গ্রামের বাড়ির দুর্গাপুজো

গরুর গাড়ি,শিবাই নদী,সপ্তমীর কলাবউ স্নান,হাসিমুখে একসাথে বসে খাওয়া খিচুড়ি-ছেঁচড়া-পায়েস-চাটনি,সন্ধিপুজো,আগের দিন রাত্রে সবজি কেটে রাখা হয়। গ্রামের মহিলারা এসে আলু কুমড়ো কাটতে বসে…

কৌস্তভ ব্যানার্জি

আমার আদি বাড়ি বর্ধমানের খুব ছোট্ট একটা গ্রামে, নাম ছোট পুরুলিয়া।  এতই ছোট যে তার নামের আগে ছোট শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। এই গ্রামটির সাথে পুরুলিয়া জেলার কিন্তু কোন সম্পর্ক নেই।

কর্মসূত্রে আমার ঠাকুরদাদা কলকাতা চলে এসেছিলেন বলে আমাদের  গ্রামের বাড়ি যাওয়াটা বিয়ে পৈতে আর পূজা পার্বণ এর মধ্যে দিয়ে ই টিকে আছে। খুব ছোটবেলায় অবশ্য গরমের ছুটিতেও যেতাম। আমার ছোট দাদুর পরিবার এই গ্রামের বাড়িতেই থাকেন এবং চাষবাসের দেখাশুনা করেন। যদিও ছোট দাদু মারা গেছেন আজ বেশ কবছর হলো। আজকে সেই দুর্গা পুজোর সময় দেশের বাড়ি যাওয়ার গল্প শোনাই ।

এই গল্পের মূল প্রেক্ষাপটটা ১৯৯৭-৯৮ সময়কালের। তবে ছবিগুলো কিন্তু অত পুরোনো নয়। সেই সময় আমাদের কলকাতার বাড়িতে টেলিফোন ছিল না। আর দেশের বাড়িতে টেলিফোন তো দূরের কথা কারেন্টই ছিল না। দুর্গাপুজোর একমাস আগে একটা চিঠি যেত গ্রামের বাড়িতে, অমুক দিন অমুক সময় স্টেশনে যেন গাড়ি থাকে, মানে গরুর গাড়ি আর কি। আরও একটা কি দুটো চিঠি যেত কলকাতারই বাকি আত্মীয়দের বাড়িতে, জানানো হতো যাওয়ার দিনক্ষণ । চিঠি পৌছবে ধরে নিয়েই নির্ধারিত দিনে আলো ফোটার আগে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম।খিদিরপুর থেকে প্রিন্সেপ ঘাট বাবুঘাট হয়ে গঙ্গার হাওয়া খেতে খেতে আপাত বিরল ট্যাক্সির বিলাসিতা উপভোগ করতে করতে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে যেতাম।

মা যেত টিকিট কাটতে তার কারণ মহিলাদের লাইনটা ছোট থাকতো। আর বাকিরা বাবার নেতৃত্বে লট বহর নিয়ে ট্রেনের সিট ধরতে যেতাম। এই সিট বাছার কাজটা খুব সহজ ছিল না। কোনদিকে রোদ্দুর পড়বে, জানলার ছিটকিনি আর জানলা দুটোই কাজ করছে কিনা, চিরুনির সাহায্য ছাড়া পাখা চলছে কিনা, বেশিরভাগ স্টেশনে বগির সামনে খাবার জলের কলটা পড়বে কি পড়বে না এইরকম কত কি মাথায় রাখতে হতো। আমাদের বড় দলের বাকি সদস্যরা স্টেশনে এসে একত্রিত হতো। হাতে প্রচুর সময় রেখে বেরোনোর পরেও প্রত্যেকবারই ট্রেন ছাড়ার সময় একটা মারাত্মক হুড়োহুড়ি চলত। কেউ হয়তো এসে পৌঁছয় নি বা কেউ বগি খুঁজে পাচ্ছে না কিংবা কারো হয়তো টিকিট কাটা হয়নি। এইসব এর পরেও ঠিক ৬:৩৬ এ লাল রংয়ের আজিমগঞ্জ প্যাসেঞ্জার যখন দুলে উঠতো, মা ঠাকুমার হাতটা জোড়া করে কপালে ঠেকত।

ট্রেন ছাড়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে চোখে হাওয়া লাগতেই ঘুমিয়ে পড়তাম, খুব ভোরে ওঠার ফল আর কি। ঘুম ভাঙতো ব্যান্ডেল স্টেশনের কোলাহলে। শহরতলী পার করে ট্রেন তখন ধান ক্ষেতের মধ্যে পড়বো পড়বো। কুন্তীঘাট এ নদীটা দেখতে পাওয়া, রকমারি স্টেশনের নাম চটজলদি পড়তে পারি কিনা, কাছের ইলেকট্রিক পোস্টগুলো কেন তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছে আর দূরের গাছগুলো কেন আস্তে আস্তে যাচ্ছে এইসব সাত পাঁচ দেখতে দেখতে আর ভাবতে ভাবতেই মিষ্টি ওয়ালা এসে যেত। সে এক জম্পেশ বাঁধাধরা লোক ছিল। সে জানতো পুজোর ঠিক আগের শনি-রবিবার কিংবা পঞ্চমীর দিন এই ট্রেনে আমরা থাকবো ই । ট্রেনে ওঠা হরেক রকম খাবারের মধ্যে এই মিষ্টি আর বড়জোর বাদাম  আমাদের খেতে দিত। খাওয়ার পরে ডালডার টিন কেটে বানানো অদ্ভুত দর্শন জলের জগ থেকে মিল্টনের বোতলে জল ভরে নেওয়া হতো। স্টেশনের ছাপোষা কল থেকেও নির্দ্বিধায় জল ভরে খাওয়া হতো। কল গুলো এখনো আছে তবে জলটা আমরা সবাই প্রায় কিনেই খাই।

অতঃপর প্রায় বারোটা নাগাদ আমরা কাটোয়ায় পৌছাতাম। এখানে ডিজেল ইঞ্জিন বদলে কয়লার ইঞ্জিন করা হতো। বাবার হাত ধরে সেটাই দেখতে যেতাম সঙ্গে এক হাঁড়ি মিষ্টি। আসলে আমরা যে স্টেশনে নামবো সেই শিবলুন একটা হল্ট স্টেশন ছিল। তার না আছে প্ল্যাটফর্ম আর না সেখানে ট্রেন দাঁড়াতো বেশিক্ষণ। তার মধ্যেই সমস্ত মালপত্র কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে কাঠের ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে হতো সবাইকে। তাই মিষ্টির হাঁড়ি টা গার্ডের হাতে দিয়ে বলা হতো দাদা বছরে একবার আসি, সঙ্গে অনেক মালপত্র , একটু বেশিক্ষণ দাঁড়াবেন।


পড়ুন: চেনা অচেনা লক্ষীপূজোর গল্প


কাটোয়া থেকে ট্রেন ছেড়ে অজয় নদী পেরিয়ে শিবলুন স্টেশন আসতো। শিবলুন পৌঁছে হুট পাট করে নেমে পড়তাম। ট্রেনটা স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেলে শঙ্কা ভরা চোখে দেখতাম গরুর গাড়ি এসেছে কিনা। এক ছুটে পৌঁছে যেতাম গরুর গাড়ির কাছে। সে অবশ্য নামেই গরুর গাড়ি, আদতে মোষ দিয়ে টানা হতো। দুই চাকার ঠেলা গাড়ি, মাঝ বরাবর লাগানো থাকত নৌকার ছইয়ের মত টোপর আর তার নিচে কম্বল চাপা খড়ের গদি। মালপত্র পিছনে বেঁধে মোষের ঘাড়ে জোয়াল ফেলতেই দৌড় লাগাতো গাড়ি। সবুজ ধান ক্ষেতের বুক চিরে চলে যাওয়া ইউক্যালিপটাস এর ছায়া ঘেরা লাল মোরাম রাস্তা, পাশে শিবাই নদী। চলতি কথায় কাঁদর ।

সে আমলে আমাদের গ্রামে গুটিকয়েক পাকা বাড়ি ছিল মাত্র। বাড়িটা দৃষ্টিগোচর হলেই দেখতাম সোয়া ছ ফুট লম্বা আর সোয়া কুইন্টালের আমার ছোটদাদু, রোয়াক এর উপর দাঁড়িয়ে মাথার ওপর ছড়ি তুলে চিৎকার করে বলছে রাজা বাবু এসে গেছে ডুডুম কাঁইনানা। ঢোল কাঁসির এই শব্দ টা দাদু মুখ দিয়েই করত চরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।

বাড়ি ঢুকে একছুট্টে সবাইকে প্রণাম করতে শুরু করে দিতাম। বড়োরা অবশ্য বাড়ি ঢোকার আগে পঞ্চাশ গজ দূরে ঠাকুরবাড়িতে প্রণাম সেরে আসতো।

এবার বাড়িটার একটু বর্ণনা দিয়ে দিই। পুব মুখো বাড়ির সামনে একটা পুকুর, নাম কালি সাগর। পাঁচ ফুট উঁচু রোয়াক, এর পরে ছিল বৈঠকখানা ঘর। বৈঠকখানা ঘর পেরিয়ে এলে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর এক বিশাল দালান। তার উত্তর দিকে সার দেয়া ঘর আর দক্ষিণ দিকে উঠোন, রান্নাঘর, কলতলা ইত্যাদি। দুই কামরার রান্নাঘরে সারি সারি মাটির উনুন থাকতো। উঠোনের দক্ষিণ দিকে আছে ধানের গোলা আর গোয়ালঘর। সেখানে খুব সাপের উপদ্রব বলে আমাদের যাওয়া বারণ ছিল। বাড়ির সামনে একটা গরুর বাথান ছিল দিনের বেলা গরু মোষ রাখার জন্য। বৈঠকখানা ছাড়াও আরো একটা খিরকি আরেকটা দেউড়ি দরজা আছে বাড়িতে তবে সে দরজায় খিল পড়তে কোনদিন দেখিনি। দোতলার অর্ধেকটা জুড়ে ঘর আর বাকিটা খোলা ছাদ। বাড়ির পিছন দিকে ছোট কাঁদর আর তারপরই যতদূর চোখ যায় সবটাই ধানের জমি। গ্রামে তখনও কারেন্ট আসে নি তবে পূজা-পার্বণে জেনারেটর চলত, বাকিটা হ্যাজাক দিয়ে ম্যানেজ হতো। পাখার দরকার খুব একটা পড়তো না। বাড়ির একটু দূরে ছিল ঠাকুরবাড়ি যেখানে দুর্গা, জগদ্ধাত্রী সহ পুজো পর্বগুলো হত।

এবার আসি পুজোর কথায়। খুব অনাড়ম্বর আর ছোট হয়তো আমাদের বাড়ির পুজো কিন্তু নিষ্ঠার গুনে এ পূজার মহিমা আমাদের সবার মনের গভীরে থাকে। বাড়ির ছেলেরা খোলা ছাদে শুতাম। সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে উঠোনে দাঁড়িয়ে টিউবয়েলের গরম জলে স্নান সেরে পরিষ্কার ধুতি পরে পূজার জোগাড় করতে লেগে যেতাম। খুব ছোটতে নৈবেদ্যের থালা বওয়া, আরেকটু বড় হয়ে ফলমূল কাটা এই ছিল কাজ।  এছাড়া ধুনো দেওয়া, কাঁসর ঘন্টা বাজানো, পুজো শেষে প্রসাদ বিতরণ সব মিলিয়ে কোথাও পাত্তা না বাবা আমি তখন ভীষণ ব্যস্ত। সপ্তমীর কলাবউ স্নান করাটা হয় পিছনের কাঁদরে। একটা পালকি আছে যাতে করে আমরা কলা বউ নিয়ে যাই। সকাল থেকেই গ্রামের সবাই এসে নিজের বাড়ির ফুল দিয়ে যায় পুজোর জন্য। অষ্টমীর দিন গ্রামের সবাই প্রসাদ খেতে আসে , তা প্রায় হাজারখানেক লোক। সে এক হই হই ব্যাপার। আগের দিন রাত্রে সবজি কেটে রাখা হয়। গ্রামের মহিলারা এসে আলু কুমড়ো কাটতে বসে । বঁটি অব্দি তারা বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ কোন না কোন ভাবে পুজোয় অংশ নেয় আর কাউকেই তার কাজ বলে দিতে হয় না। কি এক অলিখিত বোঝাপড়ায় সবাই জানে তাকে ঠিক কি করতে হবে। সকলের সঙ্গে হাসিমুখে একসাথে বসে খাওয়া খিচুড়ি-ছেঁচড়া-পায়েস-চাটনির যৎসামান্য সেই প্রসাদই অমৃত সবার কাছে।

পুজোর কথা বললে যেটা না বললে নয় সেটা হল সন্ধিপুজো। মহাষ্টমীর পুজোতে সবাই খুব সচকিত থাকি, কম সময়ের ফেরে কোথাও যেন ভুল কিছু না হয়ে যায়। অবশেষে যখন পুজোর আচার সম্পূর্ণ হয় তখন সবাই চুপ করে প্রার্থনায় বসা হয়। খ্যানের সময়ে সেই নিস্তব্ধতা, সকলের একযোগে প্রার্থনা এবং সবশেষে ছোটদাদুর মা মা বলে ডেকে উঠে নীরবতা ভঙ্গ করে বলিদানের প্রতীকী ভঙ্গি রচনার মুহূর্তে উপস্থিত মানুষের চোখে জল চলে আসা ছিল অবশ্যাম্ভাবী।আমার মত নাস্তিক ছেলেরও গায়ে কাঁটা দিত সেই পরিবেশে।

দশমীতে ভাসান করে তার পরের দিনই ফিরতাম আমরা। গরুর গাড়ির পিছন ধরে কাকারা অনেক দূর অব্দি হেঁটে আসতো। চোখ টলটল করত দুপক্ষেরই।

আবার সেই দীর্ঘ ট্রেন যাত্রার পর বাড়ি ফিরে পোস্টকার্ড ছাড়া হত ‘নিরাপদে পৌঁছে গেছি।‘

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *