ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য মানেই কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের ঐতিহ্যগত জীবনযাপনের স্বাধীনতা এবং তাদের জীবনকে নির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দি করে শ্রেণিবদ্ধ ও লেবেল লাগানোর প্রচেষ্টার মধ্যেকার দ্বন্দ্বকেও স্বীকার করা—এ কথা বললেন লেখিকা ও কবি জ্যানিস পারিয়াট। রবিবার (১৮ জানুয়ারি, ২০২৬) হিন্দু লিট ফর লাইফ-এর একটি অধিবেশনে তিনি বলেন, গোটা অঞ্চল জুড়ে মৌখিক গল্পকথার শক্তিশালী ও সূক্ষ্ম পরম্পরা রয়েছে, যেখানে নিহিত আছে আদিবাসী জ্ঞান ও আদিবাসী বিজ্ঞান। অথচ এগুলিকে প্রায়শই লোককথা বলে অবহেলা করা হয়, যা আসলে সংরক্ষণ ও লালনের প্রয়োজন।
প্রকাশক আইয়েনলা ওজুকুমের প্রশ্নের উত্তরে, নিজের উপন্যাস ‘এভরিথিং দ্য লাইফ টাচেস’এ ঘর ও নির্বাসন, আপন হওয়া ও বিচ্ছিন্নতার মাঝখানে চরিত্ররা কীভাবে পথ খুঁজে নেয় সে প্রসঙ্গে পারিয়াট ব্যাখ্যা করেন, তাঁর চরিত্ররা মূলত পৃথিবীকে দেখার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত। তিনি বলেন, “এই বইটি মূলত কিছু প্রশ্ন থেকে জন্ম নিয়েছে ‘কে পৃথিবীর নামকরণ করার অধিকার পায়’, ‘কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে সার্বজনীন বলে চাপিয়ে দেয় এবং অন্য সব দৃষ্টিভঙ্গিকে কুসংস্কার, লোককথা বা নীরবতা বলে দাগিয়ে দেয়?’” ‘ইনসাইডার আউটসাইডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
পারিয়াট আরও জানান, উপনিবেশবাদের ফলে ঐতিহ্যগত জীবনধারা প্রায় মুছে যাওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ব্যাপক জ্ঞানগত সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় বসানো হয়েছে বাইবেলভিত্তিক বিশ্বদর্শন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, তাঁর মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের কাছে ছিল মূলত ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং বহু দিক থেকে “ভারতীয় রাষ্ট্রের দ্বারা আমাদের ভূমির পুনরায় উপনিবেশীকরণ।” ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক আর্কাইভের বিশাল অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে, যেগুলি ফিরিয়ে আনার সহজ বা স্পষ্ট পথ নেই। যদিও অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ, তবুও তা জীবন্ত, জটিল ও প্রাণবন্ত শুধুমাত্র এই কারণেই যে তা অন্যান্য স্থান, ইতিহাস, মানুষ ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রামজীবনের বৈপরীত্য
নিজের ছোটগল্প সংকলন দ্যা লাস্ট ফ্রি নাগা বইতে নাগা জীবনের অন্তরঙ্গতা ও ইতিহাস-রাজনীতির বাইরের চাপের সংঘাত নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে লেখক জিম কাসোম বলেন, তাঁর গল্পগুলির মূল বিষয় নাগা জীবনধারা অনুসরণের স্বাধীনতা—যাকে অনেকেই ভুল করে নাগা সার্বভৌমত্বের দাবি ও রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। আধুনিকীকরণের ফলে পরিচয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাঁর চরিত্ররা সেই পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।এই বইতে ধরা পড়েছে গ্রামজীবনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—একদিকে রোমান্টিক, শান্ত ও স্নিগ্ধ গ্রামজীবন, আর অন্যদিকে আফস্পা (আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট) এবং সেনাবাহিনীর অত্যাচারের অন্ধকার ছায়া, যার মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে অনেক প্রজন্ম।
শেয়ার করুন :





