অন্য বিশ্বকাপ -

ছবি- মাইকেল পিমেন্টেল-আইএসআই-গেটি ইমেজেস

অন্য বিশ্বকাপ

ট্রফির বাইরে আরও কিছু গল্প।

ট্রফির বাইরে আরও কিছু গল্প, যা ২০২৬ বিশ্বকাপকে করে তুলেছে অন্যরকম।

বিশ্বকাপ মানেই কি শুধু মেসি, এমবাপে, বেলিংহ্যাম বা ভিনিসিয়ুসদের গোল? শুধু কে চ্যাম্পিয়ন হবে, সেই হিসেব? একেবারেই নয়। প্রতি বিশ্বকাপেই সমান্তরালভাবে জন্ম নেয় আর-একটি বিশ্বকাপ – ছোট দেশের স্বপ্ন, অচেনা ফুটবলারের উত্থান, অবিশ্বাস্য রূপকথা আর এমন সব মুহূর্ত, যা পরিসংখ্যানের বাইরেও বছরের পর বছর মনে থেকে যায়।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। ৪৮ দলের এই প্রথম বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর পাশাপাশি আলো কেড়েছে এমন কয়েকটি দেশ, যাদের নাম হয়তো অনেক ফুটবলপ্রেমীও আগে খুব একটা শোনেননি। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেই ‘অন্য বিশ্বকাপ’-এর কিছু গল্প।

প্রথম বিশ্বকাপ (১৯৩০)

প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে। আজকের মতো দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্ব তখন ছিল না। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দেশ। কারণ, ইউরোপের বেশিরভাগ দলই সেই সময় আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে জাহাজে দীর্ঘ সফর করে উরুগুয়ে যেতে অনিচ্ছুক ছিল।ফাইনালে আয়োজক উরুগুয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট জেতে। তবে সেই ম্যাচের একটি মজার ঘটনা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয়। দুই দলই নিজেদের দেশের বল দিয়ে খেলার দাবি জানায়। শেষ পর্যন্ত আপসের পথ বের হয়—প্রথমার্ধে খেলা হয় আর্জেন্টিনার বল দিয়ে, আর দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল দিয়ে! এই অভিনব সমাধানই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় উপাখ্যান হয়ে রয়েছে।

আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে  এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৫ লক্ষ, অথচ প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই তারা স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ড্র করে নক-আউটে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াইয়ে আটকে রেখে বিদায় নেয়। বিশ্বের ফুটবল বিশেষজ্ঞরা একে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় রূপকথাগুলির একটি বলছেন।

কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার বয়স ৪০। আধুনিক ফুটবলে যেখানে অনেকেই এই বয়সে অবসর নেন, সেখানে তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে একাধিক অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচান। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধেও তাঁর পারফরম্যান্স এতটাই প্রশংসিত হয় যে ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি নিজে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।এবং পরম আশ্চর্যের কথা ওদের এই বিশ্বকাপ টিম তৈরি হয়েছে লিঙ্কড ইনের পোস্টের মাধ্যমে যেখানে উৎসাহী প্লেয়ারদের খোঁজ করা হয়েছিল।

কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর রাজধানী প্রাইয়ার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে। বিমানবন্দর থেকে শহরজুড়ে বিজয়মিছিল হয়, যদিও দলটি ট্রফি জেতেনি। কারণ, ছোট্ট দেশের কাছে বিশ্বমঞ্চে সম্মানের সঙ্গে লড়াই করাটাই ছিল প্রকৃত জয়। স্বাধীনতা দিবসের আবহে সেই উদ্‌যাপন ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।

 কুরাসাও বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বিশ্বকাপ-খেলুড়ে দেশ। ক্যারিবিয়ান  দ্বীপ কুরাসাও-এর জনসংখ্যা মাত্র দেড় লক্ষের কিছু বেশি। অথচ তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে ইতিহাস গড়েছে। আয়তন ও জনসংখ্যা-দুই দিক থেকেই বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে ছোট দেশ এখন কুরাসাও। কয়েক বছর আগেও এই দেশের অধিকাংশ ফুটবলার ইউরোপের ছোট লিগে খেলতেন। আজ তারা বিশ্বমঞ্চে।

২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলছে চারটি দেশ – কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডন এবং উজবেকিস্তান। এই চার দেশের জন্য বিশ্বকাপে ওঠাই যেন ট্রফি জয়ের সমান আনন্দ। বিশ্বকাপের বিস্তার যে নতুন ফুটবল শক্তিকে সামনে এনে দিয়েছে, তারই প্রমাণ এই চার দেশ।

এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮টি দল। নতুন ফরম্যাটে নক-আউটে ওঠার সুযোগও বেড়েছে। ফলে আফ্রিকা, এশিয়া ও কনকাকাফ অঞ্চলের বহু দেশ প্রথমবার বিশ্বকাপের স্বাদ পেল। সমালোচনা থাকলেও এই পরিবর্তন যে বিশ্ব ফুটবলে নতুন গল্প লিখছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ইতালি নেই, কিন্তু নতুনরা আছে।চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। অন্যদিকে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডন ও উজবেকিস্তানের মতো নতুন দেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে। ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য যে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

বিশ্বকাপে এবার সাপ নিয়েও কম আলোচনা হয়নি!

এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ফুটবলের পাশাপাশি অদ্ভুতভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে সাপের গল্প। সবকিছুর শুরু সুইজারল্যান্ড শিবির থেকে। ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের অনুশীলন কেন্দ্রে নাকি প্রচুর সাপ রয়েছে—এমন একটি গল্প তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়েছিল। পরে জানা যায়, এটি ছিল সুইস সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে করা তাদের এক মজার ‘ইনসাইড জোক’। তবে যে সান দিয়েগো জিউইশ অ্যাকাডেমি নিজেদের অনুশীলন মাঠ সুইস দলের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল, তারা এই মজায় মোটেই খুশি হয়নি।

অন্যদিকে জার্মানি শিবিরে কিন্তু সত্যিই দেখা মিলেছিল একটি বিষধর সাপের। উত্তর ক্যারোলিনায় দলের অনুশীলন কেন্দ্রে সেই সাপ দেখা যাওয়ার কথা জানান অধিনায়ক যোশুয়া কিমিখ। তাঁর কথায়, “গতকাল আমরা একটি সাপ দেখেছিলাম। পরে আমাদের জানানো হয়, সেটি বিষধর। যদি কামড়ায়, তাহলে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে। হয়তো মারা যাবেন না, কিন্তু বিষয়টি যথেষ্ট বিপজ্জনক।”

শুধু স্টেডিয়াম নয়, উৎসব এখন শহরের অলিগলিতেও

বিশ্বকাপের সাফল্য শুধু স্টেডিয়ামের দর্শকসংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; তার আসল স্পন্দন ধরা পড়ে শহরের রাস্তায়। আর এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর রাস্তাঘাট যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ। যে শহরগুলোর ব্যস্ত রাস্তা সাধারণত যানজট, কর্মব্যস্ততা আর তাড়াহুড়োর জন্য পরিচিত, বিশ্বকাপের আবহে সেগুলিই রূপ নিয়েছে রঙিন, প্রাণবন্ত উৎসবের মেলায়।জার্সি গায়ে হাজার হাজার সমর্থক, বিভিন্ন দেশের পতাকা, গান, নাচ আর উচ্ছ্বাসে শহরের অলিগলি যেন এক বিশাল কার্নিভালে পরিণত হয়েছে। ফিফার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তিন আয়োজক দেশের ফ্যান ফেস্টিভ্যালগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা ২০ লক্ষ (২ মিলিয়ন)-এর গণ্ডি পেরিয়ে যায়। মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের বাইরে এই জনসমুদ্রই যেন প্রমাণ করে বিশ্বকাপ আসলে শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্বের নানা সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলা।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *