কিশোরকুমারের সঙ্গে দু দিন

কিশোরকুমার রিহার্সালে রেকর্ডের সুরে না গেয়ে ,অন্য সুরে শুরু করতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে বলে উঠলাম ,’হচ্ছে না।

সুমন্ত্র মিত্র

আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা।আমাদের রূপবাণী ফ্ল্যাটের সুভাষদা মানে সুভাষ চ্যাটার্জি কলকাতা পুলিশে লালবাজারে কর্মরত ছিল এবং পাড়ার নাটকে বেশ ভাল অভিনয় করত আর আমাকে খুবই ভালবাসত।সেই কারণেই বোধহয় তখনকার দিনে বোম্বে থেকে কোনো বড় সেলেব্রিটি এলে তাঁর,তাঁদের সিকিউরিটির দায়িত্বভার সুভাষদার ওপর পড়ত।

সেবারে পাড়ায় নিচে বল পেটাচ্ছি, সুভাষদা এসে বলল ‘শোন, কিশোরকুমার আর লতা মঙ্গেশকর পর পর দুদিন নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে গাইবেন।তুই তো গান করিস,শুনতে যাবি ?’এহেন প্রস্তাবে না বলে কোন আহাম্মক? কিন্তু আমি বললাম ‘যেতে পারি কিন্তু শুধু স্টেডিয়ামে বসে গান শুনে আসবনা, তুমি যদি পারো একবার ওই দুজনের কাছে গিয়ে প্রণাম করে অটোগ্রাফ নেবো তাহলে যাবI পরমাশ্চর্য্য হয়ে দেখলাম সুভাষদা রাজি হয়ে গেল।  

নির্দিষ্ট দিনে  সকালে আমি অটোগ্রাফ খাতা নিয়ে সুভাষদার স্কুটারের পেছনে বসে পৌঁছলাম গ্র্যান্ড হোটেলে ।সেই প্রথম ফাইভ ষ্টার হোটেলের ভেতরে যাওয়াI সুভাষদার সঙ্গে কিশোরকুমারের ঘরের দরজায় পৌঁছতেই বিপত্তি।পাশের ঘর থেকে কিশোরকুমারের ভাই অনুপ কুমার আর লীনা চন্দ্রভারকারের ভাই অনিলজি সুভাষদাকে জানালেন দাদার ঘর পছন্দ হয়নি,মেজাজ খারাপ,ওনাকে ৪২৬ নম্বরে শিফট করা হয়েছে। সুভাষদা শুনে বলল ‘তুই এখন চলে যা, ওনার মেজাজ খারাপ আছে।তুই এক কাজ কর, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় রিসেপশনে এসে আমার খোঁজ করবি।

কি আর করা যাবে, খুব হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আবার গুটি গুটি গ্র্যান্ডের রিসেপশনে।ইংরেজি বলতে পারতাম বলে একটু সুবিধে ছিল আর ভয়ডর আমার কোনোকালেই নেই। যতটা সম্ভব স্মার্টলি গম্ভীরভাবে রিসেপশনের ভদ্রমহিলাকে বললাম পুলিশ সুভাষ চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি ,উনি কিশোরকুমারের সঙ্গে আছেন। ভুরু কুঁচকে আমায় অপাঙ্গে মেপে নিয়ে বললেন ‘ আমাদের পক্ষে ওনাকে ট্রেস করা ডিফিকাল্ট ,আপনি ওনার সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিন।’আমি তো অথৈ জলে। মানে এবারেও মিস হয়ে গেল।তবু দুরুদুরু বক্ষে ফোন কোথা থেকে করব বলে উনি যেখানে দেখালেন,ঐ ৪২৬ নম্বরটা মনে ছিল।ফোন ঘোরাতেই কিশোরকুমারের গলা ‘হ্যালো’। আমার হাত, হাঁটু সব অবশ হয়ে আসার মধ্যেই বললাম ‘আজ্ঞে আমি সুভাষদার ভাই ,উনি আসতে বলেছিলেন। ‘ কানে এলো উনি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে বললেন ,’তুমি তাড়াতাড়ি আমার ঘরে চলেএসো’ বলে ঘটাং করে ফোন ছেড়ে দিলেন।

হতবাক আমি তখন প্রায় দৌড়ে লিফটে উঠে ৪২৬ মানে যে ফোর্থ ফ্লোর না জেনে ফিফ্থ ফ্লোরে উঠে আবার ফোর্থ ফ্লোরে এসে করিডোর দিয়ে নাম্বার খুঁজে গিয়ে দেখি করিডোরের উল্টোদিকে আমার ঈশ্বর জ্যান্ত কিশোরকুমার সুভাষদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসছেন, আমি গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করতেই খুব স্বাভাবিক ভাবে,যেন আমাকে কতদিন চেনেন সেইভাবে বললেন ‘ তুমি আমার ঘরে গিয়ে লীনা আর সুমিতকে নিয়ে বার্ডওয়ান রুমে এসো ,ওখানে আমার আর লতাজির রিহার্সাল শুনবে।‘বলে হেঁটে চলে গেলেন।আমি সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে ৪২৬ এ বেল দিতেই দরজা খুলে গেল, একজন পরিচারিকা টাইপ জিজ্ঞেস করলেন ‘ক্যা চাহিয়ে’,আমি পত্রপাঠ জানালাম যে আমি লীনাজি কে নিতে এসেছি। উনি আইয়ে বলে ভেতরে ঢুকতেই আবার চমক।হোটেলের ঘরে যে ড্রয়িং রুম থাকতে পারে ,মানে ওই বয়েসে হোটেলের সুইট হয় কি করে জানব।

লীনাজি আর ছোট্ট সুমিতকে নিয়ে বার্ডওয়ান  রুমের দরজা খুলতেই দেখলাম একদিকে সারি বেঁধে প্রায় জনা কুড়ি তিরিশ মিউজিশিয়ান আর তার সামনে সার করা চেয়ারে বসে আমার মা সরস্বতী লতা মঙ্গেশকর আর কিশোরকুমার।উনি আমাদের দেখে ইশারায় পাশে বসতে বললেন। বসার পর আমার মনে হল এরম কল্পনাতীত স্বপ্নও কোনোদিন দেখিনি।মানে পাশাপাশি বসে আছেন মা সরস্বতী লতা মঙ্গেশকর, কিশোরকুমার ,লীনা চন্দ্র ভারকার,সুমিত আর আমি। বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই খালি গলায় ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা ‘ ডুয়েট শুরু হয়ে গেল। কোথা থেকে যে মন্ত্রমুগ্ধের মত সময় কেটে গেল মনে নেই। ডুয়েট রিহার্সাল  শেষ হওয়ার কিছুক্ষন আগে থেকেই লক্ষ্য করছিলাম পাশের চেয়ারে কারা এসে নিঃশব্দে বসছে, তাদের প্রত্যেকের গায়ের টি শার্টে লেখা মেলোডি মেকার্স।

ডুয়েট রিহার্সাল শেষ হওয়ার পর কিশোরকুমার উঠে দাঁড়িয়ে আমায় জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি কি এখন লতাজির সোলো  রিহার্সাল শুনবে না আমার ঘরে আমার রিহার্সাল শুনবে ? ‘পৃথিবীতে এই অপশনের কি উত্তর হতে পারে তখন বিন্দুমাত্র না ভেবে আমি বললাম ‘আপনার সঙ্গে যাব’।

ওনার ঘরে যেতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ওই টি শার্ট পরা ভদ্রলোকেরা সাইলেন্টলি ওনার সঙ্গে যাচ্ছেন।

ওনার ঘরে ঢোকার পর লক্ষ্য করলাম ওনারা বাক্স থেকে নিজেদের বাজনা বের করছেন আর একটু পরেই রিহার্সাল শুরু হয়ে গেল,টিম আগের মত অত বড় নয়, যতদূর মনে পড়ে,পিয়ানো একর্ডিয়ান, গিটার ,ম্যান্ডোলিন ,ঢোল,বংগো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছি।এই সময়ে একটা গানের পর সেই সময়ের ‘তিনমূর্তি’ছবির হিট গান ‘এমন মজার শহর যারা থাকে কলিকাতায় ‘শুরু হতেই আমি লক্ষ্য করলাম উনি রেকর্ডের সুরে শুরু করলেন না ,অন্য সুরে শুরু করলেন, আর আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে বলে উঠলাম ,’হচ্ছে না।’ এই ঘটনার পরে আমার যতবারই এই মুহূর্তের কথা মনে হয়েছে, ততবার হতবাক হয়ে আমি ভেবেছি যে কোন উন্মাদের মত আমি কিশোরকুমারের রিহার্সালে ভুল হচ্ছে বলার সাহস,দুঃসাহস,আস্পর্ধা পেয়েছিলাম।

কিন্তু উনি গান থামিয়ে আমায় খুব আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ভুল হচ্ছে ভাই?’ আমি বলে উঠলাম ‘না মানে. রেকর্ডে তো এমন ছিল না।’ উনি বললেন তাই? রেকর্ডে কেমন ছিল? ‘ আমি বলে উঠলাম গেয়ে শোনাবো? উনি বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ, আর আমি গাইতে শুরু করলাম, আস্তে আস্তে লক্ষ্য করলাম মিউজিশিয়ানরাও অবাক বিস্ময়ে বাজাতে শুরু করে দিলেন।তখন আর আমায় আটকায় কে? আমার ভগবানের গান তারই ঘরে তার সামনে গাইছি ,আর তাঁর মিউজিশিয়ানরা বাজাচ্ছেন।গান শেষ হলে উনি শিশুর মত হাততালি দিয়ে বললেন ‘বা বা ,তুমি তো খুব ভালো গাও. ‘ব্যাস আমার প্রব্লেম সলভ হয়ে গেল।শোনো তুমি আমার গানগুলো এদের নিয়ে রিহার্সাল করবে ,তাতে আমার গলাটার রেস্ট হবে,আর সেই জন্য দুদিন তুমি আমার সঙ্গে স্টেজে দুটো গানে গলা মেলাবে।ঠিক আছে?’বলে একটা বড় ফোল্ডার ফাইল নিয়ে এলেন যেখানে মার্কার দিয়ে গান লেখা আছে, সোফায় নয় কার্পেটে বসে বললেন  আচ্ছা তোমার একটু সাজেশন নিই  কোনগুলো সোলো গাইব ?’ আর আমিও স্ট্রেট ওনার পাশে বসে বললাম,তখন লেট রিয়াকশনে একটু একটু বুঝতে পেরে শিউরে উঠে বললাম’দেখুন আমি বোধহয় পারব না।

উনি জিজ্ঞেস করলেন ‘কেন ?’ এতক্ষনে আমি প্রায় কেঁপে ,কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললাম,কিছু মনে করবেন না ,আমি না বিশ্বাসই করতে পারছি না ,আমি সুভাষদাকে বলেছিলাম আপনাকে প্রণাম করে, অটোগ্রাফ নিয়ে কাল,আর পরশু অনুষ্ঠান শুনবো, সেখানে আপনার সঙ্গে বসে গান বাছা …’ উনি মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পেরে হালকা করে বললেন ‘ও বুঝে গেছি , আমার সম্পর্কে ঐ ম্যাগাজিনগুলোতে লেখে যে আমি খুব মুডি,  তাই তুমি ভয় পেয়ে গেছ. জল খাবে ? দাঁড়াও আমি সুভাষ কে ডাকছি. বলে উনি কাউকে বললেন সুভাষদা কে ডাকতে।আমি তখন একটু ধাতস্থ হয়ে ওনার পাশে,ভয় কেটেছে, উনি ফাইল টা আমার দিকে এগিয়ে দিতে আমি  সভয়ে বললাম ‘আমি তো হিন্দি পড়তে পারিনা,’ উনি বললেন .’তাতে কি হয়েছে ?আমিও তো বাংলা ভালো পড়তে পারিনা।আচ্ছা আমি গানের লাইন বলছি  ‘চলা জাতা হুন’? আমি ‘হ্যাঁ’।এর মধ্যে সুভাষদার প্রবেশ।

কাজের মধ্যে ডাক পড়েছে মানে ভেবেছে বোধহয় আমি কোনো গন্ডগোল করেছি ,তাই একটু কঠিন চোখে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ওনাকে ‘কি হয়েছে দাদা ?’বলায় উনি বললেন ‘আরে তোমার ভাই তো দারুন গান করে ,ও এখন আমার সঙ্গে থাকবে, কাল পরশু রিহার্সাল করবে ,আর স্টেজে আমার সঙ্গে গাইবে।’বলে আমার দিকে চেয়ে কি তোমার কোনও আপত্তি নেই তো ?’ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল ‘আমার নেই, আমার বাবারও নেই।

দুদিন স্বপ্নের মত কেটেছিল। ওনার মিউজিশিয়ানরা গ্লোবের পাশে লিটন হোটেলে উঠেছিলেন।দুদিন সেখানে সকালে রিহার্সাল দিয়ে বিকেলে গিয়ে ওনার সঙ্গে দু দিন প্রথম কিছু লাইন গেয়েছিলাম।ওনার প্ল্যান অনুযায়ী আমি মঞ্চের পাশে নিচে দাঁড়িয়ে।যেই উনি এবাৰ আমার সঙ্গে কেউ গাইবে বলতেই উঠে পড়তাম।যেন প্রথম পরিচয় সেইভাবে নাম জিজ্ঞেস করাতে ঘুরে ঘুরে ছন্দ মিলিয়ে আমার ডাক নাম ‘রঙ্গন, রঙ্গন বলছেন। প্রথম দিন ‘খাইকে পান বানারস ওয়ালা’র মুখড়া আর দ্বিতীয়দিন আরো কঠিন ‘ ইনা মিনা ডিকা’ র মুখড়া গেয়েছিলাম।

আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনের সম্ভবত সব চাইতে অবিস্মরণীয় দুদিন।এখন শুধু একটু আফসোস হয় যে তখন স্মার্টফোন,সোশ্যাল মিডিয়া থাকলে হয়ত ,লাইভ রিহারসিং উইথ দ্য লিভিং লেজেন্ড, সেলফি এইসব তুলে পোস্ট করতাম।আবার মনে হয় ঠিক আছে। নায়ক ছবির শেষ দৃশ্যের শর্মিলা ঠাকুরের সংলাপের মত ,’মনে রেখে দেব।‘                  

1 thought on “কিশোরকুমারের সঙ্গে দু দিন

  1. এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। অসাধারণ অভিজ্ঞতা! মনে রেখে দিও সারাজীবন। মনের থেকে বড় ক্যামেরা, রেকর্ডার আর কিছুই নেই। তোমার তো ভগবান দর্শন হয়ে গেছে। এত সহজেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য, এ তো অকল্পনীয়। অসাধারণ এই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যার একটু ভাগ দিলে, তাতেই আমরা ধন্য হয়ে গেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *