ফেব্রুয়ারির বাতাসে যখন লাল গোলাপের গন্ধ, চকোলেট আর প্রেমের প্রতিশ্রুতির ছোঁয়া ভাসে, তখন শহর জুড়ে এক বিষাদময় চাপ তৈরি হয়,ভ্যালেন্টাইনস ডে মানেই প্রেমিক বা প্রেমিকা থাকতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভরা থাকে যুগলের ছবি, রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেললাইট ডিনার, আর চারপাশে ভালোবাসার প্রদর্শন। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের আড়ালেই বহু নারী থাকেন, যাঁরা একা,কেউ নিজের ইচ্ছায়, কেউ পরিস্থিতির কারণে। তাঁদের জন্য ভ্যালেন্টাইনস ডে অনেক সময় হয়ে ওঠে আত্মপ্রশ্নের দিন,“আমি কি একা বলেই কম সম্পূর্ণ?”
আসলে একা থাকা কোনো অভাব নয়, বরং অনেক নারীর কাছে এটি এক ধরনের স্বাধীনতা। নিজের সময়, নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের স্বপ্ন এই তিনটি জিনিস একাকী নারীর জীবনে অনেক বেশি স্পষ্ট। কর্মজীবন, সৃষ্টিশীলতা, ভ্রমণ বা নিজের যত্নে সময় দেওয়ার সুযোগ আসে তখনই, যখন ভালোবাসার দায়িত্ব একা নিজের ওপর থাকে। তবুও সমাজের চোখে সিঙ্গল নারী মানেই যেন কিছু “মিসিং”একটি অসম্পূর্ণ গল্প।
ভ্যালেন্টাইনস ডে সেই সামাজিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বন্ধুদের দম্পতি হয়ে রেস্তোরাঁয় যাওয়ার ছবি দেখে অনেক মেয়ের মন খারাপ হয়। কেউ কেউ নিজেকে দোষ দিতে শুরু করেন“আমি কি যথেষ্ট ভালো নই?” অথচ এই প্রশ্নটাই ভুল। সম্পর্কের মধ্যে না থাকলেই যে একজন মানুষের মূল্য কমে যায়, তা তো নয়। ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর রূপ আসলে নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক।
ভ্যালেন্টাইনস ডেতে সোশ্যাল মিডিয়া দেখে মন খারাপ? মনোবিদের পরামর্শ
ভ্যালেন্টাইনস ডে এলেই সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যায় প্রেমিক-প্রেমিকার ছবি, সারপ্রাইজ গিফট, রোমান্টিক রিল ও “পারফেক্ট কাপল” গল্পে। এই সময়ে অনেক একা মেয়ের মন অজান্তেই ভারী হয়ে ওঠে। নিজের জীবনকে অন্যের সাজানো সুখের সঙ্গে তুলনা করে মনে হতে পারে“আমি কি পিছিয়ে পড়েছি?” হার্ভার্ড প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডঃ শ্রীনি পিল্লাই এই প্রবণতাকে বলেন “কম্প্যারিজন ট্র্যাপ ”। তাঁর মতে, আমরা আমাদের বাস্তব জীবনকে তুলনা করি অন্যদের সাজানো সেরা মুহূর্তের সঙ্গে যা মানসিক চাপ ও একাকীত্ব বাড়ায়।বিশ্বখ্যাত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও বই মে বি ইউ শুড টক টু সামওয়ান লেখিকা ডঃ লরি গটিলেব ব্যাখ্যা করেছেন, সম্পর্ক না থাকা মানেই জীবনে কিছু ভুল হচ্ছে এই ধারণা সমাজ তৈরি করে দেয়, বিশেষ করে ভ্যালেন্টাইনসের মতো দিনে।
মনোবিদদের পরামর্শ
ডিজিটাল সীমা তৈরি করুন এই সময় ইচ্ছাকৃতভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমালে মন অনেক হালকা থাকে।
নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না। মন খারাপ হওয়া দুর্বলতা নয় বরং নিজের আবেগকে বোঝার প্রথম ধাপ।
নিজেকে কেন্দ্র করে দিনটি কাটান-নিজের জন্য ভালো খাবার, একা সিনেমা, নিজের যত্ন এসব আত্মসম্মানের অংশ।
সম্পর্ক = সুখ এই ধারণা ভাঙুন।অনেক মানুষ সম্পর্কের মধ্যেও একা ও অসুখী থাকে। সিঙ্গল থাকা মানেই একা নয়।
একজন একা মেয়ে যখন নিজের শরীর, মনের যত্ন নেন, নিজের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেন, তখন তিনি এক নতুন ধরনের প্রেমে বাঁচেন,সেল্ফ লাভ। সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে তাকানো, নিজের শরীরকে সম্মান করা, নিজের সাফল্যে গর্ব করা ,এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ।
ভ্যালেন্টাইনস ডে তাই সিঙ্গল নারীর কাছে হতাশার দিন হওয়া উচিত নয়; বরং এটি হতে পারে আত্মসম্মানের উৎসব। এই দিনটিতে নিজেকে একটি ফুল কিনে দেওয়া, পছন্দের বই পড়া, একা সিনেমা দেখা বা নিজের জন্য সুন্দর একটি খাবার রান্না করা,এসবও তো ভালোবাসার প্রকাশ। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে ভালোবাসা মানে অন্য কেউ, কিন্তু আমরা ভুলে গেছি নিজের কাছেও আমরা একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
আরও একটি সত্য আছে,সব প্রেমের গল্প রোমান্টিক নয়। অনেক নারী আছেন, যাঁরা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন মানসিক আঘাত নিয়ে। তাঁদের জন্য একা থাকা কোনো শূন্যতা নয়, বরং একটি নিরাময়ের সময়। ভ্যালেন্টাইনস ডে তাঁদের মনে পুরনো ক্ষত খুলে দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসা আবার নতুনভাবে শুরু করা যায়, এইবার নিজের থেকে।
ভ্যালেন্টাইনস ডে আসুক আর যাক, সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক ,একজন নারীর জীবন তার নিজেরই গল্প। সিঙ্গল থাকা মানে একা থাকা নয়; মানে নিজের সঙ্গে একটি গভীর, শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা।
আর যদি এবারে এতস্বত্বেও একা লাগে তাহলে মনে করতে হবে যে এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে একা থাকা মানেই আগামী ভ্যালেন্টাইনেও একা থাকতে হবে সেটা তো নাও হতে পারে।
এই ফেব্রুয়ারিতে, গোলাপের পাশে দাঁড়িয়ে একটুখানি আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে বলুন,“আমি যথেষ্ট। আমি সম্পূর্ণ। আমি নিজের ভালোবাসার যোগ্য।”
তুমিই নিজের জন্য যথেষ্ট। কাউকে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই।”- মায়া অ্যান্জেলিউ
শেয়ার করুন :





