ডিসেম্বরের শেষে ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনেও এক অদ্ভুত তাগিদ জন্মায়। ‘নিউ ইয়ার রেজোলিউশন’ বা নতুন বছরের সংকল্পের হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু দেখা যায়, জানুয়ারির মাঝামাঝি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই সেই সব প্রতিজ্ঞা ফিকে হতে শুরু করে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য যাঁরা কেরিয়ারের মধ্যগগন, ক্রমবর্ধমান পারিবারিক দায়িত্ব এবং শরীরের হরমোনাল পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন,তাঁদের কাছে আমূল পরিবর্তন অনেক সময় অসম্ভব মনে হয়।
কিন্তু নতুন বছরের সংকল্প মানেই কি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলা? নাকি এটি নিজেকে আরও একটু ভালোবাসার সুযোগ? চলুন দেখে নিই বিশ্বখ্যাত ওয়েলনেস এক্সপার্টরা কী বলছেন-
১) নিজেকে জানার সাহস ও মানসিক প্রশান্তি
মেয়েদের মধ্যে আজকাল এই ‘পারফেকশন’ বা নিখুঁত হওয়ার ইঁদুরদৌড়ে ক্লান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিখ্যাত গবেষক ও লেখক ব্রেনে ব্রাউনের মতে, নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার চেয়ে নিজের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেওয়া অনেক বেশি সাহসের কাজ। উনি বলেছেন “নিজের গল্পকে আপন করে নেওয়া এবং সেই প্রক্রিয়ায় নিজেকে ভালোবাসা হলো জীবনের সবথেকে সাহসী কাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের যোগ্যতা কোনো পূর্বশর্তের ওপর নির্ভর করে না।“তাই নতুন বছরে আপনার সংকল্প হোক সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা। দিনের শেষে অন্তত ২০ মিনিট নিজের মনের কথা শোনার অভ্যাস করুন।
২) রেজের ডায়েটে ফিরে আসুক ঐতিহ্য ও কাণ্ডজ্ঞান
৩০ বছরের পর থেকে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক হার কমতে শুরু করে। এই সময়ে ক্রাশ ডায়েট না করে শরীরের প্রয়োজন বোঝা জরুরি। ভারতের বিখ্যাত নিউট্রিশনিস্ট রুজুতা দিবেকর দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় নারীদের স্থানীয় ও ঋতুভিত্তিক খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
উনি বলেছেন: “খাবার খাওয়া কোনো গাণিতিক হিসাব বা ক্যালোরি গোনার কাজ নয়, এটি হলো স্বাধীনতা ও আনন্দের অভিজ্ঞতা। মনে রাখবেন, ওজন কমানোর চেয়ে শরীরের ফিটনেস এবং এনার্জি লেভেল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ফল, ঘরের তৈরি তাজা খাবার এবং পরিমিত আহারই হলো সুস্থতার চাবিকাঠি।”
৩) সচেতন মাতৃত্ব ও পারিবারিক ভারসাম্য
আজকাল মেয়েদের একটি বড় অংশই ক্রমবর্ধমান সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকেন। মনোবিজ্ঞানী ডাঃ শেফালি সাবারি মনে করেন, সন্তানদের সংশোধন করার চেয়ে মায়েদের নিজেদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক বিবর্তন বেশি জরুরি।আরও জরুরি অনুভব করা যে সন্তান শুনে শেখার থেকে দেখে শেখে বেশি।তাই আপনি বই পড়লে সন্তানের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে,মোবাইল অ্যাডিকশনের ক্ষেত্রেও তাই। আপনারা স্বামী স্ত্রী হাশিখুশি থাকলে সন্তানও হাশিখুশি থাকবে। ডাঃ শেফালি বলেন: “জীবনকে লড়াই করে জেতার চেয়ে অনুভব করা বেশি প্রয়োজন। সচেতন অভিভাবক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের অপূর্ণতাগুলো বোঝা এবং নিজেকে ক্ষমা করতে শেখা। আপনি যখন নিজে শান্ত থাকবেন, আপনার পরিবারও তখন সুস্থ থাকবে।”
৪) শরীরচর্চা: স্রেফ ক্যালোরি পোড়ানো নয়
এই বয়সে হাড়ের স্বাস্থ্য এবং পেশির শক্তি বজায় রাখা খুব জরুরি। বিখ্যাত ফিটনেস এক্সপার্টদের মতে, জিম গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানোর চেয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে কিছু করা বেশি কার্যকর। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ওয়েট ট্রেনিং বা যোগব্যায়াম আপনার হরমোনাল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। সিঁড়ি ব্যবহার করা বা প্রতিদিন ৮০০০ পা হাঁটার লক্ষ্য রাখা হতে পারে আপনার বাস্তবানুগ শুরু।
৫) আর্থিক সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সাফল্যের একটি বড় স্তম্ভ হলো আর্থিক স্বাধীনতা। মেয়েদের উচিত তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সম্পর্কে সরাসরি অবগত হওয়া। একটি ছোট এসআইপি (SIP) বা নিজের জন্য হেলথ ইনস্যুরেন্স করা কেবল আর্থিক নিরাপত্তা নয়, বরং আপনার আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
‘নতুন আমি’ মানে রাতারাতি অন্য কেউ হয়ে যাওয়া নয়। এটি হলো নিজের শরীরের কথা শোনা, নিজের মনের যত্ন নেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় চাপের, স্ট্রেসের কাছে নতি স্বীকার না করা। নতুন বছরের এই যাত্রাটি হোক আত্ম-আবিষ্কারের, যেখানে আপনি নিজেকে জানবেন,ব লাইফ স্টাইল এক্সপার্ট এস্থার পেরেল বলেন, “আমাদের সম্পর্কের গুণমানই আমাদের জীবনের গুণমান নির্ধারণ করে।“আর সেই সম্পর্কের শুরুটা হয় নিজের সঙ্গে।
নিজেকে ভালোবাসো তুমি এবার। হ্যাপি নিউ ইয়ার!
শেয়ার করুন :





