ছবি:পি টি আই

একা

রয়েল বেঙ্গল টাইগারও সাধারণত একা থাকে।

সুমন্ত্র মিত্র

গত ৫০ বছর ধরে পশ্চিমবাংলা তথা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অন্যতম শীর্ষনেত্রী ,গত ১০ বছরের মুখ্যমন্ত্রী,সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র মহিলা নেত্রী যার বিরুদ্ধে কুৎসা, বিদ্রূপ, সমালোচনা,মিমের পাথর কাদা মাখা অবিরাম,অবিশ্রান্ত হিমবাহ ধ্বস কবেই সব সংযমের সীমারেখা পেরিয়ে গেছে। দিনের শেষে সন্ধ্যায়,রাত্রিতে বাড়ি ফিরে তাঁর নিজেকে একা মনে হয় না ?

একজন ৬৬ বছরের ভদ্রমহিলা,সারা পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের এমনকি ভারতের বাইরেরও ‘দিদি’র মনখারাপ,যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার,’কত স্বান্তন কর বর্ষণ সন্তাপহরণে’ কেউ নেই।সেখানে তিনি একদম একা।

বর্তমান ভোটের রাজনীতি এবং এই রণদামামা, প্রায় সারা ভারতবর্ষের অমিতশক্তি নিয়ে আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও একার ক্যারিশমা নিয়ে বলতে হচ্ছে ‘২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী।’

কিন্তু সত্যিই কি তিনি একা ?তৃণমূলে দলে এবং দলের বাইরে ওনার প্রতি সাধারণ,ক্ষেতে কাজ করা ও খেটে খাওয়া মানুষের,বুথ স্তরের কর্মীদের,প্রাজ্ঞ বিজ্ঞ এবং সে অর্থে প্রচারের আলোয় না থাকা বহু অক্লান্ত এম পি,এম এল এ,কাউন্সিলরদের অক্লান্ত নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও শ্রদ্ধা,সরকারি শীর্ষকর্তা,আমলা না থাকলে এই বিশাল কর্মকাণ্ড সামলানো কঠিন নয়,অসম্ভব এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই বরং নেপথ্যে,প্রচারের আড়ালে কাজ অনেক বেশি হয় সেখানে ওনাকে মূল্যবান পরামর্শ নীতি নির্ধারণ সফল রূপায়ণে নিশ্চয়ই সাহায্য করেন।

ওনার মা থাকাকালীন রোজ বেরোবার সময়ে ,এমনকি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও রোজ বেরোবার সময় ওঁর মা ওঁকে ১০ টাকা দিতেন।আর উনি ফিরে এসেই দেখা করতেন।এখন বাড়ি ফিরে কার সঙ্গে দেখা হয় একা ওনার? ওনার মনের গভীর নির্জন বনছায়াস্থলে’যে কথা রয় প্রাণের ভিতর অগোচরে’ সেকথা কাউকে শেয়ার করার কেউ নেই ওনার।

একথা অনস্বীকার্য এমন প্রচন্ড কর্মব্যস্ত ভদ্রমহিলার একা থাকার কথা মনে হওয়ার সময় নেই ,সম্ভবত মনে রাখার কথা কল্পনাও করেন না কারণ সারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তার পাশে আর কিছু বিপক্ষে আছে তাঁর একা লাগার কোনও জায়গাই নেই, অগণিত,অসংখ্য সমর্থকের শ্রদ্ধা,সমর্থন,বিপুল ভালবাসার পাশে সামাজিক মাধ্যমে ‘অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার’ চালানো দলমতনির্বিশেষে বিরোধীরা,সামাজিক মাধ্যমে ওনার মুণ্ডুপাত, সাব অলটার্ন স্টাডিজ ,মার্কেজ,ইংলিশ মিডিয়াম,নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়া,(এসব সত্বেও ইউনাইটেড নেশন্স সহ বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অক্সফোর্ড বক্তৃতা আমন্ত্রণ), কবিতা,ইংরেজি উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে সীমাহীন,অশালীন,কদর্য আক্রমণ ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েও তিনি একা।

ভাবতে ইচ্ছে করে ওনাকে আমাদের বাড়ির আটপৌরে কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার চোখে দেখতে,দিদির মত,মায়ের মত,বয়স্ক স্নেহশীলা আত্মীয়র মত।পারবে কেউ দিনরাত সীমাহীন,অবিশ্রাম নির্মম কটূক্তি সহ্য করে রুখে দাঁড়িয়ে অপরিসীম পরিশ্রম করে যেতে?দিনের পর দিন,মাসের পর মাস,বছরের পর বছর? একা ?

ওনার দল কারুর পছন্দ না হতে পারে,ওনাকে কারুর তীব্র অপছন্দ হতে পারে,যেমন ১৯৮৮ তে জন্ম নেওয়া রিহানা কেন ১৯৮৪ দাঙ্গায় টুইট করেনি ২০০৬ সালে টুইটার আসা স্বত্বেও তেমনি কলকাতা থেকে দিল্লিতে ভারতবর্ষের রাজধানী চলে যাওয়ার সময় উনি কেন প্রতিবাদ করেননি থেকে পশ্চিমবঙ্গের গত ১০০ বছরের দুর্দশার জন্য একমাত্র ওনাকে দায়ী করা যেতেই পারে, কলকাতা ও প্রবাসের এক শ্রেণীর ‘এলিট'(?) বাঙালির উইকেন্ড সান্ধ্যবাসরের ঠাট্রা ইয়ার্কির ‘ভেজা ফ্রাই’ টপিকের অন্যতমও উনি,কলকাতার কাউকে পাকড়াতে পারলে সেই আসর জমে যায় ,’কি তোমাদের দিদির নতুন কি খবর?’ হাস্যকৌতুকে সমালোচনা আর উচ্চারণের মিমিক্রিতে চূড়ান্ত উপহাস অবজ্ঞায় আড্ডা জমে ওঠে। বিরোধিতা,পছন্দ,অপছন্দ,তীব্র সমালোচনা,বঙ্কিম বিদ্রুপ,ব্যক্তিগত বিষয় স্বকণ্ঠে,দ্বিধাহীন,ভয় ভীতি ছাড়া প্রকাশ করা,ফ্রিডম অফ স্পীচ প্রত্যেকের সাংবিধানিক আধিকার,কিন্তু ৬৬ বছরের একজন ভদ্রমহিলা, মাথায় প্রাণঘাতী লাঠির আঘাত সহ্য করে,রাইটার্স থেকে চুলের মুঠি ধরে হিঁচড়ে বের করা,৭০এর দশক থেকে প্রায়  ৫০ বছর রাজনীতি করে বোধহয় আর একটু সন্মান,শালীনতা, সংযম, ভদ্রতা,ভব্যতা আশা করেন।এটা বাঙালি জাতির বোধহয় এক পরম পরিতাপের বিষয়।এবং এখানেও তিনি একা।

সম্প্রতি উনি বলেছেন,’আমি যতদিন বাঁচব,রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত বাঁচব।’ওনার দৃঢ়চরিত্রের সঙ্গে মানানসই কথা,মনে রাখতে হবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও সাধারণত একা থাকে।

নজরুল মঞ্চ থেকে বেরোবার সময় ঝালমুড়ি বিক্রেতার, ভিনরাজ্যে ঘেরাও আটকে পড়া কবির,অশীতিপর বাংলা চলচ্চিত্রের বিপর্যস্ত দিকপাল নায়িকার,সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তী অভিনেতার পরিবারের,যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে থাকা,প্রতিদিন ওনার বাড়িতে সাহায্যপ্রার্থীর জন্য উনি সাধ্যমত আছেন।

শুধু,মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কোনও মমতা বন্দোপাধ্যায় নেই।একা।

.

.

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ:এই লেখা পড়ে কেউ যদি ভাবেন এর উদ্দেশ্য স্বার্থসিদ্ধি,ধান্দা এবং আখের গোছানো,তাহলে এই ভ্যালেন্টাইন আর সরস্বতী পূজা প্রাক্কালে রবিবারের দুপুরে মাংসের ঝোল খেয়ে লেপের আদরে বাঁ পাশ ফিরে প্লিজ দিবানিদ্রা দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *