নতুন ছবি করার স্বপ্ন দেখতেন | |

নতুন ছবি করার স্বপ্ন দেখতেন

উত্তম কুমার বললেন “আপনি নিজে ছবি ডিরেক্ট করছেন না কেন?…

কমলেন্দু সরকার 

১৭ জুলাই, ২০২১, ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ বইটি টানা পড়ে শেষ করে তরুণ মজুমদারকে ফোন করেছিলাম।, আপনার বইটি পড়লাম। খুব ভাল লাগল। কিন্তু কতগুলো ভুল আছে। উনি বললেন, এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন! আমার ভাল লাগছে। আপনি ভুলগুলো মেসেজ করে দিন।”

মেসেজ করে দিলাম। মেসেজটি ছিল: ভুল: ১। গ্রিফথ– ‘গ্রিফিফ’ হয়ে আছে পৃষ্ঠা ১২৬, দ্বিতীয় খণ্ড।২। শমিত ভঞ্জের প্রথম ছবি ‘হাটে বাজারে’ (১৯৬৭), ‘আপনজন’ (১৯৬৮) নয়। পৃষ্ঠা ১৯৭, দ্বিতীয় খণ্ড।৩। ‘হারীন্দ্রনাথ’ হবে হরীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৩৩৫, দ্বিতীয় খণ্ড তরুণবাবু, পাঠালাম ভ্রম সংশোধন।  আমার প্রণাম নেবেন। কমলেন্দু।

উনি মেসেজ পেয়ে, পড়ে, সঙ্গেসঙ্গে ফোন করলেন। বললেন, “ধন্যবাদ। আমি পরের সংস্করণে ঠিক করে নেব।” হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন আগেও কথা হল, বেশ কিছুক্ষণ। বললেন, “একদিন আসুন।” যাওয়া আর হয়নি। আর কোনদিনই হবে না। কিন্তু আপনার কাজের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ তো হবেই। তরুণ মজুমদারের পুরনো কিছু ছবি এখনও মাঝেমধ্যেই দেখি। ওসব থাক।

তরুণদা, আপনার আত্মজীবনীমূলক বই ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’র দ্বিতীয় খণ্ড শেষ করছেন উত্তমকুমারের মৃত্যুতে। লিখছেন, অন্ধকার স্টুডিও। সেই অন্ধকারে একা আমি চুপচাপ বসে। আজ আর স্টুডিয়োর আলোগুলো জ্বালাবে না কেউ, আমি নিশ্চিত। সেদিন ছিল ২৪ জুলাই, ১৯৮০। আজ চার জুলাই, ২০২২। মাঝে কেটে গেল ৪২টি বছর। আজকেও টালিগঞ্জের স্টুডিও অন্ধকার। তবে আজ আপনি বসে নেই, শুয়ে আছেন শববাহী যানে। সকলেই আপনার শেষযাত্রার অপেক্ষায়।

তরুণ মজুমদার বাংলা সিনেমাজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাঙালি মনকে আপনি বুঝতেন। বাঙালির মনের কথা জানতেন। বাঙালি কি চাই জানতেন। আপনি চলচ্চিত্রে বিনোদনের কথা। সিনেমাকে পণ্য না-করেও কী সুন্দরভাবে জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ছবি করে গেছে। আপনার এই ছবি বানানোর পদ্ধতি কোনও বাঙালি পরিচালকই ধরতে বা বুঝতে পারলেন না। এখানেই আপনি ভিন্ন, এখানেই আপনি বাংলা ছবির একমেবাদ্বিতীয়ম।

সিনেমাপাড়ায় যাওয়ার সময় আপনার সঙ্গে পরিচয়, আলাপ। আপনার নাম বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, অসিত সেন, তপন সিংহ প্রমুখ পরিচালকের সঙ্গে সম্মান এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আপনি ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস লেখা যাবে না, হয়ও না। আপনার ছবি ছিল বাঙালির ছবি, বাংলার ছবি। সোজাসাপটা, স্নিগ্ধ, গ্রামবাংলার মাটির গন্ধমাখা ছিল আপনার ছবিতে। না, শুধুমাত্র গ্রামের মানুষের বা দর্শকদের জন্য ছবি করতেন না। সকলের জন্য, সববয়সিদের জন্য ছবি করেছেন। আপনার তরুণ মজুমদারের ছবি মানুষের মনের গভীরে অন্ধকারকে আলোকিত করেছেন। ষাট বছরেরও বেশি তিনি বাংলা সিনেমার ভাণ্ডার ঋদ্ধ করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন। এখন তো আবার ‘করেছেন’ নয়, ‘করেছিলেন’। আপনি এখন অতীতকাল। তবে, আপনি আপনার মতো থাকুন, বর্তমান ভেবেই বলি।

তরুণ মজুমদার ১৯৪৫ যখন দেশভাগের কারণে কলকাতা আসছেন তখন তাঁর চোখে স্বপ্ন ছিল সিনেমা বানাবেন! তখন তরুণ মজুমদারের বয়স চোদ্দো। ১৯৩১, ৮ জানুয়ারি জন্ম তৎকালীন পূর্ববঙ্গের উত্তরে বগুড়ায়। ঋত্বিক ঘটককের মতো তাঁকেও খুব পীড়া দিত এই দেশভাগ। একদিন রাধা স্টুডিওর একটি ঘরে বসে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, “দেশভাগ আমার কাছে অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমাদের বাড়ি ছিল বগুড়ায়। ছোট্ট শহর। মুসলমানপ্রধান জায়গা। আমরা কখনও হিন্দু-মুসলমান আলাদা করে দেখিনি। কেউই দেখতেন না। তখন সম্পর্ক এমনই ছিল। আমার বা আমাদের  মাস্টারমশাইরা তো ছিলেন বেশিরভাগই মুসলমান। তাঁরা ভীষণই ভালোবাসতেন। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুই  তো ছিল মুসলমান। সেই বন্ধুটি এসে একদিন বাবাকে বলল, ‘আমার মনে হয় আর আপনাদের এখানে থাকাটা ঠিক হবে না, মানে আমাদেরই এবার ভয় লাগছে।’ চলে এলাম। বলতে পারেন, নিরাপত্তার অভাববোধ থেকেই দেশত্যাগ।”

করতোয়া নদী

বগুড়ায় থাকাকালীনই সিনেমা দেখার শুরু। তেমনই লিখছেন তাঁর ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’র ‘গোড়ার কথা’য়, ‘আমার ছেলেবেলাটা যেখানে কেটেছে সেখানে যেতে আজকাল পাসপোর্ট লাগে। সুন্দর সাজানো-গোছানো ছোট্ট একটা শহর। পাশ দিয়ে এক চিলতে নদী— করতোয়া।… নদীর ধারে ছোট্ট সেই শহরটায় ছিল এক জোড়া সিনেমা হল। ‘উত্তরা’ আর ‘মেরিনা।… সেই ‘উত্তরা’ আর ‘মেরিনা’তে আমার সিনেমা দেখার হাতেখড়ি। তখনকার দিনে ছবিগুলোও ছিল অন্যরকম। নেহাৎই সাদা-সাপটা, আপাদমস্তক সারল্যে ভরা। নিউ থিয়েটার্স, বম্বে টকিজ, নয়তো চার্লি চ্যাপলিন। চার্লির ছবি দেখে হেসে গড়াগড়ি যেতাম। নতুন চোখ ওই বয়সে বুঝতেই শেখেনি যে ওই হাসির আড়ালে কত কান্না, কত শ্লেষ, কত প্রতিবাদ লুকোনো। আসলে ছোট ছিলাম তো’।…

এরপর তো পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতা। কলেজজীবন শেষ। চাকরি খোঁজার পালা। কিন্তু না, ওই ফিল্মের পোকা কামড়ালো আবার। তরুণ মজুমদার লিখছেন, ‘… বাড়িতে বলে ফেললাম, সুযোগ পেলে ফিল্মের কাজকর্ম একটু শিখতে চাই’। আপত্তি ওঠেনি বাড়িতে।  বড়মামা ছিলেন তৎকালীন মাসিক ইংরেজি পত্রিকা ‘ফিল্মল্যান্ড’-এর সম্পাদক। উনি সব শুনেটুনে নিরাশও করেননি, আবার উৎসাহও দেননি তেমনভাবে। শুধু একটা সিনেমার বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আগে বইগুলো পড়ো। ওই বড়মামাই নিয়ে গেছিলেন ঝাউতলা রোডের ‘রূপশ্রী’ স্টুডিওয়।

আলাপ হল স্টুডিও-মালিক কেশব দত্তের সঙ্গে। তরুণ মজুমদার হলেন ক্যামেরা বিভাগের অ্যাপ্রেনটিস। “দিনে দু’কাপ চা ছাড়া টাকাপয়সা কিচ্ছু মিলবে না,” সাফ বললেন কেশব দত্ত। সেইসময় রূপশ্রী স্টুডিওয় শুটিং চলছিল অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘সংকেত’ ছবির। সেই প্রথম তরুণ মজুমদার কানে শুনলেন, অল লাইটস, স্টার্ট সাউন্ড, ক্যামেরা, ক্ল্যাপ, অ্যাকশন, কাট, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই শব্দগুলোই সারাজীবন বলতে হয়েছিল পরিচালক তরুণ মজুমদারকে। তবে, খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না। “মাত্র দিন চার-পাঁচ গেছিলাম ‘রূপশ্রী’তে। Cine Technicians Association of Bengal-এর সভ্য ছিলাম না, তাই কাজটা গেল,” বলেছিলেন তরুণ মজুমদার।

এরপরই সিনেমা পাবলিসিটি অফিসে চাকরি। এই অনুশীলন পাবলিসিটি অফিসেই আলাপ-পরিচয়  কাননদেবীর সঙ্গে। সেইসময় কাননদেবীর ‘শ্রীমতি পিকচার্স’-এর ব্যানারে ‘মেজদিদি’ ছবির প্রচারের ভার পড়েছে এই পাবলিসিটি অফিসেরই। পরবর্তী সময়ে কাননদেবীই তাঁর প্রোডাকশনে শিক্ষানবিশ হিসেবে সুযোগ দিলেন তরুণ মজুমদারকে। ছবির কাজে শিক্ষানবিশি আর পাবলিসিটির কাজ সমানতালে চলে। তরুণ মজুমদারের যাতায়াত শুরু হল এক নম্বর রিজেন্ট গ্রোভে কাননদেবীর বাড়ি। এখানেই আলাপ দিলীপ মুখোপাধ্যায় আর শচীন মুখোপাধ্যায়-এর সঙ্গে। ওঁরা দু’জন তখন পরিচালকের হরিদাস ভট্টাচার্যর সহকারী। উনি আবার কাননদেবীর স্বামী। আর তরুণ মজুমদার অ্যাপ্রেনটিস। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। পরে ‘যাত্রিক’ নামে ছবি পরিচালনা দল গঠন।

যাত্রিকের শুরু উত্তম-সুচিত্রার ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৫৯) থেকে। এরপর এই গোষ্ঠীর ‘স্মৃতিটুকু থাক’ (১৯৬০), ‘কাচের স্বর্গ’ (১৯৬২), মোট তিনটি ছবি করে যাত্রিক। ‘কাচের স্বর্গ’-এর তিনবছর পর ১৯৬৫-তে একক পরিচালক হিসেবে তরুণ মজুমদারের আত্মপ্রকাশ। ছবির নাম ‘আলোর পিপাসা’। এই ছবিতেই তিনি পরিচালকের জাত চেনালেন। পরিচালকের নিজস্বতা চেনালেন। বাংলা সিনেমা পেল বাণিজ্যিক কিন্তু সহজ-সরল, পরিচ্ছন্ন ছবির জনক– পরিচালক তরুণ মজুমদারকে।

‘যাত্রিক’-এর প্রথম ছবি ‘চাওয়া পাওয়া’র হওয়ার মূলে উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন। সেইসময় তরুণ মজুমদার ছিলেন কাননদেবীর ‘শ্রীমতি পিকচার্স’-এর অবজারভার। ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’র আউটডোরে তরুণ মজুমদারের কথায় প্রভাবিত হয়ে বলেছিলেন, “আপনি নিজে ছবি ডিরেক্ট করছেন না কেন?… শুনুন ভাল করে, যদি কোনওদিন মনে হয় স্বাধীনভাবে কোনও ছবি করবেন, কথা দিচ্ছি, আমি পাশে থাকব— অবশ্য যদি আপনার চিত্রনাট্যে মানিয়ে যায়।”

ওদিকে দিলীপ মুখোপাধ্যায়কেও প্রায় একই কথা বলেছিলেন সুচিত্রা সেন। দিলীপ মুখোপাধ্যায় সেকথা জানালেন তরুণ মজুমদার, শচীন মুখোপাধ্যায়কে, “আরে! হচ্ছেটা কী? একটু আগে আমাকে ডেকে মিসেস সেনও তো একই কথা বললেন। যদি আমরা একসঙ্গে মিলে কোনও ছবি-টবি করি, তাহলে উনিও আছেন। সম্মানদক্ষিণা অথবা কোনও কিছু নিয়েই কোনও সমস্যা হবে না।”

টাইম ফিল্মস-এর ব্যানারে হল ‘চাওয়া পাওয়া’। পরিচালনা যাত্রিক। তরুণ মজুমদারের ছোট বয়সের স্বপ্ন, হল সত্যি। ছবির কাহিন, চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। ছবি মুক্তি পায় ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৯, রূপবাণী, ভারতী, অরুণা-সহ ১২টি প্রেক্ষাগৃহে। ছবি হিট। চলেছিল টানা ন’সপ্তাহ।

৬ মার্চ, ১৯৫৯, শুক্রবার, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র  ছবির আলোচনায় সমালোচক লিখেছেন, ‘শব্দযোজনার সাহায্যে পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পরিচালকগোষ্ঠী কল্পনা-শক্তির পরিচয় দিয়েছেন৷ মাঝে মাঝে শব্দ দিয়ে তাঁরা যেভাবে নাট্যমুহূর্ত সৃষ্টি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। ‘যাত্রিক’-এর এই প্রথম চিত্রসৃষ্টিতে তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আশান্বিত হওয়া চলে।

এরপর ‘স্মৃতিটুকু থাক’, তারপর ‘কাচের স্বর্গ’। এই ছবিতে অভিনয় করলেন যাত্রিকের দিলীপ মুখোপাধ্যায়। অভিনেতা যথেষ্ট সুনাম হয় তাঁর। এরপর অভিনয়জগতে মনোনিবেশ করলেন। শচীন মুখোপাধ্যায়ও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন ক্রমশ। এমন সময় মুম্বইয়ের বরেণ্য পরিচালক-প্রযোজক ভি শান্তারাম-এর প্রযোজনায় ‘পলাতক’ করার কথা চলছে। “তখন আমি জানতাম না যে যাত্রিক ভাঙবে,” জানিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। তাই ‘পলাতক’ একেবারে নিজে করলেও, তিনি পরিচালনায় ‘যাত্রিক’ই রেখেছিলেন।

পলাতক

‘পলাতক’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অনুপকুমার-এর নির্বাচন নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছিল। কিন্তু তরুণ মজুমদার তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। তার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, “আমি চেয়েছিলাম, এমন একজন কাউকে যিনি দেখতে হবেন ইম্পারফেক্ট। ছবির চরিত্রটাই তো ইম্পারফেক্ট। সুন্দর সর্ব গুণসম্পন্ন নায়ক নিয়ে কী হবে! চিত্রনাট্য লেখার সময় থেকেই আমার মাথায় ঢুকে গেছিল অনুপকুমারের নাম। আর তাছাড়া অনুপকুমারের মধ্যে অভিনয় ছিল। আমি প্রথম ওঁকে দেখি কাননদেবীর শ্রীমতী পিকচার্স-এর ‘দেবত্র’ ছবির শুটিংয়ে। ছোট্ট একটা চরিত্র কিন্তু চমৎকার অভিনয় করেছিলেন অনুপ। যাইহোক, আমাকে এ-ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছিলেন ভি শান্তারাম। ছবি রিলিজের পরের ব্যাপারটা সবাই জানেন।”

বালিকা বধূ

তবে, ষাটের দশকে ‘বালিকা বধূ’ (১৯৬৭) বাংলা বাণিজ্যিক ছবির সমীকরণ, ছাদ ইত্যাদি বদলে দিয়েছিল। মৌসুমীর প্রথম ছবি। সত্তরের দশকের প্রায় শুরুতেই এটাকে প্রসারিত করেছিল ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ (১৯৭৩), ‘ফুলেশ্বরী (১৯৭৪)। এরপর একবারে অন্যরকমের, অন্যধরনের ছবি করলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প নিয়ে ‘সংসার সীমান্তে’ (১৯৭৫) এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে  ‘নিমন্ত্রণ’ (১৯৭২) একেবারে অন্যধরনের ছবি। সত্যজিৎ রায়ের পর তরুণ মজুমদারই করলেন বিভূতি-সাহিত্যের সার্থক চলচ্চিত্রায়ন।

শ্রীমান পৃথ্বীরাজ

আশির দশকে বাংলা ছবির দর্শকেরা একেবারে অন্য তরুণ মজুমদারকে পান। পরিচালক তাঁর ছবির দিক পরিবর্তন করলেন। আশির শুরুতেই করলেন নবাগত তাপস পাল-কে নিয়ে ‘দাদার কীর্তি’। তারপর শহর থেকে দূরে, মেঘমুক্তি, খেলার পুতুল, অমর গীতি, ভালোবাসা ভালোবাসা, পথভোলা, আগমন, পরশমণি। নয়ের দশকে আবার ছবির বিষয়, প্যাটার্ন বদলালেন পরিচালক। করলেন– আপন আমার আপন, পথ ও প্রাসাদ, সজনী গো সজনী, কথা ছিল, একুশ শতকের শুরুতে— আলো, ভালোবাসার অনেক নাম, চাঁদের বাড়ি, ভালোবাসার বাড়ি।

দাদার কীর্তি

তরুণ মজুমদার তাঁর ছবির মধ্যে প্রধানত বাঙালি সমাজ এবং বাংলার সংস্কৃতির কথা বলেছেন। সেই তরুণ মজুমদারের ছবি বাঙালির ছবি হয়ে ওঠে। প্রায় সমসাময়িক পরিচালক তপন সিংহ একবার বলেছিলেন, “তরুণ মজুমদারের ছবি বাঙালিকে আনন্দ দিয়ে এসেছে, আসছে। তিনি বাংলার বাইরেটা  দেখার খুব বেশি চেষ্টাও করেননি।” তরুণ মজুমদারের বেশিরভাগ ছবিই সাহিত্য-নির্ভর। তিনি জানতেন বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে রয়েছে মণিমুক্তো। তার মধ্যে থেকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। তাই তো বাংলা সিনেমাপ্রেমীরা এখনও পছন্দ করেন তরুণ মজুমদারের ছবি।

তরুণ মজুমদার অসুস্থ হয়ে পড়ার কয়েকদিন আগে ফোনে কথা হচ্ছিল। এ-কথা, সে-কথার পর জিজ্ঞেস করলাম,  নতুন কোনও ছবির কথা ভাবছেন? “ভাবছি, পড়ছি, ভালো গল্প পেলে করব। কেউ যদি আসেন তাহলে ভাবব। চেষ্টা করছি। গল্পের খোঁজ করছি।” সংবাদপত্রে পড়লাম আপনি নাকি হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও ছবি করার কথা ভেবেছেন! কী অদম্য আপনার ইচ্ছাশক্তি! বিস্মিত হই, অভিভূত হই!

সিনেমাজীবনে কোনও অতৃপ্তি আছে? এখন মনে হয়, এটা করা হল না, ওটা হল না? “ছবিরজগতে কম দিন তো হল না, বছর ষাট-পঁয়ষট্টি কেটে গেল। যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি,  সান্নিধ্য পেয়েছি, তাঁদের খুব মিস করি। বয়সে ছোট বলে কীভাবে যে আগলে রাখতেন, স্নেহ করতেন, সেসব ভাবি।”

আপনার ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ পড়লাম। ভাল লাগল। তবে যেখানে শেষ করেছেন, মনে হল, আরও কিছু লেখার বাকি আছে। তরুণ মজুমদার বললেন, “আপনার ভাল লেগেছে, শুনেই আমার ভাল লাগল। তাহলে পেরেছি। হ্যাঁ, আরও লেখার আছে। ইচ্ছে আছে তিন নম্বর খণ্ডটি করার, জানি না শেষ করতে পারব কিনা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *