গ্র্যাফিক্স-সৌরভ হাজারী

তিন নারী হাতে তরবারি

বাবা কে?প্রেমিকের আত্মহত্যা,লাঞ্ছনার প্রতিবাদ,মিডিয়া ট্রায়াল…

পিয়া ঘোষ বন্দোপাধ্যায়

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণ-কর,

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী। অর্ধেক নর।”

সেই কবেই এ লাইন ‘নারী’ কবিতায় লিখেছিলেন নজরুল। কেটে গিয়েছে অনেকগুলো যুগ। আমরা এখন আফগানিস্তানের দিকে আঙুল তুলি ! ওই দেখো, ওরা কেমন বোরখা পরিয়ে , শিকল বেঁধে রেখেছে নারীর পায়ে। ফের তালিবানরা কাবুল দখল নেওয়ায় , হাহাকার উঠেছে বিশ্ব জুড়ে। মেয়েদের ওরা বাঁচতে দেবে তো? এই প্রশ্নবাণ ছুটে এসেছে নানা মহল থেকে। কিন্তু সত্যিই কি এ সমাজ মেয়েদের বাঁচতে দেয়? তাঁদের মতো করে বাঁচতে দেয় কি? প্রশ্নটা করলেই বলা হবে, চরম ফেমিনিস্ট। সব জায়গায় মহিলাগিরি দেখানো! কই বাসের সিটে ‘লেডিস’ থাকলে তো প্রতিবাদ করো না? কিন্তু আপনি কি জানেন, অফিস থেকে ফিরে গোটা সংসারের রান্না করার সময়ও মেয়েরা প্রতিবাদ করে না। কারণ তাঁদের এটাই বোঝানো হয়েছে। এর বাইরে গেলেই সে উচ্ছৃঙ্খল।

এই যেমন নুসরত জাহানের কথাই ধরুন না! কম জল ঘোলা তো হল না তাঁকে নিয়ে ! তা তাঁর দোষটা ঠিক কি? সে অস্বীকার করেছে নিজের বিয়ে। বলেছে, সে মানেই না তাঁর বিয়ে হয়েছে। তাই তাঁর গর্ভের সন্তানের বাবা কে, সেটাও তিনি জানতে বা জানাতে প্রয়োজন বোধ করেন না। নুসরতের সামাজিক স্টেটাস এবং অবশ্যই তাঁর সাবলম্বী জীবন তাঁকে এই সাহস জুগিয়েছে। সমাজের উল্টো স্রোতে কথা বলেও, দিব্যি একটা ফুটফুটে সন্তানের হাসি মুখ দেখা যায়, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে কত পুরুষ-মহিলারাও প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, ‘বাবা কে?” কই কোনও বাবার কোলে সন্তান দেখলে তো প্রশ্ন করেন না, মা কে? কারণ সমাজ আপনাকে শেখায়নি ‘মা’-এর অধিকার কাকে বলে ! আর ঠিক এই কারণেই আপনি বা আপনারা জানতে ব্যস্ত থাকেন পুরুষ ঔরসটা এল কোথা থেকে ! না,  এ আপনার দোষ নয়। এ ওই গবু গড়ের হবু চন্দ্র রাজার দোষ। তিনি যদি জানতেন, বাবা নিয়ে এত কথা হবে, তাহলে বাবা শব্দটাই তৈরি করতেন না। এবার ভাবুন হবু চন্দ্র বেটা আবার কোথা থেকে এল, বাবা শব্দের সঙ্গে কি সম্পর্ক ! কারণ ভেবে কিছু একটা খুঁজে কটুক্তি করাই তো কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এতো গেল বাবা হওয়ার গল্প ! মা হওয়ার গল্প কে আর কবে শুনেছে ! মেয়েরা পৃথিবীতে ভীষণ স্বাধীন। মেয়েরা পড়তে পায়। প্লেন চালায়। দেশ চালায়। স্বাধীন নয় মানে? কিন্তু মেয়েরা মদ খেলে আজও কথা শুনতে হয় বইকি। বাড়ির ছেলে মদে মাতাল হয়ে বাড়িতে এসে বউ পেটালেও, ওসব হতেই পারে! কিন্তু যদি বউমা কখনও মদ খেয়েছে তবে, সব শেষ! এই যেমন বাদ যান না পরীমনিও। মদ খাওয়া এবং বাড়িতে রাখা। তাও দেশের কথা , দশের কথা ভুলে! ট্রোলড, জেল, অপমান ! যা যা করা যায় করে ফেলো। এই তো সুযোগ! ছাড়া যায় নাকি ! পারলে জানে মেরে ফেলো! তাও ঠিক!

এরপরের আমরা আবার হা হুতাশ করবো, ‘আহারে আফগানিস্তানের মেয়ে গুলো বাঁচবে তো !” সত্যি না নিজেদের দিকে কবে তাকাবো আমরা? আসলে কি জানেন নুসরত ও পরীমনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন গোটা সমাজের দিকে। পুরুষতন্ত্র বলে যে বিষয়টা এখনও দারুণ ভাবে তলে তলে চলছে, তার মুখে সপাটে চড় মেরেছেন। আর এটাই সহ্য হচ্ছে না ! লক লকে জিভে লোভনীয় খবর ও শরীরের মেদ চাটতে চাটতে আপনারা চর্বি বাড়িয়েছেন। নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করছেন।

 আমাদের দেশে ধর্ষণ দিন দিন বাড়ছে ! পুড়িয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে মেয়েদের! নির্ভয়াদের বিচার পাইয়ে দিতে বাবা-মাকে সর্বহারা হতে হচ্ছে ! আচ্ছা সমাজটা কি এমনই ছিল ! মা ঠাকুমারা যে গল্প বলেন, কই তাতে তো শুনি না এমন কোনও ভয়ের কথা ! কিম্বা সাহিত্যের মেয়েরাও তো দেখি কত সাবলম্বী ! তবে সে সব কি নিছক গল্প গাঁথা ! হয়ত সবটা নয়। যেমন মেয়ের পাইলট হওয়ার গল্প ফলাও করে বলা হয়! ঠিক সেভাবেই ধামা চাপা দিয়ে দেওয়া হয় মেয়ের সঙ্গে হওয়া যৌন নির্যাতনের কথা ! আমরা পড়েছি, উপমহাদেশের নারীরা খুব স্বাধীনচেতা, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী ছিলেন। শুনলে মনে হওয়া স্বাভাবিক, পুরুষতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও তখন ছিল না। মনে করা হয়, অবাধে খোলা চত্বরে বসে স্ত্রী-পুরুষ একত্রে জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা-তর্ক করতে পারতেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল, যে সম্পর্কে প্রখ্যাত গবেষক সুকুমারী ভট্টাচার্যি বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, প্রাচীনকালে, বিশেষ করে বৈদিক যুগের শেষ দিকে, ভারতীয় উপমহাদেশের নারীরা প্রচুর পরিমাণে অবদমিত হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে। আর এই অবদমনের ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে শাস্ত্রীয় ও সাহিত্য গ্রন্থ এবং ঐতিহ্যে-কিংবদন্তিতে। সবচেয়ে বড় প্রমাণ সেই যুগের অন্যতম প্রধান ব্রহ্মবাদিনী, বিদুষী গার্গী এবং তাঁর প্রতি পুরুষ পণ্ডিতের ব্যবহার। খ্রিস্টের জন্মের ৭০০ বছর আগে জন্ম তাঁর। শুধু জ্ঞান সাধনা ও চর্চায় ডুবে থাকার সংকল্প নিয়ে আজীবন অবিবাহিত ছিলেন বচক্নু ঋষির এই ব্রহ্মবাদিনী কন্যা গার্গী। গার্গী নামক এই জ্ঞানতাপসীকে বলা যায় অধুনিক শিক্ষিতা নারীর, বিশেষ করে অবিবাহিতা পেশাজীবী নারীদের পথিকৃৎ, যাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ মহা ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেছিলেন, “স্তব্ধ হও”। আবার জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব কফি আনান ২০০৬ সালে ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর উইমেন (UNIFEM)-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘোষণা করেছিলেন:

 “নারী ও বালিকাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি পৃথিবীব্যাপি বিরাজমান সমস্যা। সমগ্র বিশ্বজুড়ে তিন জন নারীর অন্তত একজনকে মারা হয়েছে, জোরপূর্বক যৌনক্রিয়া করতে বাধ্য করা হয়েছে, বা অন্য কোনভাবে তার জীবনে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে যেখানে নির্যাতনকারী কোনভাবে তার পরিচিত ছিল।” আসলে সমস্যাটা তখনও ছিল , এখনও আছে। ওই সবাই নুসরত, গার্গী বা পরীমনি হয়ে উঠতে পারেননি। কারণ সমাজ তার আগেই মেয়েদের পায়ে মোটা শিকল বেঁধে দেয়। যদিও এই শিকল আতসকাঁচ দিয়েও দেখা সম্ভব না।

যাক গে সে সব কথা ! মেয়েরা তো কম করে ভালোবাসার স্বাধীনতা পায় আজকাল। এটাই বা কোথায় হয়। ওই যে ভালোবেসে নীনা গুপ্তা যখন মাসাবাকে জন্ম দেন, তখন সমাজ চোখ তুলে চায় ! কিন্তু ঔরস কার জানার পর আর সমালোচনা নেই। এ কি কম কথা ! নুসরত জানিয়ে দিলেই লেঠা চুকে যাবে ! কিন্তু অপমান গুলো, যা আপনারা নিজেদের করেছেন, সেগুলো কি করে গিলবেন? ভাবুন , ভাবুন। সত্যিই, আমার দেশে মেয়েরা ভালোবেসে আকাশে ওড়ে। কিন্তু যদি নেশা করে প্রেমিক আত্মহত্যা করেন, তবে কিন্তু মেয়েদের রিয়া চক্রবর্তী বানাতে আমরা দু’বার ভাববো না! সবাই ভেবেই নেবো, রিয়াই মেরেছে সুশান্তকে। টাকার লোভে! মেয়েটা প্রেমিক হারানোর শোক ভোলা তো দূর, বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে জেলে পাঠাবো। বলির পাঁঠা বানাবো। ফেসবুকে ডাইনি, খারাপ পাড়ার মেয়ে, আরও কত কি লিখে ফেলবো ! মেয়েদের দেখলেই বলবো, তুমি আবার রিয়ার মতো হবে না তো? মিম বানাবো ! কিন্তু যখন জিয়া খান আত্মহত্যা করে ! বা দিব্যা ভারতী ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয়, আমরা কিন্তু তাঁদের প্রেমিক বা স্বামীকে কাঠগড়ায় তুলি না! কারণ তারা পুরুষ সিংহ ! তারা এমন খারাপ কাজ করতেই পারে না ! করলেও মানতে পারে না ! তাই নরম মাটি পেলেই পাথর পুঁতে দাও।

রিয়ার মতো কত মেয়েকেই রোজ সব দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে হয়, তার ইয়ত্তা নেই। তবে ভাববেন না, এ শুধু পুরুষরাই ভাবে ! আমাদের সমাজের মেয়েরাও কিন্তু কম যান না! তাঁদের ছোট থেকে এমন সামাজিকতার পাখি পড়ানো হয়, তাঁরাও বলে নুসরত খারাপ। প্রমাণ, ফেসবুকের কমেন্ট ! লজ্জা হয় ভাবলে, একটা মেয়ে হয়ে কি করে অন্য মেয়ের স্বাধীনতাটুকু মানতে চাইছেন না! কেন চাইছেন না? চেয়ে দেখুন একবার! আপনিও পারবেন নিজের সব বাধা পেরিয়ে যেতে ! পাপ বোধ হবে না আপনার। স্বামীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নিজেকে অসতী মনে হবে না! কুলটা ভাববেন না নিজেদের ! জন্ম নেবে না মা-হীন সন্তান ! অনাথ আশ্রম ভরে যাবে না কুড়িয়ে পাওয়া দুধের শিশুতে। তুলে দিন ‘অবৈধ’ কথাটা! হ্যাঁ, হ্যাঁ মেয়েদের বলছি, যা যা অবৈধ সব তুলে দিন! আগে প্রশ্ন করুন, কে বলেছে এটা ঠিক? আপনি ভুলটাই করতে চান! তার মানে আপনি উশৃঙ্খল এমন নয় ! ইচ্ছের স্বাধীনতা দিন শুধু মাত্র ! ঘুমিয়ে থাকুন না একদিন, এক সপ্তাহ বা এক মাস দুপুর ১২টা পর্যন্ত ! কেন বাড়ির মেয়ে বা বউকেই সকালের চা করার জন্য উঠতে হবে! একদিন বা একমাস কাজটা অন্য কেউ করুক না! খিদে এমন জিনিস না,সবাই গুঁতোয় পড়লে সব পারে! মেয়ের জন্য কিছু আটকে থাকবে না! দিন, দিন ইচ্ছেকে ডানা মেলতে দিন।  দোষ কিন্তু কারও হবে না! নয়তো, সমাজটাই গোল্লায় গেছে বলে সেই নুসরত, পরীমনি বা রিয়া বানানো হবে আরও হাজারটা মেয়েকে ! তারপর ফের সেই চায়ের আসরে, ‘আফগানিস্তানের মেয়েরা বাঁচবে তো?’ প্রশ্ন তুলেই সব শেষ! যৌনতায় চেপে বেঁধে রোজ পরাধীন করা হবে ভীষণ স্বাধীনচেতা কোনও এক নারীকেই! আবারও বলি দোষ কিন্তু কারও নয়, সব দোষ ওই গবু গড়ের হবু চন্দ্র রাজার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *