কন্যা রত্ন করুন যত্ন -

কন্যা রত্ন করুন যত্ন

আন্তর্জাতিক শিশুকন্যা দিবসে অনন্য অনুষ্ঠান।

মধ্যমগ্রামে শিশু কন্যা দিবস

গত ২৪শে জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শিশুকন্যা দিবস উপলক্ষে মধ্যমগ্রামে এক প্রাণবন্ত ও অর্থবহ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।সুতানুটি সখ্য, মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথে এবং বারাসাত উন্নয়ন প্রস্তুতির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল কন্যা শিশুদের অধিকার, সুরক্ষা ও মর্যাদা নিয়ে সমাজকে আরও সচেতন করা।

মধ্যমগ্রাম পৌরসভা চত্বর থেকে শুরু হয়ে শ্রীনগর গেট নং ৩ পার্কে এসে শেষ হয় এই র‍্যালি। প্রায় ৮৫ জন নারী ও কিশোরী, সমাজকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা একত্রে পথে নামেন। বাল্যবিবাহ, লিঙ্গ বৈষম্য, মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁদের কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়।সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক দিক ছিল র‍্যালির নেতৃত্বে ছিলেন কিশোরীরা নিজেরাই। তাঁরা নিজেরাই স্লোগান লিখেছেন, উচ্চারণ করেছেন এবং সমাজকে প্রশ্ন করেছেন।

র‍্যালিতে ধ্বনিত গুরুত্বপূর্ণ স্লোগানগুলো ছিল-

১। পড়াশুনা আমরা ছাড়ছি না, ১৮-এ বিয়ে করছি না।

২। মেয়েরা পড়ছে তাই দেশটা গড়ছে।

৩। কন্যা সন্তান আশীর্বাদ, বৈষম্য করা অপরাধ।

৪। শিক্ষা আমার অধিকার, কলম আমার হাতিয়ার।

৫। কন্যা রত্ন, করুন যত্ন।

৬। নিজের কথা নিজে বল, ন্যায়-এর পথে এগিয়ে চল।

৭। বাল্য বিবাহ রোধ করি, এসো সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি।

৮। সব শিশুর সমান অধিকার, এটাই মোদের অঙ্গিকার।

৯। সচেতন সমাজ সচেতন দেশ, শিশু নির্যাতন হবে শেষ।

১০। শিশুর কথায় দাও মন, তবেই হবে উন্নয়ন।

এই স্লোগানগুলিই প্রমাণ করে—আজকের মেয়েরা আর নীরব দর্শক নয়, তারা নিজেদের অধিকার জানে এবং দাবি করতেও প্রস্তুত।

আলোচনা সভায় প্রশাসন ও সমাজকর্মীদের বার্তা

র‍্যালির পর আয়োজিত হয় দুই ঘণ্টার একটি জনসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রশাসন, পুলিশ এবং সমাজকল্যাণ দপ্তরের প্রতিনিধিরা কন্যা সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

প্রধান বক্তারা ছিলেন মধুপর্ণা ঘোষ, যুগ্ম সম্পাদক,সুতানুটি সখ্য, কন্যা শিশুদের অধিকার রক্ষায় সমাজের যৌথ দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন।মনোজ সরকার, ডেভেলপমেন্ট অফিসার, কলকাতা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে মেয়েদের ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।শিউলি মিশ্র, লেডি অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর, মধ্যমগ্রাম থানার প্রতিনিধি নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার বিষয়ে মেয়েদের ভয় না পেয়ে পুলিশের কাছে আসার আহ্বান জানান।অন্বেষা গাঙ্গুলি, প্রোটেকশন অফিসার, উত্তর ২৪ পরগনা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দ্রুত রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব বোঝান।সত্য মণ্ডল, বারাসাত উন্নয়ন প্রস্তুতি,লিঙ্গসম সমাজ গড়তে কমিউনিটির ভূমিকার ওপর জোর দেন।সর্বরি মহাপাত্র,মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথে, কিশোরীদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব গঠনের স্থানীয় উদ্যোগগুলোর কথা বলেন।দেবকল্প বসু দাস,আই এস ডাব্লিউ ভাবনা নেটওয়ার্ক এর কাজ ও শিশু বিবাহ রোধে সংগঠনগুলির যৌথ ভূমিকা তুলে ধরেন।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনা

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল মন ছুঁয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ,নৃত্য, কবিতা ও নাট্যাংশের মাধ্যমে ফুটে ওঠে মেয়েদের স্বপ্ন, লড়াই ও আত্মসম্মানের গল্প। প্রতিটি পরিবেশনাই মনে করিয়ে দেয়, কন্যারা কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয় তারা আজকের সমাজেরও শক্তি।সঙ্গীত পরিবেশনে ছিল মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথের তৃষা চৌধুরী,আবৃত্তি – সুতানুটি সখ্যর দেবস্মিতা বিশ্বাস, মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথের চুমকি মজুমদার, দীপ্ত কবিতা পাঠে আই এস ডাব্লিউর জোহারিন বসু। নৃত্য পরিবেশনায় গীতা , কোয়েল ও শাঁওলি মজুমদার।নৃত্যনাট্যে আরাধ্যা বণিক ,এবং মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথের কিশোরীদের প্রাসঙ্গিক ও বার্তাবহ নাটক যেখানে আজকের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের এগিয়ে চলার পথের বাধা আর সংগ্রামের বার্তা দেওয়া হয়েছে।    

এই আয়োজন মধ্যমগ্রামকে কেবল একটি অনুষ্ঠানের শহর নয়, বরং কন্যা অধিকার আন্দোলনের একটি দৃঢ় কণ্ঠস্বর করে তুলেছে।শিশুকন্যা দিবসের এই বার্তা একটাই,মেয়েদের রক্ষা নয়, মেয়েদের সম্মান ও সমান সুযোগই প্রকৃত উন্নয়ন।

পরিশেষে ,এই ধরনের কর্মসূচি আজকের সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন নারী ও কন্যাশিশুর উপর নির্যাতন, বৈষম্য ও সহিংসতা বহুগুণে বেড়ে চলেছে।সুতানুটি সখ্য,মধ্যমগ্রাম সৃষ্টির পথে এবং বারাসাত উন্নয়ন সমিতি পরিচালনায় মধ্যমগ্রামের এই উদ্যোগ শুধু প্রতিবাদ নয়, সমাজকে সচেতন করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিশোরী মেয়েদের সামনে এনে নিজেদের কথা বলার সুযোগ দেওয়াই ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলার পথ। এই রকম সম্মিলিত উদ্যোগই ভয়ের সংস্কৃতিকে ভেঙে ন্যায়, সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে একটি নিরাপদ সমাজ নির্মাণ করতে পারে।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *