়ায়, তার এককণা প্রতিদান ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ বৃক্ষজগৎ, মানুষের কাছ থেকে পায় না। কিছু তরু-প্রেমিক মানুষ পৃথিবীতে আছেন এই পর্যন্ত, কিন্তু তাঁরা হাতে গোনা কয়েকজন।
গাছ থেকে একটা আধপাকা আমপাতা, মনুজেন্দ্রর ডান কাঁধ ছুঁয়ে খসে পড়ল মাটিতে। পাতাটা তুলতে গিয়ে ও থমকে গেল। চাঁপা রঙের শাড়ি পরা, মাথা ভরতি ববকাট পাকা চুল, দেহ নাতিদীর্ঘ, মুখ কোমল অথচ আধুনিকতার আভা— এমন এক শ্রীময়ী নারী ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত, কী করবে মনুজেন্দ্র তা ভাবতে ভাবতেই মহিলা বললেন, ভাইসচ্যান্সেলার আমাকে সকালে ফোন করে আপনার কথা বললেন। অধ্যাপক ভৌমিক, কেমন দেখছেন বাগানটা ? আপনার প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে তো ! আপনাকে কেউ যাতে বিরক্ত না করে, তাই গেটকিপার, মালি, চাষিদের উত্তর দিকে পাঠিয়ে দিয়েছি।…
—অপূর্ব ! একসঙ্গে এত আম কখনও দেখিনি। মনুজেন্দ্র আবেগে আর কিছু বলতে পারল না।
— আপনি আনন্দিত জেনে আমার খুব ভাল লাগছে। এই বাগান আমার প্রপিতামহ করেছিলেন। ঠাকুরদার আমলে খানিকটা নষ্ট ও বেহাত হয়ে যায়। তারপর আমার বাবা স্বর্গীয় প্রসাদরঞ্জন মালাকার অমানুষিক পরিশ্রম করে তাঁর সাধের বাগানকে ফিরিয়ে আনেন। এখন আমার দেখভালের পালা চলছে। গাছেরা যাতে শান্তিতে থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করেছি। তাই বাগান দেখতে বা বেড়াতে আসা পাবলিকদের অ্যালাও করি না। তবে ফিরিয়েও দিতে পারি না কিছু কিছু অনুরোধ।
—আপনি একাই সব দেখাশোনা করেন !
অনসূয়া স্মিত হাসলেন, না, না। আমচাষিরা সাহায্য করে। তা ছাড়া গাছপালারা ভীষণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ওরা বীজ থেকে জন্ম নিয়ে নিজের শক্তিতে বড় হয়ে ওঠে। শুধু জল, সার, প্রশ্রয় ও ভালবাসা আশা করে। আর একটু শুশ্রূষা।
সামান্য থেমে গাছগুলোর দিকে হাত দেখিয়ে জানালেন, এত আম সিজন ছাড়া থাকে না। পঞ্চাশ ভাগ পুষ্ট হলে, ব্যবসায়ীরা কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে চলে যান। তারপর যে-পদ্ধতিতে তাঁরা আম পাকাবার ব্যবস্থা করেন, আমি তার ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু বাগান পরিচর্যার জন্যে টাকা তো দরকার…। বাদবাকি গাছপাকা আমগুলো স্থানীয় এক অনাথ আশ্রমে আর রামকেলির বৈষ্ণব সাধুদের আখড়ায় পাঠিয়ে দিই।…চলুন, আমার আবাসে। চা খেতে খেতে কথা বলা যাবে। এক ঝুড়ি আম দেব। নিয়ে যাবেন।… একটু হাঁটতে হবে কিন্তু ! ছায়ায় ছায়ায় আসুন।
মোবাইলে কাউকে নির্দেশ দিতে দিতে অনসূয়ার পদক্ষেপ একটু দ্রুত । ওর পেছনে মুগ্ধ বিস্ময়ে আসছে মনুজেন্দ্র।
ইংরেজ আমলের বাংলো বাড়ির চতুষ্কোণ বারান্দায়, বেতের চেয়ারে চা নিয়ে ওরা বসেছে। মনুজেন্দ্র ইতস্তত করে সেই পুরনো প্রশ্নটাই ঘুরিয়ে করল, এই বড়িতে কি আপনি একা থাকেন ?
শান্ত স্বরে, স্থির চোখে অনসূয়া বললেন, হ্যাঁ।… একা, একাকী, একাকিত্ব, নির্জনতা শব্দগুলো হয়তো আপনার খুব প্রিয়। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, কেউ কি একা ? আমি বিশ্বাস করি, কোনও-না-কোনও বন্ধন মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বন্ধন মাটির নিচে থাকা শেকড়ের মতো। একা শব্দটা আমাদের বিলাপ অথবা বিলাস…। কেননা একা এবং নির্জনতা—দুটোকেই ঘিরে আছে অনন্ত প্রকৃতি। ফলে কোনও প্রাণীই প্রকৃতির বাইরে নেই। তাই নিজেকে একা কখনও ভাবি না। বাগানের প্রতিটা গাছ আমার স্বজন। ওরা আমার নিকট আত্মীয়।
অদূরে অনতি উচ্চ ধুপ করে আওয়াজ হল। অনসূয়া ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, একটা ভারি শরীরের পাকা ফজলি, গাছের আশ্রয় ছেড়ে মাটির কাছে ফিরে এসেছে। আগামী বছর আবার গাছের কোলে, বন্ধনের টানে ফিরে যাবে।
কথার মাঝখানে প্রদীপ্তর ফোন এল। অনসূয়ার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি করে, মনুজেন্দ্র ফোন ধরতেই, প্রদীপ্তর অতিনম্র স্বর, সরি স্যার, দেরি হয়ে যাচ্ছে…।
অনসূয়াকে অবাক করে দিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, এবার আমাকে যেতে হবে। আম নয়, আপনার এই বন্ধনভূমির একমুঠো শুদ্ধ মাটি, সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই।
শেয়ার করুন :





