ঘুমের সংকট: কেন বাড়ছে অনিদ্রা? সুস্থ ঘুম ফিরিয়ে আনতে বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।
আগে রাত মানেই ছিল বিশ্রাম। এখন রাত মানেই মোবাইল স্ক্রল, অফিসের অসমাপ্ত কাজ, সোশ্যাল মিডিয়া, উদ্বেগ আর পরের দিনের পরিকল্পনা। ফল? বিছানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটলেও চোখে ঘুম আসে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিদ্রা (Insomnia) এখন কেবল একটি ঘুমের সমস্যা নয়, বরং এটি মানসিক স্বাস্থ্য, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কর্মক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে অনিদ্রার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কেন বাড়ছে অনিদ্রা?
বিশ্বখ্যাত ঘুম গবেষক প্রফেসর কলিন এস্পি (ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড) দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন,অনিদ্রা শুধুমাত্র “ঘুম না আসা” নয়, এটি মস্তিষ্কের একটি শেখা আচরণ ( লার্নেড বিহেভিয়ার)। অর্থাৎ, বারবার না ঘুমোতে পারার ভয় থেকেই শরীর ও মস্তিষ্ক বিছানাকে বিশ্রামের পরিবর্তে উদ্বেগের জায়গা হিসেবে চিনতে শুরু করে।
বর্তমান জীবনযাত্রায় কয়েকটি বড় কারণ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
১. ডিজিটাল স্ক্রিনের নেশা -রাতে বিছানায় শুয়ে মোবাইল ব্যবহার এখন প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপ থেকে নির্গত নীল আলো ( শরীরের মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে মস্তিষ্ক বুঝতেই পারে না যে এখন ঘুমানোর সময়।
২. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ -চাকরি, সংসার, সন্তান, আর্থিক অনিশ্চয়তা ,সব মিলিয়ে নারীরা সারাদিনই মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন।দিনের উদ্বেগ রাতে বিছানায় গিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন মস্তিষ্ক “সমস্যা সমাধান মোড”-এ চলে যায়, বিশ্রাম মোডে নয়।
৩. অনিয়মিত জীবনযাপন-একদিন রাত ১০টায় ঘুম, আরেকদিন রাত ২টায় ,এই অনিয়ম শরীরের সার্কাডিয়ান ক্লককে (বায়োলজিকাল ) বিভ্রান্ত করে।
৪. অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও দেরিতে ভারী খাবার-সন্ধ্যার পরে একাধিক কাপ চা-কফি কিংবা রাতের ভারী খাবার ঘুমের গুণমান কমিয়ে দেয়।
৫. হরমোনের পরিবর্তন-নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজের সময় অনিদ্রার ঝুঁকি অনেক বেশি দেখা যায়।
অনিদ্রা শুধু ক্লান্তি নয়
ঘুমের ঘাটতি দীর্ঘদিন চললে দেখা দিতে পারে-স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া,মনোযোগের অভাব,রাগ ও বিরক্তি বৃদ্ধি,উচ্চ রক্তচাপ,হৃদ্রোগের ঝুঁকি,টাইপ-২ ডায়াবেটিস,রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস,উদ্বেগ ও বিষন্নতা।
শুধু “স্লিপ হাইজিন” যথেষ্ট নয়
অনেকে ভাবেন-ল্যাভেন্ডার অয়েল ব্যবহার করলেই হবে,গরম দুধ খেলেই ঘুম আসবে,মেডিটেশন করলেই সমস্যা মিটবে।আসলে বিষয়টি এত সহজ নয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার ক্ষেত্রে বিশ্বের অধিকাংশ চিকিৎসা নির্দেশিকাই CBT-I (Cognitive Behavioral Therapy for Insomnia)-কে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে কেবল ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভর করা সমাধান নয়।
বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞদের ১০টি কার্যকর পরামর্শ
১. প্রতিদিন একই সময়ে উঠুন
রাতে কখন ঘুমোবেন তার চেয়ে সকালে কখন উঠছেন সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ছুটির দিনেও একই সময়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
২. ঘুম না এলে বিছানায় পড়ে থাকবেন না
১৫–২০ মিনিট ঘুম না এলে উঠে অন্য ঘরে গিয়ে শান্তভাবে বই পড়ুন বা হালকা সঙ্গীত শুনুন।
ঘুম পেলেই আবার বিছানায় ফিরুন। এতে বিছানা ও ঘুমের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি হয়।
৩. বিছানা শুধুই ঘুমের জন্য
বিছানায় বসে অফিসের কাজ, সিরিজ দেখা বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন না।
৪. স্ক্রিন কারফিউ
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ও ল্যাপটপ বন্ধ রাখুন।
৫. বিকেলের পর ক্যাফেইন কমান
চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক বা কোলা রাতের ঘুম নষ্ট করতে পারে।
৬. দিনের আলোতে সময় কাটান
সকালের সূর্যালোক শরীরের জৈবঘড়িকে সঠিকভাবে চালু রাখতে সাহায্য করে।
৭. নিয়মিত শরীরচর্চা
হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা ব্যায়াম ঘুমের মান উন্নত করে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে তীব্র ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
৮. রাতের খাবার হালকা রাখুন
খুব দেরিতে ভারী খাবার খেলে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে।
৯. ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না
বিশেষজ্ঞরা বলেন, “আজ আমাকে যেভাবেই হোক ঘুমোতেই হবে”—এই চাপই অনেক সময় ঘুমকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। বরং শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঘুম আসার সুযোগ দিন।
১০. তিন মাসের বেশি সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
সপ্তাহে তিন বা তার বেশি দিন যদি তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে ঘুমের সমস্যা চলতে থাকে, তবে অবশ্যই একজন ঘুম বিশেষজ্ঞ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এর পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়া, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
নারীদের জন্য বিশেষ টিপস
✔ দুপুরের পর অতিরিক্ত চা-কফি কমান।
✔ ঘুমানোর আগে ১০ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন।
✔ প্রতিদিন একই সময়ে রাতের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
✔ শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও নীরব রাখুন।
✔ বিছানায় শুয়ে অফিসের ই-মেল বা সোশ্যাল মিডিয়া না দেখাই ভালো।
✔ রাতে উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার পরিবর্তে সন্ধ্যায় একটি “উদ্বেগ-ডায়েরি” লিখে রাখুন-সিবিটি- আই বিশেষজ্ঞরা এটিকে কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন।
শেষকথা
আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে ভালো ঘুম যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সুস্থ শরীর, সুন্দর ত্বক, স্থির মন, কর্মক্ষমতা এবং দীর্ঘায়ুর অন্যতম ভিত্তি হল পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম।
বিশ্বের শীর্ষ ঘুম গবেষকদের একটি অভিন্ন বার্তা হলো ঘুমকে জোর করে আনা যায় না; বরং এমন পরিবেশ ও অভ্যাস তৈরি করতে হয়, যেখানে ঘুম নিজেই এসে যায়। তাই অনিদ্রাকে অবহেলা না করে, সময়মতো সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং প্রয়োজনে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার সাহায্য নিন। একটি ভালো রাতের ঘুমই হতে পারে আগামী দিনের সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
শেয়ার করুন :





