<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title></title>
	<atom:link href="https://sukanyadigital.com/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://sukanyadigital.com</link>
	<description></description>
	<lastBuildDate>Wed, 07 Oct 2026 08:19:15 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.3.3</generator>

<image>
	<url>https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2020/07/cropped-sukanya-magazine-50x50.jpg</url>
	<title></title>
	<link>https://sukanyadigital.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>চচ্চড়ি</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/chochchori-sanjib-chattopadhyay/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/chochchori-sanjib-chattopadhyay/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 07 Oct 2026 06:03:21 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11331</guid>

					<description><![CDATA[<p>ডাক্তারবাবুর কন্ঠস্বর কানে এল,  ‘কি হল কি? তখন থেকে মিশরের মমির মতো শুয়ে আছেন, একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছেন না !’</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/chochchori-sanjib-chattopadhyay/">চচ্চড়ি</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়</strong></p>



<p>ডাক্তারবাবু। নামের পাশে লাইন তিনেক তাঁর ডিগ্রির ফিরিস্তি। ইংরিজি বর্ণমালার সবকটাই সেই মালায় বোধ হয় মালায়িত। গোটা বিশ্ব হতে আহরিত বিচিত্র সব উপাধি ।  মানব শরীরের অলিতে গলিতে গুপ্তঘাতকদের সমস্ত ষড়যন্ত্রের প্রয়াস তিনি এক লহমায় ধরে ফেলেন। অনেক সময় রুগীকে স্পর্শ করারও প্রয়োজন বোধ করেন না। অনেকটা এই রকম আড়চোখে এক পলক তাকালেই সুন্দরীর মোহনী মূর্তিতে মোহিত, সিস্সিরে ধোঁয়াই গরম জলের পরিচয়, ছানাবড়ার মতো গোল গোল দুটি চোখ গৃহিনীর মেজাজের প্রকাশক। পেরেকের মতো বিদ্ধকারী দৃষ্টিতে বড় কর্তা বুঝিয়ে দেন ছাঁটাই আসন্ন । সপরিবারে পথে নামার দিন আগত। যেন মা মনসার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, নকশাদার একটি সর্প, রেডি ফর এ ছোবল। খুব স্বপ্ন দেখেছিলে, দেখিয়েছিলে ফানুস বাতাসে দুলতে, দুলতে ক্রমশ ওপর দিকে উঠছে। অহঙ্কারী মানুষেরই উপমা। পেটে ভরা আগুন, যেন জঠরাগ্নি! তারপর ? ফানুসের নিয়তি মানুষের মতোই। জীবনের আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাক্। মরে গেলে খাটে তুলে খই আর কর্ণ কটূ নানা শব্দ ছড়াতে ছড়াতে শ্মশানের ‘এগজিট পয়েন্টে’ নিয়ে যেতে যেতে সবাই ভাবে &#8211; ব্যাটা, আর কিছু বলবে না, শুনবে না, দেখবে না, দেখাবে না —ভাবনাটা মন্দ নয়, তবে ঠিক কি-না কে বলতে পারে! দেখা যাক, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স আর একটু ইনটেলিজেন্ট হলে, কি দিশা দেখায় !</p>



<p>সেকেলে অফিসে বড়বাবু ‘রিটায়ার’ করলে টেবিল-চেয়ার সরিয়ে ‘ফেয়ার ওয়েলের’ ব্যবস্থা হত, নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে । একালে তো রিটায়ার হয় না, হয় ছাটাই&#8217;। এই গানটি জাতীয় সঙ্গীতের পর্যায়ে চলে যেতে পারে, ‘মার ঝাড়ু, মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর।’ সেই ‘ফেয়ার ওয়েলে’ এই জাতীয় করুণ দৃশ্য দেখা যেত, করুণ  তো হবেই।  এ তো মা দুর্গার বিদায় উৎসব নয়, ‘আসছে বছর আবার হবে’। মানুষটিকে এই প্রতিষ্ঠানের ত্রিসীমানায় আর দেখা যাবে না । কোথাও যেন এক বাসস্থান ছিল- স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, প্রবীণা মা। ছাতে তুলসী গাছে। বাড়ির পেছনে ডোবা । শরতের শালুক, ঝরা শিউলি। পৃথিবীর অনেক সম্পদের মধ্যে এই সামান্যই তাঁর অধিকার, এবং সন্তুষ্ট । বাকিটা স্বপ্ন দিয়ে পূরণ করতেন। এই পথ সকলের জন্য খোলা । দূর দূর বহুদূরে চলে যাওয়া যায়। সেকালের আটপৌরে প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের একটি পরিবার গড়ে উঠত। গোবরডাঙার গোস্বামী, ঘুঘুডাঙ্গার ঘোষদা, নিমতার নিত্য । একদল মধ্যবিত্ত । কারোরই আকাশ ছোঁয়া আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকত না । নিতান্তই পারিবারিক । স্ত্রী-নির্ভর । পুত্র, কন্যা, পিতা মাতা, আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত, কর্তব্য নিষ্ট, সেন্ট পারসেন্ট বাঙালি । মোটা লোমশ তোয়ালে নয়, গামছাই স্নানের  সঙ্গী । তোয়ালে শুকোতে মাস খানেক সময় লাগে, তারপর ভাগাড়ের গন্ধ ছাড়ে।  ফুর ফুরে গামছা রোদ আর বাতাস পেলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে শুকিয়ে যায়। কোমরে জড়ানো যায় ৷ সিকিউরিটির সমস্যা নেই। এমার্জেনসির সময় গায়ে একটি গামছা  চাপিয়ে পাড়ার মুদিখানা থেকে পাচফোড়ন কিনে এনে রান্নাঘরের শান্তি বজায় রাখা যায় । গামছা মধ্যবিত্ত বাঙালির দীর্ঘকালের বিশ্বস্ত বন্ধু। অতীতে বাঙালি পরিবার বাড়িতে বাস করত। প্রবীণ জানালা দরজা  বৃদ্ধ, বৃদ্ধার কুঞ্চিত ত্বকের মতো কাঠের চেহারা । অবশ্যই ঘাত সহ সেগুন কাঠে তৈরি পিতা, পিতামহের কালে ।  তিন পুরুষের জীবন যুদ্ধের সাক্ষী, । তারে ঝুলছে বির্বণ কয়েকটি বাদি পোতার গামছা । বাঙালির ট্রেডমার্ক । সেকালের পাওনাদাররা গলায় গামছা দিয়ে পাওনা আদায়ের কথা বলতেন । সাহিত্যে এ মত আছে, ‘মুকুজ্যে মশাই লজ্জায় গামছায় মুখ ঢাকলেন।’ বর্ষার গঙ্গায় কাকাবাবু স্নান করতে গিয়েছিলেন। গামছা দিয়ে তিনটে ট্যাংরা মাছ ধরে এনেছেন। পারিবারিক ঝগড়ায় গামছার ভীতিপ্রদ ভূমিকা ছিল । অভিমানী বলছে,‘ যেদিন গলায় গামছা দিয়ে ঝুলে পড়ব সেদিন বুঝবে মজা।’ হংস শুভ্র ‘টার্কিশ টাওয়েলের’ পাঁচতারা মর্যাদা। তেল মেখে, গামছা দিয়ে গা রগড়ে স্নান ছিল বাঙালির অন্যতম কালচার। যেমন অন্য আর এক জাতির কালচার, পান খেয়ে প্যাচাত করে দেয়ালে পিক ফেলা। প্রহরা না থাকলে মাসখানেকের মধ্যে তাজমহলটাকেও লালে লাল করে দেওয়া যেত। কোন প্রখ্যাত সাহিত্যিক লিখেছিলেন, ‘যৌবন জল তরঙ্গ রোধিবে কে?’ ফোলা ফোলা গাল  দুটো আরো ফুলে আছে, কারন মুখ গহ্বরে দুখিলি পান, যেন ‘অরুন, বরুণ, তারই কিরণ মালা ‘&#8217;প্যাচাত’’, লালে লাল। বহুতলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল, খিচুড়ি কালচার। ঘোড়েল, কোয়েল, দফাদার, রফাদার, পাঁচ ইঞ্চি, দশ ইঞ্চি দেয়ালের ব্যবধানে কাল যাপন। কে, কি করেন বলা কঠিন। লিফ্টে ওঠা নামা। নির্জন সিঁড়ি বিরহিনীর মতো একপাশে, পাকে পাকে উর্ধগামী। কদাচিৎ পায়ের স্পর্শ পায়। খাঁজে, খন্দে একা বৃদ্ধ, একা বৃদ্ধা, হঠাৎ কেউ আবিষ্কার করে চমকে উঠতে পারেন। পুরনো ক্যালেণ্ডার এখনো দেয়ালে ঝুলছে! আকাশের গায়ে একটি খাচায় নিঃসঙ্গ চন্দনা। কবে কেউ ভিজে ছোলা দিয়েছিল, কল বেরিয়েছে, জলের পাত্রে জল নেই, সাদা একটি দাগ । ওদিকে কত জল, মেঘ ভাঙা বৃষ্টি । জল শয্যায় ভাঙা সেতু পাশ বালিশের মতো পড়ে আছে।</p>



<p>কোথায় সেই মাটির উঠান, চওড়া দাওয়া, তুলসী মঞ্চ, সন্ধ্যার দীপ, শাঁক কেন বাজে না ! প্রবীণার কন্ঠস্বর কেন আসে না কানে। ‘ বউমা কোথায় গেলে ? এলোচুলে সন্ধে বেলায় বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ঝাঁকড়া বেল গাছে কাকের বাসা।।গভীর রাতে রহস্যময় কে যেন আসে। গম্ভীর এক পুরুষ। ‘দিদা ! কে গো সে ?’</p>



<p>ডাক্তারবাবুর কন্ঠস্বর কানে এল,&nbsp; ‘কি হল কি? তখন থেকে মিশরের মমির মতো শুয়ে আছেন, একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছেন না !’</p>



<p>‘ আমাকে উঠে বসতে দিন, তার পর বলছি।’</p>



<p>‘হ্যাঁ এইবার বলুন।’</p>



<p>‘তলপেট ফুলে আছে কেন ?’</p>



<p>‘অনেক কথা ওখানে জমে আছে ডক্টর সাব। কোষ্টকঠিন্যের মতো কথা কঠিন্যে অতীত আটকে আছে।’</p>



<p>‘মরণ দশা !’</p>



<p>‘অ্যায় ! ডাক্তার সাহাব আপনার মধ্যে আমার দিদিমা আটকে আছেন। এই কথাটি দিনে রাতে বার দশেক বলতেন।’</p>



<p>‘আপনি একজন নিউরোর কাছে যান।’</p>



<p>‘না, আমি যাবো সেই ডেন্টুর কাছে । যিনি আমার আক্কেল দাঁতটি উৎপাটিত করে ছিলেন- গিভ মি ব্যাক মাই উইজডাম টুথ’।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/chochchori-sanjib-chattopadhyay/">চচ্চড়ি</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/chochchori-sanjib-chattopadhyay/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>প্রথম অবদান</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/pratham-abadan-harsha-datta/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/pratham-abadan-harsha-datta/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 06 Oct 2026 10:04:12 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11320</guid>

					<description><![CDATA[<p>টেস্ট টু ট্রিটমেন্ট এখনও শুরুই হল না, কেবল অক্সিজেন ও অন্যান্য লাইফ সাপোর্ট দিয়ে আইসিইউতে রাখা হয়েছে ।...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/pratham-abadan-harsha-datta/">প্রথম অবদান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>হর্ষ দত্ত</strong></p>



<p>সরকারি হাসপাতালগুলোকে বাতিল করে মোহন ওর গুরুতর অসুস্থ স্ত্রী বর্ণাকে অ্যামবুলেন্সে চাপিয়ে , বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সল্ট লেক ও বাইপাসের ধরে গড়ে ওঠা এইসব সুদৃশ্য হাসপাতাল রোগী লুফে নেওয়ার জন্য নিরন্তর প্রস্তুত। কিন্তু আশ্চর্য কোথাও বেড নেই ।&#8217; বেড খালি নেই&#8217; &#8216;সরি বেড নট অ্যাভেলেবল &#8216; শুনতে শুনতে মোহন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রাইভেট হাসপাতাল বেড নেই বলছে কেন ?জেনারেল বেড যদি ভর্তি হয়ে থাকে তাহলে কেবিন আছে ওয়ান পেশেন্ট, টু পেশেন্ট কেবিন ছাড়া বড় হাসপাতালে ডিলাক্স হিসেবে দাগানো কেবিনও থাকে। সেগুলো রুগি থাকার ঘর তো নয় যেন দু কামরার ফার্নিশড ফ্ল্যাট । বর্ণাকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়ার পরেই জুনিয়র ডাক্তার কেউ দৌড়ে আসছেন। তিনি সব দেখেশুনে পাঁচ- দশ মিনিটের পরই হয়তো রিপোর্ট দিচ্ছেন । পরক্ষণেই&nbsp; অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্ট জানাচ্ছে- বেড নেই। অন্যত্র চেষ্টা করুন।</p>



<p>অ্যাম্বুলেন্সে শায়িত বর্ণা স্বাসকষ্টের পরিমাণ যেন আর সহ্য করতে পারছে না। ওর মাথার কাছে বসে ক্রমাগত মায়ের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেয়ে বিনম্রা। বৌদির পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিনা দেখছে মোহনের ভাই শোভন। ড্রাইভার বাচ্চুর&nbsp; কাছেও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। পাড়ার ক্লাবের এই&nbsp; অ্যাম্বুলেন্স ওর জিম্মায় থাকে । রোগ ও রুগির অভাব নেই ।ফলে সপ্তাহের প্রায় প্রত্যেকদিন ওকে ছোটাছুটি করতে হয়। বাচ্চুর পাশে বসে মোহন অজানা ভীতিতে কেঁপে উঠছে। তাহলে কি আচমকা বর্ণা নিরাময়ের বাইরে চলে গেছে ! সেই জন্যেই কি হাসপাতালগুলো মোহনের মুখের সামনে ঝুলিয়ে দিচ্ছে &#8216;বেড খালি নেই &#8216; প্ল্যাকার্ড ব্যানার । অন্তিম স্তর থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নেওয়াই তো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ । অথচ তার বদলে এরা যেন দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।&nbsp;</p>



<p>হুটারের শব্দ একটু কমিয়ে অভিজ্ঞ বাচ্চু চরম কোনও মুহূর্তের প্রতীক্ষায় ঘামতে থাকা মোহনকে বলল, &#8216;দাদা আমি এখান থেকে উত্তর কলকাতায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি ।ওখানে একটা ছোট প্রাইভেট হাসপাতাল আছে। ওরা রুগী ভর্তি করে নেয় , বাতিল করে দেয় না ।&#8230; আপনি বললে যাব।</p>



<p>-তাই চলো বাচ্চু । পেছন থেকে উদ্বিগ্ন শোভন বলল আপাতত এছাড়া কোনও উপায় নেই। দাদা তুমি কি সরকারি হাসপাতালগুলোর কথা ভাবছ?</p>



<p>কান্না ভেজানো গলায় মোহন উত্তর দিল কিছুই ভাবতে পারছি না ।আমি আর&nbsp; বর্ণার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না রে, হঠাৎ কী যে হল ।ওহো &#8230;..</p>



<p>শোভন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। খবর পেয়েই কলকাতা চলে এসেছে । ডেলি প্যাসেঞ্জারির হাত থেকে বাঁচার জন্য কল্যাণীতে বাড়ি করে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকে। বাচ্চুকে নির্দেশ দেওয়ার মতো শোভন বলল তুমি যে হসপিটালের&nbsp;কথা বলছ সেখানেই চলো ।</p>



<p>ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের সমসাময়িক ডাক্তার এ, রায়চৌধুরীর নামে পরিচিত এই হাসপাতালের আগে নাম ছিল জেনারেল সার্ভিস হসপিটাল। প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার রায়চৌধুরীর প্রয়াণের পর তাঁর নামে হাসপাতালটি পরিচিতি&nbsp; নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বড় রাস্তার ওপরেই মেন গেট। ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স &#8230;&nbsp;&nbsp;&nbsp; থেকে রুগি নামানোর বড় পরিসর। ব্যাক পজিশনে গাড়ি ঢুকিয়ে দৌড়ে এসে বাচ্চু দরজা খুলে স্ট্রেচারের&nbsp; পায়ের দিকটা খানিকটা টেনে দিল।</p>



<p>মিনিট দুয়েক পরেই একই ধরণের শাড়ি ব্লাউজ পরা দু&#8217;জন অল্পবয়সী মহিলা হসপিটালের ওয়েটিং এরিয়ার পাশ থেকে বেরিয়ে এলেন। শায়িত রুগির একেবারে কাছাকাছি গিয়ে ছিপছিপে তরুণীটি আপনজনের মতো জিজ্ঞেস করলেন ওঁর কী হয়েছে ?</p>



<p>-প্রবল শ্বাসকষ্ট হচ্ছে , সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর ঘামছেন &#8230;। শোভন উত্তর দিল। শ্যামলা রঙের ওপর যুবতীটি সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে কাউকে রুগির পরিস্থিতি জানিয়ে বললেন, অ্যাটেন্ডিং ডাক্তার দেখতে আসছেন। একটু অপেক্ষা করুন। তিনিই ডিসিশন জানাবেন।</p>



<p>প্রতিটি মুহূর্তকে&nbsp; মনে হচ্ছে অনন্তকাল। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে ছটফট করছে বিনম্রা। বর্ণা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে -ত্রাসে সংকুচিত মোহন অ্যাম্বুলেন্সের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে আছে।</p>



<p>লোকালয়ের মধ্যে গড়ে তোলা এই হাসপাতাল সম্পর্কে শোভনের কোনও ধারণা নেই । আরও স্পষ্ট করে বললে হসপিটালের নামের সঙ্গে আজ ওর প্রথম পরিচয় ঘটল। শোভন চার পাশ দেখে হাসপাতালের অভ্যন্তরের দিকে সামান্য এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে , গাড়ির কাছে যিনি এসে দাঁড়ালেন তিনিই ডাক্তারবাবু। বয়স্ক নন তরুণ। সকলের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন স্ট্রেচারটা যতটা সম্ভব বের করে আনুন।</p>



<p>মলিন মোহন এগিয়ে এসেছে। বাচ্চু স্ট্রেচারের একটা হ্যান্ডেল আর অপর&nbsp; হ্যান্ডেলটা&nbsp; ধরল শোভন ।সারা শরীরের সঙ্গে&nbsp; বর্ণার মুখ দেখা যাচ্ছে । যন্ত্রণার দুরন্ত অভিঘাতে বদলে দ্রুত স্তব্ধ হয়ে আসছে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রুগির দেহ । ডাক্তারবাবু শায়িত বর্ণার কাছাকাছি গিয়ে হসপিটাল স্টাফ তরুণীদের নির্দেশ দিলেন পেশেন্টকে এখুনি আইসিইউতে ভর্তি করে নিতে বলুন।</p>



<p>হাসপাতালের কর্মিরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে এসে বর্ণাকে খুব সাবধানে নামিয়ে নিল। ওয়েটিং এরিয়ার বাঁ পাশে সিঁড়ি । সিঁড়ির পাশেই লিফ্ট । বর্ণ চলে যাওয়ার পরে মোহন ভাই ও মেয়েকে নিয়ে লিফটে উঠতেই ছিপছিপে তরুণীটি খানিকটা নির্দেশ দেওয়ার মতো বলল, আইসিইউতে সবাই ঢুকবেন না । যে কোনও একজন গিয়ে কাগজপত্রে সই করে আসবেন। ওই যে রিসেপশন কাউন্টার দেখছেন ওখান থেকে ভিজিটিং কার্ড পাবেন । নিয়মাবলী ওঁরাই বলে দেবেন ।</p>



<p>দীপেশকে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ , ওর বন্ধুগ্রূপের সুব্রত ফোন করে জানিয়েছিল মোহনের স্ত্রী প্রচন্ড অসুস্থ। কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । কখন ভর্তি হয়েছে কোন হাসপাতালে অসুস্থতা কতটা গভীর ও উদ্বেগজনক &#8211; এসব জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর সুব্রত দিতে পারেনি । মোহন নিশ্চয়ই কাউকে জানায়নি। জানানোর প্রয়োজন নেই মনে করলে, এমনই ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয় । ওর বন্ধুদের মধ্যে কমবেশি এমন স্বভাব কয়েকজনের আছে । তারা হয়তো ভাবে অন্যের সহায়তা নিলে নিচু হয়ে যেতে হয় । অথচ এক মুহূর্তে বন্ধুবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এমন স্বভাব।</p>



<p>পরদিন সকালেই মোহনকে ফোন করেছিল দীপেশ কি রে তোর মিসেসকে গতকাল হসপিটালাইজড করতে হয়েছে ? সুব্রত আমাকে জানাল ।</p>



<p>মোহনের সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ । কাল&nbsp; রাতে ।&nbsp;&nbsp;</p>



<p>&#8211; একবার তো জানাবি ! হাসপাতালে ভর্তি মানে বাড়িতে রেখে ট্রিটমেন্ট করার অবস্থা নয় । বর্ণার কী হয়েছে ? কোন হসপিটালে আছে ? দীপেশের গলায় গভীর উদ্বেগ ।</p>



<p>নির্লিপ্ত গলায় মোহন বলল , আজ বেলার দিকে কিছু রিপোর্ট আসবে । অসম্ভব শ্বাসকষ্ট নিয়ে উত্তর কলকাতার একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি ।</p>



<p>&#8211; প্রাইভেট মানে ? নার্সিং হোম ? দীপেশ বুঝতে পারছে না ।</p>



<p>এবার মোহনের গলা যেন স্বাভাবিক হয়ে এল । একটু চুপ থেকে মোহন&nbsp; উত্তর দিল , বড় কোনও প্রাইভেট হসপিটাল বর্ণাকে ভর্তি নিল না। সবার একই ধরণের কজ &#8211; বেড খালি নেই । শেষ কালে মানিকতলার ডক্টর এ আর মেমোরিয়াল হসপিটালে বর্ণার জায়গা হল। নার্সিং হোম বলা যাবে না । ছোট হাসপাতাল । পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । সরকারি হাসপাতালের মতো মেছো হাটা নয় ।</p>



<p>&#8211; এ আর সি হসপিটালে বর্ণা ভর্তি হয়েছে ! বাঃ ! দীপেশ যেন লাফিয়ে উঠল , ওখানকার বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সদের একজন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আমার দাদাভাইয়ের মতো সম্পর্ক । আমি এখুনি ওঁর সঙ্গে কথা বলছি । বর্ণার ট্রিটমেন্ট যেন পারফেক্টলি হয় । কোনও চিন্তা করিস না । যে &#8211; কোনও জায়গাতে চেনা পরিচিত কেউ থাকলে খুব সুবিধে হয় । শ্ৰীমতীকে যখন আইসিইউ-তে দিয়েছে তবে ডিজিজের ডেনসিটি তো অনেকটা । তবে মিনিমাম খরচে ম্যাক্সিমাম চিকিৎসা দেওয়াই এ আর সি মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রধান উদ্দেশ্য ।</p>



<p>&#8211; হুঁ, হ্যাঁ । মোহন ভারী গলায় বলল , বর্ণা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এলে আমার এই ভয়ানক উদ্বেগ শেষ হবে । মনে এতটুকু জোর পাচ্ছিনা । উপরন্তু ভীষণ ভয় করছে ।</p>



<p>&#8211; দূর , এইভাবে ভেঙে পড়িসনা । আমরা সবাই পাশে আছি ।</p>



<p>মোহনলাল কোনও উত্তর দিল না । দীপেশ কেবল একটা হতাশ্বাসের শব্দ শুনল ।</p>



<p>চেম্বারে বসার আগে ডাক্তার কৃষ্ণদেব মৈত্র এক বৌল ভেজিটেবল স্যুপ খেয়ে নেন।</p>



<p>কেননা রুগির ভিড় সামলাতে বেলায় দুপুর একটা।আর রাতে এগারোটা বেজে যায়।</p>



<p>বাড়ির একতলাতেই ওর চেম্বার। ক্রমশ বিরল হয়ে আসা, সহৃদয় , উদার, গরিব মানুষের অসহায়তা বুঝতে পাড়ার অন্তর যাঁদের আছে ডাক্তার মৈত্র তাঁদের মধ্যে একজন। ওঁকে দেখে অনুমান করা যায়না ডাক্তারবাবুর বয়স চুয়াত্তর। মেদহীন ঋজু, লম্বা মানুষটিকে দীপেশ অশেষ শ্রদ্ধা করে।</p>



<p>স্যুপ খেয়ে ডাক্তার মৈত্র নিজেকে একটু গুছিয়ে নেন। চেম্বারের কেয়ারটেকার গোপালবাবুর কাছে জেনে নেন , কতজন রুগি নাম লিখিয়ে অপেক্ষা করছেন। এই রকম একটা সন্ধিক্ষণে দীপেশ ওঁকে দরকারে &#8211; অদরকারে ফোন করে। আজ অবশ্য মোহনের স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে কথা বলবে।</p>



<p>ওপ্রান্ত থেকে দীপেশের গলা শুনে ডাক্তার মৈত্র মৃদু উচ্ছাসে বললেন, হ্যাঁ। দীপেশ বলো। ভালো আছো তো !</p>



<p>&#8211; নিশ্চয়ই ভাল আছি । আপনিই তো আমাদের সুস্থ রেখেছেন। ডাক্তার মৈত্র সজোরে হাসলেন &#8216;পথ ভাবে আমি দেব /রথ ভাবে আমি /মূর্তি ভাবি আমি দেব /হাসেন অন্তর্যামী &#8216;। তোমার খবর বলো &#8230;</p>



<p>দীপেশ আর সময় নষ্ট না করে মোহনের স্ত্রী সম্পর্কে যতটা জানে বলল। সেই সঙ্গে অনুরোধ জানালো দাদা আপনি এআরসি মেমোরিয়াল হাসপাতালের একজন পরিচালক শুধু নন , বলতে গেলে অভিভাবক ।&#8230; আপনি বলে দিলে হাসপাতাল স্পেশাল কেয়ার নিতে বাধ্য। আমি আপনার ওপর নির্ভর করছি। বন্ধু ভেঙে পড়েছে । টেস্ট টু ট্রিটমেন্ট এখনও শুরুই হল না, কেবল অক্সিজেন ও অন্যান্য লাইফ সাপোর্ট দিয়ে আইসিইউতে রাখা হয়েছে ।</p>



<p>-সে কী। এই অবস্থায় তোমার বন্ধু ভেঙে পড়ছে কেন ? হসপিটাল আর ডাক্তারদের একটু সময় দাও।</p>



<p>&#8211; আপনি কাল একবার রুগিকে দেখে এলে আমিও মনে জোর পাব। দীপেশ অনুনয়ের সুরে বলল, আপনাকে বিরক্ত করছি । দাদা , বুঝতেই পারছেন বন্ধুর কেস ।</p>



<p>জোর গলায় ডাক্তার কে ডি মৈত্র বললেন, শুধু আগামীকাল কেন , দরকার হলে আমি প্রতিদিন পেশেন্টকে দেখে আসব।&#8230; তোমার সঙ্গে কবে দেখা হবে ? এসো একদিন । বাই বাই &#8230;.</p>



<p>ডাক্তার মৈত্র ফোন কেটে দিলেন। দীপেশ নিশ্চিত আজ যদি রুগির সংখ্যা কম থাকে,&nbsp; তাহলে&nbsp; বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার শুরু হবার আগেই ডাক্তার মৈত্র মোহনের স্ত্রীকে দেখে আসবেন। যে- ডাক্তারের আন্ডারে বর্ণা ভর্তি আছে , তাঁর সঙ্গে&nbsp; ফোনে মত বিনিময় করবেন। নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ দিয়ে আসবেন অ্যাটেন্ডিং ডাক্তারকে। দীপেশ জানতে চাওয়ার আগে নিজেই হয়তো কল করবেন।</p>



<p>কোনও বন্ধুর সাহায্য কিংবা সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিতে দীপেশের ভারী ভালো লাগে , আনন্দ হয়। এখন কোনও অসুখ- বিসুখ মানেই একটা ভয়ার্ত টানেলের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা। মোহন যে মরমে মরে আছে , তা খুব স্বাভাবিক। বর্ণা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মোহনের পরিবার শূন্যে ভাসতে থাকবে।&nbsp;&nbsp;</p>



<p>গলির মুখটায় অভিরূপের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। দীপেশদা অফিস থেকে ফিরছে। ওর থেকে যারা বয়সে বড় অভিরূপ তাদের দাদা সম্বোধন করে। অভিরূপ ব্যবসা করে। বড়&nbsp; রাস্তায় ওদের প্লাইউডের দোকান। অফিসে সময়মতো আসা &#8211; যাওয়ার কষ্ট ব্যবসায়ীরা কিছুটা অন্তত উপলব্ধি করে , তবে পুরোটা নয়। অভিরূপ&nbsp; তার ব্যতিক্রম। দীপেশদের বন্ধু হিসেবে ও ভালভাবে জানে চাকরির চরিত্র যাই হোক, ছুটির দিন বাদ দিয়ে প্রত্যহ বাড়ি থেকে বেরনো ও ফিরে আসা যেন জীবন &#8211; উপন্যাসের এক একটি পাতা। প্রতিটা মুহূর্তের বিবরণ। অভিরূপ বি.কম পাশ করার পর সরকারি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলে হিসেবে বাবার চলতি ব্যবসার হাল ধরতে হল। দীপেশের মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কোনও বিরক্তি নেই ।</p>



<p>&#8211; তুমি তো সবই জান।&#8230; অভিরূপ ফিকে হেসে বলল , আমি গ্রূপ মিডিয়া থেকে জেনে মোহনদার সঙ্গে যোগাযোগ&nbsp; চেষ্টা করেও , ওকে পাইনি। তাই আজ বিকেলে সোজা হসপিটালে চলে গেলাম। গিয়ে শুনি মোহনদা বৌদিকে অন্য হসপিটালে ভর্তি করেছে ।</p>



<p>&#8211; তার মানে ! দীপেশ যেন এক অপ্রত্যাশিত আঘাতে মাটিতে আছড়ে পড়ল , আজ সকালেও তো মোহনের সঙ্গে কথা হল । জানাল বর্ণা ইজ রিকভারিং । যদিও খুব ধীরে । কিন্তু অন্য হাসপাতালে শিফ্ট করার কথা তো কিছু বললই না। বর্ণা যে ক&#8217;দিন আই সি ইউ-তে থাকবে সেসময় আমি যাব না , ভিড়&nbsp; বাড়াবো না &#8211; এত বললাম । আশ্চর্য ।</p>



<p>অভিরূপ একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল , বৌদি যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল , সেখানে কি তোমার কোনও ভূমিকা &#8230;. আই মিন হেল্প &#8230;..</p>



<p>&#8211; না, না , মোহন নিজেই সব করেছে । আমি শুধু আমার একজন শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবুকে রুগির বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তিনি ওই হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত । তুমি কি জানতে পেরেছ , মোহন ওর স্ত্রীকে কোথায় ভর্তি করেছে ? &#8230; আমার এত খারাপ লাগছে ! পেশেন্ট উইথড্র করার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে , কিন্তু সেটা একবার জানাবে না । ব্যক্তিগতভাবে আমাকে জানানোর অসুবিধে থাকলে ফ্রেন্ড সার্কেলে জানাতে পারত। এগুলো মাত্রা ছাড়া অসভ্যতা ।</p>



<p>&#8211; দীপেশদা , তুমি শান্ত হয়ে বাড়ি যাও। সবার আচরণ সুন্দর হওয়াটাই অস্বাভাবিক । অভিরূপ ম্লান হাসল । যেন আচমকা আগুনে দগ্ধ ও তিক্ত মুখে বাড়ি ঢুকবে দীপেশদা , পরিবারের কারও সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে পারবে না । মোহনদার মনের অবস্থা যেমনই থাক, দীপেশদাকে একটা ছোট টেক্সট মেসেজ দিতে পারত। বিপদে কেউ পাশে এসে দাঁড়ালে , তার অস্তিত্ব উপেক্ষা করা অন্যায় । অস্বীকার করা পাপ ।</p>



<p>স্বল্প হাত নেড়ে দীপেশ পাড়ার ক্লাবের সামনে দিয়ে বাড়ি ঢুকে এল। অতিরিক্ত সাবধানতা , প্রত্যাশা , সিদ্ধান্ত গ্রহণ যে অন্যের অবমাননার কারণ হতে পারে , মোহনের মতো মানুষরা এটা ভাবতেই পারে&nbsp; না। ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে । অন্যত্র ভর্তি করার কারণটা জানা কর্তব্য । পরোপকার করা , না করার জন্য জরুরি ।&nbsp;</p>



<p>না , মোহনকে ফোন করল না দীপেশ । ওর ভেতরের আবেগগ্রস্ত মানুষটা ওকে রুখে দিল। আরোগ্য নিকেতন বদলের ঘটনাটা মোহনেরই&nbsp; জানানো উচিত। চুল চেরা বিচারে দীপেশ কিছুই করেনি। কেবল একটা চেনা সূত্রকে কাজে লাগানোর চেষ্টাটুকু করেছে। ডাক্তার মৈত্র নিশ্চয়ই বিষয়টা জেনে গেছেন। ব্যাপারটা&nbsp; ভালোভাবে নিশ্চয়ই নেননি ।</p>



<p>গুড মর্নিং জানিয়ে দীপেশ অপরাধীর মতো সমস্ত ঘটনাটা ডাক্তার মৈত্রকে বলল। সবটা শুনেই ডাক্তারবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন , আরে এ তো হামেশাই হচ্ছে । বাড়ির লোক যদি মনে করে , এই হসপিটাল বা নার্সিং হোমে ট্রিটমেন্ট ঠিকঠাক হচ্ছে&nbsp; না , তাহলে তাঁরা চিকিৎসাকেন্দ্র বদলাতেই পারেন। এটা তাদের রাইট। শোন দীপেশ , রুগির প্রাণ নিয়ে তো আর ছিনিমিনি খেলা যায় না। অতএব মানুষ সাধারণ থেকে অসাধারণের পথে যাবেই । তখন মানি ফ্যাক্টরের কথাও লোকজন মনে রাখে না। ড্রপ ইট । এসব নিয়ে আমি আদৌ ভাবিনা। তুমি তোমার কাজ করেছ , আমি আমার কাজ করেছি । ব্যস । হিয়ার দ্য ম্যাটার ইজ ফিনিশড ।</p>



<p>তিনদিন পরে, রবিবার সকাল এগারোটা নাগাদ মোহনের কল ঢুকল দীপেশের মোবাইলে। যেন অজানা নম্বর থেকে কেউ ফোন করছে এমন বিরক্তি ঝরিয়ে দীপেশ হ্যালো বলল ।</p>



<p>&#8211; আমি মোহন বলছি ।&#8230; তুই নিশ্চয়ই এতদিনে জেনে গেছিস বর্ণাকে বাধ্য হয়ে আলিপুরের এক প্রাইভেট হসপিটালে ভর্তি করতে হল ।</p>



<p>একটু চুপ করে থেকে দীপেশ নিস্পৃহ স্বরে বলল , শুনেছি । সুব্রত জানিয়েছে ।</p>



<p>&#8211; বর্ণাকে শিফ্ট করতে বাধ্য হয়েছিলাম রে । তুই হয়তো ক্ষুব্ধ । কিন্তু অন্য কোনও উপায় ছিল না। অ্যাডমিশনের আড়াই দিনের শুরুতে হাসপাতাল থেকে ফোন এল আপনি বেলা দশটার মধ্যে চলে আসুন । পেশেন্ট আমাদের সঙ্গে কোঅপারেশন করছেন না । সব ফোনে বলা যাবে না । আই সি ইউ-তে থাকা অন্য রুগিদের অসুবিধে হচ্ছে ।</p>



<p>&#8230; মেয়েকে নিয়ে আমি দৌড়লাম । নিজের চেম্বারে বসিয়ে চিফ মেট্রন বেশ কিছু অভিযোগ করলেন। এও জানালেন , বর্ণার লাংসে স্প্যাজম ছাড়া অন্যান্য রিপোর্ট নর্মাল। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার , নার্সদের বা স্টাফদের যখনই কিছু জিজ্ঞেস করেছি , স্পষ্ট কিছু উত্তর পাইনি। আমি বর্ণার কাছে যাওয়ার পারমিশন পেয়েই ওপরে গেলাম । অক্সিজেন মাস্ক পরানো বর্ণা আমাকে স্থির চোখে দেখছিল। ওর দু&#8217; চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তেই আমি চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলাম , কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার ? বর্ণা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলেছে , তুমি এখান থেকে আমাকে নিয়ে চল । আর একদিন থাকলেই আমি মরে যাব। এখানকার নার্সরা অক্সিজেন মাস্ক ঠিক করে পরাতে পারে না । লাগছে বললে স্বান্ত্বনা দেয় না , উল্টে মুখ করে। না, না আমি এখানে থাকতে পারছিনা । নিয়ে চলো &#8230;</p>



<p>হসপিটালের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে বর্ণাকে আলিপুরের মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছি। উত্তর কলকাতার হাসপাতালের কথা আমি ভুলে যেতে চাই ।</p>



<p>&#8211; ঠিকই তো , ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা বাজে জেনে মিসেসকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী বা করার ছিল ! সস্তার চিকিৎসা এর চেয়ে ভাল হবে কী করে ? তবে বর্ণাকে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টায় এ আর সি মেমোরিয়াল বাঁচিয়ে রেখেছিল। ফলে বর্ণা আরও উঁচু দরের ব্যবস্থায় যেতে পেরেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরবে। &#8230;. এই অবদান টুকু ভুলিস না ।&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/pratham-abadan-harsha-datta/">প্রথম অবদান</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/pratham-abadan-harsha-datta/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>স্মৃতিকুমার</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/smritikumar-sanmatrananda/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/smritikumar-sanmatrananda/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 06 Oct 2026 08:14:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11311</guid>

					<description><![CDATA[<p>আমি পুত্র স্মৃতিকুমারকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। প্রহরীগণ, যাও, ইহাকে এখনই বধ্যভূমিতে লইয়া যাও!’ </p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/smritikumar-sanmatrananda/">স্মৃতিকুমার</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>সন্মাত্রানন্দ</strong></p>



<p>ধুলার পথ, মাটির ঘর-পাতায় ছাওয়া। পথের দু-পাশে মানুষের বসতি; নাম-না-জানা ছোটো একটি গ্রাম। এ অঞ্চলে সম্পন্ন বনবীথি কোথাও নেই, ইতস্তত কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে মধ্যে মধ্যে মূক সাক্ষীর মতন। এখন চৈত্রান্ত; তাই সেসব গাছে পুরোনো পাতা ঝরে যাচ্ছে, নতুন কিশলয়ের আবির্ভাব ঘটছে। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>ভিক্ষাটনাদি সেরে গ্রামের বাইরে একটা ছায়াঘন নিমগাছের তলে তথাগত এসে বসেছেন। এর পরেই দিকহারানো বিস্তীর্ণ চাষের খেত। যদিও কৃষিবহুল নয় এতদঞ্চল, তবু কিছু গ্রামীণ মানুষ দ্বিপ্রহরবেলায় কৃষিক্ষেত্রে কর্মনিরত। কোথাও কোথাও শস্যপুঞ্জের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ে মাটির রঙ ঈষৎ কালচে বা পিঙ্গল। সে-মাটি অবশ্য এখনকার নয়। আড়াই হাজার বছর আগেকার সেই মৃত্তিকা। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিছুক্ষণ পরে তীব্র দাবদাহের কারণে কৃষকদের পক্ষেও মাঠে কাজ করা সম্ভব হল না আর। মাঠ থেকে উঠে এসে তারা ওই নিমগাছের নীচে জড়ো হল। কাপড়ের গ্রন্থি খুলে তারা বের করল আহার্য। মনে হল, এরা তথাগতর পরিচিত। তথাগত এই কৃষকদের সঙ্গে আহার্য বিনিময় করে খেতে লাগলেন। খেতে খেতে কথাবার্তাও কিছু কিছু হচ্ছে; কিন্তু কী সেই কথা, এত দূর থেকে, এত যুগের দূরত্ব থেকে তা আর স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এখন এমনই ধারা। অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে। উরুবেলায় তপস্যাকালে তপস্বী সিদ্ধার্থ যেমন জনসঙ্গ বর্জন করে চলতেন, অধিকাংশ সময় অন্তর্মুখ থাকতেন, বোধিলাভের পরে সেই দশা আর নেই। কী তিনি লাভ করেছেন, সে-কথা কেই বা বোঝে, কেই বা জানে, আর কেই-বা জানতে চায়? কিন্তু বাইরে থেকে তাঁকে সদাই প্রফুল্ল দেখায়, যেন ভেতরে ভেতরে কোনও গভীর আনন্দে নিমগ্ন হয়ে আছেন। তাঁর মুখে চোখে অণুমাত্র উদ্বেগের চিহ্নও আর নেই। এখন তিনি সকলের সঙ্গে সহজেই মিশে যান। তাদেরই ভাষায় কথা বলেন। যা তারা ভিক্ষা দেয়, তা-ই সানন্দ চিত্তে আহার করেন। এমনকি বস্ত্রও সর্বদা গৈরিক কাষায় নয়, কখনও শ্বেত, কখনও লোহিত, যখন যেমন যা পাওয়া যায়, তখন তেমনই। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এই গ্রাম জেতবন থেকে মাত্র ক্রোশখানেক দূরত্বে অবস্থিত। কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তী, সেই শ্রাবস্তী নগরীর বহির্বর্তী জেতবন উদ্যান তথাগতর উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক। তাঁর ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছেন মূলগন্ধকুটি। চন্দনকাঠের তৈরি সেই কুটিরে তথাগত কিন্তু অল্প সময়ই অবস্থান করেন। জেতবনের মধ্যে উন্নতশীর্ষ ছায়ানিবিড় অনেকগুলি গাছ আছে। তথাগত দিনমানে এসব গাছেদের ছায়ায় থাকেন। কখনও কখনও ভিক্ষার্থে নিকটবর্তী গ্রামগুলিতে যান।</p>



<p>জীবনজিজ্ঞাসায় অস্থির হয়ে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গৃহপরিত্যাগী তপস্বী। প্রশ্ন করলেই যে তথাগত উত্তর দেন, কিংবা খুব দীর্ঘ কিছু উপদেশ দেন, তা নয়। তিনি আগন্তুকদের বলেন জেতবনে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে। নীরবতা ও সংযম পালন করতে। নিজে নিজে জীবনপ্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। আর কিছুই না। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>তাঁর কাছে সকলেরই অবারিত দ্বার। তিনি কাউকে জাতিপরিচয়, কুলপরিচয় জিজ্ঞাসা করেন না। যে কেউ আসুক, সে সন্ন্যাসীই হোক আর গৃহস্থই হোক, আগত ব্যক্তির জীবনসমস্যার কথা তথাগত সমনস্ক চিত্তে শ্রবণ করেন। সম্ভব হলে, সমাধান বলেন।</p>



<p>তবু ব্যতিক্রম আছে এক ক্ষেত্রে। সকলের জন্য অবারিত দ্বার হলেও সদ্য-আগত শাক্যপুত্রীয়দের জন্য নয়। বড়ই বিচিত্র অবস্থা! &nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনুরুদ্ধ, ভদ্দিক, ভৃগু, কিম্বিল, দেবদত্ত আর আনন্দ। রাজগেহ যাওয়ার পথের পাশে অনুপিয় আম্রকাননে যখন তথাগত ছিলেন, তখনই এই শাক্যপুত্রীয়রা কপিলাবস্তু ছেড়ে এসে তথাগত-র আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের সঙ্গে এসেছিলেন ক্ষৌরকার উপালিও। পরে সেই একই প্রব্রজ্যার আদর্শে প্রাণিত হয়ে শাক্যবংশীয় অপরাপর রাজপুত্ররাও এসেছেন। আপাতত তাঁরা জেতবনেও উপস্থিত হয়েছেন। তথাগত তাঁদের এখানে থাকতে নিষেধ করেননি। কিন্তু একমাত্র উপালি ছাড়া আর কাউকেই তিনি এখনও পর্যন্ত কাছে ঘেঁষতে দেননি। বলে দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে বহু দিন অপেক্ষা করতে হবে।</p>



<p>শাক্যপুত্রীয়দের জন্যে এমন কঠোর ব্যতিক্রম কম উষ্মার জন্ম দেয়নি। সত্যিই তো! তাঁরা হলেন তথাগত-র পূর্বাশ্রমীয় আত্মীয়। যে-শাক্যবংশে কুমার সিদ্ধার্থ জন্মেছিলেন, সেই বংশেই তাঁদেরও জন্ম। অথচ তাঁদের জন্যেই এ কীপ্রকার বে-নিয়ম? &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>একদিন মধ্যাহ্নভোজনের পরে এ নিয়ে শাক্যপুত্রীয়দের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বর্তুলাকার চোখ দুটি আরও বিস্ফারিত করে দু-পাশে ঘাড় দুলিয়ে কিম্বিল বলে উঠলেন, ‘অব্‌ভুতম্‌ বাতা ভো! আচ্চরিয়ম্‌ বাতা ভো! আমরা হইলাম তাঁহার সমবংশজ। অথচ আমাদিগের নিমিত্তই এই উদ্ভট নিয়ম। অন্য যে কেহ আসিতেছে, তথাগত-র দর্শন পাইতেছে, কথা কহিবার সুযোগ পাইতেছে। আর আমরা তাঁহার সহিত কথা কহিব কি? বসিয়াই আছি মাসের পর মাস কাকবৎ প্রতীক্ষায়!’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>ভৃগু বললেন, ‘শুনিয়াছিলাম নাকি বুদ্ধত্ব সাম্যাবস্থা! এক্ষণে ইহা কীদৃশ সাম্য হইল?’</p>



<p>দেবদত্ত ফুট কাটলেন, ‘দ্যাখো বন্ধু, প্রবাদ আছে, আকরে টানে। পূর্বজীবনে ছিলেন রাজা। রাজদর্শনে উপস্থিত হইলে দর্শনার্থীকে অপেক্ষা করিতে হয়। সেই অভ্যাস কি সিদ্ধার্থের একেবারে গিয়াছে বলিয়া মনে করো? বুদ্ধ হইলেই কি আর এতকালের রাজকীয় অভ্যাস পরিত্যাগ করা যায়?’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এসব কথা আনন্দের ভালো লাগছিল না। তিনি বললেন, ‘এই রূপে চিন্তা করা নিতান্তই অনুচিত। আর যিনি বুদ্ধ হইয়াছেন, তাঁহাকে পূর্বাশ্রমের নামে, সিদ্ধার্থ নামে উল্লেখ করাও গর্হিত কর্ম। আমাদিগের জন্য তথাগত নিষেধনিয়ম করিয়াছেন যখন, তখন নিশ্চয়ই তাহার কোনো সংগত কারণ আছে। উহাই অন্বেষণ করিতে হইবে।’</p>



<p>দেবদত্ত উত্তর দিলেন, ‘করো তুমি অন্বেষণ। আমি যাহা বুঝিবার, বুঝিয়া গিয়াছি। সিদ্ধার্থ বাল্যাবধি এইরূপই ছিল। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যপ্রিয়, উদ্ধত। এক্ষণেও সে তাহাই আছে। সবাকার সম্মুখে আমাদিগকে হীনপ্রভ করিবার জন্যই সে আমাদিগের সহিত এমন করিতেছে। আমরা কি তাহার নিকট অস্পৃশ্য? কেন সে আমাদের এইরূপে বসাইয়া রাখিয়াছে, আমি কি বুঝি না?’&nbsp;&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>ভদ্দিক খানিক চিন্তা করে ধীরে ধীরে নীপপুষ্পনিভ সদ্যোমুণ্ডিত মস্তকটি চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘কারণ যাহাই হউক&#8230; কথা হইল, তথাগত আমাদের এইরূপে উপেক্ষা করিলে সাধুসমাজে আমরা মানসম্মান কিছুই পাইব না। শ্রমণ বা তপস্বীদের ভিতর আমাদের চিরকাল ব্রাত্য হইয়াই থাকিতে হইবে।&#8230; আর এই উপালিটাও হইয়াছে তেমনই, রাজপুরীতে ও ছিল মহাধূর্ত নহাপিত, এখানে আসিয়া হইয়াছে যমসদৃশ দ্বারপাল&#8230; তথাগত অনুমতি দেন নাই বলিয়া ও কেমন আমাদের দিকে ক্রমাগত রুষ্ট ভঙ্গিতে তাকাইতেছে&#8230; পারিলে বুঝি জেতবন হইতে লগুড়াঘাতে আমাদিগকে এখনই তাড়াইয়া দেয়&#8230;’&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp; &nbsp;</p>



<p>‘সবই তো বুঝিলাম, কিন্তু এ সমস্যার নিষ্পত্তি কী হইবে?’ অনুরুদ্ধ স্বগতস্বরে যেন প্রশ্ন করলেন।</p>



<p>নিষ্পত্তি কিছুই হল না। আলোচনায়, চর্চায় সেদিন বৃথাই বেলা গড়ালো শুধু। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>বরং নিষ্পত্তি এল কয়েকদিন পরে। একেবারে অভাবিত পন্থায়। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>দিনের আলো সেদিন ক্রমশ তেজ হারিয়ে নীল হয়ে আসছে, তখন বিকেলবেলা, কোথা থেকে এক অরণ্যচারী তপস্বী জেতবনে উপস্থিত হলেন। শোনা গেল, তাঁর নাম উপসেন। গা-হাত-পা রুক্ষ, মাথায় জটাভার, পরনে কটিমাত্র একটি বস্ত্র; অর্ধনগ্নই বলা যায়। এখানে এসেই তিনি অস্থির ব্যাকুলতায় তথাগত-র অন্বেষণ করতে লাগলেন। যাকেই সামনে দেখেন, তাকেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেন, ‘সুগত এখানে কোথায় আছেন? আমি যে তাঁহার দর্শন-অভিলাষী! কী উপায়ে তাঁহার দেখা পাইতে পারি? হে ভদ্র! আপনিই কি সেই মহাশ্রমণ সুগত?’ যেন তথাগত-র সঙ্গে দেখা না হলে এখনই তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যাবে। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>এই ব্যাকুল তপস্বী আগন্তুকের কথা উপালি তাড়াতাড়ি তথাগত-র কর্ণগোচর করলেন। অণুমাত্র বিলম্ব হল না, তপস্বী উপসেনের কাছে এসে উপালি তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আপনাকে ভগবান বুদ্ধ এখনই তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইতে বলিয়াছেন। আসুন, ভিক্ষু উপসেন, আমার সহিত আসুন। তিনি জেতবনের অপর প্রান্তে রহিয়াছেন!’</p>



<p>সমস্ত ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে দেবদত্ত তাঁর পার্শ্ববর্তী শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষুদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, “দেখিলে? দেখিলে কাণ্ডটা? মাসের পর মাস আমরা অপেক্ষা করিতেছি, অথচ আমাদিগের সহিত দেখা করিবার নাম নাই। আর কোথা হইতে আসিল জটাজটিল অপরিষ্কৃত একটা ভণ্ড, অমনি ‘ভগবান বুদ্ধ তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইতে বলিয়াছেন!’ ” শেষ কথাটা উপালির কণ্ঠস্বর নকল করে মুখভঙ্গিসহকারে বললেন দেবদত্ত। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>প্রায় এক প্রহর ধরে তথাগত-র সঙ্গে সেই ভিক্ষু উপসেনের কী যেন বার্তালাপ হল। অবশেষে প্রথম রাত্রির অন্ধকার গায়ে মেখে উপসেন ফিরে আসছিলেন। এখন আর তাঁর মুখে আর কোনো অস্থিরতার ভাব নেই। বেশ হৃষ্ট, আনন্দময় মুখভাব। জেতবনের সীমানা উপসেন পার হয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় শাক্যপুত্রীয়রা এসে তাঁকে ধরলেন। দেবদত্ত কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তপস্বী উপসেন! কী উপায়ে আপনি তথাগত-র দর্শন পাইলেন? আমরা তো এত মাস এ স্থলে বসিয়া আছি, তথাপি তথাগত আমাদিগকে দেখা করিবার অনুমতি দেন নাই!’ &nbsp;&nbsp;</p>



<p>সেই জায়গাটায় অল্প অল্প জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল। আবছা আলোয় ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষুদের মুখ শিশুর কৌতূহলে অবলোকন করে কী যেন চিন্তা করে নিয়ে উপসেন প্রতিপ্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা কি রাজপুত্র?’</p>



<p>ভদ্দিক উত্তর দিলেন, ‘তা ছিলাম বটে! কিন্তু এখন আমরা আর রাজপুত্র নই। ইদানীং প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়াছি।’</p>



<p>উপসেন বললেন, ‘তাহলে আমি ঠিকই ধরিয়াছি!’</p>



<p>দেবদত্ত ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ধরিয়াছেন?’</p>



<p>উপসেন উত্তর দিলেন, ‘আপনাদিগের মধ্যে আমি এখনও অবধি কোনো তপস্যার চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি না। এখনও আপনারা কাষায়-আবৃত রাজপুরুষ মাত্র। রাজবংশের গরিমা আপনাদিগের দূর হয় নাই। পরন্তু আপনাদিগের চীবরগুলি যথেষ্ট সুন্দর, মনোরম, আরামদায়ক। ইহা কি ভিক্ষুজনোচিত চীবর? নাকি রাজবস্ত্রে নির্মিত কাষায়? আপনারা ভিক্ষু হইয়াছেন?&nbsp; নাকি ভিক্ষু সাজিয়াছেন? এতাদৃশ ব্যক্তিদের সহিত তথাগত সাক্ষাৎ করিবেন না, ইহাই তো স্বাভাবিক। হা হা হা!’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>লোকটার কি শরীরে এতটুকু ভয়ডর নেই গা? ছ-ছটা রাজপুত্তুর, নেহাত প্রব্রজ্যা নিয়েছে বলেই কোমরে তলোয়ার নেই, তা না হলে এতক্ষণে ওর কাটামুণ্ডু মাটিতে গড়াগড়ি খেতো! এখনও এদের যেমন বলিষ্ঠ বপু, রাগের চোটে অহিংসা-টহিংসা ভুলে গিয়ে যদি গলা টিপে ধরে, রুগ্ন উপসেনের প্রাণ বেরোতে অধিক বিলম্ব হবে না। সেসব কিছুই না ভেবে ‘হা-হা’ শব্দে রাজপুরুষদের পরিহাস করতে করতে উপসেন জেতবনসীমা পার হয়ে যেতে লাগলেন।</p>



<p>পরদিন প্রাতঃকালে ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তাঁদের উত্তম চীবরসমূহ পরিত্যাগ করলেন। স্নানান্তে অপেক্ষাকৃত জীর্ণ চীবর ধারণ করে নিতান্ত বিনয়ীভাবে মূলগন্ধকুটি-র দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁরা ভাবছিলেন, উপালিকে দেখতে পেলে পুনরায় তথাগত-দর্শনের আবেদন জানাবেন। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। মূলগন্ধকুটি-র কাছাকাছি আসামাত্রই উপালি তাড়াতাড়ি ওঁদের কাছে এসে বললেন, ‘ভিক্ষুবৃন্দ! আপনারা এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? আজ প্রভাতবেলা হইতেই ভগবান আপনাদিগের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছেন। এমনকি ভিক্ষার্থেও বহির্গত হন নাই। আপনারা এখনই সত্বর তাঁহার নিকটে গমন করুন। তিনি জম্বুবৃক্ষতলে অবস্থান করিতেছেন।’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>দেবদত্ত মনে মনে ভাবছিলেন, বাব্বা! আজ যে এত খাতির! ব্যাপার কী? জেতবন থেকে চিরতরে চলে যেতে বলবে নাকি সিদ্ধার্থ? &nbsp;</p>



<p>সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ছয় শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তথাগত-সমীপে উপস্থিত হলেন। পাদবন্দনাদি শেষে তাঁরা বুদ্ধের সামনে মাটিতেই সুখাসনে বসলেন। তাঁদের উদ্দেশে মৃদু হেসে তথাগত বললেন, ‘স্বস্তি!’</p>



<p>প্রথমেই কথারম্ভ করলেন অনুরুদ্ধ। একটু অভিমানভরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদিগের সহিত এতকাল সাক্ষাৎ না-করিবার কারণ কী, ভগবন? আমরা কৃচ্ছ্রসাধনাদি করি নাই, রাজবংশের অহংকার পরিত্যাগ করি নাই, ইহাই কি আমাদিগের সহিত অসাক্ষাতের কারণ?’ &nbsp;&nbsp;</p>



<p>প্রশ্ন শুনে বুদ্ধ একটু হাসলেন। তারপর কমনীয় স্বরে&nbsp; বললেন, ‘না, ইহা অসাক্ষাতের সম্যক কারণ নহে।’</p>



<p>আনন্দ অধীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তবে আর কী কারণ, ভগবন?’ &nbsp;&nbsp;</p>



<p>যেন কোন সুদূর বেদনায় মথিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তথাগত। বললেন, ‘পূর্ব-পূর্বজন্মের স্মৃতি জাগরিত হইলে ভিক্ষুজীবন সুদৃঢ় হয়, আনন্দ। যাহাতে তোমাদের চিত্তে পূর্বজন্মের স্মৃতি উদ্বুদ্ধ হয়, সেই জন্যেই ইচ্ছা করিয়াই তোমাদিগকে এতদিন দূরে রাখিয়াছিলাম। যাহাতে বিগতজন্মের কথা তোমাদের মনে পড়ে। কিন্তু আমার সে-প্রয়াস সফল হয় নাই। তোমাদের স্মৃতিমঞ্জূষা অতি দৃঢ়ভাবে অর্গলবদ্ধ রহিয়াছে!’</p>



<p>দেবদত্ত বলে উঠলেন, ‘পূর্বজন্মের স্মৃতি? সে আবার কী? পূর্বজন্ম ইত্যাদি আবার আছে নাকি?’</p>



<p>সে-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বহুদূরের দিকে, যেন বিগত বহুজন্মের দিকে উদাসীন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সুগত। তারপর আবার যেন নিজের কাছে ফিরে এসে শান্ত ভঙ্গিমায় বললেন, ‘তোমাদিগকে একটি গল্প বলিব। শুনিবে?’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>গল্প কে না শুনতে চায়? শ্রদ্ধাবান আনন্দ-অনিরুদ্ধই হোক কিংবা শ্রদ্ধাহীন ক্রূরচিন্তক দেবদত্তই হোক, গল্প শুনতে চায় না, ত্রিভুবনে এমন কেউ এখনও জন্মায়নি। সকলেই সাগ্রহে তথাগত-র দিকে এবার কিছুটা এগিয়ে এসে বসলেন। &nbsp;</p>



<p>মহাশ্রমণ বুদ্ধ অতঃপর বলতে লাগলেন: &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>“উদাসীন ধরিত্রীর উপর দিয়া দীর্ঘ দীর্ঘ কল্পকাল তাহার যাবতীয় ঐশ্বর্য লইয়া চলিয়া গিয়াছে। সে-সকল কথা কেহ মনে রাখে নাই। মন্দির শ্মশান হইল, শ্মশান মন্দির হইল। রাজ্য-সাম্রাজ্য ধুলা হইয়া গেল, তাহাদের ভস্মাবশেষরাশি নদী লইয়া গেল সমুদ্রে। একজনও কেহ রহিল না। সকলের অস্থিকরোটি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া মাটিতে মিশিল, সেই মাটি হইতে রস টানিয়া লইয়া মাথা তুলিল উন্মুখ উদ্ভিদ। ভাষা পরিবর্তিত হইয়া গেল। কত সাধভরে রচিত কাব্যসম্ভার পুথির পৃষ্ঠায় অপঠিত অনুদ্ধারণীয় হইয়া ধুলা খাইতে লাগিল। সেকালের গান আর কেহ একালে গাহে না; ভাষা ভুলিয়া গিয়াছে।</p>



<p>এমনই বহুকল্প পূর্বে বারাণসী নগরীতে এক স্বধর্মনিষ্ঠ রাজা ছিলেন। নাম— ব্রহ্মদত্ত। তাঁহার অতি সরলা, শান্তা, গম্ভীরা রাজ্ঞীর নাম ছিল ব্রহ্মাবতী। কৈশোরকালেই উভয়ের বিবাহ হইয়াছিল। ধীরে ধীরে তাঁহারা যুবক-যুবতী হইলেন। &nbsp;</p>



<p>উভয়ে উভয়ের প্রতি সুগভীর স্নেহমায়ার আকর্ষণ অনুভব করিতে লাগিলেন। স্নেহ হইতে প্রীতি হইল, প্রীতি হইতে রতি। রতির ফলস্বরূপ যথাকালে ব্রহ্মাবতী অন্তর্বত্নী হইলেন। অন্তঃসত্ত্বা ব্রহ্মাবতীর সাধ হইল, কিছুকাল নদীবক্ষে নৌবিহার করিবেন। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>রাজ্ঞীর এমত ইচ্ছাপূরণের জন্য রাজা যথোপযুক্ত ব্যবস্থা লইলেন। পরিচারক-পরিচারিকা সমেত একটি সুচিত্রিত জলযান রাণী ব্রহ্মাবতীকে লইয়া গঙ্গাবক্ষে ভাসিল। ধীরে ধীরে গঙ্গানদীর প্রবাহ বাহিয়া এমন এক নির্জন স্থানে নৌকা উপস্থিত হইল, যেখানে নদীর দুইপারে কেবল শান্ত তরুশ্রেণী, ঘন অরণ্য, অনাবিল আকাশ ও মৃদুমন্দ মলয়ানিলের প্রাচুর্য আছে। আর কিছুই নাই। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>এই জনকোলাহলহীন নীরব আকাশ, শান্ত ধ্যানমগ্ন তরুবীথিকা, নিম্নে গঙ্গার মৃদু কলতানগুঞ্জরিত জলস্রোতের মধ্যে রাণী ব্রহ্মাবতীর মন একান্ত শান্ত, গম্ভীর, নিরতিশয় নিজনিবিড় হইয়া গেল। তাঁহার জন্মজন্মের স্মৃতি যেন চিত্তপথে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। শেষে সেই স্মৃতিস্রোতও স্তিমিত হইয়া আসিল, নিরুদ্বিগ্ন আনন্দের আভাস চিত্তনদীতে ধীরে ধীরে স্ফুটতররূপে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। কিছুদিন পরে রাণী ব্রহ্মাবতী এক সুদর্শন পুত্রের জন্ম দিলেন। পুত্রমুখ দর্শনে উৎফুল্ল রাণী নবজাত সন্তানের নাম রাখিলেন-স্মৃতিকুমার।</p>



<p>প্রসূত ও প্রসূতিকে লইয়া নাও বারাণসীতে ফিরিয়া আসিল। রাজপুত্রের জন্মসংবাদ পাইয়া রাজা ও প্রজা সকলেই হৃষ্টচিত্তে নদীতীরে রাজ্ঞীকে স্বাগত জানাইতে আগমন করিলেন। রাণী ব্রহ্মাবতী ও তাঁহার সদ্যোজাত পুত্র স্মৃতিকুমারকে লইয়া রাজা আনন্দে ভাসিতে ভাসিতে রাজপুরীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।</p>



<p>দিন গেল। রাজপুত্র স্মৃতিকুমার ধীরে ধীরে শশিকলার ন্যায় প্রবর্ধিত হইতে লাগিল। কিন্তু ইতোমধ্যে শিশুদেহে কিঞ্চিৎ বৈলক্ষণ্য দেখা দিল। অপরাপর শিশুদের ন্যায় স্মৃতিকুমার সহজে রোদন করে না। তীব্র রৌদ্র কিংবা দারুণ শৈত্যে ফেলিয়া রাখিলেও তাহাকে কাঁদিয়া উঠিতে দেখা যায় না। ক্ষুধা পাইলেও সে ক্ষোভ প্রকাশ করে না, রাণী তাহাকে বুকে করিয়া বসিলেও সে নিজ হইতে মাতৃস্তনে মুখ দেয় না। &nbsp;</p>



<p>যে-বয়সে শিশুরা হাঁটিতে শেখে, সেই বয়স আসিল, অথচ স্মৃতিকুমারকে বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও হাঁটানো শেখানো গেল না। সে এক স্থানে স্থির হইয়া বসিয়া থাকে। তাহাকে ধরিয়া জননী নিয়মিত হাঁটানোর প্রয়াস করাইলেও, যতক্ষণ মা ধরিয়া আছেন, ততক্ষণই সে চলিতে পারে, ছাড়িয়া দিলে তৎক্ষণাৎ ভূমির উপর পড়িয়া যায়।&nbsp; &nbsp;</p>



<p>যে-বয়সে সচরাচর শিশুর মুখে বোল ফুটে, আধো-আধো দুই একটা শব্দ উচ্চারণ করিয়া শিশু পিতামাতাকে তাক লাগাইয়া দেয়, সেই বয়সও আসিল, তথাপি স্মৃতিকুমারের মুখে বোল ফুটিল না। একটি শব্দও সে উচ্চারণ করিল না। রাজা-রাণী উভয়েই ধৈর্য ধরিয়া আরও কিছুকাল অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু সে-প্রতীক্ষা বিফল হইল, স্মৃতিকুমারের জিহ্বায় বাণীর প্রসাদ ফুটিল না।</p>



<p>তখন রাজবৈদ্য আসিলেন। একজন নহে, অনেক বৈদ্য। পরীক্ষা সকলেই করিলেন। কিন্তু শিশুটির শরীরে বা জিহ্বায় অণুমাত্র অসুস্থতা খুঁজিয়া পাইলেন না। স্মৃতিকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ। তাহা হইলে তাহার মূকত্ব ও পঙ্গুত্বের কারণ কী? কেহই বলিতে পারিলেন না।</p>



<p>পুত্র মূক, পুত্র পঙ্গু—ইহা চিন্তা করিয়া রাজা নিতান্ত শোকগ্রস্ত হইলেন। রাজপুত্রই রাজ্যের ভবিষ্যৎ; সে যদি বাকশক্তিহীন ও চলচ্ছক্তিহীন হয়, তাহা হইলে এই বিপুল সাম্রাজ্যের দায়ভার রাজা কাহার উপর ন্যস্ত করিয়া যাইবেন?</p>



<p>রাণী ব্রহ্মাবতী কিন্তু পুত্রের এতাদৃশ অবস্থা দর্শনে দুঃখিত হইলেন না। স্মৃতিকুমার অসুস্থ &#8211; এই কথাটাই ব্রহ্মাবতীর বিশ্বাস হইল না। সন্তান যখন গর্ভে ছিল, তখন রাণী সেই শান্ত নিসর্গদৃশ্যের ভিতর আপন স্মৃতিভারে নিমজ্জিতা ছিলেন, এক্ষণে শিশুটির নির্বাক দৃষ্টির ভিতর রাণী সেই নির্জন প্রকৃতির নীরব ভাষা, তাহার অসাড় পদদ্বয়ে বৃক্ষসমূহের স্থিরতা, ধ্যাননিশ্চলতা দেখিয়া নিরুদ্বিগ্না রহিলেন। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>রাণীর এই নিরুদ্বেগ ভাব রাজার ক্ষোভের কারণ হইল। কিন্তু সেই ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হইবার সুযোগ পাইল না। ইহার পর রাণী ব্রহ্মাবতী আর বেশিদিন বাঁচিলেন না। আকস্মিকভাবে অসুস্থ হইয়া একদিন মৃত্যুপথগামিনী হইলেন।</p>



<p>রাণীর অদর্শনে রাজার শোকবেগ দ্বিগুণিত হইল। স্ত্রী পরলোকগতা, পুত্র মূকপঙ্গু, কী লইয়া আর বাঁচিবেন? রাজারা একাধিক বিবাহ করেন, কিন্তু রাণী ব্রহ্মাবতীকে রাজা প্রাণাধিক ভালোবাসিতেন। অপর বিবাহের কথা তাঁহার মনেও উঠিল না। ফলতঃ, রাজা ব্রহ্মদত্তের অন্য পুত্রসম্ভাবনাও আর রহিল না।</p>



<p>এমতাবস্থায় একজন ভুবনবিদিত ভিষগ্‌ রাজপুরীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি স্মৃতিকুমারকে পরীক্ষা করিয়া যাহা বলিলেন, তাহা বিস্ময়কর। তিনি বলিলেন, স্মৃতিকুমার মূকও নহে, পঙ্গুও নহে। সে অন্যের ভাষা সমস্তই অনুধাবন করিতে পারে। তাহার বাকশক্তিও অটুট। তা সত্ত্বেও সে কোনো কারণে কথা কহে না। কথা কহিবার ইচ্ছা নাই, তাই সে নির্বাক। তাহার চলিবার সামর্থ্যও রহিয়াছে। তা সত্ত্বেও সে কোনো কারণে চলে না। চলিবার ইচ্ছা নাই, তাই সে নিশ্চল। ইচ্ছাশক্তিই মনুষ্যের সকল ক্রিয়ার মূল কারণ। কিন্তু ইচ্ছা না হইলে কোনো কার্য হইবে না। এক্ষেত্রে স্মৃতিকুমার চলনে ও বলনে অপারগ নহে, অনিচ্ছুক। কেন অনিচ্ছুক, তাহা ভিষগ্‌বর বলিতে পারিলেন না। রাজকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ, সজীব; তথাপি সে এইরূপ জড় অবস্থায় স্ব-ইচ্ছায় রহিয়াছে &#8211; এই মাত্র বলিয়া বৈদ্য বিদায় লইলেন।</p>



<p>এদিকে রাজার অন্যান্য অমাত্যবর্গও পুত্রসন্তান লাভ করিয়াছেন। ছয় জন অমাত্যের ছয় পুত্র। তাহারা সকলেই স্বাভাবিক। অমাত্যপুত্ররা রাজপুরীতে রাজপুত্র স্মৃতিকুমারের সহিত খেলা করিতে আসিত। কিন্তু তাহাদের নানা বালকসুলভ চেষ্টাতেও স্মৃতিকুমার সাড়া দেয় না, খেলায় অংশ লয় না, নিশ্চুপ হইয়া বসিয়া থাকে। এমন অনিচ্ছুক বালকের সহিত খেলা করিয়া সুখ নাই। অমাত্যপুত্রগণ নিরাশ হইয়া ফিরিয়া যায়। &nbsp;&nbsp;</p>



<p>সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া রাজা ব্রহ্মদত্ত একদিন পুত্রকে কাছে লইয়া বসিলেন। তাহাকে বিবিধ খেলানা ও মিষ্টান্ন লইয়া অনেক সাধিলেন। তাহার পর মিষ্ট কথায় পুত্রকে বুঝাইতে লাগিলেন, ‘হে সৌম্য! তুমি আমার একমাত্র তনয়। এই বিশাল সাম্রাজ্যের তুমিই ভাবী উত্তরাধিকারী। তুমি কথা বলিতেছ না কেন? গমনাগমন করিতেছ না কেন? তুমি উঠো, কথা কও, রাজ্যের দায়িত্ব বুঝিয়া লও। আমি জানি, তুমি কথাও কহিতে পারো, চলিতেও পারো। তথাপি তুমি এই জড়বৎ হইয়া আছ। আমার কথা শুনো। একবার উঠিয়া দাঁড়াও। একবার অন্ততঃ শব্দ উচ্চারণ করো।’</p>



<p>এইরূপে দিনের পর দিন রাজা পুত্রকে বুঝাইতে লাগিলেন। কিন্তু কোনো ফল হইল না। রাজপুত্র স্মৃতিকুমার তদবস্থই রহিল।</p>



<p>তখন রাজা চিন্তা করিলেন, প্রিয়বাক্যে যখন কার্যোদ্ধার হয় নাই, তখন রূঢ়তাই অবলম্বন করিতে হইবে। একই কথা রাজা স্মৃতিকুমারের প্রতি তর্জনগর্জন করিয়া বলিতে লাগিলেন। তাহাতেও ফল হইল শূন্য। স্মৃতিকুমার নির্ভয়, নির্লিপ্ত, নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া রহিল।</p>



<p>অতঃপর রাজা এক বিষম পরিকল্পনা আঁটিলেন। স্থির করিলেন, তিনি স্মৃতিকুমারকে শাস্তিদানের অভিনয় করিবেন। সভা আহূত হইল, পাত্র-মিত্র-অমাত্য সকলেই উপস্থিত। স্মৃতিকুমারও এক পার্শ্বে স্থানুবৎ বসিয়া আছে।</p>



<p>সেই ভরাসভায় সকলের সম্মুখে রাজা ঘোরশব্দে ঘোষণা করিলেন, ‘আমার পুত্র স্মৃতিকুমার মূক ও পঙ্গু। রাজ্যের উত্তরদায়িত্ব লইবার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এমন পুত্র থাকাও কী, আর না থাকাও কী? আমি পুত্র স্মৃতিকুমারকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। প্রহরীগণ, যাও, ইহাকে এখনই বধ্যভূমিতে লইয়া যাও!’&nbsp;</p>



<p>তখন সান্ত্রী, প্রহরী, হন্তারক সকলেই নিতান্ত খিন্ন মনে চতুর্দোলায় করিয়া স্মৃতিকুমারকে বধ্যভূমির দিকে লইয়া যাইতে লাগিল। রাজা উহাদের গোপনে বলিয়া দিয়াছিলেন, যদি স্মৃতিকুমার মধ্যপথে শব্দ উচ্চারণ করে, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ যেন তাহাকে রাজসভায় ফিরাইয়া আনা হয়। অন্যথায়ও একই ব্যবস্থা। তবে সেক্ষেত্রে পরে আনিলেই হইবে।</p>



<p>রাজ্যের অন্যান্য প্রজারাও রোদন করিতে করিতে উহাদেরই সঙ্গে বধ্যভূমি-অভিমুখে যাত্রা করিল। শ্মশানে তুষাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইল। এখনই যেন প্রহরীগণ স্মৃতিকুমারকে সেই অনলকুণ্ডে ফেলিয়া দিবে।</p>



<p>অন্তিম মুহূর্তে সেই সমুজ্জ্বল অগ্নিশিখা দেখিয়া স্মৃতিকুমার সহসা বলিয়া উঠিল, ‘এই বারাণসীতে কি কোনো লোক বাস করে? অথবা এই রাজ্য মনুষ্যশূন্য?’ &nbsp;</p>



<p>অমনি কাড়া-নাকাড়া-বাদ্য-ঢাক-ঢোল তুমুল শব্দে বাজিয়া উঠিল। রাজপুত্র জীবনে এই প্রথম কথা কহিয়াছে। আনন্দিত জনতা স্মৃতিকুমারকে লইয়া রাজসভায় ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে সেই সুসংবাদ দিল।</p>



<p>কিন্তু ফিরিবার পর আবার যেই-কে-সেই অবস্থা। স্মৃতিকুমার এখন আর কথাও কহিতেছে না। গমনাগমনও করিতেছে না। সেই একই তুষ্ণীম্ভাব ধরিয়া বসিয়া আছে। বধ্যভূমিতে যাহা বলিয়াছিল, সেই একবারই একটি মাত্রই কথা, তাহার পর আর নাই।&nbsp;</p>



<p>রাজা পুনরায় আদেশ দিলেন, উহাকে বধ্যভূমিতে লইয়া গিয়া বধ করিয়া ফেলিতে। পুনর্বার রাজপুত্র স্মৃতিকুমারকে লইয়া বিপুল জনতা বধ্যভূমির দিকে যাত্রা করিল।</p>



<p>শ্মশানে প্রবেশ করিবার মুখে একটি শবদেহ পড়িয়াছিল। মৃত সেই ব্যক্তির মুখপানে চাহিয়া স্মৃতিকুমার আধোমনস্ক স্বরে বলিয়া ফেলিল, ‘এই ব্যক্তি কি মরিবার পরে মরিয়াছে? নাকি মরিবার পরে বাঁচিয়া রহিয়াছে?’</p>



<p>কথার অর্থ কী, কে জানে! তবুও তো কথা! রাজপুত্র মুখ খুলিয়াছে। পুনরায় সকলে ঢাকঢোল বাজাইয়া আনন্দ করিতে করিতে রাজসভায় ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে সুসংবাদ দিল, ‘আবার রাজপুত্র কথা কহিয়াছেন!’&nbsp; &nbsp;</p>



<p>কিন্তু এইবারও সেই একই ঘটনার পুনরাভিনয় হইল। শ্মশানে স্মৃতিকুমার মুখ খুলিয়াছিল বটে, কিন্তু পিতার সমীপে আসিয়া বহু অনুরোধ সত্ত্বেও আর মুখ খুলিল না। রাজা ভাবিলেন, কেন এইরূপ করিতেছে? ভাবিয়া ভাবিয়া কোনো উত্তর পাইলেন না। শেষে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। এবার আর নকল মৃত্যুদণ্ড নহে। ক্রুদ্ধ রাজা ব্রহ্মদত্ত পুত্র স্মৃতিকুমারকে সত্য সত্যই এইবার মৃত্যুদণ্ড দিয়া উঠিয়া গেলেন। সকলে স্মৃতিকুমারকে লইয়া শ্মশানাভিমুখে বাহির হইয়া গেল। নির্বিন্ন রাজাও রাজসভা হইতে উঠিয়া গিয়া আত্মহননের পরিকল্পনা করিলেন। জীবন বিস্বাদ, সংসার বিস্বাদ, নিজেই নিজের পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়া মহাপাপ করিয়াছেন। আর বাঁচিয়া কী হইবে? &nbsp;</p>



<p>এদিকে স্মৃতিকুমারকে লইয়া জনসারণী শ্মশানের পথ ধরিয়া চলিতেছে। পথিপার্শ্বে দিগন্তস্পর্শী শস্যক্ষেত্র। ধান ফলিয়াছে খুব। জীবধাত্রী ধরিত্রীর গর্ভকুহর হইতে স্বর্ণাভ ধান্যশিশুগুলি সমুদ্‌গত হইয়া নিখিল জীবনিবহের জঠরকুহর পরিপূর্ণ করিবার জন্য যেন উৎসুক হইয়া রহিয়াছে। সেই দিকে তাকাইয়া আপনমনে স্মৃতিকুমার বলিয়া উঠিলেন, ‘ইহারা একবার ভুক্ত হইয়া পুনরায় ভুক্ত হয়!’</p>



<p>অসংলগ্ন কয়েকটি শব্দ। হউক অসংলগ্ন, তবুও তাহারা উচ্চারিত হইয়াছে। আনন্দিত জনতা কুমারকে লইয়া রাজপুরীতে ফিরিল। রাজা ব্রহ্মদত্ত বিষপাত্র ওষ্ঠে স্পর্শ করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় কুমারকে লইয়া উল্লসিত প্রজাদের ফিরিয়া আসিতে দেখিলেন।</p>



<p>তিনি বলিলেন, ‘উল্লাসে কী লাভ? কুমার তো তোমাদের সম্মুখে কথা কহিতেছে, অথচ আমার নিকটে আসিলেই নিশ্চুপ। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ভালো লাগে না। আমার সহিত রাজপুত্র কথা কহিবে না!’</p>



<p>তখন সকলকে অবাক করিয়া দিয়া স্মৃতিকুমার পিতার উদ্দেশে বলিয়া উঠিল, ‘পিতঃ! আপনারও সহিত বাগ্‌বিনিময় করিব। আপনারও সম্মুখে গমনাগমন করিব। যদি কথা দেন&#8230;’</p>



<p>বিষপাত্র এক পার্শ্বে নিক্ষেপ করিয়া রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কী কথা?’</p>



<p>‘যদি কথা দেন, আমি যাহা চাহিব, আপনি তাহাই আমাকে দিবেন।’</p>



<p>রাজা অশ্রুপরিপ্লুত স্বরে বলিলেন, ‘পুত্র! পুত্র! তোমাকে অদেয় আমার কী আছে? তুমি যাহা চাহিবে, তাহাই দিব। আগে বলো, কেন এতদিন কথা কহ নাই? কেন এতদিন চলাচল করো নাই?’&nbsp;</p>



<p>অতি শান্ত স্বরে স্মৃতিকুমার উত্তর দিল, ‘পিতঃ! আমি আমার পূর্ব পূর্ব সকল জন্মের সুস্পষ্ট স্মৃতি লইয়াই এইবার জন্মিয়াছিলাম। আমি জাতিস্মর। পূর্বজন্মে আমি রাজা ছিলাম। ষাট বৎসর রাজ্যভোগ করিয়াছিলাম। তাহার ফলে মৃত্যুর পরে ষাট সহস্র বৎসর আমাকে নরকবাস করিতে হয়। রাজকীয় উপভোগ এমনই ভয়ানক। এই কথা মনে পড়াতে আমি জন্মমুহূর্তেই স্থির করিয়াছিলাম, আমি মূকবৎ, পঙ্গুবৎ আচরণ করিব। তাহা হইলে আপনি আর আমাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিতে পারিবেন না।’</p>



<p>রাজা বলিলেন, ‘হা পুত্র! এ কী শুনাইলে? তাহা হইলে আমাদের ন্যায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কী পরিণতি হইবে? আচ্ছা, সে সকল কথা পরে ভাবিব। কিন্তু তাহার আগে বলো দেখি, শ্মশান-অভিমুখে গতবান তুমি ওইরূপ অসংলগ্ন তিনটি কথা বলিয়াছিলে কেন? উহাদের অর্থ কী?’&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>রাজপুত্র হাসিমুখে বলিল, ‘ও সকল কথা অসংলগ্ন নহে। উহাদের অর্থ আছে। বধ্যভূমিতে নীত আমার জন্য যখন তুষাগ্নি জ্বলিল, তখন বলিয়াছিলাম, বারাণসীতে কি কোনো লোক বাস করে, অথবা এই রাজ্য মনুষ্যশূন্য? যে-রাজ্যে মূক বা পঙ্গু হওয়ার অপরাধে নির্দোষ এক কিশোরকে রাজা মৃত্যুদণ্ড দেন, আর তাহা শ্রবণ করিয়াও প্রজারা বিদ্রোহ না-করিয়া রাজার এবম্বিধ অন্যায়-আদেশ পালন করিতেই উদ্যত হয়, সেই রাজ্যে বসবাসকারীরা কি মনুষ্য পরিচয়ের যোগ্য? উহারা তো পশ্বাধম! দ্বিতীয়বার একটি মৃতদেহ দেখিয়া বলিয়াছিলাম, এই ব্যক্তি কি মরিবার পরে মরিয়াছে, নাকি মরিবার পরে বাঁচিয়া রহিয়াছে? মানুষ দুইপ্রকার। এক ধরনের মানুষ মরিবার পূর্বেই মরিয়া যায়। উহারা অবিবেকী, অনাচারী ব্যক্তি। আরেক ধরনের মানুষ জীবৎকালেই এমন কীর্তি রাখিয়া যায়, যাহার ফলে মৃত্যুর পরেই তাহাদের প্রকৃত জীবন আরম্ভ হয়; কীর্তির ভিতর দিয়া, কল্যাণকামনার ভিতর দিয়া সকল নরনারীর হৃদয়ে তাঁহারা চিরজীবিত থাকেন। তৃতীয়বার অবারিত ধান্যসম্পদ দেখিয়া বলিয়াছিলাম, ইহারা একবার ভুক্ত হইয়া পুনরায় ভুক্ত হয়। ধান্য উৎপন্ন হইলে বহুলাংশে তাহা খাদ্যদ্রব্যরূপে জীবকুলের দ্বারা ভুক্ত হয়। অবশিষ্টাংশ ভালো জাতের ধান হইতে বীজ প্রস্তুত করা হয়, যাহা পরবর্তীকালে কৃষিক্ষেত্রে রোপণ করা হয়। অনুরূপভাবে প্রতিটি মানুষ ইহজন্মে পূর্ব পূর্ব জন্মার্জিত কর্মের ফল ভোগ করে, একই সঙ্গে বর্তমান জন্মে যেসব কর্ম করে তাহাই সঞ্চিত থাকিয়া তাহাদের ভাবী জন্মে ফলপ্রসূ হয়। জীব জন্মে জন্মে কর্মভোগ করিয়া চলে। ইহারই সহিত আমি ধান্যসম্পদের তুলনা করিয়াছি।’&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>সভাস্থ সকলে ‘সাধু সাধু’ করিয়া উঠিল। রাজা বলিলেন, ‘অসীম সৌভাগ্যে তোমার ন্যায় পুত্র পাইয়াছি। বলো পুত্র, কী তোমার অভীষ্ট? পূর্বশর্তানুসারে যাহা চাহিবে, তাহাই দিব।’</p>



<p>স্মৃতিকুমার উত্তর দিল, ‘তাত! আপনি আমাকে প্রব্রজ্যা গ্রহণের অনুমতি দিন!’&nbsp;</p>



<p>এই কথায় নিতান্ত শোকাহত হইয়া রাজা কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘কী বলিতেছ, পুত্র? তুমি যে আমার রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী! তোমার ন্যায় প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিই রাজ্যশাসনে সর্বপ্রকারে উপযুক্ত নয় কি?’</p>



<p>স্মৃতিকুমার বলিলেন, ‘আমি প্রজ্ঞাবান কিনা, জানি না। তবে এ জগতে যাঁহারা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান, সন্ন্যাস তাঁহাদেরই জন্যে। তাঁহারা সকলই পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া স্থির করিয়াছেন, সমস্তই নশ্বর ও দুঃখপ্রদ। তাঁহারাই সব পরিত্যাগ করিয়া নির্বাণের অনুসন্ধান করিয়া থাকেন। আর যাঁহারা অনেক ভুগিয়াও এ জগতের আশা পরিত্যাগ করিতে পারেন না, তাঁহাদের জন্যই জাগতিক উপভোগ। তাঁহারা পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মের ফল ভোগ করিয়া পরবর্তী জন্মের কর্মভোগের বীজ বুনিয়া যান। মধ্যে মধ্যে স্বর্গ বা নরক ভোগ হয়, তাহাতেও তাঁহাদের চেতনা হয় না। আবার আসিয়া এই ভবচক্রে ঘুরিতে থাকেন। পিতঃ! আমার ইতোমধ্যেই বিলম্ব হইয়া গিয়াছে। আমি চলিলাম।’</p>



<p>এই বলিয়া স্মৃতিকুমার রাজা, রাজ্য, প্রজা সমস্ত ফেলিয়া প্রব্রজ্যার পথে বাহির হইয়া গেল। অতি নির্জন স্থানে এক বনভূমিতে সুকঠিন তপ আরম্ভ করিল।&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>তাঁহার দেখাদেখি ছয় অমাত্যপুত্রও সেই বনে আসিয়া উপস্থিত হইল। স্মৃতিকুমার তাহাদের ফিরিয়া যাইতে বলিল। কিন্তু তাহারা শুনিল না। তখন তাহাদিগকে স্মৃতিকুমার দূরে রাখিতে লাগিল। তাহাদের সংশ্রব স্মৃতিকুমার পরিত্যাগ করিবার চেষ্টা করিল। তথাপি সেই অমাত্যপুত্ররা স্মৃতিকুমারকে ছাড়িল না। একত্রে তপস্যা করিতে আরম্ভ করিল।”</p>



<p>এই পর্যন্ত বলে তথাগত কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে শাক্যপুত্রীয়দের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বহু কল্পপূর্বের এই সর্ববৈনাশিক গল্পটি কেমন শুনিলে? ভালো লাগিল? কিছু কি মনে পড়িল তোমাদের?’</p>



<p>এরই মধ্যে তথাগত-প্রচারিত ত্যাগবৈরাগ্যের ভাবটিকে সংসারী লোকেরা বিদ্রূপভরে ‘সর্ববৈনাশিক’ বলে ডাকতে আরম্ভ করেছে। এ ত্যাগবৈরাগ্য কিনা সর্বনাশা, সংসারে আগুন লাগিয়ে দেয়। সে-কথা তথাগত-র কানেও উঠেছে। তাই স্বকথিত আখ্যানটিকে ‘সর্ববৈনাশিক’ বলে খানিক মজা করলেন তিনি। &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনুরুদ্ধ ছাড়া অন্য পাঁচজন শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু তাঁদের মনের ভিতরে অনেক তোলাপাড়া করেও এ আখ্যানের কণামাত্রও মনে করতে পারলেন না। কিন্তু অনুরুদ্ধ ব্যতিক্রমী; গল্প শুনতে শুনতে তাঁর মনের মধ্যে কী যেন ছায়া ছায়া আকার, অস্পষ্ট সব ঘটনাপুঞ্জ চোখের পাতার উপর রেণু রেণু অক্ষিরোমের মতো ভেসে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতন খেয়াল হল তাঁর, আরে, এ ঘটনা যে তাঁর বহুপরিচিত! এতদিন কীভাবে যে ভুলে গেছিলেন!&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>তথাগত হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অনুরুদ্ধ! তুমি কি কিছু বলিতে ইচ্ছা করো?’&nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনুরুদ্ধ উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, ভগবন! এখন আমার সম্যক মনে পড়িয়াছে। বহু কল্পপূর্বে আপনিই ছিলেন সেই স্মৃতিকুমার। আর আমরা ছয়জন ছিলাম আপনারই অনুসারী সেই ছয় অমাত্য পুত্র&#8230;’ &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>অনুরুদ্ধর কথা শেষ হল না, তার আগেই জম্বুবৃক্ষ থেকে ঝরঝর করে কতগুলো শুকনো পাতা চৈত্রপবনে স্খলিত হয়ে মাটির উপর খসে পড়ল। হয়তো এ জন্মের মতো প্রাণোর্মি শেষ হল তাদের, এর পর সৃষ্টির কোনো পুনঃপ্রবাহের বীজের ভিতরে মিশে গিয়ে সম্মুখে আরও সম্মুখে ভাবী কোনো জন্মে বুদ্ধত্বের দিকেই শুষ্ক পত্ররাশির অনিবার্য অভিযাত্রা।&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>



<p>(সূত্র: বোধিসত্ত্বাবদান-কল্পলতা, সপ্তত্রিংশ পল্লব) &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/smritikumar-sanmatrananda/">স্মৃতিকুমার</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/smritikumar-sanmatrananda/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>যাদের ফেরা হয়নি কোথাও</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 05 Oct 2026 11:50:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Galpo]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11287</guid>

					<description><![CDATA[<p>কথা মাঝপথে থামিয়ে উপরের পাটির দাঁত দিয়ে অধর সামান্য চেপে ধরে বলেছিল, ‘কেন, তোমাদের স্কুলের পত্রিকা আমি পড়তে পারি না?’...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/">যাদের ফেরা হয়নি কোথাও</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>সায়ন্তন ঠাকুর</strong></p>



<p>আর রোদ্দুরে রোদ্দুরে উথলে উঠত আকাশ। ওই যে গান আছে না—‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’, পরমুহূর্তে ঠিক এক কি দুই সেকেন্ডের ক্ষণিক বিরতির পর আবার, ‘দেখি নাই কভু, দেখি নাই, এমন তরণী বাওয়া’; তখন এই দুই পঙক্তির মাঝখানে যে রৌদ্র ও অমলিন মেঘছায়ার কাহিনি গড়ে ওঠে, অবিকল তেমন আলো প্রেমে, আরও প্রেমে হারিয়ে যেত নীলিমায়! ওই বিরতি সবার গলায় কিন্তু রৌদ্র হয় না, তাঁর কণ্ঠ বরষা শেষের আকাশকে ধুয়ে মুছে তকতকে করে তুলত, বাতাসে মিশিয়ে দিত মিহিন আতর আর পুরাতন ভাঙা বাড়ির জংলা বাগানে একপাশে সবার অলক্ষ্যে হেলে-পড়া পাঁচিলে ভর দিয়ে বেঁচে থাকা অপরাজিতা লতা থেকে ঝরে পড়ত গাঢ় বেগনে-রঙা ফুল, অবিরল। লোকটির নাম অমিয় মুকুজ্জে, লোকে বলে ওমিয়বাবু। শরিকি বাড়ির পেছনের অংশে একদিকে দেড়খানি হতদরিদ্র ঘর, চলকা-ওঠা লাল বারান্দা, উঠোন, একফালি কলঘর নিয়েই ছিল ওমিয়বাবুর সংসার, সংসার মানে পরিবার-পুত্র নয়, একা মানুষের নিরালম্ব গেরস্থালি।</p>



<p>আজ থেকে আঠাশ ত্রিশ বছর আগে উত্তর বাংলার মিজমিজে সেই মফফ্‌সলে তিনি ছিলেন গানের মাস্টারমশাই, ছাত্র-ছাত্রী যে খুব আসত তেমনটা নয়, ওই দু’চারজন, শনি রবিবার সকালের দিকেই আসত তারা। তেমনই এক শনিবার আমি ওই বাড়ির সামনে পড়ে থাকা নিঝুম গলিপথে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় শুনলাম ভেসে আসছে বিরতিসহ ‘এমনও তরণী বাওয়া’।</p>



<p>গলির পাশেই ওমিয়বাবুদের শরিকি বাড়ির পেছন-পাঁচিল, সেইখানে হেলান দিয়ে অপরাজিতা লতা থেকে তখন খসে পড়ছে আহ্লাদি সব বেগনে ফুল। খুব বেশি হলে সকাল সাতটা কি সাড়ে সাতটা, উত্তর বাংলার প্রবাদপ্রতিম বর্ষা আসি আসি বলেও দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও তার পিরিত স্তিমিত হওয়ায় আকাশ ঝলমলে, কিশোরীর দুই-বিনুনির মতন উচ্ছ্বল খণ্ড মেঘেদের গায়ে সাদা নতুন জামা, পুবদিক থেকে আসা শারদীয়া আলোয় জগত যেন রূপনগরের হাট থেকে সদ্য কিনে আনা মনমুকুর।</p>



<p>সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, অপেক্ষা করছি কখন তরণীর পিছু পিছু আসে ‘কোন্‌ সুদূরের ধন’, এক মিনিট দুই মিনিট কিন্তু সে আর আসে না, ওমিয়বাবুর নৌকো ঘাটেই আটকে পড়েছে কারণ গলা মিলিয়েছে একটি কিশোরী! যথারীতি সুর ভুল করায় গান থামিয়ে ওমিয়বাবু বলছেন, ‘এমুনডা হইলে তুমার গান হইব না, বারবার বলতাসি এমনো-ও-ও, এমনো-ও-ও, কোমল কোমল, কোমল নি এইখানডায়, বুঝতাসো না ক্যান? তোমার তো শুনি অঙ্কে খুব মাতা, তা এইডাও তো অঙ্ক, নাও, ধরো দেহি আমার সাথে’।</p>



<p>কিশোরীর নাম আমি জানি, শবনম্‌, ভুটুর দিদি, আমাদের ক্লাসেই পড়ে, সামনের বছর আমাদের উচ্চমাধ্যমিক কিনা, তাই বায়োলজি মাস্টারমশাই সঞ্জয় চক্রবর্তী স্যারের সন্ধের ব্যাচে সদ্য ভর্তি হয়েছে। বায়োলজিতে খুব একটা ভালো নয়, সেই কারণেই আমাদের ইস্কুলের সঞ্জয় স্যারের কাছে আসা, ওঁর কাছে পড়ে এই মফফ্‌সলে প্রায় সবাই উচ্চমাধ্যমিকে লেটার না পেলেও একশো কুড়ি-তিরিশ নম্বর পায়, একেবারে ধরাবাঁধা, এমনই ভালো পড়ান। শবনম্‌দের ইস্কুলও বেশ নামকরা—বার্লো গার্লস হাই ইস্কুল, মহানন্দা যেতে ডান হাতে পড়ে, ওই দিকে ইস্কুল ছুটির পর আমাদের সাইকেলগুলি কী জানি এক অজানা কারণে প্রায়শই পথ ভুল করে চলে যায়!</p>



<p>এখানে অবশ্য তেমন কিছু হয়নি, আমি প্রতিদিনই যাতায়াতের পথে এই বাড়ির সামনে একটু থামি, শনি-রবিবার বাদে গানের ইস্কুল না থাকলেও ওমিয়বাবু একা একাই সকাল কি নিভু সন্ধ্যায় হারমোনিয়াম নিয়ে বসেন, গানের কথা ও সুর তখন মধুমাসে শালফুলের রেণুর মতন বাতাসে আপনমনে ভেসে বেড়ায়। আজ জরাজীর্ণ পাঁচিলের ফাটলের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে লকলকে আগাছা, কচু আর বনতুলসী গাছে ভরে আছে মুকুজ্জেদের কবেকার বাগান, দিনের প্রথম রাঙা আলোয় থলকমল গাছের মাথায় একলা বসে আছে বসন্তবৌরী পাখি, কয়েকটা ঘুঘু পুরাতন ভিটা থেকে এই সকালেও একটানা মন্দ্র ও করুণ স্বরে ডেকে চলেছে। শবনমের ছুটি হবে কিছুক্ষণ পর, গাঢ় নীল সাইকেল চালিয়ে তারপর সে চলে যাবে এই শহরের আরও উত্তরে, তখন তাকে দেখাবে একটি উজ্জ্বল স্মৃতির মতন—কালো লং স্কার্ট সাদা ব্লাউজ, ফিনফিনে নাক, ঘাড় অবধি কাটা বুনো ঘোড়ার কেশরের মতন ঘন রেশমী বাদামী চুলে সে নিজেই যেন এই শান্ত মফফ্‌সলের একটি তীব্র পলাশ ফুল।</p>



<p>দু’একবার মাত্র কথা হয়েছে, দিন কয়েক আগে সন্ধেয় বায়োলজি টিউশন পড়ে বেরিয়ে আসার সময় স্যারের বাড়ির গলির মুখে সাইকেল থামিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল, ‘লেখাটা খুব ভালো হয়েছে কিন্তু!’</p>



<p>সবার সামনে থতমত খেয়ে অবাক গলায় শুধিয়েছিলাম, ‘কোন্‌ লেখা?’</p>



<p>‘ইস্কুল ম্যাগাজিনের লেখাটা! পিয়ের দ্য ফার্মাকে নিয়ে, ভালো হয়েছে!’</p>



<p>‘আমাদের ইস্কুলের ম্যাগাজিন? সেটা তোমার মানে তোর কাছে’</p>



<p>কথা মাঝপথে থামিয়ে উপরের পাটির দাঁত দিয়ে অধর সামান্য চেপে ধরে বলেছিল, ‘কেন, তোমাদের স্কুলের পত্রিকা আমি পড়তে পারি না?’</p>



<p>হলদে ল্যাম্পপোষ্টের ঝুঁঝকি আলোয় চেনা গলি তখন ছায়ার আপন সহোদরা, রহস্যময়ী যৌবনবতী; মাথার উপর শরতের নির্মেঘ আকাশে ভেসে চলেছে খণ্ডমেঘ, যেন বা দূর কোনও দেশের যাত্রী, ঝিমিঝিম বাতাসে রাত-মাধবীর সুবাস; উত্তর না দিতে পেরে ফ্যাকাশে হাসায় ঈষৎ কৌতুকের স্বরে বলল, ‘অনিন্দ্যদা তোমাকে একটা বই দিতে বলেছে!’</p>



<p>অনিন্দ্যদা মানে, অনিন্দ্য পুরকায়স্থ, আমাদের ইস্কুলে সদ্য জয়েন করেছেন। ইংরাজির মাস্টারমশাই, একেবারেই অল্পবয়সী বলে আমরা সবাই স্যর বলি না, তিনিই অবশ্য এমন বলেছেন। কিন্তু অনিন্দ্যদা বই দিতে বলেছে শবনমকে…মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমাকে? অনিন্দ্যদা?’</p>



<p>‘হ্যাঁ! বলল তো, আমার পড়া হয়ে গেলে তোমাকে দিতে, তুমি নাকি পড়তে চেয়েছিলে!’</p>



<p>মনে পড়ল ক’দিন আগে একটা কবিতার বই অনিন্দ্য’দার কাছে চেয়েছিলাম বটে, কিন্তু সেটা ওকে দিতে বলবে কেন? আশ্চর্য!</p>



<p>আমাকে চুপ থাকতে দেখে ফের বলল, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি! পড়তে চেয়েছিলে তুমি। পরেরদিন নিয়ে আসব, আর একটু পড়া বাকি আছে, নিয়ে যেও।’, বলেই আর না দাঁড়িয়ে সাইকেলে উঠে প্যাডেলে চাপ দিল, এক পা এগিয়ে কী মনে হওয়ায় মুখ ফিরিয়ে একবার হাসল শুধু! হতবাক আমি ম্লান বিস্রস্ত আলোয় খেয়াল করলাম শবনমের একটি গজ-দাঁত আছে আর হাসলে সেটি কোনও মুদ্রাদোষের মতনই তাকে কিশোরী থেকে আকস্মিক যুবতি করে তোলে।</p>



<p>সেই বই পেলাম আরও কিছুদিন পর, তখন আমাদের ছোট্ট শহরে ঝমঝম শব্দে পুজো বেজে উঠেছে। সেবার মনে আছে, এই বছরের মতনই শেষ আশ্বিনে পুজো; বাংলার উত্তরদিকের চৌকাঠে তখন হেমন্ত অপেক্ষারতা, পুজো শেষ হলেই সে অস্তমিত দরিদ্র অপরাহ্ণ, পীতবর্ণা স্বল্পায়ু আলোর দিন আর অকারণ মনখারাপের আঁচল রুক্ষ ধুলাবাতাসে উড়িয়ে মাত্র কয়েকদিনের জন্য আমাদের কাছে বেড়াতে আসবে!</p>



<p>উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে বলেই ওইবছর পুজোয় আমাদের দেশের বাড়ি যাওয়া হয়নি, পুজোতেও ছিল কড়া বিধিনিষেধ কিন্তু সেসব নিয়মের ফাঁক কেটে সপ্তমীর সকালে দেখা হয়ে গেল। তখন তো ‘আমাদের-তোমাদের, সনাতনী পুজো, লাভ জিহাদ’ এসব ছিল না, ফলে পুজোমণ্ডপে শবনম্‌রা আসত, তাদের কেউ সন্দেহের চোখেও দেখত না আর পুষ্পাঞ্জলির সময়েও দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের ঘরের মেয়ে দুগ্‌গা বচ্ছরকার দিনে কিচ্ছু মনে না করে বরাভয়ের হাসি মুখে নিয়ে কেমন ভালোবেসে তাকিয়ে থাকতেন; আজও নিশ্চয় থাকেন শুধু আমাদের চোখেই এক বিজাতীয় গেরুয়া রঙের দ্বেষ-চশমা ইদানীং উঠে এসেছে।</p>



<p>মণ্ডপ থেকে বেরোনোর মুখেই দেখা, একটা আসমানি শাড়িতে ভারি মানিয়েছে, সঙ্গে লিলি ফুলের মতন এ-ওর গায়ে হাসিতে ঢলে পড়া মেয়েরাও ছিল। আমাকে দেখে তীব্র উচ্ছ্বল আকাশ-আলোকে ম্লান করে সেই গজদাঁতে সাজানো হাসি বলে উঠল, ‘এই তো! তোমার দেখাই যে পাওয়া যায় না! বইটা নেবে না?’</p>



<p>‘বই?’</p>



<p>‘হ্যাঁ! নেবে না?’, একমুহূর্ত কী যেন ভেবে ফের বলল, ‘কাল আসবে?’</p>



<p>আমার সঙ্গে প্রীতম ছিল, তার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে শুধোলাম, ‘এখানে?’</p>



<p>‘এখানে? হ্যাঁ, এখানেও আসতে পারো, নাহলে তোমাদের পাড়ায়, ওমিয়বাবুর বাড়ির সামনে বাঘাযতীন ক্লাবের পুজোর মাঠে, কাল ও-পাড়ায় যাব তো আমি!’</p>



<p>‘সকালে?’</p>



<p>‘না না, সন্ধেয়, কাল তো অষ্টমী, সন্ধেয় আসব।’</p>



<p>প্রীতম পাশ থেকে বলার চেষ্টা করল, ‘কাল সন্ধেয় তো আমরা’, আমি তাড়াতাড়ি কথা দিয়ে ওকে থামিয়ে বললাম, ‘বেশ তো, কাল সন্ধে, এমনিও ওখানেই থাকতাম!’</p>



<p>কিছু বুঝল কিনা কে জানে, অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল সামলে ফের ঝিলমিলিয়ে উঠল হাসি, গাঢ় চুল কপালের উপর থেকে আলগোছে একবার হাত দিয়ে সরিয়ে শরতের সকল আয়ুধ নিমেষে নিষ্ক্রিয় করে বলল, ‘ভুলে যেও না আবার!’</p>



<p>স্পষ্ট মনে আছে অষ্টমী ছিল পয়লা কার্তিক, সেই পতনোন্মুখ শিশির-সন্ধ্যায় আলোফুল আর সন্ধিপুজোর সমারোহের মাঝেই কালো শাড়ির মায়াচ্ছন্ন আঁধারে নিজেকে সাজানো অষ্টাদশী দীর্ঘাঙ্গী আমার হাতে তুলে দিয়েছিল ওই বিষাদদ্রষ্ট কৃশকায় বইখানি, চিরকালের হেমন্তিকা যার পাতায় পাতায় অলীক এক অক্ষর কলোনি গড়ে তুলেছিল অনেক আগেই। বই হাতে নিয়ে পাতা উলটে দেখলাম উৎসর্গপত্রে ‘বুদ্ধদেব বসু’র নামের নীচে ছোট ছোট বাদামী অক্ষরে লেখা আছে—‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–পঁচিশ বছর পরে!’</p>



<p>আর কিচ্ছু নাই, নিজের নাম-আমার নাম কিচ্ছুটি নয়; হঠাৎ সেই মানুষের ভিড়ে এলোমেলো সন্ধ্যায় মনে পড়ল, এই বই তো অনিন্দ্য’দার, তাহলে এইটা লিখল…মুখ তুলে চাইলাম, আমার মন পড়তে পেরেই বোধহয় শবনম্‌ আলতো সুরে আমার কানের কাছে মুখ এনে সরগরম মাঠের শব্দ-ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সন্তর্পণে বলল, ‘এইটা অনিন্দ্য’দার বই নয়!’, একমুহূর্তের বিরতি মাত্র, ‘আমি নতুন কিনেছি, তোমার জন্য!’</p>



<p>বাতাস বইছিল তখন মিহিন, উত্তরপথগামী সেই বাতাসে চোরা শীতটান, ফিস্‌ফিসিয়ে বলছিল আমাদের দুজনকে, আর তোমাদের কখনও এখানে ফেরা হবে না!</p>



<p>এমনই কি ছিল সেই সন্ধ্যা? শেষবার মাঠের উপর ওই যুগন্ধর কবির ধূসর পাণ্ডুলিপির আয়োজন মেনেই কি সত্যি আমাদের দেখা হয়েছিল? স্পষ্ট কথায় এর উত্তর দেওয়া যায় না। শবনমের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার অনেক অনেকবার; মহানন্দার জলে সন্ধ্যা যখন গাঢ় হয়, অস্তমিত হেমন্তে আকাশে চল্‌কে পড়ে স্মৃতি-রঙের কৌটো, চৈত্রে আকুল বিবাগী ধুলাচ্ছন্ন মেঘ-বাতাসে অথবা পৌষের ম্লান ঝাপসা আলো-কুয়াশাচ্ছন্ন দ্বিপ্রহরে আমাদের দেখা হত। একটি নীল ও কালো সাইকেল পরস্পরের যাত্রাপথ কাটাকুটি করে পৌঁছে যেতে চাইত দূর দিকচক্রবালরেখা পার হয়ে অন্য কোনও ভুবনে, যেখানে সময়-গাড়ির গতি মন্থর, দিগন্তবিথারি অলৌকিক মাঠে যখন হারিয়ে গেছে অতীত-ভবিষ্যত-বর্তমানের চলন নিয়ন্ত্রণকারী কালরেখা দণ্ড।</p>



<p>তাই পাঠক ও পাঠিকা, আপনার কৌতুহলের উত্তর এক-কথায় দেওয়া অসম্ভব। আপনার মনে হতে পারে, তারপর? তারপর কী হল? যেমন সব কাহিনির একটা ‘তারপর’ থাকে, সেই নিয়ম মেনেই আপনার ওমনধারা কৌতুহল হতেই পারে। সেটিই স্বাভাবিক।</p>



<p>কিন্তু এই আখ্যানে তারপর আর কিছুই নাই!</p>



<p>উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবার চাকরিস্থল বদলে যায়, ওই শহর ছেড়ে আমরাও চলে আসি, চলে আসি চিরতরে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন আমার সঙ্গে শবনমের শেষবার দেখা হয়, ওই নদীর ধারে, তখন নির্জন ঘাটের কিনারে মুখ নীচু করে বহমান জলমুকুরে নিজের ছায়াছবি দেখার জন্য উৎসুক প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের শরীর থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ছিল দুটি একটি জীর্ণ পাতা। ক’দিন আগে ওমিয়বাবুর কাছে শেখা একটি গান আনমনে ফুটে উঠছিল শবনমের গলায়&#8211;তারায় করিব কর্ণের দুল, জড়াব গায়েতে অন্ধকার!</p>



<p>‘সন্ধ্যার মেঘে ভরিব দুকূল’ গাওয়ার সময় তার মুখে এসে পড়েছিল পশ্চিমের আলো, সেই আলোয় মিশে ছিল হত্যা দৃশ্যের রঙ। ঘাটে বাঁধা একখানি তরণী দুলছিল মন্দ মন্দ, ছায়া ভাসছিল আপন সহোদরার মতন। কে সত্যি, ছায়া নাকি তরণীর কায়া, সেদিন আমি স্থির করে উঠতে পারিনি। সেই তরণী, যা বাওয়ার আগে ওমিয় মাস্টারের গলায় ফুটে উঠত পুজোর ছুটির নিমন্ত্রণ-রোদ্দুর।</p>



<p>&nbsp;ওই দিনের পরেও তো বয়ে গেছে ছাব্বিশ-সাতাশ বছর, আর কখনও সেই মফ্‌ফসলে ফিরে যাওয়া হয়নি। পুজো আসে আবার নিজের নিয়মে চলেও যায়। ইদানীং কলকাতার উত্তর শহরতলীর যে পাড়ায় থাকি সেখানে অত জাঁকজমক নাই, থিমপুজো নাই, ওই সাবেক চালের দু’একটি পুজো হয়। আমি একদিন সকালে স্নান করে দেবীমুখ দর্শন করে আসি, তারপর বাড়িতেই কেটে যায় চারটে দিন। পুত্রের ক্যাপ-বন্দুক ফাটানোর উৎসাহও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তে, ফলে সেসব কিনে আনার বায়নাও আর নাই। এখন তো বাঙালি বোধহয় পুজোয় নতুন জামাকাপড়ও খুব একটা কেনে না, সারাবছর ধরেই চলতে থাকে তাদের কেনাকাটা, বাজারহাট। তবে অস্বচ্ছল পরিবার এখনও বোধহয় চেয়ে থাকে পুজোর জামার দিকে, তাদের হাতেই বা পয়সা কই!</p>



<p>মাঝে মাঝে পুজোর আগে কাছেই স্টেশন বাজারে যাই, ছোট ছোট সব জামাকাপড়ের দোকান, ঝুটো গয়না-সাজগোজের দোকান, ভিড় অবশ্য খুব একটা হয় না। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি সেসবের দিকে; মুখে মেচেতার দাগ নিয়ে বাড়ি ফেরে যে মেয়েটি সারাদিন কলকাতায় কোনও দোকানে কাজ সেরে, দিনভর হকারি করে ট্রেনে থেকে ঘরে ফেরে যে ক্লান্ত যুবক, মাছ-সবজি-ফল বিক্রি করে দিনান্তে বসিরহাট-বনগাঁ-গোপালপুর-ঠাকুরনগরে ফিরে যায় যে সব মানুষ-মানুষী তাদের দিকে চেয়ে থাকি। ওদের পুজো কোন্‌ রঙের কৌটো উপুড় করে আলো ও বাতাস নিয়ে আসে? নতুন জামা হয়? দু-একটা ভালো-মন্দ রান্না পুজোর দিনে? এখন তো শুনছি পুজোর পর ইস্টিশানে হকারি, ট্রেনে হকারি সব বন্ধ হয়ে যাবে। ওসবে বাবু-বিবিদের নাকি খুব অসুবিধা হয়! ডিজিট্যাল ইন্ডিয়ার বিশাল গ্লো-সাইন বোর্ডের নীচে মোল্লাহাটি-রুদ-সিমলিপাল-অকসি গ্রামের চিরকালের জংলা ভারতবর্ষ একেবারেই বেমানান।</p>



<p>তবুও পুজো আসে, প্রকৃতিদেবী আমাদের সুখ-দুঃখে চির-উদাসীনা। তিনি নিজের নিয়মেই বর্ষণক্ষান্ত দ্বিপ্রহরে আকাশের সুনীল বসতবাটিতে ছড়িয়ে দেন একমুঠি রৌদ্র ও পলাতক বালকের মতন মেঘ, অলীক রুহ্‌ আতরদানির জলে জাগিয়ে তোলেন অমলিন কমলা-সাদা ফুলের সাজি, ঝরঝর বাতাসের দোলায় খসে পড়তে থাকে তারা ভুঁইয়ের উপর।</p>



<p>মধ্য-চল্লিশের আমিও চোখ বন্ধ করি তখন; স্পষ্ট দেখতে পাই ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগের সেই উদ্বাস্তু কলোনি পাড়ায় বিশ্বনাথের দোকানে পঞ্চাশ পয়সার ঝাল-লজেন্স, একটাকার চানাচুর কিনতে ভিড় জমিয়েছে ছেলেমেয়ের দল। পুজোর দিনে দশ টাকার সরষের তেল কিনে কাচের শিশিতে নিয়ে যাচ্ছে লাজুক বউ, বাড়িতে আজ মাংস হবে কিনা !</p>



<p>ওমিয় মাস্টারের জীর্ণ ভদ্রাসন জেগে উঠছে অতিকায় ফ্ল্যাট বাড়ির গহিন অন্তঃপুর থেকে, জংলা বাগানে অপরাজিতা লতার তলায় রেখে যাওয়া শবনমের নীল সাইকেল মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে অবিতথ কুসুম রঙে, আদ্যিকালের হারমোনিয়ামের বেলো টিপে মাস্টারমশাই নম্র বেহাগকে পাশে বসিয়ে গাইছেন—ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন, ভেবে মরে মোর মন…কালসায়রের ওপার থেকে আমার দিকে অনিমিখ তাকিয়ে আছে অষ্টাদশী শবনম্‌ আর রোদ্দুরে রোদ্দুরে উথলে উঠছে আকাশ।</p>



<p>.</p>



<p><em>এই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব এবং এই সম্পর্কিত কোনো দায় কতৃপক্ষের নয় ।</em></p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/">যাদের ফেরা হয়নি কোথাও</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কারাগারে একটি বছর</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 05 Oct 2026 10:55:18 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Rochona]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11270</guid>

					<description><![CDATA[<p>নজরুল যেদিন হুগলি জেলে গেলেন তারপর দিন থেকেই তিনি থার্সটোনের কুনজরে পড়ে গেছিলেন। ...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/">কারাগারে একটি বছর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>বিনোদ ঘোষাল</strong></p>



<p>সময়টা ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাস। তরুণ কবি নজরুল ইসলাম তখন কলকাতার তালতলা লেনের মেসবাড়িতে থাকেন মুজফফর আহমেদের সঙ্গে। নজরুল তখন পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার লড়াইতে পা মেলাতে শুরু করেছেন। একইদিকে যেমন দেশবন্ধুর আদর্শে উদবুদ্ধ হয়ে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাস্তায় নেমে মিছিল মিটিং-এ গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করছেন একইসঙ্গে মুজফফরের সঙ্গে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কাজে সচেষ্ট। মস্কো থেকে প্রেরিত মানবেন্দ্র নাথ রায়ের দূতের সঙ্গে মুজফফর আহমদ এবং নজরুলের মিটিং হয়েছে। কীভাবে পার্টি গঠন করা হবে তাই নিয়ে জল্পনা চলছে। একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অন্যদিকে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে নজরুল প্রবল ব্যস্ত। সঙ্গে কবিতা লেখালিখি তো চলছেই। কলকাতার সাহিত্যমহলে ইতোমধ্যেই নজর কেড়েছে এই যুধফেরত হাবিলদার কবির অন্যধারার লেখনী। বিশেষ করে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নজরুলের অবিশ্বাস্য কলমের শক্তি সম্পর্কে সাহিত্য তথা রাজনৈতিক মহলে আলোরণ তৈরি হয়েছে। এই কবি যে লেখনীর মাধ্যমে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তা শুধু দেশের মানুষ নয় ইংরেজ শাসকও টের পেয়েছে, তারা এবার নড়েচড়ে বসেছে। নজর রাখছে এই তরুণ জ্বালাময়ী লেখনীর প্রতি। গোয়েন্দাবিভাগে নিয়মিত জমা পড়ছে নজরুলের লিখিত প্রতিটি কবিতা, প্রবন্ধ। এরমধ্যেই গ্রাফতার হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর সম্পাদিত বাঙ্গালার কথা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন দেশবন্ধুর সহধর্মিনী বাসন্তিদেবী। তিনিও পড়েছেন কাজীর লেখা। বুঝেছেন এই ছেলেটির লেখায় আলাদা আগুন রয়েছে, স্থির করলেন পত্রিকায় নজরুলের লেখা ছাপাতে হবে। দেওর সুররঞ্জনকে পাঠালেন তালতলার ঠিকানায়। একদিন সকালে সুররঞ্জন দাশ এসে হাজির হলেন ৩,৪ সি তালতলালেনের মেসে। ঘরে তখন মুজফফর আহমদ এবং নজরুল দুজনেই উপস্থিত। সুররঞ্জন নিজের পরিচয় দিয়ে আগমনে উদ্দেশ্য জানানো মাত্রই নজরুল সোল্লাসে দে গরুর গা ধুইয়ে বলে তক্তপোষে বসে তখনই পত্রিকার জন্য লিখতে শুরু করে দিলেন। মুজফফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন, তিনি আর সুররঞ্জনবাবু নিচু গলায় কথা বলছিলেন আর নজরুল তক্তপোষে পিছন ফিরে বসে খাতায় পেনসিক দিয়ে খসখস করে লিখছিলেন। পুরো লেখাটি লিখতে সময় লেগেছিল আধঘন্টা মত। জন্ম হল এক অবিস্মরণীয় কবিতা।</p>



<p>কারার ঐ লৌহকপাট</p>



<p>ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট</p>



<p>রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।</p>



<p>এই কবিতাও প্রকাশ হওয়া মাত্র বাঙলার মানুষের মুখে মুখে তা ছড়িয়ে গেল। তারপর নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকায় যখন প্রকাশিত হল আনন্দময়ীর আগমনে নামের কবিতা, ব্রিটিশ সরকার আর অপেক্ষা করল না, নজরুলকে গ্রেফতারের বন্দোবস্ত করল। কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হল নজরুলকে। বিচারের নামে খানিক প্রহসণ হয়ে একবছরের কারাদণ্ড হল কবির।</p>



<p>একবছরের কারাজীবনে নজরুল ইসলাম তিনটি জেলখানায় থেকেছেন। আলীপুর সেন্ট্রাল জেল, হুগলি জেল এবং শেষে বহরমপুর জেল।এই তিনটি জেলের মধ্যে সবচেয়ে দূর্বিসহ ছিল হুগলিজেল। কেমন ছিল সেই কারাবাসের অভিজ্ঞতা? কবির নিজের কিছু কথা এবং কবির দুই সহবন্দি নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী ও খান মৈনুদ্দীনের স্মৃতিচারণায় তা জীবন্তরূপে ফুটে উঠেছে। &nbsp;</p>



<p>হুগলি জেলের সুপার থার্সটোন সাহেব ছিলেন অসম্ভব অত্যাচারী একজন লোক। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাজবন্দিদের কতরকমভাবে অত্যাচার করা যায় তার ফিকির খোঁজা। নজরুল যেদিন হুগলি জেলে গেলেন তারপর দিন থেকেই তিনি থার্সটোনের কুনজরে পড়ে গেছিলেন। কী ঘটেছিল আসুন একটু জানা যাক।</p>



<p>সকাল সাতটা। হুগলি জেলে নজরুলের প্রথম দিন। জেলগেটে ঢং করে একটা ঘন্টা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সারা জেলখানা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সপারিষদ জেল সুপার মিস্টার থার্সটোন আসছেন বন্দীদের দর্শন দিতে। এবং তাদের কোনও অভাব অভিযোগ থাকলে তা শুনতে। শাহী কায়দায় বুটের খটখট শব্দ করে এগোতে থাকলেন থার্সটোন। কালো পাগড়িধারী একজন একজন কনভিকটেড ওয়ার্ডার চিৎকার করে উঠল, হুঁশিয়ার হো যাওওওওওও&#8230;সরকার সালাম আজবর। আজবর হল ইংরেজি ‘এ্যাজ ইউ ওয়্যার’ এর বিশেষ বঙ্গীকরণ।</p>



<p>এগারো নম্বর ঘরের সামনে এসেও কালো পাগড়ি ওই কথাগুলোই উচ্চারণ করল।কিন্তু জেলবন্দীদের মধ্যে কোনওপ্রকার চাঞ্চল্য দেখা গেল না। নজরুলকে আগে থেকেই বাকি বন্দীরা বলে রেখেছিল কী কী করতে হবে। নজরুল ঠিক তাইই করতে থাকল। থার্সটোন তার পারিষদসহ ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন বটে কিন্তু ঘরের বন্দীরা যেন তার অস্তিত্বকে স্বীকারই করল না। যেমন শুয়ে বসে –বসে ছিল তেমনই রইল। নজরুল নিজের বিছানায় শুয়ে পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে থাকল এবং গুণগুণ করে গান গাইতে থাকল।</p>



<p>হোয়াট ইজ দিজ! বিশ্রী কর্কশকন্ঠে গর্জে উঠলেন জেল সুপার।</p>



<p>বন্দীরা পুরো বোবা।</p>



<p>আই সে হোয়াট ইজ দিজ! আবারও চিৎকার করে উঠলেন।</p>



<p>এমন চিৎকারে ভয় পাওয়ার বদলে বন্দীদের মধ্যে চাপ হাসির রোল উঠল। কে যেন নিচুগলায় বলে উঠল নাথিং।</p>



<p>ডু ইউ নট ফলো ডিসিপ্লিন?</p>



<p>নো। আবার চাপা গলায় কারও উত্তর।</p>



<p>এবার থার্সটোনের নজর পড়ল নজরুলের দিকে। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে দিব্বি নাচাচ্ছে। দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল সুপারের।নজরুলের সামনে এসে রাগে গরগর করে বললেন, হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?</p>



<p>নজরুল ফিক করে হেসে উত্তর দিল নাথিং।</p>



<p>হোয়াট!</p>



<p>এ্যাবসলুটলি নাথিং।</p>



<p>ওহ হু ইজ দিস? জেলরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সুপার।</p>



<p>জেলর সাহেব থার্সটোনের কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। শুনে সুপার বললেন, ওহ দেন ইউ&#8230;ইউ দ্য রেবল পোয়েট?</p>



<p>ইয়েস স্যর। নট অনলি পোয়েট বাট দ্য সারথী অফ ধুমকেতু অলসো। ইউ নো হোয়াট ইজ ধুমকেতু?</p>



<p>নজরুলের এমন কথায় আবারও হা হা করে হেসে উঠল বন্দীরা।</p>



<p>এমন বিদ্রুপে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল সুপার। ইউ নিড পানিশমেন্ট। নজরুল সহ আরও কয়েকজনকে আগামী তিনদিনের জন্য পেনাল ডায়েটের শাস্তি দিয়ে গটমট করে চলে গেলেন।পেনাল ডায়েট হল ভাতের বদলে শুধু মাড় দেওয়া হবে এবং তাতে ডাল, তরকারি, নুন কিচ্ছু থাকবে না। দুইবেলা শুধু ওই মাড় খেয়ে থাকতে হবে।সেই শুরু। তারপর হুগলি জেলের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তই যেন অসহ্য। আলীপুর জেলে স্পেশাল কয়েদিদের যে স্বাধীনতা ছিল, যে সুযোগ-সুবিধা, সম্মান ছিল তার কিছুই এখানে নেই।থার্সটোন সহ জেলর, ডেপুটি সুপার, সিপাই সব এক একটি মূর্তিমান শয়তান।</p>



<p>কয়েকদিনের মধ্যেই এই জেলখানা অসহনীয় হয়ে উঠল নজরুলের।জেলে সাধারণ ও রাজনৈতিক কয়েদিদের দিয়ে একটা ফুলের এবং একটা সবজি বাগান করা হয়েছে। সেই বাগানে যেসব তরিতরকারি আনাজ হয় তা কয়েদিদের জন্যই ব্যবহার করার কথা। কিন্তু হুগলি জেল চলে তার নিজের নিয়মে। সপ্তাহে যে ক’দিন মাছ বা মাংস দেওয়ার কথা সেদিন কয়েদিদের কপালে জোটে মাছের কাঁটা এবং মাংসের হাড়োগোড়। আর তরকারির মধ্যে সবজির বদলে পাওয়া যায় তরকারির খোসা, কপির বুড়ো ডাঁটা,শুকনো পাতা, দরকচা পোকা ধরা বেগুন, ঝিঙে, আধপচা লাউ অথবা কুমড়ো। তারমধ্যেই খুদ ও ধানের কুন মিশিয়ে আধসিদ্ধ করে সেই চটচটে বস্তুটা সাতসকালে বন্দীদের সানকিতে ঢেলে দেয় ফালতুরা। একে বলে লপসি। তার স্বাদ তো দূরের কথা, কালো রঙ দেখলেই গা ঘুলিয়ে ওঠে। ওই কুৎসিত কালো অখাদ্য লপসিই হল এখানকার ব্রেকফাস্ট। দুপুর আর রাতের আহারও তথৈবচ। মুখে দেওয়া তো দূ রের কথা খাবারেরকথা ভাবলেই বমি আসে। এ ছাড়াও হার্সটোনের নিত্যনতুন অত্যাচার তো রয়েছেই।কিন্তু এত অত্যাচার করেও সে কিছুতেই এইসব দুরন্ত নির্ভীক বিপ্লবীদের শিরদাঁড়া ভাঙা যায় না। বরং প্রতিদিনই তারা নতুনভাবে জ্বলে ওঠে। জেলরের কড়া নির্দেশ একমাত্র সরকার মনোনীত কাগজ ছাড়া জেলের ভেতরে আর কোনও ভেতরে যেন না আসে। তারমধ্যেই নজরুল থার্স্টোনকে ব্যঙ্গ করে লিখে ফেললেন একটী প্যারোডি গান।রবি ঠাকুরের লেখা তোমারই গেহে পালিছ স্নেহের সুরে সেই গান সহবন্দিদের শিখিয়ে দিলেন নজরুল। &nbsp;কেমন? বলে নজরুল ওই সুরে গাইতে শুরু করল-</p>



<p>তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে</p>



<p>তুমি ধন্য ধন্য হে,</p>



<p>আমার এ গান তোমারি ধ্যান</p>



<p>তুমি ধন্য ধন্য হে।।</p>



<p>রেখেছ সান্ত্রী পাহারা দোরে।</p>



<p>আঁধার কক্ষে জামাই আদরে,</p>



<p>বেঁধেছ শিকল প্রণয়- ডোরে</p>



<p>তুমি ধন্য ধন্য হে।&#8230;</p>



<h2 class="wp-block-heading has-medium-font-size">পরদিন রোজের মতো আজ সকালেও থার্সটোন সাহেব তার বুটের খট খট শব্দ তুলে সপারিষদ জেলের কয়েদি পরিদর্শনে বেরোলেন। সাধারণ কয়েদিদের দেখার পর চোয়াল শক্ত করে এসে এগারো নম্বর কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন থার্সটোন। কালো পাগড়িওলা সিপাই সরকার সালাম আজবর বলে হাঁক পাড়ামাত্রই এতক্ষণ চুপচাপ শুয়ে বসে থাকা লোকগুলো আচমকাই উঠে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করল-</h2>



<p>তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে</p>



<p>তুমি ধন্য ধন্য হে&#8230;</p>



<p>সুপার প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেন। এসব কী!জেলর, ডেপুটি সুপার, জমাদার, ডাক্তার সকলেই হতভম্ব।</p>



<p>নজরুল সবার আগে। হার্সটোনের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে গাইতে থাকল-</p>



<p>আঁকাড়া চালের অন্ন লবন</p>



<p>করেছে আমার রসনা-লোভন</p>



<p>বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লপসী-শোভন</p>



<p>তুমি ধন্য ধন্য হে&#8230;</p>



<p>স্টপ অল দিজ ননসেন্স স্টপ। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো চিৎকার করে উঠলেন থার্সটোন। চোখ মুখ এমন লাল হয়ে উঠল যেন এখনই চামড়া ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসবে।ইউ ড্যাম ফুল সোয়াইন। নজরুলের দিকে আঙুল দিকে দাঁতে দাঁত ঘসে বললেন সাহেব।সকলকে আবারও চমকে দিয়ে নজরুলও পালটা বলে উঠল, ইউ ড্যাম ফুল সোয়াইন!সাহেব পুরো হতবাক! এ ছোঁড়া বলে কী! কালা আদমীর এত সাহস! হ্যাভ ইউ কলড মি নেমস!</p>



<p>ইউ হ্যাভ কলড ইট ফার্স্ট! চোখে চোখ রেখে আঙুল তুলে বলল নজরুল।</p>



<p>ইউ&#8230;ইউ&#8230;রাগে কথা আটকে গেল সাহেবের। জেলখানায় হাওয়া পর্যন্ত বইছে না এমন নৈঃশব্দ।</p>



<p>আই উইল টিচ ইউ আ লেসন&#8230;ইউ সোয়াইন! ঘর থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেলেন সাহেব, পিছনে তার অনুচরেরা। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘরের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল জেলর এবং সিপাইরা।জেলর বললেন, সুপারের নির্দেশে আপনাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনারা সহযোগিতা করুন। বলে তিনি যারা গান গেয়েছিল প্রত্যেকের হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানোর নির্দেশ দিলেন। জোর করে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাওয়া হল নজরুলকে। বন্দীরা সমবেতকন্ঠে ধ্বনি দিলেন</p>



<p>বন্দে মাতরম! ভারত মাতা কী জয়? গান্ধীজী কী জয়!</p>



<p>নজরুলও ওই অবস্থায় গলা মেলাল।জেলের পশ্চিমদিকে পূবমুখী সারসার সেল। প্রতিটির মাপ ছয়ফুট বাই চার ফুট। ওই লাইনেরই পাঁচ নম্বর সেলে নজরুলকে ভরে লোহার দরজা আটকে দেওয়া হল।একে হাতে পায়ে শিকল তার ওপর এইটুকু কুঠুরি। ভাল করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর্যন্ত উপায় নেই। খাট নেই। একটামাত্র কম্বল। ব্যাস।সুপার হার্সটোনের নির্দেশে রাজবন্দীদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল সমস্ত সুযোগসুবিধা।দুইবেলার খাদ্য বলতে শুধু পেনাল ডায়েট অর্থ্যাৎ নুন ছাড়া ভাতের ফ্যান, সকাল আর বিকেলে শুধুমাত্র এক ঘন্টার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় বাকি সময়টা হাতে পায়ে শিকলবাঁধা অবস্থায় নির্জন সেলে একা। সারা দিন, সারা রাত্রি। এ যে কী অসহনীয় শাস্তি তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। লেখার কাগজ কলম কিছু নেই অথচ মনের ভেতর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনকে কীভাবে ওগরাবে বুঝতে পারে না নজরুল। যা লেখা আসে গান গেয়ে অথবা আবৃত্তি করে মনে রাখার চেষ্টা করে। কখনও হুংকার দিয়ে উঠে বলে-</p>



<p>সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়</p>



<p>নাই কিরে কেউ সত্য-সাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়</p>



<p>শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়</p>



<p>বজ্র হাতে জিন্দানের ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়</p>



<p>দিন যায় রাত যায় এই অমানুষিক জীবন প্রতি মুহূর্তে অসহ্য লাগে। ইচ্ছে করে দুই হাতে এই গরাদটা ভেঙে ফেলে বাইরের বিশাল পৃথিবীতে আবার আগের মতো ছুটে বেড়াতে। কিন্তু মুক্তি কই? মুক্তি নেই&#8230;প্রতিটা মুহূর্তকে মনে হয় অনন্তকাল। যুগের পর যুগ ধরে এই কফিনের মতো খুপরির মধ্যে নিজের শরীরটাকে আটকে রাখা যে কী দুঃসহ যন্ত্রণার তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারও বোঝার সাধ্য নেই। দম বন্ধ হয়ে আসে। জীবনের প্রতি যে তীব্র আকাঙ্খা তা কখনও স্তিমিত হয়ে আসে হতাশায়। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। পরমুহূর্তেই নিজেকে জ্বালিয়ে তোলে নজরুল। গভীর রাতে পৃথিবী যখন  নিশ্চুপ, ঘুমে মগ্ন তখন নিজের আগুনেই ধকধক করে জ্বলতে থাকা নজরুল শিকলে বাঁধা দুই হাত গারদে ঠুকে ঝনাত ঝনাত শব্দ তুলে গাইতে থাকে-</p>



<p>এই শিকল পরা ছল মোদের এ</p>



<p>শিকল পরা ছল,</p>



<p>এই শিকল পরেই শিকল তোদের</p>



<p>করব রে বিকল!</p>



<p>তোমার বন্দী কারায় আসা মোদের</p>



<p>বন্দী হতে নয়!</p>



<p>পাশের সেলগুলিতে যারা নজরুলের মতোই একাকী, চার বাই ছয় কুঠুরিতে অমানবিক দিন</p>



<p>যাপন করছেন তারাও নজরুলের লেখা গানটির সঙ্গে গলা মেলায়-</p>



<p>ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের</p>



<p>সবার বাঁধন ভয়</p>



<p>এই বাঁধন দিয়েই বাঁধন ভয়কে</p>



<p>করবো মোরা জয়,</p>



<p>কন্ঠস্বর আরও দৃঢ় হয় নজরুলের। দ্বিগুণ উৎসাহে গরাদের শিকলের ঝনঝন শব্দ</p>



<p>তুলে গলা ছাড়ে-</p>



<p>এ শিকল বাঁধার পা নয় এ</p>



<p>শিকল ভাঙ্গা কল&#8230;</p>



<p>যত রকমের অত্যাচার করা সম্ভব সবরকম প্রয়োগ করেও থার্সটোন সাহেব বুঝতে পারছিলেন তিনি হেরে যাচ্ছেন। রাজবন্দীদের মরন কামড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন তিনি। মাত্র একবেলা দুর্গন্ধযুক্ত পচা ভাতের মাড় খাবার হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, সারাদিনে যে একঘন্টা সেলের বাইরে রাজবন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হত সেটাও বন্ধ করে দিলেন। ২৪ ঘন্টা দিনের পর দিন একবেলা ওই কুখাদ্য খেয়ে আর ওই কুঠুরির মধ্যে আটক থেকেনাভিঃশ্বাস উঠে গেল বন্দীদের। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ল, পাতলা দাস্ত, বমি। ফলে নজরুল এবং আরও কয়েকজন মিলে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শেষ অস্ত্র তুলে নিল। অনশন&#8230;আমরণ অনশন! আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হল-কাজী নজরুল ইসলাম, গোপালচন্দ্রসেন এবং মৌলবী সীরাজুদ্দীন আহমদ এই তিনজনেই আজ ৪০ দিন হইল অনশনব্রত অবলম্বন করিয়াছেন। কাজী নজরুলকে অনশনের পঞ্চমদিনে নাকের ভিতর দিয়া জোর করিয়া খাদ্য দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু তাহার ফলে তাঁহার নাকের ভিতর দিয়া রক্ত পড়িতে থাকে। তারপর হইতে কাজী নজরুল প্রায় অনশনেই আছেন; মাঝে সামান্য একটু দুধ তাহাকে জোর করিয়া খাওয়ানো হইতেছিল। তিনজন বন্দীরই অবস্থা অতি শোচনীয়। যে কোন মুহূর্তে চরম দুঃসংবাদ আমাদের কানে আসিয়া পৌঁছিতে পারে।হুগলি জেলের ব্যপারে স্পষ্ট বোঝা যাইতেছে যে, আমরা যে কেবল অসহায় তাহা নহে,অত্যাচার ও অপমানের আঘাতে আমাদের প্রাণে আর কোন চাঞ্চল্যই জাগাইয়া তুলিতে পারিতেছে না।ওই অনশন করতে গিয়ে তারপর যা অবস্থা হয়েছিল তা ভয়ংকর। বার বার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র জ্বর।</p>



<p>নজরুল ও অন্যান্য অনশনকারীদের প্রতি সুবিচারের দাবীতে দেশজোড়া প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল জেলের ভেতরে অত্যাচার। শরীরের ওজন তখন ২৫ পাউন্ড কমে গেছে। উঠে দাঁড়ানো তো দূরের কথা বসার, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই, তারমধ্যেই অন্ধকার সেলে জোর করে হাতে পায়ে বেড়ি বেঁধে রেখে দেওয়া। ওই অবস্থাতেই একবার নয়, দু-দু’বার সেই সেলের ভেতর থেকে ভয়ংকর সাপ বেরোলো। কবি এবং তার বন্ধুরা নিশ্চিত বুঝেছিলেন ওই সাপ এমনি আসেনি, ইচ্ছে করেই কবির সেলে ছাড়া হয়েছিল। তবে সেই সাপ দুটিও কবিকে দংশন করে পাপের ভাগী হতে চায়নি। বেরিয়ে গেছিল অসহায় হাত-পাবাঁধা অনশনক্লীষ্ট অসহায় কবিকে দেখে।</p>



<p>অবশেষে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠল নজরুল ও বাকি অনশনকারীদের প্রতি অন্যায়ের বিচার করতেই হবে। ইংরেজ সরকার শেষপর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হল। রাজবন্দিদের যাবতীও দাবী মেনে নিল জেল কর্তৃপক্ষ। বিরজাসুন্দরীদেবীর হাতে ফলের রস একটানা উনচল্লিশ দিনের অনশন ভাঙলে নজরুল ইসলাম। লৌহকপাট ভাঙার কবির মনে থেকে গেল লৌহকপাটের আড়ালে থাকা অভিশপ্ত দিনগুলির স্মৃতি।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/">কারাগারে একটি বছর</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 01 Oct 2026 07:57:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Binodan]]></category>
		<category><![CDATA[Celebrities]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Bengali Cinema]]></category>
		<category><![CDATA[Chabi Biswas]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11245</guid>

					<description><![CDATA[<p>অভিনয় দক্ষতায়, ব্যক্তিত্বে, চেহারায় ও বাচনভঙ্গিতে ছবি বিশ্বাসের জুড়ি আর নেই-সত্যজিৎ রায়</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/">ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>কমলেন্দু সরকার</strong></p>



<p>ছবিবাবুর মতো অভিনেতা না থাকলে &#8216;জলসাঘর&#8217;-এর মতো কাহিনির চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কি না জানি না। বোধয় না। একদিকে বিশ্বম্ভর রায়ের দম্ভ ও বিমৃশ্যকারিতা, অন্যদিকে তার পুত্রবাৎসল্য ও সংগীতপ্রিয়তা এবং সবশেষে তার পতনের ট্র&#x200d;্যাজেডি&#8212; একাধারে সবগুলির অভিব্যক্তি একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল&#8217;। সত্যজিৎ রায় লিখছেন তাঁর &#8216;ছবি বিশ্বাস&#8217; প্রবন্ধে।</p>



<p>&#8216;একথা সেকথা&#8217; প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় লিখছেন, &#8216;বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে ছবি বিশ্বাস ছাড়া আর কোনও অভিনেতার কথা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না&#8217;।</p>



<p>তিরিশের দশকের এক বিকালে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও কি ভেবেছিলেন, তাঁর প্রযোজিত নতুন ছবি &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217;-এ বিশুর ভূমিকায় এই যুবকটিই সঠিক নির্বাচন। এই প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় কে? এঁকে জানলে বোঝা যাবে ছবি বিশ্বাসকে কেন সিনেমায় অভিনয়ের জন্য বলেছিলেন। বিশ শতকের গোড়ায় তিনি চাকরি নেন ম্যাডনের অফিসে। চাকরিটা ছিল টাইপিস্টের। পরবর্তী সময়ে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় যোগ দেন ম্যাডানের চলচ্চিত্র ব্যবসায়। বছর কুড়ি তাঁর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল বেশকিছু তথ্যচিত্র এবং নিউজ রিল অর্থাৎ সংবাদচিত্র। ম্যাডানের নির্বাক ছবি &#8216;কৃষ্ণকান্তের উইল&#8217; (১৯২৭) ছবিতে প্রিয়নাথকে প্রথম দেখা যায় পরিচালক হিসেবে। এরপর আগামী চারবছর, ১৯৩১ পর্যন্ত প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখা যায় ম্যাডানের ব্যানারে সাতটি নির্বাক এবং একটি সবাক ছবির পরিচালক। ১৯৩২-এ ম্যাডান ছেড়ে এলেন ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ-এ। এদের ব্যানারে&nbsp; পরিচালনা করলেন &#8216;যমুনা পুলিনে&#8217; (১৯৩৩)। এরপর শুরু নতুন অধ্যায় প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনে। নিজেই তৈরি করলেন প্রযোজনা সংস্থা &#8216;কালী ফিল্মস&#8217;,&nbsp; যদিও পূর্ব নাম ভিন্ন ছিল।</p>



<p>প্রিয়নাথের &#8216;কালি ফিল্মস&#8217;-এর ব্যানারে তৈরি হবে নিরুপমা দেবীর তৎকালীন জনপ্রিয় উপন্যাস নিয়ে  &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217;। পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী। প্রযোজক প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় একদিন বিকেলে বসে আছেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ক্রাউন প্রেক্ষাগৃহের বুকিং কাউন্টারে। হঠাৎ তাঁর নজরে এলো অত্যন্ত সুপুরুষ চে্‌হারার বছর তিরিশ-বত্রিশের এক যুবক হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে। যুবকের রাজকীয় চেহারা দেখে তাঁকে ডাকেন। যুবকটি কাছে এলে তিনি প্রস্তাব দেন সিনেমা করার। যুবকটির অবস্থা মেঘ না চাইতেই জল। ভিতরের উচ্ছ্বাস মুখে প্রকাশ করলেন না। যুবকটি জানালেন, &#8216;রাজি।&#8217; ছবি বিশ্বাস তখন নাটকে নাম করেছেন।</p>


<a class="wp-block-read-more" href="https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/" target="_self">আরও পড়ুন<span class="screen-reader-text">: ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি</span></a>

<div class="rpwwt-widget"><ul class="blog_inner_pg"><li class="prescription"><a href="https://sukanyadigital.com/jader-fera-hoyni-kothao-sayantan-thakur/"><img width="50" height="50" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/sayantan-thakur.jpg" />যাদের ফেরা হয়নি কোথাও</span></a><div class="rpwwt-post-categories">In Bongodarpan, Featurerd, Galpo</div></li><li class="prescription"><a href="https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/"><img width="50" height="50" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/binod.jpg" />কারাগারে একটি বছর</span></a><div class="rpwwt-post-categories">In Bongodarpan, Featurerd, Rochona</div></li></ul></div>



<p>প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে নিলেন। ছবি বিশ্বাস কথামতো কালী ফিল্মসের স্টুডিয়োতে চলে গেলেন একদিন। বর্তমানের টেকনিশিয়ানই ছিল কালী ফিল্মসের স্টুডিয়ো। সিনেমা জগতে ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবি এই &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217; (১৯৩৬)। এরপর প্রতি বছরই তিন-চারটি ছবি করতে লাগলেন ছবি বিশ্বাস।</p>



<p>দু&#8217;চারটি প্রথাগত কথা বলে নেওয়া ভাল। তাঁর নাম ছিল শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। দেখতে সুন্দর হওয়ার কারণে মা কাত্যায়নী বিশ্বাস ডাকতেন ছবি। মায়ের নামেই পরবর্তীকালে ছবি নামেই পরিচিত হলেন সিনেমা এবং মঞ্চে। অল্প বয়সে মাতৃহারা হলে পিতা ভূপতিনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পিতার ছিল পাটের ব্যবসা। সেই ব্যবসাও দেখতে বাঙালি কিংবদন্তি অভিনেতা ছবি বিশ্বাসকে। যাঁর অন্তরে অভিনয় তিনি কি করে ব্যবসা সামলাবেন! তার ওপর পাটের ব্যবসা। সবকিছু ছেড়েছুড়ে মন দিলেন অভিনয়ে। যেটি তাঁর প্রথম পছন্দের।</p>



<p>ছবি বিশ্বাসের অভিনয়-স্পৃ্‌হা আসে তাঁর বৃহৎ পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে। বাড়ির সদস্য ভাই-বোন&nbsp; সংখ্যায় বেশি থাকার জন্য নিত্য লেগে থাকত নানাবিধ অনুষ্ঠান। কলেজজীবন থেকেই ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের শুরু। একসময় তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের। এখানে আসতেন তৎকালীন বিখ্যাত গুণীজনেরা। সংস্পর্শে আসেন শিশির ভাদুড়ির। যেহেতু শিশির ভাদুড়ির ছোটভাই হৃষীকেশ ভাদুড়ি ছিলেন বিদ্যাসাগর কলেজে ছবি বিশ্বাসের সহপাঠী তাই তিনি তাঁকে বড়দা বলেই ডাকতেন।</p>



<p>যাইহোক, ছবি বিশ্বাস একসময় যোগ দিলেন অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের &#8216;আর্ট থিয়েটার&#8217;-এ। একাধিক যাত্রাদল থেকে অভিনয়ের জন্য ডাক আসতে লাগে। এইসময় তিনি অভিনয়কে পেশা করতে চাননি। তাই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় এক বিমা কোম্পানিতে। পরে বিমা কোম্পানি ছেড়ে আসেন &#8216;বেঙ্গল টেলিফোন কোম্পানি&#8217;-তে। কিছুদিন পর থেকে ছবি বিশ্বাসের মন বসে না সেখানে। চাকরি নয়, ব্যবসা করবেন ঠিক করলেন। পারিবারিক ব্যবসা পাটেই মন দিলেন। কিছুদিন পর পাটের ব্যবসা লাটে ওঠে।</p>



<p>বাল্যকালে সঙ্গীতশিল্পী উস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁ-এর কাছে ধ্রুপদীগানের চর্চা করেছিলেন। ছোট জাগুলিয়ায় যেখানে তাঁদের বাড়ি ছিল সেখানে মঞ্চ বেঁধে করছিলেন &#8216;বিল্বমঙ্গল&#8217; নাটকে চিন্তামণির পার্ট।</p>



<p>মদন মিত্র লেনের দীনবন্ধু মিত্রের বৈঠকখানার ঘরে ছিল &#8216;বারবেলা&#8217; বৈঠক ক্লাব। এখানে হত শখের নাটক, শখের অভিনয়। এখানেই ছিল ছবি বিশ্বাসের অভিনয়জীবনের হাতেখড়ি। তবে, বলাই মত্রের ক্লাবে করেন নাটক &#8216;ভীষ্ম&#8217;। একসময় জড়িয়ে পড়লেন কাঁকুড়গাছি নাট্যসমাজ এবং সিকদার বাগান বান্ধব সমাজের সঙ্গে। বান্ধব সমাজ তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে &#8216;নদীয়া বিনোদ&#8217; মঞ্চস্থ করবে। &#8216;নদীয়া বিনোদ&#8217;-এ নিমাইকে খুঁজে বার করেছিলেন ললিত বসু যিনি পরিচিত ছিলেন বাঁকাবাবু নামে। ১৯৩৩, ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন এক তরুণ অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। নিমাইয়ের ভূমিকায় তাঁকে দেখে আবালবৃদ্ধবনিতা মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৩৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যান রামকৃষ্ণ আশ্রমে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব-এর মূর্তির সামনে অভিনীত হয়েছিল &#8216;নদীয়া বিনোদ&#8217;। এখানেই শেষ নয়, এই নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে ধারাবাহিকভাবে চলে। ১৯৩৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে শততম রজনী হয় &#8216;নদীয়া বিনোদ&#8217;-এর। যতদূর জানা যায়, ১৭৫-টি রজনী অভিনীত হয়েছিল নাটকটির।</p>



<p>১৯৩৮-এ নাট্যনিকেতন মঞ্চে &#8216;সমাজ&#8217; নাটক দিয়ে পেশাদারি ছবি বিশ্বাসের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপরই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে, যে-কথা পূর্বেই বলা আছে।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img fetchpriority="high" decoding="async" width="404" height="307" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/Chobi-biswas-1-kamalendu.png" alt="" class="wp-image-11248" style="aspect-ratio:1.3159609120521172;width:442px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/Chobi-biswas-1-kamalendu.png 404w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/Chobi-biswas-1-kamalendu-300x228.png 300w" sizes="(max-width: 404px) 100vw, 404px" /><figcaption class="wp-element-caption">ছবি- &#8216; পথে হল দেরি&#8217; </figcaption></figure>



<p>অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের ওপর অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের, স্টুডিয়োপাড়ায় পরিচিত ছিলেন ঢুলুদা নামে। তিনি মনে করতেন, সিনেমার অভিনয় এবং নাটকের অভিনয়, এই দুইয়ের মধ্যে যে ফারাক সেটা ছবি বিশ্বাসই দেখিয়ে গেছেন। খুব মজার মানুষ ছিলেন ছবি বিশ্বাস। তখন এম পি-র &#8216;পথে হল দেরি&#8217;র শুটিং চলছিল। তা একদিন প্রচুর দেরি করে এলেন ছবি বিশ্বাস। বললাম, এত দেরি হল ছবিদা? উত্তর যেন তাঁর ঠোঁটে লেগেই ছিল। বললেন, &#8220;তোদের ছবির নামই তো &#8216;পথে হল দেরি&#8217;। তা দেরি হবে না!&#8221; আসল কারণটা পরে জানা গেছিল, ছবি বিশ্বাস চলে গেছিলেন আড়িয়াদহে ইস্টার্ন টকিজে। ছবি বিশ্বাস সে-কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, &#8220;আরে ওরা তো আমাকে দিয়ে দুটো ছবির শুটিং করিয়েও নিল। ব্যাপারটা হয়েছিল আমি ডায়রিটা নিতে ভুলে গিয়ে যত বিপত্তি। যাক, অত ভাবিস না। আমি তোদের কাজ তুলে দিয়ে যাব।&#8221; উনি কথা রেখেছিলেন।</p>



<p>১৯৩৬, ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবি &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217;-এ সময় একটু ফিরতে হবে। এই বছরেই মুক্তি পেয়েছিল নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি &#8216;দ্বীপান্তর&#8217;। &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217; করার পর সুপুরুষ সুদর্শন ছবি বিশ্বাস স্টুডিয়োপাড়ায় হইচই ফেলেছিলেন তেমনটা ঘটেনি। কাজের আশায় ঘোরাঘুরি করেন এই স্টুডিয়ো, ওই স্টুডিয়ো। তারই মাঝে শুনলেন কে একজন অভিনেতা নৃপতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছেন চারদিকে! একদিন পাকড়াও করলেন নৃপতিকে। ছবি বিশ্বাস বল্রন, &#8220;শুনুন মশাই, আপনি নাকি আমার নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছেন?&#8221; নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ও তো কম যান না। গম্ভীর হয়ে বলেন, &#8220;বদনাম করার কাজ করেছেন, তাই করেছি।&#8221; ছবি বিশ্বাস তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কারণটা। নৃপতি চট্টোপাধ্যায় বললেন, &#8220;আগামী কাল স্টুডিয়োতে আসুন বলব।&#8221;</p>



<p>পরদিন ছবি বিশ্বাস যেতে নৃপতি মেক-আপ রুমের দরজা বন্ধ করে বোঝাতে লাগলেন তাঁর অভিনয়ের ভুলভ্রান্তি, খামতি ইত্যাদি। সবকিছু হাঁটা থেকে শুরু তাকানো, সংলাপ কীভাবে বলতে হবে, সংলাপের মাঝে পজ নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। নৃপতি চট্টোপাধ্যায়কে &#8216;প্রভু&#8217; বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন সেই মুহূর্ত থেকে। দুজনের মধ্যে ভালবাসা, বন্ধুত্ব ছিল অটুট আমৃত্যু। মঞ্চে নাটকের বাইরে বহু মজার ঘটনাও ঘটেছিল।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img decoding="async" width="751" height="395" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-nripati.png" alt="" class="wp-image-11252" style="aspect-ratio:1.90126582278481;width:536px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-nripati.png 751w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-nripati-300x158.png 300w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-nripati-720x380.png 720w" sizes="(max-width: 751px) 100vw, 751px" /></figure>



<p>সম্ভবত সেটি ছিল কম্বিনেশন নাইট। তৎকালে কোনও উৎসবে বা বিশেষদিনে কম্বিনেশন নাইট হত। নাটকে দৃশ্যটি ছিল কম্বল গায়ে মঞ্চের একপাশে শুয়ে থাকবেন ছবি বিশ্বাস আর নৃপতি চট্টোপাধ্যায় এসে কম্বলটা খুলবেন। সেদিন কলকাতা শহরে প্রচণ্ড গরম। নাটক করার নৃপতি দশটা টাকা চেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাসের কাছে। উনি মাঝেমধ্যেই টাকা চাইতেন। তা ছবি বিশ্বাস দেননি নৃপতিকে। উনিও বললেন, টাকা দিবি না তো, মজা টের পাওয়াব। নাটক শুরু হয়েছে কম্বলে মোড়া ছবি</p>



<p>বিশ্বাসের কাছাকাছি ঘুরছেন আর বলছেম, কি রে দশ টাকা দিবি কিনা বল। ছবি বিশ্বাস কম্বলের মধ্যে থেকে বলছেন, না দেবো না। নৃপতি মঞ্চে ঘোরাঘুরি করছেন আর ছবি বিশ্বাসের কাছে গিয়ে বলছেন, কি রে দিবি? ঘামে গরমে নাজেহাল ছবি বিশ্বাস আর পারলেন না। নৃপতির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। বললেন, দেব দশ টাকা। আগে কম্বলটা খোল। সারা প্রেক্ষাগৃহে হাসির তুফান। মিনিট পাঁচ পর আবার নাটক শুরু হয়।</p>



<p>আরও অনেক ঘটনা আছে। আর একটি মজার ঘটনা বলি, সেকালে নাটকের মেক-আপ রুম ছিল খুব মজার জায়গা। আড্ডা হত, হাসি হই-হল্লাও হত। বিশেষ করে নৃপতি আর ছবি বিশ্বাস একই নাটকে অংশ নিলে মেক-আপ রুমে উঠত হাসির ফোয়ারা। একবার কোন&nbsp; এক নাটকে নৃপতিকে লক্ষ্য করে ছবি বিশ্বাস বলেন, তোর আবার অত মেক-আপের কী আছে! দর্শক তো নাটকে ছবি বিশ্বাসকে দেখতে আসে।</p>



<p>নৃপতি চট্টোপাধ্যায় বলেন, তোকে দেখিয়ে দেব নাটকে কোনও চরিত্রই ছোট নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ। ওই&nbsp; নাটকে ছবি বিশ্বাস অভিনয় করছিলেন এক অভাবগ্রস্ত সৎ মানুষের। যিনি পাওনাদারের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়ান। আর পাওনাদারটির ভূমিকায় ছিলেন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়। নৃপতিকে দেখে ছবি বিশ্বাস লুকিয়ে পড়েন। পাওনাদার নৃপতি তাঁর স্বভাবসুলভ ঢঙে ছবি বিশ্বাসকে ইতিউতি খুঁজতে শুরু করেন কুলুঙ্গিতে, কখনও বিছানার নীচে কখনও গোটানো মাদুর খুলে, এমনকী জুতোর মধ্যেও! নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে সারা হল হাসিতে ফেটে পড়ে! দৃশ্যটির সময়সীমা ছিল মিনিট কয়েক নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের কাণ্ডকারখানায় গিয়ে দাঁড়ায় মিনিট পনেরো-কুড়ি। পরিচালক পর্দাও ফেলতে পারছেন না,&nbsp;&nbsp; দর্শক উপভোগ করছেন। প্রেক্ষাগৃহে হাসির তুফান! ছবি বিশ্বাস মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালে তাঁর প্রতি সমবেদনা জানাবে কি, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছেন! পরিচালক পরের শো বাতিল করে টিকিটের দাম ফেরত দেন। সেদিন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হার মেনে ছবি বিশ্বাস স্বীকার করেছিলেন, নাটকে&nbsp; কোনও চরিত্রই ছোট নয়, সকল চরিত্রেরই আছে সমগুরুত্ব।</p>



<p>শিশির ভাদুড়ি-অহীন্দ্র চৌধুরী পর বাংলা নাট্যমঞ্চে শুরু হয় ছবি বিশ্বাস যুগ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’, মনোজ বসুর কাহিনি নিয়ে ‘ডাকবাংলো’, দেবনারায়ণ গুপ্ত-র ‘শ্রেয়সী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, কত ঐতিহাসিক নাটক! পূর্বেই বলেছি, শিশির ভাদুড়ির ভাই ছিলেন ছবি বিশ্বাসের সহপাঠী, তাই শিশিরবাবুকে ‘বড়দা’ বলতেন। সেইজন্য তিনি কাছ থেকে শিশির ভাদুড়িকে দেখেছেন, অভিনয় দেখেছেন, শিখেছেন, তার পর বদলাচ্ছেন তাঁর&nbsp; অভিনয়। ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের মধ্যে ছিল চরিত্রের আভিজাত্য, দাপট, কারুণ্য, ভাঙচুর। ছিল না ম্যানারিজম। ফিল্ম-কেরিয়ারের তুঙ্গ পর্যায়ে ন’বছর বাদ পড়েছিল মঞ্চাভিনয়, তবে সুযোগসুবিধা মতো মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন। শিশির ভাদুড়ির আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকাকালীন সময়ে বিনা অর্থে নাটক করেছেন। শরীর ঠিক না-থাকার কারণে ডাক্তারের অনুমতি মেলেনি। যেদিন অনুমতি পেয়েছেন সেদিনই স্টার থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন। বুকিং অফিস খুলতেই বিশাল লাইন। মুহূর্তে সব টিকিট শেষ। প্রতিটি শো ছিল হাউসফুল। সেইসময় একটি কথা খুব চালু ছিল, বক্স-অফিস টানতেন নায়ক-নায়িকা আর ছবি বিশ্বাস।</p>



<p>তিরিশের দশকের মধ্যভাগ থেকে পঞ্চাশের দশকের শুরু, নিয়মিত অভিনয় করেছিলেন পেশাদারি মঞ্চে। তাঁর অভিনয়ের দাপটে মঞ্চের প্রধান শিল্পীরাও ম্লান হয়ে যেতেন কখনওসখনও। এমনটা ঘটত সিনেমাতেও। বাংলা সিনেমা ছবি বিশ্বাসকে এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তার ভিতর ছিল, তপন সিংহের &#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217; (১৯৫৭), এই ছবির জন্য তিনি যোগ দিয়েছিলেন বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে। সত্যজিৎ রায়ের &#8216;জলসাঘর&#8217; (১৯৫৮), &#8216;,দেবী&#8217; (১৯৬০), &#8216;কাঞ্চনজঙ্ঘা&#8217; (১৯৬২) ইত্যাদি সিনেমা তাঁকে দেশেবিদেশে এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, পরিচিতি ইত্যাদি ইত্যাদি।</p>



<p>পঞ্চাশের প্রায় শুরু থেকেই বাংলা সিনেমায় ছবি বিশ্বাসের কাজ বাড়ল। ফল, তাঁকে পাওয়া গেল কম। ১৯৩৬-এ প্রথম ছবি &#8216;অন্নপূর্ণার মন্দির&#8217; থেকে তিরিশের কয়েকটি বছর সঙ্গে চল্লিশের দশকে তিনি মোট ৬০টি ছবি করেছেন। সেখানে শুধুমাত্র পঞ্চাশের দশকে ছবি করলেন ১৪৭টি। গড়ে বছরে প্রায় ১৫টি ছবি। শুধু তাই নয়। এই দশকেই ছবি বিশ্বাস পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তপন সিংহের &#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217; (১৯৫৭), সত্যজিৎ রায়ের &#8216;পরশ পাথর&#8217; (১৯৫৮) এবং &#8216;জলসাঘর&#8217; (১৯৫৮) করেছেন।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img decoding="async" width="618" height="404" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/kabuliwala-chabi.png" alt="" class="wp-image-11255" style="aspect-ratio:1.5297029702970297;width:457px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/kabuliwala-chabi.png 618w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/kabuliwala-chabi-300x196.png 300w" sizes="(max-width: 618px) 100vw, 618px" /><figcaption class="wp-element-caption">ছবি &#8211; &#8216; কাবুলিওয়ালা&#8217;</figcaption></figure>



<p>&#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217; প্রভূত জনপ্রিয়তা এনে দেয় ছবি বিশ্বাসকে। তবে উত্তম-সুচিত্রার &#8216;সবার উপরে&#8217;র&nbsp; (১৯৫৫) একটি সংলাপ বাঙালির মুখে মুখে ফিরেছিল, &#8216;খালাস, খালাস আমি চাই না।&#8230; ফিরিয়ে দাও আমার বারোটা বছর।&#8217; ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের মধ্যে যে মেলোড্রামা ছিল তা পছন্দ করেছিলেন দর্শকেরা। এছাড়াও ছবি বিশ্বাস অভিনীত চরিত্রটি দর্শক-মনে আবেগ-সহানুভূতির সঞ্চার করতে পারে&nbsp; তাঁর অভিনয়-গুণে।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="611" height="369" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-jalsaghar.png" alt="" class="wp-image-11258" style="aspect-ratio:1.6558265582655827;width:462px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-jalsaghar.png 611w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-jalsaghar-300x181.png 300w" sizes="(max-width: 611px) 100vw, 611px" /><figcaption class="wp-element-caption">ছবি- &#8216;জলসাঘর&#8217; </figcaption></figure>



<p>ছবি বিশ্বাস যখন সত্যজিৎ রায়ের &#8216;পরশ পাথর&#8217; করছেন তখন তাঁর ১৭৩টি ছবি হয়ে গেছে আর &#8216;জলসাঘর&#8217; করছেন ১৮৩টি ছবি। সেইসময় তিনি বাংলা সিনেমার অপরিহার্য অভিনেতা। ছবি বিশ্বাসের যে আভিজাত্যময় চেহারা তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়। &#8216;জলসাঘর&#8217;-এর অসাধারণ একটি মুহূর্ত&#8212;&#8216;পারেনি, পারেনি, সুদখোরের ব্যাটা বামন হয়ে পাহাড়ের চুড়ো ভাঙতে গেছিল, পারেনি&#8217;&#8212; ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের তাচ্ছিল্যপূর্ণ সংলাপ বলার যে ভঙ্গিমা ছবি বিশ্বাস ছাড়া আর কে পারতেন! জমিদারি শেষ তবুও তাঁর অহংকার বিন্দুমাত্র কমেনি। ঐতিহ্যের সঙ্গে&nbsp; আধুনিকতার দ্বন্দ্ব। অসাধারণ এই দৃশ্যটি যেভাবে পরিস্ফুটিত করেছেন ছবি বিশ্বাস তা বাংলা সিনেমা তো বটেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ! এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।</p>



<p>এবার &#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217;র প্রসঙ্গে বলি। পরিচালক তপন সিংহ যখন ছবি বিশ্বাসকে &#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217;র কথা বলেন তখন তিনি পরিচালককে কি বলেছিলেন। দেখে নেওয়া যাক। &#8216;কাবলেদের সম্বন্ধে আমাকে একজন অথরিটি ভেবে নিতে পার।&#8217; বললেন ছবি বিশ্বাস, &#8216;ওদের সঙ্গে অনেক মেলামেশা করেছি।&#8217; সাগ্রহে বললাম, &#8216;তাহলে তো ওদের পুশতু ভাষাও একটু আধটু নিশ্চয়ই জানেন। কারণ কিছু সংলাপ পুশতুতে দিতে চাইছি কিনা।&#8217; এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, &#8216;সংলাপে আবার শুধু শুধু পুশতু মুশতু আনতে গেলে কেন? বুঝবে কে? বললাম, &#8216;না বুঝলেও চলবে, এতে অভিনয়ের একটা ডাইমেনশন আনতে পারে&#8212; আনবেই যে এ কথা বলছি না।&#8217; একটু ভেবে বললেন, তা ঠিক, একটা কাবলেকে ধরে শিখে নিলেই চলবে। বাদবাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দাও&#8212; কেমন পোশাকপরিচ্ছদ, মেক-আপ, চলা বলা&#8212; অনেকদিন পর একটা রোল পেয়েছি এক হাত লড়তে চাইছি।&#8217; (চলচ্চিত্র আজীবন, বায়োস্কোপের বাঁকে বাঁকে, তপন সিংহ)।</p>



<p>পুরনো দিনের মাঝেমধ্যেই শুনতাম&nbsp; তপন সিংহের কাছে। একদিন তিনি &#8216;কাবুলিওয়ালা&#8217;র শুটিংয়ের ঘটনা বলছিলেন, &#8220;সেট ফেলা হয়েছিল স্টুডিওতেই। সেটটা ছিল মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের একটি মুসলমান হোটেলের। শুটিং শুরু হবে। লাইট সাউন্ড ক্যামেরা সব রেডি। এবার সেটে ঢুকবেন কাবুলিওয়ালা বেশি ছবি বিশ্বাস। মনে হল ঠিক দেখছি তো! কাবুলিওয়ালা কোথায়! ছবি বিশ্বাসের মেক-আপ দেখে মনে হয়েছিল ইনি বোধহয় কোনও মুঘল সম্রাট। গরিব কাবুলিওয়ালাকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। অসিত চৌধুরী তো মেক-আপ দেখে রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর আলোচনা করে আমরা দু&#8217;জনেই ব্যাপারটা বলি ছবি বিশ্বাসকে। প্রথম দিকে গাঁইগুঁই করলেও পরে নিমরাজি ছবি বিশ্বাসকে গরিব কাবুলিওয়ালার মেক-আপ দেওয়া হয়। এছাড়াও আরও অনেক ঘটনা আছে।&#8221; সেদিন আর কথা হয়নি তপন সিংহের সঙ্গে। অভিনেতা ছবি বিশ্বাস সম্পর্কে ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।</p>



<p>ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আবার অন্যরকম ঘটনা ঘটেছিল শুটিংয়ে। এটি শোনা অভিনেত্রী গীতা দের কাছে, &#8220;ঋত্বিকদা তখন শংকরের &#8216;কত অজানারে&#8217; নিয়ে সিনেমা করছেন। একদিন শুটিং চলছে। হঠাৎ ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে ঋত্বিকদা বললেন, &#8216;ছবিদা কিচ্ছু হচ্ছে না।&#8217; আমরা তো ভয়ে সব কাঁটা। এই বুঝি তীব্র হুংকার শোনা যাবে ছবিদার। আজকের শুটিংয়ের ইতি ঘটবে! একেবারে চুপচাপ সবাই। হঠাৎ ছবি বিশ্বাসের গলা, &#8216;তাহলে দেখিয়ে দিন, কেমন করে করতে হবে।&#8217; তারপর ঋত্বিকদা অভিনয় করে দেখালেন। সেটে উপস্থিত সকলেই অবাক! অপূর্ব তাঁর অভিনয়! ছবি বিশ্বাস চুপচাপ ঋত্বিকদার দেখানো অভিনয়টি করলেন। সেদিন বুঝেছিলাম, ঋত্বিক ঘটক কত বড় অভিনেতা ছিলেন!&#8221;</p>



<p>ছবি বিশ্বাস অভিনয়ের একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। থিয়েটার এবং সিনেমার মিশ্রণে অদ্ভুত একটা ধারা এনেছিলেন। দু&#8217;একটা ক্ষেত্র ব্যতীত তাঁর অভিনয়ে থিয়েটারের কোনও ছাপই থাকত না। বিশেষ করে তাঁর কথা বলার ঢং ছিল একেবারে নিজস্ব। তার উদাহরণ হিসেবে উত্তমকুমারের একটি লেখার উল্লেখ করা যেতে পারে। উত্তমকুমার তাঁর &#8216;অভিনয়ের কথা&#8217;য় লিখছেন, &#8216;আমি যখন &#8216;নায়ক&#8217; করতে যাই তখন সত্যজিৎবাবু বলেছিলেন&#8212; ওহে উত্তমকুমার? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলুন স্যার। &#8212; না প্রথম সিনটা একটু ছবিবিক ঢঙে অভিনয় করতে হবে।ছবিবিক ঢঙে আমি কি অভিনয় করব? ছবিদা ছবিদার মতো অভিনয় করতেন, আমি আমার মতো করব।না, ওই যে টাইম অ্যান্ড পজ-এর ব্যাপারটা আছে না, ওইটে করতে হবে&#8217;। উত্তমকুমার নিজে মনে করতেন, &#8216;একটু স্টাইলাইজড অভিনয় করতে গেলেই ছবি বিশ্বাস&#8230;। &#8216;স্ত্রী&#8217; ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয়ের প্রশংসা করতে উনি বলেছিলেন, &#8220;আমি আর অভিনয় করলাম কোথায়! সারাক্ষণই তো ছবি বিশ্বাসকে অনুসরণ করে গেলাম।&#8221;</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="306" height="232" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-kanchenjungha.png" alt="" class="wp-image-11262" style="aspect-ratio:1.3189655172413792;width:466px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-kanchenjungha.png 306w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-kanchenjungha-300x227.png 300w" sizes="(max-width: 306px) 100vw, 306px" /><figcaption class="wp-element-caption">ছবি &#8211; &#8216; কাঞ্চনজঙ্ঘা &#8216;</figcaption></figure>



<p>ছবি বিশ্বাস ছিলেন বাংলা সিনেমার এক কিংবদন্তি অভিনেতা। তাঁকে নিয়ে লেখা খুব অনায়াসসাধ্য নয়। তপন সিংহ বলেছিলেন, &#8220;গ্রেট অ্যাক্টর।&#8221; সত্যজিৎ রায়&nbsp; তাঁর &#8216;ছবি বিশ্বাস&#8217; প্রবন্ধে লিখছেন, &#8216;ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার সাড়ে তিনবার। &#8216;সাড়ে&#8217; এই কারণে যে, &#8216;পরশ পাথর&#8217; ছবিটিতে তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন একটি মাত্র দৃশ্যে এবং তাও &#8216;অতিথি অভিনেতা&#8217; হিসেবে&#8212; বেনামে এবং বিনা পারিশ্রমিকে। বাকি তিনখানা ছবি হল, &#8216;জলসাঘর&#8217;, &#8216;দেবী&#8217; ও &#8216;কাঞ্চনজঙ্ঘা&#8217;। তাঁর উপযুক্ত আরও অনেক চরিত্র, অনেক কাহিনি আমার পরিকল্পনায় ছিল। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি কমেডি ছবির মোটামুটি কাঠামোও আমার তৈরি ছিল। এসবই তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার মন থেকে মুছে ফেলে দিতে হয়েছে। হয়তো এসব কাহিনি, এসব চরিত্র আর কোনওদিনই চলচ্চিত্রে রূপ পাবে না; কারণ অভিনয় দক্ষতায়, ব্যক্তিত্বে, চেহারায় ও বাচনভঙ্গিতে ছবি বিশ্বাসের জুড়ি আর নেই, এবং অচিরে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনাও নেই&#8217;। (প্রবন্ধ সংগ্রহ, সত্যজিৎ রায়, আনন্দ)।</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/">ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সোফা</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 01 Oct 2026 07:15:54 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Rochona]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11238</guid>

					<description><![CDATA[<p>বাইরের ঘরটা কেন যে সোফা দিয়ে সাজিয়ে রাখা ...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/">সোফা</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>অন্তরা চট্টোপাধ্যায়</strong></p>



<p>“মজা আ গয়া বে…”<br>“কসম সে…”<br>“শরাব,আওরত,খানা…সব কুছ সহী হোনি চাহিয়ে,তভি না আতা হ্যায় মজা.…”<br>“যা বলেছিস মাইরি..”</p>



<p>মোদো মাতালদের অপসৃয়মান কোলাহলটা ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে।আর একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কিছুক্ষণ গুমরে গুমরে মরে কানা গলিটার দেওয়ালে দেওয়ালে।সে কান্না এমনি শোনা যায় না,কারণ কানে পৌঁছনোর আগেই গলির দাঁত বের করা দেয়ালগুলো গিলে নেয় সে অস্ফুট ক্রন্দনধ্বনিকে।</p>



<p>সোফার উপর উপুড় হয়ে কাঁদছিলো কনক।ফুলকাটা,বাহারী লেস লাগানো চাদরটা ভিজে যাচ্ছিলো তার চোখের বাঁধ না মানা জলে।সামনের ছোট কাঁচের টেবিলে এঁটো প্লেট,মদের গ্লাস আর পোড়া সিগারেটের টুকরোর স্তূপ।একটু আগেই চলে গেছে মতিনের &#8220;বন্ধু&#8221; রা।মতিনও।<br>চোখ মুছে শাড়ি সামলে উঠে বসে কনক।উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে জানলা ঘেঁষা পাঁচিলের ওপর দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যায়,তার দিকে।সেখানে আদেখলার মতো ঝুলে আছে ফ্যাকাশে শাদা হাড়ের মতো একফালি চাঁদ।কনকের মনে পড়ছিলো তার গ্রামের খড়ে ছাওয়া মাটির বাড়ির উঠোন থেকে দেখা মস্ত আকাশটার কথা।তারায় তারায় ভরা সে আকাশের চাঁদ ছিলো আলাদা,তার আলো ছিল ননীর মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল আর নরম। সে দুধেল আলো আকাশ থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে আসতো উঠোনের আমগাছের পাতায় পাতায়,চন্দনজবার ফুলে ফুলে।বাড়ির পেছনে ছোট্ট পুকুরটার জলেও মুখ দেখতো সেই সুখী,আহ্লাদী চাঁদ।আর দাওয়ার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতো বাবা,হাতপাখাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খেতো আর এটা সেটা কতরকম গল্প করতো কনকের সঙ্গে।বাপবেটির সেইসব গল্পের নীরব শ্রোতা ছিলো সেই আকাশের চাঁদও।কোথায় হারিয়ে গেলো সেই আলোভরা রাত,ছায়ানিবিড় শান্তিভরা সেসব দিন?</p>


<a class="wp-block-read-more" href="https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/" target="_self">আরও পড়ুন<span class="screen-reader-text">: সোফা</span></a>

<div class="rpwwt-widget"><ul class="blog_inner_pg"><li class="prescription"><a href="https://sukanyadigital.com/kazi-najrul-islam-karagare-ekti-bachor/"><img width="50" height="50" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/binod.jpg" />কারাগারে একটি বছর</span></a><div class="rpwwt-post-categories">In Bongodarpan, Featurerd, Rochona</div></li><li class="prescription"><a href="https://sukanyadigital.com/chabi-biswas-bengali-cinema-legend/"><img width="50" height="50" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/10/chabi-thre.png" />ছবি বিশ্বাস: বাংলা সিনেমার বিস্মৃত কিংবদন্তি</span></a><div class="rpwwt-post-categories">In Binodan, Celebrities, Featurerd</div></li></ul></div>



<p>মুর্শিদাবাদ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম বদরপুরের মেয়ে কনক।বাবা নিকুঞ্জ কয়াল ভাগচাষী।মা মরা মেয়ে কনককে ভালো রোজগেরে পাত্র জেনে মতিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলো কনকের বাবা।মতিন কলকাতায় রাজমিস্ত্রির কাজ করে।অতি সাধারণ চেহারা মতিনের,বয়সের তুলনায় একটু বেশিই বয়স্ক যেন।বাড়িজমিও সেরকম বলার মতো কিছু নেই।অপর দিকে কনকের গায়ের রঙ পরিষ্কার,সুন্দরী না হলেও মুখে একটা কোমল শ্রী রয়েছে,ঘরের কাজ,রান্নাবান্নায় বেশ পটু,ক্লাস সেভেন অবধি পড়াশুনা করেছে।মোট কথা,সে সুপাত্রী।তবুও রোজগার ভালোই জেনে,মেয়ে কলকাতা শহরে থাকবে জেনে কনককে মতিনের হাতে তুলে দিতে রাজী হয়েছিলো নিকুঞ্জ।<br>বিয়ের পর কনককে নিয়ে এসে মতিন তুললো কলকাতার এক বন্ধ গলির মধ্যে ছোট্ট ঘরে।প্রথম যেদিন নতুন বউ কনক পা রাখলো এই ঘরে,সেদিন এই সামনের বসার ঘরটা খুব পছন্দ হয়েছিল তার।একটাই জানলা সেই ঘরে,সামনে উঁচু পাঁচিল।কিন্তু ঘরটা খুব সাজানো।ঘরের মাঝখানে একটা দারুণ সুন্দর সোফা।সামনে কাঁচের ছোট টেবিল।ঘরের কোণে কোণে টেবিল ল্যাম্প,নকল ফুলে সাজানো রঙিন ফুলদানি।দেওয়ালগুলো রঙ করা।</p>



<p>“ওমা,কি সুন্দর ঘরটা!”<br>এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মুগ্ধ কন্ঠে বলে উঠেছিল কনক।<br>আলতো করে ওর চিবুক নাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল মতিন,”তোর জন্যই তো ঘর সাজিয়েছি।”<br>“ধ্যাৎ!”<br>লাজুক হাসি হেসে বরের বুকে মুখ লুকিয়েছিলো কনক।</p>



<p>বাইরের সাজানো গোজানো ঘরটা পছন্দ হলেও ভেতরে গিয়ে বেশ দমে গিয়েছিলো কনক। ভেতরে একটা জানলাবিহীন বদ্ধ,ছোট্ট শোয়ার ঘর,আর তারও পেছনে একচিলতে রান্নার জায়গা আর শ্যাওলাধরা একফালি কলতলা।গ্রামের খোলামেলা,মুক্ত,উদার পরিবেশ থেকে এই দমবন্ধ করা ভাড়াবাড়ি একফোঁটাও ভালো লাগলো না কনকের।শুধু এই সামনের ঘরের এই সোফাটাই খুব পছন্দ হয়েছিলো ওর।সোফাটার নরম গদিতে বসে,হাতলটায় ভর দিয়ে পাঁচিলের ওপরের দৃশ্যমান আকাশটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকাই তার একমাত্র বিলাসিতা।মাঝে মাঝে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে অকারণে শুয়ে থাকতে আর চোখ বুজে ভবিষ্যত সংসারের স্বপ্ন দেখেও বেশ কিছুটা সময় কাটে কনকের।ও ভাবে,নিশ্চয় কিছুমাস বা দু এক বছর পর মতিন ওকে আরেকটু বড়,আরেকটু হাওয়াবাতাস খেলে এমন কোন বাড়িতে নিয়ে যাবে।সেখানে আরো গুছিয়ে কনক সংসার পাতবে, আসবে নতুন ছোট্ট অতিথি,সে খেলবে সে বাড়ির মেঝেতে, কনক মতিনের কোলে।তবে যেখানেই যাক না কেন,এ বাড়ি থেকে সোফাটা কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়ে পাতবে, এটা মনে মনে ঠিক করেই রেখেছে কনক।<br>ঘরে টিভি নেই,তবে মতিন বলেছে কিনে আনবে একটা ছোট টিভি কনকের জন্য।রেডিও অবশ্য আছে একটা।রেডিওতে বাজতে থাকা গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মাঝে মাঝে গুনগুন করে কনক,আর চেষ্টা করে নিজেকে সুখী ভাবতে,ভালো না লাগলেও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে।</p>



<p>কিন্তু কনক জানতো না যে কি দুঃস্বপ্নের জীবন তার জন্য অপেক্ষা করে আছে।মতিন আসলে মেয়েমানুষের দালাল।কলকাতায় তার আরো একটা সংসার আছে।সে প্রায়ই তার বন্ধুদের, অর্থাৎ খদ্দেরদের এখানে নিয়ে আসে।মদের ফোয়ারা চলে,সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর ভরে ওঠে।সঙ্গে চলে দেদার খাওয়া দাওয়া।তারপর কনককে যেতে হয় এক বা একাধিক অচেনা পুরুষের সঙ্গে পাশের ঘুপচি শোয়ার ঘরের খাটে।শুধু তাদেরই নয়,মতিনেরও শরীরের খিদে মেটাতে হয় তাকে মাঝে মাঝেই।প্রতিবাদ করলে কনকের কপালে জোটে বেধড়ক মারধর।</p>



<p>বন্ধু বলে বাড়ি নিয়ে এসে প্রথম যেদিন ঘরে লোক ঢোকালো মতিন,প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি কনক।ভেতরের শোয়ার ঘরে কনককে খদ্দের সমেত ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো মতিন।বন্ধ দরজার পিছনে কনকের আর্ত চিৎকার আর কান্না শুনেও এতটুকু বিচলিত হয়নি সে।সেই লোক চলে যাওয়ার পর ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে মুখ খুলতে যেতেই ঠাস করে সজোরে এক চড় মেরেছিলো মতিন কনকের গালে।<br>“চোপ শালী!একটা কথা বললে জিভ ছিঁড়ে নেবো তোর।খেতে পাচ্ছিস,ভালো শাড়ি ব্লাউজ,গয়না পরতে পারছিস,শুধু আমার বন্ধুদের সঙ্গে এক আধদিনএকটু শুবি,ব্যস।এতে এত কষ্ট কিসের রে তোর!একদম ফালতু নখরা করবি না।বেশি সতীপনা দেখানো হচ্ছে না?”গর্জে উঠে বলেছিলো মতিন।<br>প্রথমে বিস্ময়ে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে গিয়েছিলো কনক।তারপর ঘোর কাটিয়ে কনকও চিৎকার করে উঠেছিলো,”কেন,কেন বাবাকে মিথ্যে বলে নিয়ে এলে এখানে?গ্রামে চলে যাবো আমি,কিছুতেই থাকবো না এখানে।”<br>“যা না!কোথায় যাবি যা!দেখি কেমন ক্ষমতা!গ্রামে চলে যাবে!গ্রাম যেন পাশের গলিতে!” তীব্র শ্লেষের সুরে বলেছিলো মতিন।তারপর আরো কিছু অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে বেরিয়ে গিয়েছিলো সেরাতের মতো।আর বাইরের ঘরটা কেন যে সোফা দিয়ে সাজিয়ে রাখা সেটা সেদিনই প্রথম বুঝতে পেরেছিলো কনক।আর এ ও হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলো যে পালানোর কোনও পথ নেই এখান থেকে।অতএব পালানোর কথা ভাবা বৃথা।হাতে কোন পয়সাকড়ি নেই,এই অচেনা শহরে সে কোথায় যাবে?কার কাছে যাবে?সেখানেও যে শেয়াল কুকুরে তাকে ছিঁড়ে খাবে না,এমন কোন আশ্বাস আছে? এক ফাঁদ থেকে অন্য ফাঁদে গিয়ে পড়বে না তো সে?<br>এইসব ভাবতে ভাবতে যেন মাথাটা খারাপ হয়ে যায় কনকের।শুধু চোখের জল ফেলা আর এই কারাগার থেকে আদৌ কোনদিন মুক্তি পাবে কি না, সেই কথা চিন্তা করা ছাড়া আর যেন জীবনে কিছু করার নেই তার।</p>



<p>আচমকা দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে সম্বিৎ ফেরে কনকের।কে এলো এই সময়ে? মতিনরা তো ঘন্টা খানেক আগে বেরিয়ে গেছে।এ সপ্তাহে আর এমুখো হবে বলে মনে হয় না।কনকের ওপর কড়া নিষেধ রয়েছে যাকে তাকে দরজা খুলে দেওয়ার বা কারো সঙ্গে কথা বলার।আর কনক এও বুঝে গেছে যে এই পাড়ায় ভদ্রলোকের বাসা নেই,অসামাজিক লোকজনদের গোপন আখড়া এ জায়গা।<br>আবার কড়া নাড়ার শব্দ।জোরে জোরে।তাহলে কি মতিন ফিরে এলো?দ্বিধাগ্রস্ত মনে দরজার পাল্লা খুলে অবাক হয়ে যায় কনক।দরজায় দু হাতে দুটো জলের জগ হাতে দাঁড়িয়ে এক যুবক।লম্বা,রুক্ষ চেহারা, মাথায় অবিন্যস্ত চুল,মুখে হালকা দাড়ি আর দুটি গভীর কালো চোখ।পরনের নীল কালো গেঞ্জির মধ্যে সুস্পষ্ট তার টানটান ছিপছিপে শারীরিক সৌষ্ঠব।যুবকটি বললো,&#8221;একটু খাবার জল হবে?আমি আজই এই ওপরের ঘরে ভাড়া এসেছি।কল থেকে নোংরা জল বেরোচ্ছে।এতদিন বন্ধ ছিল তো,সেইজন্য হয়তো।এই দুটো জগ ভরে দিলেই হবে।&#8221;</p>



<p>বহুদিন পর যেন কোন মানুষের গলায় স্বাভাবিক কথা শুনলো কনক।কয়েক সেকেন্ড বিহ্বল হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর জলের জগ দুটো নিয়ে জল ভরে নিয়ে এলো সে।</p>



<p>&#8220;এই নিন&#8221;,বললো কনক।সে দেখলো তরুণটি কৌতূহলী চোখে তার সোফা ও ফুলদানি দিয়ে সাজানো বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে।ইস!সামনের টেবিলে এঁটো প্লেট আর মদের গ্লাসগুলো দেখে কি ভাবলো ও? বুঝতে পেরে গেছে বোধহয় আসল ব্যাপারটা।লজ্জায় কোনমতে জলের জগ দুটো ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো কনক।বেশ কিছুক্ষণ এক অজানা রোমাঞ্চে বুকটা তিরতির করে কাঁপতে থাকলো তার,কেন,কে জানে!</p>



<p>এরপর কনকের এক অদ্ভূত দ্বৈত জীবন শুরু হলো।স্বর্গ আর নরকের মাঝে এক অদৃশ্য সীমারেখায় বাঁচে সে।মতিন যথারীতি খদ্দের নিয়ে আসে।তবে আগের মতো অত ঘন ঘন নয়,ইদানীং একটু কমই আসে।কারণ মতিন প্রায়ই বিহারে চলে যায়, মনে হয় ওখানেও নতুন ধান্দা খুলেছে সে।<br>আর এদিকে উপরের ভাড়াটে যুবকটি আসতে যেতে কনকের জানলায় একটু দাঁড়ায়,হাসে।প্রত্যুত্তরে কনকও হাসে।কখনো জিজ্ঞাসা করে,<br>&#8220;বেরোনো হচ্ছে?&#8221;<br>তরুণটি মাথা নেড়ে সায় দেয়।<br>&#8220;হ্যাঁ, এই একটু….&#8221;</p>



<p>আর একদিন আবার দরজায় শব্দ হয় কড়া নাড়ার।</p>



<p>&#8220;চা এর জন্য চিনি নিতে এসেছি।একদম ফুরিয়ে গেছে।হবে?একটু চিনি?&#8221;</p>



<p>&#8220;হ্যাঁ, হ্যাঁ, এক্ষুণি আনছি।&#8221;</p>



<p>কনক কাগজে মুড়ে কিছুটা চিনি দেয় তাকে।দিতে গিয়ে আলতো করে আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যায় দুজনের।দুজনেই ঝটিতি তাকায় একে অন্যের চোখে,তারপর দুজনেই লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়।<br>ব্যস,এইটুকুই।কেউ কারো নামও জানে না,কিন্তু এক অদম্য আকর্ষণ গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে।একদিন সে যদি কনকের জানলায় না আসে,কনকের মন ছটফট করতে থাকে,অকারণে চোখে জল আসে।কিসের যেন এক ঘোরে থাকে সে।পচাগলা জীবনটাকে হঠাৎ করে ভালোলাগতে থাকে তার।এরই মাঝে মতিন খেয়াল করে,ওপরের বন্ধ ঘরে ভাড়াটে এসেছে,কড়া গলায় শাসিয়ে যায় সে কনককে,”শোন মাগী,কেউ ডাকলেও খবরদার দরজা না খুলবি না,ওপরের কারো সঙ্গে কথা বলবি না।যদি টের পাই না,জীনা হারাম করে দেবো তোর হারামজাদী।”<br>লোক আসে ওপরের ছেলেটির ঘরেও,ষন্ডামার্কা চেহারা তাদের,কখনো কখনো রাতে এসে পরদিন যায় তারা।কনক লক্ষ্য করে তখন সেই যুবকটি এড়িয়ে চলে কনককে,বুঝতে পারে তারই মত অন্ধকারের জীবন ওই যুবকেরও।</p>



<p>একদিন দুপুরে সোফায় বসে জানলায় চোখ রেখে অপেক্ষা করছিল কনক, কারণ ঠিক এই সময়টাতেই বেরোয় তার নাম না জানা প্রেমিক।ঠিক সময়ে জানলায় দেখা গেল তাকে।এগিয়ে এলো সে কনকের তারে ঘেরা জানলার গরাদের কাছে।নিজের বুকের ধুকপুক আওয়াজ নিজের কানে শুনতে পেলো কনক।স্পষ্ট বুঝতে পারছিলো কনক আজ একটা অন্য কিছু ঘটতে চলেছে।কারণ তারে ঘেরা জানলার গরাদের ওপারে যে চোখ দুটি অপেক্ষা করছে অধীর অপেক্ষায় তাতে আজ অন্যরকম চাউনি,ওই চোখের সীমানা ছাড়িয়ে আজ এতদিনকার সব না বলা জমে ওঠা বন্দী কথাগুলো যেন আজ মুক্তির পথ খুঁজছে।</p>



<p>&#8220;শুনুন একটু..&#8221;<br>&#8220;কি?&#8221;<br>&#8220;ছাদে যাবেন?&#8221;<br>&#8220;ছাদে?এখন?&#8221;<br>&#8220;হ্যাঁ, কথা আছে।&#8221;</p>



<p>কনকের বুকের বাঁ দিকে একটা অবাধ্য কাঁপুনি ধীরে ধীরে সারা শরীর বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে ওকে আস্তে আস্তে বিবশ করে দিচ্ছিলো।কোনমতে নিজেকে ধাতস্থ করলো সে।</p>



<p>&#8220;আসছি।দরজার সামনের সিঁড়িটা দিয়ে তো?&#8221;<br>&#8220;হ্যাঁ, আপনি আসুন।আমি আছি।&#8221;</p>



<p>বুকের মধ্যে যেন একশটা রেল ইঞ্জিন একসাথে চলতে শুরু করলো কনকের।সন্তর্পণে দরজা খুলে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো।এই প্রথম ঘরের চৌকাঠের বাইরে পা রাখলো কনক।ভয়ে,রোমাঞ্চে,উত্তেজনায় ওর মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে হাঁটু দুমড়ে সিঁড়িতে পড়ে যাবে সে যেন।<br>তিনতলায় পৌঁছে বিবর্ণ কাঠের দরজাতে আলতো ঠেলা দিতেই কনক দেখতে পেলো তাকে।চুন সুড়কি ক্ষয়ে ইঁট বের করা ছাদের পাঁচিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।দুই পা থরথর করে কাঁপছে কনকের, আর দাঁড়াতে পারলো না সে,দরজায় পিঠ দিয়ে বসে পড়লো,দু হাতে মুখ ঢেকে।তার আঙ্গুলগুলো ভিজে উঠলো চোখের বাঁধ না মানা জলে।একবুক উথালপাথাল করা সাগরের জলে নুনের পুতুলের মতো গলে যেতে যেতে আর ডুবে যেতে যেতে কনক নিজেকে আবার খুঁজে পেলো এক পুরুষালি বাহুডোরে।</p>



<p>&#8220;কেঁদো না,কেঁদো না এভাবে,একটু শান্ত হও&#8221;<br>&#8220;আমি খারাপ…একটা নষ্ট মেয়ে…&#8221;<br>&#8220;আমিও খারাপ।&#8221;<br>&#8220;কেন?কি করো তুমি?তোমার ঘরে কারা আসে সব?&#8221;<br>&#8220;বোমা,গ্রেনেড এসব বানাই।ওরা সব পার্টির গুন্ডা।পার্টির ক্যান্টিনে কাজ দেবে বলে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল।তারপর এই বোমা বাঁধার কাজে লাগিয়েছে। অ্যাকশনেও যেতে হয় মাঝে মাঝে।&#8221;<br>&#8220;গ্রাম কোথায় তোমার?&#8221;<br>&#8220;নসীপুর,জৌগ্রাম।করিমপুরের কাছে।&#8221;<br>&#8220;আর নাম?&#8221;<br>&#8220;মুস্তাক,মুস্তাক আলী।&#8221;<br>&#8220;তুমি মুসলমান?&#8221;<br>&#8220;হ্যাঁ।কি হয়েছে?&#8221;<br>&#8220;কিছু হয়নি তো…&#8221;</p>



<p>“হ্যাঁ হয়েছে,কনকের একটা মুস্তাক হয়েছে।&#8221;<br>মনে মনে বললো কনক।মুখে বললো,&#8221;আমার নাম কনক।চলো ছাদের পাঁচিলে দাঁড়াই।&#8221;</p>



<p>ছাদের পাঁচিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা।মুস্তাক আর কনক।ছাদের উপর আকাশ অনেক বড়,সীমানাহীন।বিস্তীর্ণ জঙ্গলের মত গিজিগিজি বাড়ি চতুর্দিকে।সব ছাড়িয়ে দেখা যাচ্ছে হাওড়া ব্রিজ।দূরে নয়,কাছেই।দু চোখ বুঁজে বুক ভরে খোলা হাওয়ায় লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলো কনক।তারপর হাত রাখলো মুস্তাকের হাতে,বললো,<br>&#8220;কিছু বলবে?কথা আছে বলছিলে?&#8221;<br>&#8220;এখান থেকে হয়তো চলে যেতে হবে আমাকে।মুর্গাসোলে।একশন আছে।ফিরে আসবো আবার,কিন্তু কবে জানি না।তবে খুব বেশিদিন দেরি হবে না ফিরতে,দিন পনেরো কুড়ি হতে পারে।ভাবলাম যাওয়ার আগে একবার জানিয়ে দিয়ে যাই।&#8221;<br>&#8220;না,না,না,তুমি যাবে না।আমি কি করবো তাহলে?আমি কি করে বাঁচবো?&#8221;হাহাকার করে উঠলো কনক।<br>কিছুক্ষণ দূরে তাকিয়ে রইলো মুস্তাক।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস গলায় বললো,”জানি না।”<br>কনক শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মুস্তাকের কাঁধ।স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মুস্তাকের দিকে।তারপর মরিয়া গলায় বলে,<br>&#8220;চলো,পালাই।পালাবে?&#8221;<br>&#8220;কোথায় পালাবে?পালিয়ে কোথায় যাবে?&#8221;<br>&#8220;যেখানে হোক।ওই তো হাওড়া ব্রিজ দেখা যাচ্ছে।হাওড়া স্টেশনে গিয়ে যে ট্রেনে পারি উঠে পড়বো।চলো বেরিয়ে পড়ি,এক্ষুনি।&#8221;<br>&#8220;অত সোজা নয়,গলির মুখে যে পানবিড়ির দোকানটা আছে,ওই পানওয়ালাটা ওদের লোক।এই গলির ওপর নজর রাখে।তোমার বরেরও জানবে লোক ফিট করা আছে কাছেই কোথাও,তুমি পালিয়ে যাও কি না দেখতে।মরবে নাকি পালাতে গিয়ে?&#8221;<br>&#8220;মরেই তো আছি,নতুন করে আর কি মরবো?এখানে এই কালকুঠুরির মধ্যে কয়েদীর মতো বন্দী হয়ে এইভাবে পচেগলে মরার থেকে বাইরে গিয়ে মরা ভালো।আর তুমিও একদিন মরবে বোমা বাঁধতে গিয়ে,নয়তো একশনে।তার থেকে একসাথে বাঁচার একটা শেষ চেষ্টা করি চলো!&#8221;<br>&#8220;সেটার জন্য আগে থেকে ভালো করে প্ল্যান করতে হবে,এভাবে হবেনা।কোনও লাভ হবে না,মাঝখান থেকে বিপদ বাড়বে।একটু সবুর করো।আমি একটু দেখি কিভাবে সুযোগ করা যায়।আমার ওপর ভরসা আছে তো তোমার?&#8221;<br>&#8220;তুমি ছাড়া আমার আর কে আর আছে বলো ভরসা করার মতো?ঠিক আছে,আমি অপেক্ষা করে থাকবো।চলো, এখন নিচে যাই।কে যে কখন এসে হাজির হয়!ঘরের দরজা খোলা রেখে এসেছি।&#8221;</p>



<p>সিঁড়ি বেয়ে আবার নেমে আসে দুজনে।নিচের ঘরে দরজার সামনে এসে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে যায় কনক।দরজায় হাত রেখে নেশালাগা চোখে তাকিয়ে থাকে মুস্তাকের চোখে।একই আবেশ মুস্তাকের চোখেও।দুজনেরই শরীর মন প্রাণের প্রতিটি কণা তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে একে অন্যের দিকে,যে গতিবেগের ওপর কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।সমাজ,সংসার সব আজ মিথ্যে হয়ে মুছে গেছে,মিথ্যে হয়ে গেছে জীবনের সমস্ত কলরব,অজানা অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে বাইরের পৃথিবী।দৃঢ়,অটল সত্য হয়ে,স্পষ্ট হয়ে,ঘরের চৌকাঠের বাইরে আর ভিতরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধু দুটি আবেগমথিত নারী ও পুরুষহৃদয়।সৃষ্টির আদিকাল থেকে যেন এভাবেই তারা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে,নীরব ও পবিত্র অপেক্ষায়।<br>মুস্তাককে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে আসে কনক,সোফায় বসায়,তারপর নিজেকে সঁপে দেয় তার ভালবাসার মানুষটির কাছে,যে মানুষটি ছিলো তার সলজ্জ কল্পনায়,বিয়ের আগে,যেমন সব সাধারণ মেয়েদের থাকে।কনক যেন হঠাৎ করেই বুঝতে পারে এই পুরুষটির প্রতি তার ভালোবাসা হঠাৎ করে জন্মায়নি,এই ভালোবাসায় কোন স্বার্থ নেই তার,আমৃত্যু এই নরকে থাকলেও আগামী হাজার বছর সে মুস্তাককেই ভালোবাসবে।</p>



<p>কেটে যায় আরো কয়েকটা মাস।মুস্তাক মাঝে মাঝে কলকাতার বাইরে যায়।যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা চিরকুটে ফেরার দিন ও তারিখ লিখে রেখে পাকিয়ে কনকের জানলার এককোণে তারের জালের ফাঁকে গুঁজে রেখে যায় মুস্তাক।এভাবেই বার্তা বিনিময় করে তারা।এছাড়া যোগাযোগের আর কোনও উপায় নেই ওদের।মতিন কনককে ফোন রাখতে দেয় না।মুস্তাক অবশ্য একটা সাধারণ মুঠোফোন একবার কিনে দিয়েছিল কনককে।রান্নাঘরে চালের ডিবের মধ্যে সেই ফোন আর তার চার্জার লুকিয়ে রাখতো কনক।একদিন অফ করে রাখতে ভুলে যাওয়ায় বেটাইমে বেজে উঠেছিলো সেটা।কনকের বাইরের ঘরে তখন মতিন সহ দুজন লোক বসে মদ গিলছে,আর ওদের জন্য রান্নাঘরে মাংস রাঁধছিলো কনক।ফোন বেজে উঠতেই এক লহমায় হৃদপিন্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে এসে আটকে গিয়েছিলো কনকের।ঝটিতি চালের ডিবের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কোনমতে ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়েছিলো কনক।ইতিমধ্যে ওর কানে এসেছে চেয়ার ঠেলে বসার ঘর থেকে মতিনের রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসার পায়ের শব্দ।আর এক মুহূর্তও না ভেবে ফোনটা ফুটন্ত মাংসের ঝোলের কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো কনক।টলোমলো পায়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলো মতিন,নেশায় রক্তজবার মতো লাল চোখ দুটোকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো,”ফোন বাজলো কোত্থেকে রে?নাগর জুটিয়ে ফেলেছিস নাকি এখানে?”<br>“ফোন?ফোন কোত্থেকে বাজবে?”পাল্টা প্রশ্ন করলো কনক।<br>মতিন এতটুকুও বিশ্বাস করে নি কনকের কথা।রান্নাঘরে ঢুকে এ তাক সে তাক হাতড়ে হাতড়ে,কৌটো,ডিবে,শিশি সব সরিয়ে সরিয়ে দেখেছিলো কোনো ফাঁকে কোনও ফোন লুকানো আছে কিনা।তারপর কোথাও কিছু না পেয়ে ক্যাৎ করে কনকের কোমরে একটা লাথি কষিয়ে বলেছিলো,”কোন ধরনের কোনও চালাকি করবি না,মাগী।একবার ধরা পড়লে কিন্তু মারতে মারতে শেষ করে ফেলবো তোকে,মনে রাখিস।”এই বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো মতিন।বসে রান্না করার টুলটা থেকে মেঝেয় ছিটকে পড়ে গিয়েছিলো কনক।তারপর গলায় আটকে থাকা শ্বাসটাকে কোনমতে গিলে,মেঝে থেকে উঠে কোমরটাকে একহাতে ডলতে ডলতে অন্যহাতে হাতা ডুবিয়ে মাংসের ঝোল থেকে উদ্ধার করেছিলো ফোনটাকে।সেটা অবশ্য দেহ রেখেছে ততক্ষণে।ব্যস,আর কোনও ঝুঁকি নেয়নি কনক।সেই ঘটনার পর থেকে যোগাযোগের এই ব্যবস্থা।</p>



<p>মুস্তাক আর কনকের গোপন সাক্ষাৎ ও প্রেমের মিলনের সাক্ষী থাকে কনকের ঘরের সোফাটি।ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কনক তার ভিতরের শোয়ার ঘরের কলুষিত শয্যায় কখনও নিয়ে যায় না মুস্তাককে।কনকের জীবনের রুক্ষ,শুষ্ক,তপ্ত,দুঃসহ মরুভূমির বুকে এক চিলতে মরূদ্যান যেন তার এই সোফাওয়ালা ঘরটি।নীরবে,নিভৃতে বৃষ্টি নামে এখানে,ভিজে তৃপ্ত,স্নিগ্ধ হয় দুটি শরীর ও মন।তৃতীয় কোন ব্যক্তি জানতে পারে না সেই বৃষ্টির খবর।<br>একদিন মুস্তাক তাকে বলে,<br>&#8220;আগামী সপ্তাহে একশনে বেরিয়ে যাবো।ফিরে এসে নিয়ে যাবো তোমাকে।একটা ঘর দেখে এসেছি মাইথনের কাছে কুমারডুবিতে।শোনো মন দিয়ে,খোঁজ নিয়েছি গলির মোড়ে ওই পানওয়ালা হোলির সময় দু সপ্তাহের জন্য দেশে যাবে দোকান বন্ধ রেখে।ওই সুযোগে পালাতে হবে।তুমি কিন্তু এ&#8217;কদিন খুব সাবধানে থেকো।তোমার বর যেন কোনরকম সন্দেহ না করে বসে।&#8221;<br>&#8220;কবে আসবে?আমার যে খুব ভয় করছে।&#8221;<br>&#8220;ধূর পাগলী,ক&#8217;টা দিনের তো ব্যাপার।একটু কষ্ট করে থাকো, কেমন?&#8221;</p>



<p>হোলি আসছে।কানা গলির মধ্যে যেটুকু রোদহাওয়া যাওয়া আসা করে, তাতে লেগেছে ফাগুনের মৌতাত।কোথা থেকে যে নেশাগ্রস্তের মতো একটা কোকিল ডেকে চলে দিনরাত কে জানে!দূর থেকে রাতের বেলায় ভোজপুরী ভাষায় ঢোল সহযোগে হোলির গান ভেসে আসে কনকের কানে।</p>



<p>“ফাগুন মে উড়ে গুলাল,কহিও নন্দরানীসে/হমারী রাধা ভোলিভালি,নটখট নন্দ কে লাল,কহিও নন্দরানিসে/<br>রাধা কে হাথ মে চুড়িয়া সোহে/চুড়িয়া সোহে রাধা কঙ্গন সোহে/বংশি বাজাওয়ে নন্দলাল কহিও নন্দরানীসে”…</p>



<p>গান তো নয়,যেন উচ্চকন্ঠে রাধার বিরহবিলাপের ক্রন্দনধ্বনি ভেসে আসে দূর থেকে।মুস্তাকের সঙ্গে প্রায় ষোল সতেরো দিন হলো কোন যোগাযোগ নেই কনকের।মুস্তাক যে এই বাড়িটায় নেই সেটা ভাবলে কান্নার একটা দলা এসে আটকে যায় কনকের গলায়।দেখা হোক না হোক,মুস্তাক যে ঠিক ওপরের তলাটায় রয়েছে,চলা ফেরা করছে,এটাই অনেক,অনেকটা ওর কাছে।বিষাদঘন আবছা আঁধারে একা চুপচাপ বসে কান্না গিলতে থাকে কনক।দুঃখে,আশঙ্কায়,উৎকণ্ঠায়,উত্তেজনায় সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে সোফার চাদরটা,যেটায় মুস্তাকের স্পর্শ লেগে আছে এখনো যেন,মনে হয় তার।দুশ্চিন্তার ধোঁয়ার কুন্ডলী ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে কনককে।<br>কি হবে? পারবে তো পালাতে?মতিন এখন কলকাতায় নেই।কি ধান্দায় না জানি শিলিগুড়ি গেছে।ইস!এই সময়টায় বেরিয়ে যেতে পারলে…..</p>



<p>এইসব সাতপাঁচই কনক ভাবছিলো সেই রাতে নিজের ঘরে বসে বসে।হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ে উঠলো।চমকে উঠলো কনক।কে এলো?মুস্তাক তো কড়া নাড়ে না,প্রথমে একবার,তারপর পরপর তিনবার মৃদু টোকা দেয়।ওটাই সংকেত।ধন্দে পড়ে গেলো কনক,দরজা খুলবে কি খুলবে না ভেবে।এরপরই প্রচন্ড জোরে কড়া নাড়ার শব্দ উঠলো দরজায়,তারপর ধাক্কার পর ধাক্কা,দরজা যেন ভেঙ্গে পড়বে।<br>দরজা খুলতেই আতঁকে ওঠে কনক।</p>



<p>মুস্তাক।</p>



<p>রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে তার জামা।মেঝেতে আছড়ে পড়ে কোনমতে বুক ঘষটে সে লুকোয় সোফার পিছনে।কিছু বলার বা বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড়িয়ে পুলিশের দল ঢুকে পড়ে কনকের ঘরে।রক্তের দাগ লক্ষ্য করে গুলিবৃষ্টি চালাতে থাকে তারা,গুলিতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় সোফাটা। বিস্ময়ের প্রাথমিক আঘাতটা কাটিয়ে উঠে এক পা এগোতেই কনককে একজন পুলিশ এক ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয় পেছনে।টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো কনক। বোবা আতঙ্কে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এলো কনকের।তার সামনেই সোফার পিছন থেকে পুলিশ টেনে বের করলো মুস্তাকের গুলিবিদ্ধ, নিষ্প্রাণ দেহটা।একজন পুলিশ অফিসার কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলো কনককে,<br>&#8220;কি সম্পর্ক আপনার,এই গুন্ডাটার সাথে?&#8221;</p>



<p>পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে সহসা যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।মহাশূন্যের কোন এক কৃষ্ণগহ্বরে আছড়ে পড়ে নিশ্চল হয়ে গেছে সময়ঘড়ির কাঁটা।কনকের কানের কাছে অজস্র ঝিঁ ঝিঁ পোকার অসহ্য বিরামহীন ডাক।তারই মধ্যে পুলিশ অফিসারের কড়া গলায় প্রশ্ন ভেসে আসে আবার,”কি হলো?চুপ করে থাকলে হবে না, উত্তর দিন।গুন্ডাটাকে চেনেন আপনি?কি সম্পর্ক আপনার এর সাথে?”<br>&#8220;কোন সম্পর্ক নেই।ওপরের ঘরে ভাড়া থাকতো,মাঝে মাঝে চাবি রেখে যেতো।&#8221; কনক নয়,যেন অন্য কে একজন ওর ভেতর থেকে উত্তর দিলো।<br>পুলিশ অফিসার আপাদমস্তক একবার মেপে নিলেন কনককে।তারপর আবার প্রশ্ন করলেন,&#8221;আপনি তো বিবাহিত দেখছি।আপনার স্বামী কোথায়?&#8221;<br>&#8220;বাইরে গেছে, কাজে।&#8221;,যন্ত্রচালিতের মতো উত্তর দিলো কনক।<br>&#8220;ঠিক আছে,কাল সকালে পুলিশের স্পেশাল টিম আসবে তদন্ত করতে।আপনাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।কোথাও যাবেন না,বাড়িতেই থাকবেন যেন।”,আদেশের সুরে বললেন অফিসার।কোনমতে মাথা নেড়ে সায় দিলো কনক।<br>“পান্ডে,সান্যাল বাইরে থেকে স্পট সিল করে দাও।বডি ভ্যান আসছে?খবর দিয়েছো?”অন্য পুলিশদের দিকে তাকিয়ে বললেন অফিসার।<br>“হ্যাঁ,স্যার।এসে গেছে।গলির মুখটাতেই রয়েছে।”,উত্তর দিল আরেকজন।</p>



<p>মুস্তাকের দেহ পুলিশদের দল নিয়ে চলে গেল।আরো একটা দল এসে স্পট সীল করে দিলো।তাদের মধ্যে থেকে একজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে বললো,“দরজাটা ভেতর থেকে ভালো করে বন্ধ করে দিন।আর একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি,সেভ করে নিন।আর আপনার ফোন নম্বরটাও দিন।”<br>“ফোন তো নেই,খারাপ হয়ে গেছে।”একই রকম যান্ত্রিক সুরে উত্তর দিলো কনক।<br>কনককে দেখে বোধহয় মায়া হচ্ছিলো পুলিশ কনস্টেবলটির।“ও আচ্ছা,যাই হোক।চিন্তা করবেন না।গলির মোড়ে চারজন সিভিল ড্রেসের পুলিশ পোস্টেড আছে।ওরা নজর রাখবে।”আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো সে।<br>“আচ্ছা।”,নিষ্প্রাণ কন্ঠে সায় দিলো কনক।</p>



<p>পুলিশ কনস্টেবলটি বেরিয়ে গেলে ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে পাথরের মূর্তির মতো ঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে রইলো কনক।প্রহরের পর নিকষ কালো প্রহর কেটে যেতে লাগলো।একসময় দূর থেকে ভেসে এলো দিনের প্রথম কাকের ভীতু,দ্বিধাগ্রস্ত ডাক।সম্বিৎ ফিরলো কনকের।কাপড়ের খুঁট দিয়ে ঘষে ঘষে মাথার সিঁদুরটা তুললো সে।শুকনো,খরখরে চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বসে থেকে থেকে একসময় মেঝেতে শুয়ে পড়ল কনক।</p>



<p>পরদিন সকালে দরজা ভেঙ্গে কনকের লাশ উদ্ধার করলো পুলিশ।সোফার লেস লাগানো চাদরটা গলায় বেঁধে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে কনক।তার ঝুলন্ত দেহের নীচে উল্টে পড়ে আছে পুলিশের গুলিতে ফুঁড়ে যাওয়া তার প্রিয় সোফাটা।</p>



<p><em>এই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব এবং এই সম্পর্কিত কোনো দায় কতৃপক্ষের নয় ।</em></p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/">সোফা</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/sofa-short-story-by-antara-chattopadhyay/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সেনকো গোল্ড গণেশ চতুর্থী অফার</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/senco-gold-and-diamonds-ganesh-chaturthi-offer/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/senco-gold-and-diamonds-ganesh-chaturthi-offer/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 11 Sep 2026 11:33:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Fashion]]></category>
		<category><![CDATA[Goynagati]]></category>
		<category><![CDATA[Most Popular]]></category>
		<category><![CDATA[interior design application]]></category>
		<category><![CDATA[senco gold]]></category>
		<category><![CDATA[senco gold and diamonds]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11212</guid>

					<description><![CDATA[<p>সীমিত সময়ের জন্য লোভনীয় অফার।</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/senco-gold-and-diamonds-ganesh-chaturthi-offer/">সেনকো গোল্ড গণেশ চতুর্থী অফার</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>গণেশ চতুর্থীর শুভক্ষণে সাজে আসুক ঐতিহ্য, আর অলঙ্কারে ফুটে উঠুক আপনার নিজস্ব রুচি। এই বিশেষ উৎসব উপলক্ষে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনকো গোল্ড  অ্যান্ড ডায়মন্ডসের বর্ণিল সম্ভারে  থাকছে আকর্ষণীয় অফার, সঙ্গে সোনার, হিরের ও অন্যান্য জুয়েলারির মনোমুগ্ধকর সম্ভার। সীমিত সময়ের জন্য এই লোভনীয় অফারে সোনার গয়নার মূল্যের ওপর  ২৫০টাকা ছাড় , মেকিং চার্জে  ফ্ল্যাট ২৫% ছাড় , হীরের গয়নার মেকিং চার্জের ওপর ফ্ল্যাট ৭৫ % ছাড় আর হিরের মূল্যের ওপর ১৫ % ছাড়।   উৎসবের আবহে প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া হোক কিংবা নিজের সাজে যোগ হোক নতুন ঔজ্জ্বল্য-পছন্দের গয়নায় এই উৎসব হয়ে উঠুক আরও স্মরণীয়। রইল এই বিপুল সম্ভারের কিছু ঝলক –</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="426" height="495" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-divine-sparkle.png" alt="" class="wp-image-11215" style="aspect-ratio:0.8606060606060606;width:452px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-divine-sparkle.png 426w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-divine-sparkle-258x300.png 258w" sizes="(max-width: 426px) 100vw, 426px" /></figure>



<p><strong>ডিভাইন স্পার্কল গণেশা ডায়মন্ড পেন্ডেন্ট</strong> &#8211; দীপ্তিময় সোনায় নিপুণ কারুকাজে গড়া এই গণেশ-অনুপ্রাণিত পেনড্যান্টে উদ্‌যাপন করুন ঐশ্বর্য, মঙ্গল ও সৌন্দর্য। ওপেনওয়ার্ক নকশায় ফুটে উঠেছে ভগবান গণেশের চিরপরিচিত অবয়ব, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝলমলে হিরের অর্ধচন্দ্রাকার অলঙ্করণ এবং শুঁড়ে বসানো একটি একক হিরে। ঐতিহ্য ও আধুনিক রুচির এই অনন্য মেলবন্ধন প্রতিদিনের সাজে যেমন মানানসই, তেমনই বিশেষ মুহূর্তে আপনার ব্যক্তিত্বে যোগ করবে এক আলাদা দীপ্তি।</p>



<p><a href="https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/divine-sparkle-ganesha-diamond-pendant">https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/divine-sparkle-ganesha-diamond-pendant</a></p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="557" height="607" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-holy-ganesha.png" alt="" class="wp-image-11218" style="aspect-ratio:0.9176276771004942;width:451px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-holy-ganesha.png 557w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-holy-ganesha-275x300.png 275w" sizes="(max-width: 557px) 100vw, 557px" /></figure>



<p><strong>হোলি গণেশা গোল্ড পেন্ডেন্ট</strong> &#8211;  জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আশীর্বাদের গুরুত্ব অপরিসীম। সুসময়ের আনন্দে যেমন, তেমনই দুঃসময়ের অন্ধকারেও মনে সাহস জোগায় মঙ্গল ও শুভশক্তির বিশ্বাস। ভগবান গণেশের মঙ্গলময় অবয়ব, সোনার উজ্জ্বলতা এবং সূক্ষ্ম নকশার এই অনন্য মেলবন্ধন প্রতিদিনের সাজে যোগ করবে এক বিশেষ আবেশ। নিজের জন্য হোক কিংবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য, এই অলঙ্কার বয়ে আনুক শুভকামনা, ভালোবাসা আর অফুরান মঙ্গল বার্তা। জীবনের প্রতিটি দিনে, ভালো থাকুন, হাসিমুখে থাকুন।<a href="https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/holy-ganesha-gold-pendant">https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/holy-ganesha-gold-pendant</a></p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="512" height="566" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-pure-presence-gold.png" alt="" class="wp-image-11220" style="aspect-ratio:0.9045936395759717;width:452px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-pure-presence-gold.png 512w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-pure-presence-gold-271x300.png 271w" sizes="(max-width: 512px) 100vw, 512px" /></figure>



<p><strong>পিওর প্রেসেন্স গোল্ড পেন্ডেন্ট </strong>&#8211; পরিশীলিত নকশা, গভীর তাৎপর্য আর অনায়াস সৌন্দর্যের অনন্য মেলবন্ধন এই গণেশ গোল্ড পেনড্যান্টে। ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক শিল্পরুচির মেলবন্ধনে গড়া এই অলঙ্কার শুধু সাজের অনুষঙ্গ নয়, জ্ঞান, শুভবুদ্ধি ও ইতিবাচকতার এক সুন্দর প্রতীক।প্রতিদিনের ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে তৈরি, তাই স্বচ্ছন্দে মিশে যায় আপনার দৈনন্দিন জীবনে। পোশাক বা উপলক্ষের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে, এই পেনড্যান্ট আপনার সাজে যোগ করে এক সংযত, মার্জিত দীপ্তি &#8211; যেখানে সৌন্দর্য প্রকাশ পায় নিঃশব্দ অথচ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে।<a href="https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/pure-presence-gold-pendant">https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/pure-presence-gold-pendant</a></p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="547" height="587" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-auspicious-aura.png" alt="" class="wp-image-11223" style="aspect-ratio:0.9318568994889267;width:452px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-auspicious-aura.png 547w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/senco-auspicious-aura-280x300.png 280w" sizes="(max-width: 547px) 100vw, 547px" /></figure>



<p><strong>অসপিশাস অরা গণেশ গোল্ড পেন্ডেন্ট</strong> &#8211; সোনার আবরণে ঘেরা, লাল এনামেলের মনোমুগ্ধকর ছোঁয়ায় সজ্জিত এই গণেশ পেনড্যান্টে ফুটে উঠেছে পবিত্রতা, প্রজ্ঞা ও শক্তির প্রতীকী সৌন্দর্য। সমৃদ্ধি ও আশীর্বাদের এক শিল্পিত প্রকাশ, এই অলঙ্কার যেন চিরন্তন ভক্তি ও বিশ্বাসকে ধারণ করে। ঐতিহ্যের গভীরতা আর নান্দনিক কারুকাজের এই মেলবন্ধন আপনার সাজে যোগ করবে এক মঙ্গলময়, কালজয়ী দীপ্তি।<a href="https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/auspicious-aura-ganesh-gold-pendant">https://sencogoldanddiamonds.com/jewellery/auspicious-aura-ganesh-gold-pendant</a></p>



<p><em><strong>মনে রাখবেন</strong> &#8211; প্রদর্শিত ছবির সঙ্গে আসল পণ্যের মাপের সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। ফটোগ্রাফির সময় ব্যবহৃত আলোর তারতম্যের কারণে পণ্যের রঙ বাস্তবের তুলনায় সামান্য ভিন্ন দেখাতে পারে।</em></p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/senco-gold-and-diamonds-ganesh-chaturthi-offer/">সেনকো গোল্ড গণেশ চতুর্থী অফার</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/senco-gold-and-diamonds-ganesh-chaturthi-offer/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>বাড়িতে চিকিৎসায় গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/home-care-maximon-india-guardian-family-card/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/home-care-maximon-india-guardian-family-card/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 11 Sep 2026 02:36:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Most Popular]]></category>
		<category><![CDATA[Prescription]]></category>
		<category><![CDATA[Susyastha]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11206</guid>

					<description><![CDATA[<p>পেশাদার স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাবে বাড়ির দরজায়।</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/home-care-maximon-india-guardian-family-card/">বাড়িতে চিকিৎসায় গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>হাসপাতালে ছোটাছুটি নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা যদি পৌঁছে যায় আপনার বাড়ির দরজায়? আধুনিক জীবনে এই প্রশ্নের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষত বাড়িতে প্রবীণ বাবা-মা রয়েছেন, পরিবারের কোনও সদস্য দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন, অথবা কর্মসূত্রে সন্তানকে অন্য শহরে থাকতে হয়-তাঁদের কাছে বাড়িতে চিকিৎসা ও পরিচর্যার সুবিধা হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।</p>



<p>এই পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্যপরিচর্যার চাহিদার কথা মাথায় রেখেই ম্যাক্সিমন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড&nbsp; নিয়ে এসেছে গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড &#8211; তিন বছরের একটি পারিবারিক হেলথকেয়ার মেম্বারশিপ, যার মাধ্যমে একাধিক পেশাদার স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাবে বাড়ির দরজায় অর্থাৎ চিকিৎসা যখন পৌঁছে যাবে বাড়িতে।</p>



<p>আজকের ব্যস্ত জীবনে প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাওয়া অনেকের কাছেই যথেষ্ট কঠিন। প্রবীণ মানুষ, নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে এমন রোগী কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাধীন পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও বেশি। গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ডের&nbsp; মাধ্যমে বাড়িতে ডাক্তার দেখানোর পাশাপাশি পাওয়া যাবে নার্সিং ও অ্যাটেনড্যান্ট কেয়ার, জেরিয়াট্রিক কেয়ার ম্যানেজমেন্ট, বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, ডায়াগনস্টিক স্যাম্পল সংগ্রহ, ফিজিওথেরাপি এবং মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট ভাড়া বা কেনার সুবিধা।</p>



<p>শুধু তাই নয়, রয়েছে প্রায়োরিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, হেলথ রেকর্ড কো-অর্ডিনেশন এবং বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা ও ফার্মেসি পরিষেবায় ছাড়ের সুবিধা।</p>



<p>অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পরিষেবার বদলে পরিবারের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরিচর্যাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা।</p>



<p>দূরে থাকা সন্তানদের জন্যও কি হতে পারে ভরসা?</p>



<p>এখন বহু পরিবারেই সন্তান কর্মসূত্রে কলকাতার বাইরে, অন্য রাজ্যে কিংবা বিদেশে থাকেন। বাবা-মা থাকেন নিজের শহরে। প্রতিদিন পাশে থাকা সম্ভব না হলেও তাঁদের চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় পরিচর্যার বিষয়ে নজর রাখা তো জরুরি।সেই জায়গাতেই হোম হেলথকেয়ার-এর গুরুত্ব বাড়ছে। হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি দৈনন্দিন স্বাস্থ্যপরিচর্যার একটি অংশ যদি বাড়িতেই পাওয়া যায়, তাহলে পরিবারের সদস্যদের জন্য তৈরি হতে পারে বাড়তি নিশ্চিন্তি। আর এখানেই গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ডের ভাবনা &#8211; যাঁরা একদিন আমাদের যত্ন নিয়েছেন, তাঁদের যত্নের দায়িত্বকে আরও সহজ ও সংগঠিত করে তোলা।</p>



<p>তিন বছরের মেম্বারশিপে কী কী?</p>



<p>গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ডের মূল্য মাত্র  ₹৩,৯৯৯ এবং মেয়াদ তিন বছর।</p>



<p>মেম্বারশিপের সঙ্গে থাকছে কমপ্লিমেন্টারি- ইসিজি লিপিড প্রোফাইল সিবিসি এফবিএস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ।এছাড়াও যোগ্য সদস্যদের জন্য রয়েছে ₹৫ লক্ষ পর্যন্ত অ্যাক্সিডেন্টাল ইনসিওরেন্স কভার  এবং ₹১ লক্ষ অ্যাক্সিডেন্টাল মেডিকেল বেনিফিট  ,তবে এগুলি প্রযোজ্য বিমা পলিসির শর্ত, বর্জন, যোগ্যতা ও অন্যান্য নিয়মের অধীন।শুধু পরিষেবা নয়, একটি দায়িত্বের ভাবনার বিকাশ ।গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের এই শুভলগ্নে প্রধান অতিথি রূপে উপস্থিত ছিলেন কবি ও সাহিত্যব্যক্তিত্ব বীথি চট্টোপাধ্যায়, যিনি উদ্বোধনী মেম্বারশিপ গ্রহণ করেন।</p>



<p>তাঁর বক্তব্যের মূল ভাবনাতেই উঠে আসে এই পরিষেবার প্রয়োজনীয়তা-স্বাস্থ্যপরিচর্যা যেন শুধু হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিশেষ করে প্রবীণ ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সহায়তার প্রয়োজন হলে বাড়িতে পেশাদার পরিষেবা তাঁদের জীবনকে আরও স্বচ্ছন্দ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে পারে।</p>



<p>আপনার পরিবারেরও কি প্রয়োজন এমন একটি ‘গার্ডিয়ান ’?বাড়িতে কি রয়েছেন বয়স্ক বাবা-মা?কেউ কি নিয়মিত ওষুধ খান?কর্মসূত্রে কি আপনাকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হয়? অথবা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যপরিচর্যার জন্য কি একটি সংগঠিত ব্যবস্থা চাইছেন?তাহলে গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যেতে পারে। কারণ স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু হাসপাতালের মধ্যে নয়-আপনার নিজের বাড়ির দরজার কাছেও।</p>



<p>এই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর সোমনাথ ভট্টাচার্য বলেন, &#8220;এখন বহু ছেলেমেয়ে দেশে-বিদেশে থাকেন, শহর থেকে মফস্সলে প্রবীণরা বড্ড একা। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৫ শতাংশ বয়স্ক মানুষ। ২০৪৬ সালে সংখ্যাটা আরও বাড়বে। তাঁদের খেয়াল রাখতেই, পাশে থাকতেই এই বিশেষ পরিষেবার কথা ভাবা হয়েছে। এঁরা একা থেকেও একা নন, যদি সাথে থাকে &#8216;গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড&#8217;। শুধু বাড়িতেই সব পরিষেবা নয়, কিছু হলে হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে আবার সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে আনা-সব ধরনের পরিচর্যাই মিলবে এই কার্ডের আওতায়।&#8221;</p>



<p>বিস্তারিত জানতে ও পরিষেবার জন্য : 9831672572, 6290225511 -৮৭/২৪৩ রাজা এস সি মল্লিক রোড ,কলকাতা – ৭০০০৪৭ ।ওয়েবসাইট – <a href="http://www.maximonindia.com">www.maximonindia.com</a>     </p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/home-care-maximon-india-guardian-family-card/">বাড়িতে চিকিৎসায় গার্ডিয়ান ফ্যামিলি কার্ড</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/home-care-maximon-india-guardian-family-card/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সার্ধশতবর্ষে  শরৎচন্দ্র</title>
		<link>https://sukanyadigital.com/saratchandra-chattopdhyay-150th-birth-anniversary/</link>
					<comments>https://sukanyadigital.com/saratchandra-chattopdhyay-150th-birth-anniversary/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sukanya Admin]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 11 Sep 2026 02:27:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Bongodarpan]]></category>
		<category><![CDATA[Featurerd]]></category>
		<category><![CDATA[Rochona]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sukanyadigital.com/?p=11195</guid>

					<description><![CDATA[<p>সার্ধশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাই তাঁকে স্মরণ করা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এ এক সাহিত্যিকের কাছে ফিরে যাওয়া...</p>
<p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/saratchandra-chattopdhyay-150th-birth-anniversary/">সার্ধশতবর্ষে  শরৎচন্দ্র</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য পাঠ করলে মনে হয়, তিনি মানুষের জীবনের খুব কাছ থেকে কথা বলছেন—এমন এক নৈকট্য, যেখানে চরিত্র আর পাঠকের মধ্যে কল্পনার দূরত্বটুকুও যেন থাকে না। তাঁর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা কোনো অলৌকিক মহিমায় উজ্জ্বল নন; তাঁরা আমাদেরই সমাজের মানুষ, আমাদের ঘরের, আমাদের চারপাশের। তাঁদের প্রেমে যেমন আকুলতা, তেমনই আছে সামাজিক নিষেধের দহন; তাঁদের প্রতিবাদে যেমন সাহস, তেমনই আছে একাকিত্বের অনিবার্য মূল্য। বিশেষত নারীর জীবন, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি আজও আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। তিনি নারীর দুঃখকে কেবল করুণার বিষয় করেননি, তাঁর নীরবতার মধ্যেও শুনেছেন আত্মসম্মানের উচ্চারণ।</p>



<p>সার্ধশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাই তাঁকে স্মরণ করা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এ এক সাহিত্যিকের কাছে ফিরে যাওয়া, যিনি সহজ ভাষায় কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর রচনার জনপ্রিয়তার আড়ালে যে তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টি, মানবিক বোধ এবং যুগের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস লুকিয়ে আছে, এই বিশেষ বর্ষে সেই শরৎচন্দ্রকেই নতুন করে আবিষ্কার করা জরুরি। কারণ সময় বদলালেও মানুষের হৃদয়ের কিছু ক্ষত, কিছু আকাঙ্ক্ষা, কিছু অপমান এবং কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন থেকে যায়—আর সেইখানেই শরৎচন্দ্র আজও আমাদের সমকালীন।</p>



<p>বহু ভারতীয় ভাষায় তার গল্প উপন্যাসের অনুবাদ এই বিপুল জনপ্রয়িতার সাক্ষ্য। কিংবদন্তি গায়িকা শ্রীমতি আশা ভোঁসলে আর এক কিংবদন্তি শ্রী সলিল চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন &#8216;শরৎবাবু আমাদের বাড়িতে বিশেষত আমার আর দিদির নিয়মিত পাঠ্য।&#8217; সমাজের লাঞ্ছিত ও নিপীড়িতরা বিশেষত মেয়েরা শরৎচন্দ্রের গভীরতম সহানুভূতি পেয়েছেন।বলা যায় সহানুভূতি উদ্রেককারী কিন্তু তৎকালীন সামাজিক বিধিনিষেধ অমান্যকারী নারী ও পুরুষদের চরিত্রচিত্রন এক ভিন্ন স্বকীয়তা দাবি করে ।</p>



<p>বিদগ্ধ সমালোচকদের মতে তাঁর প্রতিভার শ্রেষ্ঠ সময় তাঁর মধ্যবর্তী রচনাগুলিতে।তৎকালীন সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে বিশেষত নারীদের ওপর অন্যায় তাঁকে বিচলিত করেছিল।যেমন চরিত্রহীন (১৯১৭) শ্রীকান্ত (১ম, ২য় ৩য় খন্ড) দেনাপাওনা ।</p>



<p>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন লেখক খুব বেশি নেই, যাঁর কলমে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া মানুষ এত গভীর মমতা এবং এত তীক্ষ্ণ সামাজিক বোধ নিয়ে উঠে এসেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। অথচ আজ, তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দিন বা কোনও জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের পুনঃপ্রদর্শন ছাড়া, আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক আলোচনায় শরৎচন্দ্র ক্রমশ যেন দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে তাঁর নাম পরিচিত, তাঁর কয়েকটি উপন্যাসের নামও পরিচিত—কিন্তু তাঁর লেখার সামাজিক অভিঘাতটি কি সত্যিই আমরা আর অনুভব করি? তিনি ছিলেন এমন এক কথাসাহিত্যিক, যিনি উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলার নারীর সামাজিক বন্দিদশাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।</p>



<p>&#8216;বাংলা সাহিত্যের সময় ইতিহাস লেখক &#8216; বইতে&nbsp; শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ -১৯৩৮ )কে বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঐ বইটি থেকে কিছু&nbsp; অংশ &#8211; পূর্ববর্তী শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের দ্বারা তিনি যেমন প্রভাবিত হয়েছিলেন তেমনি নিজের মানসপ্রবণতা অনুযায়ী স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টিও&nbsp; করেছিলেন। জীবনের নৈমিত্তিক ঘটনার স্বল্পচ্ছ্বাসিত তরঙ্গগুলির সঙ্গে জড়িয়ে মানব -চরিত্রাঙ্কন। তিনি&nbsp; নীতিবোধের দিক থেকে সামাজিক রক্ষনশীলতাকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন।এ আঘাত কোথাও -ই বিদ্রোহের রূপ নেয়নি, কিন্তু সংস্কারাচ্ছন্নতা এবং রক্ষণশীলতার দ্বারা নিষ্পিষ্ট মানুষের প্রতি লেখকের সহানুভূতি শতধারায় উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে।</p>



<p>শরৎচন্দ্রের ঔপন্যাসিক প্রবণতা &#8211;</p>



<p>১ ) শরৎচন্দ্র অত্যন্ত আবেগপ্রবণ শিল্পী। আবেগকে সংহত ও সংযত করলে তা শিল্পকর্ম হয়ে দাঁড়ায়। সর্বদা তিনি সে- সিদ্ধিতে পৌঁছতে চাননি।তিনি জীবনকে ভাবাবেগের আতিশয্যের মধ্য দিয়ে দেখেছেন।তাঁর ভাষারীতি এবং বাচনভঙ্গিতেও&nbsp;&nbsp; উচ্ছাসের প্রবণতা লক্ষণীয়।</p>



<p>২)তিনি আসলে পারিবারিক জীবনের রূপকার। তাঁর বড়গল্পগুলিতে (&#8216;রামের সুমতি&#8217;, &#8216;বিন্দুর ছেলে&#8217;,&#8217;নিষ্কৃতি &#8216;, &#8216;মেজদিদি &#8216; )&nbsp; পরিবার জীবনের কাহিনী ও সমস্যা প্রাধান্য পাওয়ায় এখানে এক অভিনব পরিবার -রসের আবেদন সৃষ্টিতে তিনি সমর্থ হয়েছেন।সমকালের সংসারী বাঙালি নর-নারী শিশু-কিশোরের জীবন ও বাংলার পল্লীসমাজ এই গল্পগুলির মধ্যে সার্থকভাবে ধরা পড়েছে।</p>



<p>৩) সামাজিক সংস্কার ও নীতিবোধ &#8211; এই বিশিষ্ট প্রশ্ন শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সমস্যা। সেই সময়ের বাংলাদেশের গ্রাম-সমাজের নানা কদাচার সমাজ প্রধানদের অন্যায় স্বার্থপরতা জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণ এবং মানুষের হীনমন্যতাকে শরৎচন্দ্র দ্বিধাহীন চিত্তে ধিক্কার দিয়েছেন। বিবাহে যদি ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার চরিতার্থতা নাও মেলে তবুও মনের মধ্যে তাকে গুরুতর মূল্য দিতে তিনি সংকুচিত হন&nbsp; নি। রাজলক্ষীর মতো নারীর জীবনে বাইজিবৃত্তির মধ্যে বঙ্কুর মাতৃত্বের সংস্কার কাজ করেছে। মৃণালের বিবাহে&nbsp; তার বাসনা-কামনার সম্পত্তি ঘটেছে ; অথচ এই অসম মিলনকেও শরৎচন্দ্র এতবড়ো সত্যরূপে গ্রহণ করেছেন যাতে জীবনসংগ্রামে ভগ্নতরী যাত্রীরা ঐ পোতেই আশ্রয় খুঁজেছে। অন্নদাদিদি যে দুঃখের ও লাঞ্ছনার মধ্যেও আগুনের শিক্ষার মতো জ্বলেছে তার কারণ ঐ ছন্নছাড়া সাপুড়ের সঙ্গে তার প্রকৃত সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর। বৈধ্যবের সংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি রমা কিংবা সাবিত্রী মুক্তির কথা ভাবতে পারেনি বড়দিদি।</p>



<p>৪) শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র দেশে তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। নারীচরিত্র সৃষ্টিতে তিনি একটি বিশেষ প্যাটার্নের অনুসরণ করেছেন। তাঁর নারীচরিত্রগুলির মধ্যে যেসব পার্থক্য দেখা যায় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্বের ভিত্তি পর্যন্ত প্রসারিত নয়। সে পার্থক্য প্রায়ই ঘটনা ও পরিবেশগত। বাঙালি নারীর যে মূর্তি পরিবার জীবনের কেন্দ্রে অবস্থিত সেই রাজেন্দ্রাণী রূপেরই পূজা করেছেন শরৎচন্দ্র।নারী এ-সমাজে অবহেলিতা, লাঞ্ছিতা নিস্করুণ আচারে শুষ্কপ্রাণ -এইসব সমালোচনা তাঁর উপন্যাসে তীব্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলেও বাঙালি সংসারের নিয়ন্ত্রণী শক্তি নারীকে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়েছেন। শরৎচন্দ্রে নারীর যে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ দেখি তার সূত্রও এই জীবনকেন্দ্র থেকেই সঙ্কলিত। সুতীব্র&nbsp; অভিমান ও সর্বব্যাপী কতৃত্বের&nbsp; মধ্যে এই নারী আপন ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছে। এর জন্য তার কোনো বাইরের শিক্ষার প্রয়োজন হয়নি।এ শিক্ষা যেন যুগ যুগ ধরে বাঙালি পরিবার -জীবনের মর্মস্থলে অঙ্কিত হয়ে আছে।</p>



<p>৫)বাংলার পল্লীগ্রামের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ট পরিচয় ছিল ।পল্লীগ্রামের&nbsp; পটভূমিকা তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাসেই ব্যাপ্ত । পল্লীর মানুষ তাঁর উপন্যাসে প্রধানত দুটি স্বতন্ত্র টাইপ রূপে দেখা দিয়েছে । তাদের একদল পরশ্রীকাতর কূটবুদ্ধি, সংকীর্ণমনা এবং স্বার্থসর্বস্ব । অপর দল সরলহৃদয় উদারচরিত্র সুক্ষ নাগরবৈদগ্ধ -বর্জিত প্রসন্ন হাস্যে উজ্জ্বল ।</p>



<p>‘চরিত্রহীন নারীর চরিত্র কে ঠিক করবে?-‘চরিত্রহীন-এর কিরণময়ীকে আজকের চোখে পড়লে বিস্মিত হতে হয়। সমাজ যে নারীকে ‘চরিত্রহীন’বলে দাগিয়ে দেয়, শরৎচন্দ্র তাঁর ভিতরের আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধি, ক্ষত, অসন্তোষ এবং অস্তিত্বের সংকটকে দেখার চেষ্টা করেছেন।সমাজের বিচারে নারীর যৌনতা ছিল অপরাধ; পুরুষের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল ক্ষমতার প্রকাশ। এই দ্বিচারিতাকে শরৎচন্দ্র সরাসরি সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় ব্যাখ্যা করেননি। তিনি তার চেয়েও শক্তিশালী কাজটি করেছেন—একজন ‘অগ্রহণযোগ্য’ নারীর ভিতরে মানুষটিকে দেখিয়েছেন।আজকের ভাষায় আমরা যে প্রশ্নগুলি করি—একজন নারীর নিজের জীবনের উপর অধিকার কতটা? সমাজের তৈরি ‘চরিত্র’-এর সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? নারী কি নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে পারে?—এই প্রশ্নগুলির বীজ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বহু আগেই উপস্থিত।</p>



<p>‘শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মী ও অভয়া’-শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মীকে শুধু শ্রীকান্তের প্রেমিকা হিসেবে পড়া তাঁর প্রতি অবিচার। রাজলক্ষ্মী এমন এক নারী, যিনি সমাজের নির্ধারিত পথ থেকে বহু দূরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব তৈরি করেন। তাঁর জীবনে প্রেম আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, আত্মসম্মান আছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আছে—এবং আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে অবিরাম সংঘাত।আর অভয়া?</p>



<p>স্বামীর অত্যাচার, সামাজিক বিধি এবং তথাকথিত ‘স্ত্রীধর্ম’-এর সামনে অভয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভয়াবহ সাহসী। সে প্রশ্ন তোলে—শুধু বিবাহিত বলেই কি একজন নারীকে অত্যাচার সহ্য করে যেতে হবে?</p>



<p>আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অভয়ার সেই প্রশ্নকে আমাদের খুব আধুনিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শরৎচন্দ্র যখন লিখছেন, তখন এই প্রশ্ন ছিল সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রায় বিস্ফোরণ।</p>



<p>গৃহদাহ’র অচলা -অচলাকে বোঝার জন্য শুধু ত্রিভুজ প্রেমের গল্প হিসেবে ‘গৃহদাহ’ পড়লে চলবে না। অচলা এমন এক সমাজের প্রতিনিধি, যেখানে নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে সংঘাত প্রায় অনিবার্য।শরৎচন্দ্র নারীর সিদ্ধান্তকে সবসময় মহিমান্বিত করেননি। তিনি তাঁদের দুর্বলতাও দেখিয়েছেন, দ্বিধাও দেখিয়েছেন, ভুলও দেখিয়েছেন। এখানেই তাঁর নারীচরিত্রগুলি রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠে।</p>



<p>দেনাপাওনা’র &nbsp;নিরুপমা: পণ শুধু টাকা নয়।দেনাপাওনা’-র নিরুপমার ট্র্যাজেডি কোনও এক পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়। এর ভিতরে আছে পণপ্রথা, বিবাহের বাজার, নারীর উপর পারিবারিক মালিকানা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার নির্মম বাস্তবতা।বিয়ের সময় মেয়ের পরিবারকে যে অর্থনৈতিক বোঝা বইতে হয়, তার সঙ্গে মেয়েটির নিজের ইচ্ছার সম্পর্ক প্রায় নেই। মেয়ের জীবন যেন একটি সামাজিক চুক্তির অংশ।শরৎচন্দ্র এই নিষ্ঠুরতাকে বক্তৃতা দিয়ে বোঝাননি। তিনি পাঠককে নিরুপমার যন্ত্রণার মধ্যে দাঁড় করিয়েছেন।আজও যখন পণ, গার্হস্থ্য হিংসা, বৈবাহিক নির্যাতন কিংবা মেয়ের বিয়েকে পরিবারের আর্থিক দায় হিসেবে দেখার প্রবণতা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়নি, তখন ‘দেনাপাওনা’ পুরনো বই বলে মনে হয় না।</p>



<p>‘দেবদাস’-এর পার্বতীকে আমরা কীভাবে পড়ি?’দেবদাস’কে আমরা সাধারণত এক ব্যর্থ প্রেমিকের ট্র্যাজেডি হিসেবে মনে রাখি। কিন্তু পার্বতীর দিকে তাকালে গল্পটির আর একটি মুখ দেখা যায়।পার্বতী অপেক্ষা করে, কিন্তু চিরকাল অপেক্ষা করে না। দেবদাসের দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সামাজিক সংকোচ যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করে, পার্বতী নিজের জীবনের বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায়।আর চন্দ্রমুখী?সমাজ যাকে ‘পতিতা’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, শরৎচন্দ্র তাঁর মধ্যেও ভালোবাসার ক্ষমতা, আত্মত্যাগ এবং মানবিক মর্যাদা খুঁজে পান।</p>



<p>অর্থাৎ একই উপন্যাসে তিনি একদিকে উচ্চবর্ণের ঘরের মেয়েকে, অন্যদিকে সমাজের তথাকথিত ‘পতিতা’ নারীকে পাশাপাশি দাঁড় করান। দুজনের সামাজিক অবস্থান আলাদা, কিন্তু দুজনেরই অনুভূতি, ভালোবাসা এবং যন্ত্রণা সত্য।এখানেই শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রোম্যান্টিক গল্পের ভিতর থেকেও বেরিয়ে আসে।</p>



<p>অনিলা দেবী ছদ্মনামে &#8216;নারীর মূল্য&#8217; প্রবন্ধে তাঁর কথায়- &#8216; নারীত্বের মূল্য কি? অর্থাৎ, কি পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণা, স্নেহশীলা, সতী এবং দুঃখে কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ, তাঁহাকে লইয়া কি পরিমাণে মানুষের সুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং কি পরিমাণে তিনি রূপসী! অর্থাৎ পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে কতটা পরিমাণে তিনি নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পারিবেন।&#8230; প্রায় কোন দেশেই পুরুষ নারীর যথার্থ মূল্য দেয় নাই; এবং তাহাকে নির্যাতন করিয়াই আসিতেছে।&#8217;..আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের কষ্টকে তিনি ‘মেয়েদের ব্যাপার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাননি।</p>



<p><strong>স্বীকৃতি ও পুরস্কার</strong></p>



<p>কুন্তলীন পুরস্কার (১৯০৪): ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘মন্দির’ ছোটগল্পের জন্য তিনি কুন্তলীন পুরস্কার লাভ করেন। এটিই তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম প্রাপ্ত কোনো স্বীকৃতি বা পুরস্কার। জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯২৩): বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রদান করে।&nbsp; ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৩৬): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি. লিট&nbsp; ডিগ্রি প্রদান করে সম্মানিত করে।</p>



<p>বি.এ. পরীক্ষার পেপারসেটার: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বি.এ. পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের প্রশ্নকর্তা বা পেপারসেটার হিসেবে নিয়োগ করেছিল।</p>



<p>ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (১৯৭৮, মরণোত্তর): তাঁর ‘স্বামী’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৭ সালের সেরা কাহিনীর পুরস্কার হিসেবে তিনি ১৯৭৮ সালে মরণোত্তর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ ডাকটিকিট প্রকাশ (১৯৭৯): ভারত সরকার শরৎচন্দ্রের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭৯ সালে একটি ২৫ পয়সার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।</p>



<figure class="wp-block-image size-full is-resized"><img loading="lazy" decoding="async" width="492" height="387" src="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/Sarat-Devdas.png" alt="" class="wp-image-11198" style="aspect-ratio:1.2713178294573644;width:449px;height:auto" srcset="https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/Sarat-Devdas.png 492w, https://sukanyadigital.com/wp-content/uploads/2026/09/Sarat-Devdas-300x236.png 300w" sizes="(max-width: 492px) 100vw, 492px" /></figure>



<p><strong>শরৎ সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ</strong></p>



<p>তার সাহিত্য-কর্মকে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়েছে।[তার মধ্যে &#8216;দেবদাস&#8217; উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলুগু ভাষায় আটবার তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে &#8216;দেবদাস&#8217; বাংলা ও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সুমিত্রা মুখার্জি, শাহরুখ খান, ঐশ্বর্য রাই বচ্চন, মাধুরী দীক্ষিত প্রমুখ। এছাড়া সন্ধ্যারানি ও উত্তমকুমার অভিনীত বিখ্যাত বাংলা ছবি &#8216;বড়দিদি&#8217;, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় অভিনীত &#8216;পরিণীতা&#8217; ছবি নির্মিত হয়। &#8216;পরিণীতা&#8217; উপন্যাস দু-বার চলচ্চিত্রায়িত হয়, বাংলা ছবির মধ্যে &#8216;বৈকুণ্ঠের উইল&#8217;, &#8216;বালক শরৎচন্দ্র&#8217;, উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত &#8216;চন্দ্রনাথ&#8217;, &#8216;রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত&#8217;, &#8216;কমললতা&#8217;, বসন্ত চৌধুরী ও মালা সিনহা অভিনীত &#8216;অভয়া ও শ্রীকান্ত&#8217; ; &#8216;বালক শরৎচন্দ্র&#8217;, &#8216;ইতি শ্রীকান্ত&#8217;, &#8216;রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত&#8217;, উত্তম কুমার মাধবী মুখার্জি অভিনীত &#8216;বিরাজ বউ&#8217; অন্যতম । হিন্দী ছবির মধ্যে ঋষিকেশ মুখার্জির হিন্দি ছবি &#8216;মাঝলি দিদি&#8217; অন্যতম। হিন্দী &#8216;স্বামী&#8217; (১৯৭৭) চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা লেখকের পুরস্কার পান । &#8216;বিন্দুর ছেলে&#8217; অবলম্বনে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি &#8216;ছোটি বহু&#8217; (১৯৭১) নামে বিখ্যাত হিন্দী চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে &#8216;দত্তা&#8217; চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেন এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন । ১৯৭৭ সালে &#8216;পথের দাবী&#8217; অবলম্বনে উত্তমকুমার অভিনীত &#8216;সব্যসাচী&#8217; চলচ্চিত্র নির্মিত হয় । তাঁর &#8216;দর্পচূর্ণ&#8217; গল্প অবলম্বনে ১৯৮০ সালে দর্পচূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় । এছাড়া &#8216;নববিধান&#8217; উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে &#8216;তুমহারি পাখি&#8217; নামে একটি ভারতীয় টিভি ধারাবাহিক নির্মিত হয়|</p>



<p><strong>কেন আজকের দিনে বাংলা&nbsp; সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ&nbsp;&nbsp; শরৎচন্দ্রের মতো এক মহীরুহ বিস্মৃতির আড়ালে ?</strong></p>



<p>আজকের&nbsp; দ্রুতগামী এবং ডিজিটাল-নির্ভর বিশ্বে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো বর্তমান প্রজন্মের পড়ার অভ্যাসের এক বিশাল পরিবর্তন; আজকের পাঠকেরা শরৎচন্দ্রের গভীর, আবেগঘন এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের সংক্ষিপ্ত ও তাৎক্ষণিক কনটেন্ট বেশি পছন্দ করেন। তদুপরি, তাঁর উপন্যাসে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের যে গ্রামীণ ও নগর জীবনের প্রেক্ষাপট ছিল—যা কঠোর জাতিভেদ প্রথা, যৌথ পরিবারের রাজনীতি এবং ঔপনিবেশিক সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ—তা আজকের বিশ্বায়নের যুগে বেড়ে ওঠা পাঠকদের কাছে বেশ দূরের এবং অচেনা মনে হয় কারণ সেই সামাজিক প্রেক্ষাপট আজকের বাঙালি জীবনে সম্পূর্ণ বদলে গেছে ।একান্নবর্তী পরিবারের দ্বন্দ্ব রাজনীতি পল্লী সমাজের বিধিনিষেধের এবং বিশেষত সমাজে নারীর অবস্থানের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি।</p>



<p>&nbsp;তাঁর গল্পে যে তীব্র মানবিক অনুভূতি, সমাজ সংস্কারের ডাক এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের কথা ছিল, তা আজ আধুনিক বিনোদন ও কৃত্রিম চাকচিক্যের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। শরৎচন্দ্রের দেখানো গভীর সামাজিক সহানুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধকে অবহেলা করে আজ আমরা কেবল এক যান্ত্রিক সমাজ তৈরি করছি, যা আমাদের এই মহান সাহিত্যিক থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।</p>



<p> কিন্তু এ স্বত্তেও যুগ বদলালেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। সমাজ ও মানুষের মনের গহীনের যে রূপ তিনি তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও অনন্য। আজ তাঁর সার্ধশতবর্ষের পুণ্য লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা অনুভব করি যে, আধুনিকতার চাকচিক্য সাময়িকভাবে আমাদের তাঁর থেকে দূরে সরালেও, আমাদের আবেগ, ভালোবাসা এবং মানবিক অনুভূতির প্রতিটি পরতে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত অগ্রদূত হিসেবে তাঁর স্থান আজও অপরাজিত। যান্ত্রিক এই সমাজে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা একাকীত্বের গভীরে আলো ফেলতে আজও আমাদের শরৎচন্দ্রের কাছেই ফিরে যেতে হয়। তিনি কেবল অতীতের কোনো চরিত্র নন; বরং বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির এক চিরন্তন আশ্রয়, যিনি আজও আমাদের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অত্যন্ত ভালোবাসার সাথে সগৌরবে বিরাজ করছেন।</p>



<p>তথ্য ঋণ &#8211; হর্ষ দত্ত</p><p>The post <a href="https://sukanyadigital.com/saratchandra-chattopdhyay-150th-birth-anniversary/">সার্ধশতবর্ষে  শরৎচন্দ্র</a> first appeared on <a href="https://sukanyadigital.com"></a>.</p>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sukanyadigital.com/saratchandra-chattopdhyay-150th-birth-anniversary/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
