ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স -

ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স

শুধু পেশাগত সফলতা নয়, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্কের ভারসাম্য।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ব্যাস্ত  সমাজে কর্মরতা নারীর জীবনে ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পেশাগত সফলতা নয়, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতা এবং সন্তানের বিকাশ,এসবকেই নিয়েই আসল জীবনের মান গঠিত হয়। বিশেষত যখন একজন নারী মায়ের জীবনে পেশাগত চাপ, ডেডলাইন এবং পরিবার-সন্তানকে সময় দেওয়া এই সব দায়িত্ব একসাথে সামলাতে হয় তখন প্রয়োজন হয় সচেতন পরিকল্পনা এবং মানসিক শক্তি।

১) পেশাগত কাজ ও ব্যক্তিজীবনের চাপ: বাস্তব চ্যালেঞ্জ

একজন প্রফেশনাল উওম্যান প্রায় প্রতিদিনই ডেডলাইন, সার্কুলার মিটিং, ইমেইল, অফিস,টার্গেট ,ডেডলাইন কমিটমেন্ট এসবের চাপ প্রতিদিন এবং প্রতিনিয়ত অনুভব করেন। একই সঙ্গে সন্তানের হোমওয়ার্ক, পরিবারের খাবার, ঘর-সংসার, আবেগ সহানুভূতি,এসব দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। এই দ্বৈত চাপ কখনও কখনও মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং  হতাশা সৃষ্টি করে।

বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ব্রেনো ব্রাউন  বলেন, “ ইমোশনাল ওয়েলনেস বজায় রাখতে হলে নিজেকে জানা ও এবং নিজের সীমা নির্ধারণ করতে শিখতে হবে  এবং এর একটা লক্ষণরেখা টানা উচিত ।“এই সীমা  তৈরি করার মধ্যেই রয়েছে জীবনের ভারসাম্য রক্ষার প্রথম ধাপ।

২) মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব

মানসিক সুস্থতা বলতে শুধু দুশ্চিন্তা কম থাকাকে বোঝানো হয় না,বরং অভ্যন্তরীণ শান্তি, আত্ম-সম্মান, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেকে সময় দেয়ার সামর্থ্যকেই বোঝায়আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধ ওয়েলনেস এক্সপার্ট।  দীপক চোপড়া  বলেন, “মাইন্ডফুলনেস বা সচেতনভাবে বর্তমান মুহূর্তে থাকা আমাদের মানসিক চাপ কমায় এবং সৃজনশীলতা বাড়ায়।” প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে খুব সহায়ক।“

৩) টাইম ম্যানেজমেন্ট : ডেডলাইন ও পরিবার-সন্তানের জন্য সময়

কর্মক্ষেত্রে ডেডলাইন মানেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজনীয় কাজগুলিকে সঠিকভাবে সাজানো। টাইম ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট ডেভিড অ্যালেন  গেটিং থিংস ডান প্রসেস  আত্মস্থ করতে উপদেশ দেন, যেখানে সব কাজকে ছোট-ছোট ধাপে ভাগ করে সময় বরাদ্দ করা হয়। এর মাধ্যমে কাজের চাপ কমে এবং সময়ও যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিদিনের একটি রুটিন তৈরি করা -যেমন:

সকালে ৩০ মিনিট শুধু নিজেকে (মেডিটেশন/ব্যায়াম/ডায়রি)

কাজের সময় ব্লক করে প্রদত্ত সময় ধরে কাজ

সন্ধ্যায় ১-২ ঘন্টা কেবল পরিবার-সন্তানের সাথে

এই রুটিন মেনে চললে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সুসমন্বয় সহজ হয়।

৪) পরিবার ও সন্তানের সাথে মূল্যবান সময়

পরিবারকে সময় দেওয়া মানে শুধু শারীরিকভাবে সেখানে থাকা নয়—মনোযোগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। সন্তানের স্কুল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, পরিবারের খাবারের সময়ে সকলে একসাথে থাকা—এসব ছোট অভ্যাসই সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। ফ্যামিলি থেরাপিস্ট স্নেহা ঘোষ  বলেন, পেরেন্টাল প্রেজেন্স মানে ইমোশনাল প্রেজেন্স  প্রয়োজন—এতে সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।”

৫. জরুরি টিপস: সুষম জীবন গঠনে অভ্যাস ও প্রবণতা

সীমা ঠিক করুন: অফিসের পর ইমেইল চেক কমান, ব্যক্তিগত সময়কে অক্ষুণ্ণ রাখুন।

ডিজিটাল ডিটক্স করুন: রাতে ফোন/ট্যাব কম ব্যবহার করুন—ঘুম ও মানসিক শান্তি বাড়ে।

শারীরিক সুস্থতা: নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম—এইগুলো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

সহযোগিতা নিন: সংসার বা অফিসের কাজে পরিবারের সদস্যদের সহায়তা নিন—এতে বোঝাপড়া বেড়ে যায়।

নিজের জন্য সময়: প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজেকে কিছু বিশেষ সময় দিন—একটি বই পড়া, সংগীত শোনা বা ছোট-খাটো ভ্রমণ।

৬) সফল নারীর উদাহরণ: অনুপ্রেরণা

বিশ্বজুড়ে বহু নারী সফলভাবে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে সমন্বয় করে চলেছেন। ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা বা চিকিৎসা পেশার মানুষেরা সকলেই বলেন—এটি সম্ভব, যদি পরিকল্পিতভাবে সময় ব্যবস্থাপনা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ও পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বকে প্রতিদিন মূল্য দেওয়া হয়।

শেষ কথা

আজকের কর্মজীবী নারীর হাতে রয়েছে অসংখ্য দায়িত্ব,কেরিয়ার গঠন, পরিবার-সন্তান, মানসিক স্বস্তি। কিন্তু সত্যিকারের ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স তখনই গড়ে ওঠে যখন আপনি নিজের মূল্য বুঝে নিজেকে সময় দেবেন, ডেডলাইনকে পরিকল্পনামূলকভাবে মোকাবিলা করবেন এবং পরিবারের সঙ্গে মানসিক উপস্থিতি বজায় রাখবেন। বাস্তবে এই সামঞ্জস্য গড়ে তুলতে সময় লাগবে, কিন্তু প্রতিদিনই একটু একটু করে এই অভ্যাসগুলো স্থাপন করলে আপনার জীবন হবে সুস্থ, সুন্দর ও পরিপূর্ণ।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *