মাহেশের রথযাত্রা -

মাহেশের রথযাত্রা

বাংলার প্রায় ৬৩০ বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

যে রথের দড়িতে টান দিয়েছেন সাধক, জমিদার, সাধারণ মানুষ-আর সময় নিজেই।

বাংলায় রথ মানেই অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশ। বর্ষার আকাশ, মাটির গন্ধ, মেলার কোলাহল আর হাজার হাজার মানুষের “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। কিন্তু মাহেশের রথযাত্রা শুধুই একটি ধর্মীয় উৎসব নয়-এটি বাংলার প্রায় ৬৩০ বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

অনেকেই জানেন না, ওড়িশার পুরীর পর ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা এবং বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এই মাহেশেই। এর সূচনা ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলে ঐতিহ্যগতভাবে স্বীকৃত।

মাহেশের রথযাত্রার জন্মকাহিনি ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বৈষ্ণব সাধক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীতে গিয়ে শ্রীজগন্নাথদেবের সেবা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তিনি সেই সুযোগ পাননি। গভীর দুঃখে তিনি গঙ্গার তীরে ফিরে আসেন।সেই সময় এক রাতে তিনি স্বপ্নে জগন্নাথদেবের দর্শন পান।

ভগবান তাঁকে নির্দেশ দেন- “পুরীতে নয়, গঙ্গার তীরে মাহেশে আমার প্রতিষ্ঠা করো। সেখানেই আমি পূজিত হতে চাই।”

পরদিন ভোরে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী গঙ্গার জলে ভেসে আসা একটি পবিত্র নিমকাঠ পান। সেই কাঠ দিয়েই নির্মিত হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ।এই কাহিনি আজও মাহেশের মানুষের বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবার অন্য একটি প্রচলিত কাহিনী হল  চতুর্দশ শতাব্দীতে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী তীর্থযাত্রায়  পুরীতে এসে মনস্থির করলেন তিনি নিজের হাতে রেঁধে প্রভু জগন্নাথকে ভোগ খাওয়াবেন কিন্তু মন্দিরের পান্ডাদের আপত্তিতে সেই ভোগ খাওয়ানো হলো না।আশাহত ধ্রুবানন্দ আমরণ অনশনে বসায় ভক্তের ভক্তিতে প্রভু জগন্নাথ তাঁকে আদেশ করলেন যে বঙ্গদেশে মাহেশে  ফিরে যেতে উনি দারুব্রহ্ম পাঠিয়ে দেবেন সেই কাঠে ওনার, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি গড়ে পুজো করতে।কথিত আছে ৬২১বছর  আগের সেই বিগ্রহ আজও পূজিত হচ্ছে ।  

ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর পর তাঁর শিষ্য কমলাকর পিপলাই, যিনি বৈষ্ণব পরম্পরায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত, মাহেশে জগন্নাথের পূজা ও রথযাত্রাকে সুসংগঠিত করেন। অনেক ঐতিহাসিক সূত্র তাঁকেই মাহেশের রথযাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদাতা হিসেবে উল্লেখ করে।

শ্রীচৈতন্যের পদধূলিতে ‘নব নীলাচল’

মাহেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলির একটি জড়িয়ে আছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-র সঙ্গে।কথিত আছে, পুরী যাওয়ার পথে তিনি মাহেশে এসে জগন্নাথদেবের দর্শন করেন। সেই দর্শনে তিনি এতটাই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন যে দীর্ঘ সময় সমাধিস্থ অবস্থায় ছিলেন।এরপর থেকেই মাহেশকে অনেকে বলতে শুরু করেন “নব নীলাচল”অর্থাৎ, বাংলার পুরী।

মাহেশের জগন্নাথ মন্দির ও রথযাত্রার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন শেওড়াফুলির রাজপরিবার।রাজা মনোহর রায় মন্দির নির্মাণ ও বিস্তীর্ণ জমি দান করেন। পরে বিভিন্ন জমিদার ও ধনী পরিবার রথ, মন্দির ও উৎসবের রক্ষণাবেক্ষণে অর্থসাহায্য করেন।১৮৫৫ সালে ধনাঢ্য দাতা নয়নচাঁদ মল্লিক মন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র নিমাইচরণ মল্লিক কাজ সম্পূর্ণ করেন এবং পূজার আয়োজন নতুনভাবে শুরু হয়।

রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন মাহেশের রথ নিয়ে।বাংলা সাহিত্যে মাহেশের রথযাত্রার বিশেষ স্থান রয়েছে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প রথের রশি-তে রথের দড়িকে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের মিলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। যদিও গল্পটি সরাসরি মাহেশকে কেন্দ্র করে নয়, তবু বাংলার রথসংস্কৃতির পটভূমিতে মাহেশের ঐতিহ্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বর্তমান লোহার রথ—এক প্রকৌশল বিস্ময়।আজ যে বিশাল রথটি দেখা যায়, সেটি কিন্তু প্রথম রথ নয়।১৮৮৫ সালে তৎকালীন খ্যাতনামা প্রকৌশল সংস্থা মার্টিন বার্ন   এই রথটি নির্মাণ করে।

রথটির বৈশিষ্ট্য- প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতা,ওজন প্রায় ১২৫ টন,১২টি বিশাল লোহার চাকা

নবরত্ন মন্দিরের আদলে নির্মিত,সামনের অংশে তামার ঘোড়া ও রাজহাঁসের অলংকরণ।দুটি বিশাল ম্যানিলা দড়ি দিয়ে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে টান দেন।

ভারতের অন্যতম বৃহৎ স্থায়ী লোহার রথ হিসেবে এটি পরিচিত।

মাহেশে জগন্নাথদেব রথে চড়ে যান গুন্ডিচা বাড়ি, যাকে স্থানীয়ভাবে অনেকে “মাসির বাড়ি” বলেন। কয়েক দিন সেখানে অবস্থানের পর উল্টো রথে আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাত্রাকে ভক্তরা ঈশ্বরের “ঘর থেকে ঘরে” যাওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখেন।

প্রযুক্তির যুগেও মাহেশের রথযাত্রার আবেদন কমেনি। প্রতিবছর প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ মানুষ এই উৎসবে যোগ দেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, মেলা, পারিবারিক স্মৃতি এবং বাংলার নিজস্ব উৎসব-পরম্পরার টানই তাঁদের বারবার এখানে ফিরিয়ে আনে।

শেষকথা

মাহেশের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, বৈষ্ণব ভক্তি, লোকসংস্কৃতি, স্থাপত্য, প্রকৌশল এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উত্তরাধিকার। ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই রথের দড়িতে একসঙ্গে হাত রেখেছেন রাজা ও প্রজা, সাধু ও সাধারণ মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। সেই দড়ি যেন আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ঐতিহ্য তখনই বেঁচে থাকে, যখন একটি সমাজ তাকে ভালোবাসে, বহন করে এবং আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *