ছবি-হিন্দু

সোনাঝরিয়া মিনজ – এক দলিত মেয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তিগাথা

৫ বছর বয়েসে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রত্যাখ্যান,’তুমসে নহি হো পায়েগা’ কটূক্তি,পাথর ছুঁড়ে মারা পেরিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার যাত্রাপথের কথা।

“আমরা সহিংসতার শিকার হচ্ছি, কারণ আমরা গরিব, নিচু জাত এবং নারী; তাই সবার কাছেই অপদস্থ হই। কেউই আমাদের পক্ষে বলে না বা আমাদের সাহায্য করে না। আমরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হই, কারণ আমাদের কোনো ক্ষমতাই নেই,” কয়েক বছর আগে গবেষক জয়শ্রী মঙ্গুবাইকে এমনটাই বলেছিলেন এক দলিত নারী।

“দলিত নারীরা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্পেষিত গোষ্ঠী। তারা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয়ভাবেই সংস্কৃতি, কাঠামো ও অত্যাচারী প্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের শিকার। এসবের কারণেই দলিত নারীরা চিরকাল ধরেই সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে,” বলেছেন কাস্ট ম্যাটারস গ্রন্থের লেখক ড. সুরাজ ইয়েংদে।

সোনাঝরিয়া মিনজ,ভারতের দ্বিতীয় আদিবাসী মহিলা যিনি দুমকার সিধু কানহু মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন। অধ্যাপনা করেছেন বিখ্যাত জেএনিউ বিশ্ববিদ্যালয়ে।বর্তমান ভারতের আদিবাসী জাগরণের অন্যতম মুখ।

ওঁরাও জনগোষ্ঠী  পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শ্রেণীর অন্তর্গত।স্বাধীনতার আগে আর এই সেদিন পর্যন্ত অনগ্রসর,সমাজের পেছনের শ্রেণীতে থাকা ও তাদের অবর্ণনীয় শোষণ আর উপেক্ষার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা এই অতুলনীয় কীর্তি এভারেস্ট জয় করার মত। ১৯৪৬/৪৭ সালে সংবিধান রচনার সময়ে নির্বাচিত কাউন্সিলকে ভারতবর্ষের  সব অঞ্চলের সমস্ত জনজাতির পক্ষে বক্ত্যব্য রাখার সময় এক দলিত একটি ক্রান্তদর্শী প্রশ্ন তুলেছিলেন। উনি বলেছিলেন অস্পৃশ্যতার দোহাই দিয়ে আগে আমাদের সংস্কৃত পড়তে দেওয়া হত না কারণ নাকি তাতে ভাষা নষ্ট হয়ে যাবে।আর তার পরে আমাদের দীর্ঘকাল ইংরেজিও পড়তে দেওয়া হলোনা কারণ আমরা অশিক্ষিত।আপনারা কেউ বলতে পারেন পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জাতিকে প্রায় ২০০ বছর জ্ঞান,শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে কি করে এখন তারা সমাজের মূলস্রোতে আসতে পারছেনা বলে উচ্চশ্রেণীর তথাকথিত শিক্ষিতরা এত সমস্যা তৈরী করছেন?

সোনাঝরিয়া মিন্জের রুদ্ধশ্বাস তুঙ্গস্পর্শী কৃতিত্বকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তার মহিমা আর গরিমা বুঝতে সুবিধে হবে।

ঝাড়খণ্ডের গুমলা জেলার ওঁরাও জাতির কন্যা,বাবা নির্মল মিন্জ আদিবাসী সমাজকর্মী।রাঁচিতে পড়াশোনা শেষ করে পড়তে যান চেন্নাইয়ের বিখ্যাত উওমেন্স কলেজে।অঙ্কে মাস্টার্স করেন মাড্রাজ ক্রিশ্চান কলেজ থেকে।

এর পর জেএনইউ থেকে পিএইচডি সমাপ্ত করার পর ১৯৯০ এ ভোপালের বরকতুল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ১৯৯১ সালে মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও তারপর জেএনইউতে কম্পিউটার সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক রূপে কাজ করেছেন।এরই মধ্যে দেশি ও বিদেশী জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে প্রচুর রিসার্চ পেপার।তার উজ্বল কীর্তির স্বাক্ষর রেখে উন্নতির সোপানে সহকারী থেকে পূর্ণ অধ্যাপক,দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের অধিকার রক্ষায় অগ্রণী মুখ,জেএনিউ টিচার্স  অ্যাসোশিয়েশনের প্রমুখ।গত বছর দুমকার সিধু কানু মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর রূপে কার্যভার গ্রহণ।         

এই দীপ্তিময়ীর দৃপ্ত যাত্রাপথের দিকে একটু তাকালে স্তম্ভিত হতে হয়।৫ বছর বয়েসেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রত্যাখ্যান কারণ বাবা প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের আর স্কুল ক্যাথলিক।ওনার নিজের কথায়,’ওই বয়েসে ঠিক বুঝিনি যে আমি আদিবাসী বলে প্রত্যাখ্যাত কিন্তু প্রত্যাখ্যান টা পরিষ্কার বুঝেছিলাম আর এটাও বুঝতে পেরেছিলাম যে এই প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে আমায় আজীবন লড়তে হবে।স্কুলে ছোটোবয়সে প্রশংসা আর বিদ্রুপ দুইয়েরই সম্মুখীন হতে হয়েছে।এক মিস বলেছিলেন যে তুমি অঙ্কে খুব ভাল করবে তো আর এক মিস বলেছিলেন,’তুমসে নহি হো পায়েগা।’এছাড়াও ওনাকে ভাষা নিয়ে প্রবল সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল কিন্তু অঙ্কের ভাষা নিয়ে নয়।জীবনের প্রতিটি উপেক্ষায়, উদাসীনতায়,উপহাসে দৃঢ়সঙ্কল্পে অবিচলিত সোনাঝরিয়া মনে করতেন এই চ্যালেঞ্জেও জিততেই হবে।হ্যাঁ দিল্লি জেএনইউ টিচার্স  অ্যাসোশিয়েশনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আন্দোলনের সময় ওনাকে লক্ষ্য করে পাথরও ছোঁড়া হয়েছে।            

সোনাঝরিয়া  মিনজ- আপনাকে অপার শ্রদ্ধা,সশ্রদ্ধ প্রণাম।

ঋণ- এডেক্সলাইফ ডট কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *