বাঘের গল্প – বুদ্ধদেব গুহ

কিছুক্ষণ পরেই বাঘের ডাক শুনতে পেলাম।সঙ্গে সঙ্গে পুরো জঙ্গল কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল ।আমরা বুঝলাম বাঘ পাহাড় থেকে নেমে আসছে ।

আসামে নামনিতে যমদুয়ার  বলে একটা জঙ্গল আছে।নাম শুনেই বোঝা যায় কেমন জঙ্গল।সেখানে শাল গাছ গুলো এত বড় যে প্রমাণ সাইজের দশ বারো জন লোক ও ঘিরতে পারবে না এত বড়,এত চওড়া। সংকোশ নদী পাশ দিয়ে চলে গেছে ভুটানে।সেই সংকোশ নদীর অববাহিকায় যমদুয়ার জঙ্গল।ভুটানের মহারাজা হেলিকপ্টার করে ওখানে নেমে এসে শিকার করতেন।হাতি, গন্ডার,বাইসন,বুনো মোষ ,সাম্বার ,ভাল্লুক ,লেপার্ড ,বাঘ, ওয়াইল্ড ডগ ,প্রচুর জানোয়ার।সেখানে প্রকাণ্ড বড় বুনো মোষের বিশাল শিং দেখে বিভূতিভূষণের আরণ্যকের কথা মনে পড়ে যেত।আরণ্যকে বিভূতিবাবু লিখেছেন যে বুনোমোষদের দেবতাদের নাম হচ্ছে টাঁড়বড়ো যে বুনোমোষদের সাবধান করে দিত যে ওরা আসছে তোমাদের মারতে ,ওদিকে যেওনা।

সেই যমদুয়ারে সেবার ইনকাম ট্যাক্সের কমিশনার ছিলেন কেনেথ এডওয়ার্ড জনসন,যিনি আগে আর্মি তে ছিলেন।আমরা কেন বলতাম।সঙ্গে আর এক আধিকারিক এইচ এস ভাল্লিবয়।উনি শিকারে ইন্টারেস্টেড ছিলেন না ,শিলং এ কাজে গিয়েছিলেন। ওখানকার আই,টি,ও ডি ওয়াংলি বাবাকে অনেক রিকোয়েস্ট করেছিলেন তার সাহেবের জন্য শিকারের ব্যাবস্থা করে দিতে।      

ওরা শিলং থেকে ধুবড়িতে এসেছেন ,সেখান থেকেই যেতে হয় যমদুয়ার ।বাবা কে এই তালে আমি অনুরোধ করে আমিও এসেছি। আমাদের সঙ্গে সাত্তার বলে একজন ট্র্যাকার ছিল ।এখন নিষিদ্ধ এর শুনলে খারাপ লাগে কিন্ত সেই ১৯৫০  সালে ও বাঘ শিকারি ছিল। কারণ সেই সময়ে বাঘ ,লেপার্ড একটা বিপজ্জনক মেনেস ছিল,মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাদের মারা দোষের ছিল না। আর তখন এত আইনকানুন ও ছিল না। সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে।সাত্তার ,আমি,কেন জনসন,ভাল্লিবয় ,সঙ্গে একজন হুবলির  ইনকাম ট্যাক্স অফিসার ভটচায্যি ,তিনি কোনোদিন একটা বক ও মারেন নি,কিন্তু ওর বসের বসের বস তাই একটা বন্দুক নিয়ে চলে গেছেন।আমরা একটা জীপে করে রাঙা বলে একটা নদীর পাশে নল এর বনকে যাকে স্থানীয় লোকেরা ধাড্ডা বলে তার মধ্যে সব ধরণের হিংস্র জানোয়ার থাকে ।সেখানে একটা ছোট্ট ওয়াটার হোল ছিল যেখানে জন্তু জানোয়াররা জল খেতে আসত ।

সেখানে হাতি,মোষ,বাইসনের পায়ের দাগের মধ্যে থেকে সাত্তার ঠিক বাঘের পায়ের দাগ যাকে পাগমার্ক বলে খুঁজে পেয়েছে।সেই বাঘের পায়ের দাগ ফলো করে রাঙানদী পেরিয়ে ডান দিকে যে পাহাড় চলে গেছে সেইখানে নাকি বাঘটা চলে গেছে।আমরা তখন ঠিক করলাম তিরিশ মাইল দুরের বাংলো তে গিয়ে বিকেল বিকেল ফিরে এসে ওখানে বাঘের সন্ধানে বসব।মুস্কিল হল ওখানে ঐ অত উঁচু গাছে  মাচা বাঁধা সম্ভব নয় তাই মাটিতেই সুবিধেমত জায়গায় বসতে হবে।সেইমত আমরা বিকেল বিকেল ওখানে পৌঁছে দুদিকে দুটো দল করে বসলাম।যেদিকে বসলাম সেখানে একটা বাইফারকেশন আছে মানে দুটো এক্সিট পয়েন্ট আছে ।ঠিক করলাম ডানদিকে একদল এর বাঁ দিকে  আর একদল বসবে। বাঁ দিক ওয়াংলি ,ভটচায্যি, ড্রাইভার আর এদিকে আমরা ।

কিছুক্ষণ পরেই বাঘের ডাক শুনতে পেলাম।সঙ্গে সঙ্গে পুরো জঙ্গল কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল ।আমরা বুঝলাম বাঘ পাহাড় থেকে নেমে আসছে।উৎসুক, উৎকর্ণ,উন্মুখ, উত্তেজিত,মানে মনের মধ্যে যাবতীয় উ …।কারণ বাঘ কোন দিক দিয়ে বেরোবে সেটা তো বুঝতে পারছি না ।এদিকে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে ,চারদিক গাঢ় কালো অন্ধকার। এদিকে বাঘ ওদের দিকে এসেছে ,দূর থেকে বাঘ আসার সঙ্কেত পেয়ে লোকাল ড্রাইভার  ভটচায্যি মশাই কে বলছে আরে বাতি জ্বালান,কারণ কথা ছিল বাঘ এলে ভটচায্যি মশাই আলো ফেলবেন এর ওয়াংলি সাহেব গুলি চালাবেন কারন  অন্ধকারে আলো না ফেললে বাঘ মারা যায়না ,কিন্তু সেই ভটচায্যি মশাই ঐ ভাঙা বটগাছের আড়াল থেকে  টর্চের বাতি ফেলবেন কি,ভয়ে উনি বাতিস্তম্ভ হয়ে গেছেন।বাঘ দূরে এসে কিছুক্ষন হেঁটে ,একটু শুয়ে ,সঙ্গিনীর খোঁজে হাঁক ডাকছে।ওদের লাক ভালো ছিল যে হাওয়া উল্টোদিকে বইছিল বলে বাঘ ওদের গন্ধ পায়নি।আমাদের এদিকে বাঘের দেখা নেই,ওদের কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে আমরা তখন ওরা যেদিকে বসেছিল সেদিকে যেতেই একটু দূরে জঙ্গল কাঁপিয়ে বাঘ টা রেগে ডাকতে লাগল।ওই অন্ধকারে কাছ থেকে জঙ্গলের হিংস্র বাঘের ডাক যে না শুনেছে তাকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন।আওয়াজের ঠেলায় মনে হচ্ছে গাছ ফেলে দেবে ।অভিজ্ঞ শিকারি সাত্তার কে জিজ্ঞেস করা হল এখন কি করা যায় ।সাত্তার বলল যেহেতু আমরা গুলি চালাইনি বাঘ তো জানেনা আমরা শিকারি ,তাই সে কাল জল খেতে এখানে সে আবার আসবে ।আজকে আমরা চলে যাই, কাল আবার আসব । তাই ঠিক হল। কেন কে একথা বলতে গিয়ে ওর মুখে টর্চের আলো ফেলে দেখলাম ভয়ে ওর সাদা মুখ ছাই হয়ে গেছে এর সঙ্গে সঙ্গে রাজিও হয়ে গেল, ভাবখানা হল আজ তো এখান থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরি। 

বাংলোয় ফিরে এত কিছুর মধ্যে ইনকরিজিবল ভাল্লিবয় বলল ‘আই হ্যাভ নেভার হার্ড টাইগার কলিং ইন জাঙ্গল ।আই হ্যাভ হার্ড টাইগার কলিং ইন জু ,সো আই মাস্ট গো টুমরো ।‘ এই অকাট্য যুক্তি আমরা মেনেও নিলাম। 

পরের দিন আমরা সবাই গেলাম ।সাত্তার পায়ের ছাপ দেখে দেখাল পরে বাঘটা আমরা যে দিকে কাল বসেছিলাম সেই দিক দিয়েই গিয়েছে ,মানে আমরা কাল আর একটু থাকলেই বাঘটার মুখোমুখি পড়ে যেতাম। যাইহোক আজ কেন  জনসন ওদের বলল ‘ইউ সিট হাফ এ মাইল বিহাইন্ড ‘ বলে ওদের নদীর ঐ ধারে পাঠিয়ে দিল। 

আমরা বাঘের প্রতীক্ষায় স্নায়ু টানটান করে বসে আছি। ঘড়িতে তখন ছটা বাজতে দশ । সেদিন বাঘটা বোধহয়  গতকালের জন্য কেয়ারফুল হয়ে গিয়েছিল,তাই এক দুবারের বেশি গর্জন করেনি। কিন্তু এবারে খুব কাছে এসে চাপা গলায় ডাকল ,আর আমরা একটু দূর থেকে বাঘের সেই রাজকীয় হাঁটা লক্ষ্য করলাম, বাঘের হাঁটা তো খুব সুন্দর। সামনের দুটো পা একটু ভেতর দিকে বেঁকিয়ে হাঁটে বাঘ আসছে ,কিন্তু আমরা মাচায় নয় ,বাঘের মুখোমুখি হয়ে মাটিতে থেকে বাঘ মারব।সে এক আশ্চর্য রোমাঞ্চ আর ভয়ঙ্কর অনুভুতি। ঠিক ছিল সাত্তার বাঘের ওপর আলো ফেলবে আর জনসন গুলি করবে । আমার ধারণা ছিল একে সাহেব তার পর অত বড় অফিসার ,নিশ্চয়ই খুব বড় শিকারি হবে। 

বাঘটা আসতে আসতে সাইলেন্টলি একেবারে কাছে এসে পড়েছে । সাত্তার আলো ফেলতেই বাঘটা আলো দেখে আমাদের দিকে তাকালো। মাঝারি সাইজের বাঘ।বাঘ তাকিয়ে আছে কিন্তু জনসন গুলি করছে না।নার্ভ ফেল করে গেছে।অবশ্য বাঘের সামনা সামনি হলে অতি বড় বীর পুঙ্গবেরও নার্ভ ফেল করে যায়। জনসন অবশ্য শেষ অবধি গুলি করলেন ,কিন্তু তার মধ্যে অমুল্য আট দশ সেকেন্ড দেরি হয়ে গেছে। গুলি বাঘের গায়ে লাগেনি কিন্ত বাঘ প্রায় স্প্রিঙের মত একটা বিশাল স্পট জাম্প দিয়ে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে ঝাঁপিয়ে পালিয়ে গেল। ভাগ্যিস গুলিতে আহত হয়নি ,কারণ সেটা হলে সেদিন আর আমরা কেউ বেঁচে ফিরতাম না। আহত বাঘ ভয়ঙ্কর,আর আশ্চর্যের বিষয় হল বাঘ,লেপার্ড এরা এমন বিচিত্র প্রাণী যে গুলি খেয়ে এরা টুঁ শব্দ না করে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকে,তখন তার মুখোমুখি হলে মৃত্যু অবধারিত। যাই হোক বাঘ মারতে না পারলেও সেবার প্রাণে বেঁচে সেখান থেকে ফিরতে পেরেছিলাম ।

শেষ করার আগে এই শিকারে যাওয়ার আগের ও পরের দুটো ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। শিকারে যাওয়ার আগে বাবা ভল্লিবয়কে একটা চিঠি দিয়ে বলেছিলেন ,’মাই সন ইজ আ বেটার শট দ্যান মি।হি উইল অ্যাকম্পানি ইউ ‘। ভল্লিবয় ফিরে এসে বাবাকে চিঠি দিয়েছিলেন ,’ইফ দিস ইজ ইয়োর সান্স স্ট্যান্ডার্ড,আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইওর স্ট্যান্ডার্ড ইজ।’  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *