বাঘের দেশে ৩দিন -

বাঘের দেশে ৩দিন

একদিন আগের বাঘের পায়ের ছাপ, কুমির অজস্র নাম না জানা পাখি…

সুমন্ত্র মিত্র

সুন্দরবন  বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাচাঞ্চল, জলে কুমির ডাঙায় ভয়ঙ্কর হিংস্র মানুষখেকো বাঘ, ইরাবতী ডলফিন, ২৬০ প্রজাতির  পাখি, ৩৭ প্রজাতির সাপ যার মধ্যে কিং কোবরার সংখ্যা বেশি , এমন রোমাঞ্চকর প্রকৃতির সান্নিধ্যে স্কটিশ স্কুলের ৮১ ব্যাচের ৫বন্ধুর,সুরজিৎ কৃষ্ণেন্দু, ভূপাল প্রণব আর এই অধমের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণকাহিনী।

যাত্রা শুরু ২৭শে ফেব্রুয়ারি , সুন্দরবন ইকো ট্যুরিজমের ২রাত ৩দিনের প্যাকেজ ট্যুর । যাত্রা শুরু সকাল ৮.৩০ টায় সায়েন্স সিটি অথবা ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম থেকে। এরপর গৎখালি থেকে  স্বর্ণময়ী লঞ্চে যাত্রা শুরু। সবে লঞ্চে উঠেছি পারে লক্ষ্য করলাম প্রবল হৈ- হট্টগোল লোকেরা দৌড়োচ্ছে কী হয়েছে বোঝার মধ্যে প্রযুক্তির কল্যাণে জানলাম প্রবল ভূমিকম্প হয়েছে যা জলে লঞ্চের মধ্যে আমরা টের পাইনি। যারা লঞ্চে সুন্দরবন ঘুরেছেন তারা জানেন যে দুই পারে গভীর নিবিড় জঙ্গল আর তার মাঝে লঞ্চে ঘোরার মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ আছে ।আমাদের ৩দিনের ভ্রমণের মধ্যে ঝড়খালি , নেতিধোপানি সজনেখালি ওয়াচ টাওয়ার দোবাঁকি ক্যানোপি ওয়াক এবং সুধন্যখালি।

লঞ্চে ভ্রমণকালে সন্তু মিশ্র,(বি এ,ইংরেজি অনার্স ,আজকের যে কোনও টিভি সঞ্চালককে বলে বলে ১০ গোল দেবে) গাইডের অপূর্ব অজানা এবং রোমহর্ষক বর্ণনা বাড়তি পাওয়া। জানলাম সুন্দরবনের বাঘ অন্যান্য টাইগার রিজার্ভের বাঘের মতো ফটো সেশন দেয়না দূর থেকে দেখতে পেলে ঠিক আছে কাছ থেকে দেখলে ওই শেষ দেখা কারণ পৃথিবীর অন্যান্য বাঘেদের থেকে সুন্দরবনের বাঘ মানুষখেকো এবং অত্যন্ত হিংস্র হওয়ার পেছনের কারণ বহু আগে ওই অঞ্চলে সাপে কাটা মানুষদের জলে ভাসিয়ে দিত ,সেই মড়া খেয়ে মানুষখেকো তাই এই বাঘেদের জিনে মানুষখেকো প্রবৃত্তি কারণ এদের বাবা, ঠাকুরদা প্রপিতামহ সব মানুষখেকো এছাড়া এখানকার স্যালাইন ওয়াটার পান করার জন্যে এদের ব্লাড প্রেশার বেশি থাকে তাই হিংস্রতা বেশি এবং এদের খুব সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয় কারণ এদের এলাকা যা এরা নিজেদের প্রস্রাব দিয়ে মার্ক করে তা জোয়ার এলে চলে যায় আবার এক ভাবে মার্ক করতে হয়, আর জানলা বাঘেদের আশ্চর্য অজানা মানসিকতা, বাঘ একটা থাবায় নাইলন জাল ছিঁড়ে দিতে পারে কিন্ত ওদের মানসিকতার সমস্যা ,ওরা যখন ছোট ছিল তখন ঐ জাল পেরোতে পারত না আর জ্যান্ত জালে ধরা পড়ায় ওরা জাল ছিঁড়তে পারে না।

 এছাড়া এখানকার হিংস্র কুমির যা মুহূর্তের মধ্যে জলের তোলা থেকে আক্রমণ করে টেনে নিয়ে যায় এতেও রক্ষে নেই এখানে ৩৭প্রজাতির সাপেদের মধ্যে বিষধর সাপের সংখ্যাই বেশি রাসেল ভাইপার, কিং কোবরা, ক্রেইট পিট্ ভাইপার।জানলাম এখানকার বিপন্ন ইরাবতী এবং গাঙ্গেয় ডলফিনদের বিষয়ে এখন আনুমানিক ৮৫১ ডলফিনের আবাসস্থল এই সুন্দরবন ও বাংলাদেশে। তবে দূষণ আর লবনাক্ত জলের আধিক্যের জন্য এদের অস্তিত্ব সংকটে ।আর যে বিষয়টা ভালো লাগলো যে এখানে সবাই পরিবেশ রক্ষার সচেতনতায় প্রবল যত্নবান এমনকি জল -পুলিশও। বোটে বা লঞ্চে কোনো প্লাস্টিকের জিনিস এমনকি যেদিন খাঁড়িতে যাওয়া হচ্ছে সেদিন প্লাস্টিকের জলের বোতলও নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ যদি ধরা পড়েন ৫০০০টাকা জরিমানা আর লঞ্চের লাইসেন্স ক্যানসেল যা অত্যন্ত শুভ ও সচেতন উদ্যোগ এ কথা অনস্বীকার্য ।

আমরা স্কুলের বন্ধুরা এবং বাকি সবাই যারা সুন্দরবন বেড়াতে আসেন তারা ভেবে দেখুন যে এমন একটা ভয়ঙ্কর অঞ্চলে মাসের পর মাস বছরের পর বছর সারা জীবন কাটিয়ে এই জীবন-  সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন এখানকার অধিবাসীরা আর আমাদের মতন শহুরে ট্যুরিস্টরা এদের দেখেই প্রথম প্রশ্ন করেন ‘বাঘ দেখেছেন ?’ কথা হচ্ছিল গোসাবার প্রবীণ মানুষ হরিপদ দত্তের সঙ্গে , ‘ সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে যে এই আপনারা এখানে এসে আমাদের জিজ্ঞেস করেন, বাঘ দেখেছেন,কখন কোথায় বাঘ দেখতে পাব?’।আপনারা কি জানেন যাদের জিজ্ঞেস করেন তাদের পরিবারের কেউ বাঘের পেটে গেছে,কেউ মধু,কাঁকড়া ধরতে গিয়ে তাদের সঙ্গী,আত্মীয়কে বাঘ টেনে নিয়ে যেতে দেখেছে।তাদের দিনের পর দিন বছরের পর বছর এই প্রশ্ন শুনতে কেমন লাগে? এই ১০/১৫ বছর আগেও বিকেল সন্ধ্যেবেলায় যদি দেখতাম রাস্তায় একটাও কুকুর নেই ,সভয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম।বাঘ আর সাপ গোয়ালঘরে বেশি আসে।একধরনের সাপ গরু বাছুরের পা জড়িয়ে থাকে….’   

দুদিনের রাত্রিবাস সুন্দরবন ইকো ট্যুরিজমের রিসোর্টে, খাবার মান ভালো, বিশেষত লঞ্চে ফ্রেশ রান্না করা ভেটকি চিংড়ি, পাবদা রিসোর্টে পাঁঠার মাংস মোটের ওপর বলা যায় খাবার ব্যবস্থা ভালোই ।

বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে গভীর বনের ভেতর চোখ রাখলে ভয় লাগে, মনে হয় লঞ্চে নয় এই গভীর বাঘের দেশের জঙ্গলে একা আর যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে শার্দুল সম্রাট।

না আমাদের ব্যাঘ্র দর্শন হয়নি । কিন্তু একদিন আগের বাঘের পায়ের ছাপ, কুমির অজস্র নাম না জানা পাখি আর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে লঞ্চে ঘোরা  আর যখন সারেং বলছেন এবারে এই এক ঘন্টায় দুদিকেই বাঘেদের ডেরা  এখানে কোনও জনবসতি নেই, সেই অঞ্চলে বাইনোকুলারে চোখ রেখে গভীর জঙ্গল দেখার রোমাঞ্চ শিহরণ একদম অন্যরকম ।

দোঁবাকি ক্যানোপি ভ্রমণের কথা আলাদা করে বলা দরকার এইজন্যে যে এ এক অদ্ভুত শিহরণ আর রোমাঞ্চের অনুভূতি। ক্যানোপি বলতে এখানে একটা টানা লম্বা আধ কিলোমিটার লম্বা জাল দিয়ে ঘেরা একটা হাই ব্রিজের মতো যার নিচে ঘন জঙ্গল উদ্দেশ্য গভীর জঙ্গলের ভেতর কেমন দেখতে হয় সেই অনুভূতি নির্দ্বিধায় বলা ভালো এ এক আশ্চর্য রোমাঞ্চকর অনুভূতি।

স্কটিশ ৮১ ব্যাচের পঞ্চতান্ডব

বাইনোকুলারে চোখ রেখে আছি,হঠাৎ একটা হলদে কালো প্যাচ।কিছুক্ষণ স্থির ,বাঘ দেখতে অধীর আগ্রহে ভেবেছি দেখলাম।কিন্তু লঞ্চ চলছে বলে সেই দৃশ্যও সরে গেল।সারেং সাহেবকে সেইদিকের জঙ্গল দেখিয়ে বললাম মনে হয় দেখলাম।উনি নির্লিপ্ত গলায় বললেন হতে পারে ,এই দিনের বেলায় ওরা গাছের আড়ালে শুয়ে থাকে কিন্তু আপনি বোধহয় হরিণ দেখেছেন,ওদের গায়ে গাছের পাতার কালো ছায়া পড়লে ওরম ডোরাকাটা মনে হয় দুর থেকে।

ছবি- সুরজিৎ প্রামাণিক, ভূপাল বোস , প্রণব দাস, কৃষ্ণেন্দু দাস।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *