গত শতাব্দীর তুলনায় এখন অনেক বেশি নারী উপার্জনশীল এবং এই বিষয়টি নারী স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয় এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।কিন্তু দেখা গেছে যে সেই উপার্জিত অর্থের ওপর সেই নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পরেও সেই ঘাম রক্ত ঝরানো অর্থ বাধ্য হয়ে নিজের স্বামী বা পরিবারের জন্য নিয়মমাফিক দিয়ে দিতে হয়। কাজ করে আয় করা অনেক নারী আজ ঘরে বাইরে উভয় জায়গায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু শুধুমাত্র আয় করা কি মানে তার স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা পাওয়া? অর্থ উপার্জনের পরও সেই টাকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক মেয়ের হাতেই নেই।
মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানের ১৩টি ফোকাস গ্রূপের মহিলাদের নিয়ে স্টেইনার্ট ২০২৩ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০,০০০+ শ্রমজীবী নারীর মধ্যে প্রায় ৯০% সদস্য তাদের আয়ের বড় অংশ ঘর-সংসারে সরাসরি খরচ করেন। তাও হয়েছিল, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের খরচ ও অন্যান্য জরুরি খরচে।কিন্তু প্রায় ৬৭% নীচের ক্ষেত্রেও তারা নিজেই আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বরং স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুমতি বা সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করেন।এই বাস্তবতা শুধু অনুভূতিই নয়, গবেষণাও বারংবারই প্রমাণ করেছে নারীর উপার্জন থাকলেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা তার নিজের হাতে থাকা খুব কমই ঘটে।ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে -৫ রিপোর্টে প্রকাশ সার্ভেতে অংশগ্রহণকারী মহিলাদের মধ্যে ৪৪% মহিলা যারা তাদের উপার্জন থেকে যা সঞ্চয় করেছেন তাতে তাদের অধিকার নেই।অল্পশিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে ৫০% মহিলাদের নিজস্ব উপার্জনের ওপর কোনো অধিকার থাকে না।
যে বাংলাদেশে মাক্রোফাইনান্স সুপ্রসিদ্ধ সেখানেও সমীক্ষায় দেখা গেছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে একবার সেই লোন মেয়েদের হাতে আসার পরেই হাতবদল হয়ে যায় সেখানে আর তার কোনো অধিকার থাকে না।
যে বাংলাদেশে মাক্রোফাইনান্স সুপ্রসিদ্ধ সেখানেও সমীক্ষায় দেখা গেছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে একবার সেই লোন মেয়েদের হাতে আসার পরেই হাতবদল হয়ে যায় সেখানে আর তার কোনো অধিকার থাকে না।
এই অসাম্য,অন্যায় অবিচারের পাশে অনুল্লেখিত থাকে বিয়ের সময় মেয়ের বাড়ি থেকে মেয়েকে দেওয়া গয়না শ্বশুরবাড়িতে কেড়ে নেওয়া অথবা বাধ্য হয়ে মেয়েদের দিয়ে দেওয়ার কথা।
জীবন থেকেই গল্প ।বাংলা গল্প উপন্যাসে মেয়েদের বিয়ের সময় নিজের গয়না শ্বশুরবাড়ি, স্বামী,শাশুড়ির হাতে নিদারুণ লাঞ্ছনার কথা আমাদের অজানা নয়।রবীন্দ্রনাথের ‘দেনা পাওনা’ গল্পে উনি তুলে ধরেছেন পণ প্রথার কুফল ও বাঙালি জীবনের বিষময় বেদনার রুদ্ধ ইতিহাসকে।সমাজ সংসারের নির্মমতায় যৌতুকের দায়ে নিরুপমার মৃত্যুর কথা।হৈমন্তী গল্পে হৈমন্তীর বয়স নিয়ে শাশুড়ির ভর্ৎসনায় হৈমন্তীর সুতীক্ষ্ণ প্রতিবাদ ,’আমার বাবা তো কখনোই মিথ্যা বলেন না ।’এই একটি মাত্র বাক্যের মধ্যে দিয়ে সুশিক্ষা,রুচিবোধ ও স্নিগ্ধ মনোভাবসম্পন্ন হৈমন্তীর প্রতিবাদী সত্তা প্রকাশ পায়।
শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসে রক্ষণশীল সমাজে নারীদের ওপর চলা চরম অন্যায়, অবমাননা ও শোষণের চিত্র ফুটে ওঠে। বিধবা নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা, সতীত্বের কঠোর মাপকাঠি এবং দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট নারীদের কথা তিনি সাহসের সাথে তুলে ধরেছেন। তাঁর নারী চরিত্ররা প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে প্রতিবাদী ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে বলেছেন ,’মণি-মাণিক্য মহামূল্য বস্তু, কেন না, তাহা দুষ্প্রাপ্য। এই হিসাবে নারীর মূল্য বেশী নয়, কারণ, সংসারে ইনি দুষ্প্রাপ্য নহেন। জল জিনিসটা নিত্য-প্রয়োজনীয়, অথচ ইহার দাম নাই। কিন্তু যদি কখন ঐটির একান্ত অভাব হয়, তখন রাজাধিরাজও বোধ করি একফোঁটার জন্য মুকুটের শ্রেষ্ঠ রত্নটি খুলিয়া দিতে ইতস্ততঃ করেন না। তেমনি—ঈশ্বর না করুন, যদি কোনদিন সংসারে নারী বিরল হইয়া উঠেন, সেই দিনই ইঁহার যথার্থ মূল্য কত, সে তর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়া যাইবে আজ নহে। আজ ইনি সুলভ।’
সাম্প্রতিক গ্রস ডোমেস্টিক বিহেভিয়ার (GDB) সমীক্ষা, যা ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকা পরিচালিত এক অভিনব গবেষণা-ভারতের নাগরিক আচরণ, জননিরাপত্তা, লিঙ্গ-মানসিকতা, বৈচিত্র্য ও বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এই সমীক্ষা দেশের নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে।
সারা দেশ থেকে ৯,০০০-এরও বেশি মানুষের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬৯% মানুষ মনে করেন নারীরা তাঁদের উপার্জিত অর্থ নিজেরাই পরিচালনা করতে সক্ষম হওয়া উচিত। তবে উদ্বেগজনকভাবে ৩১% মানুষের বিশ্বাস, আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের পরিবারের অনুমতি প্রয়োজন। আঞ্চলিক বৈষম্যও চোখে পড়ার মতো, কেরালাতে ৯১% মানুষ নারীদের আর্থিক স্বাধীনতার পক্ষে মত দিয়েছেন, অথচ ওড়িশাতে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৭%-এ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি,নারী অর্থ উপার্জন করলেই যে সেই অর্থ ব্যয়ের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, তা নয়। সমীক্ষার এই পরস্পরবিরোধী তথ্য সমাজের এক গভীর দ্বন্দ্বকে সামনে আনে—নারীদের কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হলেও, অনেকের ধারণা তাঁদের উপার্জন পরিবারের নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত। গভীরভাবে প্রোথিত লিঙ্গ-ধারণা, সামাজিক প্রত্যাশা, ঐতিহ্যগত পারিবারিক ভূমিকা এবং পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতা নারীদের আর্থিক স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। ফলে পরিবারে আর্থিক অবদান রাখার পরও অনেক নারী প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল অবস্থাতেই থেকে যান।
পরম পরিতাপের বিষয় আগেকার কঠোর সামাজিক অনুশাসনে মেয়েদেরকে পর্দানশীন এবং অশিক্ষিত করে রাখা হওয়ার সময় থেকে আজকের পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে মেয়েদের আত্মমর্যাদা এবং আত্মউপার্জনের পথ খুলে গিয়েও সেই বাড়ির ও বাইরের যুদ্ধ সামলানোর পরেও যদি মেয়েদের নিজের উপার্জিত অর্থ নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করার স্বাধীনতা না থাকে তাহলে প্রকৃত নারী স্বাধীনতা,নারীশক্তির উন্মীল প্রকাশ হয় না।
তথ্যসূত্র- স্টেইনার্ট সমীক্ষা ২০২৩,ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ ডাটা সার্ভে (NHFS -5 ),ওয়র্ক রিলেটেড ডিসিশন মেকিং ,ম্যারেড উওমেন ইন্ডিয়া-দ্য ইকোনোমিক অ্যান্ড লেবার রিলেশনস রিভিউ), গ্রস ডোমেস্টিক বিহেভিয়ার (GDB) সমীক্ষা, ইন্ডিয়া টুডে।
শেয়ার করুন :





