পাজি ছুঁচো -

ছবি- অনুপ রায়

পাজি ছুঁচো

সরু সুরে চিক্ চিক্ শব্দ করে জানান দেয়, আছি, আছি, তুমিও আছ আমিও আছি, সপরিবারে আছি।…

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অতীতে যখন আমার উচ্চতা মাত্র কয়েক ফুট, তখন থেকেই শুনে আসছি আমি একটি পাজি ছুঁচো। ছুঁচো আমার কাছে আজও তেমন পরিচিত প্রাণী নয়। আশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। সরু সুরে চিক্ চিক্ শব্দ করে জানান দেয়, আছি, আছি, তুমিও আছ আমিও আছি, সপরিবারে আছি। আছি এবং থাকবো। অভাবেও থাকবো, স্বভাবেও থাকবো। ইঁদুরের মতো অতটা অত্যাচারী নই। তবে কি. আমরা একটু ভিজে ভিজে, থলথলে প্রাণী। ইঁদুরের মতো শুকনো, খড়খড়ে নই, থ্যাসকা আমাদের শরীরের গন্ধ। তোমাদের ভালো লাগে না। এই বার বলো, তোমরাও কি খুব সুগন্ধী? বোধ হয় না। শরীরে বহু রকমের ফ্যাস-ফোঁস প্রয়োগ করো। আহা রে! সুগন্ধী মানব আমার।যত দুষ্কর্মের নায়ক।

যৌথ পরিবার ভাঙলে কেন?

টেকনিক্যাল অসুবিধা। ‘কাকাবাবু প্রবলেম’।

সে আবার কি?

তাঁরা দুই ভাই – বাবা আর কাকা। দুই মহিলা একজন আমার মা, অন্যজন আমার কাকিমা।

বাঃ, ‘ভালোই তো, বেশ ছিমছাম। পেল্লায় একটা বাড়ি, দশ কাঠা জমি। আম, জাম, কাঁঠাল, মাঝারি মাপের একটা পুকুর, রুই, কাৎলা । আহা, আহা, বেজায় সুখ, তা’ এমন চচ্চড়ি হয়ে গেল কি করে?

নাট, বল্টু সব লুজ হয়ে গেল, টাইট দেবার লোক নেই, শুরু হল ফাইট। ফাইট করতে,করতে ফাইটাররা সব ওপরে, প্যাভেলিয়ানে। পরবর্তী ইনিংসের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। সিলিং ফ্যানে মানুষ ঝোলে আদালতে। গয়া পিসি কবে মরে পগার পারে, মামলা এখনো ঝুলছে। উত্তরাধিকার সূত্রে মামলা লাভ।

প্রপার্টিটা কোথায়?

বলতে পারবো না,তবে দলিলের পাউডার খাপে ভরা আছে।

ভাই, সেকালের চেয়ে একাল অনেক, অনেক ভালো- যে যার সে তার। এর সুন্দর একটা ইংরেজি আছে, ‘হিজ হিজ, হুজ হুজ’।সেই কলেজ জীবন থেকে শুনে আসছি বেঁচে থাকার এই স্তোত্রটি ।

সুউন্নত এই ডিজিট্যাল সভ্যতা ক্রমশ এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার দিকে চলেছে।সেদিন সুন্দর এক অভিজ্ঞতা হল। মস্ত এক বিবাহ অনুষ্ঠান। বিবাহ তো অতীতের মতো নিজেদের বাড়িতে হয় না। তাছাড়া বাড়ি কোথায়, সবই তো ফ্ল্যাট। সুতরাং বিয়ে বাড়ি ভাড়া করতে হয়। সেও ভারি মজার। বহুতল বিবাহ বাড়ি। একই সঙ্গে তিনটি বিবাহ, প্রথম তলে একটি, ব্যানার ঝুলছে শ্যামল ওয়েডস শ্যামলী। দ্বিতীয় তলে কিঙ্কর ওয়েডস কাকলী, ইত্যাদি। উপহার হাতে যাঁরা আসছেন, নির্দেশ, হুটোপাটি করবেন না । উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবেন না । নিমন্ত্রন পত্রটি/ বাক্সটিসঙ্গে রাখুন। অতিরিক্ত সাবধানতার কারনে, সঙ্গে রাখুন আধার কার্ড, প্যান কার্ড। পূর্বের এক অনুষ্ঠানে, পাত্র ও পাত্রীপক্ষের হাতাহাতি মারামারিতে আমাদের প্রভূত ক্ষতি হওয়ায় আমরা বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করে দুজন বাউন্সার রেখেছি। তাদের বুকে চিহ্নে আঁটা আছে পাত্র-পাত্রী।

লড়াইয়ের স্থান এই ভবনের পশ্চাতে নির্দিষ্ট আছে। আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার ও ফার্স্টএডের ব্যবস্থা। প্রবেশ দ্বারে আছে মেটাল ডিটেক্টার। পূর্বের এক বিবাহের তিক্ত অভিজ্ঞতা – রিভলভারধারী এক যুবক বিবাহস্থলে প্রবেশ করে দাবি করেছিল, আমি তিন বছর ধরে রিহার্সাল দিচ্ছি বরের ভূমিকায়, কোথা থেকে এই ছুঁচোটা বরের পিঁড়িতে বসে পড়ল। তারপর আগেয়া, বলে গান ধরল ষাঁড়ের গলায়, তারপর নাচতে লাগল, হাম সুইসাইড করেগা, তারপর ধপাস, নড়েও না, চড়েও না। হঠাৎ পাত্রী উঠে দাঁড়াল, সেকি নৃত্য তার – প্রেম করেছি, বেশ করেছি, করবোই তো!

ঝিরি,ঝিরি আলোর ঝালর মোড়া আলো-আঁধারি উদ্যান। এদিকে ওদিকে,সেদিকে বসে আছে সারি,সারি মোবাইল। সকলেই কথা বলছে দূরের অদৃশ্য কারো সঙ্গে।কথা, অজস্র কথা। এত কথাও জমে আছে এই ছোট ছোট খোলে। পাশে, অদূরে বসে থাকা কারো সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। হাতের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে লেগে আছে নীলে আলো। বিরাট একটা জলের ট্যাঙ্ক বাহকের মাখায়, সঙ্গে ঝিলিক মারা পোশাক, হৃষ্টপুষ্ট, শাঁসালো এক ব্যক্তি। সবাই হাঁ হয়ে গেছে – এ আবার কী?

‘হাঁ ভাই। অ্যায়সা কুছ দিতে হোবে যা কাজে আসে। চিত্তবাবু বাড়ি বানাচ্ছে, এক ট্যাঙ্কিতো জরুর লাগে গা। হাম ডিলার হায় না!’

পায়ের ওপর দিয়ে ‘ট্যাক’ শব্দ করে কি একটা চলে গেল— ‘ছুছুন্দর’।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *