শাশুড়ি-বৌমা: সংঘাত থেকে সহযাত্রা -

শাশুড়ি-বৌমা: সংঘাত থেকে সহযাত্রা

শুধু শহরেই নয়, এই পরিবর্তন এখন শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলেও দৃশ্যমান।

বাঙালি পরিবারে শাশুড়ি-বৌমা সম্পর্ক ছিল ক্ষমতার এক নিঃশব্দ লড়াইয়ের নাম। বিয়ের পর নতুন বৌয়ের কাছে শ্বশুরবাড়ি মানেই ছিল এক অচেনা পৃথিবী-যেখানে নিজের মতামতের জায়গা খুব কম, আর মানিয়ে নেওয়ার চাপ ছিল অসীম। পণপ্রথা এই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলত। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে এখনও প্রতিবছর প্রায় ৬,০০০–৭,০০০ পণ-সংক্রান্ত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়, দেখায় সমস্যাটি আজও কতটা গভীরে প্রোথিত।

সেকালে সংসারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় সম্পূর্ণভাবে শাশুড়ির হাতে থাকত। নতুন বৌয়ের শিক্ষা, রুচি বা ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে “এই বাড়ির নিয়মে” গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল প্রবল। রান্নাঘর ছিল সেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু-যেখানে ভুল মানেই অপমান, আর প্রতিবাদ মানেই “অশিক্ষা”র তকমা। অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক চাপ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এমনকি শারীরিক নির্যাতনও এই সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠত।

তবে এই দ্বন্দ্বের পেছনে শুধু কঠোরতা নয়, ছিল সামাজিক কাঠামোর প্রভাবও। বহু শাশুড়ি নিজের জীবনে একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, ফলে সেটাই হয়ে উঠেছিল “স্বাভাবিক”। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মেয়েরা যারা শিক্ষিত, অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবী ,তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান নিয়ে বেশি সচেতন। এই দুই প্রজন্মের মানসিকতার সংঘর্ষেই তৈরি হত দূরত্ব, এখনও হয়।

টেলিকম চাকরিজীবী নিমিশা কদম বিয়ে করেছিল প্রসূন কদমকে । বিয়ের আগে বেশ কিছুবার নিমিশা হবু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁদের শ্বশুর শাশুড়ি এ বাকিদের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা আর স্নেহ ভালোবাসা পেয়ে আগামী বিবাহিত জীবন সুখের আর  শান্তির হবে ভেবে আনন্দিত ছিল কিন্তু বিয়ের ৩মাস যেতে না যেতেই শুনতে হল ওয়েস্টার্ন আউটফিট পরা যাবেনা শুধু ভারতীয় পোশাক পরতে  হবে নিমিশা রান্না করতে ভালোবাসে কিন্তু শুনতে হল রান্না করা যাবে না , ফলস্বরূপ তাদের আলাদা বাড়ি নিতে হয়। শাদি ডট কমের রিসার্চ পোলের তথ্য অনুযায়ী এখন ৬৪.১% বিয়ে করার প্রাথমিক শর্ত তারা আলাদা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি হিসেবে থাকবেন।

কিন্তু গত এক-দুই দশকে অন্য একটা ছবিটা কিছুটা অন্তত বদলাতে শুরু করেছে। যৌথ পরিবারের বদলে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বৃদ্ধি, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা, এবং শিক্ষার প্রসার ,সব মিলিয়ে সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। এখন অনেক পরিবারেই শাশুড়ি-বৌমা সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সহযোগিতার জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

সত্যজিৎ রায় নিপুণভাবে এক ছবি এঁকেছিলেন নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প অবলম্বনে মহানগর  ছবিতে যেখানে পুত্রবধূ আরতির চাকরি করা প্রথমে দুজনকে বেরোনোর আগে একসঙ্গে খেতে দেওয়ার সময় উনুনের সামনে চোখের জল মোছা আর পরে কাজে বেরোবার আগে দৃশ্য যেখানে আরতি বলছে ‘মাছের  দরকার নেই মা ‘ আর কড়াই থেকে মাছের মাথা তুলে বেড়ে দিতে দিতে ‘এই তো হয়ে গেছে মা ‘ দৃশ্য এক অন্য শাশুড়ি বৌমার কথা বলে ।

শুধু শহরেই নয়, এই পরিবর্তন এখন শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলেও দৃশ্যমান। অর্থনৈতিকভাবে নিম্নবিত্ত পরিবারেও কাজের চাপ, সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং পারস্পরিক নির্ভরতা, সম্পর্ককে অনেক বেশি বাস্তব ও সহযোগিতামূলক করে তুলছে। একসঙ্গে বাজার করা, সন্তান লালনপালনে সাহায্য করা, এমনকি ছোটখাটো ঘুরতে যাওয়া সবই এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন ছবি।

তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে সমস্যা পুরোপুরি মিটে যায়নি। এখনও পণপ্রথা, মানসিক নির্যাতন বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের খবর নিয়মিত সামনে আসে। সমাজের একাংশে এখনও পুরনো মানসিকতা দৃঢ়ভাবে রয়ে গেছে।

তবুও আশার কথা হল এই সম্পর্কের ভাষা বদলাচ্ছে। আজকের শাশুড়ি বুঝতে শিখছেন, নতুন বৌ শুধু একজন “দায়িত্ব” নয়, সে-ও একজন স্বপ্ন ও আবেগ নিয়ে আসা মানুষ। আর বৌমারাও বুঝছেন, শাশুড়ি শুধুই কর্তৃত্বের প্রতীক নন, তিনিও একজন অভিজ্ঞ, সংগ্রামী নারী।

সেকালের শাসন আর একালের বন্ধুত্ব ,এই দুইয়ের মাঝখানে তৈরি হচ্ছে এক নতুন সেতু। যেখানে শাশুড়ি-বৌমা আর প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং সহযাত্রী। এই পরিবর্তন শুধু একটি সম্পর্কের নয়, বরং একটি সুস্থ, সহানুভূতিশীল সমাজ গঠনের দিশা দেখাচ্ছে।

শাশুড়ি ও জা’ এর সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে জুন চক্রবর্তী

মধ্যবয়সী জুন চক্রবর্তীর কথায় ,’ আমি যে ৯০ এর দশকে  বৌমা হয়ে এসেছি সেই সময়ে উত্তর কলকাতার  বনেদি  বাঙালি বাড়ির অনুশাসন ছিল। স্বাভাবিক ভাবে মনে ভয় আর সংকোচও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমার শাশুড়ি মা আমাদের দুই পুত্রবধূর বন্ধুর মতো। আমাদের বললাম কারণ আমার একটি ছোট জা ও আছে। আমরা একসঙ্গে সিনেমা, নাটক  দেখা , শপিং করা ছাড়াও এখন মাঝে মাঝে আমরা একসঙ্গে ডে আউটিং এও বেরিয়ে পড়ি । গল্প হাসি ঠাট্টা মান অভিমান আগের থেকে অনেক সহজ – সাবলীল হয়ে গেছে । তবে এখন দেখছি এই প্রজন্মে  আমার বেশ কিছু বন্ধু যারা এখন শাশুড়ি হচ্ছেন তারা  তাদের বৌমাদের সঙ্গে প্রথম থেকেই বেশ আন্তরিক এখানে উল্লেখ করা দরকার প্রায় কেউই একসঙ্গে থাকেন না। তাই বোধহয়  সেই আগেকার ভীতি, রীতিনীতির অন্তরাল অদৃশ্য হয়ে সম্পর্ক বেশ সহজ হয়ে গেছে যদিও এখনও কিছু ব্যতিক্রম রয়ে গেছে কিন্তু সেটা সব ক্ষেত্রেই থেকে থাকে ।’

গড়িয়া নিবাসী কেয়া দত্তর কথায়,’ আমার পরিবারে অভাব ছিল একটি মেয়ের। ছেলের বিয়ে দেবার পর সে অভাব মিটল , বাড়িতে এল আমাদের বৌমা। সংসারটি এতদিনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল বাড়ির আবহাওয়া জমজমাট হয়ে উঠল হাসি গল্প আড্ডায়। বৌমা ভারী মিশুকে, অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যকে আপন করে নিতে পারার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে এবং অল্প দিনের মধ্যে আমাদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠল। ওকে শাড়ি পরতে, রান্না করতে শিখিয়েছি কিন্তু এখন ও আমায় রান্নায় ১০ গোল দিয়ে দেবে এত ভালো রান্নার হাত ওর। এতদিন ছেলের পোশাক কিনেছি , এখন মনের সাধ মিটিয়ে শাড়ি আর অন্যান্য ড্রেস কিনতে ভালো লাগে আর এই ভালোবাসার টানেই এখন আমাদের সম্পর্ক শাশুড়ি বৌমা থেকে মা মেয়ের সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছে। শাড়ি -গয়না থেকে রণবীর-দীপিকা থেকে সব বিষয় নিয়ে আর পিএনপিসিতে আমাদের দারুণ আড্ডা জমি ওঠে। আসল কথা হল সংসারে শাশুড়ি – বৌমার অবস্থান এমনই যে একজন আগে আসে আর অন্যজন পরে এই সহজ কথাটা মাথায় রাখলে সম্পর্কও সহজ হয়ে যায়।‘

ওনার কানাডা নিবাসী পুত্রবধূ  জানালেন ,’ আমার সাথে আমার শাশুড়িমার সম্পর্কটা খুব সহজ ও সরল।আমি কলকাতার বাইরের মেয়ে পড়াশোনার বেশির ভাগই হোস্টেলে তাই বিয়ের পর একটা বাড়ির পরিবেশ পেয়েছিলাম।প্রথম থেকেই এম শাশুড়ি মা নিজের ছেলের থেকে আমায় কোনো অংশে আলাদা করে দেখেন নি, মাংসের বড় পিস্ থেকে কিছু কিনে দেওয়া সবেতেই সমান করে দেখেছেন আমাদের দুজনকে কোনো ক্ষেত্রে পক্ষপাত হলে সেটা আমার পক্ষে গেছে।মা আমাদের সম্পর্ক ভালো করার জন্য সময় দিয়েছে আর কোনো কিছু চাপিয়ে  দেয়নি, একেবারে প্রথম থেকেই বাড়ির সবকিছু সিদ্ধান্তে আমার মতামত কে গুরুত্ব দেওয়া আর যেটা সবচেয়ে ভালো যে নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের স্বচ্ছন্দ আর ভবিষ্যতের কথা না ভেবে আমাদের ভবিষ্যতের আর বিকাশের কথাকে গুরুত্ব দিয়েছে ।আমার মনে হয় শাশুড়ি বৌমার সম্পর্ক খুব পারস্পরিক আর উনি আমার অভ্যাস মানসিকতা জেনে বুঝে সেই মতো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জল -মাটি দিয়েছেন এবং নিজের গতিতে সম্পর্কে উন্নতি হতে দিয়েছেন তাই এখন এতো দূরে আমি মার উপস্থিতি রান্না বিভিন্ন বিষয়ে যার মধ্যে ফ্যাশন ও আছে আর আড্ডা মিস করি। আমাদের এত মধুর সম্পর্কের সিক্রেট হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সন্মান।‘ 

এই  প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন  অভিনেত্রী   ও সব্যসাচী চক্রবর্তী গৃহিনী মিঠু চক্রবর্তী তার দুই পুত্র গৌরব ও অর্জুন কে স্পষ্ট বলেছিলেন যে বিয়ে করে আলাদা থাকতে হবে আর উনি মনে করেন যে দুজনের বিয়ের পর এত ভালো সম্পর্ক থাকার এটা একটা বড় কারণ। অবশ্যই তার মানে এটা নয় সবাইকে তাই করতে হবে তবে এই মনোভাব আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবার কাজের সময়ের, আসা যাওয়া, সপ্তাহান্তের অবকাশের ধরণ পাল্টে যাওয়ার কারণে।

“শাশুড়ি-বউমা” সম্পর্ককে ঘিরে বাংলা পরিবারে যে চিরাচরিত টানাপোড়েন, কটাক্ষ বা নীরব ক্ষমতার রাজনীতি একসময় প্রায় স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়া হত, আজ তার অনেকটাই বদলাচ্ছে। এক ছাদের নীচে দুই প্রজন্মের দুই নারীর সম্পর্ক এখন অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠছে সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার। সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া থেকে শুরু করে মানসিক সমর্থন—অনেক শাশুড়ি আজ বউমার পাশে দাঁড়াচ্ছেন মায়ের মতো, আবার বহু বউমাও শাশুড়ির বার্ধক্য, একাকিত্ব ও অনুভূতিকে বুঝতে শিখছেন নতুন চোখে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” সেই বিশ্বাসের জায়গাটাই হয়তো নতুন করে তৈরি হচ্ছে এই সম্পর্কের ভিতরে। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের কথায়ও উঠে আসে একটি সুস্থ পরিবার গড়ে ওঠে তখনই, যখন ক্ষমতার লড়াই নয়, গুরুত্ব পায় সহানুভূতি ও কথোপকথন।

তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে “নতুন স্বাভাবিক” বলে ধরে নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। সমাজের নানা স্তরে এখনও শাশুড়ি ও বউমা—উভয়ের উপরেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কোথাও বউমা অত্যাচারের শিকার, কোথাও আবার অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার শিকার প্রবীণ শাশুড়ি। তাই সম্পর্কের এই সুন্দর পরিবর্তনকে উদযাপন করার পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং পরিবারের ভিতরে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা।

কারণ, “সহযাত্রা” শুধুই একসঙ্গে থাকা নয়, বরং একে অপরকে জায়গা দেওয়ার শিল্প। আর সেই শিক্ষাই হয়তো আগামী দিনে পরিবারের সবচেয়ে বড় আশার আলো।

আংশিক তথ্যসূত্র – শ্রেয়সী সেন

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *