<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>Galpo -</title>
	<atom:link href="https://sukanyadigital.com/category/bongodarpan/galpo/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://sukanyadigital.com</link>
	<description></description>
	<lastBuildDate>Tue, 14 Apr 2026 07:38:09 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.3.3</generator>

<image>
	<url>https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2020/07/cropped-sukanya-magazine-50x50.jpg</url>
	<title>Galpo -</title>
	<link>https://sukanyadigital.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>পাজি ছুঁচো</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-by-sanjib-chattopadhyay-2/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-by-sanjib-chattopadhyay-2/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 12 Apr 2026 13:50:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=10593</guid>

					<description><![CDATA[<p>সরু সুরে চিক্ চিক্ শব্দ করে জানান দেয়, আছি, আছি, তুমিও আছ আমিও আছি, সপরিবারে আছি।...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-by-sanjib-chattopadhyay-2/">পাজি ছুঁচো</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়</strong></p>



<p>অতীতে যখন আমার উচ্চতা মাত্র কয়েক ফুট, তখন থেকেই শুনে আসছি আমি একটি পাজি ছুঁচো। ছুঁচো আমার কাছে আজও তেমন পরিচিত প্রাণী নয়। আশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। সরু সুরে চিক্ চিক্ শব্দ করে জানান দেয়, আছি, আছি, তুমিও আছ আমিও আছি, সপরিবারে আছি। আছি এবং থাকবো। অভাবেও থাকবো, স্বভাবেও থাকবো। ইঁদুরের মতো অতটা অত্যাচারী নই। তবে কি. আমরা একটু ভিজে ভিজে, থলথলে প্রাণী। ইঁদুরের মতো শুকনো, খড়খড়ে নই, থ্যাসকা আমাদের শরীরের গন্ধ। তোমাদের ভালো লাগে না। এই বার বলো, তোমরাও কি খুব সুগন্ধী? বোধ হয় না। শরীরে বহু রকমের ফ্যাস-ফোঁস প্রয়োগ করো। আহা রে! সুগন্ধী মানব আমার।যত দুষ্কর্মের নায়ক।</p>



<p>যৌথ পরিবার ভাঙলে কেন?</p>



<p>টেকনিক্যাল অসুবিধা। ‘কাকাবাবু প্রবলেম’।</p>



<p>সে আবার কি?</p>



<p>তাঁরা দুই ভাই &#8211; বাবা আর কাকা। দুই মহিলা একজন আমার মা, অন্যজন আমার কাকিমা।</p>



<p>বাঃ, &#8216;ভালোই তো, বেশ ছিমছাম। পেল্লায় একটা বাড়ি, দশ কাঠা জমি। আম, জাম, কাঁঠাল, মাঝারি মাপের একটা পুকুর, রুই, কাৎলা । আহা, আহা, বেজায় সুখ, তা&#8217; এমন চচ্চড়ি হয়ে গেল কি করে?</p>



<p>নাট, বল্টু সব লুজ হয়ে গেল, টাইট দেবার লোক নেই, শুরু হল ফাইট। ফাইট করতে,করতে ফাইটাররা সব ওপরে, প্যাভেলিয়ানে। পরবর্তী ইনিংসের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। সিলিং ফ্যানে মানুষ ঝোলে আদালতে। গয়া পিসি কবে মরে পগার পারে, মামলা এখনো ঝুলছে। উত্তরাধিকার সূত্রে মামলা লাভ।</p>



<p>প্রপার্টিটা কোথায়?</p>



<p>বলতে পারবো না,তবে দলিলের পাউডার খাপে ভরা আছে।</p>



<p>ভাই, সেকালের চেয়ে একাল অনেক, অনেক ভালো- যে যার সে তার। এর সুন্দর একটা ইংরেজি আছে, ‘হিজ হিজ, হুজ হুজ’।সেই কলেজ জীবন থেকে শুনে আসছি বেঁচে থাকার এই স্তোত্রটি ।</p>



<p>সুউন্নত এই ডিজিট্যাল সভ্যতা ক্রমশ এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার দিকে চলেছে।সেদিন সুন্দর এক অভিজ্ঞতা হল। মস্ত এক বিবাহ অনুষ্ঠান। বিবাহ তো অতীতের মতো নিজেদের বাড়িতে হয় না। তাছাড়া বাড়ি কোথায়, সবই তো ফ্ল্যাট। সুতরাং বিয়ে বাড়ি ভাড়া করতে হয়। সেও ভারি মজার। বহুতল বিবাহ বাড়ি। একই সঙ্গে তিনটি বিবাহ, প্রথম তলে একটি, ব্যানার ঝুলছে শ্যামল ওয়েডস শ্যামলী। দ্বিতীয় তলে কিঙ্কর ওয়েডস কাকলী, ইত্যাদি। উপহার হাতে যাঁরা আসছেন, নির্দেশ, হুটোপাটি করবেন না । উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবেন না । নিমন্ত্রন পত্রটি/ বাক্সটিসঙ্গে রাখুন। অতিরিক্ত সাবধানতার কারনে, সঙ্গে রাখুন আধার কার্ড, প্যান কার্ড। পূর্বের এক অনুষ্ঠানে, পাত্র ও পাত্রীপক্ষের হাতাহাতি মারামারিতে আমাদের প্রভূত ক্ষতি হওয়ায় আমরা বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করে দুজন বাউন্সার রেখেছি। তাদের বুকে চিহ্নে আঁটা আছে পাত্র-পাত্রী। </p>



<p>লড়াইয়ের স্থান এই ভবনের পশ্চাতে নির্দিষ্ট আছে। আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার ও ফার্স্টএডের ব্যবস্থা। প্রবেশ দ্বারে আছে মেটাল ডিটেক্টার। পূর্বের এক বিবাহের তিক্ত অভিজ্ঞতা &#8211; রিভলভারধারী এক যুবক বিবাহস্থলে প্রবেশ করে দাবি করেছিল, আমি তিন বছর ধরে রিহার্সাল দিচ্ছি বরের ভূমিকায়, কোথা থেকে এই ছুঁচোটা বরের পিঁড়িতে বসে পড়ল। তারপর আগেয়া, বলে গান ধরল ষাঁড়ের গলায়, তারপর নাচতে লাগল, হাম সুইসাইড করেগা, তারপর ধপাস, নড়েও না, চড়েও না। হঠাৎ পাত্রী উঠে দাঁড়াল, সেকি নৃত্য তার &#8211; প্রেম করেছি, বেশ করেছি, করবোই তো!</p>



<p>ঝিরি,ঝিরি আলোর ঝালর মোড়া আলো-আঁধারি উদ্যান। এদিকে ওদিকে,সেদিকে বসে আছে সারি,সারি মোবাইল। সকলেই কথা বলছে দূরের অদৃশ্য কারো সঙ্গে।কথা, অজস্র কথা। এত কথাও জমে আছে এই ছোট ছোট খোলে। পাশে, অদূরে বসে থাকা কারো সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। হাতের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে লেগে আছে নীলে আলো। বিরাট একটা জলের ট্যাঙ্ক বাহকের মাখায়, সঙ্গে ঝিলিক মারা পোশাক, হৃষ্টপুষ্ট, শাঁসালো এক ব্যক্তি। সবাই হাঁ হয়ে গেছে &#8211; এ আবার কী?</p>



<p>‘হাঁ ভাই। অ্যায়সা কুছ দিতে হোবে যা কাজে আসে। চিত্তবাবু বাড়ি বানাচ্ছে, এক ট্যাঙ্কিতো জরুর লাগে গা। হাম ডিলার হায় না!’</p>



<p>পায়ের ওপর দিয়ে ‘ট্যাক’ শব্দ করে কি একটা চলে গেল— ‘ছুছুন্দর’।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-by-sanjib-chattopadhyay-2/">পাজি ছুঁচো</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-by-sanjib-chattopadhyay-2/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>অনসূয়াদির আমবাগান</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/anusuadir-ambagan-short-story-by-harsha-dutta/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/anusuadir-ambagan-short-story-by-harsha-dutta/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 12 Apr 2026 13:16:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=10583</guid>

					<description><![CDATA[<p>আপনি আমের গাছ যে-মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটিকে সম্মান জানাতে এসেছেন।...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/anusuadir-ambagan-short-story-by-harsha-dutta/">অনসূয়াদির আমবাগান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>হর্ষ দত্ত</strong><strong></strong></p>



<p> </p>



<p>গৌড় এক্সপ্রেস শিয়ালদহ থেকে ঠিক রাত ১০টা ৫ মিনিটে ছেড়েছে। মালদা টাউন স্টেশনে পৌঁছবে সকাল ৬টা থেকে ৬-১৫মিনিটে। স্লিপার ক্লাসের যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ট্রেন ছাড়ার কিছু পরেই শুয়ে পড়েন। কেউ কেউ সঙ্গে করে নিয়ে আসা ডিনার সেরে নেন। মনুজেন্দ্র বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করেই বেরিয়েছে। এই নিয়ে ও মালদায় আসছে দ্বিতীয়বার। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাশ্বতী দেবীর ওপর দুদিন ব্যাপী সেমিনারে যোগ দিতে যাচ্ছে।</p>



<p>এসি টু-টিয়ারে লোয়ার বার্থ পেয়েছে মনুজেন্দ্র। ওর উলটো দিকে বসে আছেন কালচে ট্রাউজার ও আকাশি নীল রঙের ফুল শার্ট পরা এক নিপাট বয়স্ক ভদ্রলোক। মুখে কোনও বিরক্তি বা বিষাদ লেগে নেই। বরং প্রসন্ন। । ট্রেন চলতে শুরু করার পর একঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঠায় বসে না থেকে, শুয়ে পড়ার মতো পিঠটা একটু ঠেকিয়ে নিলে ভাল লাগত। মনুজেন্দ্র ভাবল।</p>



<p>— আপনি কি এখন বিছানা করবেন ? তা হলে আমি করিডোরে দাঁড়াই&#8230;। বিনয়ী স্বরে কথা বলতে বলতে মানুষটি উঠে পড়লেন।</p>



<p>সামান্য হলেও, ভেতরে ভেতরে চমকে গেল মনুজেন্দ্র। ভদ্রলোক ওর মনের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারলেন কী করে ! বিস্ময় সামলে নিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, না&#8230;না, আমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমোই না।&#8230;বাড়িতে শুতে শুতে বারোটা পেরিয়ে যায়।</p>



<p>&#8212;তা হলে তো আপনি আমারই মতো বিছানা-কাতর নন। অতএব দিব্যি গল্প করতে করতে যেতে পারি। ভদ্রলোক স্মিত হাসলেন, মালদায় যাচ্ছেন নিশ্চয়ই ?</p>



<p>&#8212;আজ্ঞে হ্যাঁ। মনুজেন্দ্র নড়েচড়ে বসল।</p>



<p>আলতো ভঙ্গিতে বার্থে বসে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, মালদায় কি এই প্রথমবার ?</p>



<p>&#8212;না, এটা সেকেন্ড টাইম। গৌড়বঙ্গ ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনারে যোগ দিতে এসেছি।</p>



<p>ভদ্রলোক হাসি ছড়িয়ে বললেন, ওরে বাবা, আপনি তাহলে নিশ্চয়ই অধ্যাপক ! ওইসব সেমিনার-লেকচার&#8230;বুঝেশুনে আপনার সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি মশাই রেলে কেরানির চাকরি করতাম। সাত-সতেরো জায়গা ঘুরে কয়লাঘাটা থেকে যথাসময়ে রিটায়ারমেন্ট। হাঃ, হাঃ, তারপর থেকে বয়স হু হু করে বাড়ছে। মালদা টাউনে বাড়ি করেছি। আমার নাম লোকেশ নিয়োগী।&#8230;তা, আপনার নামটা জানা হল না।</p>



<p>&#8212; মনুজেন্দ্র ভৌমিক। আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি মফস্বলের একটি কলেজে অধ্যাপনা করি।</p>



<p>&#8212;বাঃ, খুব ভাল।&#8230;টাউন থেকে গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি খানিক আউটস্কার্টে। জায়গাটার নাম মোকদুমপুর। ইউনিভারসিটির পাশ দিয়ে চলে গেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে থার্টি ফোর। আচ্ছা, প্রথমবার এসে মালদা জেলার আশপাশটা ঘুরে দেখেছিলেন ?</p>



<p>সেবার ওর হাতে তত সময় ছিল না। তবু তারই মধ্যে যেটুকু দেখেছে মনুজেন্দ্র তা বলল, হুসেন শাহী গৌড়, পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ আর মহেদিপুর বর্ডার দেখেছিলাম।</p>



<p>আনন্দের সঙ্গে নিয়োগীবাবু বললেন, বেশ, বেশ। আপনি তো ক্রিম জায়গাগুলোই দেখে নিয়েছেন। তবে আরও ঘুরে দেখার জায়গা আছে, অধ্যাপক ভৌমিক। এবার না হয় যাবেন।</p>



<p>একটু দ্বিধা ও মৃদু অস্বস্তি নিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, আসলে মালদার সঙ্গে আম অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে গেছে। বলতে লজ্জা করছে, তবু বলি, অনন্য স্বাদের এত বিচিত্র আমের ফলন যে-জমিতে হয়, সেই ভূমির মাটি একমুঠো নিয়ে যেতে চাই।</p>



<p>লোকেশ অবাক চোখে, মনুজেন্দ্রর দিকে সোজা তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বললেন, এই না হলে অধ্যাপক ! আমরা আমটি খেয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। আর আপনি আমের গাছ যে-মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটিকে সম্মান জানাতে এসেছেন। আমি ভাবতেই পারছি না। বিশ্বাস করুন, আমার জীবনে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।</p>



<p><strong>দুই</strong><strong></strong></p>



<p>অবিরাম চলছে এক্সপ্রেস ট্রেন। ওদের দুজনের তো বটেই, সম্ভবত কম্পার্টমেন্টের অন্য যাত্রীদেরও গন্তব্য মালদা টাউন। একলা ট্রেনভ্রমণে বা ফ্লাইটে মনুজেন্দ্র চুপচাপই থাকে। পাশের যাত্রীর সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলে না। কিন্তু এই লোকটির সঙ্গে কোনও এক অজানা সহজ পথে আলাপ হয়ে গেল ! ভালই লাগছে। <strong></strong></p>



<p>কুণ্ঠিত স্বরে নীরবতা ভাঙল মনুজেন্দ্র, লোকেশবাবু, আমি কয়েকটা বড়সড় আমবাগান দেখতে চাই।</p>



<p>ভাবনার অতল থেকে সহসা উঠে এসে, দুঃখী মানুষের মতো শব্দহীন মলিন হাসলেন নিয়োগীবাবু, মালদা শহরে তেমন বাগান আর নেই। কলকাতার মতো এখানেও ফ্ল্যাট কালচার সব গ্রাস করে নিয়েছে। আপনারা পুকুরহারা, আমরা বাগানহারা। তবে গ্রামীণ এলাকার আমবাগানগুলো উপার্জনের স্বার্থে, মালিক ও চাষিরা হাতে হাত বেঁধে বাঁচিয়ে রেখেছে। হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ প্রভৃতি আম এখানকার মানুষের কাছে শুধু ফল নয়, মাল্টিপারপাস ইন্ডাস্ট্রি। একজন রিটায়ার্ড পার্সন হিসেবে যেটুকু বুঝি। আমি কিছু ভুল বলছি না তো ?</p>



<p>&#8212; ভুল বলার কোনও প্রশ্নই নেই। মনুজেন্দ্র হাত তুলে লোকেশকে আশ্বস্ত করল।</p>



<p>&#8212;বাঙালি বহু ধরনের চেনা-অচেনা আম খায়। তবে নানা কিসিমের আমের মধ্যে&nbsp; হিমসাগর আর ল্যাংড়া বাঙালির অর্ধেক ভালবাসা ছিনিয়ে নিয়েছে। দুটো আমই চোঁচহীন। শাঁসে ভরপুর, আঁটি ছোট। আহা, দুটোরই কী স্বাদ ! আবার ইয়া বড় বড় গাছপাকা ফজলি একটা খেলেই পেট ভরে যায়। তাই না ! &nbsp;</p>



<p>&#8212;ঠিকই বলেছেন। মনুজেন্দ্র বলল, এই জেলার একজন অধিবাসী হিসেবে এটা আপনার বাস্তব জ্ঞান, অনুভব, উপলব্ধি।&#8230;সেমিনার থেকে সময় বের করে নিয়ে গ্রামের দিকেই যাব। মনে রেখেছি, গতবার পান্ডুয়া যাওয়ার পথে, চলন্ত গাড়ি থেকে কয়েকটা পাঁচিল ঘেরা আমবাগান দেখেছিলাম।&#8230;কিন্তু এমনভাবে আর নয়, আমি এবার হেঁটে-ঘুরে আমসাম্রাজ্য দেখতে চাই।</p>



<p>দারুণ খুশি হলেন লোকেশ। স্যার সম্বোধন করে বললেন, আপনি গড্ডলিকা স্রোতের বাইরে থাকা তেমনই মানুষ, যাঁদের সান্নিধ্যে এলে জীবনের মানেটাই যেন বদলে যায়। স্যার, আমি আপনাকে কোনও উপদেশ দিচ্ছি না। কেবল একটা প্রস্তাব। বলব ?</p>



<p>মনুজেন্দ্র অবাক, কেন বলবেন না ! বলুন&#8230;</p>



<p>ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে একটু ভেবে, নিয়োগীবাবু খবর দেওয়ার মতো করে জানালেন, &nbsp;আমবাগান দেখতে যাওয়ার সময় আপনার সঙ্গে কোনও গাইড থাকবেন। আমার একটা অনুরোধ, যেই থাকুন, তাকে বলবেন, আমি অনসূয়াদির আমবাগানটা একবার দেখতে যাব। অপূর্ব বাগান। আড়ে-বহরে বিরাট। সত্যিই দেখবার মতো। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে লোকে বলত, হিমসাগরি বিশ বিঘে। তারপর নাম পালটে হল প্রসাদবাবুর ম্যাঙ্গো ফরেস্ট। এখন লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে তিন নম্বর পরিচয়—অনুসূয়াদির আমবাগান।</p>



<p>স্বল্প ভুরু কুঁচকে মনুজেন্দ্র বলল, অনুসূয়া শব্দটা ভুল। হবে অনসূয়া। &nbsp;</p>



<p>&#8212;কিন্তু ভুলটাই এখানে দিব্যি চলছে। হাত জোড় করে ফিকে হাসলেন লোকেশ।</p>



<p>&#8212;জায়গাটা মালদা টাউন থেকে কতদূর ?</p>



<p>যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন এমনভাবে ভদ্রলোক বললেন, খুব বেশিদূর নয়। মহানন্দা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে পান্ডুয়ার দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলে রামকেলি গ্রাম। নামটা আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন।</p>



<p>জোরে অথচ নীরবে মাথা নাড়ল মনুজেন্দ্র। তারপর যেন সুদূর অতীতে চলে গিয়ে মগ্ন স্বরে বলল, &nbsp;রামকেলি বৈষ্ণবদের কাছে অন্যতম মহান তীর্থ। ষোড়শ শতকের শুরুতে ধর্মভাবনার চিরপথিক মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব বৃন্দাবন যাওয়ার পথে, এই গ্রামে কিছু দিন ছিলেন। এখানেই তিনি পেয়েছিলেন আজীবনের সহচর রূপ ও সনাতনকে।</p>



<p>মনুজেন্দ্রর পায়ে হাত ছোঁয়ানর মতো আনত হয়ে নিয়োগীবাবু বললেন, এসব ইতিহাস আপনি সব জানেন। ভাগ্যিস আমি বলিনি !</p>



<p>মৃদু বিরক্ত হল মনুজেন্দ্র, শুনুন লোকেশবাবু, আমি সবজান্তা মাস্টার নই।&#8230;আপনি যখন এত গুরুত্ব দিয়ে বলছেন, তখন আমবাগানটা যেভাবে হোক দেখতে যাবই।</p>



<p>&#8212;আমার সৌভাগ্য স্যার। তবে এত বড় বাগান ঘুরে দেখতে সময় লাগবে। &nbsp;বাগানের মালকিন অনুসূয়া মালাকার ওখানেই থাকেন। আমি আর কিছু বলছি না। বাকিটা আপনি &nbsp;বুঝে নেবেন।</p>



<p><strong>তিন</strong><strong></strong></p>



<p>দ্বিতীয় দিন সকাল সাতটা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত, একাধিক আমবাগান ঘুরে দেখার জন্যে মাননীয় উপাচার্য ডক্টর ভট্টাচার্য, মনুজেন্দ্রকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ওর সঙ্গে আছে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (এগজামিনেশন) প্রদীপ্ত আচার্য। ভদ্রলোক আলাপচারি নয়। কম কথার মানুষ। মনুজেন্দ্রর চেয়ে বয়সে ছোট। তবে কথা কম বললেও সুভদ্র, অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সচেতন। শুরু থেকেই ড্রাইভারের পাশে বসছে। শহর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত বাগানগুলোর সামনে, গাড়ি থামিয়ে কেয়ারটেকার বা মালিদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। তিনটে বাগান ইতিমধ্যে মনুজেন্দ্রকে দেখানো হয়ে গেছে। এগুলো বড় আকারের নয়। শাখা-প্রশাখায় ঝুলন্ত আমের ঘনত্ব কম, বৈচিত্র মামুলি।</p>



<p>‘আম্রকানন’ নামে একটা মাঝারি বাগান দেখে, মনুজেন্দ্রর মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রদীপ্ত বলল, সাবার্ব থেকে বেরিয়ে এবার আপনাকে পুরোপুরি গ্রামের দিকে নিয়ে যাব।&#8230;বুঝতে পারছি, এইসব পড়তি বাগান দেখে আপনি খুশি হচ্ছেন না। ঠিক আছে, মহানন্দা পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার গেলেই গ্রামাঞ্চলের শুরু। হাইওয়ের দুপাশে গ্রাম, গ্রামের ভেতরে বাগানের পর বাগান। গাছে গাছে যেন আমের মেলা বসেছে ! খুব ভাল লাগবে।</p>



<p>মনুজেন্দ্র মিষ্টি হাসল, তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, গ্রামের দিকে গেলে বিস্ময় ও আনন্দ&#8212;দুটোতেই ভেসে যাব।</p>



<p>&#8212;তা বলতে পারেন। প্রদীপ্তর মুখে হাসির আভাস, গৌড়বঙ্গের ইতিহাসের চেয়ে, আমের অমর ঐতিহ্যে মালদাবাসী অনেক বেশি গর্বিত।</p>



<p>&#8212;ভাই, আমি শুনেছি রামকেলিতে নাকি একটা বিশ বিঘে জমি জুড়ে একটা আমবাগান আছে ? মনুজেন্দ্র ঔৎসুক্য চেপে রেখে সহজভাবে জানতে চাইল।</p>



<p>মুহূর্তে পাংশু বর্ণ হয়ে গেল প্রদীপ্তর মুখ, আপনি কি অনসূয়াদির আমবাগানের কথা বলছেন ?</p>



<p>&#8212; হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি এমন বিচলিত হচ্ছেন কেন ! মনুজেন্দ্র বেশ অবাক হয়ে গেল। ওর মনে পড়ল, লোকেশ নিয়োগী এই বিশাল বাগানের অস্তিত্ব ও অবস্থিতির কথা জানিয়েও মন্তব্য করেছিলেন, &nbsp;‘আমি আর কিছু বলছি না। বাকিটা আপনি বুঝে নেবেন।‘ ভদ্রলোক কোনও কারণে বিষয়টার ইতি টেনে দিয়েছিলেন মাঝপথে। আমবাগানটি নিয়ে ডেপুটি রেজিস্ট্রারের আচরণও অস্বাভাবিক।</p>



<p>প্রদীপ্ত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না স্যার, আমি বিচলিত হইনি। আসলে ওই বাগানটার মহিলা মালিক লোকজনের সঙ্গে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করেন। বাগানের নিজস্ব চাষি ও মালিদের ছাড়া কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেন না।&#8230;আপনাকে একটা অনুরোধ করছি, বাগান দেখার পারমিশনটা যদি আপনি নিজে করে নেন&#8230;</p>



<p>চোখ সরু করে মনুজেন্দ্র জিজ্ঞেস করল, অনুমতি কে দেবেন ?</p>



<p>&#8212;যাঁর বাগান অর্থাৎ অনসূয়া ম্যাডামই দেবেন। এখানে চাকরিতে জয়েন করার পর, আমি বাগানটার কথা লোকের মুখে শুনে একবার দেখতে এসেছিলাম। আমার পরিচয় জানানো সত্ত্বেও মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। এমন দুর্ব্য়বহার উনি অনেকের সঙ্গে করেছেন। প্লিজ স্যার, আমি বাগানের ভেতরে যাব না।</p>



<p>চিন্তিত মুখে মনুজেন্দ্র জানতে চাইল, অনসূয়া দেবী কোথায় থাকেন ? ওঁর বাড়ি&#8230;</p>



<p>প্রদীপ্ত শুকনো মুখে উত্তর দিল, অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, বাগানের ডান দিকে একটা ইট দিয়ে তৈরি রাস্তা আছে। ওই পথ ধরে মিনিট পনেরো গেলেই দেখতে পাবেন, পুরনো ধাঁচের উঁচু একতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে গাছের ঘনত্ব অনেক বেশি। অনেকটা বনের মতো। উনি ওখানে একা থাকেন। বিয়ে-থা করেননি। ওঁর রিলেটিভ কেউ মালদায় আছেন কিনা, তা জানি না।</p>



<p>একটা আমবাগানকে ঘিরে এত রহস্য কেন ? মসৃণ, দুরন্ত হাইওয়ের দিকে অপলকে চোখ রেখে মনুজেন্দ্র ভাবতে চেষ্টা করল। স্পষ্ট উত্তর পেল না। গম্ভীর গলায় প্রদীপ্তকে নির্দেশ দিল, বিশ বিঘেতে চলুন।</p>



<p><strong>চার</strong><strong></strong></p>



<p>ভারি কাঠের তৈরি বিরাট দুটো দরজা। ওপর দিকে শেকল ও তালা দিয়ে বাঁধা। একটা পাল্লা সরাতেই দরজায় যে-লম্বা ফাঁক হল, তাতে একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে আড়াআড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। মনুজেন্দ্র ফোকর দিয়ে দেখল, কোনও দ্বাররক্ষী নেই। মালি, চাষি কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছে, বাগান জুড়ে রোদ্দুর আর ছায়ার কাটাকুটি। আমের সুগন্ধ। নিবিড় পল্লবের আড়াল থেকে একটু থেমে থেমে কোকিল ডাকছে। ভেসে আসছে অন্য পাখির শিস। একেবারেই জনমানব শূন্য। তবু ও গলা চড়িয়ে হেঁকে উঠল, কেউ আছেন ? কেউ কি আছেন ? আমি একটু ভেতরে যেতে চাই। হ্যালো&#8230;</p>



<p>কয়েক মিনিট কেটে গেল। তেমনই এক কঠিন শূন্যতা। মুখ ঘুরিয়ে মনুজেন্দ্র দেখল, নিঃস্পৃহ মুখে শুকনো কাঠের মতো বসে আছে প্রদীপ্ত। ওর দিকে হাত নেড়ে, দরজার ফাঁক দিয়ে মনুজেন্দ্র বাগানে প্রবেশ করল। কাউকে দেখতে না পেয়ে ঘুরতে শুরু করল এধার-ওধার। কী আর হবে ! ট্রেসপাসার্সের তকমা লাগিয়ে মালিক দুচার কথা শোনাবেন। আম-চোর অপবাদ দিয়ে অপমানও করতে পারেন অযথা। এর বেশি কিছু তো নয়।</p>



<p>আরও দূরে, বাগানের উত্তর দিক থেকে কয়েকজন পুরুষ ও মহিলার কথাবার্তার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। একবর্ণও বুঝতে পারল না মনুজেন্দ্র। বরং ভাবল অনসূয়ার সঙ্গে দেখা হওয়া বা দেখা করা জরুরি নয়। যখন কেউ বারণ করছে না, তখন ও যতটা পারে বাগানটা ঘুরে-ফিরে দেখুক। চলে যাওয়ার সময় অনসূয়ার সঙ্গে আলাপ হলে ভাল। না হলে ওর কিছু করার নেই। ইটরাস্তা থেকে মাটিতে পা রাখল মনুজেন্দ্র।</p>



<p>টইটম্বুর ফলের ভারে অবনত গাছগুলো যেন স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় মৃদু হাওয়ায় দুলছে। বাগানের মাটিতে কোথাও সবুজের আভাস, কোথাও রুক্ষ মাটি। ঝরা পাতা ঝাঁট দিয়ে তফাতে তফাতে স্তূপ করে রাখা আছে। গাছগুলোর গায়ে লেবেল সাঁটানো : ফজলি-62, হিমসাগর-184, ল্যাংড়া-37 ইত্যাদি। সম্ভবত কত সংখ্যক গাছ, এই নাম্বারিং তারই ইঙ্গিত। মনুজেন্দ্র হাঁটছে কখনও এদিকে, কখনও ওদিকে। ওর মন বলছে, &nbsp;গাছ মানুষকে নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে যতটা ভালবাসে, মানুষের প্রয়োজনে-উপার্জনে পাশে দাঁড়ায়, তার এককণা প্রতিদান ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ বৃক্ষজগৎ, মানুষের কাছ থেকে পায় না। কিছু তরু-প্রেমিক &nbsp;মানুষ&nbsp; পৃথিবীতে আছেন এই পর্যন্ত, কিন্তু তাঁরা হাতে গোনা কয়েকজন।</p>



<p>গাছ থেকে একটা আধপাকা আমপাতা, মনুজেন্দ্রর ডান কাঁধ ছুঁয়ে খসে পড়ল মাটিতে। পাতাটা তুলতে গিয়ে ও থমকে গেল। চাঁপা রঙের শাড়ি পরা, মাথা ভরতি ববকাট পাকা চুল, দেহ নাতিদীর্ঘ, মুখ কোমল অথচ আধুনিকতার আভা&#8212; এমন এক শ্রীময়ী নারী ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত, কী করবে মনুজেন্দ্র তা ভাবতে ভাবতেই মহিলা বললেন, ভাইসচ্যান্সেলার আমাকে সকালে ফোন করে আপনার কথা বললেন। অধ্যাপক ভৌমিক, কেমন দেখছেন বাগানটা ? আপনার প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে তো ! আপনাকে কেউ যাতে বিরক্ত না করে, তাই গেটকিপার, মালি, চাষিদের উত্তর দিকে পাঠিয়ে দিয়েছি।&#8230;</p>



<p>&#8212;অপূর্ব ! একসঙ্গে এত আম কখনও দেখিনি। মনুজেন্দ্র আবেগে আর কিছু বলতে পারল না।</p>



<p>&#8212; আপনি আনন্দিত জেনে আমার খুব ভাল লাগছে। এই বাগান আমার প্রপিতামহ করেছিলেন। ঠাকুরদার আমলে খানিকটা নষ্ট ও বেহাত হয়ে যায়। তারপর আমার বাবা স্বর্গীয় প্রসাদরঞ্জন মালাকার অমানুষিক পরিশ্রম করে তাঁর সাধের বাগানকে ফিরিয়ে আনেন। এখন আমার দেখভালের পালা চলছে। গাছেরা যাতে শান্তিতে থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করেছি। তাই বাগান দেখতে বা বেড়াতে আসা পাবলিকদের অ্যালাও করি না। তবে ফিরিয়েও দিতে পারি না কিছু কিছু অনুরোধ।</p>



<p>&#8212;আপনি একাই সব দেখাশোনা করেন ! &nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনসূয়া স্মিত হাসলেন, না, না। আমচাষিরা সাহায্য করে। তা ছাড়া গাছপালারা ভীষণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ওরা বীজ থেকে জন্ম নিয়ে নিজের শক্তিতে বড় হয়ে ওঠে। শুধু জল, সার, প্রশ্রয় ও ভালবাসা আশা করে। আর একটু শুশ্রূষা।</p>



<p>সামান্য থেমে গাছগুলোর দিকে হাত দেখিয়ে জানালেন, এত আম সিজন ছাড়া থাকে না।&nbsp; পঞ্চাশ ভাগ পুষ্ট হলে, ব্যবসায়ীরা কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে চলে যান। তারপর যে-পদ্ধতিতে তাঁরা আম পাকাবার ব্যবস্থা করেন, আমি তার ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু বাগান পরিচর্যার জন্যে টাকা তো দরকার&#8230;। বাদবাকি গাছপাকা আমগুলো স্থানীয় এক অনাথ আশ্রমে আর রামকেলির বৈষ্ণব সাধুদের আখড়ায় পাঠিয়ে দিই।&#8230;চলুন, আমার আবাসে। চা খেতে খেতে কথা বলা যাবে। এক ঝুড়ি আম দেব। নিয়ে যাবেন।&#8230; একটু হাঁটতে হবে কিন্তু ! ছায়ায় ছায়ায় আসুন।</p>



<p>মোবাইলে কাউকে নির্দেশ দিতে দিতে অনসূয়ার পদক্ষেপ একটু দ্রুত । ওর পেছনে মুগ্ধ বিস্ময়ে আসছে মনুজেন্দ্র।</p>



<p>ইংরেজ আমলের বাংলো বাড়ির চতুষ্কোণ বারান্দায়, বেতের চেয়ারে চা নিয়ে ওরা বসেছে। মনুজেন্দ্র&nbsp; ইতস্তত করে সেই পুরনো প্রশ্নটাই ঘুরিয়ে করল,&nbsp; এই বড়িতে কি আপনি একা থাকেন ?</p>



<p>শান্ত স্বরে, স্থির চোখে অনসূয়া বললেন, হ্যাঁ।&#8230; একা, একাকী, একাকিত্ব, নির্জনতা শব্দগুলো হয়তো আপনার খুব প্রিয়। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, কেউ কি একা ? আমি বিশ্বাস করি, কোনও-না-কোনও বন্ধন মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বন্ধন মাটির নিচে থাকা শেকড়ের মতো। একা শব্দটা আমাদের বিলাপ অথবা বিলাস&#8230;। কেননা একা এবং নির্জনতা&#8212;দুটোকেই ঘিরে আছে অনন্ত প্রকৃতি। ফলে কোনও প্রাণীই প্রকৃতির বাইরে নেই। তাই নিজেকে একা কখনও ভাবি&nbsp; না। বাগানের প্রতিটা গাছ আমার স্বজন। ওরা আমার নিকট আত্মীয়।</p>



<p>অদূরে অনতি উচ্চ ধুপ করে আওয়াজ হল। অনসূয়া ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, একটা ভারি শরীরের পাকা ফজলি, গাছের আশ্রয় ছেড়ে মাটির কাছে ফিরে এসেছে। আগামী বছর আবার গাছের কোলে, বন্ধনের টানে ফিরে যাবে।</p>



<p>কথার মাঝখানে প্রদীপ্তর ফোন এল। অনসূয়ার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি করে, মনুজেন্দ্র ফোন ধরতেই, প্রদীপ্তর অতিনম্র স্বর, সরি স্যার, দেরি হয়ে যাচ্ছে&#8230;।&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনসূয়াকে অবাক করে দিয়ে মনুজেন্দ্র বলল, এবার আমাকে যেতে হবে। আম নয়, আপনার এই বন্ধনভূমির একমুঠো শুদ্ধ মাটি, সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই।</p>



<p>  </p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/anusuadir-ambagan-short-story-by-harsha-dutta/">অনসূয়াদির আমবাগান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/anusuadir-ambagan-short-story-by-harsha-dutta/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>বুড়ো আশুতোষ আর নিঃসঙ্গ চৈত্র</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/story-by-sayantan-thakur/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/story-by-sayantan-thakur/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 12 Apr 2026 13:08:13 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=10577</guid>

					<description><![CDATA[<p>পায়ের নীচে ঘেঁটু ফুলের জোসনা, প্রফুল্ল আকন্দ ফুটে থাকে রুখা দুপুরের গর্ভে, অদূরে দিগন্তবিথারি....</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/story-by-sayantan-thakur/">বুড়ো আশুতোষ আর নিঃসঙ্গ চৈত্র</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>সায়ন্তন ঠাকুর</strong></p>



<p>আশুতোষের বয়সের গাছ-পাথর নাই, মাথার জটা ধুলামলিন পিঙ্গল, পরনের বাঘছালও জৌলুসহীন তবে কণ্ঠে সেই কবেকার নীল রঙ কিন্তু এখনও লেগে রয়েছে! মোটাসোটা দেবতাটি ফাল্গুন-চৈতের হাহাকারাচ্ছন্ন দ্বিপ্রহরে একা একা চড়কতলার মাঠে প্রাচীন ছায়াময় অশ্বত্থ তলায় বসে থাকেন, লাল শালু মোড়ানো হাতের কল্কেয় মাঝে মাঝে দু-একটি টান দেন আর ভুরুক ভুরুক গাঁজার ধোঁয়া মিশে যায় বৈরিগি বাতাসে।&nbsp; পায়ের নীচে ঘেঁটু ফুলের জোসনা, প্রফুল্ল আকন্দ ফুটে থাকে রুখা দুপুরের গর্ভে, অদূরে দিগন্তবিথারি ভুলোর বালুচর থেকে যখন ভেসে আসে হট্টিটি পাখির ডাক ঠিক তখনই দু-একটি বেখেয়ালি শুকনো অশ্বথ পাতা খসে পড়ে আশুতোষের মাথায়, জটার বামদিকে একফালি চাঁদের কোণে আটকে থাকে সেই জীর্ণ বসনসম পাতা, যেন কোনও সেকেলে অলঙ্কার।&nbsp; তবে কে কার অলঙ্কার তা আর স্পষ্ট বোঝা যায় না, আশুতোষের অলঙ্কার এই উদাসী চৈত্র, বিগতযৌবনা হলদে পাতা নাকি উল্টোটিই সত্য? কে জানে!</p>



<p>সত্য অত সহজে বোঝা না গেলেও বুড়ো দেবতার সঙ্গে অনেকদিন আগে ছেলেবেলায় একবার আমার দেখা হয়েছিল, সে এক আশ্চর্য ঘটনা! আসুন, আজ আপনাদের সেই গপ্পো শোনাই, ঠিক গল্প নয় আবার আঁকাড়া বাস্তবও তো বলা চলে না।&nbsp; ওই ধরুন কল্পনা আর বাস্তবের মাঝামাঝি এক অপরূপ দোদুল্যমান ভূখণ্ডে আমাদের দেখা হয়েছিল—ঈষৎ অস্পষ্ট, সামান্য কাঁপুনে, যেন স্পর্শ করলেই ওই ঘটনার রেণু আকাশে বাতাসে গোটা ফাটা শিমুল তুলোর মতন ভেসে যাবে।</p>



<p>যাকগে, ওসব ভাবের কথা থাক, তার চেয়ে বরং গল্পটা বলি!</p>



<p>রাঢ়দেশে চৈত্র মাসের একটা আলগা চটক আছে, ভালো করে ঠাহর না করলে অবশ্য বোঝা যায় না।&nbsp; পালামৌর বনপাহাড়ের সঙ্গে কিছু মিল আছে আবার অনেকটা ফারাকও স্পষ্ট।&nbsp; বেলা দ্বিতীয় প্রহর গড়াতে না গড়াতেই রোদ্দুর রক্তচক্ষু হয়ে ওঠে, বাউলানি ধুলাপথ, দূরে আকাশ-মাটির সীমানার কাছে জ্বরো রুগীর মতন কাঁপতে থাকা দিকচক্রবাল রেখা, ঝুঁটি বাঁধা বোষ্টুমী তালগাছ, আগুনে পলাশ, অনাদরের ঘেঁটু ফুলের ঝোপ, ধুলামলিন আকন্দ আর ফল-পাতা শূন্য শিমুল আকাশে হাড় জিরজিরে স্মৃতি-ডালপালা মেলে বসে থাকে।&nbsp; ইশারাবাহী এক ক্ষ্যাপা বাতাস মাঝে মাঝে ছুটে আসে কোন্‌ জাদুভুবন থেকে, তখন পাক ওঠে লাল ধুলা, খসে পড়ে পলাশ, শুকনো পাতা ভেসে যায় কারোর অলঙ্ঘনীয় নির্দেশে, কে এক বিচিত্র জাদুকরী তার সাপি খুলে ভুবনডাঙায় ছড়িয়ে দেন দু-মুঠি অকারণ মনখারাপ, সংসার-আলগা মানুষের মনে সেই মুহূর্তে ডাক দিয়ে যায় এক চিরকালীন আগল-ভাঙা কিশোর, কানে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘অনেক বেলা হল হে মনপবন, এবার গুবগুবিখান হাতে তুলে নাও, পলাতকা ছায়া আঁধারে হারিয়ে যাওয়ার আগেই চলো আমরা দুজনে পালাই!’</p>



<p>আর তখনই দুপাশে আদিগন্ত মাঠে খরার পান্না সবুজ লকলকে ধান এই রুখা রূপভুবনে কী এক অপূর্ব বৈপরীত্য যে সৃষ্টি করে, ঠিক যেন আমাদের জীবন—বেহিসাবী রাগ, অল্প অভিমান, ঝগড়া, বাদ-বিসম্বাদ আবার চকিত চুম্বন, আলগোছে তুলে নেওয়া প্রেম ও অপ্রেম সব নিয়েই যেমন সে চিরকালের চালচিত্র রচনা করে, এও কতকটা তাই!</p>



<p>তো এইরকম বেলা-বয়ে-যাওয়া দিনে আমি প্রায় ভুলোর চরের দিকে একা একা চলে যেতাম।&nbsp; কেন যেতাম এখন সে-কথা আর মনে পড়ে না কিন্তু যাওয়ার ঘটনাটি এখনও দিব্যি ঠাহর হয়।&nbsp; ভুলোর চরের একটা ছোট্ট আখ্যান আছে, এইবেলা সেটিও বলে নিই, নাহলে পরে আবার ভুলে যাব।&nbsp; আপনি হয়তো বলবেন, ‘আরে, এ যে গল্পের ভেতর আবার গল্প, ও ঠাকুরমশাই, এরকম করে চললে যে আর কোথাও পৌঁছানো হবে না আমাদের! যাহোক বেভুলো উড়নচণ্ডে লোক বটে আপনি!’</p>



<p>আমি সেক্ষেত্রে মুচকি হেসে বলব, ‘এই তো ভালো! কিছুটা আমি বলব, তারপর পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বাকি গল্পের ফুঁপি ধরে আপনি এগিয়ে যাবেন, কিছুক্ষণ পর অন্য কেউ, এভাবেই তো আখ্যান বয়ে যায় কাল থেকে কালান্তরে!’</p>



<p>একসময় ময়ূরাক্ষী এই অঞ্চলে বেশ গতিশীলা ছিল, তারপর কীসের খেয়ালে যেন সে পথ ভুলে চলে গেল আরও পশ্চিমে, পড়ে রইল স্মৃতির মতন শূন্যগর্ভ নদীখাত।&nbsp; রইল একটি ক্ষীনতনু ধারা, তিরিতিরি জল, বর্ষায় যৌবনবতী হয় বটে কিন্তু তার বারোমাস্যা বড়োই করুণ, শুষ্ক।&nbsp; নদী মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ায়, ঠিক প্রথম প্রেমিকা ফিরে যাওয়ার পর যেমন হৃদয়ে তৈরি হয় এক অনুনমেয় ক্ষত, অবিকল সেরকম ওইখানে তৈরি হল গত শতাব্দীর বিধবার থানের মতন এক ধু ধু বালুচর, এপার ওপার দেখা যায় না তার, দুপুরে রোদ্দুর গাঢ় হলে তেতে আগুন হয়ে ওঠে চর আবার দিন ফুরোলে চৈতি রাতে অলীক কুয়াশায় ভরে ওঠে চারপাশ।&nbsp; নিঝুম জনহীন চরে মাঝে মাঝে ভেসে আসে শিবাদলের ডাক, রাতচরা পাখির কান্না ভেঙে দেয় নৈঃশব্দের মগ্না আঁচল, বয়ে যায় শিমশিম বাতাস, কান পাতলে শোনা যায় কে যেন বলছে, ‘আরও এগিও না বাপু, ফিরে যাও, নাহলে তোমার ঘর-সংসার-হাল-বলদ-ছেলেপুলে-পরিবার-জমিজিরেত-ভদ্রাসন সব রসাতলে যাবে!’</p>



<p>তবে চৈতি জোসনায় ভুলোর চর অন্যরকম, এই রূপ-জগতের সঙ্গে তখন তার আর জলচল নাই।&nbsp; মূর্ছিত কৌমুদী হাওয়া-বাতাসে মিশিয়ে দেয় অলীক ভুবনের রুহ্‌ আতর, তখন কেঁদে কেঁদে একাকী ঘুরে মরে ওই নিঃসঙ্গ বাতাস।&nbsp; তার বিস্রস্ত আঁচল লুটোয় বন্ধনহীন জ্যোৎস্নায়, দুচোখে লেগে যায় মায়া জগতের রেণু, কাউকে যেন খুঁজে বেড়ায় সে, অনেক জন্ম আগে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিন্তু মিলন হয় নাই বলে বিরহী বাতাস আজও মুক্তি পায়নি।&nbsp; এই দিগরের লোকজন ওই হাওয়া-বাতাসকে যমের মতন ডরায়, তারা বলে, দিনের বেলা যেমন তেমন ভুলোর চর কিন্তু জোসনা রাতে ওইপানে চোখ তুলে একপলক তাকালেও নাকি অন্ধ হয়ে যায় মানুষ, ডাইনি চাঁদ তার রক্তে অবিরাম বাজিয়ে চলে সন্ন্যাসের ঝুমঝুমি।&nbsp; চন্দ্রাহত সেইসব মানুষই নাকি চড়কের সন্নিসি হয় একমাসের জন্য, আর যাদের অসুখ আরও তীব্র তারা ঘর ছেড়ে চিরকালের জন্য পালায়, কেউ কখনও তাদের কোথাও খুঁজে পায় না।&nbsp; গাঁয়ের বুড়ো মানুষরা, যাদের তিন মাথা এক হয়েছে, তারা আরও বলে, বহুকাল আগে এক সোমত্থ মেয়ে নাকি ওই ভুলোর চরে গায়ে আগুন দিয়ে মরেছিল, সেদিন ছিল চৈত্র পূর্ণিমা, ভরা চাঁদের রাতে হব্যবাহর বূহ্য বলয়ের মতন ঘিরে ধরেছিল তাকে, যুবতি পাক খেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল বালুচরে, প্রচণ্ড আর্তচিৎকারে জেগে উঠে বাতাসে মিশে যাচ্ছিল কেশবতী কন্যার চুল-মাংস পোড়ার কটু গন্ধ, মন পোড়ার সুবাসও হয়তো মিশে ছিল! কে জানে! জগত-চোখ দিয়ে মন তো আর দেখা যায় না!</p>



<p>কেন মরেছিল তা নিয়ে কেচ্ছা কম রটেনি কিছু, ওই যা হয়, কাঁচা বয়সে বিয়ের আগে পোয়াতি, আমাদের গাঁ-দেশে বলে সর্বনাশিনীর মন মজেছিল আনজনে! হাঃ, তারা সব অন্ধ লোক, পিরিত দেখতে পায় না, জানে না, সর্বনাশী পিরিত ওইভাবেই দেশ-লোকাচার-কুলাচার-মান-অপমান-নিন্দা-স্তুতি সব ভাসিয়ে জোয়ারের টানে ভাসিয়ে নিয়ে যায় চিরকালের নারী ও পুরুষকে, বারংবার, ওই প্রবল টানের কোনও দেশ-কাল-জাতি নাই, সে এমনই, নিষ্ঠুর ও সোহাগী যুগপৎ, তাই বোধহয় অপ্রতিম!</p>



<p>তবে ওই ঘটনার পর থেকেই নাকি প্রতি শুক্লপক্ষের রাতে বালুচরে ঊর্দ্ধলোক থেকে নেমে আসেন জ্যোৎস্নার দেবী, ফিনফিনে নরম ত্বক, বসনহীন নিরাভরন দেহে দীঘল চোখের মতন দুটি শ্বেতস্তন, মোম গোলানো এলোচুল চরাচরে বিছিয়ে দিয়ে মানুষের নাম ধরে ডেকে বেড়ান, যাদের নাম ধরে ডাকেন তারা যদি ভুলেও ওদিকপানে যায় তাহলে আর ঘরে ফেরে না।&nbsp; ডেকে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলেই বোধহয় বিস্তীর্ণ চরের নাম হয়েছে ভুলোর চর।</p>



<p>আরও শোনা যায়, ওই মেয়ের নাগর তারপর নাকি মরেছিল গলায় দড়ি দিয়ে, ভুলোর চরের পুবে যে অতিকায় অশ্বত্থ গাছ আছে তার একটি পুরাতন ডালে…হ্যাঁ, আপনার অনুমান যথার্থ, এই হল সেই অশ্বত্থ যার তলায় নিঝুম চৈতি দ্বিপ্রহরে বসে থাকেন আমাদের দেবতা আশুতোষ, যাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বিস্মৃত কৈশোরে!</p>



<p>সেদিনও বেলা একটু গড়াতেই ওইরকম বেপথু বাতাস বইতে শুরু করল আর আমিও গামছায় ফুলো ফুলো আউশ চালের মুড়ি, দুটি শশা আর একখানি পাকা বেল বেঁধে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম।&nbsp; ফেরার ঠিকানা নাই, সাঁঝ ঘনিয়ে আসার আগে ফিরলেই হবে! বড়ো দিঘির পাশ দিয়ে রাস্তা, তারপর রেললাইন পার হয়ে কলুদের মাঠ, একাকিনী পথ, বামহাতে বিশ্বাসদের বাঁশবাগান, পথের দুপাশে ঘেঁটু ফুলের ঝোপ, চোরকাঁটা, নয়নতারা ফুল, লজ্জাবতী লতা…আরও কয়েক পা হাঁটলে চড়কতলার মাঠ, ভুলোর চর চোখে ভেসে উঠবে।</p>



<p>এই পথে সন্ধ্যায় থোকা থোকা জোনাক জ্বলে, ভুলি নাই, কিছুই ভুলি নাই, এখনও সব স্পষ্ট মনে আছে।&nbsp;</p>



<p>ইচ্ছা ছিল অশ্বত্থ তলার ছায়ায় বসে মুড়ি-শশা খাব আর অলস চেয়ে থাকব সেই কুহকিনী চরার দিকে, কেন কে জানে ওইরকম কাঁচা বয়সে ভুলোর চর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত! সেই ডাক অবশ্য আজও মুছে যায়নি।&nbsp;</p>



<p>তা মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক, চিরদিনের নিয়ম!</p>



<p>চড়কতলায় পৌঁছে দেখি বুড়ো অশ্বত্থের ছায়ায় আশুতোষ বসে রয়েছেন, মাথায় ভাঙা চাঁদ, পরনে মলিন বাঘছাল, সারা দেহে ছাই, গলায় আবার নীল রঙ! ডম্বরুটি পাশে রাখা, ত্রিশূল কিন্তু নাই।&nbsp; আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে গাঁজা খাওয়া ভাঙা গলায় বললেন, ‘বিড়ি দ্যা না একখান, বাপজান!’</p>



<p>আমি তো কথা শুনে একগাল মাছি! বললাম, ‘বিড়ি খাইনা আমি!’</p>



<p>‘সে কী অলুক্কুনে কতা রে বাপ, বিড়ি খাসনে তো চলে কী করে তোর!’</p>



<p>শুধোলাম, ‘তুমি কে বলো দেখি? এত খতেন কীসের তোমার?’</p>



<p>তারপর কত কথা, কত কথা! ছায়া দীর্ঘ হল, অপরাহ্নের রেণু আর বাতাস জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার হয়ে গেল কখন যেন, আমাদের কথাগুলিও ডানা মেলে উড়ে গেল ভুলোর চরের পানে, সে-সব কথা জমিয়ে রাখলে আজ আপনাদের শোনাতে পারতাম।&nbsp; কিন্তু আমার দ্বারা যে সঞ্চয় হয় না, যত্র আয়, তত্র ব্যয়, কী করব বলুন, কথায় বলে, অভ্যেস যায় না ম’লে!</p>



<p>তবে এটুকু মনে আছে, পাকা বেলটি আশুতোষের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, ভারি তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল খুবই খিদে পেয়েছিল!</p>



<p>খেতে খেতে গলায় আলগোছে হাত বুলিয়ে কেমন যেন করুণ গলায় বললেন, ‘দ্যাক, এই অং মাকলি গা কুটকুট করে!’</p>



<p>ছেলেমানুষি সুরে শুধোলাম, ‘তা গলায় মাখো কেন রঙ?’</p>



<p>প্রসন্ন মুখে বুড়ো দেবতা বললেন, ‘না মাকলি চলবে! কত বচ্চরের অব্যাস! সেই কবে বিষ খাইচেলাম তার ট্যালা সামলাও একন!’, কথা শেষ করেই গুনগুন করে গান ধরলেন, ‘চিড়নে চুড়িয়া চুল, খোঁপায় দিয়া, হা রে, চম্পা ফুল, ফুলের গন্ধে কেড়ে লেয় প্রাণের যুবতির কুল! সুন্দরী তুই তো বড় রূপসী,আমি একটু হইছি বুড়া, তাতে তোর ক্ষেতি কি?’</p>



<p>ওই একবারই মাত্র দেখা হয়েছিল, তারপর আর কখনও সাক্ষাত হয়নিকো!</p>



<p>গতকাল বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম বড়ো রাস্তার ধারে দুজন লোক শালু পেতে পয়সা ভিক্ষা করছে।&nbsp; পরনে লাল কাপড়, খালি গা, কপালে খড়িমাটির তিলক, সুর টেনে টেনে বলছে, ‘দুদিন এলি এই ভবে, দুদিন পরে যেতে হবে,খামারবাড়ি খামারজমি, সময় হলে যাবে ছাড়ি!’</p>



<p>বুঝলাম চড়কের সন্নিসি, অবাকও হলাম একটু, এই ইলিকঝিলিক শহরে এরা এখনও বেঁচে আছে! চোখের পলকে মধুমাসের বাতাসে ভর করে ছুটে এল রাম বাগদি!</p>



<p>সখী সাজবে এবার রাম বাগদি।&nbsp; সস্তার জরিপাড় শাড়ি, পরচুলো, কানে ঝুটো সোনার মাকড়ি,পায়ে মল,নীল রঙ সারা মুখে। আরেকজন কেউ পরবে মিথ্যে বাঘছাল, প্লাস্টিকের চাঁদ লাগাবে পরচুলো জটায়, হাতে টিন কাটা ত্রিশূল, গলায় বৈঁচি ফুলের মালিকা।&nbsp; নীল পুজোর রাতে বিয়ে হবে ওদের—শিব আর লীলাবতী, বাসর জাগবে সন্নিসির দল,কচি বেতের নলা দিয়ে শোল মাছ রাঁধা হবে, যতেক ভূত পেত্নীর সেদিন নেমতন্ন।</p>



<p>পোড়া অশ্বত্থ তলার মাঠে পরদিন চড়কের মেলা, নাগরদোলা আসবে, হরেক মাল—যা নেবে সব দশ টাকা, দশ টাকা! গণপতি জাদুকর খেলা দেখাবে খালি হাতে, দড়ির খেলা, শূন্য কলস থেকে জল ঢালার খেলা, তারপর চড়ক গাছে চড়ে পিঠে বর্শা গেঁথে বোঁ বোঁ করে পাক খাবে জোয়ান সন্নিসিরা।&nbsp;&nbsp;</p>



<p>আরও রাতে সন্নিসির দল কাঁচা আতুড়ে ছেলের লাশ তুলে এনে শুরু করবে মরা খেলা।&nbsp; বাঁশের ডগায় দেহ পুঁতে ডম্বরুর তালে তালে নাচাবে রাতভর, বৈরিগি বাতাসে ধুনির আগুন লকলক করে জেগে উঠবে তখন—রাঢ়দেশকে সাক্ষী রেখে শুরু হবে মড়াখেলার প্রাচীন গুহ্য উৎসব।</p>



<p>এমনই তো ছিল আমাদের বঙ্গদেশ, কোথা থেকে কী যেন সব হয়ে গেল! ভিনদেশির ইশারায় নির্বাপিত হল তুলসীতলার শ্রীদীপ, লোকাচার-দেশাচার মুছে আমার শ্যামলী বাংলায় কারা যেন বাতাসে মহাভুজঙ্গের তীব্র শিস তুলে ছুটে এল, তাদের মুখে ‘হর হর মহাদেও’ ধ্বনি।&nbsp; আমাদের সদাপ্রসন্ন, ঈষৎ পৃথুল, আলাভোলা, গৌরীকে অভাবে রাখা, গাঁজা খেয়ে শ্মশান-মশানে পড়ে থাকা আশুতোষ তো এমন ছিলেন না!</p>



<p>রাস্তার কোলাহলে সহসা ভেঙে গেল চটকা!</p>



<p>চারপাশে গাঢ় বিকেল, দু এক টুকরো মেঘ সূর্যকে আড়াল করে ছিন্ন মায়াতন্তু রচনা করেছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম অনেকক্ষণ।&nbsp; কেমন যেন অবাস্তব ওই দুজন সন্নিসি—আকন্দের ঝোপ নাই, ঘেঁটু ফুল নাই, বৈঁচি বেলগাছ রায়চৌধুরীদের শ্যামদিঘি কিছুই নাই।&nbsp; ধুলোমাখা অতিকায় শহরের রাজপথে গাজনের গান গাইছে তারা, কে চেনে এখানে ওদের ? কেই বা দেবে দুটো পয়সা ?</p>



<p>চোখ বন্ধ করে পুনরায় ফিরে গেলাম আমার চেনা বাংলায়…শ্যামদিঘির ঘাট পার হয়ে সেই অকালমৃতা যুবতির মন-পাল্কি ভুলোর চরে আহত অভিমানের মতো পাখা মেলে ছুটে চলেছে, দুপাশে অপরাহ্নের বসতবাটি, সাদা আঁশের মতো শেষ বেলার আলো গড়িয়ে পড়ছে যেন কোথা থেকে, চৈত্রপবন গৃহদাহের সুবাসে আমোদিত…ওই আখ্যান ডাকছে এবার আমাদের, বেলা পড়ে এল হে বাজনদার, চলো রওনা দিই!</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/story-by-sayantan-thakur/">বুড়ো আশুতোষ আর নিঃসঙ্গ চৈত্র</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/story-by-sayantan-thakur/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সনাতনের গুপ্তধন</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/sanataner-guptadhan-bengali-short-story/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/sanataner-guptadhan-bengali-short-story/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 09 Jan 2026 10:31:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=10111</guid>

					<description><![CDATA[<p>ঝিলের তলায় নাকি লুকিয়ে আছে সোনা- দানা,হিরে -মানিক।পাহারা দেয় অতৃপ্ত আত্মারা।</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/sanataner-guptadhan-bengali-short-story/">সনাতনের গুপ্তধন</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সুমন্ত্র মিত্র</p>



<p>এ কাহিনীর সময়কাল সত্তরের দশকের শেষের দিকের গ্রামবাংলা।শেয়ালদা থেকে&nbsp; টাকি লাইনে নির্জনে পড়ে থাকা মালতীপুর এই বাংলার অন্যান্য অনেক নাম না জানা গ্রামের মতোই যেখানে&nbsp; শীত এলে বাতাসে একটা আলাদা গন্ধ ভাসত খড়ের গাদা, শুকনো পাতা, জ্বালানির কাঠ আর দূরের কুয়াশামাখা জলের সোঁদা গন্ধ। নদী না হলেও &#8211;</p>



<p>ঝিলটার ঠিক পাশেই ছিল এক পুরোনো ভগ্নপ্রায় বাড়ি লোকমুখে যার নাম সনাতন বাবুর জমিদার বাড়ি।প্রায় ১০০ বছর আগে জমিদারবাড়ি হলেও এখন তালপুকুরে ঘটি ডোবে না।</p>



<p>এই বাড়ি আর তার ইতিহাস সম্পর্কে দু&#8217;চার কথা বলা প্রয়োজন।&nbsp;সনাতন বাবুর প্রপিতামহ রামরতন সরকার ইংরেজদের দপ্তরে সামান্য কর্মচারী থেকে কী করে এতো বড়োলোক হলেন&nbsp; সেই নিয়ে গ্রামের লোকেদের নানা ফুসফাস কালের গভীরে অন্তর্হিত হলেও আদতে বনগ্রামের বাসিন্দা হয়েও কেন এই নির্জন অখ্যাত মালতীপুরে একটি ছোট হলেও জমিদারবাড়ি বানিয়েছিলেন সেই নিয়ে সরেস কুখ্যাতি আছে ,শোনা যায় ওনার বিলাসিনী নামে এক ইয়ের জন্য এখানে এই বড় বাগানবাড়ি বানিয়েছিলেন এবং শেষের দিকে কলকাতার সব কিছু ছেড়ে এখানে থাকতে শুরু করেছিলেন।ওনার ছেলে কালীচরণ কলকাতায় বাবার টাকায় ব্যবসা করে আরও সম্পদশালী হওয়ার পরে বোধহয় বাবার মতো লাম্পট্য আর অতিরিক্ত মদ্যপানের কুপ্রভাবে মাত্র ৫২ বছর বয়েসে ইহকাল ত্যাগ করলে পুত্র পঞ্চাননকে কঠোর শাসনে মানুষ করেন মা তরুবালা।</p>



<p>ধনী পরিবারে জন্মালেও পঞ্চাননকে প্রথমে পাঠশালা ও পরে মেট্রোপলিটান স্কুলে ভর্তি করে দেন।এরপর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষে গডফ্রে ফিলিপস কোম্পানিতে হেড ক্লার্ক ও পরে ম্যানেজারের পদে সুনামের সঙ্গে কাজ করে অবসরের পর আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি আসক্ত হন এবং বৈষয়িক এবং আমোদ প্রমোদ প্রায় সব পরিত্যাগ করে বৈরাগ্যের,নির্জনে ধ্যান ও লোকালয় থেকে দূরে এই মালতীপুরের বাড়িতে বেশি করে থাকতে শুরু করেন।মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতেন আবার যখন ফিরতেন তখন সঙ্গে থাকতো একটা ছোট বাক্স।বাবার&nbsp; প্রভাবে কিনা বলা শক্ত তবে অনেকে মনে করেন যে সনাতন ছোট থেকেই একটু বেশি চুপচাপ ,একা থাকতে ভালোবাসতো।পড়াশোনায় মধ্যমানের কিন্তু বই পড়া ছাড়া আর অন্যদিকে তেমন ঝোঁক ছিলোনা,মিশুকেও নয়।কলেজের পড়া শেষ করার পর বাবার অফিসে চাকরিতে ঢুকে বছর দশেক চাকরি করার পর চাকরি ছেড়ে মালতীপুরের বাড়িতে একা থাকা স্থির করে।মায়ের শত অনুরোধে বিয়ে করা তো দূর কারুর সঙ্গে মেলামেশা প্রায় করেনা বললেই চলে। শখ কেবল দুটো,প্রচুর বই পড়া আর নতুন টেকনোলজির দিকে।&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img fetchpriority="high" decoding="async" width="743" height="193" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-1.jpeg" alt="" class="wp-image-10174" style="aspect-ratio:3.849740932642487;width:518px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-1.jpeg 743w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-1-300x78.jpeg 300w" sizes="(max-width: 743px) 100vw, 743px" /></figure>



<p>বাড়িটা আসলে বাড়ি নয়, যেন সময়ে ফেলে রাখা একখানা স্মৃতি। দেওয়ালের চুন উঠে গেছে, ছাদে শ্যাওলা, জানালার পাল্লা আধখানা ভাঙা। বাড়িটাকে ঘিরে ছিল বিশাল বিশাল আম, জাম, লিচু, বট আর বাঁশের জঙ্গল। শীতে পাতাঝরা ডালে ডালে বসত অচেনা পাখি, আর সন্ধ্যা নামলেই সেই বাড়ির ছায়া ঝিলের জলে এমনভাবে পড়ত, যেন জলেও কেউ দাঁড়িয়ে আছে।</p>



<p>এই বাড়িতেই থাকেন  সনাতন বাবু , বয়স আশি ছুঁইছুঁই। রোগা, লম্বা, কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীর, কিন্তু চোখদুটো আশ্চর্য রকম উজ্জ্বল।এখনকার প্রজন্মের  গ্রামের কেউ জানেনা, তিনি একসময় কী ছিলেন।  <strong>বয়স্কদের কাছে অবাক ও আশ্চর্যের বিষয় এত ধনী একজন মানুষ কেন এই পোড়ো ভূতের বাড়িতে একা থাকেন এবং যে ধন সম্পত্তির কোনও চিহ্ন দেখা যায় না।</strong></p>



<p>সনাতন বাবুর সঙ্গে থাকেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী গদাই। চল্লিশ বছরের বিশ্বস্ত ভৃত্য। চুলে পাক ধরেছে, হাতে শক্তি কমেছে, কিন্তু সনাতন বাবুর প্রতি তাঁর আনুগত্যে কোনওদিন ভাঁটা পড়েনি।গদাই রাঁধুনি,বাজার সরকার ,সনাতন বাবুর দেখভাল ফাই ফরমাশের একমাত্র সম্বল।</p>



<p>শীতের সকালে গদাই উনুনে আগুন ধরাতেন, খড়কুটো জ্বালিয়ে। সনাতন বাবু লেপ মুড়ি দিয়ে বসে থাকতেন, ঝিলের দিকে তাকিয়ে। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর হঠাৎ বলতেন,</p>



<p>“গদাই, ঝিলটার জল আজ বড় শান্ত, তাই না?”</p>



<p>গদাই মাথা নাড়ত, “হ্যাঁ বাবু। শীতে জল বুঝি কথাও কম বলে।”</p>



<p><strong>গ্রামে প্রচলিত গল্প  ছিল এই ঝিলের তলায় লুকিয়ে আছে গুপ্তধন। ব্রিটিশ আমলের ধন, না জমিদারদের সোনা দানা কেউ জানত না। তবে সবাই জানত, সেই ধন পাহারা দেয় অতৃপ্ত আত্মারা। রাতের বেলা নাকি ঝিলের ধারে অনেকে দূর থেকে ছায়াময় অশরীরীদের স্বচক্ষে দেখেছে এবং  কান পাতলে শোনা যায় চেনা ভাষায় অচেনা ডাক।</strong> আগে যারা তাঁদের দেখেছে তারা আর ওই তল্লাটে সন্ধ্যের পর যাওয়ার কথা কল্পনাও করেনা ,আর এই কিছুদিন আগে  ট্রেনের তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে  রাত ১১টার সময় কলকাতার সমবায় দপ্তরের সুপারভাইজার শশাঙ্ক সাহা দেরি হয়ে গেছে বলে স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরতে শর্টকাট করতে ঝিলের ধার দিয়ে যাওয়ার সময় দূরে অস্পষ্ট সাদা প্রেতচ্ছায়া দেখে অজ্ঞান হতে হতে সামলে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরার পর তুমুল জ্বরে পড়েছিলেন।    </p>



<p>এই সব শুনে&nbsp;বড় হয়েছে গ্রামের তিন দুঃসাহসী ছেলে বাপন, লালু আর নিতাই। বয়স চোদ্দ -পনেরো। স্কুলের চেয়ে সাহসের গল্পে তাদের আগ্রহ বেশি। শীতের সন্ধ্যায় খেলাধুলোর পর মাঠের ধারে গাছের ডাল আর পাতা পুড়িয়ে আগুন পোয়াতে ওরা প্রায়ই বলাবলি করত যে&nbsp; এ সবই ভয় দেখানো। গুপ্তধন থাকলে কেউ তো পাবে!নিতাই চোখ বড় করে বলত, চল, আমরা চেষ্টা করি।</p>



<p>এমন কিছুদিন কথাবার্তা তর্ক বিতর্কের পর ওরা ঠিক করল যে ব্যাপারটার শেষ দেখে ছাড়তে হবে কিন্তু যেন কাকপক্ষীতে টের না পে ,বিশেষ করে যার যার বাড়িতে কারণ এই দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চারে কারুর বাড়ির বাবা মা বা পাড়ার কোনো সিনিয়র সম্মতি তো&nbsp; দেবেই না বরং বাগড়া দেবেই।</p>



<p>কথা ফাইনাল হয়ে গেল যে আগামী ২০ তারিখ ডিসেম্বরের বড়দিনের ছুটি পড়ার দিনেই অভিযান চালানো হবে কারণ ওই দিন স্কুল শেষের পর ছুটি পড়ে যাওয়ার জন্য বড়োরা ছেলেদের ফিরতে একটু দেরি হলেও সেটা প্রশ্রয়ের চোখে দেখেন।</p>



<p>সেদিন&nbsp; সন্ধ্যায়, কুয়াশা যখন ঝিলের ওপর সাদা চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে, তিনজন সনাতন বাবুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল,ওরা তিনজনেই ভালো করে সর্ষের তেল মেখে এসেছিল&nbsp; আর তিনজনের সঙ্গে ছিল বড় তোয়ালে দড়ি শাবল আর টর্চ । বাড়ির ভেতর আলো জ্বলছে ম্লান কেরোসিনের আলো।</p>



<p>বাপন ফিসফিস করে বলল, “সনাতন দাদু আর গদাই জেঠু নাকি সব জানে।”</p>



<p>লালু বলল &#8216;এখন কথা বলে সময় নষ্ট করা যাবে না।আমি জামাকাপড় ছেড়ে জলে নামছি টর্চ আর দড়ি নিয়ে ,কিন্তু ডুব সাঁতার হলেও বেশি নিচে নামতে পারবো না আর এই অন্ধকারে জলের তলায় টর্চের আলো কাজ করবে কিনা জানি না,কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে।&#8217;</p>



<p>বাপন বলল ,&#8217;কুছ পরোয়া নেহি,তুই না পেলে অন্য দিকে আমি,আর তার পর আরো অন্য দিকে নিতাই ট্রাই করবে।আর আজ না পেলে আবার পরে অন্য প্ল্যান করতে হবে।</p>



<p><strong>লালু একবুক  দম নিয়ে আস্তে করে জলে  নেমে গেল।বাপন আর নিতাইয়ের বেশ ভয় করলেও কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলছিল না।একটু পরে লালু উঠে এসে বলল, &#8216;না,পেলাম না কিন্তু টর্চের আলোয় ঝিলের ওই ধারে সিঁড়ির মতো কিছু একটা দেখেছি জলের নিচে।&#8217;</strong></p>



<p>এবার বাপন বলল,&#8217; আমি নামছি&#8217;।এবারে বাড়ির অন্য দিকে যেখানে জঙ্গল বেশি ঘন সেখানে গিয়ে দেখল সত্যি প্রায় চোখে না পড়ার মতো মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো ভাঙা সিঁড়ি জলে নেমে গেছে।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img decoding="async" width="380" height="373" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-2.jpeg" alt="" class="wp-image-10171" style="aspect-ratio:1.0187667560321716;width:518px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-2.jpeg 380w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-2-300x294.jpeg 300w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/01/WhatsApp-Image-2026-01-12-at-2.11.33-PM-2-50x50.jpeg 50w" sizes="(max-width: 380px) 100vw, 380px" /></figure>



<p><strong>বাপন &#8216;জয় মা&#8217;বলে একটা শক্ত দড়ি কোমরে জড়িয়ে  জলে নেমে প্রথমে কিচ্ছু দেখতে পেল না,সব কুচকুচে কালো,কিন্তু একটু পর ওই ঘন কালো অন্ধকারে চোখ সয়ে জোর পর টর্চ জ্বেলে দেখলো খুব অস্পষ্ট হলেও সিঁড়ির নিচে কিছু একটা আছে ,এদিকে ওই মারাত্মক শীতে কাঁপতে কাঁপতে সাহস এবং সংকল্পের শেষটুকু সম্বল করে মরীয়া হয়ে জলের আরো গভীরে নামার পর হাতে শক্ত কিছু ঠেকতে বুঝতে পারল এটাই সেই কাঙ্খিত সিন্দুক।</strong> এর পর কোমরের দড়ি দিয়ে সেই সিন্দুক কোনোরকমে বেঁধে খুব কষ্ট করে কারণ ওর মনে হচ্ছিল আর কিছু পরেই ওর দম শেষ হয়ে যাবে   ওপরে উঠে মুখ হাঁ করে অনেকটা প্রস্বাস নিয়ে বিজয়ীর মতো দড়ির প্রান্ত নিয়ে লালু আর নিতাইয়ের হাতে দেওয়ার পর আস্তে আস্তে একটু একটু করে যেমন ছিপে বড় মাছ ধরা পড়লে তুলতে হয় তেমন করে কিছুক্ষণ পর সিন্দুক পাড়ে তুলে আনলো।</p>



<p>কিন্তু ওরা টের পায়নি কখন ওদের পেছনে এসে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন সনাতনবাবু এবং গদাই আর ওদের দুজনেরই হাতে বড় তেলমাখানো বাঁশের লাঠি।</p>



<p><strong>&#8216;গুপ্তধন উদ্ধার হলো ?&#8217;</strong></p>



<p>বাপন লালু আর নিতাইয়ের পেছন থেকে এই শান্ত গম্ভীর অথচ কঠিন গলায় এই কণ্ঠস্বর শুনে প্রচন্ড&nbsp; ভয় আর আতঙ্কে&nbsp; ওদের শিরদাঁড়া হিম হয়ে গেল।পেছনে&nbsp; ফিরে সনাতনবাবু আর গদাইকে দেখে ওদের মনে হল আজই ওদের পৃথিবীতে শেষ দিন।</p>



<p>কিন্তু ওদের অবাক করে শান্ত গলায় সনাতন বাবু বললেন, &#8216;ভেতরে এসো।এই&nbsp; শীতে ভেজা শরীরে&nbsp; বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে নিউমোনিয়া হবেই।&#8217;</p>



<p>ওরা ধীরে ধীরে সনাতনবাবুর বাড়িতে ঢোকার পর সনাতনবাবু গদাইকে বলায় লালু আর বাপনের জন্য দুটো বড় গামছা এল সঙ্গে দুটো গেঞ্জি আর ধুতি। ভিজে পোশাক পরিবর্তন করে ওদের হাতে গরম দুধের গেলাস তুলে দিয়ে বললেন,&#8217;আজ তোমাদের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে তাদের মাথার খুলি ফেটে যেত।কিন্তু এবার বলতো তোমাদের এত সাহস হলো কি করে ?এই অসাধ্যসাধন করলে কি করে আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তোমরা এখন কি করবে অথবা তোমাদের নিয়ে আমি কী করব ?&#8217;</p>



<p>শেষের এই প্রশ্নের কি উত্তর হবে ওরা বুঝে উঠতে পারলো না কিন্তু বাপন বলল ,&#8217;দেখুন সনাদাদু আপনি আমাদের পুলিশে দেবেন না বাবা মার কাছে ধরিয়ে দেবেন এটা আমরা জানিনা এবং এটাও জানিনা আপনি বিশ্বাস করবেন কি না যে এই গুপ্তধন চুরি করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না আমরা শুধু অ্যাডভেঞ্চারের জন্য আর এতদিন লোকমুখে চলে আসা কথা পরীক্ষা করার জন্য এই কাজ করেছি।&#8217;</p>



<p>এর পর প্রায় ২০/২৫ মিনিট সনাতন বাবু চুপ করে ওদের দিকে পর্যায়ক্রমে শুধু দেখে গেলেন,ওদের মনে হচ্ছে প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে আর ওরাও চুপ করে বিচারের প্রতীক্ষায়।</p>



<p>এবারে সনাতন বাবু বললেন,&#8217;আমি তোমাদের একটা পরীক্ষা নিতে চাই।এবং এই পরীক্ষা তোমাদের তিনজনকে সারা জীবন দিয়ে যেতে হবে।তোমরা কি জান যে সিন্দুকে এই বিপুল ধনরত্ন আমি নিজে এই ঝিলের তলায় লুকিয়ে রেখেছি আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে থেকে।আমি জানিনা তোমরা আমাদের বংশ সম্পর্কে কি জান,কিন্তু অর্থলোভ এবং ভোগেচ্ছা মানুষকে তার মনুষ্যত্ব ভুলিয়ে কত নিচে নামাতে পারে আমি দেখেছি।আর লোভ আর ভোগ করার ইচ্ছে জয় করে আমি এখানে এই ভাঙা বাড়িতে পড়ে আছি , লোকজনকে ভয় পাওয়াতে ওসব ভূত প্রেত সব আমার সৃষ্টি,ওগুলো লেজার দিয়ে তৈরি ভূত তাই বর্ষাকালে ওদের দেখা যায়না কারণ বৃষ্টিতে এবং জোরে হাওয়া দিলে লেজারের কারিকুরি তৈরি হয় না তখন ঝোপের মধ্যে লোকানো সাউন্ড বক্স দিয়ে ওই আওয়াজ বাজানো হয়।&nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিন্তু ওসব কথা যাক ,তোমাদের পরীক্ষা হবে এই গুপ্তধন আবার যেখান থেকে তুলেছো ওখানে রেখে আসবে ,এই বিষয়ে মন্ত্রগুপ্তি শপথ নিতে হবে যে এর কথা কাউকে বলবে না।আমি ,গদাই চলে যাওয়ার পর তোমরা একটা ট্রাস্ট অথবা এনজিও&nbsp; তৈরি করবে,এই মালতীপুরের দুস্থ গরিব বাচ্চাদের পড়াশোনা ,এবং একটা হাসপাতাল করবে ,তোমরা বড় হলে আশাকরি তোমরাও জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং এই কাজে তোমরাও টাকা পয়সা দেবে।এই হলো তোমাদের পরীক্ষা এবং আমারও পরীক্ষা।তোমাদের পরীক্ষা তোমরা লোভ জয় করার, মন্ত্রগুপ্তি শপথ ধরে রাখার,আর আমার পরীক্ষা তোমাদের ওপর এতটা বিশ্বাস করার পরীক্ষা।‘&nbsp;</p>



<p>৩০ বছর পর</p>



<p>এখন বাপন অর্থাৎ সায়ন্তন বোস আমেরিকার জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং প্রফেসর।লালু অর্থাৎ ললিত দাস&nbsp; মানিপাল গ্রূপ অফ হস্পিটালসের রেকর্ডস ম্যানেজার আর নিতাই অর্থাৎ নিতিন&nbsp;&nbsp;&nbsp; বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষক।সনাতনবাবু,গদাই কেউ এখন আর নেই।সনাতনবাবু উইল করে তার স্থাবর অস্থাবর সব কিছু পরিবারের নামে দিলেও  এই বাড়ি আর জমি ওদের তিনজনের নামে দিয়ে গেছেন।এখন মালতীপুরে একটি উন্নতমানের প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্র এবং একটি মাধ্যমিক স্কুল হয়েছে।ওই গুপ্তধনের কিছু আর ওদের এনজিও মিলে তৈরি করেছে।বছরে একবার করে ওরা মালতীপুরে আসে।ঝিলের ধারে দাঁড়ায়। জলে তাকিয়ে তাদের মনে পড়ে সনাতনবাবুর কথা,যিনি ওদের লোভ জয় করতে শিখিয়েছিলেন আর বাপনের একটা কথা ওদের মনে গেঁথে গেছে।বাপন বলেছিল ,&#8217;দেখ এটা গুপ্তধন খোঁজার এবং পাওয়ার রোমাঞ্চ,সনাতনদাদুর জায়গায় অন্য কেউ হলে আমাদের মারধর,পুলিশ,বাবা মায়ের সন্মান এসবের অনেক ওপরে থেকে যাবে একজন মানুষ তাঁর আশ্চর্য বিবেচনায় তিনজন  কিশোরের জীবন বদলে দিয়েছিলেন এবং যার ফলে কতজন সাধারণ ,দুস্থ,অভাবী মানুষের ,মেধাবী ছেলেমেয়েদের উপকার হচ্ছে  সেটাই আসল। </p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/sanataner-guptadhan-bengali-short-story/">সনাতনের গুপ্তধন</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/sanataner-guptadhan-bengali-short-story/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>গ্ল্যাডিয়েটর</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-gladiator-by-antara-chatterjee/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-gladiator-by-antara-chatterjee/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Oct 2025 08:52:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9596</guid>

					<description><![CDATA[<p>“কালকে যে জিতবে,তাকে সম্রাট টাইটাস মুক্তি দেবেন শুনলাম”...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-gladiator-by-antara-chatterjee/">গ্ল্যাডিয়েটর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>অন্তরা চ্যাটার্জি</p>



<p>“এদিকে আরো একটু মাংস আর সব্জি…”</p>



<p>গলা তুলে বলল মার্সেলাস।</p>



<p>সঙ্গে সঙ্গে ডাইনিং হলের অন্যপ্রান্ত থেকে দ্রুতপদে দুজন পরিবেশনকারী এগিয়ে এল মার্সেলাসদের টেবিলে।একজনের ডেকচিতে ঘন ঝোলভর্তি ভেড়ার মাংস আর একজন এনেছে বিন আর কড়াইশুঁটি সিদ্ধ।রুটি ও ফলভর্তি ঝুড়ি নিয়েও এগিয়ে এল আরেকজন।মার্সেলাসদের টেবিলে গোল হয়ে বসেছিল ক্যাসিয়াস,তাফারি,এটিকাস কোয়ামে,মুসিনাস,বাটো,ভিক্টর,সিমাচিয়াস,ক্যালেন্ডাসরা।যে যতটা পারল মাংস,সব্জি আর ফল তুলে নিল পাতে।আগামীকাল কলোসিয়ামে ওদের মহাযুদ্ধের প্রদর্শনী।কালকের সূর্যের  আলো দেখলেও রাতে চাঁদের রশ্মি কে বা কারা দেখতে পাবে,কেউ জানেনা।তাই আজ রাতে ওদের লাস্ট সাপার বা শেষ ভোজের অনুরূপ আয়োজন করা হয়েছে।যত সব সুখাদ্য যে যত খুশি খাবে।অবশ্য এমনিতেই রোমের সবথেকে নামী প্রশিক্ষণশালা লুডুস ম্যাগনাসে ওরা নিয়মিতভাবে যথাযথ পরিমাণে পুষ্টিকর সুস্বাদু খাদ্য পায়।ওদের প্রশিক্ষণশালার মালিক ল্যানিস্টা সিলিয়াস ওদের শরীরস্বাস্থ্য যাতে ভালো থাকে,শরীরের প্রতিটি পেশী যাতে থাকে সচল ও কর্মক্ষম,অনাবশ্যক মেদ যাতে না জমে,দিনে একবার,প্রয়োজনে দুবার ঠান্ডা বা গরম জলে যাতে স্নান করতে পারে,যাতে ওদের রাতে সুনিদ্রা হয়,সেইসব খুঁটিনাটি ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নবান।কিন্তু যতই যত্নে থাকুক,একমাত্র  ক্যাসিয়াস ছাড়া ওরা সবাই ল্যানিস্টা র দাস।শুধু এই প্রশিক্ষণশালারই নয়,ওদের জীবন,পরিবার ও যেটুকু সম্পত্তি আছে সে সব কিছুরই মালিক তিনি।</p>



<p>ওরা সবাই গ্ল্যাডিয়েটর।এদের মধ্যে শুধুমাত্র ক্যাসিয়াস পেশাদার।সে এসেছে এই ভয়ঙ্কর মরণপণ খেলোয়ারি পরোয়ানা স্বেচ্ছায় মাথায় নিয়ে বিপুল অর্থ ও যশলাভের আশায়।তাফারি ও কোয়ামে হল রোমের বাজারে বিক্রি হওয়া আফ্রিকান ক্রীতদাস।বাটো একজন যুদ্ধবন্দী।জন্মসূত্রে সে সিরীয়।বাকিরাও প্রায় সবাই তাই।মার্সেলাস ছিল রোম শহরের এক মধ্যবিত্ত অস্ত্রনির্মাতা ও ব্যবসায়ী।বর্তমান সম্রাট টাইটাসের বিরুদ্ধে রোমান সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে পাকেচক্রে তার নাম জড়িয়ে পড়ে এবং সে গ্রেফতার হয়।রোম শহরের প্রান্তে যেটুকু সম্পত্তি ও সামান্য জমি ছিল তা বাজেয়াপ্ত করা হয়,তার গর্ভবতী স্ত্রীকে করা হয় নজরবন্দি।কিন্তু ইতিমধ্যে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তার স্ত্রী।বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা এবং সুস্বাস্থ্যের কারণে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার বদলে গ্ল্যাডিয়েটরিতে নিয়ে আসা হয় এবং ল্যানিস্টা সিলিয়াসের এই প্রশিক্ষণশালায় প্রায় দেড় বছরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।এখন সে একজন সেকিউটর অর্থাৎ যারা বড় ঢাল এবং ভারী গ্ল্যাডিয়াস বা তরোয়াল নিয়ে লড়াই করে।তার মুখে থাকে ধাতব মুখোশ ও মাথায় শিরস্ত্রাণ এবং বাঁ হাত ও কাঁধে ধাতব আবরণ। একই সঙ্গে আক্রমণ ও আত্মরক্ষায় সমানভাবে দক্ষ এই সেকিউটররা।আরো নানা বিভাগ আছে গ্ল্যাডিয়েটরদের মধ্যে।মুর্মিলোৱা আবার বড় ছোরা নিয়ে,ঢাল নিয়ে শুধুমাত্র মাথায় শিরস্ত্রাণ ও হাতের ধাতব বর্ম পরে লড়ে।আছে রেটিয়ারিরা,যারা মৎস্যজীবীদের মতো জাল আর ত্রিশূল নিয়ে ময়দানে নামে।দুহাতে দুটি তলোয়ার,কিংবা বর্শা,বল্লম ও ঢাল নিয়ে লড়ে এমন গ্ল্যাডিয়েটররাও আছে।বেষ্টিয়ারিরা বাঘ,সিংহ,হাতি,কুমির,ভল্লুকের মতো ভয়ঙ্কর প্রাণীর সঙ্গে লড়াই করে।কর্পোফোরাস নামে একজন বেষ্টিয়ারি একা প্রায় খালি হাতে এরকম কুড়িটি পশুকে যুদ্ধাঙ্গনে হত্যা করতে সমর্থ হন ও প্রবল জনপ্রিয় হন।আছে ল্যাসেরিয়াসরা,ওরা যুদ্ধে নামে শুধুমাত্র ফাঁসযুক্ত দড়ি নিয়ে,তাদের মজবুত বর্ম ও শিরস্ত্রাণ থাকেনা।তবে কোন অস্ত্র বা বর্ম নিয়েই লড়ার অনুমতি নেই নক্সি আর ড্যামনাটিদের।থাকলে থাকে চক্ষুকোটরহীন ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ ও মরচে পড়া পুরনো ভোঁতা তলোয়ার।অর্থাৎ অন্ধ ও এক অর্থে নিরস্ত্র হয়েই লড়তে হয় এদের।এরা আসলে মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধী।সবসময়,এমনকি খাওয়া এবং শোয়ার সময়েও হাতে পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে রাখা হয় তাদের।ময়দানে গ্ল্যাডিয়েটরদের সামনে এদের খালি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বলাই বাহুল্য অসম লড়াইয়ে স্বল্পক্ষণের মধ্যেই তাদের প্রাণ যায় দক্ষ গ্ল্যাডিয়েটরদের হাতে।</p>



<p>খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথাবার্তা চলছে।আগামীকাল কলোসিয়ামের বিশেষ আকর্ষণ মার্সেলাস ও বাটোর দ্বন্দ্বযুদ্ধ।এরা দুজনেই রোমের জনপ্রিয় গ্ল্যাডিয়েটর।বিগত পাঁচ বছরে অন্তত সাত আটটি কঠিনতম লড়াইয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়ে এরা জয়ী হয়ে টিকে আছে।রোম নগরীর মানুষের সীমাহীন কৌতূহল এদের দুজনের আগামীকালের দ্বন্দ্বযুদ্ধ নিয়ে।</p>



<p>“কালকে যে জিতবে,তাকে সম্রাট টাইটাস মুক্তি দেবেন শুনলাম”,বলল তাফারি।</p>



<p>“মুক্তি?আগে লড়াইয়ে জিতে বাঁচি!তারপর তো মুক্তির প্রশ্ন!”বললো মার্সেলাস।</p>



<p>“এই অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে দেশে ফেরা,মানুষের মতো জীবনযাপন করা সবই স্বপ্নের মতো মিথ্যা লাগে।বাবা মা হয়তো আর বেঁচে নেই,কিন্তু স্ত্রী পুত্র নিশ্চয়ই বেঁচে আছে।মরার আগে একবার কি পরিবারের সঙ্গে দেখা হবেনা?ঈশ্বর কি আমাকে একবারও করুণা করবেন না?”বাটোর গলা থেকে কথাগুলো যেন ঝরে পড়ল চাপা কান্না আর প্রার্থনা হয়ে।</p>



<p>“মুক্তি ছাড়া জীবনের কাছে আর কিছু কামনীয় আমারও নেই।কিন্তু ঈশ্বরের কৃপা আর ভাগ্যের জোর ছাড়া তা তো সম্ভব নয়।”দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো মার্সেলাস।</p>



<p>কথাবার্তার মাঝখানে একবার প্রহরী এসে তাড়া দিয়ে গেলো।ল্যানিস্টার নির্দেশ আজ বেশিক্ষণ রাতজাগা চলবেনা।অতএব আসর তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে।</p>



<p>“তাহলে অদ্যই শেষ রজনী,ভাই?”বাটোকে আন্তরিক স্বরে বললো মার্সেলাস।</p>



<p>বাটো গম্ভীর হয়ে জবাব দিলো,”কাল থেকে আমরা আর কেউ ভাই বা বন্ধু নই,আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী।আমি মুক্তি চাই।দেশে ফিরে দেশের মাটিতে মরতে চাই।এছাড়া জীবনে আমারও আর কিছু চাওয়ার নেই।এজন্য যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছলে বলে কৌশলে হত্যা করতে আমার এতটুকুও হাত কাঁপবে না,মনে রেখো।”</p>



<p>গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লো মার্সেলাস।ঠিকই।আগামীকাল দুজনের মধ্যে যেকোন একজন বাঁচবে।কারোরই হাত কাঁপবে অন্যকে মারতে।</p>



<p>ভোজপর্ব শেষ হতে চলেছে।বিশাল হলঘরের বৃহদাকার কাঠের টেবিলগুলো ক্রমশ খালি হয়ে আসছে।বড় বড় মশালগুলো একে একে নিভে আসাতে পাথরের দেওয়ালে দেওয়ালে নাচতে থাকা আলোছায়ার খেলাও ক্রমে ক্রমে শেষ হয়ে আসছে।মার্সেলাস ও তার সঙ্গীরা একে অপরকে আলিঙ্গন করে বিদায় নিলো।মার্সেলাস রওনা দিল অস্ত্রাগারের দিকে।তার সঙ্গে পাহারা দিয়ে চলছে দুজন সশস্ত্র প্রহরী।সে কালকের লড়াইয়ের জন্য একটি নতুন বর্ম বেছে নেবে।তার আগের বর্মটা গতবারের লড়াইয়ে অস্ত্রের আঘাতে দুতিন জায়গায় তুবড়ে ও ফুটো হয়ে গেছে।একটা নতুন শিরস্ত্রাণ ও পায়ের আবরণও তার দরকার।</p>



<p>মশালের আলোয় আলোকিত অলিন্দ পেরিয়ে একটা ছোট দরজা দিয়ে অস্ত্রাগারে ঢুকল মার্সেলাসরা।নানাবিধ অস্ত্র ও বর্মের বিস্ময়কর ভান্ডার থেকে সে বেছে নিল ট্রয়ের যুদ্ধের দৃশ্যখচিত পালক লাগানো একটি শিরস্ত্রাণ,দেবী আথিনার মূর্তিখচিত ধাতব পদাবরণ এবং রুপোর হালকা নকশা করা একটি লোহার বর্ম।সম্পূর্ণ সোনা বা রুপোর বর্মও রয়েছে সেখানে,কিন্তু সেগুলি প্রকৃত যোদ্ধারা কেউই নেয় না।সম্রাট বা রাজা রাজড়াদের কখনো কখনো শখ হয় ময়দানে নেমে লড়াইয়ের খেলায় মেতে ওঠার,তখন এই জাতীয় শৌখিন বর্ম তাঁরা অঙ্গে ধারণ করে থাকেন।অবশ্যই তাঁদের সেই লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেরে যেতে হয়।অনেক সময় হিংস্র পশুদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সাধ হয় তাঁদের।তখন বাঘ,ভল্লুকের থেকে উঁচুতে একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে তাদের অস্ত্রে বিদ্ধ করেন তাঁরা।</p>



<p>বাছাই শেষ হলে তার প্রিয় তরোয়ালটির মসৃণ গায়ে একবার হাত বুলিয়ে সে অস্ত্রাগারের বাইরে বেরিয়ে একই অলিন্দ পেরিয়ে মার্সেলাস&nbsp; চলে এল তার নিজের কক্ষে।প্রহরীরা চলে গেলে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল তার একফালি ঘরের ছোট শয্যায়।ঘরে একটিই ক্ষুদ্র পাল্লাবিহীন জানলা।পাথরের ভারী দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না সেই জানলা দিয়ে।বিছানায় শুয়ে দূরের কোন একটি মশালের আলোয় স্বল্পালোকিত সেই দেওয়ালের দিকেই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মার্সেলাস।প্রায় সব রাতই নিদ্রাহীন কাটে তার।আজ রাতে তো তার আর ঘুম আসার কোন সম্ভাবনাই নেই।</p>



<p>জানলার বাইরে পাথরের দেওয়ালটা ভেদ করে বহুদূর উড়ে চলল মার্সেলাসের মন তার স্মৃতির ডানায় ভর করে।রোম শহরের প্রান্তে ছিলো তার সেই ছোট ঘাসজমিওয়ালা বাড়ির লাগোয়া ছোট অস্ত্র কারখানা,যেখানে তার জন্য ও তার জনকয়েক কর্মচারীদের জন্য সকালে ও দুপুরে নিয়মিত নিজে হাতে খাবার রেঁধে আনতো তার স্ত্রী কর্নেলিয়া,একসাথে সবাই মিলে খেতো।পূর্ণিমার রাতে বাড়ির সামনে অলিভগাছটার নিচে হাতে হাত রেখে বসে থাকত দুজনে,ভবিষ্যতের সাদামাটা স্বপ্ন বুনতো।তার তৈরি অস্ত্রের সুনাম ও সুলভতার কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিলো রোম শহরে।অনেকেই অস্ত্র কিনতে আসত তার কাছে।কি করে জানবে মার্সেলাস এদের মধ্যে কারা ছিল বিদ্রোহী সৈন্য?একদিন দুপুরে খাওয়ার সময় তার বাড়িতে চড়াও হয় সরকারী আইনরক্ষক বাহিনী, টেনে হিঁচড়ে বিনা বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো তাকে।তারপর সে এলো ল্যানিস্টার এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে।তারপর মাসের পর মাস তরোয়াল চালনার নিরন্তর কঠোর অনুশীলন করে গেছে মার্সেলাস শুধুমাত্র একটি আশায়।মুক্তি।একজন গ্ল্যাডিয়েটর পরপর কঠিন লড়াইয়ে প্রবল প্রতিপক্ষকে যদি হারাতে পারে,তাহলে সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে তার মালিক অর্থাৎ ল্যানিস্টা বা সিজার তাকে জনসমক্ষে মুক্ত নাগরিক ঘোষণা করতে পারেন।এ ব্যতীত আত্মহত্যা ছাড়া একমাত্র মুক্তির উপায় হল অবসর গ্রহণ।সেটা প্রথমত চল্লিশ পয়তাল্লিশ বয়স অবধি লড়াই করে বেঁচে থাকলে,এবং অবশ্যই তা সিজার বা তার মালিকের ইচ্ছায়,নিজের ইচ্ছায় নয়।অবসরপ্রাপ্ত গ্ল্যাডিয়েটরদেরও অনেকসময় প্রশিক্ষক বা রেফারী হতে বাধ্য করা হয়। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের হৃদয়বিদারক মৃত্যুসংবাদ পেয়ে মার্সেলাস দেওয়ালের পাথরে মাথা কুটে কাঁদতে কাঁদতে অনেকবার নিজের অস্ত্রে গলা কেটে আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছে ।পারেনি।মুক্তি যদি মেলে,এই সুন্দর পৃথিবীর মুক্ত আকাশের নীচে আরেকবার দাঁড়িয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার বড় ইচ্ছে তার।তবে বাড়ি ফেরার আর মন নেই মার্সেলাসের।কি জন্য ফিরবে?কার জন্য ফিরবে?দরজা খুললেই তো ফাঁকা ঘরের শূন্যতা হাঁ করে গিলতে আসবে মার্সেলাসকে।ঘরে ঘরে বোধহয় এতদিনে ধূলোর পাহাড় জমেছে।সাপখোপ ছুঁচো ইঁদুরেরা ডেরা বেঁধেছে আনাচেকানাচে।বাড়ির সামনের ঘাসজমিতে কর্নেলিয়ার নিজে হাতে তৈরি করা গোলাপবাগান এতদিনে নিশ্চিত শুকিয়ে শেষ হয়ে গেছে!যদি মুক্তি মেলে তাহলে বিগত পাঁচ বছরের লড়াইয়ে যা পুরস্কারমূল্য পেয়েছে সে, সেটুকু নিয়ে সে ভ্রমণে বেরোবে।সে যাবে পম্পেই শহরে,অস্টিয়া এন্টিকা বন্দরে,নানা অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয় করবে,আলবান পর্বতের পাদদেশে ছবির মতো গ্রাম আর আঙ্গুর ক্ষেতগুলোতে ঘুরে বেড়াবে।আর তারপর যদি ইচ্ছে হয়,কিছু অর্থ বাঁচে,না হয় নিজের ভিটায় ফিরে আসবে সে,মৃত্যুর পর প্রিয় অলিভ গাছটার তলায় তার আর কর্নেলিয়ার পাশাপাশি দুটো সমাধিফলক স্থাপনের ব্যবস্থা করে যাবে।</p>



<p>তবে হ্যাঁ,সবই সম্ভব যদি..যদি কালকের মহাযুদ্ধে সে আদৌ জিতে উঠতে পারে।প্রতি লড়াইয়ের আগেই এই বিরাট “যদি”টা সীমাহীন অনিশ্চয়তার একটা কালান্তক খড়্গের মতো ঝুলতে থাকে তার মতোই সব যোদ্ধাদের সামনে।এই কয় বছরের মধ্যে কতজনই তো এলো গেলো।খনি শ্রমিক পলিনাইকাসের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিল মার্সেলাসের।পরপর তিনটি লড়াইয়ে জেতার পর চতুর্থবারের লড়াইয়ে মরতে হয় তাকে।আরেক যোদ্ধা গায়াস ময়দান থেকে জিতে ফিরেও চোট আঘাতের জের সহ্য করতে পারলো না।তরোয়াল নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে লড়তে তাকে মোকাবিলা করতে হয় একটি বাঘের সঙ্গে।প্রতিপক্ষ ও বাঘটিকে অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়ে হত্যা করতে সমর্থ হয় সে,স্বর্ণমুদ্রা ও বিজয়ীর সেরা সম্মান লরেল পাতার মুকুটও পুরস্কার পায়।কিন্তু মাথায় ভয়ঙ্কর চোট ও বাঘের নখের গভীর ক্ষতের সংক্রমণে মৃত্যু হয় গায়াসের।আফ্রিকার ক্রীতদাস কোফি তো এক অভাবনীয় কান্ড করেছিলো।তিনজোড়া গ্ল্যাডিয়েটরদের এক লড়াইয়ে সে অংশগ্রহণ করে।চিরমুক্তির আকাঙ্খায় মরিয়া হয়ে এরা সকলকে চমকে দিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ময়দানে দর্শকদের সামনে একে অপরকে হত্যা করে,যে পরিকল্পনার বিষয়ে ঘুণাক্ষরেও আগে থেকে কিছু টের পায়নি মার্সেলাসরা।</p>



<p>জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দোদুল্যমান একটা পলকা দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে চলে ওরা,জানেনা,শুরু থেকে শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারা যাবে,নাকি তার আগেই মরণখাদের অতল অন্ধকারে পতন লেখা আছে ওদের ভাগ্যে।</p>



<p>আজকের মহাযুদ্ধে মনে হচ্ছে জনতার চাপে যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে গোটা কলোসিয়াম।অন্তত একমাস আগে থেকেই রোম শহরের রাজপথে রাজপথে বিশাল বিশাল ক্যানভাসে যুদ্ধের আঁকা ছবি ও লেখা সহ বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।গতকাল রাত থেকে শহর ও শহরের বাইরের সমস্ত মানুষের গন্তব্য একটাই।কলোসিয়াম।অলিগলি রাজপথে শুধু পিঁপড়ের মতো চলমান মানুষের সারি।উৎসবের মেজাজে গরিব থেকে মহাধনী সমস্ত নাগরিকরা জড়ো হয়েছে কলোসিয়ামে।গ্যালারির সবথেকে উঁচুতলায় সাধারণ মানুষদের আসন।সেখান থেকে অনেক নিচে লড়াইয়ের দৃশ্য যে খুব ভালো করে দেখা যায় তা নয়,আর শব্দ তো তাদের কানে পৌঁছনোর সম্ভাবনাই নেই।কিন্তু সব থেকে বেশি চিৎকার আর হর্ষধ্বনি ভেসে আসে ওই উঁচুতলার থেকেই।মাঝের সারি নির্দিষ্ট ধনীদের জন্য।আর একদম নিচের তলা লাল ও সোনালী রেশমী কাপড়ে,রঙ্গিন পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।সেখানে, অর্থাৎ রণাঙ্গনের সবথেকে সামনে বসবেন মহামান্য সম্রাট এবং রাজন্যবর্গ।প্রচন্ড গরম আর রোদ আজকে।কলোসিয়ামের কর্মচারীরা গ্যালারিতে থেকে থেকে যন্ত্রের সাহায্যে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে দর্শকদের গায়ে।বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে মিষ্টি পানীয়,চিনি মাখানো বাদাম।পুরভরা খেজুর,শুকনো মশলাদার মাছ,চিজ দেওয়া ছোট গোল রুটি ইত্যাদি নানা লোভনীয় খাবার বিক্রিও হচ্ছে গ্যালারির সিঁড়িতে সিঁড়িতে।</p>



<p>আচম্বিতে তীক্ষ্ণ রবে বেজে উঠলো শিঙ্গা,গুড়গুড় করে বেজে উঠলো অসংখ্য ঢাক।খাস সভাসদবর্গ ও দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে সস্ত্রীক সম্রাট টাইটাস প্রবেশ করলেন ও আসনগ্রহণ করলেন।কলোসিয়াম ফেটে পড়ল&nbsp;&nbsp; সম্রাটের জয়ধ্বনিতে।আর দেরি নয়,দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে এখনই।সকলের দৃষ্টি নিবন্ধ ময়দানের চারপাশে সারি সারি বন্ধ বিশাল লোহার দরজাগুলোর দিকে।</p>



<p>দর্শকদের প্রতীক্ষা ও উদগ্র কৌতূহলের নিরসন ঘটিয়ে সশব্দে খুলে গেল একাধিক লোহার দরজা।কিন্তু দরজার ভিতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসছে না কেন?আসলে আজকে দুজন নক্সি অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীর খেলাচ্ছলে হত্যাপর্ব রয়েছে প্রথমেই।তাই ওই দুজন বেরোতে চাইছে না।দরজার পেছনে লুকিয়ে কাতর স্বরে মিনতি করছে যাতে ময়দানে না যেতে হয়।কিন্তু এতে কোন লাভ নেই।প্রথমে চাবুক মেরে আর তারপর গরম লোহার ছেঁকা দিয়ে তাদের বাধ্য করা হলো ময়দানে নামতে।তাদের পিছন পিছন এল জাল ও ত্রিশূলধারী গ্ল্যাডিয়েটর সিমাচিয়াস।উল্লাসে ফেটে পড়ল কলোসিয়াম।নিরস্ত্র নক্সিদের মধ্যে একজনের আবার সর্বাঙ্গ প্রায় অনাবৃত কিন্তু মুখে একটি চক্ষুবিহীন ধাতব মুখোশ,অর্থাৎ তাকে অন্ধ সেজে লড়তে হবে।ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলল সিমাচিয়াস।কিন্তু স্বল্প সময়ে পরই অধৈর্য্য হয়ে উঠল দর্শকরা।তারা সমানে সমানে লড়াই দেখতে চায়।অতঃপর সিমাচিয়াস ওদের একজনকে জাল ছুঁড়ে আবব্ধ করল।সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে আরেকজন এসে প্রাণপণে চেপে ধরল সিমাচিয়াসের গলা।দীর্ঘদেহী,বলশালী সিমাচিয়াস একঝটকায় ফেলে দিল তাকে এবং নিমেষে তার তীক্ষ্ণ ত্রিশূল বিদ্ধ করল পরপর দুজনকে।ওদের দুজনের রক্তাক্ত দেহ টেনে নিয়ে যাওয়া হল ভিতরে এবং মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে দেওয়া হল তাদের গলার নলি।এদের দেহ এরপর ফেলে দেওয়া হবে নদীর ধারের বর্জ্যস্তুপে।কোন ধরণের শেষকৃত্য বা সমাধি হবেনা এদের।</p>



<p>আজকের পরবর্তী আকর্ষণ মেভিয়া নামের একজন মহিলা গ্ল্যাডিয়েটরের সঙ্গে বন্য ভাল্লুকের যুদ্ধ।রণসজ্জায় সজ্জিত মেভিয়ার সর্বাঙ্গ বর্মে আবৃত কিন্তু বক্ষস্থল উন্মুক্ত।দর্শকদের উল্লসিত চিৎকারে কান ফেটে যাওয়ার অবস্থা।মেভিয়া তার ঢাল ও বর্শা উঁচিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বৃত্তাকারে পাক খেতে লাগল।হঠাৎ করেই উল্টো দিকের একটি লোহার দরজা খুলে গেল আর চাকা লাগানো লোহার খাঁচার খোলা দরজা দিয়ে লাফিয়ে নামল বিশালাকৃতির একটি মিশমিশে কালো ভাল্লুক।ভাল্লুকটা প্রথমে প্রখর সূর্য্যের আলোয়,উন্মত্ত জনতার মাঝে পড়ে&nbsp; হতভম্ব হয়ে গেল,তারপর ভয় পেয়ে আবার ঢুকে পড়তে গেলো খাঁচায়।কিন্তু তার আগেই তীরবেগে মেভিয়া ছুটে তার পিঠে বিঁধিয়ে দিল বর্শা।ক্ষিপ্ত ভাল্লুকটা তাড়া করল মেভিয়াকে।মেভিয়া ভাল্লুকটাকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানাদিকে ছুটতে লাগল।কিন্তু অতর্কিতে মরিয়া ভাল্লুকটা এক বিশাল লাফ দিয়ে মেভিয়াকে একেবারে মাটিতে পেড়ে ফেলল।দুজনের ধ্বস্তাধস্তি আর উথালপাথালিতে ধূলোর ঘূর্ণিঝড় উঠল ময়দানে।সাগ্রহে দর্শকরা সামনে ঝুঁকে পড়ল কি হয় তা দেখার জন্য।অবশেষে শোনা গেল ভাল্লুকটার মরণ আর্তনাদ।ধুলো থিতিয়ে যেতে দেখা গেল মেভিয়ার বর্শা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে ভাল্লুকের বুক।আর তার বিশাল দেহের তলা থেকে বেরিয়ে আসছে রণক্লান্ত মেভিয়া।গ্যালারিতে আরো একবার হর্ষধ্বনি উঠল,কিন্তু মহিলা যোদ্ধারা যতই দক্ষ ও নির্ভীক হোক না কেন,পুরুষ যোদ্ধাদের মতো জনপ্রিয়তা তাদের নেই।ফলে আরো একবার দর্শকদের অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পেল পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য।</p>



<p>আবার ঘর্ঘর শব্দে খুলে গেল কলোসিয়ামের নিচের দরজা।দর্শকদের বিস্ময়ে নির্বাক করে দিয়ে সেই দরজা দিয়ে প্রথমে ছুটে বেরোলো ঢাল ও কুঠার হাতে এক যোদ্ধা আর তার পিছন পিছন ও সরোষে ও সগর্জনে সুতীক্ষ্ণ খড়্গ উঁচিয়ে ধেয়ে এলো রণসাজে সজ্জিত একটি গন্ডার।তার আরোহীর মাথায়,হাতে,পায়ে চর্মাবরণ।তবে হাতে তার ঢাল নেই,শুধুই তরোয়াল।প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো জনতা।এই আরোহীকে রোমের জনতা চেনে।এর নাম গ্লসিও।দক্ষতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য খ্যাত এই গ্লসিও।তারা চেনে কোয়ামে নামে এই যোদ্ধাকেও।অত্যন্ত কৌশলী ও দ্রুতগামী এই কৃষ্ণাঙ্গ যোদ্ধা।সবেগে ধাবমান গন্ডারটিকে বেশ খানিকটা দৌড়তে হলো কোয়ামের পিছনে।তারপর অবশ্য ধরে ফেলল কোয়ামেকে,কিন্তু ততক্ষণে বেশ খানিকটা ক্লান্ত হয়ে গেছে গন্ডারটা।কোয়ামে গন্ডারটার পাশে পাশে দৌড়তে দৌড়তে সজোরে কুঠার হানলো গ্লসিওর পায়ের পাতায়।রক্ত ছিটকে উঠলো তার জুতোর মধ্যে থেকে।এই অপ্রত্যাশিত আঘাতের জন্য প্রস্তুত ছিলো না গ্লসিও।ভারসাম্য হারিয়ে বাহনের পিঠ থেকে পড়ে গেলো সে।তরোয়ালে ভর দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালো সে,কিন্তু তীব্র যন্ত্রণার সাথে সে বুঝতে পারলো পায়ের পাতার কিছুটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।এগোতে গিয়ে সেই কাটা মাংসের সাথে জুতোর চামড়ার ঘর্ষণের বেদনায় ককিয়ে উঠলো সে।খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তবু সে এগোতে লাগলো তার প্রতিপক্ষের দিকে।ওদিকে ঢাল ও কুঠার হাতে প্রস্তুত কোয়ামে আড় চোখে দেখে নিলো তার ঠিক পিছনেই গন্ডারটা দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।দ্রুতগতিতে মাথা খাটাতে লাগলো কোয়ামে সামনে পিছনে দুজন শত্রুকে কিভাবে মোকাবিলা করা যায়।শরীর ও মস্তিষ্কের প্রতিটি পেশী টানটান করে অপেক্ষা করতে লাগলো কোয়ামে।গন্ডারটা ধুলো উড়িয়ে ক্ষুর ঘষছে মাটিতে।এবার তেড়ে এলো বলে। ওদিকে গ্লসিও এগিয়ে আসছে।দুজনকেই এগিয়ে আসতে দিল কোয়ামে।দর্শকরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখছে কি হয়।মাত্র হাত দেড়েকের পার্থক্য থাকতে থাকতে বিদ্যুৎগতিতে কোয়ামে ওদের মাঝখান থেকে সরে গেল আর গন্ডারের তীক্ষ্ণ খড়্গে গেঁথে গেল গ্লসিওর দেহ।উঠে দাঁড়িয়ে মহানন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো কলোসিয়ামের সমস্ত দর্শক।কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।গ্লসিওকে ঝেড়ে ফেলে গন্ডারটা আবার এগিয়ে আসছে কোয়ামের দিকে।হাতের কুঠারটা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে সেও এগিয়ে গেলো ক্রুদ্ধ পশুটার দিকে,মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে পাশে এসে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুঠারের আঘাত হানল গন্ডারের একমাত্র খোলা ও নরম জায়গা চোখ ও চোখের পাতার উপরের অংশে।এবার কাবু হলো মারাত্মকভাবে আহত জন্তুটা,ভয়ে সরে গেলো দেওয়ালের দিকে।সেখানেই একটা লোহার দরজা খোলা পেয়ে ভয়ার্ত আর্তনাদ করতে করতে ভিতরে উধাও হয়ে গেলো।কোয়ামে এবার এগিয়ে গেলো ভূলুণ্ঠিত গ্লসিওর দিকে।গ্লসিওর পেট ও পা থেকে রক্ত ঝরে ঝরে ক্রমাগত মিশছে রণাঙ্গনের ধূলোয়।কোয়ামেকে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করলো সে কিন্তু কোমর থেকে বাকিটা আর তুলতে পারলো না।খুব সম্ভবত কোমর কিংবা মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে তার।তার দেহের দুপাশে পা রেখে উদ্যত কুঠার শূন্যে তুলে দাঁড়ালো কোয়ামে।অতি কষ্টে গ্লসিও হাতের একটা আঙ্গুল তুলে ধরলো।এর অর্থ সে জীবনভিক্ষা চাইছে।এই মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে বধ করার সম্পূর্ণ সুযোগ থাকলেও সেটা করতে পারবেনা কোয়ামে।গ্লসিওর বাঁচা মরা এখন নির্ভর করছে সম্রাট ও জনতার ওপর।গ্যালারির প্রতিটা তলা থেকে উন্মত্ত জনতা সমস্বরে চিৎকার করতে লাগলো “ মৃত্যু” “মৃত্যু” “মৃত্যু”&#8230;.শব্দটা ক্রমশ একটা মন্ত্রোচ্চারণের মতো হয়ে উঠে কানে তালা ধরিয়ে দিতে লাগলো।।সম্রাট টাইটাসের মুমূর্ষু গ্লসিওকে জীবনদানের ইচ্ছা থাকলেও জনতার ইচ্ছাই মেনে নিতে হলো তাঁকে।কারণ কলোসিয়ামের এই বৃহদাকার অঙ্গন শুধুমাত্র এক ভয়ানক ক্রীড়াভূমি নয়,রাজনৈতিক জনপ্রিয়তারও এক মহত্ত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।জনপ্রিয়তার খাতিরে জনতার চাহিদা মেটাতেই হবে তাঁকে।তাঁর নিম্নাভিমুখী বৃদ্ধাঙ্গুলি চোখে পড়া মাত্র আর দেরি করলো না কোয়ামে,সজোরে কুঠারাঘাত করলো গ্লসিওর কন্ঠদেশে।হাজার হাজার জনতার উল্লাসধ্বনিতে চাপা পড়ে গেল গ্লসিওর শেষ আর্তনাদ।গ্লসিওর মৃতদেহ কলোসিয়ামের “মৃত্যুর দরজা” দিয়ে সম্মান সহকারে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো।</p>



<p>দুপুর ক্রমশ ঢলে পড়ছে বিকেলের দিকে।এবার সময় হয়ে এসেছে সবচেয়ে নামী ও সুদক্ষ গ্ল্যাডিয়েটরদের দ্বৈত দ্বন্দ্বযুদ্ধের।এতরকম চিত্তাকর্ষক লড়াইয়ের আয়োজন থাকলেও দর্শকরা কিন্তু অপেক্ষা করে থাকে এই শেষ দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য।কলোসিয়ামের ভেতরে ও বাইরে জুয়া খেলাও চলে কে জিতবে তাই নিয়ে।আজকের মার্সেলাস ও বাটোর মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার অপেক্ষায় বসে আছে গোটা কলোসিয়াম।ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে পরপর সাতবার অস্তিত্বরক্ষার মরণপণ লড়াইয়ে নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে টিকে যাওয়া এই দুই যোদ্ধার মধ্যে আজকে যে জিতবে তাকে পুরস্কারস্বরূপ মুক্তি প্রদান করবেন সম্রাট টাইটাস।</p>



<p>দ্রিমি দ্রিমি রবে দুন্দুভি বেজে উঠতেই রণাঙ্গনে প্রবেশ করল সুদৃশ্য বর্মে সজ্জিত মার্সেলাস আর বাটো।দুজনের হাতে ঢাল ও তরোয়াল।দুজনেই সুদেহী,দীর্ঘ পেশীবহুল বাহুবিশিষ্ট ও বিস্তৃত বক্ষপট দুজনেরই।দুজন যোদ্ধাকে দেখে সহর্ষ চিৎকার আর করতালিতে ফেটে পড়ল কলোসিয়াম।অনেকেই উঠে দাঁড়িয়ে ওপর থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে তাদের দিকে হাত নাড়তে লাগলো।তারাও প্রত্যুত্তরে সাড়া দিতে লাগল ময়দানের চারপাশে ঘুরে ঘুরে দর্শকদের উদ্দেশ্যে তরোয়াল উঁচিয়ে।অকস্মাৎ যেন ফাঁক হয়ে গেল রণভূমির একাংশ,সরে গেল একটি কাঠের পাটাতন আর তার ভিতর থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটি ক্ষিপ্ত চিতাবাঘ।এর জন্য প্রস্তুত ছিলো না দুজনের কেউই।মার্সেলাস আর বাটোর মধ্যে নিমেষে চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল,আগে দুজনে মিলে চিতাটাকে মারবে,তারপর নিজেরা যুদ্ধ করবে।ক্ষিপ্রগতিতে চিতাবাঘের পিছনে চলে গেল মার্সেলাস,আর বাটো রইলো সামনে।গোল হয়ে ঘুরতে লাগলো চিতাটা,যেন বুঝে উঠতে পারছে না কার দিকে ধেয়ে যাবে।তারপর যেন মনস্থির করে নিয়েই অতর্কিতে সবেগে ঘুরে লাফিয়ে পড়লো বাটোর উপর।বাটো মাটিতে পড়ে গিয়ে তার বিশাল ঢালটা দিয়ে কোনমতে চিতাটাকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু তরোয়ালের ঘা বসানোর মতো বাগে পেলো না সেটাকে।এবার এগিয়ে গেলো মার্সেলাস।তুমুল ঝটাপটি চলছে মানুষ ও পশুতে।প্রাগৈতিহাসিক,আদিম এক দ্বন্দ্ব যেন আকৃতি নিয়েছে বর্তমানের সভ্যতার এই অঙ্গনে।এর মধ্যে উল্টোপাল্টা আঘাত হানলে চিতার বদলে আহত হবে বাটো।এ সুযোগও ইচ্ছে করলেই নিতে পারে মার্সেলাস,কারণ যুদ্ধে ও প্রেমে সবই ন্যায্য।কিন্তু মার্সেলাস তা করবে না।যুদ্ধশিক্ষার এই পাঠশালা তাকে শুধুমাত্র রণকৌশলই শেখায় নি,শিখিয়েছে নীতিনিষ্ঠ হতে,সৎ হতে,নিজ বাহুবলের উপর ভরসা রেখে শেষ নিঃশ্বাস অবধি নির্ভীকভাবে লড়তে।এই লড়াই তার কাছে যুদ্ধ যুদ্ধ মারণখেলা নয়,এক ধর্মযুদ্ধও বটে।সতর্ক মার্সেলাস বাটোকে বাঁচিয়ে তরোয়ালের এক জোরদার কোপ বসালো চিতাটার পাঁজরের মাঝামাঝি।আহত চিতাটা আর্তনাদ করে উঠে ছেড়ে দিলো বাটোকে,লাফিয়ে পড়লো মার্সেলাসের উপর।কিন্তু আহত চিতাটার দেহে খুব অল্প শক্তিই অবশিষ্ট আছে।সজোরে তার ঢাল দিয়ে এক ধাক্কা দিতেই ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলো চিতাটা আর একমুহূর্ত দেরি না করে এবার বাটো মারাত্মক এক কোপ বসাল তার মাথায়।এবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নীরবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো মানুষের কয়েক মুহূর্তের প্রমোদের শিকার অসহায়,নির্দোষ প্রাণীটা।</p>



<p>এবার মুখোমুখি সংঘর্ষ দুই সমযোদ্ধার।বাটো আর মার্সেলাস একে অন্যের দিকে তরোয়াল উঁচিয়ে দাঁড়ালো।গ্যালারির এক দিক থেকে তালে তালে ধ্বনিত হচ্ছে “বাটো” “বাটো” “বাটো” আর অন্যদিক থেকে সমান তালে “মার্সেলাস” “মার্সেলাস” “মার্সেলাস”।যতবার এই রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে দাঁড়ায় সে,নিজের নামের এই ছন্দোবদ্ধ নিরন্তর চিৎকৃত উচ্চারণ রক্তে তোলপাড় তোলে মার্সেলাসের।বীররসের আদি অকৃত্রিম ধারায় সিক্ত হতে থাকে তার চেতনা।সে ভুলে যায় সে একজন বন্দী,তার নেই কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা,নিজস্ব ইচ্ছা,এমনকি প্রার্থনা করার অধিকারও তার নেই।সে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয় তার ব্যক্তিগত দুঃখশোক।তার ভিতরে লুকিয়ে বসে থাকা এক যোদ্ধা বেরিয়ে আসে বুক চিতিয়ে,নির্ভয়ে আক্রমণকারীর চোখে চোখ রেখে দাঁড়ায়,ইস্পাত কঠিন হয়ে ওঠে তার প্রতিটি স্নায়ু।”হয় জেতো,নয় বীরের মতো মরো”&#8230;শিক্ষাঙ্গনের এই শিক্ষাই রণাঙ্গনে তার মন্ত্র এই মুহূর্তে।ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরের মতো সে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাটোর ওপর।বাটোও প্রস্তুত ছিলো।সঠিক সময়ে ঢাল তুলে সে মার্সেলাসের উদ্যত তরবারির আঘাত প্রতিহত করলো।এরপর কঠিন যুদ্ধ শুরু হলো তাদের মধ্যে।তরোয়ালে তরোয়ালে সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছুটতে থাকলো।অস্ত্রের ঝনঝনানি,যোদ্ধাদের হুংকার,উন্মত্ত জনতার কলরোল সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো।সহসা মার্সেলাসের অতর্কিত আক্রমণে বাটোর মাথা থেকে খসে পড়লো&nbsp; তার শিরস্ত্রাণ।একমুহূর্ত হতচকিত হয়ে গেলো বাটো।সেই ফাঁকে আবার তরোয়াল চালালো মার্সেলাস তার ঘাড় ও গলার অনাবৃত অংশ লক্ষ্য করে।চকিতে মাথা সরিয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেলেও আঘাত এড়াতে পারলো না বাটো।তার ঘাড়ের কাছে চামড়া ফাঁক হয়ে গিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগলো।সেই রক্তদর্শনে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো মার্সেলাসের সমর্থকরা।আহত,ক্রুদ্ধ সিংহের মতো এবার বাটো ঝাঁপিয়ে পড়লো মার্সেলাসের উপর।শরীরের সবটুকু শক্তি একত্রিত করে ঢাল দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে একেবারে কোণঠাসা করে ফেললো মার্সেলাসকে।নিজের শরীরের থেকে বাটোকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলো মার্সেলাস,কিন্তু পারলো না।আচমকা কৌশলী মার্সেলাস নিচু হয়ে বসে পড়লো,তারপরই মাটিতে একপাক গড়িয়ে গিয়ে দ্রুত সরিয়ে নিলো নিজেকে আর বাটোর শিরস্ত্রাণহীন মাথা সজোরে ঠুকে গেলো ময়দানের সীমানার দেওয়ালে।বাটো সশব্দে আছড়ে পড়লো,তার হাত থেকে ছিটকে দূরে পড়ে গেলো তার ঢাল।অসহায় দৃষ্টিতে একবার মার্সেলাসের দিকে আরেকবার তার নাগালের বাইরে পড়ে থাকা ঢালটার দিকে তাকালো বাটো।মার্সেলাসও কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো,তারপর নিজের শিরস্ত্রাণ আর ঢাল ছুঁড়ে ফেলে দিলো দূরে।খোলা তরোয়াল উঁচিয়ে বাটোকে উঠে দাঁড়াতে ইশারা করলো মার্সেলাস।বাটো উঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা টলমলে পায়ে এগিয়ে গেলো,তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো মার্সেলাসের উপর।আবার অগ্নিময় ভাষায় কথোপকথন শুরু করলো দুই যুযুধান পুরুষের রক্তস্নাত তরবারিদ্বয়।কিন্তু ক্রমাগত রক্তক্ষরণে অবসন্ন বাটো যে ক্রমশ দমে যাচ্ছে মার্সেলাসের জোরালো আক্রমণের সামনে তা দৃশ্যত স্পষ্ট হয়ে উঠলো।কলোসিয়ামের একপ্রান্তে বাটোর সমর্থকদের মধ্যে হতাশার রব উঠলো আর অন্যপ্রান্তে মার্সেলাসের নামে বিজয়োল্লাস শোনা যেতে লাগলো।হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত কান্ড করে বসলো বাটো।জুতোর মধ্যে গুঁজে রাখা একটি ক্ষুদ্র ছোরা বার করে সজোরে তা বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো মার্সেলাসের গলায়।সহজাত সতর্কতার সঙ্গে মাথা সরিয়ে নিল বটে মার্সেলাস,কিন্তু গলার বদলে ঘাড়ে গভীরভাবে গেঁথে গেলো ছোৱাটা,বেসামাল হয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো সে,হাত থেকেও স্খলিত হলো তার তরবারি।সেই ফাঁকে মার্সেলাসের উপর চেপে বসলো বাটো,দুহাতে উর্দ্ধে তুলে ধরলো নিজের তরোয়াল,কিন্তু আঘাত করার আগেই জ্ঞান হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে বাটো পড়লো মার্সেলাসের উপর। কলোসিয়ামের স্তম্ভিত জনতা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে পড়েছে দুই তারকা গ্ল্যাডিয়েটরের যুদ্ধের পরিণতি কি হয় তা দেখার জন্য।উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন হতচকিত সপারিষদ সম্রাটও।সময় যেন থমকে গেছে এই রক্তরঞ্জিত রণবৃত্তে,থমকে গেছে ময়দানের উড়তে থাকা ধূলিকণাও।সকলের কৌতূহল ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাটোকে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো মার্সেলাস,উল্লসিত জনতার উদ্দেশ্যে একবার হাত নেড়েই আবার ভূপতিত হলো সে,লুটিয়ে পড়ল বাটোরই পাশে।জ্ঞান না হারালেও তার শরীরে আর একবিন্দুও শক্তি অবশিষ্ট নেই যুদ্ধ করবার,সর্বাঙ্গ এলিয়ে পড়েছে তার।এমন সময় সামান্য নড়ে উঠলো বাটো।জ্ঞান ফিরেছে তার,কিন্তু উঠে বসার ক্ষমতা নেই।পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলো জনতা,তারা চায় আবার লড়াই শুরু হোক,নির্দিষ্ট হোক পরিণতি,যেকোন একজন জিতুক,একজন মরুক।সম্রাট টাইটাস হাত তুলে শান্ত হতে বললেন দর্শকদের।তাদের কোলাহল কিছুটা কমে এলো।সম্রাটকে আলোচনা করতে দেখা গেলো আজকের এডিটর অর্থাৎ রেফারীর সঙ্গে।তারপর সম্রাট নিজ আসন ছেড়ে ময়দানে নেমে এলেন এবং এসে দাঁড়ালেন মাটিতে শুয়ে কাতরাতে থাকা রণক্লান্ত,শক্তিহীন দুই যোদ্ধার সামনে।তাদের দুজনেরই শরীরের রক্ত ক্রমাগত নির্গত হয়ে মিশছে ধূলোয়।তাদেরকে মাঝখানে রেখে একটি সুরক্ষাবলয় রচনা করলো সম্রাটের একান্ত নিজস্ব দেহরক্ষীরা,এদের মধ্যে বেশ কিছুজন প্রাক্তন গ্ল্যাডিয়েটরও বটে।সম্রাটকে দেখে অতিকষ্টে হাঁটু গেড়ে বসলো দুজন,মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো তাঁকে।</p>



<p>সম্রাট দু হাত তুললেন জনতার উদ্দেশ্যে।নিমেষে গোটা কলোসিয়ামে স্তব্ধতা নেমে এলো।জনতা উন্মুখ হয়ে উঠলো সম্রাট এই অভূতপূর্ব দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নেবেন তা জানতে।</p>



<p>“প্রিয় নগরবাসীগণ,আপনাদের বিনোদনের জন্যই আমরা আজ এই বিশাল আয়োজন করেছি।কিন্তু এই মহাযজ্ঞের জন্য বিনোদনই কিন্তু শেষ কথা নয়।শক্তি,সাহস,ক্রীড়ানৈপুণ্য, শ্রম,রণকৌশল সব কিছুরই যথাযথ পরীক্ষা হয় এখানে।অপরাধীরা শাস্তি পায়,যোগ্যেরা ও বিজয়ীরা পায় সম্মান ও পুরস্কার।”</p>



<p>এই অবধি বলে থামলেন সম্রাট।পিনপতনের শব্দও শোনা যাবে এমন নিস্তব্ধতা চতুর্দিকে।</p>



<p>“যে যোদ্ধারা অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করেছেন, তাঁদের একজনকে এই বছর আমি মুক্ত নাগরিক ঘোষণা করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।কিন্তু আজকের দ্বন্দ্বযুদ্ধ আরেক অবিশ্বাস্য দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাকে।আমি সত্যিই নির্ধারণ করতে পারছি না,কাকে আমি মুক্তির প্রতীক তরবারি এই রুডিস প্রদান করবো।”</p>



<p>সশব্দ গুঞ্জন উঠলো জনতার মধ্যে।আবার হাত তুলে তাদেরকে শান্ত হতে বললেন টাইটাস।</p>



<p>“বাটো মার্সেলাসকে ভূপতিত করলেও নির্ণায়ক শেষ আঘাত হানতে পারেনি।এদিকে মার্সেলাস এই যুদ্ধে নিজেকে একাধিকবার দক্ষতর প্রমাণিত করেছে,এবং নিজের ঢাল ও শিরস্ত্রাণ ত্যাগ করে,প্রতিপক্ষের অসহায়ত্বের সুযোগ না নিয়েও যুদ্ধ চালিয়ে একজন আদর্শ,অনুকরণীয় বীরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।অর্থাৎ আজ দুই যোদ্ধার মধ্যে কেউই কাউকে পরাস্ত করতে&nbsp; বা বিজিত করতে পারেনি।সেই কারণে আজকের এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে আমি বাটো এবং মার্সেলাস দুজনকেই বিজয়ী ঘোষিত করছি।”</p>



<p>আবার কলোসিয়াম ফেটে পড়লো তুমুল হাততালিতে এবং সম্রাটের জয়ধ্বনিতে।</p>



<p>“এবার মুক্তির প্রতীক এই তরবারি রুডিস কিন্তু একজনকেই দেওয়া হবে এবং আমি তা মার্সেলাসকেই প্রদান করবো স্থির করেছি।”</p>



<p>সম্রাটের বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাশায় দেহ ভেঙ্গে এলো বাটোর।দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।এবার হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে অর্ধত্থিত হয়ে সম্রাটকে অভিবাদন জানালো মার্সেলাস ও সবিনয়ে বললো,”আমি এখনই মুক্তি চাই না,মাননীয় সম্রাট।আরো এক বছর আমি গ্ল্যাডিয়েটর হিসাবে লুডুস ম্যাগনাসে থাকতে চাই।আরো রণকৌশল শিখতে চাই,আরো অর্থ ও সম্মান অর্জন করতে চাই।আপনি এই রুডিস বাটোকেই প্রদান করুন,সম্রাট।”</p>



<p>“বেশ,তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক তবে।”,এই বলে বাটোর দিকে এগিয়ে ধরলেন কাষ্ঠনির্মিত সুদৃশ্য কারুকার্যময় তরবারিটি।বিস্ময়াহত বাটো কয়েক মুহূর্ত অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকলো মার্সেলাসের দিকে।তারপর নতজানু হয়ে তরবারিটি দুহাতে গ্রহণ করে সশ্রদ্ধ চুম্বন করলো সেটিতে।</p>



<p>&nbsp;আরো একবার কলোসিয়াম মুখর হয়ে উঠলো সম্রাটের জয়ধ্বনিতে।সম্রাট এবার সপারিষদ গমনোদ্যত হলেন।দর্শকরাও আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সম্রাটের সম্মানে।তারাও এবার রওনা দেবে নিজের নিজের গন্তব্যে। বাটো ও মার্সেলাসকে একটি ঘোড়ায় টানা শকটে পাশাপাশি শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল চিকিৎসা বিভাগের প্রধানের কাছে।</p>



<p>”কেন আমার জন্য নিজের মুক্তিকে বলি দিলে মার্সেলাস?সম্রাট তো তোমাকেই যোগ্য বিবেচনা করেছিলেন!” প্রশ্ন করলো বাটো।</p>



<p>“তোমার দেশে তোমার বাবা মা আছেন,আশা করি বেঁচেই আছেন,স্ত্রী পুত্র আছে।তুমি দেশের মাটিতে মরতে চাও।তোমার মুক্তি আমার থেকে বেশি প্রয়োজন।”উত্তর দিলো মার্সেলাস।</p>



<p>“তাই বলে আবার একবছরের অনিশ্চিত জীবন?পরের লড়াইয়ে বাঁচবে কিনা তার কি কোন ঠিক আছে?”কথা বলতে বলতে কৃতজ্ঞতায় গলা বুঁজে এলো বাটোর।</p>



<p>“এই অনিশ্চয়তাই তো বেঁচে থাকার রসদ যোগাবে,বাটো।আমি ফিরলেই বা কার কাছে ফিরবো?তার থেকে তোমাকে ফেরাতে পেরে আমি আজ অনেক বেশী তৃপ্ত,আনন্দিত।আরেকটা বছর থেকেই না হয় যাই এই জীবন মৃত্যুর খেলার ময়দানে।এর বাইরের পৃথিবীতেও তো সেই একই খেলা!তার থেকে এই খেলা মন্দ কি?”</p>



<p>এই বলে বাটোর বাহু স্পর্শ করে হাসলো মার্সেলাস।আপ্লুত বাটোর মুখে বাক্যস্ফূর্তি হলো না,তার দুই চোখ খালি বারবার জলে ভরে আসতে লাগলো।রূদ্ধবাক বাটো শুধু মার্সেলাসের হাতটা চেপে ধরলো উষ্ণ ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায়।তারপর বাটোকে নামিয়ে নেওয়া হলো এক চিকিৎসকের কক্ষে।মার্সেলাসকে নিয়ে যাওয়া হলো শল্য চিকিৎসালয়ে,কারণ তার কাঁধে তখনও গেঁথে রয়েছে বাটোর ছোরা।কলোসিয়ামের ভিতরের অলিন্দপথ দিয়ে যেতে যেতে দেওয়ালের সারিবদ্ধ জানলা দিয়ে মার্সেলাস দেখতে পাচ্ছিল রক্ত,ধূলো আর যোদ্ধাদের পদচিহ্নলাঞ্ছিত কলোসিয়ামের নির্মম যুদ্ধাঙ্গনকে&nbsp; যা এতক্ষণ মহান অথচ হতভাগ্য বীরদের জীবনকে আন্দোলিত করছিলো দুঃসহ,দুঃসাধ্য দ্বন্দ্বে,দিবসাবসানের রক্তিম আলোয় সব কোলাহল থেমে গিয়ে কীভাবে তা পরিবর্তিত হয়ে পড়ছে মৌন,মায়াময়,শান্ত উদাসীন এক বিস্তৃত লীলাক্ষেত্রে,যার মাটির প্রতিটি খণ্ডের নীচে লুকিয়ে রয়েছে অগণিত মানুষের কঠোরতম সংগ্রামের অলিখিত ইতিহাস।চেতনা লুপ্ত হওয়ার আগের মুহূর্তে মার্সেলাস মনে মনে প্রণাম জানালো এই আদিম ও অকৃত্রিম বীরভোগ্যা ভূমিকে যেখানে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নিরন্তর উদযাপিত হয়ে চলেছে জীবনের জয়যাত্রা।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-gladiator-by-antara-chatterjee/">গ্ল্যাডিয়েটর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-gladiator-by-antara-chatterjee/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সেকাল ও একাল</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-sekal-o-ekal-by-sanjib-chattopadhyay/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-sekal-o-ekal-by-sanjib-chattopadhyay/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2025 05:18:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9472</guid>

					<description><![CDATA[<p>বাড়িগুলো সব আলমারির মতো। এ পাল্লা খুললে মিত্তির। ও পাল্লা খুললে বোস। ভেতরটা সব এক রকম।….</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-sekal-o-ekal-by-sanjib-chattopadhyay/">সেকাল ও একাল</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়</p>



<p>খাস্তা শব্দটা খাবারের দিকে গেলে -সে এক ব্যাপার।খাস্তা কচুরি -নিমকি-লুচি।খাস্তা গজা।মুচমুচে একটা খাদ্য।সেকালের বাঙালি খাস্তা কচুরির খুব ভক্ত ছিল।শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তখন কাশীপুর উদ্যান বাটিতে।গিরিশচন্দ্র এসেছেন।বরাহনগর বাজারে বিখ্যাত ফাগুর <a>দোকান।গিরিশচন্দ্রের জন্য খাস্তা কচুরি আনিয়েছেন।তিনি ঠাকুরের সামনে বসে একের পর এক খেয়ে চলেছেন।</a>কোনো হিসেবে নেই।বেপরোয়া মানুষ।বিরাট শরীর।ঠাকুরের খুব আনন্দ।গিরিশ তাঁর ভীষণ প্রিয় সন্তান।ঠাকুর এক ভক্তকে বলছেন,&#8217;গিরিশকে বলে দে ,অনেক গুলো কচুরি খেয়ে ফেলেছে -আজ যেন বাড়ি গিয়ে আর কিছু না খায়।&#8217; খাদ্যের মধ্যেও কিছু খাদ্য আছে -রজো শূলি।পেটে গিয়ে জমিদারি হাঁক ডাক ছাড়ে।যেমন- ঘি চপচপে পোলাও।একালের মানুষের সহ্য হবে না।ক্ষীর,রাবড়ি ভয়ের জিনিস।পায়েসও কিছু কম যায়না।মোহনভোগ তো হারিয়েই গেছে।এখন তালগোল পাকানো ড্যালা ড্যালা হালুয়া।ছেলেবেলায় যখন প্রকৃত পোস্ত পাওয়া যেত,সেই সময় পোস্ত দিয়ে হে-রে-রে-রে করে এক থালা ভাত মেরে দেওয়া যেত ;যেন পাতে ডাকাত পড়েছে।</p>



<p>জীবন থেকে জীবন হারিয়ে গেছে।বেঁচে থাকার ভীষণ কষ্ট।কটা টাকা রোজগারের জন্য জীবনের সব সুখ বিসর্জন।কে কোথায় থাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না।বাড়ি আছে ,লোক নেই।ভোঁভাঁ।বাড়িগুলো সব আলমারির মতো।এ পাল্লা খুললে -মিত্তির।ও পাল্লা খুললে বোস।ভেতরটা সব এক রকম।একটুখানি বসা,দু চার পা হাঁটা,একফালি শোয়া,প্রায় অদৃশ্য এক চিলতে বারান্দা.একটা ফুলগাছের টব-বাগানের উপহাস।খাটো রান্নাঘর।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যা হয় টুকটাক।একপাশে একটা মর্গ।চাপা ভাপা শব্দ -ফ্রিজ।দু-দরজা।একটাকে বলা হয় গভীর ঠান্ডার এলাকা।এই মর্গ থেকে বেরোবে খাদ্যের অতীত।পোস্ট- মর্টেম হবে পরিবার পরিজনের দাঁতে।টাটকা কিছু চেও না,সভ্যরা তোমাকে অসভ্য ভাববে।&#8217;চাউ&#8217; কি জানেনা-হাউ ফানি।ও কি অসভ্য উচ্চারণ কাকাবাবু -মাগি নয় ম্যাগি।পুনডুলস নয় নুডলস।সুফি নুডলস শোনেন নি। লোকটা কি বীভৎস রকমের প্রাচীন।কালো গরুর ক্ষীর ক্ষীর দুধের স্মৃতিচারণ করছেন।</p>



<p><a>&#8216;তোমার এই অ্যান্টিক কাকাবাবুটি কবে যথাস্থানে ফিরবেন ?&#8217;</a></p>



<p>&#8216;কেন কাবেরী?&#8217;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>&nbsp;&#8216;সর্ষের তেল মেখে বাথরুমে স্নান করে টাইলসগুলোর অবস্থা কি করেছেন ! মনে হচ্ছে গোয়াল ঘর !&#8217;</p>



<p>&#8216;সর্ষের তেল পেলেন কোথায় ! ও তেলের সঙ্গে তো আমাদের সম্পর্ক নেই।&#8217;</p>



<p>&#8216;সঙ্গের ওই নীল ব্যাগটায় এইটিনথ সেঞ্চুরির মাল পত্তর আছে।পান সাজার সরঞ্জাম,দোক্তা,সর্ষের তেল,নারকোল তেল ,বিটনুন।খড়ম।&#8217;</p>



<p>&#8216;খড়ম ? খড়ম দিয়ে কি করবেন?&#8217;</p>



<p>&#8216;গুরুদেবের কাঠ পাদুকা।স্নানের পর বারান্দায় ফুলগাছের তবে ওপর সাজিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে চন্ডীপাঠ করে শোনান। মনস্ট্রাস,হরিবল।ফুলগাছটা নেতিয়ে গেল।পানের পিকে দামি বেসিনটা শেষ। এরপর লোকের কাছে মুখ দেখাব কি করে। রাস্তার দিকের বারান্দায় লাল গামছা আর বারো হাত থান ধুতি সপাটে ঝুলছে।আবার বলেন কি সত্যনারায়ণ পুজো করবেন।অসহ্য ,অসহ্য।কাঁটালি কোলা চটকান সিন্নি। বাবারে,একি নরক যন্ত্রণা।তুমি বরং ভুলিয়ে ভালিয়ে তোমার কালীঘাটের পিসিমার কাছে রেখে এসো।শ্যাওলা ধরা উঠোন।পাতকো। নোনা ধরা দেওয়াল,গোবর গোবর গন্ধ।বাথরুমের টিনের দরজা ঢ্যাঁস করে খোলে। এরা কোনোদিন মানুষ হবে না।আদিগঙ্গা,কচুরিপানা।&#8217;</p>



<p>&#8216;তোমার আইডিয়াটা মন্দ নয়।মা কালীর লোভ দেখাই।&#8217;</p>



<p>&#8216;আর কিছুদিন থাকলেই আমাদের নাম খাস্তা।&#8217;</p>



<p>নাম খাস্তা।খাস্তা কচুরি নয়,খাস্তা নাম।অনেক সময় পুরোনো বই পোকায় কেটে খাস্তা করে দেয়।খাস্তা নিমকি এই হালকেতার আলমারি নিবাসে চলবে না।কার্পেটে চুরচুর চূড়মুড় পড়বে।চিজ পাফ চিৎ হয়ে শুয়ে খেতে হবে।সোফার আপহোলস্ট্রি নষ্ট হয়ে যাবে।হাঁটি হাঁটি পা পা সভ্যতা এগোচ্ছে।বুড়োরা সব আরো বুড়ো হয়ে যাবে।ধৈর্য ধরে থাকতে হয়-কবে খাট খালি হয়।শ্রাদ্ধ একটা করতেই হয়।একবারই একটু কষ্ট।সে তো দাঁত তুলতেও কষ্ট।তারপর যাও না,সিঙ্গাপুরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এস।বিজ্ঞান ভূত প্রেত বিশ্বাস করে না।ভদ্দর লোকের ছেলে মেয়ে ভূত হতে যাবেন কেন?পরলোকে ফাসক্লাস থাকবেন।সেপারেট রুম,অ্যাটাচড বাথ।জানলার বাইরে উদ্যানে অপ্সরারা পালা করে নেচে যাচ্ছে।</p>



<p>&#8216;কাকাবাবু কালীঘাটে পিসিমার কাছে কিছুদিন থাকবেন ?&#8217;</p>



<p>&#8216;অক্সফোর্ড থেকে ঘুরে আসি।সংস্কৃত পড়াতে হবে সায়েবদের।যাবার আগে তোমার কেমন আছ দেখে গেলাম।খুব খারাপ আছ বাবা।জীবনটাকে খাস্তা করে ফেলেছ।&#8217;</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-sekal-o-ekal-by-sanjib-chattopadhyay/">সেকাল ও একাল</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-sekal-o-ekal-by-sanjib-chattopadhyay/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কাঁসর</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-kansar-by-harsha-dutta/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-kansar-by-harsha-dutta/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2025 04:56:13 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9463</guid>

					<description><![CDATA[<p>… শুনলাম কমপ্লেক্সের পুজোর কাঁসরটা নাকি পাওয়া যাচ্ছে না ?...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-kansar-by-harsha-dutta/">কাঁসর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>হর্ষ দত্ত</p>



<p>ঠট্যাং  ঠট্যাং  ঠট্যাং ।ঠাঁই নানা,ঠাঁই নানা,ঠাঁই নানা,ঠট্যাং  ঠট্যাং  ঠট্যাং।এর হাতে ,ওর হাতে ঘুরছে কাঁসর।যে যেমন ভাবে পারছে ,বাজাচ্ছে।যে কোনও পুজোয় বাজনা বাজার একটা রীতি।আবহমান ঐতিহ্য।মন্ত্রোচ্চারণ পর্বে,আরতির অপূর্ব মুহূর্তগুলোতে,ভোগ নিবেদনে,প্রসাদ বিতরণে, বিসর্জনে। সমগ্র পুজো হয়ে ওঠে শব্দময়।ঘন্টা ,শঙ্খ,কাঁসর,ঝাঁজর,ঢাক,ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র তালে-বেতালে পুজোর গাম্ভীর্য নষ্ট করে দেয় কিনা,সে বিতর্ক পরে।শব্দময় উৎসব তীর্থস্থান থেকে মন্দির,মন্দির থেকে রাজপথ,রাজপথ থেকে অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ে।কোনও বাড়িতে অবশ্য লক্ষী পুজো করা হয় নিঃশব্দে,নীরবে।মা লক্ষীর বাহন শব্দ পছন্দ করেন না।দেবতোষ নিজে অবশ্য আওয়াজ শূন্য পুজো স্বচক্ষে দেখেনি।এই সব বাদ্যযন্ত্রের পাশে মাইক ও ডিজেকে যুক্ত করে না নিলে,অনেকে পুজোর আবহ অনুভব করতে পারে না।দেব-দেবীর অর্চনাকে প্রেক্ষাপটে রেখে ধ্বনি -প্রতিধ্বনির এই উল্লাস এখন সংস্কৃতির মর্যাদা পেয়েছে।</p>



<p>ওদের কমপ্লেক্সে আটটা ব্লক।এ থেকে এইচ।এক একটা ব্লকের কার পার্কিং পুজো বা অনুষ্ঠানের জন্য খালি করতে হয়।কে কমিউনিটি -হলটা আছে তার আয়তন ছোট।হলের মধ্যেই শরীর সচেতনরা একটা জিম কর্নার তৈরি করেছে।উপরন্তু ,অধ্যাপক নীরদ গুহ ঠাকুরতা মারা যাওয়ার পর, তাঁর স্ত্রী ছয় আলমারি বই সোসাইটিকে দেন করেছেন।বইভর্তি কাঠের আলমারিগুলোর ঠাইঁ হয়েছে কমিউনিটি হলে।একদিকে দেহচর্চা -অন্যদিকে মননচর্চা -দুটো মিলিয়ে হলটার স্যান্ডউইচ অবস্থা।ফলে এ-কার পার্কিংয়ে ইংরেজি নববর্ষ,বি-তে বাংলা নববর্ষ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী।সি-তে দুর্গা ও লক্ষী পুজো,ডি-পার্কিং খালি করতে হয় কালীপুজো উপলক্ষে।এখানেই অনুষ্ঠিত হয় সরস্বতী পুজো।বাঁ দিকের পংক্তি ই,এফ,জি,এইচ ব্লকে যথাক্রমে স্বাধীনতা দিবস,সোসাইটির প্রতিষ্ঠা দিবস,বাৎসরিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা শিবির এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবা দিবস পালিত হয়।</p>



<p>সুবিধে-অসুবিধে মিলিয়ে পার্বণগুলো এখনো করা হচ্ছে।ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি।কমপ্লেক্স মেন্টেনেন্সের টাকায় আট-নটা  উৎসব সম্পন্ন হওয়া মুশকিল।ফলে আলাদা করে চাঁদা নিতেই হচ্ছে।তবে তার পরিমাণ সাধ্যের মধ্যেই রাখার চেষ্টা করা হয়।ফলে উষ্মা থাকলেও,তা আড়ালে রেখে সবাই অংশগ্রহণ করতে আসেন।খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকে পুজো- পার্বণে।অন্যগুলোয় প্যাকেট।পুজোর বাসন কোসনও থাকে কমিউনিটি হলে।বড় টিনের বাক্সে তালা দিয়ে বাসন ও অন্যান্য উপকরণ রাখা আছে।পেতল,কাঁসা,তামা,কাঠ ও পাথরের তৈরি এই দৈব সম্পত্তি দেখাশোনার দায় বর্তেছে দেবতোষের ওপর।এমনিতে ও খুব সতর্ক ও দায়িত্ববান।</p>



<p>গত বছর দেবদেবীর সম্পদের রক্ষক ছিলেন বেণুগোপালবাবু। খুবই নির্বিরোধী ও অল্পকথার মানুষ।জানুয়ারি মাসে বোর্ড অফ ম্যানেজমেন্টের মিটিং যখন হল,বেণুগোপালবাবু তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে বাক্স দেখাশোনার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে অল্প পরিশ্রমের কাজ নিলেন।সভাপতি প্রদ্যুৎকৃষ্ণ রায় কোনও আপত্তি শুনলেন না,বাসনের ঢাউস বাক্সটা দেবতোষের কোর্টে ঠেলে দিলেন।অগত্যা ওকে ভার নিতেই হল।কিন্তু&nbsp; একটা ভুল করে ফেলল দেবতোষ।বেণুগোপালবাবুকে দাঁড় করিয়ে বাক্সটার তালা খুলে কতগুলো ও কত রকমের বাসন আছে দেখে নিল না।চাবিটা সোজা পকেটে ঢুকিয়ে দেবতোষ অনিচ্ছাকে মুছে ফেলে বলেছিল,ঠিক আছে ।কাউকে না কাউকে ভার তো নিতেই হবে।</p>



<p>সরস্বতী পুজোর দিন,বাসন যা যা লাগবে বের করে দিল দেবতোষ।নিয়ে গেল সি-ব্লকের শ্যামলী আর রুচিরা।ওরা দু&#8217;জন প্রত্যেকটি পুজোয়,আয়োজনের বিভিন্ন কাজ নিজেরাই কাঁধে তুলে নেয়।এবারের প্রতিমা ভারী সুন্দর হয়েছে।ডাকের সাজ,শ্বেতশুভ্র প্রতিমার মুখ আধুনিক নয়,উনিশ শতকের অপূর্ব ছোঁয়া।টানা টানা চোখ,পান পাতার মতো মুখ,লাল টুকটুকে ঠোঁট।সারা কমপ্লেক্সে সরস্বতী প্রতিমার মাধুর্য নিয়ে সাড়া পড়ে গেছে।সোসাইটির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা,কিশোর-কিশোরীরা বাসন্তী রঙের জামা,শাড়ি পাঞ্জাবি পরে ডি-ব্লকের কার পার্কিংয়ে আসতে শুরু করেছে।কমললোচনা বিশালাক্ষীর অঞ্জলি সাড়ে বারোটায় শুরু,একটার মধ্যে শেষ।প্রতিবছরের মতো এবারেও মহিলাদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।যে-ব্লকগুলোতে প্রতিমা পুজো হয়,সেখানে প্যান্ডেল তৈরি করার জন্যে একদিন আগে পার্কিং খালি করে এখানে ওখানে গাড়ি সরাতে হয়।এই অসুবিধেটুকে ছাড়া আনন্দ-অনুষ্ঠান ভালভাবে উৎরে যায়।সকলের মনের মতো হবে এমন আশা অবশ্য আবাসন কমিটি করে না।</p>



<p>ঠাকুরমশাই ব্রজনাথ চক্রবর্তী ঠিক সময়ে পুজো শুরু করে দিয়েছেন।ওঁর হাতে হাতে উপকরণ জুগিয়ে দিচ্ছে শ্যামলী,রুচিরা আর তন্বী। ঝুড়িতে অঞ্জলীর ফুল-বেলপাতা গুছিয়ে রাখছে রোজি আর কস্তুরী নাম দুই কলেজ পড়ুয়া তরুণী।দেবতোষ এবং আরও কয়েকজন,খেতে বসার টেবিল-চেয়ার সাজানোর তদারকি করছিল।ওরা পরিষ্কার শুনতে পেল চক্রবর্তী ঠাকুরমশাই চেঁচিয়ে বলছেন,&#8217;এবার আরতি শুরু হবে।যাঁরা দেখবেন,আসুন।&#8217; হাতের কাজটুকু শেষ করে দেবতোষ <a>যাবে।হঠাৎ </a>দেখল, রুচিরা প্রায় ছুটতে ছুটতে ওর কাছে এগিয়ে এল।বলল ,&#8217;দেবুদা কাঁসরটা হয়তো বাক্সতেই থেকে গেছে ।বের করা হয় নি।&#8217;দেবতোষ অবাক,&#8217;তখন শ্যামলী যে বলেছিল,সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে !&#8221;এখন তো শ্যামলী বলছে কাঁসর ছিল না&#8230;.।ডোন্ট  ওরি।আমার কাছে একটা ছোট কাঁসর আছে।ওটা এক্ষুণি নিয়ে আসছি।&#8230;আপনি আপনার কাজ করুন।</p>



<p><a>লাস্ট </a>ব্যাচে খেতে বসে কমিটির সদস্যরা টের পেল ,যে কাঁসরটা বেজেছে ,সেটা আদৌ আবাসনের সম্পত্তি নয়। তাহলে সেই গোলাকৃতি,ভারী,তীক্ষ্ণ আওয়াজে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার মতো বাদ্যযন্ত্রটি কোথায় গেল? পুজো সাঙ্গ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি প্রশ্নটা রাষ্ট্র হয়ে গেছে।দেবতোষ তৃপ্তি করে ভোগ প্রসাদ খেতে পারল না।ক্যাটারারের বসানো টেম্পোরারি বেসিনে হাত ধুতে ধুতে দেখল,পুজো প্যান্ডেলের সামনে ওর নেক্সট ডোর নেইবার চিত্ত দাশগুপ্ত এদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।লোকটি ভয়ঙ্কর পাজি,মিথ্যেবাদী।অনেকদূর পর্যন্ত বদমায়েশি করতে পারে।সোসাইটিতে থাকার পক্ষে একেবারে অনুপযুক্ত।সিঁড়ির ল্যান্ডিং এ জুতো রাখার র&#x200d;্যাক নিয়ে দেবতোষ আপত্তি করেছিল।দাশগুপ্ত প্রথমে শোনেন নি।অসভ্যের মতো দেবতোষের বাবা,মা আর বোনের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেছে। ল্যান্ডিং এ জুতো রাখা যেন ফান্ডামেন্টাল রাইট -এই ইস্যুতে ওর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিতেও ছাড়েনি।</p>



<p>কমপ্লেক্সের কোনও ব্লকেই সিঁড়ির ল্যান্ডিং এ জুতো রেখে দেওয়ার জন্য সু বক্স বা র&#x200d;্যাক কেউ বসায়নি।বাহ্যিক সৌন্দর্য বজায় রাখতে প্রত্যেকটা ব্লক সমতা রক্ষা করছে।ব্যক্তিগত অভিপ্রায় পূর্ণ করার তাগিদে কমন প্লেস ব্যবহারের নিয়ম তাদের আবাসনে নেই।এই বিষয়টাকে কমপ্লেক্স মেন্টেনেন্স কমিটিকে জানাতেই হল।তখন দেবতোষ কমিটির মেম্বার ছিল না।ওকে সেই সময় সবচেয়ে বেশি আশ্বস্ত করেছিল সেক্রেটারি সুভাষ ভট্টাচার্য।দেবতোষেরই&nbsp; বয়েসী সুভাষ ভরসা দিয়ে বলেছিল,নিয়মকানুন তার নিজের জায়গায় থাকবে,সু স্ট্যান্ড ফ্ল্যাটের ভেতরে। বেশি থানা পুলিশ মামলা দেখালে ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যেতে বলব।প্রায় প্রত্যেক আবাসনে কিংবা স্ট্যান্ড অ্যালোন ফ্ল্যাট বাড়িতে দাশগুপ্তের মতো দু&#8217; এক পিস্ ত্যাঁদড় মাল থাকে।চিন্তা করিস না।একটা আর্জেন্ট মিটিং ডেকে,রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনের বাইরে বেরোনোর জন্য চিত্তবাবুর ফালতু স্পর্ধা ,কীভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয় আমি জানি।</p>



<p>সুভাষ ওর চেয়ার এতটুকু নড়ায়নি।ফলে চিত্ত দাশগুপ্ত জুতোর র&#x200d;্যাক সিঁড়ির ল্যান্ডিং থেকে ঘরে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।কিন্তু আজ ওই হাসি অন্য ইঙ্গিত করছে- এই যে দেবতোষবাবু ,আমি জুতো ঘরে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম।সবচেয়ে বেশি পেছনে লেগেছিলেন আপনি।এবার ঠাকুরের বাসন চুরির&nbsp; দায়ে আপনার মুখে সারা আবাসন জুতোর বাড়ি মারবে।কাঁসা -পাতলে কেজি এখন প্রায় পাঁচশো টাকা।দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে একটার পর একটা বাসন চুরি করে চোরাবাজারে বিক্রি করে দিন।পরের মাল ঝেড়ে দিয়ে যা পাবেন,তাই লাভ।কেমন লাগছে এখন?যতই খুঁজুন ,ওই কাঁসর বাক্সতে পাবেন না।হাওয়া হয়ে গেছে।</p>



<p>লোকটার বিশ্রী দৃষ্টি ও মিচকি হাসি অসহ্য ,অসহ্য !দেবতোষ মুখ ঘুরিয়ে নিল।ওর ভেতরে এক প্রবল আলোড়ন যেন শুরু হবে একটু পরেই।কমিটির অন্য কোনও সদস্য বসে হয়তো ওকে জিজ্ঞেস করতে পারেন ,শুনলাম কমপ্লেক্সের পুজোর কাঁসরটা নাকি পাওয়া যাচ্ছে না ?এই হয়েছে এক জ্বালা,দায়িত্ব বদল হলেই কোনও না কোনও অঘটন ঘটবেই।তাই না !দেবতোষ জানেনা এসব প্রশ্নের কী উত্তর হবে।কী হওয়া উচিত।সযত্নে রাখা ঠাকুরের বাসন হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়ার দায় ওর &#8211; দেবতোষ এই সত্যটি জানে।আগামীকাল প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে কাঁসরটা বাক্সে আছে কি নেই দেখতে পারলে ভাল হতো।চিত্তবাবুর মতো লোকেরা ওকে ছোট করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন।এতে টেনশন আরও বাড়বে।খুব দামি জিনিস নয় ,কিন্তু এই আবাসনের সেন্টিমেন্ট কাঁসরটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।কমিউনিটি হলের একটা চাবি থাকে প্রদ্যুৎবাবুর কাছে।আর একটা নবনির্বাচিত সেক্রেটারি মেঘনাদি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।চাবি চাইতে গেলে দু&#8217;জনের ভুরু কুঁচকে যাবে।আর কারণটা শুনলে প্রদ্যুৎকৃষ্ণ হতাশ গলায় বলবেন ,&#8217;আমি তোমায় ট্রাস্ট করি,দেবু।&#8217; মেঘনাদি চোয়াল শক্ত করে জ্ঞান দেবেন,<a>&#8216;</a>দেবতোষ,প্লিজ বি ডিউটিফুল ! জিনিসটা আবাসনের ,কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।&#8217;</p>



<p>এমন বেদনাহত বার্তা আর সাবধান বাণী যে শুনতে হবে এবং আরও কেউ কেউ নানা ধাঁচে বলবেন,তা দেবতোষ জানে।কেবল স্পষ্ট উত্তর ওর জানা নেই।নির্বিঘ্নে ঠাকুর বিসর্জনের তিন দিন পরে দেবতোষ সভাপতি ও সম্পাদিকাকে সরাসরি ফোন করে অনুরোধ করল,দয়া করে আপনারা দশ মিনিটের মধ্যে আসুন।আমি বাক্সটা খুলে একবার খুঁটিয়ে চেক করতে চাই।সরস্বতী পুজোয় ব্যবহৃত বাসন ও অন্যান্য জিনিসগুলো কাল শ্যামলী আমাকে মেজে ঘষে দিয়ে যাবে।বাক্সটা এখন অনেকটাই খালি।কাঁসরটা খুঁজতে সুবিধে হবে।ওর অনুরোধে রাজি হয়ে প্রদ্যোৎকৃষ্ণ ও মেঘনা এলেন ,দেখলেন,বিরস বদনে ফিরে গেলেন।বাক্সটায় কাঁসর নেই।খুঁজতে খুঁজতে দেবতোষ নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠছিল।তন্নতন্ন করে দেখেও কাঁসরটা পাওয়া গেল না।লজ্জিত,পরাজিত দেবতোষ তবু একবার শেষ চেষ্টা করবে।</p>



<p>শ্যামলী আর রুচিরা রবিবার সকালে কমিউনিটি হলে ব্যবহৃত বাসনগুলো দিতে এল।ওদেরও মুখ থমথমে।খোওয়া যাওয়া ঘটনার সঙ্গে ওদেরও নাম জড়িয়ে গেছে।খুব শান্ত স্বরে দেবতোষ জিজ্ঞেস করল,আচ্ছা শ্যামলী,পুজোর আগের দিন তুমি আর রুচিরা যখন বাসন নিয়ে গেলে,তখন কাঁসরটা সত্যিই কে ছিলনা ! তুমি ভালো করে ভেবে দেখ।&#8230;বলো&#8230;</p>



<p>রুচিরার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে শ্যামলী আহত মানুষের মতো উত্তর দিল,হয়তো এনেছিলাম।কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না।পুজোর দিন থেকেই ভেবে মরছি,দেবুদা।এক একবার মনে হচ্ছে চন্দন কাঠ আর কাঁসর বাজানোর কাষ্ঠদন্ডটা পুষ্পপাত্রের ওপরে রেখেছিলাম।পিলসুজ আর পঞ্চপ্রদীপ একটা বারকোশের ওপর শোয়ানো ছিল।জিনিসপত্র গুলো ওখান থেকে নিয়ে গিয়ে কোথায় রেখেছিলে ?দেবতোষের গলার স্বর খুব করুণ শোনাল।মান সম্মান নিয়ে অনেকে টানাটানি&#8230;করছে&#8230;</p>



<p>হ্যাঁ,তা তো করবেই,রুচিরা বলল,হারিয়ে গেল,না কি কেউ চুরি করল !আমিও বিভ্রান্ত।একটু থিম শ্যামলীর হয়ে রুচিরা উত্তর দিল,প্রতিবারের মতো বাসনগুলো প্রথমে প্যান্ডেলে,প্রতিমার কাছাকাছি থাকে।তারপর আমি ও শ্যামলীদি ভাগাভাগি করে বাড়িতে পরিষ্কার করতে নিয়ে যাই।অতগুলো বাসন একজনের পক্ষে মেজে চকচকে করা তো সম্ভব নয়।</p>



<p>নিশ্চয়ই। ঠিকই বলেছ।দেবতোষ একটু ভেবে খুব দরকারি কথার মতো জিজ্ঞেস করল ,এখন সব&nbsp; দেখে শুনে,মিলিয়ে নিয়ে এসেছো তো !</p>



<p>ওরে বাব্বা,কাঁসর কাণ্ডের পর থেকেই আমরা মরমে মোর আছি।যেকটা বাসন ও অন্য জিনিসপত্র নিয়ে গেছিলাম,সব ঠিকঠাক এনেছি।</p>



<p>ভেরি গুড।আচ্ছা,আমাকে কে যেন বলেছিল, কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আসার পর অনেকেই ডাকের সাজের অনবদ্য মূর্তি দেখতে এসেছিল।খবরটা কি ঠিক?</p>



<p>এবারে উত্তর দিল শ্যামলী,এমন উদ্দীপনা আমি কোনও বছর দেখিনি,দেবুদা।ছোট ছেলেমেয়েরা তো ছিলই,ওদেরই পুজো।বয়স্করাও এসেছিলেন।</p>



<p>বয়স্কদের মধ্যে কারা ?নাম মনে আছে?যেন একটু আসার আলো দেখা যাচ্ছে, এমনভাবে দেবতোষ জানতে চাইল।</p>



<p>ওই সময়ে সবাই একটা না একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত,ওই ব্যস্ততার মধ্যে নির্দিষ্ট কারও নাম মনে নেই।তবে একটা বিরক্তিকর মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে।&#8230;আপনার প্রতিবেশী চিত্তবাবু প্রতিমার কাছে এগিয়ে বসে হাত বাড়িয়ে পরখ করছিলেন,মা সরস্বতীর ডাকের সাজ আসল শোলা দিয়ে তৈরি নাকি সাদা আর্টপেপার।আমার ভারী রাগ হয়ে গেছিল।এক নম্বর বদমাইশ।পুজোর স্টেজে জুতো পরে উঠেছিলেন।দু নম্বর,শোলা আসল নাকি নকল তা যাচাই করতে ওঁকে কে বলেছে !আমি বিরক্তি দেখাতে কী একটা বলে,যেখানে বাসনগুলো রাখা ছিল,সেদিকে সরে গেছিলেন,এইটুকু মনে আছে।তখন কমিটির কেউ একজন আমাকে ডাকছিলেন।</p>



<p>চুপ করে সব শুনে দেবতোষ জোরে শ্বাস ফেলে দৃঢ় গলায় বলল,কাঁসর আমি নিজের টাকায় কিনে কম্পেন্সেট করে দেব।কিন্তু আবাসনের কাঁসরটা যে ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে যায়নি,সেই সত্যটা বের করে ছাড়ব। ছাড়বই।</p>



<p>রুচিরা ও শ্যামলী সভয়ে দেখল দেবুদার চোখে আগুন জ্বলছে।প্রতিহিংসার আগুন নয়,দুর্নীতি প্রতিরোধের আগুন।</p>



<p>সময় নিজের মতো চলতে চলতে দুর্গাপুজোর সামনে এসে যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াল।গতকাল মহালয়া শেষ হয়েছে।কাঁসর হারানো বা চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ফিকে হয়ে গেছে।প্রত্যেকটি ব্লকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল,&#8217;নতুন কাঁসর কিনে এনে,কমিটি সদস্য দেবতোষ বসু আবাসনের পুজো &#8211; পার্বণের জন্য উৎসর্গ করেছেন&#8217;।তবু চিত্ত দাশগুপ্তের মতো সংকীর্ণ মনের তথাকথিত ভদ্রলোক, এখনও বাতাসে ভাসিয়ে রেখেছে একটি বাক্য,&#8217;আহা, স্মৃতিবিজড়িত কাঁসরটা কোথায় গেল !&#8217;</p>



<p>ওদের আবাসনে প্রত্যেক বছর কমিটি বদলায়,ঢাকিদেরও বদল হয়।প্রত্যেক বছর একই ঢাকিদের বাজনদার হিসেবে ডাকা হয় না। পুজো সংক্রান্ত একটা মিটিং এ দেবতোষ সেক্রেটারি মেঘনাদিকে নিজের থেকেই বলল,এবারে ঢাকি ভাড়া করার কাজটা আমাকে দেবেন? অরুনাংশুর করার কথা।তবে ওর সঙ্গে কথা বলেছি। আমি ভার নিলে ওর আপত্তি নেই।হাত তুলে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছিল অরুনাংশু।কমিটি মেম্বারেরা কেউ আপত্তি করেনি। পঞ্চমীর দিন শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর থেকে,দেবতোষ আবাসনের নিয়মভেঙ্গে যে বাজনদার দের নিয়ে এল,তারাই এসেছিল গতবছর।কালাচাঁদ সর্দার ও তার তিন সঙ্গী।দুটো ঢাক,একটা ঢোল ও একটা কাঁসর।ঢাকিওয়ালাদের ভিড় আর বাজনার কানফাটা শব্দের মধ্যে,দেবতোষ ওদের দেখতে পেয়েছিল।কৈশোর উত্তীর্ণ কাঁসর বাদকের হাতে অন্যদের চেয়ে বড় ও গমগমে বাদ্যযন্ত্রটা দেখেই দেবতোষ ওদের ভাড়া করে নিয়ে এসেছে।আবাসনে ঢোকার আগে,প্রদ্যুৎকৃষ্ণকে ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে,দাদা আমি নিয়ম ভাঙলাম।মাপ করে দেবেন।কিন্তু কথা দিচ্ছি,আমাদের কাঁসরটা উদ্ধার হবেই।মায়ের ইচ্ছায় কীভাবে হবে স্বচক্ষে দেখতে পাবেন।</p>



<p>ষষ্ঠীর বোধনে আবাসনের সবাই আসতে পারে না।তবে মিসেসকে নিয়ে চিত্তবাবু এসেছিলেন।একটুপরে দুজনে হঠাৎ উধাও।খেয়াল করল অরুনাংশু।দুর্গা দুর্গতিনাশিনীর আহ্বান লগ্নে পুরোহিত ইঙ্গিত দিতেই কালাচাঁদের ঢাক বেজে উঠল।প্রত্যাশিত শব্দতরঙ্গ ছড়িয়ে গেল সারা আবাসনে।কাঁসর বাদক ছেলেটি মনে হয় নড়বড়ে টাইপের।খুব অলস হাতে কাঁধের ঝোলা থেকে বের করল কাঁসরটা।বাজাতে শুরু করল।কমিটির সদস্যরা চমকে উঠতেই দেবতোষ চেঁচিয়ে বলল.আরও চমক বাকি আছে।</p>



<p>আগমনীর পুজো শেষ হতেই পুরো কমিটি কালাচাঁদকে ঘিরে ফেলল।ভয়ার্ত কালাচাঁদ বলল,গেল বছর আমরা যখন সদর দিয়ে রাস্তায় বেইরেছি,হাঁটতেছি তখন এখেনের এক বাবু কাঁসরটা আমার হাতে দিয়ে বললেন,এইটা তোমরা লিয়ে যাও।আমার ঘরে পইড়ে আছে।তোমরা বাজাবেক।তা আমি নিয়ে নিনু।আমরা গরিব মানুষ&#8230;মেঘনাদি ওকে আশ্বস্ত করল,ঠিক আছে,ঠিক আছে।আমরা একটা নতুন কাঁসর তোমাদের দেব।পুরোনোটা ফেরত দিয়ে যেও।</p>



<p>সবাইকে হতবাক করে দিয়ে প্রদ্যুৎকৃষ্ণ ঘোষণা করলেন,হঠাৎই দেবুর পরম মিত্র চিত্ত দাশগুপ্ত আজ সকালের ট্রেনে হায়দ্রাবাদ বেড়াতে চলে গেছেন।কাকভোরে ওর হোয়াটস্যাপ মেসেজ পেয়েছি।&nbsp;</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-kansar-by-harsha-dutta/">কাঁসর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-kansar-by-harsha-dutta/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>লাল মৃত্যুর মুখোশ</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/edgar-allan-poe-story-the-mask-of-red-death-bengali-translation-by-sanmatrananda/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/edgar-allan-poe-story-the-mask-of-red-death-bengali-translation-by-sanmatrananda/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 19 Sep 2025 08:04:49 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9438</guid>

					<description><![CDATA[<p>… মৃদু গুঞ্জরণ আরম্ভ হল... এ লোকটা কে? এ লোকটা কে? এ লোকটা কোত্থেকে এল?</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/edgar-allan-poe-story-the-mask-of-red-death-bengali-translation-by-sanmatrananda/">লাল মৃত্যুর মুখোশ</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এডগার অ্যালান পো-র ‘দ্য মাস্ক অফ দ্য রেড ডেথ’&nbsp; ভাষান্তর:সন্মাত্রানন্দ&nbsp; &nbsp;</p>



<p>সারা দেশটাকে বহুদিন ধরে তছনছ করে দিচ্ছিল ‘লাল মৃত্যু’-নামের অসুখ। এর আগে কখনও কোনো মহামারীর প্রকোপ এত বিধ্বংসী, এত ভয়ানক হয়ে ওঠেনি। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে অবিশ্রান্ত রক্তপাত আর এর অমোঘ চিহ্ন—লালিমা ও ভীতিপ্রদ রক্তক্ষরণ। প্রথমে শরীরে তীব্র যন্ত্রণা, হঠাৎ মাথা ঘুরতে থাকা, তারপর শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিশ্রান্ত রক্তস্রাব, শেষে অনিবার্য মৃত্যু। সারা শরীরে, বিশেষত রোগীর মুখমণ্ডলে রক্তের কালচে দাগ ফুটে উঠে সংক্রামক মারণ-জীবাণুর আক্রমণ নিশ্চিত করে দেয়; আত্মীয়-স্বজন সংক্রমণের ভয়ে দূরে পালায়, সেবা ও সহানুভূতি পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। এবং এই রোগের আক্রমণ, রোগবৃদ্ধি এবং অন্তিমে মৃত্যু—সবটাই মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাচ্ছিল। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>অথচ এমন অবস্থাতেও রাজপুত্র প্রসপেরো কিন্তু একেবারে দিব্যি ফূর্তিতে, নির্ভয়ে, বিন্দাস মেজাজে দিন কাটাচ্ছিল। যখন তার রাজ্যের আদ্ধেক লোক মরে ঢিবি হয়ে গেল, তখন রাজপুত্র তার রাজসভার নাইট আর সুন্দরীদের মধ্য থেকে হাজারখানেক চমচমে, আমোদগেড়ে-গোছের লোক বেছে নিয়ে দুর্গজাতীয় এক মঠে নির্জনে বসবাস করতে চলে গেল। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>বিস্তৃত, বিপুল সেই প্রাসাদ—রাজপুত্র প্রসপেরোর নিজস্ব পাগলাটে অথচ মহিমামণ্ডিত মেজাজের সৃষ্টি। সুদৃঢ়, সমুচ্চ প্রাকার দিয়ে ঘেরা সমস্ত কেল্লাটা। প্রাকারের গায়ে আবার লোহার সিংদরজা; সেখানে কেউ প্রবেশ করে সাধ্য কী! দুর্গে প্রবেশ করে সভাসদরা বড়ো বড়ো আগুনের চুল্লি আর হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজার বড়ো বড়ো খিল কীলক গড়াই-পেটাই করতে লাগল। মনে কোনো হতাশা বা উন্মত্ততা ঢুকবার বা মন থেকে ওসব বেরোবার সমস্ত পথ তারা অবরুদ্ধ করে ছাড়ল। দুর্গের ভেতরেই যাবতীয় ভোগসুখের ঢালাও ব্যবস্থা, কাজেই বাইরে যাওয়ার কোনো দরকারই নেই। সর্বপ্রকার সাবধানতা অবলম্বন করে সভাসদরা সংক্রমণকে দুর্গের বাইরেই ঠেকিয়ে রেখে ভাবল, খাও, পিও আর মজা করো! ও বাইরের জগৎ তার নিজের মামলা নিজেই সামলাক গে! &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এর মধ্যে শোক বা চিন্তা করা বেজায় বোকামো, দুর্গের ভেতরেই রাজপুত্র যেখানে ভোগবিলাসের সমস্ত আয়োজন করে রেখেছে। দুর্গে ভাঁড় আছে, নকলনবিশ আছে, ব্যালে নর্তকীরা আছে, গায়ক-গায়িকা, সুন্দরী নারী, মদের ফোয়ারা—হে হে, সবই যাকে বলে একেবারে রীতিমতো মজুত! এসব তো আছেই, তার উপরে আছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। দুর্গের বাইরে টহল দিয়ে বেড়াক ‘লাল মৃত্যু’-মহামারী! &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>দুর্গে বসবাসের পাঁচ কি ছয় মাস গত হয়েছে, বাইরে তখন মহামারীর যমযন্ত্রণা তুঙ্গে; রাজপুত্র প্রসপেরো দুর্গের বাসিন্দা সেই হাজারজন আমোদগেড়ে লোকের বিনোদনের জন্যে মুখোশ-নাচের অভূতপূর্ব আয়োজন করল। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>সে মানে যাকে বলে একেবারে ধ্বকধ্বকে উত্তেজক দৃশ্য—সেই মুখোশ-নাচ। কিন্তু সেসব কথা পরে হবে, যে-ঘরগুলোতে এই নাচবাহানাটা হচ্ছিল, সেই ঘরগুলোর কথাই আমি আগে বলব।</p>



<p>মোট সাতটা বড়ো বড়ো ঘর। এ ধরনের প্রাসাদে সাধারণত এরকম বড়ো বড়ো ঘর সোজাসুজি একই সরলরেখায় থাকে, ঘরগুলোর মধ্যেকার দরজার পাল্লা দু’পাশের দেওয়ালের দিকে সড়াৎ করে সরে গিয়ে দীর্ঘ উন্মুক্ত অলিন্দের আভাস রচনা করে; ফলতঃ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত কোথাও দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। কিন্তু এ প্রাসাদের ঘরগুলির বিন্যাস ওরকম সরলরৈখিক নয়। তা অবশ্য হওয়ারই কথা, কেননা ‘কর্তা যিনি, ক্ষ্যাপা তিনি ক্ষ্যাপার মূলাধার’ প্রসপেরো; কাজেই তার কিম্ভূতকিমাকার কল্পনার ফল যে প্রাসাদের গঠনশৈলীর উপরেও এসে পড়বে, তাতে আর সন্দেহ কী? প্রাসাদের ঘরগুলো এমনই উদ্ভটমার্কাভাবে এলোমেলো সাজানো যে, এক জায়গা থেকে এক নজরে একটা ঘরের বেশি কিছু দেখাই যায় না। বিশ ত্রিশ গজ অন্তর অন্তর দেওয়ালের গায়ে একটা করে তীব্র কৌণিক মোচড় এবং প্রত্যেকটি মোচড়ে এক-এক প্রকারের উদ্ভাবনী কৌশল। প্রত্যেক দেওয়ালের মধ্যিখানে ডাইনে বাঁয়ে একটি করে গথিক স্থাপত্যের জানালা; জানালার ওপারে বদ্ধ বারান্দা—দেওয়াল যেমন যেমন বাঁক নিয়েছে, বারান্দাগুলোও অমনই ব্যাঁকাত্যাড়া হয়ে যে যার নিজের জায়গা ঠিক করে নিয়েছে। জানালাগুলোতে রঙিন কাঁচ বসানো, প্রতিটি কক্ষের জানালার কাঁচের রং কক্ষটির গৃহসজ্জার রঙের অনুরূপ। যেমন ধরা যাক, একেবারে পুব দিকের ঘরটার সবকিছু—দেওয়াল, আসবাবপত্তর সবই নীল; তার জানালার কাঁচও নীল। পরের কক্ষে দেওয়ালের পর্দা, অলংকরণ সব গোলাপি—জানালার কাঁচও গোলাপি। তৃতীয় কক্ষটি সবজেটে, জানালাটাও সবুজ। চতুর্থ কক্ষের অঙ্গসজ্জা কমলা রঙের, এমনকি সে-কক্ষের আলোটাও কমলা রঙের। এইভাবে পঞ্চম কক্ষ সফেদময়, ষষ্ঠ কক্ষ বেগুনিময়। একেবারে শেষ কক্ষ, মানে সপ্তম কক্ষটির ছাদ, দেওয়াল সমস্ত কালো ভেলভেটের ভারী পর্দা দিয়ে ঢাকা, পর্দা ভাঁজে ভাঁজে কার্পেটের উপর এসে লুটিয়ে পড়েছে; কার্পেটের রঙও এ ঘরের ঘোর কালো। কিন্তু জানালার কাঁচের ব্যাপারে ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু এই ঘরটাতেই। এ ঘরের জানালাটার কাঁচের রং কালো নয়। জানালার রং টকটকে লাল—গাঢ় রক্তবর্ণ। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এখন এই সাতটা ঘরের একটাতেও কোনো আলো কিংবা বাতিদান নেই। ঘরের মধ্যে সোনাদানার অলংকার এলোমেলো বহুৎ ছড়ানো আছে, ছাদ থেকেও ঝুলছে অলকা-তিলকা কত কিছু, অথচ একটা ঘরেরও চার দেওয়ালের মধ্যে আলো কিংবা বাতি কিচ্ছুটি নেই। আলো যা আছে, তা হচ্ছে ওই জানালার ওপাশের বদ্ধ বারান্দাগুলোতে। একেকটি জানালার ওদিকে একটি করে ওজনদার তিনপেয়ে আলোকস্তম্ভ, তাতে দাউ দাউ করে জ্বলছে মশাল, আর সেই মশালের তীব্র আলো জানালার রঙিন কাঁচের মধ্য দিয়ে ঘরের ভিতরে এসে ঘরটাকে সমুজ্জ্বল করে রেখেছে। ফলতঃ ঘরের মধ্যেকার মানুষ ও জিনিসপত্তরের জাঁকালো, অদ্ভু্ত, মজাদার সব অতিকৃত আকার ফুটে উঠছে। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিন্তু একেবারে শেষের ঘরটা, মানে পশ্চিমদিকের সেই কালো ঘরটা—সেটাতে গাঢ় রক্তরঙা লাল কাঁচের জানালা দিয়ে মশালের আলো ভেতরে ঢুকে ঘরের কালো দেওয়াল, কালো মেঝের উপর এসে পড়ে ঘরটাকে যেন একেবারে আতঙ্কজনকভাবে বীভৎস করে রেখেছে; এতটাই বীভৎস যে, পারতপক্ষে ও ঘরের ভেতরে রাজপুত্র প্রসপেরো-র প্রিয় সভাসদদের কেউই কখনও পা রাখতে সাহ্স করে না।&nbsp;</p>



<p>এই ঘরটাতেই পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আবলুশ কাঠের বিশাল একটা ঘড়ি। ঘড়িটার পেন্ডুলাম এপাশ ওপাশ দুলতে দুলতে ভোঁতা, ভারী, একঘেঁয়ে শব্দ করে চলেছে। মিনিটের কাঁটা ঘড়ির চারপাশে যখন একপাক খেয়ে আসে, ঘণ্টা পূরণ হয়, ঘড়িটার পিত্তলনির্মিত ফুসফুস থেকে স্পষ্ট, গমগমে, গম্ভীর এবং যথেষ্ট সাংগীতিক মূর্ছনা নিঃসৃত হয়। তবু সে এমনই একটা অদ্ভুত জোরালো সুর যে, প্রত্যেক ঘণ্টায় ঘড়ির সেই আওয়াজে অর্কেস্ট্রার গায়নদার বাজনদারেরা গাইতে গাইতে বাজাতে বাজাতে হঠাৎ চুপ মেরে যেতে বাধ্য হয়। নাচুনেরা নাচের বিভঙ্গ মাঝপথেই থামিয়ে ফেলে। সমস্ত উল্লাসের মাঝে যেন নেমে আসে মুহূর্তের ছন্দপতন। এবং যতক্ষণ ধরে ঘণ্টা বাজতে থাকে, যে-লোকটা সবচেয়ে বেশি মাতাল হয়েছে, সবচেয়ে সে-ই ফ্যাকাশে মেরে যায়। আর যারা বুড়োটে, হাবড়াটে, ঠান্ডাগোছের লোক, তারা ওই শব্দের অভিঘাতে কপালে হাত বুলোতে বুলোতে কী যেন কী কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় গম্ভীর হয়ে এতোল-বেতোল কীসব ভাবতে লেগে যায়। কিন্তু ঘড়ির আওয়াজের শব্দ যখন একেবারে থেমে যায়, অমনি সভার মধ্যে একযোগে হাসির হররা উঠে আসে; এ ওর মুখের দিকে চেয়ে নিজেদের এই মৌহূর্তিক ভয় আর নির্বুদ্ধিতা নিয়ে যেন মস্করা করে। ফিসফিস করে এ ওর কাছে শপথ নেয় এই বলে যে, পরের বার ঘড়ির ঘণ্টা শুনে আর এরকম ভয়টয় পাবে না। অথচ আবার ষাট মিনিট অর্থাৎ কিনা তিন হাজার ছ’শো সেকেন্ড পরে ঘড়ি যেই না বেজে ওঠে, অমনই আবার সেই একই ভয়, একই কাঁপুনি, সেই একই ত্রস্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় যা-তা একটা অবস্থা! &nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিন্তু এসব সত্ত্বেও মোটের উপর আনন্দ ফূর্তি বেশ জমেই উঠেছিল। রাজকুমারের পছন্দ সব জবরদস্ত; রং ঢং রুচি সমস্তই মিহি। নিছক ফ্যাশনবন্দী কেতায় প্রসপেরো-র অরুচি; তার পরিকল্পনাগুলো সব সাহসী আর জ্বালাময়ী, ভাবনাচিন্তা সমস্তই বর্বরোচিত উজ্জ্বলতায় দেদীপ্যমান। কেউ কেউ তাকে ভাবত পাগল, কিন্তু তার বশংবদ অনুচরেরা ওকথা মনেও স্থান দিত না। তাকে দেখলে, শুনলে, ছুঁলে—অর্থাৎ কিনা রাজপুত্তুরের সঙ্গে দহরম-মহরম থাকলে কেউ তাকে অন্তত পাগল বলত না। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এই উৎসব উপলক্ষ্যে সাত কক্ষের সাত রকম অলংকরণ, মুখোশধারী নর্তক-নর্তকীদের বেশবাস সব কিছুই রাজকুমার প্রসপেরোর বিচিত্র রুচিমাফিক। সেসব রংচং যে যথেষ্ট কিম্ভূতকিমাকার হয়েছিল, তাতে আর সন্দেহ কী? চোখ-ঝলসানো চমক, চপলতা, উদ্ভট কল্পনা সবই এসে মিশেছিল এই মুখোশ-নাচের আঙ্গিকে; যার অনেকটাই ভিক্তর হুগোর ‘হারনানি’ নাটকের মধ্যে দেখা গিয়েছিল এর আগে। বেমিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর বেঢপ সাজসরঞ্জামের লতাপাতাসমন্বিত কারুকাজ-করা বিচিত্র সব আকার, পাগলের মতন সব উদ্ভট কল্পনায় ভরে থাকা সেই নাচের অনুষ্ঠান— যার মধ্যে অনেকটাই সুন্দর, অনেকটাই বিশৃঙ্খল, অনেকটাই বিকট, কিছুটা বা ভয়ানক, এবং বিরক্তকর উপাদানও যে খুব কম ছিল, তাও বলা যায় না।</p>



<p>এই সাতটা ঘরের মধ্যে যেন বিচিত্র স্বপ্নসমূহ এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। এবং এরা—এই সমুদায় স্বপ্ন সামনে পেছনে পাক খাচ্ছিল ঘরগুলোর রং নিজেদের শরীরে শুষে নিয়ে, তাদের নাচের তাল আর পায়ের চাল নিয়ন্ত্রণ করছিল অর্কেস্ট্রার খামখেয়ালি বাজনা। এবং কিছুক্ষণ পরে পরে হঠাৎ অন্তপ্রান্তের সেই কালো কক্ষের আবলুশ কাঠের ঘড়ি বেজে উঠছিল&#8230; ঢং ঢং ঢং&#8230; এবং তখন&#8230; এক মুহূর্তের জন্যে সমস্ত চুপচাপ, সমস্ত স্থির, শুধু সেই ঘড়িটার গম্ভীর আওয়াজ, আর কিছু নয়&#8230; যেন এক লহমায় এই সব স্বপ্নরা পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু একটু পরেই যখন ঘণ্টাধ্বনি-প্রতিধ্বনি মরে আসছিল&#8230; একটি লহমার নিস্তব্ধতা শুধু&#8230;তারপর আবার সেই হালকা হাসির চাপা ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল&#8230;আবার উত্তাল হয়ে উঠছিল জীবনসংগীত, স্বপ্নগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিল আবার, আগের থেকেও অনেক বেশি উদ্দাম হয়ে উঠছিল নাচের চলন, জানালার ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা তেপায়া স্তম্ভের উপর মশালের আলো ঘরের রঙিন কাঁচের মধ্য দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে স্বপ্নসমূহের গায়ের উপর এসে পড়ে আরও রঙিন, আরও বর্ণোজ্জ্বল করে তুলছিল তাদের।&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিন্তু পশ্চিমদিকের সেই কালো ঘর, সেখানে মুখোশধারীদের কেউ প্রবেশ করতে সাহস করছিল না। এদিকে রাত নিবিড় হচ্ছে, রক্তাভ জানালার কাঁচের মধ্য দিয়ে চুনিরঙা আলো চুঁইয়ে পড়ছে কালো ভেলভেটের বিমর্ষতার উপর। কার্পেটের উপর দুয়েকটি পায়ের স্পর্শে কখনও কখনও আবলুশ কাঠের সেই বিশালাকার ঘড়ির ভেতর থেকে চাপা একটা আর্তনাদ উঠে আসছিল, অন্যান্য কক্ষসমূহের ভিতর বহে চলা আমোদ-আহ্লাদের থেকেও গভীরভাবে মর্মস্পর্শী সেই নিহিত বিষাদ।</p>



<p>সে যাই হোক, অন্যান্য ঘরগুলোতে কিন্তু মানুষের সন্নিবিষ্ট ভিড়; জীবনের উদগ্র উচ্ছ্বাস বল্‌গাহীনভাবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে বহে চলছিল। উৎসবের সেই জাঁকজমক চলতেই লাগল, যতক্ষণ না ঘড়িটাতে মধ্যরাত্রির ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে। আমি আগেই যেমন বলেছি, ঘণ্টা বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গান থেমে গেল, শান্ত হয়ে গেল নর্তক-নর্তকীদের বিভঙ্গ, সব কিছু সহসা নিস্তব্ধ যাওয়ার সেই অসহজ আড়ষ্ট অনড় এক নৈঃশব্দ্য। অন্যান্য প্রত্যেক ঘণ্টাতেই যে এটা হচ্ছিল, হ্যাঁ, আমি তো তা আগেই বলেছি, তবে এবারে একটু বিশেষ—কেননা এবার ঘড়িতে পরপর বারোটা ঘণ্টা বাজার আওয়াজ&#8230; এবং সম্ভবতঃ তার ফলেই চিন্তা করার আরও একটু বেশি সময়&#8230; উল্লাসকারীদের মধ্যেও যারা একটু অধিক চিন্তাশীল, তাদের জন্যে আত্মনিমগ্ন হওয়ার আরও অধিক অবসর। আর সেই অবসরের মধ্যে যখন অন্তিম ঘণ্টাধ্বনির শেষ প্রতিধ্বনিটুকুও অতলান্ত নীরবতার ভিতর হারিয়ে গেল, ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে অনেকেরই চোখে পড়ল মুখোশপরা একটা নতুন আকার&#8230;একটা সম্পূর্ণ নতুন লোক, যাকে এর আগে কেউ কখনও দেখেনি। সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন ব্যক্তিটির আবির্ভাব ফিসফিসানি গুজবের রূপ ধরে ভিড়ের মধ্যে চাউর হতে লাগল&#8230; মৃদু গুঞ্জরণ আরম্ভ হল&#8230; এ লোকটা কে? এ লোকটা কে? এ লোকটা কোত্থেকে এল?—প্রথমে অসন্তোষ, পরে বিস্ময়, তদনন্তর ভয়, আতঙ্ক আর সব শেষে কেমন একটা অপরিতৃপ্ত বিতৃষ্ণা!&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>মুখোশধারীদের সেই নৃত্যে কতটা অদ্ভুত সব পোশাক পরে সেদিন লোকজন নাচানাচি করছিল, আমি সে-কথা আগেই বলেছি। সেই সব বিচিত্র আকারের ভিড়ের মধ্যে কোনো সাধারণ বেশবাস পরিহিত মানুষ যে এতটা উত্তেজনা উৎপন্ন করতে পারত না, তা সহজেই অনুমেয়। সত্যি বলতে কী, সে-রাতের মুখোশনাচে বাড়াবাড়ির কোনো সীমা ছিল না, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে নবাবির্ভূত ব্যক্তিটি যেন খোদার উপরেও খোদকারি করে দিয়েছিল। রাজপুত্র প্রসপেরোর খামখেয়ালিপনাকেও বুঝি হার মানিয়ে দিয়েছিল এই নবাগত মুখোশধারী। সবচেয়ে বেপরোয়া লোকের হৃদয়েও অনুভবের সেই সূক্ষ্ম তন্ত্রী থাকে, যাকে আবেগ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ছোঁয়া যায় না। একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়া লোক, যার কাছে জীবন ও মৃত্যু দুটোই নেহাৎ তামাশা হয়ে গেছে, এমন মানুষও কিছু কিছু জিনিস নিয়ে মোটেই খিল্লি করতে পারে না। ভিড়ের মধ্যে সবাই এটা বেশ অনুভব করতে পারছিল, এই অপরিচিত আগন্তুক লোকটির চেহারায়, পোশাকআশাকে না আছে কোনো পরিকল্পনা, না আছে ছিরিছাঁদ। লোকটার চেহারা লম্বা, সিড়িঙ্গে। পা থেকে মাথা কবরের পোশাকে ঢাকা। যে-মুখোশে মুখটা আচ্ছাদিত, সেটা দেখলেই মনে হয় যেন শক্ত কড়কড়ে হয়ে যাওয়া একটা মৃতদেহের মুখ, খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করলেও সেটা নকল কি না, তা বুঝবার উপায় নেই। এতটাও, মেনে নিতে না-পারলেও, যা হোক তা হোক করে অন্ততঃ সহ্য করে নেওয়া যেত, কিন্তু বাধ সাধল এই যে, ওই মড়ার মতো লোকটার চেহারায় ‘লাল মৃত্যু’-র বিভীষিকা লেগে ছিল যেন। তার পোশাকআশাকে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, তার চওড়া কপাল আর মরা মুখে যেন জমাট-বাঁধা ভয়ের রক্তচিহ্ন&#8230; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>হলঘরের মধ্যে সমবেত নর্তক-নর্তকীদের মধ্যে লোকটা ধীর গম্ভীর পদক্ষেপে এদিক থেকে ওদিক হেঁটে যাচ্ছিল, যেন এখানে সে কী একটা গুরুভার দায়িত্ব পালন করতে এসেছে। বিচিত্রদর্শন লোকটার উপর রাজপুত্র প্রসপেরোর নজর পড়তেই ভয়ে ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠে রাজপুত্র তো প্রথমে অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়; কিন্তু পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে রেগে আগুন হয়ে উঠল প্রসপেরো। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>‘কার এত সাহস রে,’ নিকটস্থ সভাসদদের উদ্দেশে গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল প্রসপেরো, ‘কার এত সাহস রে যে এমন একটা কুচ্ছিত সং সেজে আমাকে অপমান করতে এসেছে? ধর ওই লোকটাকে, ওর মুখোশ খুলে নে—দেখি কে এ লোকটা, দুর্গের চূড়োয় কাকে কাল সূর্যোদয় হলেই আমাকে ফাঁসিতে লটকাতে হবে।’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>একেবারে পুবদিকের নীলরঙা কক্ষটাতে দাঁড়িয়ে প্রসপেরো প্রাণপণে চেঁচাচ্ছিল। প্রসপেরো বলিষ্ঠ, ডাকাবুকো লোক, তার গমগমে কণ্ঠস্বর তখন সাতটা ঘরের মধ্য দিয়েই শোনা যাচ্ছে। রাজপুত্রের ইশারায় গানবাজনা থেমে গেছে ইতোমধ্যেই&#8230; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>রাজপুত্র দাঁড়িয়ে ছিল নীল ঘরে, তার চারপাশে ফ্যাকাশে মেরে যাওয়া সভাসদদের একটা জটলা। প্রথমে রাজপুত্রের হুঙ্কার শুনে জটলার একাংশ ওই অনুপ্রবেশকারীর দিকে ধেয়ে গেল। তখনও লোকটা কাছেপিঠেই দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর সে-লোকটা সচেতন রাজকীয় পদক্ষেপে রাজপুত্রের দিকে সরে আসতে লাগল। কিন্তু কী এক অজানা ত্রাসে, এতক্ষণ যারা খুব হম্বিতম্বি করছিল, তাদের একজনও এখন আর লোকটাকে ধরবার জন্য এগিয়ে যেতে সাহস করল না। ফলতঃ কোনো বাধা না পেয়ে মড়ার মুখোশপরা সেই লোকটা রাজপুত্র প্রসপেরোর এক গজ দূর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যেতে লাগল। সমস্ত সভাসদের দল যেন ত্রস্ত হয়ে ঘরের মাঝখান থেকে ছিটকে দেওয়ালের দিকে সভয়ে সেঁটে যেতে লাগল, আর সেই ভয়ানকদর্শন আগন্তুক ওদের মধ্য দিয়ে অবাধে পথ করে সামনে এগিয়ে গেল। &nbsp;</p>



<p>সেই এক গম্ভীর মাপা পদক্ষেপ, যা লোকটাকে প্রথম দর্শনেই সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, সেই এক রাজকীয় সচেতন ভঙ্গিমা। নীল ঘর থেকে গোলাপি ঘর—গোলাপি থেকে সবুজ—সবুজ থেকে কমলা—কমলা থেকে সাদা— সাদা থেকে বেগুনি&#8230; তাকে ধরবার জন্যে নির্দিষ্ট প্রয়াস করার আগেই সেই ছায়ামূর্তি এগোতে লাগল সামনে, আরও সামনে। এতক্ষণে হুঁশ ফিরে পেয়ে রাজপুত্র প্রসপেরো নিজের এক মুহূর্তের কাপুরুষতার লজ্জাকে অতিক্রম করে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ছ’টা ঘরের মধ্য দিয়ে লোকটাকে ধরবার জন্যে ছুটে গেল, যদিও তার তাঁবেদারদের প্রত্যেকেই তখন ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছে; একজনও রাজপুত্রকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল না। খাপ থেকে উদ্যত ছুরি বের করে রাজপুত্র সম্মুখে ধেয়ে যাচ্ছিল&#8230; অপস্রিয়মাণ ছায়ামূর্তির তিন কি চার ফিটের মধ্যে এসে পড়েছে যখন, কালো ভেলভেটে মোড়া ঘরটায় ঢুকে পড়েছে প্রায়&#8230; ঠিক এমন সময় সেই ছায়ামূর্তি রাজপুত্রের দিকে মুখোমুখি ফিরে দাঁড়াল। &nbsp;</p>



<p>ভয়ানক একটা চিৎকারের আওয়াজ&#8230; তারপর কার্পেটের উপর খসে পড়ল প্রসপেরোর হাতের ছুরিটা, ঠিক তার পরমুহূর্তেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল প্রসপেরোর নিষ্প্রাণ শরীর। &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এতক্ষণে মরিয়া হয়ে শেষ সাহস সঞ্চয় করে আমোদগেড়ে সভাসদের দল সেই কালো ঘরটায় ছুটে গিয়ে ঢুকল। আবলুশ কাঠের ঘড়ির সুগম্ভীর ছায়ার ভিতর সেই মুখোশধারীর দীর্ঘাকার শরীর স্থির ঋজু ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটাকে তখনই তারা ঘিরে ধরল। কিন্তু লোকটাকে শক্ত করে পাকড়ে ধরতে গিয়ে অনুচ্চারিত ভয়ে সকলেই শিউরে উঠল ততক্ষণাৎ; সেই কবরের পোশাক আর মরা-মানুষের মুখোশের নীচে কোনো শরীরই নেই—শুধুই হাওয়া&#8230; শুধুই ভয়াবহ নিরবয়ব শূন্যতা!</p>



<p>এবার আর অণুমাত্র সন্দেহ রইল না, দুর্গে লাল মৃত্যু প্রবেশ করেছে। সে এসেছে রাত্রে চোরের মতো পা টিপে টিপে। একের পর এক আমোদপ্রিয় লোকগুলো সেই আমোদগৃহের রুধিরসিক্ত মেঝের উপর লুটিয়ে পড়তে লাগল। এবং পতনের সঙ্গে সঙ্গেই সকরুণ মৃত্যু। শেষ মানুষটা যখন আছড়ে পড়ল মেঝেতে, আবলুশ কাঠের ঘড়িটাও বন্ধ হয়ে গেল। তেপায়া বাতিস্তম্ভের উপর নিভে গেল মশালের আগুন। অন্ধকার, অপক্ষয় এবং রুধিরস্রাবী মৃত্যুর নিঃসীম আধিপত্যে ডুবে গেল সমস্ত দৃশ্যাবলী। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>(অনুবাদকের টিপ্পনি:১৮৪২-এ এডগার অ্যালান পো-র লেখা এই গল্পখানি অনুবাদ করতে করতে ২০১৯-এ আরম্ভ হওয়া দুনিয়াব্যাপী করোনা মহামারীর সময়কার প্রসপেরো-সম কতগুলো স্বার্থান্ধ মানুষের মুখ আমার মনের&nbsp; মধ্যে জেগে উঠছিল বারবার। অনুবাদ-গল্পটি পড়তে পড়তে নিশ্চয়ই আপনাদেরও সেসব কথা মনে পড়বে )&nbsp;&nbsp;&nbsp; &nbsp;&nbsp;</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/edgar-allan-poe-story-the-mask-of-red-death-bengali-translation-by-sanmatrananda/">লাল মৃত্যুর মুখোশ</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/edgar-allan-poe-story-the-mask-of-red-death-bengali-translation-by-sanmatrananda/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ইয়াকুব মিয়া ও তার জান</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-yaqub-mian-o-tar-jan-by-bindod-ghoshal/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-yaqub-mian-o-tar-jan-by-bindod-ghoshal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 19 Sep 2025 04:59:52 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<category><![CDATA[Bengali Short stories]]></category>
		<category><![CDATA[Bengali Short story]]></category>
		<category><![CDATA[binod ghoshal]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9410</guid>

					<description><![CDATA[<p>লোকটা তার ডান হাতটা তুলে মহিলার ঠিক ব্রহ্মতালুতে রাখল। বেশ চাপ দিয়েই। মহিলা চোখ বুজে কীসব ফিসফিস করে বলে চলেছেন। আমি কিছুই বুঝলাম না।</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-yaqub-mian-o-tar-jan-by-bindod-ghoshal/">ইয়াকুব মিয়া ও তার জান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিনোদ ঘোষাল</p>



<p>ভাই সিটটা আমাগো। সইর&#x200d;্যা বয়েন।</p>



<p>উইন্ডো সিটে সবে বসেছি তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এমন কথায় বক্তব্যকারীর মুখের দিকে তাকালাম। প্লেনে ঢোকার আগে চোখ পড়েছে বেশ কয়েকজন সুন্দরীর প্রতি। যথোচিত নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছি কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা। আজ পর্যন্ত কোনও মনহরণকারিণী আমার পাশে তো দুরস্ত ধারে কাছেও বসেন না। ব্যাপারটা অনেক অনুসন্ধান করার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটা আমার ললাটলিখন। তবে সেটা যে মন্দভাগ্য নয় তা বোঝানোর জন্যই ঈশ্বর একবার অটোতে আমার পাশে এক সুন্দরী সুবেশা এবং তন্বীকে বসতে পাঠিয়েছিলেন। গোটা রাস্তা আমি পুরো তটস্থ হয়েছিলাম। সামান্যতম স্পর্শজনিত দুর্ঘটনাও যে মান এবং প্রাণ দুই নিয়েই অবলীলায় টানাটানি করতে পারে তার ভয়েই একপ্রকার কেন্নো টাইপ হয়ে পুরো রাস্তা গিয়েছি। তিনি যখন নেমে গেলেন তখন আমার দমআটকানো শরীর পুরো ভুসস করে ছেড়ে গেল। আআহহ কী শান্তি! সেদিনই বুঝেছিলাম পার্শ্বস্থিত রূপসী অবলার চেয়ে চিমসে গোঁফওলা ঢের ভাল।</p>



<p>তবে ভালোরও তো একটা লিমিট রয়েছে তো রে ভাই। সইর&#x200d;্যা বয়েনের দিকে বিরস বদনে তাকালাম আমি। চিবুকে দাড়ি, মাথায় ফেজ, পানখাওয়া দাঁত, চেক শার্ট কটকি প্যান্ট আমার দিকে দুটো বোর্ডিং বাস বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দ্যাহেন আমাগো আঠাইশ।</p>



<p>আমি বললাম আমিও আঠাশ। আঠাশ সি। ওদের পাসে লেখা আঠাশ এ আর বি। সেটাই বললাম।</p>



<p>সেটাই বললাম। শুনে মধ্যপঞ্চাশ বলল অ। ঠিক আসে। বলে হাতে ধরা বিগশপার্স, থলে ইত্যাদি ওপরে তুলে দিয়ে পাশে সালোয়ার কামিজ পরা মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল জান বও।</p>



<p>জান! শুনে পুক করে হাসি পেল আমার। কাঠির মতো রোগা মহিলা। চোখ মুখ বসা। সত্যি বলছি একবার তাকালে আর দ্বিতীয়বার দেখার আগ্রহ থাকে না। যাইহোক জানের জনার্দন বসলেন মাঝে। জানলার ধারে আমি আর অন্যধারে মহিলা। লোকটি পাশে বসামাত্রই মেজাজ খিঁচড়ে গেল আমার। জগতে যেকয়েকটি বিষয় আমাকে অত্যন্ত বিরক্ত করে তার মধ্যে অন্যতম হল দুর্গন্ধ। এই জিনিসটির সঙ্গে আমি কিছুতেই কম্প্রোমাইজ করতে পারি না। আর বেছে বেছে আমার পাশেই। শার্ট থেকে যেমন ঘামের উৎকট গন্ধ বেরোচ্ছে যে আমার পেটে যথারীতি পাক দিতে শুরু করল। শালার কপাল আমার এত খারাপ কেন? কেন? কেনওওওও?</p>



<p>কয়ডায় ছাড়বে? লোকাল বাস বা ট্রেনের ক্ষেত্রে সহযাত্রী যে প্রশ্নটি অনেকসময় করেন। কলকাতা টু ঢাকা ইন্ডিগো সিক্স ই আঠেরো আটান্ন নম্বর ফ্লাইটে আমার সহযাত্রী প্লেনের ভেতর নিজের সিটে বসে আমাকে ঠিক এইপ্রশ্নটি যখন করলেন তখন আমার জীবন আরও ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল তার মুখনির্গত গন্ধে। কোনও রাখঢাক না করে স্ট্রেট বলছি স্রেফ বমি চলে এল। হে ঈশ্বর মাঝেমাঝে তো আমার প্রতি ছোটখাটো সদয় হলেও পারো? এই যেমন ভাল সুগন্ধী মাখা কোনও মানুষ কিংবা যার মুখে চমৎকার বেনারসি জর্দা। নেই কপালে নেই। চিরকালই আমার কপাল এমন এবং এমনই চলছে। ঘড়ি দেখলাম। ঢাকা পৌঁছতে ঠিক পয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু টেক অফ করতে এখনও বেশ কিছুক্ষণ সময়। ততক্ষণ সহ্য করে যেতে হবে।</p>



<p>আমার ভাবনা শেষ হল না তার আগেই তিনি প্রকাণ্ড শব্দ করে দুইবার হাঁচি দিলেন। না মুখে হাত দিয়ে নয়, এমনিই। হাঁচির লালামিশ্রিত বাষ্পের দুর্গন্ধে আমার বমি পেয়ে গেল। নাক চিপে অন্যদিকে তাকালাম। বাস হলে জানলা খুলে দিতাম। এখানে সেই উপায় নেই। প্লেনের জানলা খোলা যায় না। ফলে নিজের দুর্ভাগ্যকে আরও একবার গালাগাল দিতে দিতে চুপ করে বসে সময় গুণতে থাকলাম। মোবাইল বার করে ফেসবুক খুলে খুটখাট করতে শুরু করেছি দেখি পানখাওয়া মুখ আমার পাশে ঝুঁকে আমার মোবাইলে চোখ রেখেছে। আচ্ছা জ্বালা তো?</p>



<p>মোবাইল একটু কাত করলাম। তিনিও নাছোড়। কাত হলেন। আমার প্রোফাইলে ঝাড়ি না দিলে তার যেন ভাত হজম হবে না। মোবাইল অফ করে পকেট ভরলাম। তিনিও একবার তার সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে বাঙাল উচ্চারনে জিজ্ঞাসা করলেন, জান ঠিক লাগে তো?</p>



<p>জান! শব্দটা কানে কট করে বাজল আমার। হাসিও পেল।&nbsp; &nbsp;</p>



<p>যা হোক, দীর্ঘযুগ পার করে প্লেন এবার নড়ে উঠল। ধীর গতিতে এগোতে থাকল রানওয়ের দিকে।</p>



<p>আল্লাহ! বলে একটি স্বস্তির শাস ছেড়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে দুই হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখে বোলালেন। তারপর আচমকাই আমার দিকে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন ভাই(ব উচ্চারণে) আফনের কী ঢাকায় বাসা?</p>



<p>আমি সংক্ষেপে উত্তর দিলাম, না।</p>



<p>তয়?</p>



<p>আফনে কী করেন? আমারে এট্টু ধরতে পারেন না? সহসাই রিনরিনে গলায় অভিযোগ ভেসে এল ‘জান’ এর কাছ থেকে।</p>



<p>জ্বী জান, এই ধরি। বলে আবার সহজ একগাল হাসি দিলেন তিনি।</p>



<p>কী ধরবে? আমার বেশ কৌতুহল হল আমার। আমি আড়চোখে তাকালাম ওদের দু’জনের দিকে। কী করতে চায় তা জানার দুরন্ত আগ্রহ জন্ম নিল আমার। দেখলাম। লোকটা তার ডান হাতটা তুলে মহিলার ঠিক ব্রহ্মতালুতে রাখল। বেশ চাপ দিয়েই। মহিলা চোখ বুজে কীসব ফিসফিস করে বলে চলেছেন। আমি কিছুই বুঝলাম না। বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম ওদের এই কান্ডর দিকে।  কী করতে চাইছে দুজনে?</p>



<p>আমার কৌতুহলের প্রকাশ বোধহয় বেশিই হয়েগিয়েছিল। মহাশয় আবার আমার দিকে লালছোপ দন্তরাজি প্রকাশ করে বললেন, আমার বিবিজানের আবার প্লেন উঠার সময় একটা সমইস্যা হয়। মাথা ঘুরায়। এমন কইর&#x200d;্যা মাথাটা চাইপ্যা থুইলে ঠিক থাহেন।</p>



<p>অ। টেক অফ করার জন্য ঝড়ের গতি নিল বিমান। উনি তার জানের ব্রহ্মতালু চেপে ধরে বিরবির করে মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। শোঁওও করে প্লেন মুহূর্তে অনেকটা ওপরে উঠে গিয়ে আকাশে থিতু হওয়ার পর হাত নামালেন তিনি। তারপর লোকটা আমাকে সরাসরি বললেন, আসসালায়কুম, আসেন একটু আলাপ করি। আমি ইয়াকুব মিয়া। আর ইনি আমার বিবিজান সালেখা।</p>



<p>আমি দুইজনকে নমস্কার জানালাম। তারপর ঘড়ি দেখলাম। আরো মিনিট পঁচিশ। ইয়াকুব সাহেবের গায়ের আর মুখের গন্ধ আমার চারদিক আমোদিত করে তুলছে।</p>



<p>ঢাকায় কী কামে যায়েন?</p>



<p>একটা অনুষ্ঠান রয়েছে।</p>



<p>আফনে গান বাজনা করেন নাকি?</p>



<p>না সেসব কিছু না। এমনিই বন্ধুর একটা অনুষ্ঠান। আমি আসলে যাচ্ছি ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে। এত কথা একে বলার প্রয়োজন বোধ করলাম না।</p>



<p>আইচ্ছা। তাইলে ঢাকা এইপ্রথম বার যাইতাসেন?</p>



<p>না দ্বিতীয়বার।</p>



<p>আইচ্ছা। ঢাকা ঘুরবেন তো?</p>



<p>নাহ একদিনের প্রোগ্রাম। পরশু ফিরে আসছি।</p>



<p>ওহ&#8230;বলে একটু চুপ করলেন ইয়াকুব। তারপর বেশ মন খারাপ করেই বললেন, অবিশ্যি আমাগো গরীব দ্যাশ। দেখনের আছে টা কী।</p>



<p>কথাটা মন থেকে বললেন নাকি আমাকে ঠুকে, সেটা বুঝলাম না। আমি পালটা জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা ইন্ডিয়া কি বেড়াতে এসেছিলেন?</p>



<p>না ভাই, বেড়াইনের ভাইগ্য আর আমাগো কই? আইসিলাম বিবিজানের ট্রিটমেন্ট করাইতে। এই যে গলায় কেমো পড়সে এতদিন। বড় কষ্ট ভাই।</p>



<p>আমি সত্যিই এমন উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বেশ চমকে উঠলাম। কেমো! গলায়! মানে&#8230;</p>



<p>ক্যানছার ভাই। পুরা দশটা মাস মিয়াবিবিতে পইড়্যাছিলাম আপনাগো বুম্বাইতে। টাটা ক্যানসার রিসাচ আসে না&#8230;ওইহানে।</p>



<p>ওহ&#8230;আর কিছুই বলতে পারলাম না আমি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায়।</p>



<p>কী কষ্ট কইর&#x200d;্যা যে কাটাইসি দুইজনে এই এক বছসর তা কী কমু ভাইরে&#8230;নিজের ভিটা ছাইড়্যা, পুলা মাইয়্যা ছাইড়্যা&#8230; ।</p>



<p>এখন ভাবী কেমন রয়েছেন?</p>



<p>মিথ্যা কমু না ভাই। অনেক ভাল আসে। ডাক্তারে কইসে বাকিটা ওষুধে ঠিক হইব। ইন্ডিয়ার ডাক্তারের উপর আল্লাআলার দুয়া রইস্যে ভাই। হেয়ারা জাদু জানেন। আমার বিবিজানরে মৃত্যু থিক্যা ফিরাইয়া আনসেন তেনারা। ইয়াকুবের চোখেমুখে সেই কৃতজ্ঞতার সরল অভিব্যক্তি ফুটে উঠল।</p>



<p>একটা কথা আমি আর না জিজ্ঞাসা করে পারলাম না। নিজের দেশে চিকিৎসা করাতে পারলেন না?</p>



<p>বাংলাদ্যাশে ট্রিটমেন্ট নাই ভাই। মানে আসে, কিন্তু কঠিন ব্যামো হইলে তার ট্রটমেন্টের এখনও ব্যবস্থা হয় নাই। শুধু খরচার পর খরচা হইব কিন্তু ট্রিটমেন্ট পাইবেন না।</p>



<p>সেইজন্যই কি সব বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসা করাতে ইন্ডিয়ায় আসে?</p>



<p>হ আর কি?</p>



<p>দশমাস ছিলেন?</p>



<p>হ। তার চাইর মাস আগে আরও একমাস থাইক্যা গেসি।</p>



<p>তাহলে এলেনই যখন মুম্বাই না গিয়ে ভেলোরে যেতে পারতেন।</p>



<p>হ গেসিলাম তো। ওইহানেই গেসিলাম। কিন্তু ওইহান থিকাই কইল মুম্বাই টাটা ক্যানছাড় রিসার্চে নিয়া যাইতে। তাই পরের বার তৈরি হইয়া গ্যালাম।</p>



<p>এতদিনের ভিসা পেলেন? শুনেছি বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া আসার ভিসা পেতে ঝামেলা হয়।</p>



<p>হুঁ তা হয়, তবে মেডিকাল ট্রিটমেন্টের গ্রাউন্ডে পেপারস ঠিকমত জমা দিলে ভিসা পাইতে পবলেম হয় না। অনেকদিনের ভিসা পাওন যায়।</p>



<p>ও বলে আমি মুখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে তাকালাম। নিচে সাদা মেঘগুলো থোকা থোকা জমে রয়েছে। তুলোর পাহাড়। ভারি সুন্দর লাগছে দেখতে।</p>



<p>যাক এখন উনি ঠিক হয়েছেন এটাই আনন্দের।</p>



<p>হ্যাঁ ভাই।</p>



<p>আমি আচমকাই খেয়াল করলাম প্রথমে যতটা বদ গন্ধ লোকটার গা থেকে বেরোচ্ছিল এখন আর ততটা নয়, তাহলে আমি কি অন্যমনস্ক হয়ে পড়লাম। হলেই ভাল।</p>



<p>আসলে সালেহা হইল আমার জান বুঝলেন কি না। ওর কিস্যু হইলে আমি ওইহানেই শ্যাষ। আমাগো শরীল আলাদা কিন্তু জান একটাই বুঝলেন কি না।</p>



<p>সঙ্গে সঙ্গে মহিলা চাপা গলায় ধমক দিল আহ আফনে একটু চুপ থাকতে পারেন না ক্যান? সারাক্ষণ খালি&#8230;</p>



<p>শুনে আবার দাঁত বার করে হাসলেন ইয়াকুব। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন শরম পাইতাসে। আইচ্ছা আর কমু না। বলে কথা বদলে ইয়াকুব বললেন আপনাগো নসিব বড় ভাল ভাই। ইন্ডিয়ার মতো দ্যাশে জন্মাইসেন। কত ব্যবস্থা, কত কিসু রইসে। এইবার তো কিছু ঘুরান হয় নাই। জান রে কইসি এরপরের বার যখন আমু ওর টেস্টের লইগ্যা তখন ঘুরুম। তাজমহল দেখুম বিবিরে লইয়্যা।</p>



<p>আমি বললাম হ্যাঁ সেই ভাল।</p>



<p>তয় ট্যাহাপয়সা জলের মতো বাইর হইসে ভাই। এই পেলেনে যাতায়াত, এতদিন ওইহানে থাকা, খাওয়া ট্রিটমেন্ট। যা ছিল প্রায় সবই শ্যাষ, তয় আমার কুনো কষ্ট নাই হ্যার লইগ্যা। ট্যাহা আজ নাই কাল আবার হইব, হাত দুইটা আল্লাহ অহনও মজবুত রাখসে, মানুষতারে যে তাজা ফিরৎ পাইলাম এইটাই আল্লাতালার দুয়া তাই না ভাই?</p>



<p>অবশ্যই।</p>



<p>ইন্ডিয়া পাশে ছিল বইল্যা আমার বিবিজান বাঁচল ভাই। আমাগো দ্যাশে ওরে বাঁচাইতে পারতাম না। &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>সত্যি বলতে নিজের দেশের প্রশংসা শুনতে ভালই লাগছিল। আমাদের দুজনের ভাষা বাংলা হলেও দেশ দুটো আলাদা। ফলে মনেরও কোথাও একটা কাঁটাতার বিছানো রয়েছে সেটা টের পেলাম। কিন্তু ইয়াকুব বারবার নিজের দেশকে একটু খাটোই করছিলেন আরও এমন কিছু কথা বলে যেটা আমার ঠিক ভাল লাগছিল না। সব দেশেরই ভাল মন্দ রয়েছে কিন্তু সেটা অন্যদেশের মানুষের কাছে না বলাই ভাল।</p>



<p>একটু পর এ্যানাউন্সমেন্ট হল সিটবেল্ট বেঁধে নিতে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যান্ড।</p>



<p>বাংলাদেশ আইয়্যা পড়ল নাকি? হঠাৎই জিজ্ঞাসা করলেন বছর পঞ্চাশের ইয়াকুব।]হ্যাঁ এই তো বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। আমি নিচের দিকে তাকালাম ছেড়া ছেড়া মেঘের ফাঁকে বহু নিচে খুব ছোটছোট বাড়ি, আলো, রাস্তা দেখা যাচ্ছে।</p>



<p>ইয়াকুব আবার একটা শ্বাস ছাড়লেন। জান আইয়া পড়সি, আহ আল্লাহ। বাংলাদ্যাশের আকাশের উপড় অহন আমরা&#8230;কী অদ্ভূত তৃপ্তি নিয়ে কথাটা বললেন ইয়াকুব। ওর শ্বাস ছাড়ায় আমি এবার কোনো দুর্গন্ধ পেলাম না। আমার নাক কি তবে ওই গন্ধ সয়ে গিয়েছে?</p>



<p>আর ঠিক কিছুক্ষণ পর প্লেনটা যখন নিচে নামবে তখন ইয়াকুব আবার তার বেগমজানের মাথায় হাত রাখলেন। প্লেনের চাকাগুলো যখন রানওয়ে স্পর্শ করে একটা ঝাঁকুনি দিল ইয়াকুব আচমকাই বাচ্চাছেলের মতো উল্লসিত হয়ে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন আল্লাহ আমার দ্যাশের মাটি ছুঁইলাম। আআহ আআল্লাহ! আমাগো গরীব দ্যাশ ভাই। আমার দ্যাশ&#8230;</p>



<p>আর কিছু বললেন না ইয়াকুব। ওর চোখেমুখে একটা অপূর্ব আলো ঝলকাচ্ছিল।</p>



<p>আপনাদের বাড়ি কি ঢাকাতেই?</p>



<p>না না রংপুর। ঢাকায় হইলে আজ রাইতে আপনারে দাওয়াত না দিয়া ছাড়তাম নাকি? পদ্মার ইলিশ খাওয়াইয়া তবে ছাড়তাম। আইজ হোটেলে থাইক্যা। কাল বাসে রওনা দিমু।</p>



<p>প্লেন থামল, যে যার হ্ন্যাদব্যাগ বার করতে ব্যস্ত। ইয়াকুবের মোবাইলে বাংলাদেশী সিমের টাওয়ার এসে গিয়েছে। কাকে যেন ফোন করে খুব চিৎকার করে বলছে, ব্যাটা রে আইস্যা পরছি। চিন্তা করিস না। হ্যাঁ রে ব্যাটা। পৌঁছাইয়া যামু&#8230;আরে হ হ এই নে আম্মির লগে কথা ক&#8230;ফোনটা ওর স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন ইয়াকুব। আমি এগিয়ে গেলাম। ওদের কথা আর শোনা হ’ল না।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-yaqub-mian-o-tar-jan-by-bindod-ghoshal/">ইয়াকুব মিয়া ও তার জান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/bengali-short-story-yaqub-mian-o-tar-jan-by-bindod-ghoshal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ধনু দ্য ডন</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/dhonu-the-don-bengali-short-story-by-sumantra-mukhopadhyay/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/dhonu-the-don-bengali-short-story-by-sumantra-mukhopadhyay/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 18 Sep 2025 16:52:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=9396</guid>

					<description><![CDATA[<p>ধনু বাবু ম্যাচের আগে রাতে এমন কিছু দেখতেন, যা পরের দিন ফলে যেত।</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/dhonu-the-don-bengali-short-story-by-sumantra-mukhopadhyay/">ধনু দ্য ডন</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়</p>



<p>&#8211; গেলো, গেলো, গেলো !</p>



<p>&#8211; ও কত্তা, কিছু দ্যাখলেন নাকি ?</p>



<p>&#8211; কে রে তুই হতছাড়া ?</p>



<p>&#8211;&nbsp; আমি কানাই ।</p>



<p>&#8211; এত রাতে তুই এখানে কী করছিস ?</p>



<p>&#8211; বেরিয়ে ছিলাম চুরি করতে, কিন্তু আজ রেতে ঠিক মন লাগলনি। তাই ভাবলাম, আপনি তো জেগেই থাকবেন, যাই আপনার সঙ্গে একটু গল্প করে আসি।</p>



<p>&#8211; তা এসে কী দেখলি ?</p>



<p>&#8211; দ্যাখলাম, এক ফালি বাঁকা চাঁদের আলো যে ভাবে রাস্তার উপর এসে পড়ে, ঠিক তেমনি, দক্ষিণের জানলার ভাঙা খড়খড়ি দিয়ে রাস্তার আলো আপনার মুখের উপর পড়ছে। আর আপনি ঘুমোচ্ছেন। ভাবলাম আপনার বুঝি শরীর খারাপ হল নাকি। কারণ, রেতে তো আপনি ঘুমিয়ে পড়েন না। তাই একটু দ্যাওয়ালে ঠেঁস দিয়া বসলাম। ভাবলাম যদি মনোজ ডাক্তারকে ডাকতে হয়। তা কত্তা, কাল তো ফাইনাল, তা আপনি কী দেখলেন ?</p>



<p>&#8211; কানাইয়ের কথা উত্তর না দিয়ে, খানিকক্ষণ নিজের মনেই ভাবতে লাগলেন ধনু বাবু ওরফে ধনঞ্জয় কর্মকার। তারপর কানাইকে অর্ডার করলেন, এসেছিস যখন, যা রান্নাঘরে গিয়ে দু’কাপ চা করে নিয়ে আয়। আবার দেখিস, কাপ গুলো নিজের পকেটে পুরো নিস না।</p>



<p>&#8211; ছ্যা কী বলেন কত্তা, আপনার বাড়িতে আমি চুরি করতে পারি । তা কত্তা আপনার বাড়ির রান্নাঘরটা কোন দিকে ?</p>



<p>&#8211; খুঁজে দেখ, কোনও একটা ঘরে হবে, উত্তর দেন ধনু বাবু ।</p>



<p>২</p>



<p>গোপীডোবা । চার কিলোমিটার মধ্যেই শেষ আমাদের গ্রাম। শরৎ এলে রং খেলে গোপীডোবার। বর্ষা ফুরোলে ফুলিও শান্ত হয়ে যায়। তার চরেই মাথা চাড়া দেয় কাশের বন। শ্যাপলা উঁকি মারে টলটলে জলের মধ্যে থেকে। গত বিশ বছর ধরে গোপীডোবায় এক অবাক কাণ্ড হচ্ছে। মার্চ মাস থেকে যা শুরু হয়, শেষ হয় মহালয়ার দিন। সকাল থেকেই আজ আমাদের গাঁয়ে উৎসব। কারণ, প্রতিবারের মতো এবারও মহালয়ার বিকেলে আমাদের ইস্কুল মাঠে ফুটবলের ফাইনাল।</p>



<p>তারাসুন্দরী চ্যালেঞ্জ কাপ। না, এর মধ্যে কোনও স্মৃতি এখনও নেই। নবতীপর তারাসুন্দরী সংসারের মাঝমাঠে এখনও সবাইকে ড্রিবল করে চলেছেন। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয় তাঁর গোবরজল দিয়ে শুদ্ধিকরণের কাজ। তারপর আমাদের চাকর সতীশকে নিয়ে গোয়ালে আমাদের দুই গরু সুন্দর ও সুন্দরীর সংসারের কাজ। বেলা বাড়লে নিজের মনেই বাড়ির বাগানে ঘুরে আমার ঠাকুমার জন্য ফুল তুলে আনেন। বিকেল হলে বেরিয়ে পড়েন পাড়া ঘুরতে।</p>



<p>তারকেশ্বর মুখুজ্জ্যে মারা যাওয়ার আগে নিজের বোনের নামে গাঁয়ের ফুটবল টুর্নামেন্টের নাম রেখে গিয়েছেন। যেখানে নিয়ম একটাই, জিতেছো খুব ভাল, ট্রফি হাতে নিয়েছো, ব্যস ওইটুকু !পরের দিন আবার ট্রফি তারাসুন্দরীকেই ফিরিয়ে দিয়ে যেতে হবে। ওই ট্রফি গোবরজলে শুদ্ধি করে তারাসুন্দরী আবার নিজের সিন্দুকে তুলে রাখবেন।</p>



<p>আমরা খেলাবো, খেলব না। এটাই ছিল জামরুলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট তারকেশ্বরের নিদান। তাই এতদিন মাঠে চুন দেওয়া থেকে জল বওয়া &#8211; এটাই ছিল আমাদের কাজ। তবে এবার সেই সিদ্ধান্ত বদলেছে। আর বদলেছেন ধনু বাবুই। ছেলেরা কেন খেলবে না ? এই প্রশ্নটাই বৈঠকে সবার সামনে রেখেছিলেন তিনি। প্রথমে আমার বাবা, যিনি ক্লাবের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, তিনি একটু গাইগুঁই করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ইস্কুলের হেডস্যর রামকরি বাবু এবং থানা দারোগা ভবতোষ বাবুর পাল্টা কাউন্টার অ্যাটাকে বৈঠক জিতে নেয় বিরোধী পক্ষ।</p>



<p>কিন্তু সকাল থেকেই আমাদের টেনশনে বুক ফেটে যাচ্ছে। কারণ, অভিষেকেই আমরা যে ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছি। এই প্রথম তারাসুন্দরী চ্যালেঞ্জের ফাইনাল খেলছি আমরা। কোথায় আনন্দ ? সকাল থেকে আমাদের দুই হাফ ব্যাক হাবুল আর কেষ্টার জ্বর। ফরোয়ার্ড অমল বীজগণিত ভুলে যাচ্ছে। গোলকিপার তারকের ইতিমধ্যেই চারবার আসা যাওয়া হয়ে গিয়েছে। আর এ সবের মধ্যে দক্ষিণ দিকের বার পোস্টের তলায় গুম মেরে বসে আছেন ধনু বাবু।</p>



<p>৩</p>



<p>বিচিত্রের মধ্যে ঐক্য।</p>



<p>গোপীডোবার মুখুজ্জ্যেদের এটাই ইতিহাস। তারসঙ্গে তারাময় সংসার। আমার ঠাকুরদা তারকেশ্বর। আমার ঠাকুমা তারারানি আর আমাদের সবার পিসিমা তারাসুন্দরী। যাঁরা নিজেরাই এক একটা ইউনিভার্স। দুই তারা ছোট থেকেই সই। শশুরবাড়ি থেকে শেষবার অষ্টমঙ্গলার দিনেই এসেছিলেন তারাসুন্দরী। তারপর আর ফেরেননি। সেই থেকে তিনিই এ বাড়ির লাস্ট লাইন অফ ডিফেন্স।</p>



<p>তারকেশ্বর ছিলেন এই গ্রামের প্রথম আইএ পাস। আর ছিলেন মোহনবাগান অন্ত প্রাণ। রোজ সকালে স্টিম ইঞ্জিন চেপে সাহেবদের কোম্পানিতে কলম পিষতে যেতেন। আর মোহনবাগানের খেলা থাকলে ময়দানে ছাতা খুলে সেলিব্রেট করতেন। ফেরার সময় ঢুঁ মারতেন খালাসিটোলায়। কারণ, জিতলেও পান, আবার হারলেও পান।</p>



<p>একবার আমি পিসি ঠাকুমাকে জিগেস করেছিলাম &#8211; আচ্ছা পিসি ঠাকুমা ঠাকুরদা কি মদ খান ? তাতে পিসি ঠাকুমা উত্তর দিয়েছিলেন, না ওষুধ মনে করে খান। এই উত্তরের যে ঠিক কি অর্থ হতে পারে, তা আমি তখন আর বুঝতে পারিনি। যাই হোক এই সংসারে আমার বাবাই বড়। অমলকান্তি এই গ্রামের প্রথম সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট। গ্রামের ইস্কুলেই অঙ্কের মাস্টারমশাই। বড় ক্লাসে ওঠার পর সকালে বাবা, দুপুরে মাস্টারমশাই আবার বিকেলের পর থেকে বাবা, এটাই এখন তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। দুই তারার মাঝে উইথড্রয়াল মিডফিল্ডার হিসাবে দাঁড়িয়ে আছেন আমার মা অলকা।</p>



<p>আমার মেজো কাকা কৃষি বিজ্ঞানি। একসময় জার্মানি গিয়েছিলেন গবেষণা করতে। সেখানে গিয়ে ক্যাথলিন, যিনি এখন কমলা, তাঁকে বিয়ে করে বসেন। সেই খবর শুনে আমার ঠাকুরদা আমার মেজো কাকা অম্লানকান্তিকে ত্যাজপুত্র করেছিলেন। ঠাকুরদা বলেছিলেন, বুড়োর বিয়ে আমরা মানছি না, ও অফসাইডে গোল করেছে। যাইহোক, জয় তারা করে আমার মেজো কাকা আবার আমাদের সংসারেই ফিরে এসেছেন। এখন তিনি সদা ব্যস্ত তাঁর জৈবিক চাষ নিয়ে। আর ক্যাথলিন ওরফে কমলা গ্রামের মেয়েদের স্কুলের শিক্ষিকা। সেখানে পড়ে আমার বোন তিন্নি।</p>



<p>আমার বাকি দুই কাকা সজল ও অরূপকান্তি ব্যস্ত থাকেন মরশুমী কাজে। এর মধ্যে আমার ছোটকাকা অরূপকান্তির মধ্যে চুনী গোস্বামীর ছায়া দেখেছিলেন আমার ঠাকুরদা। কিন্তু ওটা শুধু উনিই দেখতে পেয়েছিলেন। আর গড়ের মাঠে গিয়ে বার দুয়েক চুনী গোস্বামীকে দেখে ফিরেছিলেন আমার কাকা। তাঁর যাবতীয় টোকা ঠাকুরদার তৈরি জামরুলতলা স্পোর্টিং ক্লাবেই। তাঁর কোচিংয়েই আমাদের ফাইনালে ওঠা। চার ফুটবলারের অসুস্থতার বিভ্রান্তিতে আজ অরূপকান্তিও কিংকর্তব্যবিমূঢ়।</p>



<p>৪</p>



<p>ছোট বেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে দেখতাম এক ভদ্রলোকের আনা গোনা। প্রায় ছ ফিটের উপর লম্বা। সাহেবদের মতো গায়ের রং। উত্তমকুমারের মতো হাসি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ধুতির উপর হাওয়াই শার্ট। ইতিহাসের পাতায় আঁকা আলেকজান্ডারের মতো নাক, আর চোখে গ্রেগরি পেগের মতো রিমলেস চশমা। যাওয়ার আগে আমার মায়ের কাছে একটাই আবদার থাকত&#8230;</p>



<p>&#8211; বউমা একটা পান।</p>



<p>ঠাকুমাকে জিগেস করতাম, কে গো উনি ?</p>



<p>&#8211; উনি ধনঞ্জয় কর্মকার। ওই যে গ্রামের পূর্ব দিকের বড় বাড়ি সেই বাড়িতেই ধনু থাকে।</p>



<p>বাবা আর মেজো কাকা দেখতাম তাঁকে ডাকতেন ধনু দা বলে। সেজো কাকা ডাকতেন শুধু ধনু বলে। আর ছোটো কাককে বলতে শুনতাম, ধনু কাকা। তাই একবার আমি ওনাকেই জিগেস করেছিলাম, আচ্ছা আপনাকে আমি কি নামে ডাকব ?</p>



<p>&#8211; উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ধনু দ্য ডন। সেই থেকেই তিনি আমার কাছে ধনু দ্য ডন। ঠাকুমা বলতেন ধনু বাবুর মধ্যে নাকি এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। কী হবে, তা নাকি আগে থেকে আঁচ করতে পারতেন ধনু বাবু।</p>



<p>বছর পাঁচেক আগের কথা। তার কয়েক মাস পরেই তারকেশ্বরের শতবর্ষ। বাবা কাকাদের পরিকল্পনা তো আছে, আমি আর তিন্নি মিলে ঠাকুরদার জন্য স্পেশাল প্ল্যান করছি। কিন্তু এক শীতের দুপুরে হঠাৎ করেই নড়বড়ে নিরানব্বইয়ে নিজের উইকেট দিয়ে গেলেন আমার ঠাকুরদা। পরে তিন্নি আমায় বলেছিল, জানিস দাদাভাই আমি মনোজ ডাক্তারকে ধনু দ্য ডনের কানে বলতে শুনেছি।</p>



<p>&#8211; আমি জিগেস করলাম কি ?</p>



<p>&#8211; তিন্নি বললো, মনোজ ডাক্তার ধনু দ্য ডনকে জিগেস করছিলেন, ধনু বাবু আপনি কিছু কি দেখেছিলেন নাকি ? মনোজ ডাক্তারের এই প্রশ্নে বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন ধনু বাবু।</p>



<p>এদিন তাই সকালে দক্ষিণ দিকের বার পোস্টের নিচে ধনু বাবুকে গম্ভীর হয়ে বসে থাকতে দেখে আমার বুকটাও ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। তাহলে কী ধনু বাবু এমন কিছু দেখছেন, যার জন্য তাঁর এত উদ্বেগ। এই ভাবতে ভাবতেই আমি বাড়ি ফিরলাম।</p>



<p>৫</p>



<p>মহিষপোঁতা বয়েজ।</p>



<p>যারা গত পাঁচ বছর তারাসুন্দরী চ্যালেঞ্জের চ্যাম্পিয়ন। এবারের ফাইনালে তারাই আমাদের প্রতিপক্ষ। জগাই-মাধাই আর দিনাই এই ত্রিফলাতেই কেউ খেয়েছে ১০ গোল, কেউ ১২ আবার কেউ ১৫। যেদিন ওদের খেলা থাকত, সেদিন আমি ওদের গোলকিপার সোনাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দেখতাম কখনও বারের নিচে বসে গোপালভাঁড় পড়ছে। আবার কখনও বিলির বুট উলটে দেখছে। আর হাফটাইম হলে এক ঘটি জল খেয়ে উল্টো দিকের বার পোস্টের তলায় ঘুমিয়ে পড়ছে। আসলে মহিষপোঁতা এতটাই শক্তিশালী, যে সোনাইয়ের গোল খাওয়ার কোনও ভয় ছিল না।&nbsp; শেষ বাঁশি বাজিয়ে রেফারি নস্কর বাবুর কাজ ছিল সোনাইকে ঘুম থেকে ডাকা।</p>



<p>আর আমরা&#8230;</p>



<p>যেদিন সিদ্ধান্ত হল আমরা মাঠে নামব, সেদিনই আমার সেজো কাকা সজলকান্তি হাত তুলে জানালেন, এবার ক্লাবের জার্সি আমি ডিজাইন করব। ছোট থেকেই সেজো সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজে হাত পাকিয়েছেন। হাইস্কুলের হরি স্যর বললেন, গ্লুকোজের দায়িত্ব আমার। বুট থেকে বল কে কি দেবে, তার তালিকা তৈরি হয়ে গেল। দল কী হবে, তা আর ঠিক হল না।</p>



<p>অবশেষে অনেক আলোচনার পর আমার ছোটকা তাঁর ফুটবল মস্তিস্ক দিয়ে একটা দল খাড়া করলেন। তাতে গোলকিপার তারক। যে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মুরগী পাহারা দেয়। যাতে ভাম বিড়াল এসে মুরগী থেকে না পারে। তাই আমার ছোট কাকার ধারণা ওর রিফ্লেক্স এই দলে সবচেয়ে ভাল। তাই অনেক কসরতের পর বল ধরার টেকনিকই এখন তারক ভাম বিড়ালকে আটকাতে কাজে লাগাচ্ছে।</p>



<p>চার ব্যাক মিন্টাই, কানাই, তোতন, তুতান। মাঝমাঠে আমার পাশে ঘণ্টা, ছোটকা, দই আর দোলন। কারণ, হাবুল আর কেষ্টা অসুস্থ। দুই ফরোয়ার্ড মাখন আর আমাদের স্কুলের ফার্স্ট বয় অমল।</p>



<p>৬</p>



<p>দুপুর থেকেই গুম মেরে আছে আকাশ। এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গিয়েছে। খাওয়ার পর থেকে শরীরটা বেশ আনচান করছে। বিছানায় মন টিঁকছে না। গত কয়েক মাস ধরে কোচ ছোটকাকার অনুশাসনে আমরা খালি হাড়ভাঙা অনুশীলন করেছি। কিন্তু একটাও ম্যাচ খেলেনি। প্রত্যেক ম্যাচেই দেখেছি প্রতিপক্ষ মাঠে আসেনি। হয় তারা ঝড়ে আটকে গিয়েছে। আবার বাঁধ ভেঙে এমন জল ঢুকেছে, যে তাঁদের ফুটবল মাথায় উঠেছে। আর প্রতিবারেই দেখতাম ধনু দ্য ডন আমায় বলে যেতেন, কী ক্যাপ্টেন সব ঠিক আছে তো, এবার ফাইনালের জন্য তৈরি হও।</p>



<p>তাহলে কী সত্যিই ধনু বাবু ম্যাচের আগে রাতে এমন কিছু দেখতেন, যা পরের দিন ফলে যেত। তাহলে গত রাতে তিনি কী এমন কিছু দেখছেন, যার জন্য তিনি দক্ষিণ দিকের বার পোস্টের নিচে গুম মেরে বসেছিলেন। হাতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, ঘরে কিছুতেই মন টিঁকছে না। আর এটা এমন একটা কথা যে সাহস করে কাউকে বলতেও পারছি না। একবার ছাদে যাচ্ছি, একবার ঘরে ফিরছি। একটাও ম্যাচ খেলিনি, সেখান থেকে একবারে ফাইনাল। তাও আবার মহিষপোঁতার বিরুদ্ধে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি এই দলের অধিনায়ক। সবমিলিয়ে কেমন হব গুলিয়ে যাচ্ছে।</p>



<p>৭</p>



<p>মেঘ কেটে রোদ উঠেছে।</p>



<p>আমরা মাঠে এসেছি। ফাইনালে আমাদের গায়ে উঠেছে উপরের দিকটা সবুজ-মেরুন, নিচের দিকটা লাল-হলুদ। তার উপর সাদা-কালো দিয়ে আমার সেজোর কাকার হাতের কলকার কাজ। সে এক বিচিত্র রং আমাদের সবার গায়ে। জার্সির নম্বর কোনটা ইংরেজি হরফে আবার কোনটা বাংলা হরফে। আমরাই বুঝতে পারছি না, কার গায়ে কত নম্বর জার্সি। গত কয়েকদিনে এই পৃথিবীতে যত রকমের রং হয়, সেই রঙের জার্সি গায়ে আমরা সাইড লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু বলে একটাও শট মারিনি। মাইকে বারে বারে ঘোষণা হচ্ছে। মাঠে ভিড় জমছে। আর আমি খুঁজে যাচ্ছি ধনু দ্য ডনকে। হাতের নাগালে একবার পেলেই জিগেস করব, কাল রাতে আপনি কী দেখেছেন বলুন ?</p>



<p>ডায়াসে দেখলাম নতুন ধাক্কা পাড় ধুতিতে আমার বাবাকে। পাশের দুটি চেয়ার এখন ফাঁকা। ম্যাচ শেষের ঠিক ১৫ মিনিট আগে তাতে দুই তারার আর্বিভাব হবে। দু খিলি করে দোক্তা পান মুখে দিয়ে বাড়ি নারীশক্তিকে নিয়ে তাঁরা মাঠে আসবেন। কোনও শব্দ খরচ না করে পুরস্কার দিয়ে এবং সেই পুরস্কার কবের মধ্যে ফেরত দিতে হবে তা মনে করিয়ে দিয়ে আবার তাঁরা মাঠ ছাড়বেন।</p>



<p>ক্লাব প্রেসিডেন্টের অনুমতি নিয়েই রেফারি নস্কর বাবু দুই দলের অধিনায়ককে মাঠে ডেকে নিলেন। টস হল। আমি হারলাম। মহিষপোঁতার অধিনায়ক ঝন্টা বলল, যে কোনও দিকেই তারা খেলতে রাজি। ৩০ মিনিটের ম্যাচ এখুনি শেষ হয়ে যাবে। তাই দিক নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। ঠিক হল, দক্ষিণদিকে আমরা থাকব। উত্তর দিকে ওরা থাকবে।</p>



<p>&#8211; আজ আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ। মনে রাখবি এমনই এক লড়াই হয়েছিল ১৯১১ সালে। মনে রাখবি তোরা এটা ফুটবল নয়, মর্যাদার ম্যাচ। ছোট কাকার এই ভোকাল টনিক নিয়ে মাঠে নামল জামরুলতলা স্পোর্টিং ক্লাব। এদিনও দেখলাম বিপক্ষের গোলকিপার সোনাইয়ের হাতে হাঁদা-ভোঁদা আর বাটুল দ্য গ্রেট।</p>



<p>&#8211; দোলন আমায় জিগেস করল, হ্যাঁরে, ওদের গোলকিপার মাঠে বই নিয়ে এসেছে কেন ? ও কি বাড়িতে বই পড়ে না ? দোলনকে কোনও উত্তর না দিয়ে আমি সেন্টার করতে গেলাম। শুধু চোখের সামনে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে তিন ত্রাস জগাই-মাধাই আর দিনাই। নস্কর বাবুর বাঁশি, খেলা শুরু&#8230;.</p>



<p>৮</p>



<p>সত্যিই স্বাধীনতার যুদ্ধ !</p>



<p>প্রথম পাঁচ মিনিটেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল আমাদের প্রতিরোধ। বল ধরার টেকনিক ভুলে আমাদের গোলকিপার তারক আবার ভাম বিড়াল মোডে ফিরে গেল। দই আর দোলন হঠাৎ করে কোথায় হারিয়ে গেল। অমল গেল প্রতিপক্ষের গোলকিপার সোনাইয়ের সঙ্গে বই পড়তে। আর আমরা, বাকিরা সবাই গোল লাইনের উপর দাঁড়িয়ে জগাই-মাধাইয়ের তাণ্ডব সামাল দিচ্ছি। এর উপর আমার সেজো কাকার ডিজাইন করার খদ্দর কাপড়ের নতুন জার্সি। ভরা ভাদ্রের রোদে গায়ে ছিরবিড় করছে। নিট ফল হাফটাইমে মহিষপোঁতা এগিয়ে দু গোলে।</p>



<p>নস্কর বাবুর হাফটাইমের বাঁশিতে খানিক স্বস্তি। প্রথম ১৫ মিনিটেই রণক্লান্ত হয়ে আমরা মাঠ ছাড়লাম। দেখলাম আমাদের তেলে সান্তানা ছোট কাকা তাঁর সব কৌশল থেকেই ভঙ্গ দিয়েছেন। গ্লুকোজের জল বাড়িয়ে আমায় জিগেস করলেন, কী করা যায় বল তো ?</p>



<p>&#8211; উত্তর না দিয়ে গোটা মাঠে আমার চোখ তখনও একজনের আশায়। তাহলে কী সেই এই বিপদের আশঙ্কায় আজ মাঠে আসেননি। নাকি আমাদের আরও বিপদ রয়েছে। যা লজ্জায় পরিণত হতে চলেছে। হঠাৎ করে আমার চোখ গেল মাঠের ধারের চেয়ারের দিকে। দেখি পাশাপাশি বসে আছেন দুই মূর্তিমান। একজন আমাদের থানার দারোগা ভবতোষ সাঁপুই। তার পাশেই আমাদের গ্রামের একমাত্র চোর কানাই।</p>



<p>&#8211; সম্বিৎ ফিরে ছোট কাকাকে উত্তর দিতে যাব, দেখি আমাদের মাঝে হাজির সেই ছ ফিটের উচ্চতার ভদ্রলোক। আজও অমলীন তাঁর হাসি। রিমলেস চশমার ফাঁক থেকে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, চালিয়ে যাও ক্যাপ্টেন। কোনও চিন্তা নেই। এই দেখ তোমার দুই ফুটবলারকে চাঙ্গা করে দিয়েছি। সকাল থেকে মনোজ ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে ওরা এখন ফিট।</p>



<p>পাশে তাকিয়ে দেখি জার্সি পরে রেডি হাবুল আর কেষ্ট। ছোট কাকা এগিয়ে গেলেন রেফারি নস্কর বাবুর দিকে। বললেন দুটি চেঞ্জ আছে। দই আর দোলন বাইরে। মাঠে হাবুল এবং কেষ্ট। মাঠে নামার আগে আমি বললাম, সোনাইকে ঘুমতে দেওয়া চলবে না। যে যেখান থেকে পারবি ওদের গোল লক্ষ্য করে শট মারবি। আজ আমরা সোনাইকে সেকেন্ড হাফে ঘুমতে দেব না। এমন জাগিয়ে রাখব, ব্যাটা টের পাবে। অমল কী বুঝল জানি না, জিগেস করল কত ডিগ্রিতে শট করব ? বলের গতিবেগ কত হবে ?</p>



<p>&#8211; ঘণ্টা শুধু উত্তর দিল, অমল দা তুমি খালি মারবে, বল নিজের মতো করে গতিবেগ বুঝে নেবে। তবুও আমার মনে খচখচানি কাটল না। বারবার প্রশ্ন উঠল, ধনু বাবু কী তাহলে সেকেন্ড হাফের কিছুই দেখেননি। কেন আমার দিকে তাকিয়ে তখন চোর কানাই হাসল ? হাবুল আর কেষ্টা নিয়ে ঠিক হাফটাইমের সময় কেন ধনু বাবু মাঠে ঢুকলেন।</p>



<p>শুধু মাঠে নামার আগে তারককে জিগেস করলাম, তোর বাড়িতে কটা ভাম বিড়াল আসে ? তারক বলল, একটা। তার আবার তাগড়াই চেহারা। আমি বললাম, ধর তোর বাড়িতে তিনটে ভাম বেড়াল এসেছে। তুই আটকাতে পারবি। এক ঢোঁকে গ্লুকোজের জল খেয়ে তারক বলল, বেশ পারব।</p>



<p>দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু&#8230;</p>



<p>ইতিমধ্যে ডায়াসে হাজির টুর্নামেন্টের প্রধান অতিথি তারাসুন্দরী এবং তাঁর কোম্পানি। সেন্টার হল। মিনিট কয়েক আমাদের দিকে বল এল না। আমি হাবুল, কেষ্টা আর মাখনকে চোখের ইশারায় দিনাইয়ের পায়ে পড়ে যেতে বললাম। ঘণ্টাকে ইশারা করলাম রেডি থাকার জন্য। এই প্রথম ম্যাচে আমরা প্রথমবার মহিষপোঁতা মাঝমাঠ পেরোলাম। পিছনে থেকে দেখলাম তুতান আর তোতনও উপরে উঠে এসেছে। মনে মনে ভাবলাম ধনু বাবু গতকাল রাতে আর যাই দেখুন, ফাইনালে মনে হয় এই দৃশ্য দেখেননি।</p>



<p>চাপে পড়ে গেল মহিষপোতা। ঘুম উড়ে গিয়েছে সোনাইয়ের। কখন ডান দিক, কখন বাঁ-দিক থেকে আমাদের আক্রমণ। এর মধ্যে ঘণ্টার ক্রশ থেকে মাখনের হেড বার উঁচিয়ে চলে গিয়েছে। এই করে সেকেন্ড হাফের সাত মিনিট চলে গিয়েছে। তখনও আমরা দু গোলে পিছিয়ে। আমাদের পায়ে পড়ে যাওয়া ফুটবলে জগাইদের ত্রাস শেষ।</p>



<p>এর মধ্যে ফাউল করে ফেলল মহিষপোঁতা। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে আমরা ফ্রিকিক পেলাম। অমল বলল, আমি মারব। ঘণ্টা বলল, অমল দা এই সুযোগ, দেখিয়ে দাও তোমার পায়ে সিক্সটি ডিগ্রি অ্যাঙ্গলে বল বাঁক খায়। ছ জনের প্রাচীর তৈরি করল মহিষপোঁতা। প্রতিপক্ষের বক্সের বাইরে আমরাও তৈরি। মাঠে চাপা উত্তেজনা। চারদিকে স্তব্ধতা। পিন পড়লেও শব্দ হবে। বেজে উঠল নস্কর বাবুর বাঁশি।</p>



<p>খানিকক্ষণের জন্য গোটা ইস্কুল মাঠ নিস্তব্ধ। হই হই চিৎকারে আকাশ চেরা আওয়াজ। ইতিহাস তৈরি করছে অমল। তার বাঁকানো শটে ব্যবধান কমালো জামরুলতলা। প্রতিপক্ষের জাল থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে এল মাখন। আর কী যেন কানে কানে বলে এল সোনাইকে ? ম্যাচ শেষে আমি মাখনকে জিগেস করেছিলাম, তুই তখন সোনাইকে কী বলছিলি ? মাখন বলল, আমি বললাম, শুধু হাঁদা-ভোঁদা পড়লে হবে, মাঝে মধ্যে তো রোভার্সের রয়ও পড়তে হবে। না হলে বলে বাঁক খাওয়া বুঝবে কী ভাবে ? আমি বললাম, বোঝ কাণ্ড !</p>



<p>মাঠে তখন উল্লাস চলছে। লোক সরাতে ভবতোষ দারোগা নিজেই মাঠে নামলেন। খানিকক্ষণ পর আবার শুরু হল খেলা। হাতে আর শেষ পাঁচ মিনিট। আর এই পাঁচ মিনিটে এক স্বপ্নের ফুটবল খেলল জামরুলতলা স্পোর্টিং ক্লাব। প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠে আটকে দিয়ে আবার গোল অমলের। এবার হাবুলের থ্রু থেকে।</p>



<p>আর শেষ বাঁশি বাজার আগে ঘণ্টার কর্নার থেকে মাখনের বাইসাইকেল কিক। ডায়াসের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুই তারাকে বুকে আগলে পুজোর ঢাকের বোলে নাচছেন আমার অঙ্কের মাস্টারমশাই বাবা। মেজ কা তাঁর জমিতে হওয়া জৈবিক জলপাই হরির লুঠের মতো দর্শকদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন। ডিগবাজি খাচ্ছেন আমার আরও দুই কাকা।</p>



<p>৯</p>



<p>খেলা শেষ।</p>



<p>আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ধনু দ্য ডন। বললেন, তুমি আমার মিথ ভাঙলে ক্যাপ্টেন। এবার থেকে আমি যা দেখব, সেটা যে মিলবে এমন নয়। আমি ভুল, তুমি ঠিক। তারাসুন্দরীর হাত থেকে প্রাইজ নিচ্ছে জামরুলতলার ফুটবলাররা। তারা জানে এই ট্রফি কাল সকাল নটার মধ্যে আবার ফিরিয়ে দিতে হবে। মাঠেই ঘোষণা হয়ে আজ রাতে সবার বাড়িতে অরন্ধন। গ্রামের সবাই থাকবে জামরুলতলার ক্লাবের সামনে। পাঁটার মাংস আর ভাত। আর শেষ পাতে দুটি করে মুরারী ময়রার গরম রসগোল্লা।</p>



<p>&#8211; ঘোষক ধনু দ্য ডন।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/dhonu-the-don-bengali-short-story-by-sumantra-mukhopadhyay/">ধনু দ্য ডন</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/dhonu-the-don-bengali-short-story-by-sumantra-mukhopadhyay/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
